#বৃষ্টিশেষে_প্রেমছন্দ
#মুমুর্ষিরা_শাহরীন
৪৬.
ঘড়ির কাটা সাড়ে তিনটের ঘরে। টিকলি টায়রা আস্তে করে নিচে নেমে এলো। জামিলুর রেজা সোফায় বসে সকালের পত্রিকা এখন পড়ছিলেন। টিকলি টায়রাকে কনুই মেরে বলল,
‘দুপুরে খাওয়ার পর না বাবা ঘুমায়? আজ এখানে কেনো?’
টায়রা ব্যথা পেয়ে চোখ মুখ কুচকিয়ে বলল, ‘আমি জানি বাল। তোরে বাশঁ দেওয়ার জন্য মনে হয় বইসে আছে।’
টিকলি চোখ রাঙানি দিতেই টায়রা ঠেলা দিলো এগোনোর জন্য। পা টিপে টিপে ড্রইংরুম পার হতে না হতেই জামিলুর রেজার গমগমে আওয়াজ শোনা গেলো। টিকলি টায়রা তটস্থ হয়ে চোখ মুখ খিচে দাড়াঁলো। জামিলুর রেজা মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে জহুরি নজরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো। টায়রা তুতলিয়ে বলল,
‘কি কি হয়েছে বাবা?’
জামিলুর রেজা এক ভ্রু উঁচুতে তুলে বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছো?’
টায়রা উত্তর খুঁজে পেলো না। টিকলিকে চিমটি কাটতেই টিকলি কটমট করে তাকালো। টায়রা কাধ দিয়ে হালকা ধাক্কা দিলো কিছু বলার জন্য। টিকলি বাবার দিকে ঘুরে বলল,
‘ওই তো…ওই তো..মানে…আর কি আমরা পার্লারে যাচ্ছিলাম বাবা। হ্যাঁ পার্লারেই তো যাচ্ছিলাম। সামনে আমার বিয়ে তো। একটু সাজুগুজু করতে হবে না? মুখটাকে ফ্রেশ না রাখলে তো সবাই বউ দেখে নাক ছিটকাবে।”
জামিলুর রেজা সোজা হয়ে দাড়ালেন। বিয়ে সম্পর্কে মেয়ের চিন্তা ভাবনার উন্নতি দেখে তার খুশি খুশি লাগলো। তবুও সচেতন দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই দুপুরে পার্লার কে খোলা রাখে?’
টিকলি হাত মোচড়াতে মোচড়াতে টায়রার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো। টায়রা বলল,
‘আরে বাবা, এই পার্লার অনেক নামী দামী তো তাই সবসময় খোলা থাকে। কাস্টমার ডিমান্ড বুঝো না? সারাক্ষণ ভিড় থাকে।’
জামিলুর রেজা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘ওহ ভিড় হয়। তাহলে এখন যেতে হবে না। বাইরে কাঠফাটা রোদ্দুর। ঘরে যাও। বিকালে যেও।’
এই বলে জামিলুর রেজা চলে যেতে নিলেই টিকলি টায়রা সমস্বরে চিল্লিয়ে বলল, ‘না।’
জামিলুর রেজা থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়ালেন। বোকা বোকা গলায় বললেন, ‘কি হলো?’
টিকলি থেমে থেমে বলল, ‘আসলে বাবা..হয়েছে কি? আমাদের এ সময় এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে তো তাই।’
জামিলুর রেজা অবাক গলায় বললেন, ‘পার্লারে এপয়েন্টমেন্ট?’
টায়রা বিজ্ঞ সুরে আস্তে গলায় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, ‘হ্যাঁ বাবা। সেটাই তো বলছি। এখন পার্লারের মালিকের সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট আছে। এপয়েন্টমেন্ট এরপর না পার্লারে ঢুকে ফেসিয়াল আই মিন সাজুগুজু হেন-তেন হাবিজাবি করতে পারবো!’
জামিলুর রেজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আজকাল পার্লারেও এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে ঢুকতে হয়। দিনকাল কোথায় যাচ্ছে? দেশ আসলেই উন্নতির পথে এগিয়ে গেছে।’
জামিলুর রেজা নিজের ঘরে যেতে যেতে বললেন, ‘গাড়ি নিয়ে যেও। আর এক ঘণ্টার ভেতর বাসায় আসা চাই।’
জামিলুর রেজা যেতেই টিকলি টায়রা চাপা সুরে হেসে উঠলো।
,
নামীদামী চাকচিক্যপূর্ণ আড়ম্বরি রেস্টুরেন্ট। মাঝখানে টেবিল। দু’পাশে সোফা। টায়রা মনোয়ারা খানের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে ছিলো। তার চোখে মুখেই ফুটে উঠেছে এখানে আসার বিরক্তি। টিকলি এক ঝলক মনোয়ারা খানের দিকে তাকিয়ে আবার এদিক ওদিক তাকালো। ভেতরটা অস্বস্তিতে বুঁদ হয়ে রয়েছে। মনোয়ারা খান সৌজন্যে হেসে বললেন,
‘কি খাবে বলো?’
টিকলি ভ্রু বাকিয়ে মনোয়ারা খানের দিকে তাকালো। এখানে নিশ্চয়ই আদর যত্ন করে খাওয়ানোর জন্য ডাকা হয়নি। এতো সময় না নিয়ে আসল কথায় আসলেই তো হয়। টিকলি মাথা দুলিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘নাহ কিছু খাবো না। আপনি এখানে কেনো ডেকেছেন তা যদি বলতেন-‘
মনোয়ারা খান স্মিত হাসলেন। টিকলি চোখ ছোট করে তাকালো। মহিলাটি নিতান্তই সুন্দর এবং আধুনিকা। পড়নে তার ঘিয়া রঙের জামদানী শাড়ির বেগুনি পার। মাথায় বেগুনি হিজাব। তার উঁচু নাক, চড়া কপাল, ভ্রুর নিচে একজোড়া নিঃসহায় চোখ, শ্যামলা মুখশ্রীর নিখুঁত গড়ন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে টিকলির মনে হলো, ‘আদর ওর মায়ের মতোন দেখতে।’
টায়রা সোফায় হেলান দিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আমাকে কেনো ডাকা হয়েছে আন্টি?’
