মনোভূমির ছায়া পর্ব-২৫+২৬+২৭

0
194

মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ২৫
#মাহীরা_ফারহীন

ক্ষণে ক্ষণে সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টার কাটা ছুটে চলেছে।
সময় পানির মতো বয়ে যাচ্ছে। নিনা উদ্বিগ্ন চোখে একটু পরপর ঘড়ির দিকে মুখ বাড়াচ্ছে। দুপুরের খাবার খেয়ে জোর করে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে এ্যাভরিল। কিছুতেই উঠতে দিচ্ছে না। পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা। সকাল থেকে টানা
মুষলধারে বৃষ্টি পরেছে। অক্টোবরের মাঝামাঝিতেই যেন ডিসেম্বরের শীত পরে গিয়েছে। এ্যাভরিল বিছানায় নিনার পাশে আধশোয়া হয়ে বসে ‘দ্যা গ্রেট গেটসবাই’ পড়ছে।
নিনা অবশেষে অধৈর্য হয়ে উঠে বসে বলল,
‘এ্যাভরিল প্লিজ আমাকে যেতে দাও। যতক্ষণ না পর্যন্ত ওই মানুষটাকে আমি খুঁজে বের করছি আমার শান্তি লাগছে না।’

‘আহা নিনা!’ বলে এ্যাভরিল ওর বইটা উল্টো করে বিছানায় রাখলো। নিনার কাঁধ ধরে জোর করে শুইয়ে দিয়ে বলল,
‘তোমার জর এখনো সারেনি। এই অবস্থায় কোথাও যাওয়ার কথা ভুলে যাও। আমি তো বলেছিলাম আমাকে যেতে দাও। না তা তো তুমি দিবানা।’

একদিনেই নিনার ফরসা মুখটা জরে ভুগে আরোও ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। রাতে বাঁধা বেনিটা এখন ঢিলে হয়ে গিয়েছে।
অবশ্য শুধু জর কেই দোষারোপ করা যাবে না। গতকাল বিকেলের ঘটনার পর থেকে উদাসীনতায় ডুবে আছে। হাসছেও না, সেভাবে কথাও বলছে না। মুখের ওপরও মনের প্রভাব পরে বৈকি।
নিনা পানসে কন্ঠে বলল,
‘কিন্তু এটা বিপদজনক। তোমাকে আমি এসবের সাথে জরাতে চাই না।’

‘বাট আমাদের জানতে তো হবে। আর এটা এমন কীই বা বিপদজনক কাজ?’

‘দেখ যেই এটা করেছে সে অবশ্যই কোন প্রফেশনাল হ্যাকার কে দিয়েই করিয়েছে। অথবা এডিটিং গুলোও কোন এডিটিং সপে করিয়েছে। কিন্তু কোন হ্যাকারের কাজ হওয়াটাই বেশি সম্ভাবনাময়। কারণ আমি বা টনি কখনো যেই ম্যাসেজ গুলো দেই-ইনি সেগুলো কোথা থেকে আসল? বুঝতে পারছ কেউ কতটা ডেস্পারেট হলে এই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে?’

‘হুম কিন্তু তুমি কী করছ সেটা সম্পর্কে সেই স্ট্রেঞ্জার জানবে না আর যদি জেনেও থাকে আমার সম্পর্কে তো আর জানবে না। তাই না? আমি যদি যাই চেক করতে তাহলে স*ন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না।’

‘হুম তা ঠিক।’ ইতস্তত কন্ঠে বলল নিনা।

‘ওকে দেন। তুমি এই চিন্তা টিন্তা বাদ দাও। আমি যাচ্ছি। সালেম টাউন যেতে একটু সময় লাগবে।’
নিনাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এ্যাভরিল লাফ দিয়ে উঠে গেল। টি-শার্ট এবং পাজামা পরেছিল ও। চেঞ্জ করে একটা হলদে লঙ্গ টপ ও জিন্স পরল। চুলে একটু চিরুনি চালিয়েই ওয়ালেট নিয়ে চলে গেল। নিনা অলস ভঙ্গিতে বালিশে মাথা ঠেকালো। বিছানায় মেবাইলটা পরে ছিল। বুকের ওপর কোন ভারি পাথর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন ভারি লাগছে মনটা। কামরাটা খুব গুমোট ঠেকলো। খোলা জানালা দিয়ে ম্লান সূর্য রশ্মি ভেতরে এসে পরছে। তবে কোন বাতাসের লেশমাত্র নেই। তবে ঠান্ডাটা কমছে না তবুও। লিজার কথায় ওর কিছু যায় আসে না। খারাপ লাগার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ইভান? এটা ঠিক ইভান একবারও বলেনি যে ওকে বিশ্বাস করে না। এটাও বলেছে যে ওকে বিশ্বাস করে কিন্তু ওই প্রশ্নগুলো? ও মুখে এটা বলার পরও দিব্যি দ্বিধায় পরে আছে। ওর চোখে একটা দ্বিধা স্পষ্ট দেখেছে নিনা। তার মানে বিশ্বাস করতে চাইলেও সে পারেনি। নিনার চোখ থেকে এক ফোঁটা উষ্ণ জল বেরিয়ে শুষ্ক গালটা পুরিয়ে দিল। পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা। কিন্তু একটু পর পর নিনার গা কাঁপুনি দিয়ে উঠছে। চোখের পানিতে কখন বালিশে একটু খানি জায়গা সিক্ত হয়ে উঠল নিজেও খেয়াল করল না।

———————-

আকাশের মুখ শুকনো। ধুয়ো ধুয়ো ধূসর মেঘভেলা ভেসে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একটু আগের সূর্যের নিষ্প্রভ কিরণ গুলোও মেঘে ঢাকা পরেছে। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। নেইবারহুডের রাস্তায় কোলাহল নেই বললেই চলে। এ্যাভরিল হেঁটে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। সাইকেল বা ক্যাব নিতে পারত তবে হেঁটে যাওয়াটাই বেশি সুবিধাজনক মনে হয়েছে ওর। সালেমটাউন এখান থেকে হাঁটার দূরত্বে আধাঘন্টা হবে। হাঁটতে হাঁটতে ডাউনটাউন পার হয়ে সালেমটাউন নেইবারহুডে পৌঁছতে হবে। মনের মধ্যে বেশ গাঢ় বিচলন ও নার্ভাসনেস কাজ করছে। জানে না ওকে যেই ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সেটা কার। জানে না ওখানে গেলে কিসের সম্মুখীন হতে হবে। কিছুই জানে না ও। ক্যাম্বারল্যান্ড নদীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। অনেকটা নীচে শান্ত গতিতে বয়ে যাওয়া পানির ছোট ছোট ঢেউগুলো দেখল। রাস্তার পাশে বর্ণিল সাজে সজ্জিত দোকানপাট। কিছু দেয়াল জুড়ে মুরাল আর্ট করা। এ্যাভরিল প্রকৃতি, পরিবেশ বিলাস করতে করতে যখন সালেমটাউনে পৌঁছল তখন প্রায় চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গিয়েছে। ঠিকানা অনুযায়ী নিউ সালেম চার্চের সামনের রাস্তায় বাড়িটি। তবে নিউ চার্চ পাওয়ার আগে একটি চার্চ চোখে পরল। সালেম চার্চের সামনের রাস্তায় ঢুকতেই একটি ব্যাপটিস্ট দেখা গেল। আরেকটু সামনে এগোতেই এ্যাভরিলকে আবারও অবাক করে দিয়ে একটি অর্থোডক্স চার্চ চোখে পরল। এবার ভ্রু কুঁচকে ভাবল, ‘কী ভাই একটাই রাস্তায় আর কত চার্চ থাকে? রাস্তার নাম থার্ড এভিনিউ না হয়ে চার্চ স্ট্রিট হলে ভালো হত।’ ভেবে লম্বা শ্বাস ফেললো। ঠিক নয় নম্বর বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। বর্ণনা এবং ঠিকানা অনুযায়ী সবই তো মিলছে। বাড়িটা দুইতলা। সামনে খোলা কার পার্ক করার স্থান। যদিও সেখানে কোন গাড়ি নেই। বাড়ির পাশে বড় একটা অপরিচিত গাছ। কালচে সবুজ পাতায় ঢাকা ঘন ডালপালা। এ্যাভরিল একবার শুকনো ঢোক গিলল। বাড়ির সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, ‘আমি জানি না এখানে কে থাকে, কাজেই যেকোনো কিছু হতে পারে। আর যদি পরিচিত কাউকে পেয়েও যাই তবুও কী বলবো কেন এসেছি এখানে? অথবা একেবারে অপরিচিত একটা বাড়িতে উঁকি ঝুঁকি দেওয়াটা আরোও রিস্কি হয়ে যাবে।’ ভাবতে ভাবতে নিজের সেল ফোনটা পকেট থেকে বের করল। মি.মালিকের নম্বর ডায়েল করল। কয়েক সেকেন্ড পর উনি ফোন ধরেই বললেন,
‘তুমি পৌঁছেছ? সব ঠিক আছে?’

