ভালোবাসতে চাই পর্ব-১৪

0
842

#ভালোবাসতে_চাই
#পর্বঃ১৪
#ফারজানা_আক্তার

সন্ধ্যা হয়ে আসছে, পশ্চিম আকাশে লাল আভা ফুটে উঠেছে, সূর্যটা ডুবু ডুবু করছে। জেগে যায় রিক্তা। মিটিমিটি করে চোখ খুলে দেখে পুরো রুম ফাঁকা, শিশির কোথাও নেই। জাগলেও শোয়া থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না রিক্তার। তবুও ধীরে ধীরে উঠে বসে সে। অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে, শিশিরও ডাকেনি। কিন্তু কোথাই গেলেন উনি এভাবে আমাকে না বলে?
সাতপাঁচ ভেবে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায় রিক্তা।

মুখে হালকা পানি ছিটিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে বেলকনির দিকে যায় রিক্তা। বেলকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে, মুগ্ধ নয়নে সন্ধ্যার অপরূপ শহরটা পর্যবেক্ষণ করছে আর ভাবছে এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না। আশেপাশে চোখ বুলাই রিক্তা, পাশেই একটা ছোট্ট টুলে ফ্লাক্স ভর্তি চা রাখা আছে, রিক্তার চোখমুখ উজ্জল হয়ে উঠে। ফ্লাক্স থেকে এক কাপ চা ঢেলে চায়ের কাপে চুমুক দেয় রিক্তা, ইস্ প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে।



চারিদিকে অন্ধকার ছড়িয়ে গেছে, একা একা ভয় করছে রিক্তার তাই রুমের দিকে পা বাড়ায় সে। রুমে আসতেই দেখে কাটের উপর একটা প্যাকেট রাখা। দৌড়ে গিয়ে প্যাকেট টা হাতে নিয়ে দেখতে লাগে ভেতরে কি আছে। ওমা এই যে গাউন, এত সুন্দর গাউন এর আগে দেখিনি আর আমি, এটা এখানে কে রেখেছে? শিশির নয়তো?

খুশিতে আর লজ্জায় লাল হয়ে গেছে মুখটা। পাশেই একটা ছোট্ট চিরকুট, রিক্তা চিরকুট টা হাতে নিয়ে পড়তে থাকে “দ্রুত চেঞ্জ করে নাও, নীল গাউনে নীল পরীর অপেক্ষায় শিশির ”
রিক্তা মুচকি হাসে, লজ্জাও পাই বেশ।



নীল গাউন, হাত ভর্তি চুড়ি, চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, এতেই অনিন্দ্য লাগছে রিক্তাকে। রিক্তা আয়নার সামনে বসে আছে খোলা চুলে, ফট করে দরজা খুলে শিশির আসে রুমে, রিক্তা হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। শিশির যেন হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে রিক্তার চোখের ভাজে। পলক পরছেনা দু’জনের। শিশির ধীরে ধীরে রিক্তার খুব কাছে চলে আসছে, নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছে দু’জনের। হঠাৎ শিশিরের ফোনে কল আসলে ঘোর কাটে দু’জনের, শিশির ফোন নিয়ে বেলকনিতে চলে যায়, রিক্তার সন্দেহ হয় “উনি আমার সামনেও তো কথা বলতে পারতো, কিন্তু নাহ, আমি কে? কেন উনি আমার সামনে কথা বলবে?
বেশ অভিমান হয় রিক্তার।
একটু পর শিশির এসে বলে চলো।
~যাবোনা কোথাও আপনার সাথে।
অভিমানের সুরে বলে রিক্তা।
~যাবেনা মানে? না গেলে তৈরি হলে কেন?
একটু রিক্তার দিকে ঝুঁকে বলে শিশির। নিশ্চুপ রিক্তা।
গাড়িতে উঠতেই শিশির রিক্তার চোখজোড়া বেঁধে দেয় একটা পাতলা কাপড় দিয়ে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামে, শিশির আগে নিজে নামে তারপর রিক্তাকে নামায় ধরে ধরে।
রিক্তাকে সুন্দর করে দাঁড় করিয়ে চোখজোড়া খুলে দেয়, রিক্তা ধীরে ধীরে চোখ খুলে। খুশিতে আত্মহারা রিক্তা, চোখ জলজল করছে, ছোট মেয়েদের মতো ঘুরে ঘুরে নাচতেছে, শিশির যে একমনে তাকে দেখছে সেই দিকে তার কোনো লক্ষ নেই, এটা স্বপ্ন নয়তো? আমি কি সত্যিই নায়াগ্রা জ্বলপ্রবাতে দাঁড়িয়ে? বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।
দু’গালে হাত রেখে বলে রিক্তা। শিশির চেয়ে চেয়ে হাসছে।
~স্বপ্ন নয় বাস্তব
~সত্যি বলছেন?
~হুম
চাঁদনি রাত, আকাশে থালার মতো চাঁদ উঠেছে, চারিদিকে লাইটের আলো ঝিকঝিক না করলে চাঁদের আলোয় রিক্তার মায়াবী চেহেরা উপভোগ করতে পারতো শিশির, শিশির রিক্তাকে পেঁছন থেকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে ফিস ফিস করে বলে “ভালোবাসতে চাই পাগলিটাকে” কথাটি বলে রিক্তার কানে একটা চুমু দেয় শিশির।
চমকে উঠে রিক্তা, উনি কিভাবে জানলেন?
কিভাবে জেনেছি এটাই ভাবছো তো?
~হুম
~তোমার ডায়েরি পড়েছি।
~কবে?
~ওইদিন
~কোনদিন?
~ওই যে ওইদিন
~ওই যে কোনদিন?
বিরক্তিকর ভাব নিয়ে বলে রিক্তা।
~তোমাদের বাসায়, তুমি ঘুম থেকে উঠে ওয়শারুমে যাওয়ার পর।
~ক কী কী পড়েছেন?
~কেনো বলবো
~বলুন না
~উনাকে প্রথম দেখেই ছোটখাটো ক্রাশ খেয়েছি, অবশেষে উনাকেই ভালোবেসেছি।।।
রিক্তা লজ্জায় কুটিকুটি। ইচ্ছে করছে এখন এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু শিশির যে তাকে জড়িয়ে আছে।