মনোয়ারা খান একটু নিভলেন টায়রার সরাসরি প্রশ্নে। একটু থেমে অপ্রতিভ গলায় বললেন,
‘তোমার সাথে কি আর্দ্রের কথা হয়?’
টিকল বিস্ফোরিত কন্ঠে বলল, ‘না না। ওর সাথে আর্দ্র ভাইয়ার কেনো কথা হবে?’
মনোয়ারা খান খানিকটা বিরক্তিতে ভ্রু কুচকালেন,’তুমি অনেক কিছুই জানো না টিকলি। উত্তরটা তোমার বোনকে দিতে বললে ভালো হতো।’
টায়রা অকপটে বলল, ‘নাহ কথা হয়না।’
মনোয়ারা খান ভ্রু কুটি করে তাকালেন। টায়রা একটু থেমে শুকনো ঠোঁট জোড়া জিহবা দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে বলল, ‘কাল রাতে হয়েছিলো।’
টিকলি অবাক গলায় বলল, ‘কাল রাতে হয়েছিলো মানে?’
টায়রার জবাব দেওয়ার আগেই মনোয়ারা খান বললেন, ‘আর্দ্রের বিয়ে ঠিক হয়েছে নিভার সাথে। তা জানো?’
টায়রা উত্তর দিলো না। অন্যদিকে তাকালো। সে বুঝে গেছে তার এখানে আসার কারণ। সবার মাঝে টিকলি বলল,
‘জি শুনেছি।’
মনোয়ারা খান মাথা দুলালেন। টিকলি আবার বলল, ‘কিন্তু আর্দ্র ভাইয়া তো ছোট তার আগে তো।’
‘আদর বিয়ে করবে না। এদিকে ওর বাবাও মেনে নিবে না।’
টিকলি থামলো। সহায়হীন চোখে তাকালো মনোয়ারা খানের দিকে। মনোয়ারা খান উঠে এসে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে টায়রার উদ্দেশ্যে বললেন,
‘আমি জানি না আর্দ্রের প্রতি আদেও তোমার কোনো অনুভূতি আছে কিনা। তবে আর্দ্র নিজের আত্মগোপনেই নিজের মনের অনেকটা অংশ জুড়ে তোমার প্রতি গাঢ় অনুভূতি তৈরি করে ফেলেছে।’
টিকলি হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। বিদীর্ণ চোখে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইলেই মনোয়ারা খান হাত জোর করে বললেন,
‘আমি তোমার পায়ে পরে বলছি টিকলি, দয়া করে আমার ছেলের জীবন থেকে সরে যাও। আমার সংসার আগুনে জ্বলসে যাচ্ছে। বাবা-ছেলের মাঝে একমাত্র তোমার কারণেই বিবাদ ঘটছে। তোমার কারণে আদর বিয়ে করছে না। তোমার কারণে আদরের বাবা জেদ ধরে ছোট ছেলের আগে বিয়ে দিচ্ছেন। দয়া করো, আমি তো তোমার মায়ের মতোন। সরে যাও আমার ছেলের জীবন থেকে। পরিবারের দোয়া ছাড়া তোমরা কখনো সুখী হবে না। আর তোমাদের বাবারা মরে গেলেও কোনোদিন তোমাদের মানবে না। আমার সংসারটা চূর্ণবিচূর্ণ করো না।’
মনোয়ারা খানের শুষ্ক গাল বেয়ে পড়তে থাকলো নোনা জল। টিকলি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে মনোয়ারা খানের দিকে তাকিয়ে থাকার কালেই চোখের কোণায় অশ্রুর কুণ্ডলী জমা হলো। আদরকে ভুলে যেতে হবে- এ কথা তো কল্পনাতেও আনা যায় না। আদরকে ভালোবাসার অধিকার তার থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। টিকলির এখন কি করা উচিত? এই জনবহুল রেস্টুরেন্টে প্রেমিকের মায়ের সামনেই হাউমাউ করে কাদা উচিত? তার পা ধরে বলা উচিত- ‘আমি আপনাদের দাসী হয়ে থাকবো তবুও এমন করবেন না।’ তাহলে কি বলা উচিত? কি বললে আদর-অধিকার শুধু তার হবে?