‘হ্যা আঙ্কেল আমি মাত্র বাড়ির সামনে পৌঁছলাম। তাই আপনাকে জানাতে ফোন করলাম।’

‘ভালো করেছ। শোন ওটা যারই বাসা হোক পনেরো মিনিটের বেশি ওখানে থাকবে না। পনেরো মিনিটের মধ্যে বের হয়ে আমাকে কল দিবা না হলে আমি ধরে নেব তোমার কোন বিপদ হয়েছে।’

‘জ্বী আঙ্কেল। আমি সেরকমটাই করব।’

‘সাবধানে থেক।’ এ্যাভরিল লাইন কেটে দিল।

সন্তর্পণে হেঁটে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আগেই মনে মনে ভেবে ফেললো দরজা খোলার পর কী বাহানা দেওয়া যায়। ‘অচেনা কেউ হলে সোজা বলে দেব আমি অন্য কাউকে খুঁজতে এসেছি এবং বাড়ি ভুল করে এখানে চলে এসেছি। শেষ!’ ভাবতে ভাবতে কলিং বেল বাজাল। প্রতিটি সেকেন্ড যাচ্ছে এবং মনে হচ্ছে যেন এই বুঝি খুললো দরজা।না জানি কে এই বাড়ির মালিক। আবারও কলিং বেল বাজাল। এবার প্রায় সাথে সাথেই দরজা খুলে গেল। একটা মোটাসোটা মেয়ে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে। চুল এলোমেলো। টান টান ছোট ছোট চোখ। দেখে মনে হচ্ছে ঘুম থেকে উঠে এসেছে। মুখে বিরক্তির রেশ। মেয়েটা কাঠখোট্টা কন্ঠে বলল,
‘ইয়েস?’

‘আমি এ্যাভরিল। আমি….’ এতটুকু বলতেই মেয়েটা ভ্রু উঁচু করল। ছোট করে বলল, ‘ওহ।’
মেয়েটা কিছু একটা ভাবল তারপর বলল, ‘ওহ তুমি কী ন্যাশভিল হাইস্কুল থেকে?’

এ্যাভরিল মাথা নাড়ল।

‘ওয়েট।’ বলেই ভেতরের দিকে মুখ ফিরিয়ে উচ্চস্বরে ডাক দিল, ‘রিন। তোর ফ্রেন্ড এসেছে!’

এ্যাভরিল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা দরজা ছেড়ে চলে গেল। তখনই হারিন এসে দাঁড়াল দরজায়। এ্যাভরিলের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আরে তুমি?’

এ্যাভরিল নিজেও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মুখে কোন রা নেই। হারিনের মুখ থেকে বিস্ময় সরে গিয়ে ধীরে ধীরে প্রশ্ন ফুটে উঠল। এ্যাভরিল নিজেকে সংযত করে বলল, ‘আমি…নোট নিতে…আই মিন নোট দরকার ছিলো কিছু।’ অনেক কষ্টে জুতসই একটা কারণ দাঁড় করালো।

‘ওহ কিসের নোট লাগবে?’

ঠান্ডা বাতাসের ঝাঁপটা যেন ওর গায়ে লাগছেই না৷ কপাল, ঘাড় গামে ভিজে চিটচিট করছে। ইতস্তত কন্ঠে বলল,
‘গত সপ্তাহে আমি মাত্র একদিন এসেছিলাম। বাকি দিনের ক্যালকুলাস নোটগুলো লাগতো।’

‘ওহ।’ বলল হারিন। হঠাৎ ওর মুখমণ্ডল নরম হলো। বলল,
‘ইশ তুমি ভেতরে এসো। ভুলেই গিয়েছিলাম।’

এ্যাভরিল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকল। হারিন করিডোর ধরে হাঁটতে শুরু করে নির্বিকার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
‘বাই দ্যা ওয়ে আমার বাসা চিনলে কিভাবে?’

এ্যাভরিল পুনরায় ঢা*ক্কা খেলো। এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবে। ভাগ্যিস হারিন এখন ওর দিকে তাকিয়ে নেই। নাহলে নির্ঘাত ওর বিচলতা ও অস্থিরতায় মাখা দৃষ্টি চোখে পরে যেত। বুকে দ্রিম দ্রিম করে ডঙ্কা বাজছে। এ্যাভরিল নিজের ইতস্তততাকে যথাসম্ভব গোপন করার চেষ্টা করে বলল,
‘আমাকে কাইলি বলেছে।’

‘কাইলি? ও কিভাবে জানে?’

‘জানি না। ওতো এই নেইবারহুডেই থাকে তাই হয়তো জানে।’

‘ওহ জানতাম না।’ বলে থামল। ওরা লিভিং রুমে গিয়ে ঢুকেছে। একপাশের জানালার পর্দা ফেলা। দেয়াল টিভিতে নেটফ্লিক্সে সুইট হোম সিরিজ চলছে। কমলা সোফার সামনে রাখা সেন্টার টেবিল। টেবিলে কোকের বড় বোতল এবং লেইস চিপসের বড় একটা প্যাকেট খোলা অবস্থায় পরে রয়েছে। হারিন ওকে লিভিং রুমে দাঁড় করিয়ে রেখে ভেতরে চলে গেল। এ্যাভরিল অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। হঠাৎ নিজের ওপর ভারি রাগ হলো। কেন ও এত ভয়ে পেয়ে গিয়েছিল। কেন এত নার্ভাস হচ্ছিল? হারিনের ওকে স*ন্দেহ হলেও বা কী? ও না জানে ও নিনার সাথে থাকে আর না জানে যে নিনা এই র*হস্যের ত*দন্ত করছে। অবশ্য সেটা জানলেও এ্যাভরিলকে কোন ভাবেই স*ন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই। এ্যাভরিল যেই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিল সেটা হারিনের পক্ষে জানাটা অসম্ভব। এ্যাভরিল লিভিং রুমের এ কোণ হতে ও কোণ পায়চারি করতে লাগলো। দাঁত দিয়ে নখ কামড়াচ্ছে এবং ভাবছে,
‘এখন ব্যাপারটা পানির মতো পরিষ্কার। হারিন টনিকে পছন্দ করত। এটা তো আমি আগে থেকেই জানতাম। একবারও মাথায় আসলো না কেন হারিনই হতে পারে এটা। কিন্তু টনি লিজাকে ভালোবাসতো। কাজেই হারিন এই বাজে খেলা খেলে ওদের মধ্যে ভুলবোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছিল। তাও আবার নিনাকেই ওর অজান্তে এসবের মধ্যে জড়িয়েছিল। এখন যদি লিজা এই কথা জানতে পারে ও আরেকবার ভে*ঙ্গে পরবে। এবং….এবং অবশেষে হয়তো ইভনেরও ভুল ভা*ঙ্গবে। কিন্তু এখন ওদের ভুল ভা*ঙ্গলেও আর কিছুই করার নেই। খুব দেরি হয়ে গেছে। খুব। টনিকে তো ফিরে পাব না আমরা।’

‘আরে তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো।’ হারিনের কথায় চমকে উঠল এ্যাভরিল। হারিনএকটা খাতা হাতে ফিরে এসেছে৷ এ্যাভরিল হালকা হেসে বলল,
‘না ঠিক আছে। আমার একটু তাড়া আছে। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আজই নাহয় নোটগুলো নিয়ে যাই।’

‘ওহ। এই নাও। এগুলো আমারই। জানতাম না তোমার লাগবে তাই আলাদা করে নোট করা নেই।’

‘সমস্যা নেই। আমি এগুলো দুই-এক দিন পর ফিরিয়ে দেব।’

‘অত চিন্তা নেই। যেকোনো দিন ফিরিয়ে দিও।’

এ্যাভরিল নোটগুলো হাতে তুলে নিয়ে এমনিই নাড়াচাড়া করে বলল,
‘হ্যা ঠিকই আছে সব। এমনিতেই উলটপালট তো হতে পারে না। নাহলে নোট দেওয়া নিয়ে স্কুলে তুমি এত ফেমাস হতা না।’

হারিন হাসল। এ্যাভরিল বলল,
‘আচ্ছা আসি তাহলে।’

‘হ্যা। তবে আবার এসো।’

‘আই হোপ সো।’

ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল হারিন। এ্যাভরিল বাড়ির বাইরে বেরিয়ে বুক ভরে লম্বা শ্বাস নিল। দ্রুত পায় বাড়ির বাউন্ডারি হতে বেরিয়ে গিয়ে দূরে সরে আসল। নিজের সেল ফোন হাতে নিয়ে মি.মালিককে ফোন করে আগে সবটা জানাল। নিনাকে বাসায় গিয়ে আস্তেধীরে সবটা খুলে বলবে।
.
.
.
.
.
দুর্বল শরীর নিয়েও দ্রুত গতিতে সিঁড়ি ভে*ঙে নিচে নামছে নিনা। এ্যাভরিল ছুটতে ছুটতে পেছনে আসছে৷ লিভিংরুমে এসে সহসা থেমে গেল ও। শরীরটা বেশ দুর্বল। মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। জর চলে যায়নি তবে এই মুহূর্তে গায়ে জর নেই বললেই চলে৷ এ্যাভরিল ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তিত কন্ঠে বলল,
‘তুমি ঠিক আছো? এত তাড়াহুড়ো করার কী আছে?’

ফাতিমা আপা গ্লাসে পানি ঢেলে সেটা নিনার দিকে এগিয়ে দিলেন। নিনা পানি পান করে গ্লাসটা টেবিলে রাখল।

‘এই অবস্থায় কোই যাচ্ছিস তোরা?’