শিশির হাঁটু গেড়ে বসে, রিক্তা অবাক হয়, শিশির পকেট থেকে একটা রিং বের করে রিক্তার হাতে পরিয়ে দেয়,, রিক্তার হাতে আলতো করে চুমু খায়, কেঁপে ওঠে রিক্তা।

রিক্তা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শিশিরকে, শিশির একটু কেশে বলে তুমি কিন্তু এখনোও ভালোবাসি বলো নাই,
রিক্তা মুখ লুকায় শিশিরের বুকে,
শিশির টান টান গলায় বলে এখনো তো বাসরও হলোনা, শুধু ভালোবাসি বলতেই এতো লজ্জা?

রিক্তা চোখমুখ খিঁচে আমতা আমতা করে বলে ভালোবাসি,
শিশির আবারও বলে ভালোবাসি অনেকটা।।



পরদিন সকালে রিক্তার ঘুম ভাঙতেই সে নিজেকে শিশিরের বুকে আবিষ্কার করে,, ধীরে ধীরে শিশির কে ছাড়িয়ে উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বেলকনিতে যায়, এখনো সূর্য মামা উঁকি দেয়নি, রিক্তা অপেক্ষায় আছে সূর্যোদয় দেখার। মনে মনে ভাবছে এক কাপ চা হলে বেশ ভালো হতো।




সূর্য উঁকি দিচ্ছে এমন সময় কারো ঠান্ডা হাত রিক্তার কোমর স্পর্শ করতেই চমকে উঠে রিক্তা, বুঝেতে বাকি রইলোনা কে তাকে জড়িয়ে ধরেছে এভাবে। শিশির কোমর জড়িয়ে থুতনি রাখে রিক্তার কাঁধে। আর ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে আমাকে একা রেখে এসে এখানে কি হুম?
~এই বেলকনি থেকে পৃথিবী টা অন্যরকম সুন্দর লাগে, তাই সূর্যোদয় দেখতে আসলাম।
~বেশ, আমিও দেখলাম
রিক্তার কানে কানে ফিস ফিস করে বলে শিশির “এভাবে অন্যদেশে বাসর হবে আমাদের, ভাবনার বাহিরে, ছিলো আমার।
রিক্তা লজ্জায় কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে।

মুচকি হাসে রিক্তা।



যাও গোসল করে নাও,
গোসল সেরে এসে মাথা মুছতে মুছতে বলে শিশির।
~নাহ, শীত খুব
ঠোঁট উল্টিয়ে বলে রিক্তা।
~ গরম পানি আছে, যাও
~এতো সকালে গোসল না করলে কি হয়না?
~নাহ হয়না, তোমার ইচ্ছে ছিলো হানিমুন এই দেশে করার, সো যাও এবার।
~আমি কি জানতাম এই দেশে এখন শীতকাল চলে।
কান্না জড়িতো কন্ঠে বলে রিক্তা, হেসে দেয় শিশির, কোনোমতে জোর করে পাঠিয়ে দেয় ওয়াশরুমে রিক্তাকে। ৫মিনিট পর কাঁপতে কাঁপতে বের হয় রিক্তা, শিশির দ্রুত গরম কাপড় পরিয়ে দেয় রিক্তাকে।

~আচ্ছা আজ ৫মিনিটে গোসল কীভাবে হলো তোমার?
~ম্যাজিক
বলেই রিক্তা সুইমিংপুলের দিকে পা বাড়ায়। শিশির সার্ভেন্টকে কল করে নাস্তা আনতে বলে, কিছুক্ষণ পর নাস্তা আসলে রিক্তাকে ডাকে শিশির, রিক্তা না আসতে চাইলে কোলে করে নিয়ে আসে।
নাস্তা করে রিক্তাকে তৈরি হতে বলে শিশির,

হালকা বাদামি রংয়ের একটা শাড়ি পরে রিক্তা, সাথে হাত ভর্তি চুড়ি, কপালে একটা ছোট্ট টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে হালকা কাজল, অল্পতেই অসাধারণ লাগছে রিক্তাকে, চোখ ফেরাতে পারছেনা শিশির। শিশিরের চাহনি দেখে রিক্তা লজ্জায় কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে।



ফাঁকা রাস্তা, দু’পাশে লম্বা লম্বা গাছ, শিশিরের হাত জড়িয়ে হাঁটছে রিক্তা। ঝিরিঝিরি বাতাসে রিক্তার এলো কেশ গুলো উড়তে থাকে। রিক্তা কাঁকড়া দিয়ে বাঁধতে চাইলে শিশির বাঁধা দেয়।
হটাৎ সামনে তাকাতেই শিশিরের পা থমকে যায়, রাগে দূঃখে চোখগুলো লাল হয়ে যায়, রিক্তা দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে কেউ একজনকে, শিশির রাগান্বিত নয়নে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে রিক্তার দিকে।

#চলবে