মনোয়ারা খানের মায়া হলো। তবে তার কিছু করার নেই। তিনি টায়রার দিকে তাকিয়ে কান্নারত অবস্থায় বললেন,
‘আমার আর্দ্রটাও ভালো নেই, মা। সরে যাও ওর জীবন থেকে। আর কক্ষনো কথা বলো না ওর সাথে। ওদের নতুন জীবনগুলো নিয়ে ওদের মতো করে থাকতে দাও। আমার সংসারটাকে বাঁচাও তোমরা। আমার ছেলেদের বাঁচতে দেও। সরে যাও তোমরা দুই বোন। দয়া করো, এই অসহায় মা টাকে।’
জগতের কোনোকিছুই যেনো টিকলির কর্ণগোচর হলো না। কানে তালা লেগে গেছে। পু’ করে বিকট ধ্বনির এক ধরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। টিকলির মনে হচ্ছে এ সবই অপার্থিব। এসব ঘটছে না। টিকলি কল্পনা করছে। শুধুই কল্পনা। এ সব তার হ্যালুসিনেশন। একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কয়েক মিনিট গড়িয়ে গেলো কিচ্ছু ঠিক হলো না। যেমন ছিলো তেমনি রইল সব। টিকলির কিছুই বলা হয়ে উঠলো না। হাউমাউ করে কাদা হলো না। পা ধরে অনুনয় সুরে অনুরোধ করা হলো না। স্থিত হয়ে সোফা থেকে উঠে দাড়ালো সে। বাইরে নিজের ঠাট বজায় রাখতে গিয়ে এক ফোটা অশ্রু বিসর্জনও দেওয়া হলো না। দূর্বলতা প্রকাশ করার ইচ্ছে জাগলো না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো। নিরব গলায় বলল,
‘টায়রা চল। বাসায় যেতে হবে তো! বাবা এক ঘন্টার মাঝে বাসায় যেতে বলেছে।’
টায়রা চমক দুটি চোখে টলটলে পায়ে টিকলির সাথে হেটে চলে গেলো। মনোয়ারা খান তখনও হাত জোর করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েগুলো চলে যেতেই তিনি মুখে হাত দিয়ে কাদলেন। তিনি চাননি এই সুন্দর ফুটফুটে মেয়েগুলোর হৃদয়ের গভীরে আঘাত করতে৷ কিন্তু না চাওয়া জিনিস গুলোই চেয়েফেলা হয়। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে, ছেলেমেয়ের দিকে নজর দিয়ে, সুন্দর সংসারটা চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে সেই সংসারের হাল ধরতে নারীগণ অনেক সময় অলৌকিক শক্তি সঞ্চয় করে থাকেন। যেই হাতিয়ার শক্তিটির নাম ধৈর্য্য এবং চোখের অশ্রু।
আদর আর্দ্র যখন গাজীপুর থেকে বাড়ি ফিরে এলো। সকালে ছেলের ঘরে যেতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন ছেলে তার ফোনে টায়রার ছবি দেখছে। কালকে ছেলেকে ডাকার উদ্দেশ্যে ঘরে গিয়ে ফিরে আসার সময় কেদে কেদে ফোনে কথাও বলতে শুনেছেন। আদর বলেছিলো, বউ নিয়ে একাই সেটেল হবে। ঘরের বাইরে থেকে শুনেই মনোয়ারা খানের আত্মা ধক করে উঠেছে। এই এতো জুড় ঝামেলার মাঝে টিকলি টায়রাকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না তার। এখন অপেক্ষা এবং দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কিছু করার নেই। সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাক তবুও তার সংসার সুখের থাক। সংসারের জন্য তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বার্থপর হতেও রাজি আছেন। কিন্তু অবুঝ মহিলা এটা বুঝতে পারলেন না এতে তার সংসার আরো জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।
_________________________________
শেষ বিকালের আকাশে এক ঝাকঁ পাখি উড়ে গেলো উত্তর দিকে। উদাস চোখে সাথে বৈরাগী মনে জানালা গলিয়ে সবুজবীথি প্রকৃতি দেখছিলো টিকলি। পাশেই গভীর চিন্তায় টায়রা কপাল কুচকে বসেছিলো। খানিক বাদে এক পলক টিকলির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরালো। অদ্ভুত! টিকলি কাদছে না। একটা কথাও বলছে না। আশ্চর্য বিষয়! টায়রা যতটা সম্ভব নিজের স্বভাব-সিদ্ধ গলায় বলল,
‘হাতে আছে আর মাত্র পাঁচদিন। কি করবি কিছু ভেবেছিস? ভাইয়াকে বলবি না?’
টিকলি উত্তর দিলো না। বিষন্ন মুখটায় যাতনা। চাপা অন্তর্বেদনার ক্লেশ। টায়রা বুঝতে পারছে এই এতো সুন্দর অরঞ্জিত নির্মল মুখটার পেছনের মর্মযন্ত্রণার মনস্তাপ। টায়রা ক্ষোভ ভাব নিয়ে মজা করার চেষ্টা করে এবার বলল,
‘সব দোষ ওই আকিদা ভাল্লুকিনীর। ঐ ব্যক্তি প্রথমে রাহুল ভাইয়াকে বিয়ে করার জন্য বাবা-মাকে উসকানি দিয়েছিলো। এই মহিলার মাথায় প্রচুর বুদ্ধি। কুটনি মহিলা। অসহ্য।’
টিকলি স্মিত হাসলো। কি আশ্চর্য ব্যপার! যে যত অন্যের ভুল ধরতে পারে, সমালোচনা করতে পারে, পট পট করে কথা বলতে পারে সমাজের ভাষায় সে তত বুদ্ধিমান। স্বল্পভাষী, অনধিকার চর্চা করে না, কারোর ব্যাপারে মাথা ঘামায় না এমন মানুষগুলোই সামাজিক ভাষায় বোকা। প্রকৃত অর্থে তাদের বুদ্ধি নেই। সহজ ভাষায় বুদ্ধিহীন জীব তারা!
শেষ বিকেল দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পক্ষীদের নীড়ে ফেরার ব্যস্ততা দেখা গেলো। দূরের আকাশের ডুবন্ত সূর্যের লাল আভা ভেসে উঠলো। প্রকৃতি নীল হতে হতে কালো আধারে ডুব দিলো তবুও টিকলি সেই স্থান থেকে নড়লো না। ঝিম মেরে একই স্থানে বসে রইলো।
রাত তখন আটটা। ফোনটা অনবরত বেজে চলেছে। এক ঝলক ফোনের দিকে তাকাতেই দেখা গেলো ‘বাদর ডাক্তার’ নাম ভেসে উঠেছে। টিকলি তাকিয়েই থাকলো। সেকেন্ড গড়ালো। মিনিট গড়ালো। পাঁচবার ফোন দেওয়া হয়ে গেলো। এরপর আর ফোন এলো না। মোবাইলের স্কিন কালো হয়ে গেলো। নিস্তব্ধ টিকলি তখনও তাকিয়ে থাকলো বোধবুদ্ধি নেই এমন ধারায়।
,
টিকলিকে ফোনে না পেয়ে আদর ভ্রু কুচকালো। এরকম তো কখনো হয়না। কপালে সূক্ষ্ম কয়েকটা ভাঁজ ফেলে টায়রার নাম্বারে ফোন লাগালো।
টায়রা টিকলির পাশেই বসেছিলো। সবকিছু তার চক্ষুগোচর হয়েছে। আদর যে এবার তাকে ফোন করবে তাও ভেবে রেখেছিলো। মিনিট দুয়েক না গড়াতেই আদরের ফোন পেয়ে টায়রা বারান্দায় চলে গেলো।
‘আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কেমন আছেন?’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি?’
