#পথান্তরে প্রিয়দর্শিনী
#মম_সাহা
#পর্ব-৪২+৪৩+৪৪
নিরব আলিঙ্গনে মিনিট দুই পেরুতেই মোহনা বাঁধন মুক্ত হয়। দর্শিনীর সামনে হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে বলে,
“নারী ভীতি আমার মানসিক রোগ ছাড়া কিছুই না। আমার এই একটা রোগের জন্য তোমার স্বাধের সংসার লুটোপুটি খেয়েছে ধূলোয়। তোমার সন্তান আজ বাবার আশ্রয়স্থল হারিয়েছে। সবটা দোষ আমি মাথা পেতে স্বীকার করছি। আমাকে তুমি চিরজীবন অভিশাপে রেখো, অন্তত আমি নিজের কাছে নিজে একটু কম লজ্জিত হবো। কিইবা করতাম বলো তখন? ছেলেরা ভাবে, নারী জীবন বোধহয় ভীষণ সোজা। কিছু বছর বাবার ঘরে তারপর বাকি বছর স্বামীর ঘরে বসে কাটিয়ে দেওয়াটাই নারী জীবনের সারাংশ। কিন্তু যদি একটু তলিয়ে দেখতো মানুষ, তাহলে বুঝতে পারতো পৃথিবীতে নারী জীবনের চেয়ে কঠিন জীবন আর কিছু হয় না। পৃথিবীতে এমন কোনো পুরুষ পাবে না যারা নিজের পুরুষ জীবনকে ঘৃণা করে অথচ এই পৃথিবীতে এমন কতশত নারী আছে যারা নারী হয়েছে বলে নিজেদেরকে ঘৃণা করে। কেনো করে বলো তো? ভীষণ সুখে কী ঘৃণা আসে? ঘরে-বাহিরে সব জায়গায় নারীদের নিরাপদ থাকতে হয়। নিজের সম্মান টিকিয়ে রাখতে দিবানিশি ভয়ে জুবুথুবু হয়ে থাকতে হয়। কই পুরুষরা তো যুগের পর যুগ নির্দ্বিধায় জীবন কাটাচ্ছে, তাদের তো সম্মান রক্ষার ভয় নেই। পরিবারের ভার কাঁধে নিতে হয় বলে পুরুষরা নারীদের কত হেলা’ই না করে। পুরুষদের মতন আর কোনো জীব যেন পৃথিবীতে নেই। অথচ পরিবার, সমাজ,দায়িত্ব পালন করতে করতে শেষ হয় নারী জীবন। রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় ভয়ে থাকতে হয় কোনো পুরুষ না আবার নারী স্বত্তা খানা ছুঁয়ে দেয়। শুধু রাস্তাঘাট না, পরিবারের মানুষ এমনকি আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকেও ভয়ে থাকতে হয়। আত্মীয়র মাঝে কোনো পুরুষ তার লোভের হাতখানা শরীরে ছুঁয়ে দিলেও কিছু বলা যায় না, ভিতরে ভিতরে অপমান-ঘৃণায় গুমরে ম*রতে হয়। কেনো! কেবল মাত্র নারী বলেই। পৃথিবীতে নব্বই শতাংশ নারী এই ছোঁয়ার স্বীকার। পরিবারের মানুষ অব্দি ছাড় দেয় না নারীদেহ ছুঁয়ে দেওয়ার লোভ। আমরা এই নারী জনম নিয়ে বেঁচে আছি। একেক জন যেন মানসিক রোগী হয়ে আছি। অথচ সমাজ কত অবলীলায় বলে দেয়, নারী জীবনে কি আর এমন কষ্ট! এই অপ্রাসঙ্গিক ঘটনায় আমিও আজ ভুক্তভোগী দর্শিনী। ক্ষমা করো। তোমার সংসার আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না জানি, কেবল আমার সবটুকু প্রার্থনায় তোমার অঢেল সুখের কামনা করছি। ভালো থাকবে কেমন?”
দর্শিনী মুখে আঁচল চেপে কাঁদছে। এই মহিলাটা শেষ মুহূর্তে এসে এতটা ভালো না হলেই তো পারতো। কেনো এতো ভালো হলো সে!
মৃত্যুঞ্জয় দর্শিনীর মাথায় হাত বুলালো। হাত বুলাতে বুলাতে মোহনার দিকে তাকিয়ে বললো,
“আন্টি, আপনি জীবনে প্রচুর লড়াই করেছেন। কিন্তু আপনার লড়াইয়ের পথও যে অন্যায় পথ ছিলো।”
“তার জন্যই বুঝি পুলিশকে খবর দিলে? দেখেছি, দেখেছি, আমি সবই দেখেছি। বাড়ির ঠিকানাখানা পাঠিয়েছো এতক্ষণ তাই না? আমার অন্যায়ের শাস্তি দিবে বলে? বেশ করেছো। আমি অন্যায় করার জন্য কত কিছুই না করলাম! স্ট্রোক করার পর শরীরের সব অঙ্গ ঠিক থাকতেও খবর ছড়ালাম বা’হাত অবশ হয়ে গিয়েছে। ভেবেছিলাম এবারও ধামাচাপা দিতে পারবো পাপ। কিন্তু আমি যে ভুলে গেছিলাম, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এই যে দেখো, স্বামীকে নিজের হাতে খু*ন করার পরও কি সুন্দর সিঁদুর লেপেছি কপালে। এটাও ধর্ম অনুযায়ী পাপ কিন্তু আমার কাছে চির শান্তি। ঐ যে ওখানে যে মানুষটা শুয়ে আছে, এ সিঁদুর টা আমি তার নামে পড়ি নি। বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ আগে কূল-কিনারা হারা আমার মাথার উপর বটবৃক্ষ হয়ে যে এসেছিল, এই সিঁদুর টা আমি তার নামে পড়েছি। সেই স্মৃতি মিটবার নয়, সে মানুষও আমার কাছে কখনো মরবে না। আমি ভালোবাসতাম, বাসি আর চিরকালে বেসে যাবো ঐ মানুষটাকে। এই ধর্ষক নিলয় কুমার আমার কেহ না, কিচ্ছু না। কিন্তু ঐ বটবৃক্ষ নিলয় কুমার আমার পুরো পৃথিবী।”