‘তেমন কিছু না আন্টি। আপনি ওকে মানা করেন না। আজকে না গেলেও তো হয়।’ এ্যাভরিল ফাতিমা আপার দিকে তাকিয়ে বলল।

‘না আমি এখুনি যাব।’ দৃঢ় কন্ঠে বলল নিনা। বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ফামিতা আপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
‘নিনা কাল পরশু গেলেও তো হয়। কী এমন জরুরি কাজ তোর? অসুস্থ শরীর নিয়ে বাইরে গেলে আবার কোন একটা বিপদ ঘটবে।’

‘আপা তুমি বুঝবা না আমার কাজটা অনেক জরুরি। আমাকে এখন যেতেই হবে।’

ফাতিমা আপা হতাশ হলেন,
‘এ্যাভরিল তুমি ওর খেয়াল রেখো। ও আনার কথা এখন শুনবে না।’
এ্যাভরিল আলতো করে মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল।
নিনা কালো প্ল্যাটফর্ম সু পরল। এ্যাভরিল স্নিকার্স পরেই ছিল। বের হওয়ার জন্য দরজা খুলতেই দেখা গেল বাইরে অমিত দাঁড়িয়ে আছে।

‘ওয়াও আমি জানতাম না তোরা আমার জন্য গেটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিলি।’ বলল অমিত।

‘তুই এখানে কী করছিস?’ বিরক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল নিনা।

‘আমি একজন ভালো ফ্রেন্ডের দায়িত্ব পালন করতে তোকে দেখতে এসেছি। ওহ সরি তোর কাছে তো এগুলা সস্তা ইমোশনাল ব্যাপার মনে হয়।’

‘হুদাই সময় নষ্ট। আমি ঠিক আছি।’

‘তোরা কোথাও যাচ্ছিস?’ এ্যাভরিলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করল অমিত।

‘আহ, হ্যা।’ ইতস্তত করে উত্তর দিল এ্যাভরিল।

নিনা দরজার বাইরে বের হয়ে বলল,
‘আমরা এতক্ষণে অর্ধেক পথ পৌঁছেও যেতাম তুই হঠাৎ করে মাঝে চলে না আসলে।’

চলে হনহনিয়ে গ্যারাজের দিকে এগিয়ে গেল।
‘কিছু মনে করো না। ওর শরীর খারাপ বলে মেজাজও একটু খারাপ হয়ে আছে।’ মিনমিন করে বলল এ্যাভরিল

‘হায়হায়! কয়েকদিন কথা হয়নি দেখা হয়নি এর মধ্যে ওর জীবনে কী ঘটে গেছে এমন?’

‘মানে?’ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল এ্যাভরিল।

‘ওতো সবসময়ই রুড আচরণ করে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে ওর মন মেজাজ ভয়ঙ্কর রকমের খারাপ। আর রাগগুলো ঝাড়ার কাউকে পায়নি বলে আমি বালি কা বাঁকড়া হয়ে গিয়েছি। আমার ওপর দিয়ে ঢালতেসে।’

এ্যাভরিল চাপা হাসল। গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার শব্দে ওরা চমকে উঠল। অমিত দ্রুত গতিতে গ্যারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিনা গাড়িটা গ্যারাজ থেকে বের করে আনতেই অমিত ড্রাইভারস সিটের জানালায় ঝুঁকে বলল,
‘নিনা বের হও।’

‘আহ! আর ইউ কিডিং? দেখিস না আমরা কোথাও যাচ্ছি?’

‘ভাই এই জর গায়ে তুই ড্রাইভ করবি? তোর মাথা টাথা খারাপ হয়ে গেসে? তুই তো ম*রবি সাথে আমাদের সবাই মা*রবি।’

গাড়ির দরজাটা খুলে ধরল অমিত। এ্যাভরিল ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
‘হ্যা নিনা। অসুস্থ অবস্থায় ড্রাইভ করার প্রশ্নই ওঠে না। বের হও। তুমি ড্রাইভ করবা না। এটাই শেষ কথা।’ বেশ কঠোর ভাবে বলল এ্যাভরিল। নিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অগত্যা বেরিয়ে আসল। অমিত ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। নিনা এবং এ্যাভরিল পেছনের সিটে উঠে বসল। ন্যাশভিল শহরের অধিকাংশ স্থানের স্পিড লিমিট সবসময়ই পঁচিশ থেকে ত্রিশ
মাইল পার আওয়ার বেঁধে দেওয়া থাকে। অমিত গাড়ি চালাচ্ছিল সাতাস মাইল পার আওয়ারে। তারপরেও নিনা একটু পর পর ওকে খোঁ*চা দিতে থাকল আরোও দ্রুত যাওয়ার জন্য। অমিত সামনের দিকে চোখ স্থির রেখে বলল,
‘ভাগ্যিস তোকে গাড়ি চালাতে দেইনি। নাহলে এতক্ষণে স্পিডিং টিকেট খাওয়ায় বসে থাকতি।’ বলে থামল। তারপর আবার বলল,
‘জানো এ্যাভরিল একবার নিনা জোনস স্ট্রিটে আটত্রিশ মাইল পার আওয়ারে গাড়ি চালাচ্ছিল। সেবার কপসরা ওকে ধরে লিটারালি একশো বিশ ডলারের স্পিডিং টিকেট ধরিয়ে দিয়েছিল।’

‘ওহ গড! রিয়েলি?’

‘ইয়াহ। আজকাল ওকে অনেকটা শান্ত থাকতে দেখা যায়। আগে ও আরোও বেশি বেপরোয়া এবং ডেঞ্জারাস ছিলো।’
বলল অমিত।
নিনা বিরক্ত দৃষ্টিতে জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে ছিল। এবার মাথা তুলে অমিতের দিকে তাকাল। পেছন থেকে ওর মুখের একাংশই চোখে পরল। নিনা ঝাঁঝাল কন্ঠে বলল,
‘আজাইরা কথা বলা বন্ধ কর!’
তখনই ওদের গাড়ি একটা জায়গায় এসে থামল। অমিত জানালার বাইরে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘এটাই কী ওই বাড়ি?’

এ্যাভরিল বাইরে থেকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল,
‘না আরো দুটো বাড়ি সামনে।’

‘এখানে এতো চার্চ কেনো?’ জিজ্ঞেস করল নিনা।

‘কি জানি। গতকাল আমিও সেম কথাই ভাবছিলাম। অদ্ভুত।’

‘অদ্ভুত না ভূতুরে।’ বলল অমিত।

‘চার্চ আবার ভূতুরে?’ বলল এ্যাভরিল।

‘ও বলতে চাচ্ছে গথিক আরকি।’ বিরস ভাবে বলল নিনা।

‘হ্যা। অর্থোডক্স চার্চটা দেখো ফুল গথিক আর্কিটেকচার।’

দুটো বাড়ির পর অবশেষে ওদের গাড়ি হারিনের সেই ছোট্ট বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। নিনা দুর্বল শরীর নিয়েও প্রায় উড়ে উড়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। অমিত গাড়ি থেকে বেরিয়ে দরজা লাগিয়ে বলল,
‘ভাই আমরা হারিনের বাসায় এমনিতে কী করতে আসছি কেউ আমাকে বলবে?’

‘আমি একা যাব ভেতরে। তোমরা এখানে থাকবে। আর ততক্ষণে তুই চাইলে এ্যাভরিলের কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনতে পারিস।’ বলেই নিনা গটগট করে দরজার দিকে হাঁটা দিল। এ্যাভরিল গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে উৎকন্ঠিত চিত্তে বলল, ‘ওর একা যাওয়াটা কী ঠিক?’

‘চিন্তা করো না। ওর কিছুই হবে না। দেখতে পাচ্ছি ওর প্ল্যাটফর্ম শু টাও পরে এসেছে। তার মানে ও প্রস্তুত হয়েই এসেছে।’

‘মানে? কি ধরনের প্রস্তুতি?’ জিজ্ঞেস করল এ্যাভরিল।

‘মি.মালিক ওকে প্রোফেশনালি সেল্ফ ডিফেন্স ট্রেনিং দিয়েছেন। ওকে এত সহজে কাবু করা যায় না৷ আর ওর জুতার কথা যদি বলি বাপরে বাপ ওর লাথি যা ডেঞ্জারাস। একবার আমার বাম পায়ে লেগেছিল। একদম লাল হয়ে ফুলে গিয়েছিল। এখনো দাগ আছে।’

‘তোমাকে কেন লাথি দিয়েছিল ও?’

