শুচিস্মিতা পর্ব-১১+১২

0
215

#শুচিস্মিতা -১১
Tahrim Muntahana

~ বিয়েতে যাবো না কেন আম্মা। ওরা‌ কি ভাববে?

ফাতিনের কথায় মিসেস সেলিনা চুপ র‌ইলেন। তার মনে হচ্ছে বিয়েতে গেলে আনতারা’র সাথে ফাতিন কথা বলবে। তিনি চাইছিলেন‌ই না ফাতিন আসুক। অথচ ছেলে টা তাকে না জানিয়েই বিয়ের আগের দিন চলে এলো। এখন আবার বিয়েতে যাবে মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে!

~ আমি তোমারে আনতারা’র থেকে দূরে থাকতে ক‌ইছিলাম ফাতিন। আমার কসমের কোনো দাম নাই তোমার কাছে?

ফাতিনের বুঝ এলো কেন তার মা তাকে বারণ করছিলেন। মন টা আবার ভেঙে গেল তার। মা তাকে বিশ্বাস করছে না? একটা মেয়েকে ভালবেসে মায়ের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে সে? বললো,

~ তোমার আগে কেউ না আম্মা। আমি আনতারা’কে চাওয়ার আশা সেদিনই ছেড়ে দিয়েছি। আমার মনের কথা তুমি ছাড়া কেউ জানতে পারবে না, আনতারা’ও না! এবার একটু সবার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করতে দাও‌। নাহলে বলো এখনি ঢাকার দিকে রওনা হচ্ছি!

গাঢ় অভিমান টের পেলেন মিসেস সেলিনা। তার আগে কেউ না শুনে খুশিও হলেন আকাশ ছোঁয়া। বললেন,

~ যাও যাও রেডি হ‌ও, গাড়ি আইসা পড়ছে।আমি দেইখা আসি আনতারা রেডি হ‌ইলো কিনা!

ফাতিন সায় জানিয়ে রেডি হতে গেল। মিসেস সেলিনা চললেন আনতারা’র রুমের দিকে। মেয়েটার সাথে অযহত এতদিন দুরত্ব রেখেছে সে, যেখানে দোষ মেয়েটার‌ না। আনতারা একা একাই তৈরি হচ্ছিল, মিসেস কামরুন্নাহার বিয়ে বাড়িতে কাজের উপর রয়েছে। মিসেস সেলিনা ঘরে ঢুকেই বললেন,

~ এখনো রেডি হয়নি? দেখি কি পড়ছস! এটা না, ছাই রঙের একটা ফ্রক আছে না? ওইটা পড়ে আয়, যা যা!

বড় চাচির পরিবর্তনে আনতারা কষ্ট পেলেও চুপ ছিলো, কোনো প্রশ্ন‌ই করেনি। আজ এমন ব্যবহারে আনতারা’র মনে খুশিরা হানা দিলো। কোনো রকম বাক্য ব্যয় না করে চাচি কথা মতো ড্রেস পড়ে আসলো। মিসেস সেলিনা মেয়েটার খুশি টের পেলেন, একটু বেশীই খারাপ লাগলো তার। খুশিটা আরেকটু বেশী করে দিয়ে নিজের ঘর থেকে একটা জুয়েলারি বক্স আনলেন। হিজাব পড়ার আগেই তিলক টা পড়িয়ে দিয়ে নিজ হাতে সুন্দর করে হিজাব টা পড়িয়ে দিলেন, আনতারা’র চোখ কেমন চিকচিক করে উঠলো। তবে লজ্জায় আর জড়িয়ে ধরতে পারলো না। নৌজপিন ও পড়িয়ে দিলেন। মিসেস কামরুন্নাহার হাতের কাজ সেরে আনতারা’র কাছে এসেছে রেডি করাতে, এসেই এমন দৃশ্য দেখে তার মন আচমকাই ভালো হয়ে গেল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,

~ মাশাআল্লাহ আমার মেয়েটাকে কি সুন্দর লাগছে!

মিসেস সেলিনা’ও একটু গাঢ় করে পরখ করলেন, সত্যিই অপূর্ব লাগছে! দুই জা ই হেসে আনতারা কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, ড্রয়িং রুমে অপেক্ষা করছিলো ফাতিন’রা, ফারাহ, কেয়া একটু আগেই তৈরি হয়ে বসেছে। আনতারা কে দেখে ফাতিন থমকালো! কিছুক্ষণ পলকহীন দেখে গেল, হঠাৎ করেই যখন মায়ের কথা মনে পড়লো, জোর করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো সে। বুকে ঘা হলো, তবে প্রতিষেধক নেই! মিসেস কামরুন্নাহার ফারাহ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

~ বোন দের দেখে রেখো ফারাহ! অপরিচিত বাড়ি কাছ ছাড়া করবে না। কিরণ সর্বক্ষণ ছোট আপায়ের হাত ধরে থাকবে। কথার নডচড় যেন না হয়!

সবাই বাধ্যগত সন্তানের মতো মাথা নাড়ালো। মিসেস কামরুন্নাহার হেসে ফাতিনের দিকে তাকালেন, ছেলেটা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। বিষন্ন হয়ে গেল মন, তিনি একটু হলেও জানেন তো! মিসেস সেলিনা চিন্তিত স্বরে বললেন,

~ তুই গেলেই ভালো হ‌ইতো নাহার। গুরুজন থাকলে ভালো হ‌ইতো!

~ না গো বড়ভাবী, এখন কি আর সেই বয়স আছে? ফাতিন, রাশিদ, নিয়ন তো আছে। ওরা সামলে নিবে চিন্তা করো না!

মিসেস সেলিনা মাথা নাড়ালেন। ফাতিন সবার আগে বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে, এক অটো তে তারাই যাবে তাই কোনো সমস্যা হবে না আনতারা’র। আনতারা’র সমস্যার কথা ভাবছে দেখে ফাতিন নিজের উপর‌ই হাসলো!

~ তোকে পাবো বলে ভালোবেসেছিলাম, তবে জানতাম না কৃষ্ণমায়া আঁধার বেশী ভালোবাসে। ধরা ছোঁয়ার বাইরে যে!