এই পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ় মানুষটার মাঝে ভালোবাসা কতটা প্রবাহমান! অথচ ভালোবাসার মানুষটা কত বিশ্রী! এই মানুষটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ভালোবাসার মানুষ খারাপ মানেই ভালোবাসার উপর কলঙ্কের কালি লেপে দিলেই তুমি প্রেমিক না। প্রেমিক হতে হলে তোমার অন্তরে কেবল আর কেবল মাত্র প্রেম থাকতে হবে। তোমার ভালোবাসার মানুষ অযোগ্য হতেই পারে কিন্তু ভালোবাসা সর্বদা পূজনীয়। ভালোবাসাকে ঠুনকো অবহেলায় ছুড়ে ফেলার অধিকার তোমার নেই। ভালোবাসা পূর্ণিমার চাঁদের মতন উজ্জ্বল, ভুল প্রেমিক তার অদৃশ্য কিছু কলঙ্ক মাত্র।
মোহনা হুট করে ভয়ঙ্কর হাসি দিয়ে উঠলো। তার খিলখিল হাসিতে ভরে উঠলো পরিবেশ। কেঁপে উঠলো লোমকূপ। হাসতে হাসতেই মোহনা বললো,
“বিহু, সাবধানে থাকিস। এই পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর, একা বেঁচে থাকা ভীষণ কষ্টের তবুও টিকে থাকিস। তুই যেন আবার নতুন করে কোনো মোহনা না হোস সেই প্রার্থনা করি। মোহনারা জীবনে সব পেলেও ভালোবাসা পায় না। আর ভালোবাসা ছাড়া বেঁচে থাকা কঠিন রে বড্ড কঠিন।”
মোহনার কথার ধরণ, হাসির অঙ্গভঙ্গি কিছুটা সন্দেহ জাগালো উপস্থিত মানুষ জনের মনে। মায়া তার শ্বাশুড়ির পানে এগিয়ে আসতে নিলেই হুট করে তাদের পুরো ঘর আঁধার হয়ে উঠে। কোনো আলোর ছিটেফোঁটা নেই। আহম্মক বনে সবাই যার যার স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলো! আঁধারে আঁধারে জায়গাটা যেন মৃত্যুপুরী ধারণ করলো। মিনিট পাঁচের ব্যবধানে পুরো মহল্লা আলোকিত করে জ্বলে উঠলো কৃত্রিম আলো গুলো। বিদ্যুৎ আসতেই সবার নজর গেলো তাদের মেইন দরজা খানার দিকে যেটা হা করে খোলা। সবাই বিষ্মিত হলো, অবাক হলো মোহনা এখানে নেই! কোথাও নেই! মিনিট পাঁচের ব্যবধানে মহিলাটা উধাও! কোথায় গেলো সে?
মৃত্যুঞ্জয় আশপাশে খোঁজা শুরু করলো। তন্মধ্যেই পুলিশ তার স্ব শব্দে জিপ খানা নিয়ে হাজির হলো। উপস্থি সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বদলে গেলো সব!
থানার বড় অফিসার নিলয় কুমারের লা*শটা উঠিয়ে নেওয়ার হুকুম জাড়ি করলেন। কে মে*রেছে, কী হয়েছে জানতে চাইলে ঘটনা ঘুরিয়ে দেয় বিপ্রতীপ। সবটা দোষ অকপটে নিজের ঘাড়ে তুলে নেয়। এমনকি সে এটাও বলে ছু*ড়িতে তার হাতের ছাপ, দড়িতেও তার হাতের ছাপ। কারণ লা*শটা সে-ই খুলেছিলো ফ্যান থেকে। সবটা, সবটাই যেন সবার অবিশ্বাস্যকর ভ্রম মনে হলো।
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কিছু না করেও খু*নের আসামী হয় বিপ্রতীপ। সবাই সবটা কেবল চেয়ে দেখলো৷ কারো কিছু বলার নেই, বলতে চেয়েও যেন কেউ কিছু বলতে পারলো না। বিপ্রতীপ সবার সাথে আলাদা কথা বলবে একটু সাইডে নিয়ে গেলো সবাইকে। বিহঙ্গিনী মুখ খুললো এবার, কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“তোরা সবাই স্বার্থপর, দাভাই। আমায় এই পুরো পৃথিবীতে একা করে দিয়ে পালাচ্ছিস?”
বিপ্রতীপ হাসলো। বিহঙ্গিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“তুই কোথায় একা? এই গোটা পৃথিবীটাকে তুই নিজের ধরে নে। এই প্রথম আমি কোনো সঠিক কাজ করছি। তাছাড়া হয়তো আমি বাবার খু*ন করি নি কিন্তু খু*ন তো আমি করেছি। একটা সম্পর্কের খু*ন করেছি। একটা মেয়ের বিশ্বাসের খু*ন করেছিলাম। সেটার শাস্তি তো আমার প্রাপ্য। সেটাই নাহয় হলো এবার। আমার মা পৃথিবীর বুকে একদম পবিত্র নারী হয়েই নাহয় বেঁচে রইলো। কেউ জানবে না একটা নারীর নির্মম জীবনের নিষ্ঠুরতা। যে মানুষটা সারাজীবন এতকিছু সহ্য করলো, সে নাহয় শেষ অব্দি সুন্দর থাকুক। যে মানুষটার বেঁচে থাকার বড্ড ইচ্ছে, নরক সহ্য করেও বেঁচে ছিলো, সে মানুষটাকে কীভাবে ম*রতে দেই বল?”
“তাই বলে তুই দোষ না করেও দোষী হবি, দা’ভাই!”