‘ভালো আছি।’
‘টায়রা, টিকলি কোথায়? ফোন করলাম কিন্তু রিসিভ করলো না।’
‘আসলে…’
টায়রার তোতলানো দেখে আদর ভ্রু কুচকে বলল, ‘ইজ এভরিথিং অলরাইট?’
টায়রা ইতস্তত করে বলল, ‘ভাইয়া, আপনি কি রিয়েক্ট করবেন বুঝতে পারছি না।’
আদরের কেমন যেনো লাগলো। ভীত গলায় বলল,
‘টায়রা হেয়ালি করো না। কি হয়েছে বলো?’
টায়রা চোখ মুখ কুচকে বলল, ‘টিকলির বিয়ে ঠিক হয়েছে ভাইয়া।’
আদর থমকে গেলো। থমকে দাড়ালো তার ঘোটা পৃথিবী। গোল গোল ঘুরতে লাগলো মাথা। মস্তিষ্কের নিউরন গুলোও অবাক হয়ে উঠে কাজ করা বন্ধ করে দিলো। কেবল বলের মতো ঢপ খেতে লাগলো এই একটি বাক্য, ‘টিকলির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’
আদর শূন্যে দৃষ্টি রেখে বিস্মিত গলায় বলল, ‘কি বলছো! বিয়ে ঠিক হয়েছে মানে? কবে? কার সাথে? উনি তো আমাকে কিছু বললেন না। টায়রা তুমি কি আমার সাথে মজা করছো? প্লিজ লক্ষী বোন এরকম মজা করো না।’
টায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘উত্তেজিত হবেন না ভাইয়া। পরিস্থিতি এখন আপনাকেই সামাল দিতে হবে। হাতে আর মাত্র পাঁচদিন সময়।’
আদর রুদ্ধশ্বাসে বলল, ‘পাঁচদিন মানে?’
‘পাঁচদিন পর টিকলির বিয়ে।’
আদর ক্রুদ্ধ গলায় বলল, ‘আর তুমি আমাকে এখন বলছো? উনি কোথায়? আই ওয়ান্ট টু টক টু টিকলি।’
‘ভাইয়া আগে আমার পুরো কথাটা শুনুন। টিকলি আপনাকে বলতে চেয়েছিলো কিন্তু..’
আদর অধৈর্য্য গলায় বলল, ‘কিন্তু? কিন্তু কি? পাত্র কে? ডিটেইলস দেও।’
টায়রা চোখ বন্ধ করে মিনমিনে গলায় এক নিঃশ্বাসে বলল, ‘পাত্র আমাদের মামাতো ভাই। নাম, রাহুল হক।’
আদর ভ্রু বাকালো, ‘রাহুল হক মানে? রাহুল হক মানে কি টায়রা?’
‘রাহুল হক মানে আমার মামাতো ভাইয়ের নাম।’
‘টায়রা আমার মেজাজ গরম। উল্টাপাল্টা কথা বলবা না। কোথায় থাকে এই ব্যক্তি?’
টায়রা কাদো কাদো গলায় বলল, ‘আপনার বাসার উপরের তলার রাহুল ই আমাদের মামাতো ভাই। তার সাথেই বিয়ে।’
আদর স্থির কানে শুনলো। শুনা মাত্রই অচল হয়ে এলো হাত পা। যেনো অসাড় হতে লাগলো শরীর। প্রকৃতি হয়ে উঠলো শান্ত নিরব স্তব্ধ। স্থিতিশীল প্রকৃতিতে অদ্ভুত শব্দ করে উড়ে গেলো বাদুর। আকাশে জমাট বাধা কালো মেঘের দল আদরকে উপহাস করলো। কালো অশরীরীর ন্যায় গাছগুলো আদরকে ব্যঙ্গ করলো। ফাঁকা রাস্তাটা পর্যন্ত আদরের সাথে পরিহাস করলো। ঠাট্টা করলো। এ কোন রাহুল? এই রাহুলের বিয়েতেই কি আদর যেতে চেয়েছিলো? এটাই কি সেই রাহুল যাকে সে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতো? এটা কি সেই রাহুল যে আদরকে বড় ভাইয়ের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা করতো! আদরের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো। বিরবির করে অনবরত বলতে থাকলো,
‘এসব কি শোনাচ্ছো তুমি টায়রা? এটা কীভাবে হতে পারে? রাহুল তোমাদের মামাতো ভাই? কীভাবে? আমাকে আগে কেনো জানাও নি? বিয়ে ঠিক হয়েছে তবুও আমাকে কেনো জানানো হয়নি?’
টায়রা বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলা শুরু করলো বিকালের ঘটনা। মনোয়ারা খানের কাল কল করা। আজ দেখা করা। আদরের জীবন থেকে টিকলির সরে যেতে বলা সব বলল। সব শুনে আদর পাগলের ন্যায় ছুটে গেলো উপর তলায়। মায়ের সাথে বোঝাপড়াটা পরের জন্য তোলা রইল। এখন রাহুলের সাথে কথা বলা আবশ্যক। কিন্তু উপরে ব্যাচেলর বাসায় গিয়ে জানলো রাহুল বাসায় নেই। ফোন দিলে ফোন বন্ধ আসলো। একবার দুইবার দশবার তবুও একই কণ্ঠ একই কথা, ‘আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটিতে এই মুহুর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন। ধন্যবাদ।’
,
কলিংবেলের শব্দে শায়লা আক্তার সদর দরজা খুললেন। খুলে রাহুলকে দেখে চমকে উঠলেন। পরম যত্নে জড়িয়ে ধরে বললেন,
‘বাবা তুই?’
রাহুলের মুখটা থমথমে। কালকের নিভার ঘটানো ঘটনা নিয়ে সে যথেষ্ট গম্ভীর। কোনোমতেই মাথা থেকে নামছে না ব্যাপারগুলো। তাই সেই বাসা ছেড়েই চলে এসেছে। মৃদু হেসে বলল,
‘ব্যাচেলর বাসা থেকে বিয়ে করবো নাকি? তাই এসে পড়লাম।’
‘ভালো করেছিস বাবা। কি খাবি বল?’