~ আনতারা কে একটু এদিকে আসো না!

কনের কথায় আনতারা’র কিছুক্ষণ স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার নাম বলছে? অস্বস্তিতে পড়ে গেল সে, এমন সময় টের‌ পেল তার হাত কারো মুঠোয়। ঝট করে হাতের দিকে তাকালো , এক নিমিষেই বুঝে ফেললো হাতের মালিক তার মনকুঠিরে থাকা প্রিয়জন! ততক্ষণে রাশিদ হাত ধরে হাঁটা শুরু করেছে। ঝিনুকের সামনে দাঁড় করাতেই ঝিনুক কাছে টেনে নিলো আনতারা’কে। দ্বিধান্বিত নজরে রাশিদের দিকে তাকালো আনতারা। রাশিদ বুঝতে পারলো,

~ ঝিনুক, কি করছিস? তোকে বলেছিলাম আনতারা এসবে অভ্যস্থ নয়!

~ ইশশ সরি ভাইয়া। আমি এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিলাম। যাই হোক তুমিই কিন্তু আমার জা হবে।

আস্তে আস্তে বলায় কেউ টের পেল না তিনজনের মধ্যে কি চলছে। রাশিদ আরো কিছুক্ষণ পর আনতারা কে নিয়ে লোক সমাগমের বাইরে এলো। মেয়েটা হাঁসফাঁস করছিলো। জোরে শ্বাস নিয়ে আনতারা বলে উঠলো,

~ আপনি সবাই কেই বলে বেড়িয়েছেন এসব?

রাগ টের‌ পেল না রাশিদ, তাই সেসবে কান ও দিলো। বলে উঠলো,

~ সামনে সুন্দর একটা পুকুর আছে যাবে?

~ চলেন!

রাশিদ যেন এই আঁধার রাতেই আকাশে বিশাল চাঁদ দেখতে পাচ্ছে, আনতারা’র কথাগুলো শুনে। মেয়েটা যাবে? প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নিলো? অবাক হয় রাশিদ, আনতারা আর কিছু না বলে ঠোঁটে সম্মতিসূচক একটি হাসি ধরে রাখে।
রাশিদ যা বুঝার বুঝে যায়। তার পাশে থাকা অপরূপা রমনীর প্রত্যেকটা ভাব সে বুঝে নিতে পারে। শরীর নতুন ছন্দে কেঁপে উঠে রাশিদের, নেত্রপল্লব‌ ও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই মুহূর্তে নিজেকে কোনো জড়বস্তু মনে হচ্ছে রাশিদের, দুটো বছর অপেক্ষা করার‌ পর এই দিনটাই সকল অনুভূতি যেন হারিয়ে ফেললো। কৃষ্ণবর্ণ মুখে আলাদা এক খুশীর ঝলক। রাশিদ কে বার বার আকৃষ্ট করে। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেয় মায়ায়! এই হাসির জন্য‌ই তো সে কতকাল অপেক্ষা করেছে! দুটো বছর কি কম নাকি? হঠাৎ করেই রাশিদ টের পায় তার চোখ ভিজে আসছে, ঠোঁট উল্টে আসছে! তার কি কান্না পাচ্ছে? এতমাস তো পায় নি! তাহলে আজ কেন কান্না পাচ্ছে? মেয়েটার চোখে মুখে নিজের প্রতি ভালোবাসা দেখে তার হৃদয় পুড়ছে, আচানক খুশিতে ভেতরটা খালি লাগছে! ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়ে রাশিদ, আনতারা নিবিড় চোখে সবটাই পরখ করে। হঠাৎ করে তার চোখ টাও চিকচিক করে উঠে। তার মতো ভাগ্যবতী কে আছে? তার ভালোবাসা বুঝতে পেরে যে ছেলের চোখে জল আসে, সে ভাগ্যবতী না হয়ে পারে? দু পা এগিয়ে এসে রাশিদের বরাবর দাঁড়ায় আনতারা। বড়বড় ঝাঁকড়া চুলে কাঁপা হাতটা ছুঁয়ে দেয়, মাথা তুলে রাশিদ। করুণ কন্ঠে বলে উঠে,

~ আমি একটু একা থাকতে চাই, এই অনুভূতি’র সাথে তাল মেলাতে পারছি না শুচিস্মিতা!

আশ্বিন বাতাসে শীতের স্পর্শ নিয়ে আসে। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস শরীর মন‌ দুলিয়ে দেয়। নির্মল প্রকৃতি নজর কাড়া রূপে ধরা দেয় প্রকৃতি প্রেমী দের কাছে। নদীর পাড় ঘেঁষে হাঁটছে আনতারা! আজ মনটা তার বড্ড ভালো। নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। মাটির সিক্ততাও আশ্বিনের প্রভাবে কমে গেছে। অবিরাম বর্ষণের ধারায় ফুলে ফেঁপে হিংস্র নদীর রূপ আর দেখা যাচ্ছে না! আকাশের গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ, শরতের পুরোদস্তুর নেমে পড়া প্রকৃতি আনন্দের সুর তোলে হৃদয়ে। প্রেমময় অনুভূতি জাগিয়ে দেয় মনে। নিঃসঙ্গ জীবনে আরেকটা সত্তার অস্তিত্ব মনে করিয়ে দেয়। ইচ্ছে জাগে নির্মল প্রকৃতি তে হারিয়ে যেতে প্রিয় মানুষটার হাত ধরে! আনতারা’র এমন ইচ্ছে জাগলেও বিশেষ ভাবে মাথায় জেঁকে বসতে দিচ্ছে না। কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। এই ভোরে দুজন কুপোতকুপোতি কে একসাথে দেখলে পুরো গ্রাম থ‌ই থ‌ই হয়ে যাবে! সেই ভয়েই আনতারা বাড়ির পথ ধরলো, না জানি কখন মানুষটা চলে আসে। আনতারা’র ভয়টাই সত্য হলো, ওইযে হেলেদুলে আসছে। এদিক‌ওদিক তাকালো আনতারা, অনেক চাষীরা কাজ করছে। ভয়ে ঢোক গিললো সে। তবে সেরকম কিছুই হলো না, তার পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় ফিসফিস করে বললো,

~ আজ রাত এগারোটায় টাই শিউলি তলায় থাকবে, আমি অপেক্ষা করবো!

