ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-৪৬

0
1078

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৪৬

আদ্রিশের এমন শর্ত শুনে আমি শুকনো এক ঢোক গিললাম। উনি তা টের পেলেন কি না জানি না। তবে পরক্ষণেই হেসে উঠে বললেন,
” রিল্যাক্স। এতো ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আমি যাস্ট গল্প করার কথা বলেছি। তুমি আমি পাশাপাশি বসে গল্প করবো। কিছু ফিউচার প্ল্যানিং করবো। এই তো। ”

আদ্রিশের কথা শুনে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম৷ ভয়টা কেটে গিয়ে শান্তি অনুভব করলাম। কিছুক্ষণ পর আদ্রিশ আবারো বললেন,
” কেনো? তুমি৷ কি ভেবেছিলে?”

আমি আমতাআমতা করে বললাম,
” না না। কিছুই ভাবিনি। ”

আমার কথাটা মোটেও হাস্যকর ছিলো না৷ তবুুও আদ্রিশ আমার কথায় শব্দ করে হেসে ফেললেন। বললেন,
” আমি জানি, তুমি৷ কি ভেবেছিলে। আমি মোটেও ঐ দিকটা ইশারা করিনি। ওসবের জন্য সারাজীবন পড়ে আছে। আমি চাই, আজকের রাতটা স্পেশাল করতে। এরজন্য, তোমার সাথে গল্প করা,তোমার সম্পর্কে সবকিছু জানা, আমার সম্পর্কে তোমার সবকিছু জানার সময় আজকেই। আই থিংক, এতে তোমার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।”

” আমার কোনো সমস্যা নেই। উল্টো, আমি আরো খুশি হয়েছি। ”

” আচ্ছা, তুমি শাড়ী চেঞ্জ করে কমফোর্টেবল কিছু পরে নাও। আমিও শেরওয়ানি চেঞ্জ করে নেই।” এই বলে আদ্রিশ আমাকে ছেড়ে দিলেন। আয়নার সামনে গিয়ে শেরওয়ানি খুলতে লাগলেন উনি। আমিও একে একে সব গহনা খুলে শাড়ীর পিনগুলো খুলতে লাগলাম। কাঁধের কাছের পিনগুলো খুলতে খুলতে আদ্রিশকে বললাম,
” কুঁচির পিনগুলো একটু খুলে দিন তো। ওখানে কয়টা পিন লাগিয়েছে আল্লাহ জানে। আমি খেয়াল করিনি। ”

আদ্রিশ ততক্ষণে ড্রেস চেঞ্জ করে ফেলেছেন। আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বললেন,
” আচ্ছা, খুলে দিচ্ছি। ”
এই বলে উনি শাড়ীর পিনগুলো খুঁজে এক এক করে খুলতে লাগলেন। পিন খোলা শেষে উনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
” তুমি কি শাড়ী পড়তে পারো?”

” উমম, পারি না। কখনো ট্রাই করিনি আরকি। তবে ট্রাই করলে পারবো।”

আদ্রিশ আমার কথায় মুখ বেজার করে বললেন,
” ধ্যাত, আমি ভেবেছিলাম, তুমি বলবে যে, তুমি শাড়ী পরতে পারো না। খুব কঠিন একটা কাজ। আমি যাতে সবসময় শাড়ী পরতে তোমাকে হেল্প করি। কিন্তু এতো আশায় পানি ঢেলে দিলে তুমি। ”

আদ্রিশের কথা শুনে আমি শব্দ করে হেসে ফেললাম। এতে উনি আমার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন।

শাড়ী চেঞ্জ করে একটা থ্রিপিস পরে বিছানায় গিয়ে আদ্রিশের পাশে বসে পরলাম আমি। উনি চুপচাপ জানালার বাহিরের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। আনমনে কিছু ভাবছেন। আমি উনার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাস করলাম,
” কিছু ভাবছেন?”

আমার কথায় আদ্রিশ খানিকটা চমকে উঠলো। হয়তো আমার উপস্থিতি আগে টের পাননি উনি। আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট এক নিঃশ্বাস ফেলে উনি বললেন,
” ভাবছি, তোমাকে সারাজীবন সুখী রাখতে পারবো তো?”

আমি খানিকটা চিন্তিত হয়ে বললাম,
” হঠাৎ এমন মনে হচ্ছে কেনো?”

” একটা মেয়ে বিয়ের সময় অনেক স্বপ্ন, আশা নিয়ে থাকে। আমি সেসব পূরণ করতে পারবো কি না জানি না। হঠাৎ করেই নিজের উপর সব আস্থা হারিয়ে ফেলছি আমি। ”

আদ্রিশকে আশ্বস্ত করতে আমি উনার কাঁধে মাথা রেখে বাহু ধরে বললাম,
” আমার বিশ্বাস আপনি পারবেন। এতো চিন্তা করার কোনো কারন নেই তো।”

আদ্রিশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
” আমাদের বৈবাহিক জীবনের শুরুটা হবে ছোট্ট দুই রুমের একটা বাসা থেকে। তোমার অসুবিধা হবে না তো?”