বিহঙ্গিনীর কণ্ঠে চরম অসহায়ত্ব স্পষ্ট। বিপ্রতীপ বাম চোখের কোণাটা কনিষ্ঠ আঙুলের সাহায্য মুছে নিলেন। ফর্সা মুখ খানা লাল হয়ে গেছে। হয়তো ভেতর ভেতর সে প্রচুর কাঁদছে। কিন্তু উপরে হাসি মুখ বজায় রেখেই বললো,
“হ্যাঁ দোষী হবো। মা যেহেতু বেঁচে থাকার জন্য গিয়েছে তাহলে তাকে বাঁচতে দে। মা হয়তো বুঝতে পেরেছিলো এমন কিছু হবে তাই তো সব প্ল্যান করেছে। আর তাছাড়াও, আমি না হতে পেরেছি ভালো প্রেমিক, না হয়েছি ভালো স্বামী, আর না হতে পারবো ভালো বাবা। অন্তত একটা ভালো সন্তানই হলাম। মায়ের গর্ভের কলঙ্ক নাহয়ে কিঞ্চিৎ উজ্জ্বল নক্ষত্র হলাম। ভালো থাকিস বিহু।”
বিপ্রতীপের কণ্ঠস্বর কাঁপলো, অশ্রু গড়ালো। জীবনে সে অনেক বাজিমাত করেছে, আজ জীবন একটা বাজিমাত করে দিলো। কথায় আছে না? সৃষ্টিকর্তা ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না।
দর্শিনী কেবল ফ্যালফ্যাল করে বিপ্রতীপের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। অন্তরের গহীন হতে বেরিয়ে এলো খুব পাংশুটে দীর্ঘশ্বাস। জীবনটা এমন না হলে কী খুব বড় ক্ষতি হয়ে যেতো! জীবনের পথ চলতে গিয়ে কত কিছুই না দেখতে হয়, কত হিসেব গড়মিল হয়, তবুও তো জীবন সুন্দর।
_
খালি রাস্তায় সাঁই সাঁই করে ছুটে যাচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়ের গাড়িটা। খুব মনযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়। তার বা’পাশেই দর্শিনী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে রইলো। মধ্যরাতেই তারা পাড়ি জমিয়েছে বাড়ির পথে। এই শহর দর্শিনীকে কেবল কষ্টই দিয়েছে, আর যে সহ্য করার শক্তি নেই তার।
বিহঙ্গিনীকে নিজের সাথে নিয়ে আসার অনেক চেষ্টাই করেছে দর্শিনী কিন্তু মেয়েটা আসে নি। কেমন ভেঙে পড়েছে। একদম নেতিয়ে গেছে সে। মায়া অবশ্য বলেছে সাথ দিবে বিহুর কিন্তু তা কতদিনের জন্য!
#চলবে
#পথান্তরে_প্রিয়দর্শিনী
#মম_সাহা
পর্বঃ তেতাল্লিশ
রাতের নিস্তব্ধ রাস্তাকে পিছে ফেলে বিরতিহীন ভাবে ধূসর রঙের গাড়িটা ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যে। গাড়ির ভিতরে অবস্থানরত মানুষ দু’জনই নিশ্চুপ। একজন বিষাদে নিশ্চুপ আরেকজন অপ্রাসঙ্গিক হিংসায়। হুট করেই চলন্ত গাড়িটা সাবধানে ব্রেক কষলো মৃত্যুঞ্জয়। বাহিরের দিকে আচ্ছন্ন থাকা দর্শিনীর দৃষ্টি মৃত্যুঞ্জয়ে আবদ্ধ হলো। ক্ষানিক অবাক হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“গাড়ি থামালেন যে!”
মৃত্যুঞ্জয় সিট বেল্ট খুলতে খুলতে রুক্ষ স্বরে জবাব দিলো,
“গন্তব্য বহুদূর তাই বিরতি প্রয়োজন। আপনি বসুন, আমি আসছি।”
দর্শিনী হয়তো আরও কিছু বলতো কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় সে সুযোগ টুকু না দিয়েই বড় বড় পা ফেলে রাস্তার বিপরীত পাশে চলে গেলো। বিরাট রাস্তায় খালি গাড়িটাতে দর্শিনী একা বসে রইলো। মিনিট দশ গড়াতেই মৃত্যুঞ্জয় চলে এলো হাতে তার বিশাল প্যাকেট। দর্শিনী প্যাকেট টা দেখে ভ্রু কুঁচকালো, প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কিসের প্যাকেট এটা?”
“খুলেই দেখুন।”
দর্শিনী আর কথা বাড়ালো না, প্যাকেট টা ধীর গতিতে খোলা শুরু করলো। মৃত্যুঞ্জয়ও ততক্ষণে এসে গাড়িতে বসে পড়েছে। প্যাকেট টা খুলতেই হেল্থ ড্রিংকস্, কিছু ফল, বাটার বন, জলের বোতল, লাড্ডুর বাক্স চোখে পড়লো দর্শিনীর। মৃত্যুঞ্জয় সবে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে, তন্মধ্যেই দর্শিনীর বিষ্মিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
“এত গুলো খাবার!”
“হ্যাঁ, সারারাত না খেয়ে থাকলে বাবুর যে শরীর খারাপ করবে জানেন না? শোকে তো ডুবে আছেন, বাবুটার চিন্তা করার কী আর প্রয়োজন আছে!”
দর্শিনী সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো তার পাশে বসা সুপুরুষটার দিকে। কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে বসে প্রথমেই হাত দিলো লাড্ডুর বক্সটাতে। সাথে সাথেই পুরুষালী, গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“খালি পেটে প্রথমেই মিষ্টি খেলে গা গুলিয়ে আসবে। প্রথমে বাটার বন খান তারপর জল। এরপর একটু ফল খেয়ে যা ইচ্ছে খাবেন। এত বড় হলেন অথচ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন না।”
মৃত্যুঞ্জয় আজ বেশ গম্ভীর হয়ে কথা বলছে। দর্শিনীর বিরক্ত লাগলো, কিঞ্চিৎ বিরক্ত প্রকাশ করেই বললো,
“এভাবে আমার সাথে কথা বলবেন না তো। যেন মাস্টারমশাই আসছে।”
দর্শিনীর উপর কিছুটা অভিমান থাকলেও দর্শিনীর বাচ্চামি মাখানো কথায় হেসে ফেলে মৃত্যুঞ্জয়। কেউ বলবে এই মেয়েটাই সবসময় এত গম্ভীর হয়ে থাকে।
মৃত্যুঞ্জয়কে হাসতে দেখে আরেকদফা বিরক্ত হলো সে। বাটার বন বের করে একটা মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে এগিয়ে দিলো। মৃত্যুঞ্জয় গাড়ি চালাতে চালাতে একবার খাবারের দিকে তাকিয়ে আবার গাড়ি চালানো তে মনোনিবেশ করলো।
দর্শিনী এবার বিরক্তির চরম মাত্রায় পৌঁছে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
“কী সমস্যা? এমন করছেন কেন!”
“কেমন করছি?”