‘উমমম…. পোলাও, আলু ভাজি আর কালাভুনা খেতে ইচ্ছে করছে ফুপি।’
চলবে❤️
#বৃষ্টিশেষে_প্রেমছন্দ
#মুমুর্ষিরা_শাহরীন
৪৭.
পানি খাওয়ার জন্য নিচে নেমে এসে টায়রার চোখ চড়কগাছ। চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো,
‘তুমি?’
রাহুল হেসে বলল, ‘হ্যাঁ আমি।’
টায়রা জোরপূর্বক হেসে বলল, ‘বউ দেখতে এসেছো?’
‘নাহ নিতে এসেছি।’
টায়রা আতংকিত গলায় বলল, ‘নিতে এসেছো মানে বিয়ের তো দেরি আছে।’
রাহুল উপরে যেতে যেতে বলল, ‘এখান থেকেই বউ নিয়ে যাবো।’
রাহুলের কথা শুনে টায়রা ছুটে গেলো টিকলির কাছে। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে যেতে না যেতেই রুহুল হকের ফোন এলো। রাহুল বিরক্ত মুখে ফোন রিসিভ করে বলল, ‘জি বলুন।’
রুহুল হক দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, ‘তুমি ওখানে কি করো? বিয়ের আগে এসব কি রং তামাশা?’
রাহুল দায়সারা জবাব দিলো, ‘তাহলে কোথায় থাকবো? ব্যাচেলর বাসা ছেড়ে দিয়েছি। বউ নিয়ে তো আর ব্যাচেলর বাসায় উঠবো না।’
‘আমি কি মরে গেছি। কতবার বললাম এ বাড়ি থেকে বিয়ে করতে কথা কানে যায় না তোমার। বিদায়বেলায় বউ নিয়ে কোথায় যাবে?’
রাহুল ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ ভাবলো এরপর আর উত্তর দিলো না। রুহুল হক ক্ষেপা গলায় বললেন, ‘এক্ষুনি ও বাড়ি থেকে এ বাড়ি আসো রাহুল।’
রাহুল এক বাক্যে না করলো, ‘কক্ষনো না।’
রাহুল থেমে শ্বাস ফেলল বলল, ‘আচ্ছা। বিয়ের আগেরদিন আপনার বাড়ি যাবো। এ কয়দিন এখানে থাকি। আপনার বাড়িতে আমার দমবন্ধ লাগে।’
,
সকালে মায়ের মুখোমুখি হয়ে আদর ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কাল কোথায় গিয়েছিলে মা?’
মনোয়ারা খান অপ্রস্তুত হলেন। অপ্রসন্ন গলায় বললেন, ‘কাজে।’
‘কি কাজ?’
‘ছিলো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’
‘বলো।’
মনোয়ারা খান আর উত্তর দিলেন না। কাজ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আদর রোষাগ্নি গলায় বলল, ‘ নিজের ছেলের জীবন নষ্ট করা কি তোমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ মা?’
মনোয়ারা খান বিস্ময় দৃষ্টিতে চাইলেন, ‘আমি তোমার মা আদর। আমি তোমার জীবন নষ্ট করবো?’
আদর টেবিলে শব্দ করে বলল, ‘তাহলে কেনো কাল টিকলির সাথে দেখা করেছো? কেনো ওকে আমার থেকে দূরে যেতে বলেছো?’
মনোয়ারা খানের চোয়াল শক্ত হলো, ‘বেশ করেছি। যা করেছি একদম ঠিক করেছি। তোমাদের এসব প্রেম প্রেম খেলার আগে আমার সংসার৷ আমার চোখের সামনে আমার স্বামী কষ্ট পাচ্ছে বড় ছেলের জন্য। কিন্তু ছেলের ধ্যান জ্ঞান ওই এক মেয়ে। কি আছে ওই মেয়ের মাঝে? যখন বিয়ে দিতে চেয়েছিলো তখন তো কত কথা বলেছো! এখন কোন সাহসে ওই মেয়ের হয়ে সাফাই গাইতে আসো?’
আদর চমকিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উচ্চারণ করলো, ‘মা!’
মনোয়ারা খান কঠোর গলায় বললেন, ‘আদর এখান থেকে যাও। তুমি নিজে একবার ভেবে দেখো তুমি কেমন মেয়ের প্রেমে পড়েছো। মেয়েটাকে আমি ভেবেছিলাম অন্যরকম। আমি দেখা করেছি আর সে তোমাকে সাথে সাথে বলে দিলো। সে যদি ভালোই হতো, তোমার ভালো চাইতো, সবার কথা চিন্তা করতো, তাহলে নিরবে সরে যেতো। এভাবে তোমার কাছে আমার নামে নালিশ করতো না।’
আদর বিস্ময়কর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল ক্ষণকাল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই কঠিন মনের মানুষটি যে তার মা তা মানতে আদরের খানিকটা বেগ পেতে হলো। কীভাবে এতোটা কঠোর হতে পারে মা?
‘না জেনে কাউকে ব্লেম করা উচিত নয়। কেউ যদি অযথা তোমাকে ব্লেম করে তাহলে তোমার কেমন লাগবে? ভেবে দেখো।’
আদর শক্ত গলায় বলল। চোখের সাদা অংশের আশেপাশে লাল রেখার ছড়াছড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাসের ফুসফুস শব্দ ভেসে আসছে। আদর রেগে চলে গেলো নিজের ঘরে।
_______________________________
চারিপাশে ভ্যাপসা গরমের তান্ডব। মাথার উপর তেজস্বী সূর্য। রোদের তাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পিচ ঢালা রাস্তা, ফুটপাত। টিকলির শুষ্ক চুলগুলো মৃদু উড়ছে। বড় শপিংমলের এসির নিচে বসে থেকেও গা থেকে অনবরত ঘাম ছুটছে। অপ্রসন্ন চোখে এদিক ওদিক তাকাতেই রাহুলের কথা শোনা গেলো। একটা নীল জামদানী শাড়ি নিয়ে রাহুল বলছে,
‘দেখ তো এটা কেমন লাগে?’