” অসুবিধা হবে কেনো? দুজন মানুষের জন্য এমন বাসায় থাকাই ভালো। বড় বাসা দিয়ে কি হবে? বাই দা ওয়ে, বাসা ঠিক করা হয়ে গিয়েছে?”

” হুম। সবকিছু করা হয়ে গিয়েছে। যাস্ট ঢাকায় গিয়ে বাসায় উঠবো। ব্যস।”

” সে কি! বাসা ঠিক করলেন কবে?”

” ঐ যে ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখনই একটু আধটু খুঁজে এসেছিলাম। তারপর নাইমকে বলতেই সব ঠিকঠাক করে ফেলে ও।”

আমি এবার অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলাম। আদ্রিশের কাঁধ হতে মাথা উঠিয়ে উনার দিকে তাকালাম। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলাম,
” এতো আগে থেকে! আমার যতদূর মনে পরে, আপনি যখন ঢাকা গিয়েছিলেন, তখন আমাদের মধ্যে কিছুই ঠিকঠাক ছিলো না৷ আই মিন, আমরা কেউই ওভাবে শিওর ছিলাম না৷ তারপরেও?”

আদ্রিশ এবার হেসে ফেললেন।আমাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে বললেন,
” তুমি না থাকলেও আমি শিওর ছিলাম অনেকটা। মনে মনে একপ্রকার প্রতিজ্ঞা নিয়ে রেখেছিলাম যে, যে করেই হোক, বিয়ে আমি তোমাকেই করবো।”

” এটা কিন্তু ওভার কনফিডেন্স হয়ে গিয়েছিলো। আর নিজের উপর এতো ওভার কনফিডেন্স থাকা ভালো না।”

” কে বললো ভালো না৷ এই যে দেখো, এই ওভার কনফিডেন্সের জোরেই তোমাকে পেয়েছি।”

” আচ্ছা, যদি আপনার পরিবারের কেউ রাজি না হতো বা আমার পরিবারের কেউ রাজি না হতো তখন?”

” আমার পরিবারের সবার ব্যাপারেই কনফিডেন্ট ছিলাম আমি। আম্মু তো তোমাকে শুরু থেকেই পছন্দ করতো। সো, কোনো সমস্যাই হতো না। ”

” আমার পরিবার যদি না মানতো?”

” ম্যাডাম….আপনার পরিবারও মেনে নিতো। কারণ, তারা আগে থেকেই নিজেদের মধ্যে একটু একটু করে এ ব্যাপারে কথা বলেছে। আর যদি নাই মানতো, তাহলে প্রথমেই মানা করে দিতো। আমার মতো বেকার ছেলের হাতে মেয়ে তুলে দিতো কে? অবশ্য, ডক্টররা বেকার খুব কমই থাকে।”

” সব বুঝলাম। বাট এই দুই পরিবারের বিষয়টা আপনি জানতেন কি করে?”

” আম্মু একটু একটু হিন্টস দিয়েছিলো আরকি। তুমি জানতে না?”

” না। জেনেছি তো, বিয়ে ঠিক হওয়ার পরে।”

” আচ্ছা…..আর হ্যা, শোনো। আগামীকাল বিকেলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবো। সবকিছু গুছিয়ে রেখো।”

আদ্রিশের মুখে আগামীকাল ঢাকায় যাওয়ার কথা শুনেই মনটা খারাপ হয়ে এলো আমার। তবুও স্বাভাবিক থেকে বললাম,
” বিকেলে কেনো? পরশু সকালে গেলে হতো না?”

” উহু, হতো না। কারণ পরশুদিন থেকে হসপিটালে জয়েন করতে হবে।”

” ওহ আচ্ছা। ”

” প্রথমে সকালের টিকিট কাটতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পায়নি৷ এজন্য বিকেলের টিকিট কাটতে হলো।”

আমি ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে ক্লাম্ত গলায় বললাম,
” ওহ আচ্ছা। ভালো।” এই বলে আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আগামীকাল ঢাকায় চলে যাবো, এই ভাবতেই কষ্টগুলো চারপাশ থেকে চেপে ধরছে যেনো আমাকে। আমি দূর হয়ে যাচ্ছি, সবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি………

হঠাৎ আদ্রিশ আমাকে নিজের বাহুডোরে আরো শক্ত করে ধরে বললেন,
” নতুন নতুন তো, তাই কষ্ট বেশি হচ্ছে। ঢাকায় গিয়ে সংসার, পড়ালেখা এসবের মধ্যে থাকলে কষ্টটা অনেকখানি ঘুচে যাবে।”

আদ্রিশের এ সান্ত্বনামূলক কথাবার্তা কোনো প্রভাব ফেললো না আমার উপর। উনি আবারও জিজ্ঞাস করলেন,
” তোমার ক্লাস শুরু কবে থেকে?”

” এই তো, আর এক সপ্তাহ পর থেকে।”

” তাহলে তো ঢাকায় গিয়েই বই, কঙ্কাল এসব কিনতে হবে।”

আমি কিছু বলতে যাবো এর আগেই হুট করে ঝমাঝম বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের চালের উপর এ আওয়াজ আরো জোরে শোনা যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, প্রথমেই চমকে উঠলাম আমি।
আদ্রিশ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলেন,
” ভয় পেয়েছো নাকি?”

আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
” না। ভয় পায়নি। চমকে উঠেছিলাম আরকি। হঠাৎ করে এমন আওয়াজ শুনেছি তো এজন্য। ”

আদ্রিশ প্রত্যুত্তরে কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেেস বললেন,
” টিনের চালের উপর বৃষ্টির এ আওয়াজ ভালোভাবে শুনো। উপভোগ করার মত একটা টিউন। মাঝেমধ্যে তো মনে হয়, ফোনে এ টিউন রেকর্ড করে ফেলি।”

আমি প্রত্যুত্তরে কিছুই বললাম না। উল্টো চুপচাপ বসে রাতের আঁধারে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা করতে লাগলাম। হঠাৎ দূরে কোথাও বাজ পরার আওয়াজ হতেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। ফলস্বরূপ পুরো ঘরটা যেনো একটা অন্ধকার কূপে পরিণত হলো। অবশ্য বিদ্যুৎ যাওয়ায় ভালোই হয়েছে। চারদিকে যে সুনসান নিরবতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে বৃষ্টির এই রিমঝিম শব্দটা আরো ভালোভাবে শোনা যাচ্ছে। আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে আদ্রিশের উদ্দেশ্যে বললাম,
” বৃষ্টির এ শব্দটা……”
আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই হঠাৎ উনি আমার চোখের উপর আলতো করে নিজের হাত রাখলেন। এরপর আমার পাশ থেকে সরে গিয়ে আমার পিছে বসে পরলেন। আমার কানের কাছে নিজের মুখ নিয়ে আলতো স্বরে বললেন,
” একদম চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির এই রিমঝিম শব্দটা উপভোগ করো। তোমার ধ্যানমগ্ন সবটাই এ শব্দের উপর দাও। গভীর মনযোগ দাও, পাতার উপর পড়তে থাকা বৃষ্টির সেই ফোঁটা গুলোর উপর। মনযোগ দাও, টিনের চাল বেয়ে মাটিতে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার শব্দের উপর। অনুভব করো সবটা।”

আদ্রিশের কথামতো সবকিছু মনের ক্যানভাসে এঁকে চলছি। সাথে অনুভব করছি প্রতিটা মূহুর্ত। বেশ কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির গতি একটু কমে আসে। কিন্তু পরক্ষণেই আবারো বৃষ্টির গতি বাড়তে থাকে। তখনও আদ্রিশ আমার চোখের উপর হাত দিয়ে আছে। আমি উনার হাত সরিয়ে পিছনে উনার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বললাম,
” চলুন না….বৃষ্টিতে ভিজি।”

” এতো রাতে!”

” হ্যা। এতো রাত বলেই সুবিধা। আশেপাশে কেউই দেখতে পাবে না আমাদের। আর দেখুন, বৃষ্টি গতি বাড়ছে। এক্ষুনি চলুন। ”
এই বলে আমি আদ্রিশের হাত ধরলাম। উনি বললেন,
” আচ্ছা চলো।”

বড় উঠোনে আমি আর আদ্রিশ দাঁড়িয়ে আছি। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে কারোর ঘরের জানালা দেখা যায় না। এজন্য আমাদের ধরা পরার সুযোগও নেই।
আমি এপাশ ওপাশ ঘুরে ঘুরে, দুপাশে দু হাত ছাড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছি। আদ্রিশও বৃষ্টিতে ভিজছেন। তবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। এ মূহুর্তে প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঠিকঠাকভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে থরথর করে কাঁপা ছাড়া আর পথ রইবে না। এজন্যই আমি ঘুরে ঘুরে বৃষ্টিবিলাস করছি।
হঠাৎ আদ্রিশ আমার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। আমার কোমড়ে হাত রেখে থুতনি ধরে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
” এতো ঘুরাঘুরি করে বৃষ্টিতে ভিজছো কেনো? এদিকে যে আমি দাঁড়িয়ে আছি, সেটা খেয়াল নেই?”

প্রচণ্ড শীতে রীতিমতো কাঁপা-কাঁপি অবস্থা আমার। এজন্য কম্পনরত কণ্ঠে বললাম,
” এভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে শীত লাগে খুব৷ এজন্যই ওভাবে বৃষ্টিতে ভিজছিলাম।”

আদ্রিশ কোনো কথা না বলে আমার কোমড় ধরে নিজের আরো কাছে নিয়ে এলেন আমাকে। আমি শুকনো একটা ঢোক গিলে উনার দিকে তাকালাম৷ উনি হয়তো একটু হাসলেন৷ পরক্ষণেই বললেন,
” একটু উষ্ণ পরশে তোমার এই শীতল অনুভূতিটা দূর করে দেই৷ কি বলো?”

আমি চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকালাম। উনি বিনাবাক্য ব্যয়ে আমার অধর স্পর্শ করলেন।

®সারা মেহেক

#চলবে