“এই যে বাচ্চাদের মতন গাল ফুলিয়ে আছেন।”
“কারণ আছে, তাই।”
দর্শিনী এবার বাটার বনটা প্যাকেটে রাখলো। খুব মনযোগী শ্রোতার ন্যায় বসে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কারণটাই তো জানতে চাচ্ছি, কী হয়েছে?”
মৃত্যুঞ্জয় গাড়ি থামালো রাস্তার এক পাশে। নিরিবিলি রাস্তা। যতটুকু মনে হয় শহর ছেড়ে বড় রাস্তায় গাড়ি প্রবেশ করেছে। আশেপাশে কোনো জনমানসের চিহ্ন নেই। একদম নির্জন রাস্তা। এই নির্জন রাস্তাটাই কত নির্দ্বিধায় একজন পর পুরুষের সাথে বসে আছে দর্শিনী, অথচ তার হৃদয়ে কোনো ভয় নেই। পৃথিবীতে সকল পুরুষই খারাপ না। বছরের পর বছর এই পুরুষদের ছায়াতলেই নারীরা থাকে, সব পুরুষ খারাপ হলে এটা আদৌও সম্ভব হতো!
ভাবনার মাঝেই মৃত্যুঞ্জয়ের রাশভারি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আপনি আজও আপনার প্রাক্তনকে ভালোবাসেন, তাই না?”
হঠাৎ এই প্রসঙ্গ উঠায় নড়েচড়ে বসলো দর্শিনী। ক্ষানিক অস্বস্তিতেও পড়লো। আজকাল ভালোবাসা শব্দটাতেই তার অস্বস্তি। কারণ একটাই, ভালোবাসার মানুষটাই যে আস্ত এক বিব্রতকর মানুষ!
দর্শিনীর উত্তর না পেয়ে অধৈর্য হলো মৃত্যুঞ্জয়। অধৈর্য কণ্ঠেই বললো,
“বিপ্রতীপ এতকিছুর পরও কী অবলীলায় আপনার ভালোবাসা হয়ে রইলো! কতটা সৌভাগ্যবান সে!”
“বিপ্রতীপ আমার ভালোবাসা হয়ে রয়েছে সেটা আপনার ভুল ধারণা। হ্যাঁ, আমার জীবনে যখন ভালোবাসা নামক অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়েছিলাম তখন বিপ্রতীপ নামের মানুষটাই আমার সারা অনুভূতি জুড়ে বিরাজ মান ছিলো। বছর বছর যাবত যে ভালোবাসা তৈরী হয়েছে তা তো আর এক নিমিষে তুরুপের তাসের মতন ভেঙে যাবে না তাই না? তবে হ্যাঁ, আমি ভালোবাসাকে আজও ভালোবাসি কিন্তু বিপ্রতীপকে না।”
“তাহলে কী জীবনে মুভ অন করবেন না আর? একটা মানুষের জন্য আটকে রাখবেন নিজের জীবনটা?”
মৃত্যুঞ্জয়ের প্রশ্নে ক্ষানিক হাসলো দর্শিনী। হাসি মুখেই বিনীত স্বরে বললো,
“আপনাদের কাছে মুভ অন মানে কী? একজনকে ভুলে আরেকজনের সাথে জড়িয়ে যাওয়া? এত সহজে ভুলা যায় আদৌও! আমার কাছে মুভ অন মানে এটা না। জীবনে এগিয়ে যাওয়াটাই হলো মুভ অন। স্বামী মানে কেবল আমার একা গন্তব্যে হাঁটার জন্য আরেকজন সঙ্গী এ ছাড়া আর কিছুই না। সঙ্গী ছাড়াও পথ হাঁটা যায়। একবার তো সঙ্গীর সাথে হাঁটতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছি, এবার নাহয় একা হাঁটলাম।”
মৃত্যুঞ্জয় আর কোনো কথা বললো না। অনেকে তো সঙ্গী ছাড়া হাঁটতে চায় ই, তবুও তো পথে দেখা হয় কত পথচারীর সাথে। সে নাহয় পথচারী হয়ে রবে।
দর্শিনীও নিজের মতন করে খেতে শুরু করলো। মৃত্যুঞ্জয়ের কথার ইঙ্গিত বুঝবে না অত ছোটও সে না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবুঝ থাকাটাই শ্রেয়।
মৃত্যুঞ্জয় গাড়ির বর্তমান গুমোট পরিস্থিতি কাটানোর জন্য হঠাৎ ই বলে উঠলো,
“আচ্ছা, আপনার কী মনে হয়, বিহঙ্গিনী আর মৈত্র দাদাকে মায়া দেখে রাখবে?”
দর্শিনী খাবার চিবুতে চিবুতে উত্তর দিলো,
“মায়ার নিজেরই তো ঠিক নেই, ও আবার আরেক জনকে কী দেখবে!”
মৃত্যুঞ্জয় অবাক হলো। অবাক কণ্ঠে বললো,
“নিজের ঠিক নেই মানে?”
“মায়ার দুটো কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গেছে। কয়েকদিনের মাঝে ডোনার না পেলে মেয়েটা আর বাঁচবে না।”
মৃত্যুঞ্জয়ের হঠাৎ করেই খারাপ লাগা শুরু করলো। মায়া এমন একটা মেয়ে যাকে দেখলে একবার অন্তত কারো না কারো মায়া জন্মাবেই। আর মেয়েটার বয়সও তো খুব কম, এতটুকু বয়সে এমন রোগ!
দর্শিনী আকষ্মিক খাবার রেখেই বলে উঠলো,
“আপনার কী মনে হয়, শাশুড়ি মায়ের পালানোর এই কাজটা কী একার পক্ষে সম্ভব!”
দর্শিনীর প্রশ্ন যুক্তিযুক্ত দেখে মৃত্যুঞ্জয় খানিক ভাবতে বাধ্য হলো৷ সত্যিই তো, মোহনার পক্ষে তো এটা একা করা সম্ভব না।
মৃত্যুঞ্জয় সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনার কী কাউকে সন্দেহ হয়! কে মোহনাকে সাহায্য করেছে! আসলেই তো ঐ মহিলার পক্ষে একা পালানো সম্ভব না কারণ উনি যখন পালিয়েছে তখন পুরো এলাকার বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিলো, তার মানে কেউ তাকে সাহায্য করেছে। কিন্তু কে সে!”