কথাটা বলে রাশিদ তাকে না দেখার ভান করেই চলে গেল। হাসলো আনতারা। পেছনে তাকানোর শখ হলেও তাকালো না। কাল রাতে মানুষটা মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলো, একদম গম্ভীর নিশ্চুপ দৃষ্টি ফেলে তাকে দেখে গেছে। ব্যাপার টা বেশ মজা পেয়েছে আনতারা! এখনো বিশ্বাস করতে পারেনি হয়তো! না করার‌ই কথা! অনেক সাধনার ফল যে! রাতের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো, মনের মধ্যে শিতল অনুভূতিরা শিহরণ জাগিয়ে দিচ্ছে! প্রেমের সুখ বুঝি এমন‌ই হয়?

~ আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে ফারাহ, বাড়ি ফিরতে হবে!

নিয়নের কথায় ফারাহ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে র‌ইলো। ঠিক করেছিল আর দুদিন থেকে চলে যাবে, শাশুড়ির অসুস্থতার কথা শুনে বিচলিত হলো,

~ কি হয়েছে আম্মার?

~ হাঁটুর ব্যাথা নাকি বেড়েছে। বড়ভাবীর আসতে তো দেরী হবে, মেজ ভাবী একা সব কাজ পারবে না। আমাদের যেতেই হবে‌। আমাকেও কাজে ফিরতে হবে, এইবারো বেশীদিন রাখতে পারলাম না তোমাকে!

ফারাহ’র মন খারাপ হলেও কিছু বললো না। মায়ের কাছে চলে গেল, বলতে হবে। মিসেস সেলিনা রান্না ঘরে ছিলেন। দুপুরের খাবার খেতে আসবে বাড়ির পুরুষ’রা। ফারাহ মায়ের পাশে দাঁড়িয়েই বললেন,

~ মা আজকে চলে যাবো। শাশুড়ির হাঁটুর ব্যাথা বেড়েছে। ফোন দিয়েছিল!

মিসেস সেলিনা মুখ বেঁকালেন। রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,

~ যখন‌ই আহস তখন‌ই ওই মহিলার সমস্যা হয়? বিয়ের পর কয়টা দিন থাকছস ক তো?

মায়ের আচরণ ফারাহ’র ভালো লাগলো না। চোখ মুখ কুঁচকে বললো,

~ অনেকদিন থাকছি মা। তিনবারের মতো আসা হলো এই কয়েকদিনেই। বড়ভাবী বছরে একবার যেতে পারতো না, জানো?

~ হো একেবারে একমাস করে থাইকা গেছো। আমাদের আগেই খুঁজ নেওয়া দরকার আছিল। কোন ঘরে বিয়া দিল আল্লাহ’‌ই জানে।

~ ভালো ঘরেই বিয়ে দিয়েছে মা, স্বামী ভালো থাকলে আর কিছু লাগে না। কথা বাড়িও না তো, তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করো।

বিরক্তি কন্ঠে কথাগুলো বলেই বোনের ঘরের দিকে র‌ওনা হলো ফারাহ। মেয়েরা হয়তো এমনি শশুড় বাড়িতে যেমন বাবার বাড়ির নিন্দে শুনতে পারে না তেমনি বাবা’র বাড়িতেও শশুড় বাড়ির নিন্দে শুনতে পারে না! দু’বাড়িকেই তারা আপন‌ ভাবে! আনতারা পড়ছিল, ফারাহ ধপাধপ শব্দ করে বসে বিছানায়। বোন কে দেখে ব‌ই বন্ধ করে পাশে বসে আনতারা,

~ কি হয়েছে আপায়? রেগে আছো কেন?

~ আর বলিস না তারা, আমার শাশুড়ি একটু খিটখিটে, আগের দিনের ধারণা নিয়ে থাকে, ব‌উ দের তোপের মুখে রাখে, তাই বলে আমার শাশুড়ি কিন্তু খুব খারাপ না। উনি আগে থেকে যেমন দেখে আসছে তেমনি করছে। আমার দাদি শাশুড়ি কি করতো জানিস? বিয়ের পরদিন সকালে সারা ঘর চাল ছিটিয়ে আম্মাকে একটা একটা করে খুঁটতে বলেছিল, ধুয়ে রান্না করতে হবে, ময়লা যেন না থাকে; শুকনো মরিচ একগাদা করে পাটায় বাটাতো, হাতের জ্বলন হয় না? তাহলে তার মনে আর কি ভালো ধারণা জন্মাবে?

বোনের কথায় হেসে উঠলো আনতারা। এই কয়দিনেই কেমন আপন করে নিয়েছে, শাশুড়ির মনের কথাও বুঝে ফেলেছে!

~ আচ্ছা তা বুঝলাম, তবে তুমি রেগে আছো কেন?

~ আম্মার হাঁটুর ব্যাথা বেড়েছে, তাহলে আমাকে যেতে হবে না? মা কে বলছি আর শুরু করছে বকবক!

~ রাইগো না আপায়, বড় চাচীর তো ইচ্ছে করে আরো কয়দিন রাখতে! যাই হোক চলো তেঁতুল ভর্তা খাবো!

ফারাহ’ও হেসে বোনের পিছু নেয়, কেয়া কিরণ ভোর থেকেই তাজ‌ওয়ার বাড়ি পড়ে আছে। দু বোন মিলে জমিয়ে আড্ডা দিতে দিতে তেঁতুল ভর্তা খায়। অনেকদিন পর যেন আনতারা’র কাছে সেই আগের‌ আপায় ফিরে এসেছে। খাওয়ার একপর্যায়ে আনতারা বললো,

~ কয়েকদিন পর তো চলে যাচ্ছি আপায়, যাওয়ার আগে আসবে তো?

