#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#বারো
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা
সময়ের গতিতে জীবনে অনেক মানুষ আসে। আবার চলেও যায়। কেউ নিঃশব্দে যায়, আবার কেউ বা এত বেশি জানান দিয়ে যায় যে, তাদের দেয়া ক্ষতগুলো আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। সেটা হোক ভালোবাসায় নয়তো ঘৃণায়।
জীবনের সকল গল্পগুলো কেন সুখের হয় না?
কেন রূপকথা শুধু রূপকথাই থেকে যায় সত্যি হয় না!
যদি এমন প্রকৃতির নিয়ম হয় তবে প্রতিটি রাজকন্যা কেন রাজপুত্র ভেবে দজ্জালকে আপন করে নেয়! কেন সব সত্য সঠিক সময়ে সামনে আসে না!
আচ্ছা এটা কী শুধু জীবন থেকে অভিজ্ঞতার জন্য একটা কালো অধ্যায় শিক্ষা হয়ে আসে? নাকি পুরোটা জীবন অবিশ্বাস আর যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোর ফাঁদ মাত্র? রিদ্ধিমা হায়দার তো এমন একটা নাম যেখানে গিয়েছে সেখানেই জয় করে ফিরেছে তবে সবচেয়ে বড় জায়গায় কেন তাকে হারতে হলো!
এই দুনিয়া এত জালিম কেন হয়! এত দুঃখ কী করে একজনকে দিতে পারে!
আচ্ছা সবকিছু কী প্রকৃতির দোষ। আমার কী এতটুকুও নেই! আছে সত্যি তো এটাই সব আমার কর্মের ফল। সব আমার অন্যায়ের শাস্তি। আমি জান্নাত ভেবে জাহান্নামের পথে হেঁটেছি। তাই রিদ্ধিমা হায়দার তোমাকে তো জাহান্নামের আগুনকে সহ্য করতেই হবে। না তুমি এর থেকে পালাতে পারবে। না তুমি এর মোকাবেলা করতে পারবে।
এতটুকু লিখে ডায়েরিটা বন্ধ করল রিদ্ধিমা। চোখের জলে পাতাগুলো ভিজে যাচ্ছে। বিছানায় এসে খাটের হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে পেটে হাত রেখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভবটাকে হৃদয়ের গহীনে আঁকড়ে ধরতে চাইছে।
ভাবছে আর কোনোদিন বাবা-মা, ভাইদের সাথে দেখা হবে? রাইয়ানের ছোট ছোট হাত দুটি আর কোনোদিন তাকে আগলে ধরবে। নাকি আজীবন এমন মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে?
দরজায় কেউ নক করছে।
চোখের পানি মুছে বলল, “আসো?”
সাদা এপ্রোন পরা হাসিখুশি একটা মেয়ে তার কাছে আসল”মেডিসিনের সময় হয়ে গেছে ম্যাম।”
রিদ্ধিমা হাত বাড়াল।
পানি ও মেডিসিন এগিয়ে দিল মেয়েটা। এখানে এসেছে পর্যন্ত একটা কথাও সে বলেনি। চুপচাপ ডাক্তারের কথা শুনেছে। নিজের সন্তানের কথা ভেবে খাচ্ছে তাও কষ্ট করে। একটা রাত! একটা কাল বৈশাখী রাত যেন সবকিছুকে এলোমেলো করে দিয়েছে। এলোমেলো করে দিয়েছে একটা গোটা জীবন! সব সম্পর্ক।
একটা মানুষকে এতটা ভেঙে দেয়ার পর। সে কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে কী পারে?