‘না ও লাথি দেয়নি। এ্যাক্সিডেন্টালি লেগে গিয়েছিল।’
এ্যাভরিল হেসে উঠল। বলল,
‘নিনাকে দেখলে বুঝা যায় না।’

‘দেখো নিনার আগে দুজন ফ্রেন্ড ছিলো। আমি আর টনি। জানি না কেন ওর মনে যা আসে, সেটা তিক্ত হোক আর না হোক জাস্ট আমার সামনে উগলে দেয়। বাট টনির সামনে এমন আচরণ করতো না ও। ওর সামনে স্বাভাবিক আচরণ করতো। টনি চলে যাওয়ার পর ভাবলাম বোধহয় এবার আমার সাথে ওমন ব্যবহার করবে। তা নয়। এখন দেখি ওমা এরই মধ্যে আরেকজন ফ্রেন্ড জুটিয়ে তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করছে আর আমি সেই আগের জায়গায়ই পরে থাকলাম।’

‘আহা দেখো এটার মানে তো এমন না যে ও তোমাকে কিছু কম গুরুত্ব দেয় বা কম কেয়ার করে৷ তুমি ওর সবচেয়ে পুরোনো ফ্রেন্ড। টনি আসার আগে তুমি একাই ছিলা। তখনও তো ও একই রকম ব্যবহার করত। এবং এটা তো আরো ভালো যে তোমার সামনে ও কোন কিছু মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে দেয় না। যা মনে আসে জাস্ট বলে দেয়। কারণ ও তোমার কাছে বলতে এবং নিজের ট্রু সেল্ফ শো করতে কর্মফোর্টেবল মনে করে।’

অমিত হালকা হেসে বলল,
‘বাই দ্যা ওয়ে ওর একটা মজার বিষয় হচ্ছে ওর ওপর রাগ করে থাকা যাবে না। যাবে না মানে যাবেই না।’

‘বুঝলাম না?’ দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল এ্যাভরিল।

‘মানে ও সবার ওপর রাগ করে থাকতে পারবে কিন্তু ওর ওপর কেউ রাগ করে থাকবে সেটা ও মানতে পারে না। ইভেন হয়তো তেমন কাছের কেউই না তারপরেও ওর অসহ্য লাগে ব্যাপারটা। তাই আমি আর কখনো রাগ করার চেষ্টা করি না। নাহলে মাথা খারাপ করে দেয়।’

এ্যাভরিল আবার হাসল। বলল, ‘ওয়াট এ ইন্টারেস্টিং গার্ল।’

ইনশাআল্লাহ চলবে।

#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ২৬
লেখনী – #মাহীরা_ফারহীন

কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছে নিনা। পেছনে কিছুটা দূর থেকে অমিত এবং এ্যাভরিলের কথোপকথনের মৃদু শব্দ ভেসে আসছে। দরজার সামনে ক্রিস্টমাস বেল ঝুলানো। হয়তোবা ক্রিস্টমাসের সময় থেকে ঝুলে থাকতে থাকতে ধূলোয় ঢেকে গিয়েছে। তখনই দরজাটা খুললো। ওপাশে পরিচিত জনকেই পাওয়া গেল। হারিনের গায়ে ধূসর রঙের পাজামা এবং বাদামি রঙের টি শার্ট যার বুকে লেখা “Sorry for partying”। কালো স্ট্রেইট চুলগুলো ঢিলা করে পোনিটেল করা। টানা টানা ফোলা চোখ ভরা বিস্ময় এবং প্রশ্ন নিয়ে নিনার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘নিনা? তুমি এখানে?’ ওর কড়া কোরিয়ান একসেন্টে জিজ্ঞেস করল হারিন।

‘হ্যা। খুব ইন্টারেস্টিং কথা বলার আছে তোমার সাথে।’ বলল নিনা। হারিন নিনার ঘারের ওপর দিয়ে পেছনে এ্যাভরিল এবং অমিতের ওপর দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার নিনার দিকে তাকাল। বলল,
‘এ্যাভরিল তো গতকালও ঘুরে গেল। আর আজ…’
নিনা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘এখানে দাঁড়িয়েই যদি সব কথা বলি সেটা বোধহয় খুব একটা ভালো দেখাবে না।’
হারিন ততক্ষণাৎ সরে দাঁড়াল। নিনা ভেতরে ঢুকে দাঁড়াল।
হারিন বাম দিকে ইশারা করতেই সেদিকে করিডর ধরে
গটগট করে হেঁটে গেল। যেই কামরায় গিয়ে করিডরটা শেষ হলো সেটা ছোটখাটো একটা লিভিং রুম। সারা ঘর অন্ধকার। পর্দা ঢাকা জানালা হতে ম্লান আলে আসছে। টিভিতে চলতে থাকা “স্ট্রেঞ্জার থিঙ্গসের” স্ক্রিন থেকে আসা আলোটাই সারা ঘর আলোকিত করে রেখেছে। হারিন এসে দরজায় দাঁড়িয়ে চোখে অজস্র প্রশ্ন নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘হ্যা বলো?’

‘নিনা আরাম করে সোফায় পয়ের ওপর পা তুলে বসে বলল, ‘Libby274।’ এতটুকু বলে থামল এবং হারিনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। হারিনের মুখে হালকা বিস্ময়ের রেশ ছড়িয়ে যেতে যেতেই সেটা বিভ্রান্তিতে রুপ নিল। এবং অবশেষে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বলল,
‘মানে?’

‘ “[email protected]” চেনা চেনা লাগছে না?’

‘মানে কী? কিসের কথা বলছো?’

‘তোমার তো ভালো করেই জানার কথা হারিন। আফটার অল এই ইমেইল একাউন্টটা দিয়েই তো তুমি কত মাস্টার প্ল্যান কার্যকর করেছো।’

‘আশ্চর্য! তুমি কিসের কথা বলছো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ হারিনকে উৎকন্ঠিত এবং হতভম্ব দেখাল।

নিনা উঠে দাঁড়াল। শান্ত কন্ঠে বলল, ‘তাই নাকি?’
বলে ধীরে ধীরে একটু এগিয়ে এসে হারিনের সামনাসামনি দাঁড়াল। এবার কন্ঠে শীতলতা টেনে বলল,
‘আমার বাবা ন্যাশভিল পু*লিশ ডিপার্টমেন্টের হেড। এবং যে বা যারাই টনির মোবাইল ইলিগ্যালি হ্যাক করেছে এবং যাদের জন্য আমাকে হ্যারেসমেন্টের শি*কার হতে হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে থা*নায় রি*পোর্ট করব। কী বলো?’

‘কী? তোমাকে হ্যারেস হতে হয়েছে? মানে কী?’ হারিনকে সত্যিই হতবুদ্ধি মনে হলো।

‘একটা কথা মনে রাখো। আমি রি*পোর্ট করলে পু*লিশের প্রফেশনালদের জন্য এই ইমেইল একাউন্টের আসল মালিককে খুঁজে বের করা কোন ব্যাপারই না। তারপর এই বে*আইনি কার্যক্রমের জন্য কী শাস্তি অপেক্ষা করছে সেটা শুনার আগে শেষ বার জিজ্ঞেস করছি। বলো আইডি টা তোমার কীনা?’ শেষ প্রশ্নটা কঠিন স্বরে করল।

হারিনের মাথা আপনাআপনি নিচু হয়ে গেল। একদম চিবুকের সাথে লেগে গিয়েছে।
‘কী হলো?’ ঝাঁঝাল কন্ঠে শুধালো নিনা।

‘হ্যা। ওটা…আ… আমারই ই-মেইল।’ মিনমিন করে উত্তরটা দিল হারিন।

নিনা আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে সোফায় বসে বলল,
‘যদিও জানি কেন করেছো এইসব তারপরও তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। শুরু কর।’

প্রথমে হারিন স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
‘আ…আমি আসলে টনিকে পছন্দ করতাম। ও সবসময় আমার কাছ থেকে নোট নিত। অনেক সময় আমরা একসাথে বসে পড়াশোনাও করেছি। সবই সুন্দর ভাবে চলছিল কিন্তু মাঝখান থেকে লিজা ঢুকে গেল আমাদের মাঝে। কেউ ওদের কথা জানতো না। আমি একদিন জেনে যাই। বাট আমি ওটা মানতে পারিনি।’ দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলে চুপ হয়ে গেল। আর কিছু বলবে না ভেবে নিনা কিছু বলতেই যাচ্ছিল তখনই হারিন আবার বলা শুরু করল,
‘আমার একজন কাজিন আছে যে হ্যাকার। তার সাহায্য নিয়ে আমিই ওই স্ক্রিনশটগুলো পাঠিয়েছিলাম লিজাকে এবং টনির ফোনও হ্যাক করিয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম না ওই কোকোনাট টাই তুমি বের হবা।’

‘তোমার কোন ধারণা আছে আমি এখন তোমার সাথে কী কী করতে পারি?’ অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হারিনের দিকে।

হারিনকে উৎকন্ঠিত দেখাল। নিনা আবারও বলল,
‘কারোও ব্যক্তিহত প্রোপার্টিতে বিনা অনুমতিতে হস্তক্ষেপ করা ইলিগ্যাল সেটা যেভাবেই হোক না কেন। এবং এর জন্য তোমাকে স্কুল থেকে সাস*পেন্ড করা হতে পারে। জানো?’

‘না প্লিজ নিনা। আমার মায়ের অলরেডি অনেক ঋণ আছে। আমার বোন কলেজ স্কিপ করেছে। তুমি প্লিজ আমার পড়াশোনা টা….নিনা ওকে মাঝখান থেকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘দুটো শর্তে।’

‘কী?’ মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করল হারিন।
নিনা স্বাভাবিকভাবেই বলল,
‘একটা বিশেষ জবানবন্দির রেকর্ডিং আমাকে দিতে হবে।’

‘কোন জবানবন্দি?’

‘ম্যাচফিক্সিং এর জবানবন্দি।’

‘তুমি কিভাবে জান….

‘জানি। জাস্ট দাও ওটা!’ ওর ঝাঁঝ ভরা কন্ঠে হারিন কেঁপে উঠল। ধীর পায়ে ভেতরে চলে গেল ভেতরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে এলো একটা পেনড্রাইভ হাতে। নিনার দিকে বারিয়ে ধরল সেটা। নিনা গম্ভীর স্বরে বলল,
‘চালিয়ে দেখাও আগে।’
হারিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর স্মার্ট টিভিটে পেন ড্রাইভটা লাগালো। রিমোট টিপে পেনড্রাইভে থাকা একটি মাত্র অডিও চালু করল। অডিও টা শোনার নিনা সন্তুষ্ট হয়ে নিজেই পেন ড্রাইভটা খুলে নিল।
হারিন বলল,
‘আর দ্বিতীয় শর্ত?’