ফারাহ দৃষ্টি ঘুরায় আনতারা’র দিকে। বলে উঠে,

~ অবশ্যই আসবো। কোনো ভাবে যদি না আসতে পারি, তুই চলে যাবি কেয়া কিরণ কে নিয়ে।

ওই বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে আনতারা’র নেই, তবে আপায় কে বুঝতে দিলো না। মুচকি হেসে বললো,

~ আমি পারবো তো আপায় ছোট চাচীর ভরসার প্রতিদান দিতে?

~ অবশ্য‌ই পারবি! শুচিস্মিতা’রা হারে না, হারতে পারে না! তুই তোর নিজের জন্য স্বপ্নের পথে অগ্রসর হবি, তোকে দেখিয়ে দিতে হবে শুচিস্মিতা চাইলে সব পারে!

গভীর রাত! গ্রামে সময় এগারোটা মানে গভীর রাত‌ই! ধীরে ধীরে পা ফেলে তালুকদার বাড়ির গেইট পেরোয় আনতারা‌। প্রথম দিনের মতো ভয় না করলেও ভয় যে একেবারেই হচ্ছে না‌ তেমন না। কারোর চোখে ধরা পড়ার ভয় ঠিক‌ই হচ্ছে, কি কেলেঙ্কারি‌ই না হবে! শিউলি তলায় দাঁড়িয়ে আছে রাশিদ, আনতারা কে দেখেই ঘাসের উপর বসে পড়ে। বসার ইশারা করতেই আনতারা নিঃশব্দে এদিক ওদিক দেখে বসে। রাশিদ হাসে, মেয়েটা কেমন‌ তার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে!

~ শুচিস্মিতা দেখছি অন্যরূপে! আমার মরণ আজ সত্যি সত্যিই হয়ে গেল!

লজ্জা পায় আনতারা, এভাবে সরাসরি বলার কি আছে? বাগান থেকে গোলাপ, বকুলফুলের সুবাস ভেসে আসছে। মনমাতানো এক পরিবেশ। রাশিদ এইবার নিষিদ্ধ এক আবদার করে বসে,

~ আমার হাত টা ধরবে একটু?

পায়ের তলা শিরশির করে উঠে আনতারা’র। মাথা নত করে কাঁপা কাঁপা হাতটা এগিয়ে দেয়, খপ করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নেয় রাশিদ। আনতারা এবার রাশিদের মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে, কী উজ্জ্বল লাগছে মুখটা এখন। যেন পৃথিবীর সবথেকে সুখী ব্যক্তি সে। আনতারা’র চোখ মুখ ও উজ্জ্বল হয়ে উঠে। তাকে পেয়ে কেউ এত সুখী! ভাবতেও আনতারা’র ভেতর টা উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। শূণ্য থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনতারা’র দিকে তাকায় রাশিদ, মাথা টা নিচু করে অপলক তাকিয়েই থাকে। মেয়েটার চোখ মুখে আজ আলাদা জ্যোতি খেলা করছে, যদিও বাগান থেকে আসা লাইটের আলোয় তেমন টা দেখা যাচ্ছে না, তবে যা দেখা যাচ্ছে যথেষ্ট একজন পাগল প্রেমিকের তৃষ্ণা মেটাতে!
মাঝে মাঝে মেয়েটার মুখে যখন অন্ধকার পুরানো কালিঝুলির মতো লেপ্টে থাকে, দ্বিধায় পড়ে দৃষ্টি করুণ হয়ে আসে তখন রাশিদের বুকের ভেতর কী যে এক কষ্ট হতে থাকে, মেয়েটাকে হয়তো বোঝানো সম্ভব নয়। মেয়ে টা যখন নিজেকে অন্ধকার বলে দূরে সরিয়ে রাখে, মানুষের কটু কথা শুনে মুখ ভার করে রাখে
মনে হয় রাশিদের বুকের বাম পাশে থাকা হৃদপিন্ড নামক যন্ত্রটাই কেউ অনবরত ছুরি দিয়ে আঘাত করছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়ে যায়, ছটফট করতে থাকে সে। আজ এই ছটফটানির হয়তো সমাপ্তি হলো, মেয়েটা যে তার আলোতে ধরা দিয়েছে! তার প্রেমের সুধা নিতে তৎপর হয়েছে। নড়েচড়ে উঠে আনতারা, নেত্রপল্লব কেঁপে উঠে রাশিদের। দৃষ্টি ঘুরিয়ে হুট করেই বলে উঠে,

~ কালকে চলে যাচ্ছি!

আনতারা’র উজ্জ্বল মুখটায় আঁধার নেমে আসে, তবে ধরা নেয় না। বললো,

~ ঢাকায় কোথায়?

~ জানিনা!

আনতারা বুঝলো রাশিদ তাকে বলতে ইচ্ছুক নয়! চুপ মেরে গেল! রাশিদ প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,

~ তোমাকে না দেখার দুঃখটা লুকাবো কোথায় শুচিস্মিতা?

আনতারা’র বলতে ইচ্ছে করে, ‘আমাকেও নিয়ে যান না আপনার সাথে। লুকিয়ে রাখুন না বুকের ভেতর।‌ বাইরের পৃথিবী থেকে আড়াল করে রাখুন না। সবকিছু ছেড়ে দিবো, স্বপ্ন গুলো জলাঞ্জলি দিয়ে দিবো, শুধু আপনার জন্য!’
বলতে পারে না আনতারা। কোথায় যেন একটা বাঁধা পায়, গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। আনতারা’র নিশ্চুপতা পূর্বে ব্যাথা দিলেও আজ যেন সুখ দিচ্ছে রাশিদকে! মেয়েটা যে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আছে। তার কথা স্মরণেই মেয়েটা এমন করছে, তার উপস্থিতি মেয়েটাকে আনন্দ দিচ্ছে। এর থেকে বড় সুখ বুঝি আছে? নিজের মতো কিছু বলতে নিবে তখনই দুজন কে চমকে কেউ বলে উঠলো,

~ ওইখানে কে? কে কথা বলে?

চলবে…?

#শুচিস্মিতা -১২
Tahrim Muntahana

~ ছোট চাচি, আমি!