রিদ্ধি জানে না সে কোথায় আছে। কার কাছে আছে। শুধু জানে এমন কোথাও আছে যেখানে তার জন্য কোনো বিপদ অন্তত আসবে না। কারণ তার মন বলছে এমন কিছু। তারপর আবার ভাবছে মন তো বলেছিল মাহিদ নামক মানুষটাও তার জন্য বেস্ট চয়েজ। সেটাও তো মিলল না। এখন তার কোনোকিছুতেই সমস্যা নেই। তার সাথে যা হয়েছে এর থেকে খারাপ কিছু কোনোদিন হবে বলে সে মনে করে না। না তা নিয়ে কোনো চিন্তা আছে।
“ম্যাম, আপনার নামে একটা পার্সেল এসেছে।”
রিদ্ধিমা যেন শুনল না। এমনভাবে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। মেয়েটা বুঝতে পারল এখনো ট্রমা থেকে বের হতে সময় লাগবে। তাই সে সবুজ রঙের প্যাপারে জড়ানো একটা বক্স সাইড টেবিলের উপর রেখে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, “আমি রেখে গেলাম ম্যাম।”
মেয়েটা চলে গেল। রিদ্ধির কোনো আগ্রহ নেই কোনোকিছুর উপর। তার কাছে এখন জীবনের এক একটা মুহূর্ত হাজার বছরের থেকেও বেশি বলে মনে হচ্ছে।
যেন চোখের পলকে, সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাস সবকিছু চোরাবালির মতো শেষ হয়ে গেল। আর সংসার! স্বপ্ন দেখা সেই ছোট্ট সুখের নিড়! সেটা কোথায় গেল? ধীরে ধীরে গড়ে তোলা সেই স্বপ্ন, আশা সবকিছু এক মুহূর্তে পেছনে ফেলে আসা কী এতটাই সহজ!
রিদ্ধির মনে পড়ে গেল সেইসব দিন।
এসএসসি পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়তো বলে বাবাও তার সাথে জেগে থাকতেন। সে যতই বলত ঘুমিয়ে পড় বাবা। তিনি শুনতেন না। বলতেন, “আমি থাকলে তোর ভরসা থাকবে। তোর পড়া আরও ভালো হবে।”
বাবা থাকলে ভরসা থাকে, সত্যি ভরসা থাকে। বাবা কী আজও তার ভরসা হতে রাজি আছেন? নাকি তার অন্যায়ের জন্য ভুলে গেছেন। আর কোনোদিন কী বাবার সামনে যেতে পারবে? না কোনোদিন না। যে আত্মবিশ্বাসের নিয়ে ঘর ছেড়েছিল সে বিশ্বাস তো হালকা বাতাসেই ভেঙে গেল। তাহলে কোন মুখে যাবে তাদের সামনে। না কোনোদিন না। এ জীবনে আর কোনোদিন যেন পরিবারের কারো মুখোমুখি না হতে হয়।
বাকিটা জীবন এভাবেই কাটাতে হবে। হুম এভাবেই। মানুষ বলে চোখের পলকে নাকি জীবন শেষ হয়ে যায়। সেও চায় সেটাই হোক। সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় সে। জীবনের সব কষ্টকে ভুলে যেতে চায়।
★★★
জরিনা প্রতিটি অলিগলিতে রিদ্ধিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার চোখ-মুখ ফুলে গেছে। মাহিদ রাতে তাকে একা পেয়ে অনেক মেরেছে। এবং হুমকি দিয়েছে রিদ্ধির পরিবারের কানে যেন এসব না যায়। রিতিসহ সে রিদ্ধিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যে করেই হোক পরিবারের কাছে যাওয়ার আগে তাকে ধরতেই হবে। তাই তো রিদ্ধিদের বাসার সামনে লোক পাহারায় বসিয়েছে। বাসায় ঢুকার আগেই রিদ্ধিকে ধরে ফেলবে তারা।
ফোনটা বাসায় ফেলে গেছে রিদ্ধি নয়তো এতক্ষণে ট্রেস করে কোথায় আছে বের করে ফেলতে পারত। নানা চিন্তায় পাগলের মতো অবস্থায় আছে মাহিদ।
★★★
এক সপ্তাহ পর।
রিদ্ধি বসে আছে ডাঃ হুমায়রা এহসানের সামনে।
“হাই মিস, রিদ্ধিমা হায়দার, কেমন আছেন আপনি?”