‘এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। এটা বলো প্রথম দিকে তুমি আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকতে কেন?’

হারিন কয়েক মুহূর্তে নিশ্চুপ থেকে উত্তর দিল,
‘কারণ আমার মনে হতো আমি তোমাকে কোথাও দেখেছি। চেনা চেনা লাগতো। আসলে টনির মোবাইলটা হ্যাক করে যখন এসব করেছিলাম তখন তোমার একটা ছবি দেখেছিলাম টনির সাথে। ওই একবারই দেখা। তাও ছবি। সে অনেক আগের কথা। তাই চেনা চেনা মনে হতো বলেই তাকিয়ে থাকতাম। একটু স*ন্দেহও লাগতো তোমাকে।’

‘ওহ এই ঘটনা।’

‘আচ্ছা এবার কী….হারিনের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই নিনা শক্ত কন্ঠে বলল,
‘চলো আমার সাথে।’ শক্ত করে হারিনের বাহু আঁকড়ে ধরে নিনা বলল। দরজার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল। হারিন কোন রকমে তাল সামনে ওর পেছন পেছন এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘কোথায় যাব? হেই কিছু তো বলো।’
নিনা নিশ্চুপ রইল। দরজা খুলে বাইরে বের হতেই দেখল এ্যাভরিল এবং অমিত গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গল্পে মশগুল ওরা। নিনা বের হতেই ওর দিকে দৃষ্টি ফেরাল। হারিন বিচলিত কন্ঠে বলল,
‘তোমরা কী করছ? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? প্লিজ আমাকে থানায় নিয়ে যেও না।’

‘আরেহ কী হচ্ছে এসব?’ অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল এ্যাভরিল।

‘কেউ তোমাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছে না হারিন।’ এ্যাভরিলের প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে হারিনকে উদ্দেশ্য করে বলল নিনা।
তারপর অমিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘চল লিজার বাসায় যাওয়া যাক।’ ওরা সকলে গাড়িতে উঠে বসল। হারিনও অগত্যা মুখে কুলুপ এঁটে বসে পরল। অমিত গাড়ি স্টার্ট দিল। এরপর যতক্ষণ গাড়িতে বসে ছিলো পরিবেশ অস্বাভাবিক ভাবে গুমোট হয়ে থাকল।

—————————

ইভান পা দুটো গুটিয়ে, উইন্ডোশিলে হেলান দিয়ে অলস ভাবে বসে আছে। আকাশের দিকে দৃষ্টি স্থির। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সূর্যের সোনালী কিরণে ধূলো বালির অতি সূক্ষ্ম ক্ষুদ্র কণাগুলোও চিকচিকে জরির কণার মতো চোখে ধরা দেয়। ও বসে আছে বাড়ির দ্বিতীয় তলার ওপেন লিভিং রুমের উইন্ডোশিলে৷ এই জানালা থেকে সরাসরি বাড়ির সামনের অংশটা দেখা যায়। সামনে খোলা বাগান। ওর কালো শিভ্রেলেই গাড়ি একপাশে পার্ক করা৷ সামনের রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা। মাঝেমাঝে দু একজন ছোট ছেলেমেয়ে স্কেট বোর্ডিং করতে করতে বা খেলতে খেলতে এদিক দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। ইভান সেসব দেখেও যেন দেখতে পাচ্ছে না। ও হারিয়ে আছে নিজের ভাবনায়,
‘আমি অনেক বড় একটা গোলমাল করে ফেলেছি৷ নিনা, আহ! তাই বলে ও নিজের কোন রিলেশন নিয়ে আমার কাছে মিথ্যা বলবে না। আগে যদি নাও বলে থাকে ঠিক আছে কিন্তু যদি কিছু থেকেই থাকে তাহলে সেদিন সবকিছু যখন খুলে বললো তখনও বলতে পারতো। কিন্তু ও নিজেকে শুধু টনির বান্ধুবী বলেই সম্বোধন করেছে। আমি এতো গাধা কেন? যখন জিজ্ঞেস করল কেন এসব উল্টা পা্লটা প্রশ্ন তুলতে গেলাম। অনেক ব্যাপারই লজিক্যাল নাও হতেই পারে। কিন্তু তার মানে তো এটা নয় যে কোন একটা মানুষ মিথ্যা বলছে। কোথা থেকে এসব এলো? এসব করে কারই বা কী লাভ সেই প্রশ্ন নিশ্চয়ই নিনার মাথায়ও এসেছে। কিন্তু আমি কেন ওকে ওভাবে বলতে গেলাম এসব। এখন ওর রাগ কিভাবে ভা*ঙাবো? ওকে পাওয়াটা এতটা কঠিন কেনো? কেন ও বারবার আমার থেকে দূরে সরে যায়? উফ! ইডিয়ট একটা আমি!’ ভেবে বিরক্ত দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকাল। চোখে পরল এক বাদামি রঙা ফোর্ড গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়িটা চিনতে ওর কোন অসুবিধা হলো না। নিনার গাড়ি। কিন্তু নিনা এই সময় গাড়ি নিয়ে ওর বাড়ির সামনে হাজির হবে কেন? এই প্রশ্নটাই খেলে গেল মাথায়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল মনোযোগ সহকারে। কিন্তু কোই কেউ তো বেরোচ্ছে না গাড়ি থেকে।এবার ইভানের ভ্রু জোরা কুঞ্চিত হলো। মাথার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু নিচে নেমে দরজা খোলার প্রয়োজন বোধ করল না। গাড়িটার ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে ভাবতে লাগলো, ‘ব্যাপারটা কী? আমার বাড়ির সামনে এসে কেন দাঁড়িয়ে আছে নিনা? আর এসেছে যখন বের হচ্ছে না কেন? এমনিতে তো আমার ওপর রাগ করে থাকার কথা৷ ওকি আমার ওপর নজর রাখছে? ওয়াট দ্যা হেল! কেই বা গোটা এক গাড়ি নিয়ে বাড়ির সামনাসামনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কারো ওপর নজর রাখবে? তাহলে ঘটনাটা কী?’ ভাবতে ভাবতেই দেখল অবশেষে গাড়ির দরজাগুলো একসাথে খুলে গেল। গাড়ি থেকে একে একে নিনা, অমিত, এ্যাভরিল বেরিয়ে এলো। নিনা এবং এ্যাভরিল গাড়ির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল এবং অমিত এগিয়ে গেল দরজার দিকে। পরক্ষণেই কলিং বেল বেজে উঠল। ইভান সচকিত হয়ে সিঁড়ির গোঁড়ায় গিয়ে দাঁড়াল। জানে না কী ঘটতে চলেছে। তবুও উদ্বেগ ভরা বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে নেমে গেল। বাড়ির মূল দরজা খুলতে সামনেই অমিতের চেহারা চোখে পরল। এরপর দেখা গেল নিনা ও এ্যাভরিল কে । ইভান এমন ভাবে ভ্রু কুঁচকে তাকাল যেন মাত্র ওদের আবিষ্কার করেছে। অবাক কন্ঠে বলল,
‘তোমরা?’
নিনা সেই দূরে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই উচ্চস্বরে বলল,
‘লিজাকে প্লিজ ডেকে দিতে পারবা?’

‘লিজাকে কী দরকার?’ ইভান প্রশ্ন করল।

‘ওর সাথে আমাদের বোঝাপড়া আছে।’ বলল অমিত।
ইভান আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায় লিজার কামরার সামনে পৌঁছাল। দরজা বন্ধ। কয়েকবার কাঠের দরজায় বিকট শব্দে ঠোকা দেওয়ার পর ভেতর থেকে লিজার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
‘কি হয়েছে এরকম ধাম ধাম করে দরজা পেটাচ্ছ কেন? আজব তো!’

‘লিজা বাহিরে আয় তোর সাথে কেউ দেখা করতে এসেছে।’

‘আমি কারো সাথে দেখা করব না।’ বিরক্ত কন্ঠে বলল লিজা।

ইভান পুনরায় দরজায় বারি দিয়ে বলল,
‘নিনা দেখা করতে এসেছে তোর সাথে।’

‘ওই বীচ আমার কাছে থেকে এখন কি চায়? আমি ওর মুখ দেখতে চাই না।’

‘দেখ তুই যদি এখনই বাইরে না আসিস আমি কিন্তু চাবি দিয়ে তোর দরজা খুলতে বাধ্য হব।’

কিছুক্ষণের নীরবতা তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। ওর মুখটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি ফ্যাকাসে দেখালো। চুলগুলো এখন দুই বেনির বদলে পোনিটেল করা। যদিও তা একটু ঝুলে গিয়েছে। চোখ মুখ কিছুটা ফুলে আছে ঠিক ঘুম থেকে উঠলে যেরকমটা দেখায় সেরকম। বিরক্ত কন্ঠে বলল,
‘কী সমস্যা?’

