ভালোবাসার উল্টো পিঠে পর্ব-১৯

0
524

#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#ঊনিশ
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা

ছয় মাস পর।

রিদ্ধিমা এখন পুরোপুরি নিজেকে পরিবর্তন করে নিয়েছে। মাহিদের দেয়া ক্ষত গুলো মুছে ফেলতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিজেকে এখন শুধু অনাগত সন্তানের জন্য প্রস্তুত করছে।

জীবন কখনো কখনো আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে আসে। যেখানে কোনো সম্পর্ক থাকে না। শুধু নিজে আর আল্লাহ থাকেন। তখন মানুষ বুঝতে পারে একমুঠো মাটির চেয়ে নিজের আর কোনো মূল্য নেই। যে মাটিতে তৈরি হয়ে সে পৃথিবীতে এসেছে। সে মাটিতেই তাকে ফিরে যেতে হবে। রিদ্ধিমা এখন ঠিক এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। গুনাহকে তার ভয় করে। তাই তো সে নিজেকে খুব সহজেই আল্লাহর পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

যখন কোনো মানুষের ভেতর আখিরাতের ভয় ঢুকে যায়। আল্লাহর সামনে কী নিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে চিন্তা করতে থাকে। ঠিক তখন তার ইচ্ছায় কোনো পাপ করা সম্ভব হয়ে উঠে না।

ডক্টর হুমায়রা তাকে গাইনীকলোজিস্টের কাছে নিয়ে গেছে। সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অক্টোবরের সতেরো তারিখ সম্ভাব্য ডেট দিয়েছে। এখন প্রতিটি মিনিট প্রতিটি সেকেন্ড সে নতুন অতিথির অপেক্ষা করছে। এ পৃথিবীতে কিছু অপেক্ষা করাও আনন্দ আছে। কারণ সে অপেক্ষায় প্রাপ্ত সম্পদকে নিজের বলে দাবি করা যায়। সে সম্পদ নিজের জন্য নেয়ামত হয়।

তাই তো নিয়ম করে আল্লাহর কাছে সবসময় চক্ষু শীতলকারি সন্তানের দোয়া করে।

আজকাল তার বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। ছোট বেলায় যেকোনো কাজে মা-বাবা বলতেন আগে সন্তানের মা হও তারপর বুঝবে সন্তানের মায়া কী!

এখন তার প্রায় মনে হয় বাবা-মায়ের কত আরাধ্যের সন্তান ছিল সে। আর যখন সেই সন্তান বাবা-মাকে কষ্ট দেয় তা যে কতটা যন্ত্রণার এখন সে বুঝতে পারে। নিজ অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। একটা সুযোগ চায় যেখানে বাবা-মায়ের মন থেকে সকল দুঃখ দূর করে দেয়া যায়।

প্রায় ইচ্ছে করে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। তাদের প্রাণ ভরে দেখতে। কিন্তু, পারে না। নিজের অপরাধ মনে হলে আর তাদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করতে পারে না।

★★★

রিয়ন পত্রিকায় রিদ্ধিমার খবরটা দেখার পর থেকে মাহিদকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে আগের বাসা ছেড়ে দিয়েছে। সে কিছুতেই বিশ্বাস করে না তার বোন এমন কাজ করতে পারে। রিদ্ধিমাকে সহজে বোকা বানানো যায়, কিন্তু তার দ্বারা এমন কোনো খারাপ কাজ করা সম্ভব নয়, যাকে ক্রাইম বলে ধরা হয়। তাছাড়া প্রেগন্যান্ট সে। এমন অবস্থায় সে কেন মাহিদকে ছেড়ে চলে যাবে। টাকা-পয়সা তাদের মাহিদের চেয়ে অনেক বেশি। কখনো এসবের প্রতি তার লোভ ছিল না। নিজের প্রয়োজনে মা-বাবার কাছ থেকে হাত খরচ পেত। কিন্তু তাই বলে টাকার লোভে সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার মেয়ে সে না।

রিয়ন বুঝতে পারছে এটা মাহিদের কোনো চাল। এ ছেলেকে সে কোনোদিন পছন্দ করেনি। শুধু বোনের দিকে তাকিয়ে কিছু বলেনি৷ তবে এবার হাতে পেলে ছাড়বে না।

যে করেই হোক তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। নয়তো বোনের খোঁজ পাওয়া সম্ভব হবে না। থানায় জিডি করতে গেলেও পারবে না। তারা খবরের কাগজের খবর দেখে বলবে। হয়তো রিদ্ধিমা অন্য কারো হাত ধরে চলে গেছে। এতে বরং তার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারবে না।

তাই তো চুপিচুপি বোনকে খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

★★★

দুদিন পর।

রাত তিনটায় উঠে রিদ্ধিমা তাহাজ্জুদ নামাজ শেষ করে। কোরআন শরীফ খুলে সূরা মরিয়মের দশ আয়াত শেষ করেছে। এমন সময় আচমকা মনে হলো পেটে হালকা ব্যথা অনুভব করছে। কোনোরকমে কোরআন শরীফ বক্সে যত্ন করে রেখে উঠে বিছানার পাশে দাঁড়াতেই বুঝতে পারল ওয়াটার ব্রেক করেছে। তার সাথে ব্যথাও বাড়ছে। দাঁত-মুখ খিঁচে সহ্য করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। বুঝতে পারল তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।

সে জোরে শ্বাস নিয়ে ব্যথায় কুকড়ে যেতে যেতে বলল, “হে, আমার মালিক আমার সন্তানকে সহিসালামতে পৃথিবীতে আগমনের ব্যবস্থা করুন। তাকে নেক হায়াত ও ইসলামের পথে চলার শক্তি ও ধৈর্য দিয়ে দুনিয়ায় পাঠান। সে যেন পৃথিবীর সব রকম মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। এবং হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর দেখানো পথে চলতে পারে সে তৌফিক দান করুন।”