টায়রা ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে পাশে বসে ফোন টিপছিলো। এক ঝলক শাড়িটার দিকে তাকিয়েই আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। বাড়িতে রুহুল হক এসেছেন। এক প্রকার ধমকে জোর জবরদস্তি করে তিনজনকে পাঠানো হয়েছে শপিং এ। বিয়ের আর মাত্র চারদিন বাকি। রাগে টায়রার মাথা ফেটে পরলো। মনে হলো এক্ষুনি রাহুলের নাক বরাবর ঘুষি দিয়ে বিয়ের ভূত মাথা থেকে নামিয়ে দি। রাহুলের আচরণে টিকলি অবাক হলো। রাহুল কীভাবে এতোটা স্মুথলি বিয়ে ব্যাপারটা নিতে পারছে? টিকলি ভাষ্যমতে রাহুল নিজেও কখনো বোনের নজর ছাড়া অন্য নজরে ওর দিকে তাকায়নি। টিকলি চোখ মুখ কুচকে বিদ্বিষ্ট গলায় বলল, ‘তোমার যা পছন্দ হয় নাও।’
রাহুল কেমন করে যেনো মাথা ঝাঁকালো। নীল জামদানী শাড়িটা প্যাকেট করতে বলল৷ টিকলির চোখ গেলো শাড়ির স্তূপের নিচে পরে থাকা জলপাই রঙের জামদানী শাড়িটার দিকে। জলপাই রং আদরের খুব পছন্দ। আদর বলেছিলো একদিন, টিকলিকে বিয়েতে জলপাই রঙের শাড়ি পড়িয়ে সাজাবে। শাড়িটা হাতে তুলে নিতেই টিকলির হাত থেকে ছু মেরে রাহুল নিয়ে নিলো। টিকলি হতভম্ব চোখে তাকাতেই রাহুল হেসে অত্যাধিক খুশি গলায় বলল,
‘এই শাড়িটা পছন্দ? ভাই এই শাড়িটাও প্যাক করে দিন।’
টিকলির আশ্চর্য ভাব তখন অবধি কাটলো না। হতবুদ্ধির ন্যায় বসে রইল। অতি দুঃখী মানুষরা একটু খুশিতেই পাগল হয়ে যায়। রাহুলের অবস্থাও হয়েছে তেমন। টিকলি রাগে দুঃখে বাইরে চলে এলো। রাগে ফুসতে ফুসতে হাত মোচড়াতে লাগলো। ইচ্ছে করলো হাতের মুঠোয় রাহুলকে পিষে ফেলতে। ফোনে টুং করে শব্দ হলো। টিকলি ক্ষুব্ধ হাতে ফোন বের করতেই দেখলো আদর ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। কপালের পাতা কুচকিয়ে ভয়েস মেসেজ ওপেন করতেই শুনা গেলো আদরের কণ্ঠ,
‘টিকলি, আমার না অসুখ করেছে! আপনাকে দেখার অসুখ।’
বাতাস থেমে গেলো। রোদের ঝলকানি নরম হলো। সব শূন্যে উঠে লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে লাগলো। মুহুর্তেই অদৃশ্য এক স্তব্ধতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো টিকলিকে। নিশ্চল চোখের কোণায় বিন্দু বিন্দু করে জমতে থাকলো পানি। বুকে জমলো পাহাড় সমান মেঘ। হঠাৎই খেয়াল করলো তার শ্বাস আটকে আসছে। শরীরের ভর ছেড়ে দিচ্ছে। এই কণ্ঠকে ভুলে যাবার মতো ক্ষমতা তার নেই। টিকলি তড়িঘড়ি করে আবার দোকানের ভেতরে পা রাখলো। এখানে আর এক সেকেন্ড থাকতে পারবে না সে৷ টায়রাকে চোখের ইশারায় কিছু বুঝিয়ে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, আমি বাসায় গেলাম।’
রাহুল তাক লাগা চোখে বলল, ‘বাসায় যাবি মানে? মাত্র তো শাড়ি কিনলাম।’
‘আমার শরীর ভালো লাগছে না। অস্থির লাগছে এতো মানুষের ভীড়ে।’
রাহুল কথা বাড়ালো না। বলল, ‘তাহলে চল আমরাও চলে যাই। পরে আসবোনি।’
টায়রা উচুঁ গলায় বলল, ‘না।’
রাহুল টিকলি ভ্রু কুচকে তাকালো। চিৎকারে দোকানদার পর্যন্ত বিহ্বল হয়ে পরলো। আমতা আমতা করে টায়রা বলল,
‘না মানে। টিকলি বাসায় গেলেই তো বাবা মা বকা দিবে তারউপর যদি দেখে আমরাও শপিং করা বাদ দিয়ে এসে পরেছি তাহলে তো..’
রাহুল ভাবলো কিছুক্ষণ। টিকলি মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘হ্যাঁ টায়রা তো ঠিকই বলেছে।’
‘আচ্ছা সাবধানে যাস।’
,
একটু আগের প্রবল রোদখানি এখন নেই। তেজস্বী সূর্য ঢাকা পড়েছে মেঘের আড়ালে। চারিপাশে ঠান্ডা বাতাস। নৃত্য করতে করতে হেলে পরছে বৃক্ষসমাজ। টিকলি ফুটপাতের ব্যস্ত পায়ের সমাচারে পিষ্ট হয়ে ধীর পায়ে হেটে যাচ্ছে। গাল ভিজে উঠেছে তপ্ত নোনা জলে। ফুটপাত ছেড়ে নিচে নেমে এলো সে। হেটে হেটে অনেকখানি দূরে এসে পরেছে। জনসমাগমহীন রাস্তার বাকল ধরে যেতেই কেউ হেচকা টানে গাড়ির পেছনের সিটে তুলে নিলো। টিকলি চিৎকার দিয়ে উঠতে নিলেই আগুন্তকঃ টিকলির দু’ হাত চেপে ধরলো। টিকলি বার কয়েক পলক ফেলে আদরকে দেখে রাগীস্বরে বলল,
‘আপনি? এভাবে কেউ টেনে ধরে?’