‘চল বাইরে।’ লিজা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ইভানের চাপাচাপিতে অগত্যা বাইরে বেরিয়ে এলো লিজা। নিজে থেকে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই এ্যাভরিল গাড়ির দরজাটা খুলে দিল এবং নিনা ভেতর থেকে আরেকটি মানুষকে অনেকটা টেনেই বাইরে এনে দাঁড় করালো। লিজা ওদের দেখে দ্রুত পায় বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াল,
‘আরে এখানে কি কোন সার্কাস হচ্ছে নাকি আজব তো! তোমরা এরকম প্যারাড নিয়ে আমার বাসার সামনে হাজির হয়েছ কেন?’ শুধালো লিজা।

নিনা হারিনের দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,
‘ আমাকে যেন আরেকবার রিপিট না করতে হয়, তুমি মুখ না খুললে আমি কী কী করতে পারবো।’

হারিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ্যাভরিল পেছন থেকে ওকে গুঁতা দিতে অবশেষে কাঁপা কাঁপা গলায় মুখ খুলল,
‘আ…আমি মানে তোমাকে যেই আননোন ইমেইল একাউন্ট থেকে স্ক্রিনশট পাঠানো হয়েছিল সেটা….আম..আমার।’

লিজা, ইভান ও অমিত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সকলের চোখে প্রশ্ন।

‘তোমার মানে!?’ জিজ্ঞেস করল ইভান।

নিনা হারিনকে ঠেলা দিয়ে বলল, ‘বলো না কেন?’

‘টনি কিছু করেনি। ও নির্দোষ ছিলো। নিনাও নির্দোষ। সরি লিজা।’ এতটুকু বলে আবারও মৌনতার চাদর মুড়ি দিলো।

‘কী উল্টা পাল্টা কথা বলতেসো? টনি কিছু করেনি মানে কী?’ জিজ্ঞেস করল ইভান। লিজা কিছুই বলছে না। শুধু স্থির দাঁড়িয়ে আছে।

নিনা বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল, ‘হারিন এসব ঢং কিন্তু ভাল্লাগছে না। এতকিছু যখন করতে একবার ভাবোনি তখন বলতে এত সংকোচ কিসের?’

‘আমি একজন হ্যাকার কে দিয়ে টনির মোবাইল হ্যাক করিয়েছিলাম। ওই ম্যাসেজগুলো যেগুলোর স্ক্রিনশট তুমি পেয়েছো সেগুলো ফেক। কোকোনাট নামে সেভ করা নম্বরটা জাস্ট র‌্যানডমলি চুজ করেছিলাম। জানতামও না ওটা নিনা। আমি ইচ্ছা করেই তোমাদের মধ্যে ভুলবোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছিলাম।’

লিজা অবশেষে নিরবতা ভেঙে মুখ খুললো,
‘কেন করেছিলা এইসব?’ অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল।

‘কারণ আমি টনিকে পছন্দ করতাম। এন্ড তোমাদের একসাথে দেখতে পারতাম না।’

লিজা মূর্তির ন্যায় নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে দেখে হারিন বলল,
‘আই এম সরি লি… এতটুকু বলতে না বলতেই লিজা বহুদিনের ক্ষুধার্থ সিংহের মতো হিং*স্র ভাবে ঝাঁপিয়ে পরল হারিনের ওপর। গভীর ভাবে ত্বকে নখ বসিয়ে গলা চেপে ধরল। সাথে সাথে ইভান ও এ্যাভরিল ওকে গিয়ে ধরল কিন্তু ওর হাত ছাড়ায় কে?’

‘লিজা ছাড়ো ওকে। ও ম*রে যাবে তো!’ উত্তেজিত কন্ঠে বলল এ্যাভরিল।
দুজন মিলে লিজার হাত ছাড়াতে পারছে না এতটাই শক্তভাবে গলা চেপে ধরেছে ও। হারিনের মুখ চোখ লাল হয়ে আসছে। হাসফাস করছে। অমিত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল তারপর এসে লিজাকে ধরল। নিনা নির্বিকার চিত্তে লিজার একটি আঙ্গুল উল্টো করে চাপ দিয়ে ধরতেই লিজার হাত ঢিলে হয়ে এলো। সাথে সাথে ইভান লিজার হাত দুটো পেছনে এনে শক্ত করে ধরল৷ লিজা ঝাঁঝাল কন্ঠে বলল,
‘ইউ সান ওফে বিচ! তুমি আমার জীবনের সব নষ্টের গোড়া। তোমার কারণে সব শেষ হয়ে গিয়েছে। আমি তোমাকে ছাড়বো না!’

হারিন এখনো বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে এবং কেসে চলেছে৷
লিজা এখনো চলে চলল,
‘মানলাম তুমি টনিকে পছন্দ করতা। কিন্তু এটা কী ধরনের পছন্দ করা যেখানে তুমি ওর জীবনের খুশিটাই কেড়ে নিলা? এটাকে ভালোবাসা বলে না!।’

হারিনের গাল বেয়ে কয়েক ফোটা চোখের জ্বল গড়িয়ে পরল। ইভান বলল,
‘সিরিয়াসলি আমি ভেবেছিলাম এবার হয়তো আমাদের এতদিনের তিক্ত সম্পর্ক হয়তো ঠিক হতে পারতো অথচ তুমি মাঝখান থেকে সব নষ্ট করে দিলা। শিট!’

হারিন মাথা নত করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
লিজা নিনার দিকে ঘুরে লজ্জিত কন্ঠে বলল,
‘আই এম…সরি নিনা। আমি সত্যিই লজ্জিত পরশু দিন যা যা করেছি তার জন্য। আমি…’

‘ইটস ওকে। এমনিতেও তুমি ভুল বুঝেছিলা জাস্ট। বাদ দাও।’

এ্যাভরিল হারিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘বলো এবার আমাদের কী করা উচিৎ? তোমাকে জেলে দিব?’

‘ওয়াট! নো। নিনা আমাকে শর্ত দিয়েছিল আমি যদি এখানে এসে লিজার সামনে সব সত্যি খুলে বলি তাহলে আমার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিবে না।’

নিনা কিছুই বলল না। দূর দিগন্তে আকাশ টগবগে আগ্নেয়গিরির মতো লাল রঙে ফুঁসে উঠেছে। থালার মতো গোল সূর্য অর্ধেক ডুবে গিয়েছে। আকাশ জুড়ে ছিন্নভিন্ন রঙিন মেঘগুলো গলে অসংখ্য পাখি ফিরে যাচ্ছে নিরে। নিনা হারিন কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় হারিন মৃদুস্বরে বলল,
‘ওই কাগজ গুলো, যেগুলো তুমি ট্র্যাসবিন থেকে নিয়েছিলা। ওইগুলোই সম্ভবত ওর ডায়েরির ছেঁড়া পৃষ্ঠা ছিল।’

নিনা থমকে দাঁড়াল। হারিনের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি কীভাবে জানো?’

‘ওখান থেকে একটা পৃষ্ঠা আমি পেয়েছিলাম। বাকিগুলো পাইনি৷’

‘সেদিন ওই বাড়িতে তুমি আর অরল্যান্ডো ওই ডায়েরির ছেঁড়া পৃষ্ঠা গুলোই খুঁজছিলে?’

‘এটাও তুমি জানো?’ অবাক কন্ঠে বলল হারিন।

‘এটা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়।’

‘হ্যা..আমি ওই কারণেই গিয়েছিলাম।’

নিনার বুক ফেরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এ্যাভরিল এসে ওর পাশে দাঁড়াল। হাতটা ধরেই বলল,
‘তোমার গা তো অনেক গরম। জর বেড়েছে বোধহয়। অনেক হয়েছে এসব, বাসায় চলো এখন।’ বলে ওকে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে গেল। অমিত এগিয়ে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। ইভান এগিয়ে গিয়ে গাড়ির জানালার সামনে দাঁড়াল। এ্যাভরিলকে উদ্দেশ্য করে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
‘ওর কী জ্বর? এই জ্বর গায়ে এতক্ষণ ধরে এইসব করল?’
নিনা গাড়িতে উঠে বসেছে। এ্যাভরিল দরজা লাগিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল,
‘হ্যা ইভান। গতকাল রাত থেকে ওর জ্বর। বাট প্লিজ তুমি এখনই ওর সাথে কথা বলতে যেও না। ওর মন মেজাজ এখন ঠিক নেই। একটু নিজের মতো থাকতে দাও ওকে।’
ইভান আলতোভাবে মাথা নাড়ল। এ্যাভরিল গাড়িতে উঠে বসতেই ওরা বেরিয়ে গেল। ইভান উদাসীন চোখে কালো গাড়িটির দিকে তাকিয়ে রইল। ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে ওরা। এদিকে সূর্য ছুটি নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে আকাশ থেকে। ক্রমেই সুরমার মতো ফ্যাকাসে কালো রঙ আকাশে লেগে থাকা লাল আভাকে গ্রাস করে যাবে। হারিন দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। এখন সেও প্রস্থান করল। লিজা ওর দিকে কিছুক্ষণ অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ভাইয়া চলো। আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবা এখানে?’ ইভান ঘুরে দাঁড়াল। ওরা দুজন ভাইবোন একরাশ বিষন্নতা হৃদয়ে চাপিয়ে ধীর পায় বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রাতের অন্ধকার যেভাবে ঝুপ করে নেমে এলো সেভাবেই ওদের মন, মস্তিষ্কেও নেমে এলো গভীর রাতের ক্লেশাক্ত আঁধার।
.
.
.
.
গাড়ি থেকে নেমে এ্যাভরিল আগে আগে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়াল। চারিপাশ আঁধারে ঢেকে গিয়েছে। বড় লোহার গেটে লাগানো বাতি দুটো ঝলমলে আলো ছড়িয়ে জ্বলে রয়েছে। বাড়ির জানালা ও খোলা দরজা দিয়ে আলো ঠিকরে পরছে। নিনা গাড়ি থেকে বের হতেই অমিত ওর পাশে এসে থামল। বলল,
‘তুই আমাকে বলিসনি তো তোর আর ইভানের মধ্যে সম্পর্ক এতটা দূর এগিয়ে গিয়েছে।’