দর্শিনী খাবারের লাস্ট অংশ টুকু মুখে তুলে নিয়ে কুটিল হেসে বললো,
“জানেন তো পৃথিবীর সকল হিসেব ভালোবাসার কাছে এসে গড়মিল হয়ে যায়। যে একবার সত্যিকার অর্থে ভালোবেসে ফেলে সে যেকোনো মূল্যে ভালোবেসে যেতে চায়। শাশুড়ি মায়ের সাহায্য করার ক্ষেত্রেও হয়তো এটা হয়েছে।”
মৃত্যুঞ্জয় আর প্রশ্ন করলো না কারণ সে জানে দর্শিনী এটার উত্তর দিবে না। দেওয়ার হলে প্রথমেই দিতো। আবারও সব নিশ্চুপ। আজকাল নিস্তব্ধতার মাঝেই চির সুখ।
_
বাড়িতে পৌঁছাতেই যে এত বড় চমক দর্শিনীর জন্য অপেক্ষায় থাকবে, সে ঘূনাক্ষরেও টের পায় নি। গ্রাম জুড়ে প্রিয় মানুষটার নামে ছিঃ ছিঃ আর নানান কটু কথায় সে বাকরুদ্ধ। অবশেষে তাকে ছোট বৌদি সবটা খুলে বললো। দর্শিনীর বাড়ির লোক অবশ্য জানে দর্শিনী একটা ক্যাম্পিং এ গিয়েছিলো, তাই তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিলো না তাকে নিয়ে।
একফোঁটা বিশ্রাম না করেও দর্শিনী ছুট লাগালো হিমাদ্রি’দার বাড়ি। আট মাসের ভারী পেট নিয়ে এত ছুটোছুটি তার দেহ নিতে পারছে না তবুও সে ছুট লাগায়। এই ছোট কাকীই একটা সময় তার আদর্শ ছিলো, আজও আছে, এ মানুষটাকে নিয়ে নোংরামো সত্যিই মানা যায়!
সৌভাগ্যবশত হিমাদ্রীদের বাড়ি যাওয়ার পথেই হিমাদ্রীর সাথে দেখা হয়ে যায় তার। মাস্টার জেঠুদের বাগানের পাশের খালি জায়গাটাতেই হিমাদ্রী বসে আছে। দৃষ্টি তার উদাস।
দর্শিনী ধীর পায়ে হিমাদ্রীর পাশে দাঁড়ালো, শক্ত কণ্ঠে বললো,
“এমনটা কেনো করলেন হিমাদ্রী দা!”
হিমাদ্রীর ধ্যান ভাঙলো। চোখ গুলো তার কেমন টকটকে লাল! কিঞ্চিৎ ভড়কে গেলো দর্শিনী তবে চেহারার কাঠিন্যতা কমলো না। রুক্ষ কণ্ঠে দ্বিতীয় প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“কাকিমনিকে আমি প্রচুর বিশ্বাস করি তাই আমি জানি সে কোনো ভুল কাজ করবে না। কিন্তু আপনি, আপনাকেও তো অনেক বিশ্বাস করতাম , তাহলে এমন করলেন কেনো!”
হিমাদ্রী দর্শিনীর দু’হাত ধরে ফেললো আচমকা। লাল চোখ গুলো থেকে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু কণা। আকুতি মাখা কণ্ঠে বললো,
“আমি জানিনা প্রিয়, কি থেকে কি হয়ে গেলো। আমি তো কাল অস্মি মানে তোমার কাকাতো বোনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটাকে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমি ওদের ঘরে যেতেই দেখি তোমার কাকী মানে কুহু কেবল স্নান করে বেরিয়েছে। এর মধ্যেই হৈচৈ পরে গেলো সে ঘর ঘিরে। সবাই ছড়িয়ে ফেললো বিশ্রী ঘটনা। অথচ সবটাই সাধারণ, স্বাভাবিক ছিলো।”
হিমদ্রীর কথার ধরণে দর্শিনী ভ্রু কুঁচকালো। সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কাকীর নাম ধরে ডাকছেন যে!”
“কারণ কুহুকে আমি ভালোবাসি। আমি জানি সে আমার চার বছরের বড়, কিন্তু কী করবো, ভালোবাসা কি বয়স মানে! কিন্তু কে জানতো আমার জন্যই সে মানুষটা কলঙ্কিত হবে। পাহাড়ের চূড়ার মতন উঁচু মাথা তার নিচু হবে। আমার ম*রে যেতে ইচ্ছে করছে যে।”
দর্শিনী অনেকটাই অবাক হলো হিমাদ্রী দা এর কথায়। সাধাসিধে আটপৌরে মানুষটা কিনা একজন বিধবা, বয়সে বড় মেয়েকে ভালোবাসে!
হিমাদ্রীর অসহায় কান্নায় মায়া হলো দর্শিনীর। সে হিমাদ্রীর হাতটা মুঠ করে ধরলো। তন্মধ্যেই বাগান থেকে এক তাচ্ছিল্য মাখা কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ছিহ্, তোমাদের বাড়ির মেয়েদের সবারই কী চরিত্র খারাপ!”
#চলবে
#পথান্তরে_প্রিয়দর্শিনী
#মম_সাহা
পর্বঃ চুয়াল্লিশ
শুকনো পাতার স্তুপের পাশে তিনটি মানুষ বিরস মুখে দাঁড়িয়ে আছে। গুমোট করা বাতাস গুলো মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসের মতন ছুটে যাচ্ছে মানুষ গুলোর মস্তিষ্ক নাড়িয়ে। দর্শিনী বেশ ভদ্র কিন্তু কঠিন মুখে তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“তা কাকাবাবু, আমাদের বাড়ির মেয়েদের চরিত্র খারাপের কী দেখলেন শুনি?”
ভদ্র লোকের মুখ থমথমে, হাসির মাঝেও কেমন যেন তাচ্ছিল্য মাখা একটা ভাব। সেই তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেই বললো,
“আমাকে আবার নতুন করে তোমাদের চরিত্রের সার্টিফিকেট দিতে হবে মেয়ে? নিজেদের গুনগান শোনার এত ইচ্ছে?”
