ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-৪২

0
1074

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৪২

আদ্রিশের অনুভূতির সূত্রপাত যে প্রথমদিন থেকেই তা জানতে পেরে বেশ অবাক হলাম আমি। অথচ প্রথমদিন থেকে আমার সামনে কি ভাব নেওয়া! অবশ্য সুযোগ বুঝে সে ‘ভাব নেওয়া’ টা পানিতে ছুঁড়ে ফেলতেন উনি। কথার মোহে ফাঁসিয়ে ফেলতেন আমাকে। উনার মনে প্রথম থেকে আমার জন্য অনুভূতি আছে, এটা জানলে কখনো আমি আমার আমার অনুভূতিকে চাপিয়ে রাখতাম না।
তখন মাহা’র কথা চিন্তা করলে উনার প্রতি সকল অনুভূতি মৃত হয়ে যেতো আমার। অথচ আজ, সে অনুভূতি নতুন এক জীবনের সূচনা ঘটাতে চলেছে। আমি ডায়েরির পরের পাতা পড়তে আরম্ভ করলাম,

” মেয়েটার সাথে আজ তিনবার দেখা হয়েছে। মানে একদম ভালোমত দেখাসাক্ষাৎ আরকি। সকালে দু’বার আর রাতে একবার।

সকালের দিকে পিছনের উঠোনে বসে ছিলো সে। আমি ডাইনিং এ পানি খেতে এসে তাকে দেখেছিলাম। পানি খাওয়া শেষ হতেই উঠোনে গিয়ে দেখলাম অর্ণব এসেছে। মেয়েটার হালচাল জিজ্ঞাস করছিলো তখন। অর্ণব মেয়েটার নাম জিজ্ঞাস করতেই আমি তার নাম বলে দিলাম। যদিও অর্ণবকে তখন ‘মিম’ নাম বলেছিলাম, কিন্তু আমার মনে তখন চলছিলো মেয়েটাকে অন্য নাম দেওয়ার ভাবনা। কারন মেয়েটাকে সেই সাধারণ নামে ডাকতে মন চাইছিলো না আমার। খুব স্পেশাল একটা নাম দিতে মন চাইছিলো। যে নামে শুধু আমি ডাকবো তাকে। অন্য কারোর সামনে সে নাম মুখে আনবো না৷ সেই নাম বলে আমি তখনই তাকে সম্বোধন করবো, যখন আমরা একান্তে থাকবো।
আমি কয়েক সেকেন্ড মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চট করে একটা নাম খুঁজে ফেললাম। মেয়েটা চশমা পরে, তো স্বভাবতই সে চাশমিশ উপাধিপ্রাপ্ত। আর মেয়েটার নাম যেহেতু মিম। সুতরাং, মিম আর চাশমিশ একসাথে মিলে হয় মিশমিশ। নামটা কিউট বটে!

আমি এগিয়ে গিয়ে মিশমিশ আর অর্ণবের কাছে দাঁড়ালাম। কিছু কথাবার্তা শেষে অর্ণব মিশমিশের সামনে ছোট্ট একটা নাটক করে বসলো। তাকে ভাইয়া না বলতে বললো। এই সাধারণ কথাটাই সে অতি নাটকিয়তার আয়োজন করে সম্পন্ন করেছিলো৷ অর্ণবের এ নাটকিয় ভাবটা দেখে মিশমিশ যে বেশ ভড়কে গিয়েছিলো তা তার চেহারার হাবভাব দেখেই বুঝতে পারলাম। ফলস্বরূপ আমি আর অর্ণব একটু শব্দ করেই হেসে ফেললাম।

এরপর সকালের খাওয়াদাওয়া শেষে ভাবীর প্রেশার চেক করলাম। তখন মিশমিশকে মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখছিলাম আমি। হয়তো সে খেয়াল করেনি। খেয়াল করলে নির্ঘাত চোখ দিয়েই আমার মার্ডার করে ফেলতো ও। এভাবে মিশমিশকে আড়চোখে দেখতে অদ্ভুত এক খুশির ঢেউ খেলা করছিলো আমার মনে।

ভাবীর প্রেশার চেক করার পর আমি আমার রুমে ফিরে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার চেয়ারটার কথা মনে পড়তেই ভাইয়ার রুমের দিকে ফিরতি পথ ধরলাম। রুমে গিয়ে দেখি মিশমিশ আমার চেয়ারে বসে আছে। ব্যস এ নিয়েই ছোটখাটো একটা ঝগড়া বেঁধে গেলো আমাদের মাঝে৷ এই প্রথম ঝগড়াটা আমি বেশ মজা নিয়ে ইঞ্জয় করেছিলাম। আর মিশমিশকে জ্বালানো তো… সে কথা আর নাই বললাম। ঐ যে, আছে না একপ্রকারের মানুষ, যাকে যত রাগাবে সে ততই রাগবে। মিশমিশ একদম সেই ধরনের মানুষ। তাকে যত জ্বালাবো সে তত জ্বলবে। এমন মানুষের সাথে কথা কাটাকাটি করেও মজা। একদম নিজের মনমত কথা আগানো যায়। আর নিজের মনমত রিয়েকশন পাওয়া যায়। হা হা হা…..