গলা কাঁপছে আনতারা’র। এত রাতে গেইটের বাইরে দেখলে ছোট চাচি সন্দেহ করবে না তো? ধরা পড়ার ভয়ে নয়নযুগলে জলেরা হানা দিতে চাইলেও পলক ফেলে বাঁধা দেয় সে। মিসেস কামরুন্নাহার কিছুক্ষণ আনতারা’র মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এসেছিল স্বামীর জন্য, আজ একটু বেশীই দেরী হচ্ছিল বলে চিন্তায় হাঁসফাঁস লাগছিল তার, তাই বাগান সাইড এসেছিলো হাঁটতে। এসেই কারো ফিসফিস কন্ঠ শুনে সন্দেহ হয় বিদেয় চেঁচিয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু এত রাতে আনতারা’কে বাড়ির বাইরে দেখবেন সেটা হয়তো ভাবতে পারেননি। তা চোখে মুখেই প্রকাশ পাচ্ছে। আনতারা মাথা নিচু করে নেয়। বাঁচার জন্য বলে উঠে,

~ ভালো লাগছিলো না ছোটচাচি, বাগানে এসেছিলাম। ওইপাশে কে যেন কথা বলছিলো, তাই দেখার জন্য বের হয়েছি ওমনি দেখি তুমি!

মিসেস কামরুন্নাহার হাসলেন। হাসিটা ঠিক কি রকম আনতারা বুঝতে পারলো না। গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

~ চলো ঘরে চলো?

ছোট ছোট পা ফেলে বাড়ির ভেতর আসলো আনতারা। বার বার পেছনে তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে হলেও সাধ্য র‌ইলো না। ছোট চাচি তার পেছনেই হাঁটছেন। নিজের ঘরে এসে একটু স্বস্তিতে বসলো তখনি মিসেস কামরুন্নাহার অপ্রসন্ন কন্ঠে বললেন,

~ এরকম বয়স আমিও পেরিয়ে এসেছি আনতারা! তোমার এমন অধঃপতন হলো যে আমাকে মিথ্যে বলছো!

আতকে উঠলো আনতারা, এবার আর চোখের জল বাঁধ মানলো না, নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো নিজ নিয়মে। কিছু বলতে চাইলেও গলা দিয়ে যেন কথা বের হচ্ছিল না। মিসেস কামরুন্নাহার দরজা বন্ধ করে তেড়ে আসলেন একপ্রকার,

~ বলো কে ছিলো? কার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছ? কার জন্য এত অধঃপতন?

এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো আনতারা, মিসেস কামরুন্নাহার তবুও শান্ত হলেন না।‌বরং আনতারা’র দু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন,

~ কথা বলছো না কেন? সাহস হচ্ছে না? এত রাতে বাড়ির বাইরে পা রাখার সাহস হয়েছে, আমার কাছে বলতে সাহস পাচ্ছো না? ছেলে টা কে?

আনতারা তবুও চুপ করে রয়, সে কিছুতেই চায়ছে না রাশিদের নামটা সামনে আসুক। মিসেস কামরুন্নাহার এবার রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় আনতারা’র গালে। সাথে গড়িয়ে পড়ে তপ্ত নোনা জল। আনতারা গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ছোট চাচির দিকে‌। তাকে মারলো? মিসেস কামরুন্নাহার চোখের পানি মুছে বললেন,

~ যার জন্য এত পরিশ্রম, যার জন্য এই বয়সে চাকরি করছি, যার স্বপ্ন কে নিজের বলে দেখেছি সেই তো এখন অন্যদিকে মন দিয়ে বসে আছে‌। এই দিন দেখার জন্য বেঁচে ছিলাম? কি করে পারলে? আমার ই ভুল হয়েছে, অপাত্রে নিজের শ্রম ঢেলে যাচ্ছিলাম।

মিসেস কামরুন্নাহার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিতেই আনতারা তার পা জাপটে ধরে। মেয়েটা কান্নার ফলে কথায় বলতে পারছে না,

~ ছোটচাচি আমি ভুল করেছি, আর এমন হবে না। আমি তোমাকে না বুঝেই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। তোমার পরিশ্রম আমি বিফলে যেতে দিবো না। আমি প্রমিস করছি তোমার শ্রমের মূল্য ঠিক দিবো। প্লিজ ক্ষমা করে দাও, আমি আর ওসবে আগাবো না। তোমার পায়ে পড়ছি ছোটচাচি আমাকে অবিশ্বাস করো না।

মিসেস কামরুন্নাহার কোনো কথাই বলেন না, দাঁড়িয়ে থাকেন। আনতারা’ও পা ছাড়ে না। অতিবাহিত হয়ে যায় কয়েক মিনিট, পুরো ঘরে কান্না আর নাক টানা’র শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ‌ই ভেসে আসে না। মিসেস কামরুন্নাহার নিজের রাগ কে সংযত করেন, গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠেন,