দর্শিনী কিঞ্চিৎ হাসলো। লোকটা যে তার সাথে এভাবেই কথা বলবে সেটা যেন তার ঢের জানা ছিলো। তাই তত অবাক না হয়েই বরং প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“আমার তো ইচ্ছে ছিলো না শোনার ৷ অথচ আপনি ছুটে এসেছেন গুনগান শুনাতে। যতই হোক আপনি আমার বড়, তার উপর মৃত্যুঞ্জয়ের বাবা, কিছু তো সম্মান দিতেই হয়। তাই নাহয় একটু শুনলামই আমার গুনগান।”
ভদ্রলোক দর্শিনীর গা ছাড়া ভাব দেখে ক্ষানিকটা ভড়কালো। এপাশ-ওপাশ হাতড়ে কিছু বাক্যের সমাহার সাজিয়ে অস্পষ্ট ভাবে বললো,
“একটা নারীর সম্পদ আর সম্মান কিন্তু তার চরিত্র। মেয়ে হিসেবে সেটা তোমাদের মাথায় রাখা উচিত।”
“আচ্ছা! চরিত্র কেবল নারীদেরই সম্পদ? পুরুষদের কিছু না, তাই না? তাই বুঝি পুরুষরা নিত্যনতুন রটছে নারীদের সম্মান লুটার ইতিহাস! বাহ্। আপনার কাছে অন্তত এরকম দৃষ্টিভঙ্গি আশা করি নি, কাকাবাবু।”
ভদ্রলোকের ভদ্রতায় যেন কিছুটা কালি ছিটকে দিলো দর্শিনী। ভদ্রলোক আর কিছু বললেন না, কিছুক্ষণ নিরব থেকে পথ ধরলেন চলে যাওয়ার। হয়তো চক্ষু লজ্জা লুকানোর চেষ্টা।
হিমাদ্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দর্শিনীও ফিরছে বাড়ির পথে। একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীরের অবসাদের অবসান প্রয়োজন। আর কত!
_
ভীষণ ক্লান্ত, নিরেট একটা অপরাহ্ন কাটানোর পর দর্শিনীর শরীরটা ফুরফুরে। ঘরের লাইট বন্ধ করা, বাহিরেও সন্ধ্যা ঝিমিয়ে রাত এসেছে, কখনো ঝিঁঝি ডাকছে, কখনো বা ডাহুক। ভালো লাগছে অন্ধকারটা দর্শিনীর, কেমন যেন একটা শীতল শীতল ভাব। গবাক্ষ গলিয়ে কিছু অস্বচ্ছ জোৎস্নার আলো লুটোপুটি খাচ্ছে দর্শিনীর ঘরের মেঝেতে। ঘর নয় যেন স্মৃতির পাতায় ঝিমিয়ে থাকা কিছু গোপন ঝাপসা সুখের রাজ্য।
ভারী শরীরটা টেনে ধীর গতিতে বিছানা ছাড়ে সে। এক পা দু’পা করে হেঁটে ঠিক পঞ্চম পায়ের পদক্ষেপ টা রাখে জোৎস্না ভরা মেঝেতে। শিরশির করে উঠে শরীর। মনে হলো জোৎস্নার স্রোত জাপ্টে ধরলো সুন্দর, শুভ্র, মোলায়েম পা গুলো। মাটির মাঝে জোৎস্নার রঙ মিলে কেমন অদ্ভুতে এক রঙ সৃষ্টি হয়েছে, যে রঙ দেখলে তৃপ্তি মেলে।
দর্শিনী খিল খিল করে হাসলো। কত দিন পর এমন করে হাসলো সে! হাসতে হাসতেই স্থির,অচঞ্চল পা গুটিয়ে বসে পড়লো মাটির মেঝে খানায়। আজ একটু জোৎস্নার স্নান হয়ে যাক? আজ একটু নাহয় দুঃখ উড়ানোর গল্প লেখা যাক?
এক, দুই, তিন করে খুব নিরবে কিছু মিনিট অতিক্রম হলো। সশব্দে বেজে উঠলো দর্শিনীর মুঠোফোন। দর্শিনী আগ্রহ দেখালো না ফোনটা তোলায়। বাজতে বাজতে ক্লান্ত হয়ে মুঠোফোন তার চিৎকার বন্ধ করলো। মিনিট এক পেরুতেই আবারও সশব্দে বেজে উঠলো সে নতুন উদ্যমে। না চাইতেও দর্শিনী উঠলো মাটি থেকে। আলসে ভঙ্গিতে ফোনটা উঠিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই জ্বলজ্বল করলো স্মৃতির পাতার খুব আদুরে নামটা, ‘তৃণশয্যা’।
দর্শিনী ভেবে পায় না, এই মেয়েটার এমন রোমাঞ্চকর নাম রাখার কারণ কী? মেয়েটা আগাগোড়া পুরোটাই যেন খোলা বইয়ের মতন। যার যেমন ইচ্ছে, সে তেমন করেই বুঝতে পারবে। তবুও কত রহস্যময় নাম সে নারীর!
এবার ফোনের রিং কাটার আগেই রিসিভ করলো দর্শিনী। ফোন রিসিভ হতেই অপর পাশ হতে করুণ স্বরে মেয়েটা বললো,
“বিয়েটা এগিয়ে আনা হয়েছে, প্রিয়দি। পরশু দিনই বিয়ে। আসবে না?”
হঠাৎ এমন কথার জন্য প্রস্তুত ছিলো না দর্শিনী। সে তো ভেবেছে এমন একটা বিরূপ ঘটনা হয়তো তৃণার বিয়েটা আটকাতে পারবে, অথচ অবস্থা আরও বেগতিক!
তৃণার মিহি স্বরে আবারও ধ্যান ভাঙলো দর্শিনীর। মেয়েটা কাঁদছে না তবে অবসন্ন স্বরে বলছে,
“আমার তো জীবিত ভাবে মৃত্যুর সুযোগ এসেছে। দেখবে না সে মৃত্যু প্রিয়দি? লাল কাপড়ের কাফন দেখেছো কখনো! আমার বিয়ের বেনারসি টা আমার লাল কাপড়ের কাফন। সব কাফন কি আর সাদা হয় গো! আর না সব মৃত্যু চোখে দেখা যায়। আসবে না আমার জাঁকজমকপূর্ণ মৃত্যু দেখতে?”