আদর দ্বিগুন তেজ দেখিয়ে বলল, ‘আমার ফোন কেনো তুলছেন না?’
টিকলি নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো, ‘ভালো লাগছিলো না তাই?’
আদর আরো জোরে চেপে ধরলো টিকলির হাত। ব্যথায় চোখ মুখ কুচকে ফেলল টিকলি। আদর টিকলির দিকে ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আপনার সাহস তো কম না৷ বিয়ের শপিং করতে এসেছেন।’
আদরের থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা চালানো হলো কয়েকবার। বার বার ব্যর্থ হয়ে ক্লান্ত মাথা সিটে হেলান দিলো টিকলি। তখন চারিপাশে ঝুমঝুম করে নেমেছে বৃষ্টির সৈন্যদল। তাদের প্রধান কাজ হলো ভিজিয়ে দেওয়া। কিন্তু আসল কাজ হলো কারোর মন ভালো করা, কারোর মন খারাপ করা কিংবা কারোর বিরক্তির কারণ হওয়া। আদর গাড়ির জানালা আটকে বলল,
‘আপনার মনে আছে টিকলি, আমি প্রথম কি বলে আমার অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলাম?’
টিকলি হালকা করে মাথা দুলিয়ে বলল, ‘In the end of rain, the love is beginning.’
আদর স্মিত হেসে বাইরের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো, ‘দেখুন আজও বৃষ্টি পড়ছে। একটু পর থেমে যাবে। ভালোবাসার সূচনা ঘটবে।’
বন্ধ চোখের পাতা মৃদু কেপে উঠলো। আদর অসহায় কণ্ঠে বলল, ‘আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন কোনো পরিস্থিতিতে আমার থেকে দূরে সরে যাবেন না।’
টিকলি আদরের বুকে হালকা করে মাথা রাখলো। অপ্রতুল গলায় বলল, ‘সরি।’
আদর পরম যত্নে টিকলির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘আমি রাহুলের সাথে কথা বলতে চাই।’
টিকলি মাথা উঠালো। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলো। আদর টিকলির ফোনের দিকে ইশারা করে বলল, ‘নাম্বার দিন। আমি সব জানি। টায়রা কাল সব বলেছে।’
টিকলি আদরকে নাম্বার দিলো। আদর ভ্রু কুচকে বলল, ‘এই নাম্বার তো আমার কাছেও আছে। কিন্তু বন্ধ।’
টিকলি চিন্তিত মুখে বলল, ‘বন্ধ? কই দেখি।’
টিকলি ফোন দিলো। যথারীতি ফোন বন্ধ এলো। টিকলি হতাশ নিঃশ্বাসে বলল, ‘বন্ধ। নাম্বার বোধহয় চেঞ্জ করেছে। নাহলে রাহুল ভাইয়ার ফোন কখনো বন্ধ থাকেনা।’
আদর সিটে বাড়ি মেরে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলল, ‘এখনি সিম পাল্টাতে হলো।’
টিকলি অসংলগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদর টিকলির গালে হাত রেখে বলল, ‘কান্নাকাটি করবেন না। আমি আছি তো!’
টিকলি আদরের হাতের উপর হাত রেখে ভরসায় সুরে বলল, ‘হুম।’
আদর টিকলির দিকে গভীর প্রেম নয়নে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। হঠাৎ টিকলির কপালে চুমু দিয়ে বলল, ‘আজও একটা টিকলির অভাবে চুমু সম্পূর্ণ হলো না।’
টিকলি তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। ফিসফিস করে বলল, ‘আপনার স্পর্শ এমন কেনো বাদঁর সাহেব? বিষের চেয়েও জ্বালাধরণকারী!’
আদর টিকলির কপালের সাথে কপাল ঠেকালো। ভারী নিঃশ্বাসে বলল, ‘আমি আপনাকে সবরকম আদর দিতে চাই টিকলি। যেনো আদরের আদরে বিষের ব্যথায় চেয়েও ভয়ংকর জ্বালায় আপনি লাল নীল বর্ণ ধারণ করেন।’
‘এতো প্রেম সইবে আমার কপালে?’
আদর ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি একেঁ বলল, ‘মুন্সিগঞ্জের একটা দারুন সুন্দর জায়গা আছে। জায়গাটির নাম মোল্লারচর।’
টিকলি দুষ্টুমি করে বলল, ‘এই ব্যাদনার সময়ে তবে আনন্দদায়ক ভাবে একটু ঘুরাঘুরি নামক নীল ব্যথা তৈরি করা যাক!’
আদর ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলল, ‘যাক। আমার কোনো সমস্যা নেই।’
,
টায়রা রাহুল ফিরলো দুপুরের দিকে। ভিজে জুবুথুবু হয়ে। শপিং ব্যাগ গুলোও অর্ধেক ভিজে গেছে। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকেই সোফায় আকিদা বেগমকে বসে থাকতে দেখা গেলো। রাহুল মাথার চুল ঝেড়ে ভ্রু কুচকে তাকালো। আকিদা হক উঠে এসে পেছনে উকিঁঝুঁকি দিয়ে একবার শপিং ব্যাগগুলোর দিকে তাকালেন। সন্দেহান গলায় বললেন,
‘টিকলি কোথায়?’
পেছনেই শায়লা আক্তার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পেছনের সোফায় জামিলুর রেজা বসে কিছু একটা আন্দাজ করে টায়রার দিকে আগুন গরম চোখে তাকালেন। টায়রা একটু মিইয়ে গেলো। তার এই ধুরন্ধর বাপের চোখে ফাঁকি দেওয়া বহুত কঠিন। রাহুল অবাক হয়ে বলল, ‘টিকলি বাড়ি ফিরে নাই?