~ আমি তোমাকে আর জিজ্ঞেস করবো না ছেলেটা কে। কিন্তু একটা কথা বলে রাখছি, এরপর কখনো এমন কিছু দেখলে আমাকে চিরতরে হারাবে তুমি। তোমার আবেগের বয়স ঠিক পেরিয়ে যায়নি। কি দেখেছো দুনিয়া? কয়টা ছেলেকে দেখেছো? যে গাঁয়ের রং নিয়ে সবাই এত তিরস্কার করে, সেই রং নিয়ে বিয়ের আগ পর্যন্ত‌ই যাওয়া যায়, বিয়ে পর্যন্ত না। যদি বিয়ের ইচ্ছেই থাকতো এরকম রাত বিরাতে লুকিয়ে দেখা করতো না। আমি না থেকে যদি অন্য কেউ থাকতো? বড়ভাবী, ছোট ভাই, বড় ভাই! কি করতে আনতারা? কোথায় মুখ লুকাতে? তারা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতো আমার ভুল, মেয়েকে ঠিক মতো মানুষ করতে পারি নি! আমার গাফিলতির জন্য মেয়ে এত রাতে বাড়ির বাইরে পা রাখতে পেরেছে তাও একটা ছেলের জন্য। কোথায় থাকতো আমার মুখ? তুমি একবারো ভাবলে না আনতারা। গ্রামের কেউ দেখলে কি হতো? পুরো দু তিন গ্রাম থ‌ইথ‌ই হয়ে যেত। তালুকদার বাড়ির মেয়ে ছেলের সাথে ধরা পড়েছে। কি মিনিং বের‌ করতো লোকে? ছি ছি করতো না? দাম থাকতো কোথাও? ফারাহ’র শশুড় বাড়ি খবর যেত না? তাদের সামনে কোন মুখ নিয়ে উত্তর দিতাম? তারা বলতো না এই মেয়ের জন্য তাদের ছেলেকে রিজেক্ট করেছি? বলতো না ভালো হয়েছে বিয়ের‌ কথা না এগিয়ে? ফারাহ’র মান থাকতো? তোমার ছোট বোনের কি হতো? সবাই বলতো না বড় টা এমন মানে ছোটটাও এমন হবে? ছেলের‌ চরিত্রে দাগ কম‌ই লাগতো, সবাই তখন বলতো মেয়ে না চাইলে ছেলে যেতে পারতো? জানো‌ না, যুগ আপডেট হলেও যুগের মানুষের ধ্যান ধারণা সেই প্রাচীনের মতোই আছে, মেয়ের দোষ টাই তারা ধরতো। কি করতে তখন? আত্মহত্যা করতে? তারপর? তুমি তো বেঁচে যেতে তবে আমরা? আমাদের ও মরতে হতো। নাম ডুবাতে না চাইলে এখানেই সমাপ্তি টানো, পড়ালেখায় মন দাও। নাহলে সত্যিই আমাকে মরতে হবে!

হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে আসতেই মিসেস কামরুন্নাহার বেরিয়ে যায়। আনতারা স্তব্দ হয়ে সেভাবেই বসে রয়। প্রেমে পড়ে সে সত্যিই সমাজ ভুলে গিয়েছিল, পরিবারের কথা ভুলে গিয়েছিল। একটুর জন্য তো নিজের স্বপ্নটাও জলাঞ্জলি দিতে চেয়েছিল। সত্যিই তার অধঃপতন হয়েছে, নাহলে আজ এই পরিস্থিতি তে পড়তে হতো? মুখে হাত চেপে কাঁদে আনতারা। একটু নয়, অনেকটা সময় কাঁদে। ফ্লোরেই শুয়ে রাশিদের কথা ভাবে। বুক ধুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যায়, কষ্টগুলো বাঁধাহীন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে। মানুষ টার চোখে যে খুশি দেখেছিল, আবার সেই খুশি কেড়ে নিলো সে। ভালো থাকতে দিলো না! যে মানুষটা তাকে ঘিরে বেঁচে আছে, সেই মানুষটার প্রতিটা ক্ষণের কষ্টের মূল্য সে কষ্ট দিয়েই দিলো। সে সত্যিই এরকম ভালোবাসা ডিজার্ভ করেনা। তার মতো শুচিস্মিতা’রা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নয়! চোখ নিভু নিভু হয়ে আসে, কার্ণিশ ঘেঁষে আবারো জল গড়িয়ে পড়ে! তবুও মুখে তাচ্ছিল্য হাসি ফুটিয়ে রাখে আনতারা,

~ আমি শুচিস্মিতা নয়, আমি আঁধারিয়া, অন্ধকার, আমার জীবন‌ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা। আপনি নামক আলো, আমার জীবনে এসে অন্ধকার দূর করতে পারবে না রাশিদ ভাই।‌ বরং নিজেই অন্ধকারে ডুবে যাবেন। তার থেকে ভালো দেহের দুরত্ব! মন টা তো কাছাকাছিই!

নিজের ঘরে পাইচারি করছে রাশিদ। রাজ্যের অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরেছে। মিসেস কামরুন্নাহারের উপস্থিতিতে সে শিউলি তলায় ই লুকিয়ে ছিলো দেয়াল ঘেঁষে। দেখেছে কিনা বুঝতে পারছে না! ভয় সেজন্য‌ই বেশী হচ্ছে। এত রাতে ফোন দিতেও সাহস হচ্ছে না। কি করবে সে মাথায় ঠেকছে না কিছু! এবার সে সত্যি মরে যাবে, সুখে নয় দুঃখে! এতদিন অপরূপার মনের খবর জানতো না, আফসোস এদিক হতো না। কিন্তু এখন! এখন তো সে তার শুচিস্মিতার মনের খবর জানে, কিভাবে দূরে থাকবে? কোনো অঘটন ঘটে গেলে কিভাবে সামাল দিবে? এই এতটুকু বিরহ যে এখন তার সহ্য হচ্ছে না! কাঁপা হাতে ফোন তুলে নিয়ে ভাবতে বসলো ফোন দিবে কি না! শেষমেষ নিজের সাথে না পেরে ডায়াল করেই দিলো! দুরুদুরু বুকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে র‌ইলো ফোনের স্কিনে, রিং বেজে কেটে গেল! আচমকায় বুকের ভেতর হারানোর অসহনীয় ব্যাথা টের পেল রাশিদ। হার্টের রোগীর মতো ছটফট করতে লাগলো। আবার ফোন লাগালো, এবার‌ও সেই এক‌ই ঘটনা! এত তাড়াতাড়ি ঘুমানোর মেয়ে আনতারা নয়, এমন ঘটানার পর তো আনতারা’র চোখে ঘুম ধরাই দিবে না! সে ভালো করেই জানে এটি। তাহলে কি তার সন্দেহ’‌ই ঠিক? প্রেম শুরুর আগেই বাঁধা এসে সামনে দাঁড়ালো, পাওয়ার আগেই হারিয়ে ফেললো? বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ে রাশিদ, হাত দিয়ে বার কয়েক বুক ঢলে। জোরে জোরে শ্বাস নেয়, হার্টের সমস্যা টা আবার দেখা দিচ্ছে মনে হয়! তৃতীয় বারের মতো ফোন দিয়ে চোখ বন্ধ করেই রাখে সে, দু’বার রিং বাজার পর‌ই রিসিভ করার শব্দ! চিকচিক করে উঠে রাশিদের চোখ, ঝটপট কানে ধরতেই অপাশ‌ থেকে ভেসে আসে,

~ রাশিদ ভাই!