দর্শিনীর বুক কাঁপলো। নিউরনে ছড়িয়ে গেলো কিছু চঞ্চল আতঙ্ক। উৎকণ্ঠিত হলো তার মস্তিষ্ক, কণ্ঠ কেঁপে উঠার পরেও সে বহু কষ্টে স্বান্তনার বাণী পাঠ করলো,
“কাঁদছিস কেনো তৃণা! আমরা তো আছি। কিছু একটা ঠিক ব্যবস্থা করে নিবো।”
“কিছুই করতে পারবে না দি,কিছুই না। আমি আর আশাও রাখছি না। কি আর হবে আশা রেখে? বাবার বিশাল চ*ড়,থাপ্পড় ছাড়া কিছুই যে জুটবে না। আমার কেবল মায়া হচ্ছে দৃষ্টান্তের জন্য। ছেলেটা ভালোবেসে কী নিদারুণ ঠকেই না গেলো! সে তো ভালোবাসতে চায় নি, এই আমি, আমি বাধ্য করেছিলাম তাকে ভালোবাসতে। তাকে ভরসা দিয়েছিলাম, ভালোবাসলে কেউ ছেড়ে যায় না। অথচ আমি ছেড়ে যাচ্ছি। আচ্ছা প্রিয়দি, আমি কী তবে ভালোই বাসি নি?”
শেষের দিকের কথাটা বলার সময় কাঁপলো তৃণার কণ্ঠটা। মেয়েটা কী কান্না গিলে ফেলার চেষ্টা করলো? মেলায় একবার তাকে মাটির পুতুল কিনে দেওয়া হয়নি বলে দশ বছরের কিশোরী ঠোঁট ফুলিয়ে সে কি কান্না! অবশেষে তার গগণ ফাটানো কান্নার জন্য তাকে পুতুল কিনে দেওয়া হয়েছিলো। অথচ সেই মেয়েটা আজ মানুষ হারিয়ে ফেলার আতঙ্কে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদছে না বরং কান্না গিলে ফেলছে! মেয়ে মানুষ এমন হুট করে কীভাবে বড় হয়ে যায়? কান্না গিলে ফেলার মতন বড় না হলেই তো পারে। আকাশ-পাতাল উজাড় করে চিৎকার করে কান্না করে যদি বড় বেলাতেও আবদার করতো তাহলে হয়তো ছোট বেলায় পুতুল কিনে দেওয়ার মতন বড় বেলার আবদার গুলোও পূরণ হতো। হতো না?
বিরাট এক প্রশ্ন উত্তর বিহীন ঘুরে বেড়ালো দর্শিনীর মস্তিষ্কে। সময়ের বিবর্তনে সবই বদলায়, ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না করা কিশোরী বদলায়, কিশোরীর বায়না পূরণ করা বাবা-মাও বদলায়। তাই হয়তো ছোট বেলায় আবদারের পুতুল পেলেও বড় বেলায় ভালোবাসার মানুষটা পাওয়ার সৌভাগ্য হয় না।
তৃণা ফোন কেটে দিয়েছে মিনিট দশ তো হবেই কিন্তু দর্শিনী ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। কি করবে, কি করবে ভেবেও কিছু করার সুযোগ পেলো না। স্মৃতির পাতায় অগোছালো ভাবনা মেলতেই হঠাৎ তৃণার বলা কথাটা তার মস্তিষ্কে শিহরণ জাগালো। ‘ভালোবাসলে কেউ ছেড়ে যায় না’। দর্শিনীর মাথায় প্রশ্নরা আঁকিবুঁকি আঁকলো, সত্যিই ছেড়ে যায় না! অথচ এক আকাশ ভালোবাসা থাকা শর্তেও তো নিপা বৌদি ছেড়েছিল দৃষ্টান্তকে, সে ছেড়েছিল বিপ্রতীপকে। তাহলে কী কথাটা ভুল? হ্যাঁ, ভুল। বাস্তবতার কষাঘাতে কত ভালোবাসাই পিষে যায়, তাই বলে তাদের ভালোবাসায় প্রশ্ন তোলার সাধ্যি কারো নেই।
দর্শিনী নিজের ঘর ছেড়ে বের হলো। উঠোনে কত গুলো কাঁঠাল পাতা ছড়িয়ে আছে। আজ মা-বৌদিরা কী সন্ধ্যার উঠোন ঝাড়ু দেয় নি! ভীষণ অবাক ভাব নিয়ে দর্শিনী উঠনো নামলো। হলুদ রঙের বাল্বটাও আজ সদর দরজার সামনে জ্বালানো হয় নি। অদ্ভুত ব্যাপার! এত বছরের জীবনে এমন অলুক্ষণে কাণ্ড সে দেখে নি।
বড়দার ঘর থেকে ধৃষ্টের গলার স্বর ভেসে আসছে। সে বার বার আওড়াচ্ছে, ‘আমাদের ছোট নদী চলে আঁকেবাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’।
বাড়িতে ধৃষ্ট বাদে আর কারো উপস্থিতি পাওয়া গেলো না। অদ্ভুত ভাবে আজ বাবাকেও দেখা গেলো না। সারাদিনের ক্লান্তিতে খোঁজ নেওয়া হয় নি অথচ এখন কত গুলো ধূসর ভাবনা উড়ে বেড়াচ্ছে।
দর্শিনী বড়দার ঘরে পা রাখতেই দেখলো ধৃষ্ট পড়ার টেবিলে বসে অনবরত দুলে দুলে পড়ছে। বড়দা ডান হাত কপালের উপর ফেলে শুয়ে আছে। বড় বৌদি জামা-কাপড়ের আলনা গুছচ্ছে।
ধৃষ্টের পড়ার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই ছেলেটা পড়া থামিয়ে দিলো। নিধিও খেয়াল করেছে দর্শিনীকে তবে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখালো না।
হঠাৎ ছেলের পড়া শুনতে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকালো প্রদীপ। চোখের উপর হাত রেখেই ধমকের স্বরে বললো,
“পড়ছো না কেন ধৃষ্ট?”
“পিসি মণি এসেছে, বাবা।”
ছেলের কথা শুনে প্রদীপ কপাল থেকে হাত সরালো। বোনকে দেখে মিষ্টি হাসি দিয়ে উঠে বসলো বহু কষ্টে। পা দুটো অচল প্রায়। তেমন একটা জোর নেই। সারাদিন বাড়িতে শুয়ে বসেই কাটে তার।
দর্শিনী ধৃষ্টের মাথায় হাত বুলিয়ে ভাইয়ের খাটে গিয়ে বসলো। ধীর কণ্ঠে শুধালো,
“শরীর কেমন আছে, বড়দা?”