‘কীসের সম্পর্ক?’ জিজ্ঞেস করল নিনা।

‘তুই জানিস আমি কিসের কথা বলছি।’

‘ওয়েল। না কিচ্ছু আগায়নি।’ বলে হাটা দিল।

‘অস্বীকার করে…ওকে মাঝখান দিয়ে থামিয়ে বলল,
‘অস্বীকার করছি না। হ্যা অনেক কিছুই হয়েছে আমার আর ওর মধ্যে। কিন্তু ওইযে তুই বলেছিলি, নাটক করতে। তাই ছিল এসব। জাস্ট অভিনয়।’
অমিত ওর সাথে সাথে এগিয়ে যাচ্ছে।
‘আমি জানতাম না এত ভালো অভিনয় করতে পারিস তুই।’ টিটকারির সুরে বলল অমিত।

‘আরেহ কী ব্যাপার তোমরা কী বাসায় ঢুকবা না?’ দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলল এ্যাভরিল। অমিত বলল,
‘আমি আসি তাহল….
‘একদম না। চল কফি খেয়েই যাবি।’ ওর কথা কেটে দিয়ে বলল নিনা।

ইনশাআল্লাহ চলবে।

#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ২৭
#মাহীরা_ফারহীন

পরিষ্কার নীল আকাশে ছিন্নভিন্ন পেলব সাদা মেঘগুলো অজানা গন্তব্যে ভেসে চলেছে। মন ভালো করা মিষ্টি ফুরফুরে বাতাস পরশ বুলিয়ে যায় গাছপালা, ঘরবাড়ি। বাগানের গাছপালার আড়ালে বসে কোন নাম না জানা পাখি সুরেলা কণ্ঠে গান করছে। সূর্যের মিষ্টি সোনালী রোদ ছুঁয়ে যায় প্রকৃতি। বাউন্ডারি দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাপল গাছটির পাতা কমলা রঙ মেখে অধিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত হয়েছে। বাগানে সাদা ছোট টেবিল দুটো কফির কাপ রাখা। সেখানে বসে আছে অমিত ও এ্যাভরিল। এ্যাভরিল বলল,
‘না অমিত। তুমি কিসের ভিত্তিতে এইসব বলছো? এই কয়েক দিনে ইভানের সাথে যেভাবে নিনা মিশে গিয়েছে সেটা অভিনয় হতেই পারে না।’

‘সেটা তো আমারও কথা।’ বলে কফি সিপ করল। তারপর আবারও শান্ত কন্ঠে বলল,
‘কিন্তু গতকাল নিনা নিজেই আমাকে বলল যে, এতদিন যা কিছু করেছে, যা কিছু হয়েছে সেটা শুধুই নাটক ছিল। জানি না কেন এমনটা বললো। কিন্তু ও যথেষ্ট স্বাভাবিক ভাবেই কথাগুলল বললো যেন সেটাই সত্যি।’

এ্যাভরিল হতাশ দৃষ্টিতে পিঙ্গল রঙা কফির কাপটির দিকে তাকিয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। এ্যাভরিল উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘দাঁড়াও দেখে আসি।’ বলেই বাগানের খোলা দরজা দিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করল। দরজা খুলতেই দেখল ইভান দাঁড়িয়ে। বলল,
‘ওর সাথে দেখা করতে পারি?

এ্যাভরিল শান্ত ভাবে বলল,
‘ওতো ঘুমিয়েছিল। দেখি উঠেছে কিনা।’ বলেই ওকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে দরজা বন্ধ করল।

নিনা চুপচাপ বিছানায় ঘাপটি মেরে পরে আছে। কিছুক্ষণ পূর্বেই ঘুম ভেঙে গিয়েছে। একবার উঠে পুরো কামরা টহল দিয়েছে। জানালা দিয়ে দেখেছে বাগানে এ্যাভরিল ও অমিতকে বসে থাকতে। কিন্তু নিচে ওদের সাথে বসতে ইচ্ছে হয়নি। পুনরায় বিছানায় ফিরে এসেছে। ক্লিক শব্দে দরজাটা খুলে গেল। এ্যাভরিল উঁকি দিল ভেতরে। মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘জেগে আছ?’

‘উম।’ করে একটা শব্দ করে উত্তর দিল নিনা।

‘ইভান এসেছে। ওকে উপরে আসতে দিব?’

নিনা একটু নড়েচড়ে উঠল। ধীরে ধীরে উঠে বসে বলল,
‘দাও।’
ও চলে গেল।

নিচে গিয়ে ইভানকে কথাটা জানিয়েই পুনরায় এ্যাভরিল বাগানের দিকে চলে গেল। ইভান ভারাক্রান্ত মনে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। ক্রমেই একটা নিরব রাগ জায়গা করে নিচ্ছে হৃদয়ে। ভাবছে,
‘অমিত এটা কী বলছে? এতদিন নিনা যা যা করল সবই নাটক ছিলো? আর এখন? এখন কী করছে?’ ভাবতে ভাবতে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে ম্লান একটা শব্দ ভেসে আসল,
‘কাম ইন।’
ও দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। নিনা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। অতিরিক্ত ফ্যাকাসে দেখাল ওকে। চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গিয়েছে প্রায়। ইভান এগিয়ে গিয়ে বিছানার কিনারায় বসল। বলল,
‘কেমন আছো?’

‘এইতো।’

ইভান নিনার নিস্প্রভ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। নিনা নিজের হাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে। ইভান বলল,
‘ফার্স্ট অফ অল লিজা সেদিন তোমার সাথে যে দুর্ব্যবহার করল তার জন্য আমি দুঃখিত। এবং আমি যেই স্টুপিডনেস দেখিয়েছি তার জন্যও দুঃখীত।’
নিনা নিশ্চুপ রইল। এবার ইভান গাঢ় স্বরে বলল,
‘বাট নিনা, আমি অনেক কিছু বলতে চেয়েও পারছি না।’
নিনা ওর দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,
‘কী বলছ?’

‘আই ডোন্ট নো কেন বারবার আমার সাথেই এমন হয়৷ আমি কী এমন দোষ করেছিলাম বলো নিনা?’ বলে নরম দৃষ্টিতে তাকাল। নিনার ভ্রু জোড়া সূচালো হলো। ইভান বলে গেল,
‘হয় সকলে আমাকে ভুল বোঝে নয়তো ঠকায়। একটা অপবাদ আমার ওপর থেকে সরালে অথচ আরেকটা ঢাক্কা যে খেলাম। সেটার কী?’ এবার বেশ নিরাশ কন্ঠে বলল। নিনা ওর হাতে হাত রেখে বলল,
‘কী হয়েছে টা কী?’ ইভান নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। বলল,
‘নাইস প্লে। খুব ভালো অভিনেত্রী তুমি। আমাকে পাক্কা বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছিলে যে তুমি আমাকে পছন্দ করো। তোমার কী লাগতো? ইনফরমেশন? আরেহ ভাই এ্যাভরিল কে জিজ্ঞেস করলেই তো আমার থেকে ঢেড় গুন বেশি তথ্য দিতে পারত। কেন আমাকে নিয়ে এভাবে খেলা করলে? হ্যা!?’
নিনা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকল। উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
‘না ইভান। কোন একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ব্যাপারটা এমন না।’

‘তাহলে ব্যাপারটা কেমন?’ তিক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ইভান। ওর কন্ঠটাই যথেষ্ট ছিল নিনার হৃদয়ে র*ক্তক্ষরণ করার জন্য। এর পূর্বেও ওদের ঝগড়া হয়েছে। তর্কাতর্কি হয়েছে। অথচ এভাবে কখনোই কথা বলেনি ইভান। নিনার চোখ ছলছল করে উঠল। বলল,
‘দেখো আমি কখনোই তোমার সাথে কোন অভিনয় করিনি। আমি যদি অভিনয়ই করতাম তাহলে আমাদের অত তর্কাতর্কি, ঠোকাঠুকি কখনো হতোও না। আমার ফিলিংস গুলো ফেক নয়!।’

‘ওহ রিয়লি? ওয়েল তোমার কী এখনো আমার কাছ থেকে আর কিছু জানার আছে? তোমার কী জানার আছে আমাকে বলো? আমার কোন সমস্যা নেই আমি বলছি। আমার ব্রেসলেট টনির রুমে ভে*ঙে পরেছিল কেন জানতে চাও? সেটা ওইদিন আমি পরেই যাইনি। লিজা আমারটা পোরে গিয়েছিল। সেদিন আমি কোন হেমলক বা বি*ষাক্ত কিছু আনিওনি। ওর হাতে কোথা থেকে ইনফেকশন হয়েছে আমি জানি না। আমি কখনোই ওকে প্রথমে ঠকাইনি। ওর খারাপও চাইনি। আমি কখনো টনিকে বি*ট্রেই করিনি।
আমার মাথায় আসে না এর চাইতে বেশি তোমার আর কী জানার থাকতে পারে।’

‘ইভান আমি এইসব আগে থেকেই জানি। বাট স্টিল আমি তোমাকে একচুয়েলি পছন্দ করি। তার জন্য কোন কারণ….