এক নিমিষেই বুকের ব্যাথা কোথায় গিয়ে পালালো টের পেল না রাশিদ। মনে হলো হৃদপিন্ড টা এবার ঠিক জায়গায় বসেছে, ছুটোছুটি করছিল বলেই তো এত ব্যাথা! শান্ত স্বরে বললো,

~ তুমি আমার বুকের বাম পাশে থাকা হৃদপিন্ড নামক যন্ত্রের একমাত্র অসহনীয় রোগ শুচিস্মিতা! যার প্রতিষেধক ও তোমাতেই!

এতক্ষণের উপচে পড়া কান্নার বাঁধ বুঝি ভেঙে গেল। ছুটে গেল ওয়াশরুমে। হাউমাউ করে কেঁদে দিলো আনতারা। চোখ বুজে শুয়ে পড়লো রাশিদ, যা বুঝার বুঝে গেছে সে! নিবিড় মনে কান্না’র শব্দ শুনে গেল। মেয়ে টা তার জন্য কাঁদছে? তাকে হারানোর ভয়ে কাঁদছে? মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে কেন? কোথাও দুঃখ আবার কোথাও সুখ সুখ লাগছে। আনতারা নিজের কান্না থামিয়ে আবার ঘরে ফিরে এলো, বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনের মধ্যে কিছু কথা সাজিয়ে বলার আগেই ওপাশ থেকে শোনা গেল,

~ দুজন দুই ঘরে দুই পাটাতনে শুয়ে আছি, কি হতো এই দুই টা বাদ দিলে, তুমি থাকতে আমার বাহুতে!

~ চুপ করুন, রাশিদ ভাই! আমি অন্ধকার, আমাকে অন্ধকারেই মানেই। আপনাকে অন্ধকারে মানায় না। রাশিদ তাজ‌ওয়ারের জীবনে আনতারা’র কোনো ঠাই নেই!

~ রাশিদের জীবনে তো ঠাই আছে! তাজ‌ওয়ার নাহয় ছেড়ে দিলাম!

রাশিদের সহজ স্বীকারোক্তি আনতারা’কে আরো ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। মানুষ টা তার জন্য নিজ পরিবার ছাড়তে চায়ছে! নেত্রপল্লবে ভেসে উঠে সুন্দর এক ছোট্ট সংসার! যেই সংসারের একমাত্র অধিকারীনী সে, সংসারের কর্তা তার নিজের যার মনকুঠিরে তার বসবাস! সুখে ভাসতে থাকে, হুট করেই আবার নেত্রপল্লবে ভেসে উঠে মিসেস কামরুন্নাহারের মুখশ্রী। কানে বাজতে থাকে কথা গুলো। জোরে জোরে শ্বাস নেয় আনতারা। সাহস জুগিয়ে বলে উঠে,

~ আজ থেকে আমাকে ভালোবাসা ছেড়ে দিন রাশিদ ভাই, ঘৃণা করবেন। যতটা ভালোবাসেন তার থেকে হাজার গুণ ঘৃণা করবেন। আমার মতো মেয়ে রা ভালোবাসার যোগ্য নয়, তাদের শুধু তুচ্ছ তাচ্ছিল্য‌ই প্রাপ্য!

রাশিদ হাসলো, প্রাণহীন হাসি। আঁধারিয়া’রা আসলেই ঘৃণা পছন্দ করে! তবে সে যে ঘৃণা করতে পারবে না। ভালোবেসে একটু একটু করে মরে যাওয়াও যেন সুখ। বললো,

~ তুমি নিজেকে তুচ্ছ ভাবে
আমি ভাবি তুষ্ট!
তুমি নিজেকে অন্ধকার ভাবো
আমি ভাবি আলো!
তুমি নিজেকে কালো ভাবো
আমি ভাবি শুচিস্মিতা!
যার একটু খানি হাসিতে ঘায়েল হয়েছি বহুবার, মরেছি শতবার!
কিন্তু আফসোস এই হাসিটা ফের দেখার জন্য হয়তো আমাকে আমৃত্য অপেক্ষা করতে হবে! তবে ক্ষতি নেই!

সকাল ঠিক‌ই হলো, তবে অন্যদিনের মতো আজকের সকাল টা নয়, ভিন্ন। প্রকৃতির রূপ আজ আনতারা’কে ডাকছে না। অনুভূতি হীন জড়বস্তু’র মতো ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হলো। ঘুমিয়েছে বললেও ভুল হবে। শেষ রাতের দিকে চোখ টা একটু লেগে এসেছিল এই যা! ফ্রেশ হয়ে বাইরে গিয়ে দেখলো রান্না ঘরে মিসেস কামরুন্নাহার একাই কাজ করছেন। আনতারা গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। মিসেস কামরুন্নাহার না দেখার ভান করেই কাজ করতে লাগলেন। আনতারা বুঝলো তাকে এড়িয়ে চলছে। বললো,

~ আমাকে এক কাপ চা দিবে ছোটচাচি।

মিসেস কামরুন্নাহার দিলো, তবে টু শব্দ পর্যন্ত করলো না। অভিমানী আনতারা’র অভিমান যেন আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেল। চোখ ভরে আসতে চাইলো, ঠিক তখনি রান্না ঘরে ঢুকলো কেয়া। কোনো দিক না তাকিয়েই মা কে জড়িয়ে ধরলো, এসেছিল আবদার করতে অথচ সে তো জানেই না তার মায়ের মন মানসিকতা ঠিক নেই। মিসেস কামরুন্নাহার ধমকে বললেন,

~ রান্না করছি দেখতে পারছো না? আদিক্ষেতা দেখাতে আসবে না। এত সকালে ঘরের বাইরে কি? পড়াশোনা সব লাটে উঠিয়েছ? পড়লে ভালো করে পড়ো, নাহলে বলো বিয়ের ব্যবস্থা করছি। মাথার ঘাম পায়ে ঠেলে আমরা টাকা উপার্জন করছি এমনি এমনি? অযহত টাকা ঢালার জন্য? যদি এই পরিশ্রমের মূল্য না দিতে পারো দরকার নেই এমন পড়াশোনার।