আকিদা হক ভ্রু জোড়া উঁচু করে তাকিয়ে বললেন, ‘বাড়ি ফিরে নাই মানে? তোমাদের সাথে গেলো, তোমাদের সাথেই তো বাড়ি ফেরার কথা।’
রাহুল অপ্রস্তুত চোখে টায়রার দিকে তাকালো। টায়রা কি বলবে মুহুর্তের মাঝে বুঝে উঠতে পারলো না। মেয়েকে চুপ থাকতে দেখে জামিলুর রেজা আরো নিশ্চিত হলেন যে টিকলি আদরের সাথে গেছে। টায়রা মিনমিন করে বলতে ধরলেই চট করে মাথায় বানোয়াট কথারা ধরা দিলো। ও হেসে দাঁত বের করে বলল,
‘ও তো একটা বান্ধবীকে ইনভাইট করতে গিয়েছে। আমাদের খুব কাছের বান্ধবী তো বাসায় গিয়ে ইনভাইট না করলে বেচারা দুঃখ পাবে।’
জামিলুর রেজা এতোক্ষণে মুখ খুললেন। গমগমে আওয়াজে বললেন, ‘বান্ধবীর নাম্বার দেও। আমি তার সাথে কথা বলবো।’
টায়রা মিনমিন করে বলল, ‘বাবা টিকলিকে ফোন করলেই তো হয়।’
জামিলুর রেজা ধমকে বললেন, ‘দাড়িঁয়ে আছো কেনো? নাম্বার দিয়ে যেতে বলেছি।’
টায়রা নাম্বার দিলো। জামিলুর রেজা লাউডস্পিকার অন করে ফোন কানে ধরলেন। দু’বার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ফ্যাসফ্যাসে গলায় কেউ বলে উঠলো,
‘বল। কি অবস্থা?’
রাহুলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। চমকে জামিলুর রেজার কানে ধরা ফোনের দিকে তাকালো। জামিলুর রেজা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
‘আমি টায়রার বাবা।’
নিভা দাঁত দিয়ে জিহবা কাটলো। ব্যাস্ত কণ্ঠে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম আংকেল।’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।’
জামিলুর রেজা বাড়তি কথায় গেলেন না। সরাসরি প্রশ্ন করলেন, ‘টিকলি কি তোমার ওখানে?’
নিভা বুঝতে পারলো কোনো কিছু ঘাপলা আছে। তা নাহলে টিকলিকে ফোন না দিয়ে নিভাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করা হতো না টিকলি কোথায় এবং টায়রার ফোন দিয়েও জামিলুর রেজা ফোন করতেন না। নিভা খানিকক্ষণ ভেবে ধীরে ধীরে উত্তর দিলো,
‘জি আংকেল। আমাদের বাসায় এসেছে।’
‘ঠিকাছে, ওকে একটু দেও।’
এ কথা শুনে নিভা কি বলবে ভেবে পেলো না। নখ কামড়াতে কামড়াতে হঠাৎ অভিনয় শুরু করলো,
‘হ্যালো হ্যালো। হ্যালো আংকেল শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো৷ মরার ফোন খালি ডিস্টার্ব দেয়। নেট পাচ্ছে না আংকেল। আরেকবার বলুন। হ্যালো। আংকেল টিকলি ওয়াশরুমে গিয়েছে। আমাদের বাসায় এসেই পেট ভরে খেয়েছে তো। তাই প্রাকৃতিক কাজ সাড়তে গেছে। ও এলে আমি আপনাকে ফোন করতে বলবো। হ্যালো আংকেল শুনতে পাচ্ছেন। শালার ফোন!’
জামিলুর রেজা অপ্রস্তুত হয়ে ফোন কেটে দিলেন। টায়রার দিকে ফোন এগিয়ে দিলেন। তার মনে খটকা টা রয়েই গেলো। সচেতন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ টায়রার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন তিনি। রাহুলও তড়িঘড়ি করে উপরে চলে গেলো। সবাই যেতেই আকিদা হক ভ্রু নাচিয়ে বলল,
‘ঘটনা কি খুলে বলো তো টায়রা!’
টায়রা কিছু বলতে চেয়েও বলল না। শয়তানি হাসি দিয়ে ক্রমাগত ভ্রু নাচিয়ে আকিদা হকের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ঘটনা হলো আমি আপনাকে নিয়ে দারুন একটা ছন্দ বানিয়ে ফেলেছি। হাউ টেলেন্টেড আই এম!’
আকিদা হক খুশিতে গদগদ করে বললেন, ‘তাই? আমাকে নিয়ে ছন্দ? শুনাও। শুনাও।’
টায়রা বলতে গিয়ে আবার চুপ হয়ে গেলো। বিষন্ন ভাব ধরে বলল, ‘না থাক বলবো না। কারণ ছন্দতে আপনার নাম মুখে আনতে হবে। তুই করেও ডাকতে হতে পারে। আপনি আমার এতো প্রিয় একজন ভাল্লু…না মানে এতো প্রিয় একজন পছন্দের মামী। আপনার সাথে আমি বেয়াদবি করতে পারিনা। ছি ছি ছি! তওবা! তওবা!’
আকিদা হক টায়রার এমন ব্যবহারে ভাব নিয়ে দাঁড়ালেন। খুশিতে আকাশে উড়তে উড়তে বললেন, ‘আরে বলো আমি কিছু মনে করবো না। এই প্রথম আমাকে নিয়ে কেউ ছন্দ লিখেছে। এ তো আমার জন্য বিরাট খুশির সংবাদ।’
টায়রা মাথা দুলিয়ে বলল, ‘তাহলে বলি। আপনি আবার রাগ করবেন না।’
গলা উঁচিয়ে ধমকে টায়রা বলা শুরু করলো,
“এই আকিদা, ওইদিকে তাকা।
দা দিয়ে কেটে দিবো তোর পা আর কাল্লা।
তাড়াতাড়ি তোর এই নাম পাল্টা।
এই আকিদা, গরু কেটে করে ফেল তোর আকিকা।”
আকিদা হক চোখ বন্ধ করে খুব উৎসাহ নিয়ে ছন্দ শুনছিলেন। টায়রা এই সুযোগে পা টিপে টিপে স্থান থেকে সরে এক দৌড়ে ঘরে চলে গেলো। ছন্দ শেষ হতেই তিনি টপাস করে চোখ খুলে আহাম্মক এর মতো সামনে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর গগনবিদারী চিৎকার দিলেন, ‘টায়…রা……..।’
চলবে❤️