প্রদীপ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে সহজ সরল কণ্ঠেই বললো,
“ভালো আছি। তোর কী অবস্থা? বিকেলের দিকে তোর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম ঘুমিয়ে আছিস। শরীর ঠিক তো?”
“হ্যাঁ, বড়দা, একদম দারুণ আছে। তুমি ডাক্তার দেখাচ্ছো তো ঠিক মতন?”
প্রদীপের হাসি হাসি মুখ খানে অমাবস্যার দেখা মিললো। হাসি উড়ে গেলো দীর্ঘশ্বাসে। আমতা-আমতা করে বললো,
“তুই বস, আমি বাথরুম থেকে আসছি।”
বড়দার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার ধরণটা ভাবালো দর্শিনীকে। প্রদীপ বের হয়ে যেতে যেতেই নিধি মুখ খুললো, দর্শিনীর তখনকার করা প্রশ্নের মুখ ঝামটি মারা উত্তর দিয়ে বললো,
“ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য তোমার বড়দার আছে নাকি নেই সে খবর রাখো? কত মাস যাবত ঘরে বসে আছে, ডাক্তার দেখানোর টাকা টা কে দিবে শুনি? সবাই কী আর তোমার মতন সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়!”
বড় বৌদির কথার ধরণে অবাক হলো দর্শিনী। অবাক কণ্ঠে বললো,
“বড়দার কাছে ডাক্তার দেখানোর টাকা নেই!”
নিধি হাতের জামাটা ছুঁড়ে ফেললো। রুষ্ট কণ্ঠে বললো,
“টাকাটা থাকবে কীভাবে শুনি, অকেজো মানুষের টাকা কোথা থেকে আসবে? কে দিবে টাকা?”
“কেনো, বাবা দিবে।”
দর্শিনীর উত্তরে হাসলো নিধি। তাচ্ছিল্য করে বললো,
“অকেজো ছেলে এবং সে ছেলের স্ত্রী-সন্তানকে পালছে উনি, আর কত দিবে? খোঁজ তো রাখো না সংসারের, জানবে কীভাবে? বাবাকে আমি দোষ দিবো না। সুমনেরও দোষ নেই, সংসারের পুরো দায়িত্ব তার ঘাড়ে। কিন্তু তোমার মা, মানে আমার শাশুড়ী, তার মতন মহিলা দুটো হয় না। যখন তুমি অসহায় ছিলে তখন তোমাকে কথা শুনাতে সে ভাবে নি। আজ আমরা অসহায়, আমাদের সাথে অগোচরে কত কিছুই হচ্ছে জানবে না তা কেউ। আমার ছোট ছেলেটা, আগে দুধ খেয়ে ঘুমাতো রোজ। এখন দুধ খেতে পারে না, দাম বেড়েছে নাকি, কেবল সকাল-বিকেল চা খাওয়ার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই আনা হয় এখন। মাছের বড় টুকরো এখন নিপা পায়, নিপার দোষ নেই, মেয়েটা এসব কুট কাঁচালিতে নেই কিন্তু এগুলো শাশুড়ি মায়ের কাজ। নিপার স্বামী রোজগার বেশি করে তাই সে মাছের টুকরো বড় পায়। সংসারের রীতিমতো দুই-তৃতীয়াংশ কাজ আমিই করি। স্বামী সংসারে টাকা দেয় না, তাই শ্রম দিয়ে সব ঋণ কমাতে চাচ্ছি। সেসবের ধারণা আছে তোমার কাছে? নেই। তুমি যদি বাবাকে জায়গা নিয়ে উসকানি না দিতে আজ আমার স্বামী পঙ্গু হতো না আর আমরাও এমন ভাবে থাকতাম না। তোমাকে আমি ক্ষমা করবো না কখনো।”
প্রথম কথা গুলো দর্শিনীর মনে ধিক্কার তুললে। সত্যিই সংসারের খবর সে রাখে না, অথচ কত কি ঘটে যাচ্ছে সংসারে! মা কখনো ভালো হবে না? কোন সন্তানের টাকা বেশি, কোন সন্তানের টাকা কম, এসব দিয়ে আজকাল সম্পর্ক মাপা হয়! কিন্তু নিধির বলা শেষ কথাটার তীব্র প্রতিবাদ করলো সে, কঠিন কণ্ঠে বললো,
“তোমাদের সাথে এমন হচ্ছে আমি জানতাম না। কিন্তু এসবের দায়ভার কখনোই আমার না। ভুল কিছু ধারণা নিয়ে আমাকে দোষারোপ করবে আর আমি মেনে নিবো তা না বৌদি। চোখ খুলে অন্তত বিচার টা করো।”
নিধি উত্তর দিলো না তবে কান্না করলো। দর্শিনীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। দর্শিনী কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। ততক্ষণে প্রদীপও দরজায় এসে উপস্থিত হয়েছে। দর্শিনী মাথা নামিয়ে নিজের ঘরে দিকে পা বাড়ালো। প্রদীপ নিধিকে এই প্রথম বকলো না। কেবল জড়িয়ে ধরলো খুব নিরবে। নিধির শেষ কথা টুকু বাচ্চামো হলেও প্রথম কথা গুলো মিথ্যে না। টাকার কাছে মাঝে মাঝে মা-সন্তানের ভালোবাসা ও হার মানায়। নিজেকে না দেখলে বুঝতোই না।
ছোট্ট ধৃষ্ট কি যেন বুঝলো, হুট করে সেও বাবা-মায়ের কোমড় জড়িয়ে ধরলো। ক্রন্দনরত মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“আমরা আবার কবে আগের মতন হবো, মা?”
অবুঝ ছেলের উত্তর দিতে পারে না মা। কেবল হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। দর্শিনী দূর হতে এই পরিবারটাকে দেখে যায় নিরলস। কি অসহায় মানুষ গুলো! খোঁজ না নিলে তো জানাও হতো না।
_
চারদিকে সন্ধ্যা বিরজমান। একটু পর তৃণার গায়ের হলুদের অনুষ্ঠান। সবাই যখন সে অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত, তখন দর্শিনীর গালে সপাটে চ*ড় পড়লো। কিন্তু কেনো!
#চলবে