রিদ্ধি চুপ করে আছে। কোনো কথা বলছে না। এক সপ্তাহ ধরে কারো সাথে কথা না বলে এখন৷ মনে হচ্ছে কথা বলাই ভুলে গেছে সে।
হুমায়রা তার অবস্থা বুঝতে পেরে হেসে বললেন, “ওয়েল! আমি আগে আমার পরিচয় দিয়ে নেই। আমি ডাঃ হুমায়রা এহসান একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। আপনি আমাকে একজন ডক্টর না ভেবে বন্ধু ভাবতে পারেন। আমি আপনার সব যন্ত্রণা শুনতে চাই। হ্যাঁ অবশ্য আপনি চাইলেই শুধু বলবেন। না চাইলে সমস্যা নেই। আফটার অল, আপনি কাকে কী বলবেন। কাকে কী বলবেন না তা একান্ত আপনার ইচ্ছে।”
নিজের কথা শেষ করে ডক্টর হুমায়রা মিনিট দশেক অপেক্ষা করেছেন। তারপরও রিদ্ধি কিছুই বলল না। তিনি তাই হেসে বললেন, “ওকে আপনাকে আমি ত্রিশ মিনিট সময় দিচ্ছি। আমি অন্য একজনের সাথে সেশন করব। আপনি ভাবেন তারপর আপনার যা ইচ্ছে হয় করবেন।”
রিদ্ধিমার পাশে অন্য একজন মেয়ে এসে বসেছে।
ডক্টর হুমায়রা তার সাথে কথা বলছেন। মেয়েটা তার সমস্যা বলে যাচ্ছে তিনি বুক প্যাডে কী কী যেন নোট করছেন।
মেয়েটার সমস্যা তার স্বামীকে নিয়ে। স্বামী পর নারীতে আসক্ত। এই নিয়ে নানা ঝামেলা। মেয়েটা ভেঙে পড়ছে। তাদের ভালোবাসার বিয়ে ছিল। কিন্তু কীভাবে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। মেয়েটার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
ডক্টর হুমায়রা কিছু বলতে যাবেন এমন সময় কারো ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দ শুনলেন। তিনি মুচকি হেসে সুন্দর পুতুলের মতো মেয়েটার দিকে তাকালেন। তিনি জানতেন তার সব কষ্ট অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসবে।
মেয়েটা কেঁদেই যাচ্ছে। ডক্টর হুমায়রা হাসি হাসি মুখ করে তার দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। একটুও সান্ত্বনা দিচ্ছেন না। সে চায় মেয়েটা কাঁদুক। নিজেকে হালকা করুক। গুমোট হয়ে থাকা মেঘ একটু একটু করে বৃষ্টি হয়ে নামুক।
গ্লাসের দরজার ওপাশে আরও একটা মানুষ রিদ্ধিমা হায়দারকে দেখে কাঁদছে। ডক্টর হুমায়রা তার দিকে তাকিয়ে হেসে বুঝালেন সব ঠিক হয়ে যাবে। রিদ্ধিমা হায়দার ভাবছে জীবন এখানেই শেষ। তার কেউ নেই। কিন্তু সে জানে না তার জন্য বারোটা বছর অপেক্ষারত একজন মানুষ আছে। যে কোনোদিন চায় না রিদ্ধিমা হায়দার খারাপ থাকুক। হেরে যাক। জীবন কী এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়! নাকি একটা কালো অধ্যায় শেষ হয়ে নতুন সোনালী অধ্যায়ের পুনরাম্ভ হয়!
জীবন এভাবে শেষ হয়ে যায় না রিদ্ধিমা হায়দার। আরও অনেক লড়াই বাকি। আরও অনেক ভেঙে পড়া বাকি। ভাঙতে ভাঙতে যখন এতটুকু অবশিষ্ট থাকবে না। তখন আবার নতুন করে শুরু হবে নতুন এক জীবনের সূচনা। কিন্তু সে জীবন কতটা দূরে! কতটা বাকি! সে উত্তর তো উপরে যিনি বসে আছেন তিনিই জানেন।
চলবে