আবার রাতে মিশমিশ আমার কাছে সেই বইটা চাইতে এসেছিলো। যদিও নদীকে দিয়ে পাঠিয়েছিলো, কথাটা বলতে। আমি তখনই সাফ সাফ না বলে দেই। কারন ঐ বই আমি কিছুতেই মিশমিশকে দিতে পারবো না। ঐ বইয়ের পিছনে আমার হাতের কবিতা লেখা। যদিও কবিতাগুলো আমার খুব পছন্দের৷ কারন আমার কল্পনার সেই রমণী, যার নাম রেখেছি মাধবীলতা, তাকে নিয়েই কবিতাগুলো লেখা আমার৷ আমি প্রথম থেকেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস নিয়ে ছিলাম যে, আমার জীবনে একদিন সেই কল্পনার মাধবীলতা আসবে। যার প্রেমে আমি বিভোর হয়ে থাকবো। যাকে ঘিরেই থাকবে আমার সব ভালোলাগা, ভালোবাসা। তাকে ‘ভালোবাসি’ বলার পর একদিন সময় সুযোগ বুঝে আমার লেখা কবিতাগুলো পড়িয়ে শোনাবো তাকে। সে পছন্দ করবে কি না জানি না। তবে কবিতা পড়ার মূহুর্তে তার প্রেমে আরো একবার পরে যাবো আমি। এটা অনেকটা নিশ্চিত।

অনেক আগে থেকেই বইয়ের পিছনে কবিতা বা উক্তি লেখা আমার অভ্যাস ছিলো। আজও আছে। আমার বইগুলো কেউ ছুঁয়েও দেখতো না বিধায় সেখানে এসব লেখালেখির সাহস পেয়েছিলাম৷

আমার কল্পনার সে মাধবীলতা যখন বাস্তবে আসবে তখন তাকে ঘিরেই চলবে এসব লেখালেখি। তাকে উৎসর্গ করেই লিখবো প্রতিটা লেখা। অবশ্য একটা কথা না বললেই নয়,
আমার কল্পনার সে মাধবীলতার আগমনী বার্তা হয়তো আমার এ হৃদয়খানি পেয়ে গিয়েছে । হয়তো প্রকৃতিও পেয়ে গিয়েছে।”

ডায়েরির অপর পাতা উল্টাতেই নানুর ডাক পরলো। আমি দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে ডায়েরিটা তার নিজের জায়গায় রেখে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।

.

রাতের খাবার খেয়ে মাত্রই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছি। আম্মু প্রায় ঘুমিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ঘুমটা এখনো গাঢ় হয়নি। আভা শুয়ে শুয়ে ফোন চালাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার কাছে ফোন চাওয়ার পরও আমার ফোনটা পেলাম না৷ পরে আম্মুর ফোন আভা’র হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমার ফোন নিয়ে উঠে পরলাম আমি৷

চুপিসারে ছোট উঠোনে এসে উপস্থিত হলাম আমি। ফোনের স্ক্রিন অন করতেই সময় ভেসে এলো। রাত পৌনে এগারোটা বাজে। আমি দ্রুত আদ্রিশকে কল দিলাম। সেই সন্ধ্যা হতে উনার সাথে কথা না বলে কিভাবে আছি তা আমিই জানি৷ প্রচণ্ড ভয় আর অস্থিরতায় সময় কেটেছে আমার।
রাতের খাবার আগে একবার কল করলেও আমার কল রিসিভ করেননি উনি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিলো না আমার। তবে উনার ম্যাসেজে সে দুশ্চিন্তা দূর হয়। উনি ম্যাসেজে বলেছিলেন, সবাই ঘুমানোর পর উনাকে কল দিতে। সেজন্যই এখন উনাকে কল দিচ্ছি। একবার রিং হওয়ার সাথে সাথেই উনি কল রিসিভ করলেন।
” সবাই তাহলে ঘুমিয়ে পরেছে?”
আদ্রিশের কণ্ঠস্বরে ক্লান্তি ভাবটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো। আমি অতি সন্তর্পণে এক নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
” হুম৷ এজন্যই আপনাকে ফোন করেছি। আপনি কি করছেন?”

” হসপিটালের লবিতে বসে আছি। ”

” মাহা’র সাথে কথা হয়েছে?”

” না এখনো হয়নি৷ ও ঘুমাচ্ছে। ”

” ওর অবস্থা কেমন?”

” স্বাভাবিক। বশির স্যার যেমনটা বলেছিলো ততোটাও খারাপ অবস্থা হয়নি ওর। শরীর খানিকটা দূর্বল থাকায় ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে ওকে।”

” ওহ। তাহলে ওর সাথে কখন কথা বলবেন?”