কেয়া কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে চলে যায়, এমন ব্যবহার মায়ের থেকে আশা করা যায় না। সকাল সকাল মনটাও ভেঙে যায় তার। আনতারা ঠিক বুঝলো কথাগুলো কেয়ার সাথে তাকেও বলা হয়েছে। ভেজা নয়নে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো সে! তখনি শোনা গেল শোরগোলের আ‌ওয়াজ। মিসেস মমতা’র উল্লাসিত কন্ঠ। নিজের ঘরে ঢুকেই আনতারা পর্দার আড়াল থেকে বাইরে নজর দেয়। মানুষ টা চলে যাচ্ছে! অপলক তাকিয়ে রয় মুখপানে। রাশিদ তার মায়ের কথা‌ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। আনতারা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ঘরের ভেতর এসে বসে পড়ে। ঠিক তখনি নড়ে উঠা পর্দায় চোখ দেয় রাশিদ, হাসে! অপরূপা তাহলে তার যাওয়ায় পুড়ছে! সময় হতেই অটো তে উঠে বসে সে, চলতে শুরু করে অটো। তালুকদার, তাজ‌ওয়ার দুটো বাড়িই একপলক করে দেখে নেয়! দু বাড়িতেই তার আপনজন রয়েছে, যাদের কে ছেড়ে সে দূরে চলে যাচ্ছে। নির্মল গ্রামের প্রকৃতি ছেড়ে শহরের ভিড়ভাট্টায় হারাতে যাচ্ছে সে‌। তবে হৃদয় টা যে এখানেই রেখে গেল, তার শুচিস্মিতার কাছে! গ্রামের মোড়ে খানিকক্ষণ দাঁড়ায় রাশিদ, খুব মিস করবে আড্ডা গুলো। ছেলেপেলে গুলোও তাকে বিদায় দিতে এসেছে। আবার চেপে বসে অটোতে‌। গ্রামের শেষ মাথায় গিয়ে মাথা বের করে আরেকবার গ্রাম টাকে দেখে নেয়। দু বছর আগেও সে শহরে থেকেছে, এতটা মায়া টের পায় নি এই গ্রামের জন্য, তবে আজ মনে হচ্ছে গ্রামটা তার অস্তিত্বের সাথে মিশে গেছে। বিড়বিড় করে বলে উঠে,

~ আবার দেখা হবে কোনো এক কোলাহলপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশনের। আবার দেখা হবে কোলাহলপূর্ণ কোনো বাস স্টেশনে। আবার দেখা হবেই, আমি অপেক্ষা করবো শুচিস্মিতা! হয়তো দীর্ঘক্ষণ!

~ আম্মা, মেজ ভাবী কে বলেন রান্না ঘরে যেতে। এখানে অযহত বসে থেকে লাভ নেই!

ফারাহ’র কথার রিনু মুখ বেঁকালো। মিসেস নাজমা কিছু বললেন না আগেই। রিনু বললো,

~ অযহত ব‌ইসা আছি মানে? শুনো ফারাহ, আমারে কাজ শিখাইতে আসবা না‌। বললেই হ‌ইতো রান্না ঘরে যেতে, উল্টাপাল্টা কথা বলবা না।

~ কাজের সময় এলেই তো আপনার আম্মার কথা মনে পড়ে মেজ ভাবী, তাই আমাকেও বলতে হলো।

দুই ব‌উয়ের কথা কাটাকাটিতে বিরক্ত হলেন মিসেস নাজমা। ধমকে বললেন,

~ যাও তো, আমার ঘর থেইকা বাইর হ‌ও। মিল্লামিশা কাম করবো, তা না ক‌ইরা ঝগড়া লাগাই দিছে, এরা নাহি আমার সংসার সামলাইবো। হাঁটুর ব্যাথাডা ভালা হ‌ইক, তার‌পর তোমাগরে দেইখা লমু।

ফারাহ, রিনু দুজন‌ই মুখ বেঁকিয়ে বের‌‌ হয়ে গেল‌ ঘর থেকে‌। দুজন যেন দুই মেরুর। একজন ফাঁকি দিতে উস্তাদ, আরেকজন এসব সহ্য না করার দলে‌। মধ্যে বাড়ির বড় ব‌উ চুপচাপ নিজের কাজ করে যায়! পুরুষ রাও হ‌য়েছে একরকম, ব‌উ শাশুড়ির মধ্যে নাকি তাদের কাজ নেই! এক হিসেবে ভালোয় হয়েছে না, নাহলে হয়তো প্রতিদিন সালিশ বসতো! রিনুর রাগী মুখশ্রী দেখে পারভিন হাসলো, দুপুরের রান্না বসাবে, তরকারী কাটতে বসিয়ে দিলো রিনুকে, যত রাগ তরকারীর সাথে মিটাক, ঘরে শান্তি ফিরুক। অন্যদিকে ফারাহ এসেই অন্য কাজ করতে লাগলো, তার কাজ করতে মানা নেই, বাড়িতে প্রায় দিন রান্না করতো সে। কিন্তু তার সমস্যা অহেতুক হুকুম সে মেনে নিতে পারে না! এর জন্য‌ই হয়তো ঝগড়া লেগে যায়, তার ই বা কি করার। মুখ কি সে তালুকদার বাড়িতে রেখে আসছে, তার সংসার তার মতামত থাকবে না? তা কি করে হয়! অন্যকেউ ভুলভাল একটা বললে , সে পরিবর্তে তিনটা বলতে পারে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই নিজের কাজ শেষ করে একটু ফোন নিয়ে বসলো ফারাহ, বোনের সাথে কথা বলা প্রয়োজন! ফোন দিতেই সাথে সাথেই রিসিভ হলো, খানিক অবাক হলেও হাসিমুখে কিছু বলার আগেই কারো কান্না ভেজা কন্ঠ শুনে থেমে যায় সে,

~ আপায়, আপায় গো, আমার যে আর ভালোবাসা পাওয়া হলো না!

চলবে…?