শাহানেওয়াজের হঠাৎ কিছু একটার শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে। সে অডিও রেকর্ডারে রিদ্ধিমার কথাগুলো শুনতে পাচ্ছে। বুঝতে পারছে সেই সময় এসে গেছে। রিদ্ধিমার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।

সে কখনো রিদ্ধিমার সাথে দেখা করে না। বা তার রুমে যায় না। তাই তো রিদ্ধিমার অগোচরে অডিও রেকর্ডিং সিস্টেম করে রেখেছে। সেখানে রিদ্ধিমার বলা প্রতিটি কথা সে শুনতে পায়।

তাড়াতাড়ি করে নাফিজাকে কল করে রিদ্ধিমার রুমে যেতে বলল। তাকে রেডি করতে বলল। এবং নিজে ডক্টরকে কল করে হাসপাতালে সব রকম ব্যবস্থা করতে বলল। ডক্টর হুমায়রাকে কল করলে সে সব ম্যানেজ করবে বলে জানিয়ে দিল। যেহেতু ডক্টর স্বপ্না তার বান্ধবী তাই যত রাতই হোক সে চলে আসবে হাসপাতালে।

সব ঠিক করেও যেন তার স্বস্তি হচ্ছে না। রুমে পায়ে চারি করতে লাগল। অসম্ভব রকম চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। দশ মিনিট লাগল নাফিজার রিদ্ধিকে তৈরি করতে। এই দশ মিনিট সময় শাহানেওয়াজের কাছে দশ হাজার বছর মতো করে হয়েছে।

রিদ্ধিমাকে কালো বড় চাদরে জড়িয়ে ধীরে ধীরে গাড়িতে এনে বসাল। শাহানেওয়াজের অনেক ইচ্ছে ছিল একটাবার তার দিকে তাকাবে। কিন্তু পারেনি। তার সাহস হয়ে উঠেনি।

হুমায়রা রিদ্ধিকে কেবিনে নিয়ে গেল। আল্ট্রা করে বাচ্চার পজিশন দেখে জানাল। পানি শুকিয়ে গেছে বাচ্চার শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে। তাড়াতাড়ি অপারেশন করা দরকার। নয়তো বাচ্চার জীবন নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

এ কথাটা শুনে শাহানেওয়াজের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। সে করিডরে রাখা বেঞ্চে বসে পড়ল। হুমায়রা তাকে বুঝানোর চেষ্টা করল। আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে বলল।

হুইলচেয়ারে পেশেন্টের পোশাক পরা দূর্বল চেহেরার রিদ্ধিমাকে নিয়ে নাফিজা ওটির রুমের দিকে এগুচ্ছে।
রিদ্ধিমার জীবনে প্রথম নিজেকে এত অসহায় মনে হচ্ছে। এমন সময় পরিবারের যত্ন খুব করে চায় মেয়েরা। কিন্তু তার ভাগ্য দেখো সব থেকেও নিজের দোষে সবার থেকে দূরে সে।

দূর থেকে একটা মানুষ তার দিকে অনেক সাহস জুগিয়ে তাকিয়ে দেখল। অনেক শক্ত মনের শাহানেওয়াজ শেখের জীবনের প্রথম নিজেকে এত অসহায় মনে হলো। বারো বছর আগের দেখা সেই হাসিখুশি রিদ্ধিমা হায়দারকে খোঁজার চেষ্টা করল। কোথাও পেল না। শুধু একটা কায়াকে দেখতে পেল। যার জীবনে অনেক যন্ত্রণার গল্পে গড়া।

তার খুব করে বলতে ইচ্ছে হলো, “রিদ্ধিমা আপনার কোনো ভয় নেই। আপনি এবং আমাদের সন্তান সুস্থ ভাবেই আমার কাছে ফিরে আসবেন। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। সবসময় প্রয়োজনীয় সব কথা বলা যায় না। গলার কাছে এসে আটকে যায়। অনেক জড়তা, হারানোর ভয় সবকিছু মনের কথাকে প্রকাশ করতে দেয় না।

রিদ্ধিমা কেন যেন চারপাশে একবার কাউকে খুঁজল। হঠাৎ শাহানেওয়াজের দিকে চোখ পড়ল। অদ্ভুতভাবে সে লক্ষ্য করল, ” এই ভদ্রলোকের চোখে জল। সে বুঝতে পারল না সে জল কার জন্য!”

ডক্টর হুমায়রা রিদ্ধির হাত ধরে বলল, “একদম ভয় পাবে না। মনে রাখবে আল্লাহ তোমার সাথে আছেন।”

রিদ্ধিমা হাসার চেষ্টা করে বলল, “ইনশাআল্লাহ।”

প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড আল্লাহকে ডেকে যাচ্ছে। বলছে, “হে, আমার মালিক, জীবনে এই মেয়েটা অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। আপনি তার কষ্ট আমাকে দিয়ে দিন। তাকে সুখের মুখ দেখান। মা ও সন্তান দুজনকে সুস্থ ভাবে নতুন জীবন দান করুন। আমিন।”

ওটির আলো জ্বলে ওঠল। হয়তো ভেতরে কাঁটাছেড়া শুরু হয়ে গেছে। ওটির সামনে বসে হারানোর ভয়, আতংক নিয়ে বসে অপেক্ষা করছে শাহানেওয়াজ। জীবনে প্রথম সে অনুভব করল কাউকে হারানোর ভয় কতটা যন্ত্রণার হয়।

চলবে।