” দেখি….কখন ওর ঘুম ভাঙে। তবে দোয়া করছি, আজ রাত নাগাদ যেনো ওর ঘুমটা ভেঙে যায়। এমন হলে সকালের বাসেই আমি বাড়ি ফিরতে পারবো। আগামীকাল তো তোমার চাচুরাও চলে আসবে। তাইনা?”

” হুম।”

” কি একটা অবস্থা! তারা এসে যদি আমাকে বাড়িতে না দেখে তাহলে কি না কি ভাববে আল্লাহ জানে।”

” এদিকের টেনশন না নিয়ে ওদিকটায় সব ঠিক করে আসুন৷ আমি চাইনা মাহা ভবিষ্যতে আমাদের দুজনের মাঝে কোনো প্রকার ঝামেলা সৃষ্টি করুক।”

” হুম। ঠিক বলেছো।”

” আচ্ছা, বাড়ির কারোর সাথে কথা হয়েছে আপনার?”

” হুম। বিকেলের দিকে আব্বুর সাথে কথা হয়েছিলো। বললাম আপাতত সব স্বাভাবিক আছে। জানো, মিশমিশ? আমি খুব টেনশনে ছিলাম৷ আব্বু আম্মু কি না কি ভেবে বসে এ কারনে।”

” আপনি যখন খারাপ কিছুই করেননি তখন এতো টেনশনের কি ছিলো। শুধু শুধু টেনশন করে মাথার ঘন চুলগুলে ঝরিয়ে ফেলছেন।”

আমার কথায় আদ্রিশ ওপাশে শব্দ করে হেসে উঠলো। এতক্ষণ পর উনার হাসির শব্দে হৃদয়ে ভালোলাগার শীতল স্রোত বয়ে গেলো। হঠাৎ কি মনে করে উনাকে একটা প্রশ্ন করে বসলাম।

” আচ্ছা, একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাস করবো আপনাকে?”

ওপাশে আদ্রিশ স্বাভাবিক হয়ে বললেন,
” একটা কেন হাজারটা প্রশ্ন করতে পারো মিশমিশ।”

” আপনি কবে থেকে বুঝলেন, যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন?”

” হঠাৎ এমন প্রশ্ন করার কারন?”

” এমনিতেই করতে মন চাইলো। তবে আপনার জবাব কিন্তু চাই-ই চাই।”

আদ্রিশ হালকা হেসে বললেন,
” ঠিক আছে। জবাব দিবো। তবে আজ নয়। ”

” তো কবে জবাব দিবেন?”

আদ্রিশ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,
” উমম, বাসর রাতে।”

কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিলেও উনার জবাব দেওয়ার সময় শুনে চুপ হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম,
” এখন জবাব দিলে কি কোনো সমস্যা? ”

” উঁহু….. কোনো সমস্যা নেই। ”

” তাহলে জবাবটা দিন না।”

” নো মিশমিশ। এসব প্রশ্নের জবাব ফোনে দিতে হয়না। এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়, প্রিয়তমার সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে। তার সৌন্দর্যের নেশায় ডুবে নিজেকে মাতাল করে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।”

আমি উনার কথায় লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। ইতস্ততভাবে বললাম,
” এত আজগুবি কথাবার্তা কোথায় পান আপনি? এসব কিছু করতে হয়না। এমনিই প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায়।”

আদ্রিশ আবারো হেসে বললেন,
” যাই বলো, মিশমিশ। এখন আমি এ প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি না।”

” ধ্যাত। আমি ফোন রেখে দিচ্ছি। “এই বলে সাথে সাথে ফোন কেটে দিলাম আমি। কারন এ মূহুর্তে উনার সাথে কথা বলার সাধ্য আমার নেই।

ফোন হাতে নিয়ে রাতের নির্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। রুপোর থালার মত চকচক করছে রাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা চাঁদটি৷ চারদিকে মৃদু স্বরে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। এটাই যেনো রাতের গভীরতাকে আরো এক ধাপ বৃদ্ধি করছে।

হঠাৎ সেদিনটার কথা মনে পরে গেলো আমার। যেদিন আদ্রিশ আর আমি প্রথমবারের মত এ নিশুতি রাতে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। উপভোগ করছিলাম রাতের সৌন্দর্য। অথচ আজ…….আজ আমি একা। যদিও খানিক সময়ের জন্য৷ তবুও এই নিঃসঙ্গ রাতে হৃদয়টা একজনের অপেক্ষায় পুড়ছে। দৃষ্টিজোড়া তার অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে আছে। সবই সাময়িক। কিন্তু সাময়িক এ কষ্টগুলো পুড়াচ্ছে আমাকে। সেদিন আর আজকের রাতের মধ্যে এতো পার্থক্য দেখতে পেরে খানিকটা উদাস হয়ে গেলাম বটে৷
এ উদাসীনতা দূর করার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর পথ রইলো না আমার কাছে। আচ্ছা? আদ্রিশও কি আমার অনুপস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরে এতোটা পুড়ছে?

®সারা মেহেক

#চলবে