‘নাহ। আমাকে ঠকানোর অধিকার তোমাকে দিচ্ছি না আর।’ বলেই উঠে দাঁড়াল। সোজা দরজার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। নিনা তড়িঘড়ি বিছানা থেকে নামল। বলল,
‘থাম। ইভান!’

ইভান ততক্ষণে নিচে নেমে গিয়েছে। নিনা সিঁড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এলো। এতক্ষণ হৃদয়ের বেদনা এখন খাওয়া ঢা*ক্কাটার কাছে যেন কিছুই ছিল না। নিনা ধপ করে সিঁড়িতে বসে পরল। মনে হলো কেউ হৃদয়ে ছু*রি দিয়ে আহাত করেছে। অসম্ভব ক্লেশের তমশা বোনা কালো নদে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে ও। চারিপাশের আর কোন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। চোখের কোটর গলে অনবরত নোনা জল গড়িয়ে পরছে টের পেল। মনে হলো অনেক দূর থেকে এ্যাভরিলের কন্ঠ শুনতে পেল। বোধহয় অমিতও কিছু বললো। কিছুক্ষণের মধ্যে আর কোন শব্দ, আর কোন আলো, আর কোন ভাবনা ওর মনে আলোড়ন ঘটাতে ব্যর্থ হলো।

এ্যাভরিল উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
‘কী হয়েছে ওর? ও এরকম বেহুশ হয়ে গেল কেন?’

‘ওর প্যানিক এটাক হচ্ছিল। এটা ওর ছোট বেলা থেকেই হয়।ওকে রুমে নিয়ে যেতে হবে।’ উত্তেজিত ভাবে বলল অমিত।

এ্যাভরিল মাথা নাড়ল। নিনা নিথর পরে আছে সিঁড়িতে। ওর মাথা এ্যাভরিলের কোলে। অমিত ওকে পাঁজা কোল করে তুলে নিয়ে রুমে ঢুকে বিছানায় শুইয়ে দিল। এ্যাভরিল বিছানায় উঠে বসল ওর পাশে৷ বলল,
‘কী হলো টা কী? ইভানকে দেখলাম গটগট করে বেরিয়ে যেতে। আর এদিকে সাথে সাথে ও এমন সিঁড়িতে বসে কাঁদতে শুরু করল।’

‘আমার মনে হয় ওদের কোন ঝগড়াঝাটি হয়েছে।’
বলেই বেড সাইড টেবিল থেকে গ্লাসে পানি ঢাললো। তারপর অল্প অল্প পানি হাতে নিয়ে নিনার মুখে ছিটা দিল। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া নেই৷ এ্যাভরিলের চোখে নোনা জল এসে জমল। পাশাপাশি প্রচন্ড রাগও হলো। সাথে সাথে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল করল একটা। তিনবার কল করার পর ফোনটা রিসিভ হলো। এ্যাভরিল ঝাঁঝাল কন্ঠে বলল,
‘ইউ ফা’কিং বাস্টার্ড! তোর সাহস কী করে হয় নিনাকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার? জানিস ওর কী হয়েছে! হ্যা?’

‘কীহ?!’

‘কী করেছিস টা কী তুই? কেন তুই যাওয়ার পরপরই ও এভাবে জ্ঞান হারালো?’

‘আরে…ওর কথা না শুনেই এ্যাভরিল ফোন কেটে দিল। রাগে ওর গোটা মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। অমিত বলল,
‘শান্ত হও এ্যাভরিল। এই সময় তুমি এভাবে উত্তেজিত হয়েও না। আমাদের আঙ্কেল কে ফোন দেওয়া উচিৎ।’

এ্যাভরিল বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর মি.মালিক কে কল করল। ওর কথার মাঝেই ইভানের কল এলো কয়েকবার। অমিতের ফোনেও কল এলো। তবে ওরা কেউ ধরলো। অবশেষে অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠল। এ্যাভরিল নিনার সাথেই বসে রইল। অমিত নিচে নেমে গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই ওপাশ থেকে হুরমুর করে অমিতকে ঢাক্কা দিয়ে কেউ ভেতরে ঢুকলো। অমিত বিস্মিত হয়ে তাকাল ইভানের দিকে। বলল,
‘আশ্চর্য তো! তুমি আবার ফিরে এসেছো কোন মুখে?’

‘নিনার কী হয়েছে?’ অমিতের কথায় পাত্তা না দিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ইভান।

‘সেটা তোমার উল্টা পাল্টা কাজ করার আগে ভাবা উচিৎ ছিল ইভাম।’

‘ধুরো!’ বিরক্ত কন্ঠে কথাটা বলে সিঁড়ির দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। সোজা উপরে উঠে নিনার কামরায় প্রবেশ করল। এ্যাভরিল ওকে দেখা মাত্র অগ্নি দৃষ্টিতে তাকাল,
‘এখন কেনো আবার ছুটতে ছুটতে আসলি। অলরেডি ওর এই হাল করে তোর শান্তি হয়নি? আবার মজা দেখতে আসছিস?’

‘বলছিস টা কী? আমি বুঝতে পারিনি এভাবে রিএ্যাক্ট করবে।’ নরম কন্ঠে বলল ইভান। বিছানার দিকে এগিয়ে এসে নিনার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়াল। অমিত এসে দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। এ্যাভরিল বলল,
‘কী হয়েছিলটা কী? কেন এমন করলি?’

‘তোর কী এখুনি এইসব নিয়ে কথা বলা দর….

‘হ্যা দরকার। বল।’ কঠোরভাবে বলল এ্যাভরিল।

ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছুক্ষণ মৌণ থেকে বলল,
‘নিনা সেদিন আমাকে পুরো সত্যটা বলেনি। ও এই ব্যাপারটা গোপন করে গিয়েছিল যে আমাকে পছন্দ করাটা আসলে একটা নাটক ছিল। পুরোটাই ওর এই কেস সল্ভের অংশ ছিল।’

‘কী!? এইসব কথা তুমি কোই থেকে শুনেছ?’

‘তোমার মুখ থেকেই শুনেছি।’

অমিত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বলল,
‘মানে?’

‘ওহ তখন যে বাগানে বসে আমরা কথা বলছিলাম তখন শুনেছিস?’ জিজ্ঞেস করল এ্যাভরিল।

‘হ্যা।’

‘আরেহ বলদ! নিনা যে তোর ওপর রেগে ছিল ভুলে গিয়েছিস? নিনা তো রেগে এই কথা বলতেই পারে। আর সেটা তোকে তো বলেনি, বলেছে অমিতকে। অহেতুক পুরো কথা না বুঝেই বেশি বেশি লাফালাফি!’ বিরক্ত কন্ঠে বলল এ্যাভরিল।

ইভান কিছুই বললো না। উদাসীন ভঙ্গিতে নিনার পাশে বিছানায় বসল। এরপর ঘন্টা পার হয়ে গেল। সকাল পেরিয়ে দুপুর এলো। অমিত নিচে গিয়ে বসে আছে। এ্যাভরিল একবার নিচে যাচ্ছে তো একবার উপরে আসছে। দুপুরের দিকে ফাতিমাপাও চলে এলেন আজ। মি.মালিকও এর মধ্যে একবার ঘুরে গেলেন বাড়ি থেকে। নিনাকে দেখে গিয়েছেন। এই অবস্থা এর আগেও একবার দাঁড়িয়ে ছিল। যদিও নিনা শুধু জ্ঞানই হারিয়েছে তবুও সন্ধ্যায় উনি ওনার পরিচিত ডাক্তার কে নিয়ে ফিয়ে আসবেন। একটু আগেই আবারও নিনাকে এ্যাভরিল ও ফাতিমা আপার দায়িত্বে রেখে চলে গিয়েছেন। অবশ্য ইভান ও অমিতও বাড়িতে ঠায় বসে আছে সে দায়িত্ব মাথায় নিয়ে৷ নিনার যখন জ্ঞান ফিরল, চোখ মেলেই চোখের সামনে ইভানকে আবিষ্কার করল। ইভান কামরায় থাকা সিঙ্গেল চেয়ারটা বিছানার পাশে টেনে এনেছে। সেখানে বসে একটা ম্যাগাজিন নিয়ে এমনিই চোখ বুলচ্ছিল। নিনাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে সচকিত হয়ে সোজা হয়ে বসল।
নিনা কয়েক মুহূর্ত নিরবে স্থির ইভানের দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবল,
‘আমি এখনো স্বপ্ন দেখছি? আমার ভ্রম হচ্ছে। আজব তো ইভানকে তাই বলে সত্যি সত্যিই হ্যালুসিনেট করছি?’ ভাবতে ভাবতে মাথা তুলে বেড সাইড টেবিলে রাখা পানির গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতেই ইভান তড়িঘড়ি সেটা এগিয়ে দিল। নিনা চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। কপাল কুঁচকে বলল,
‘ইভান তুমি এখানে!?’

‘তুমি এতক্ষণ আমাকে দেখো নাই?’

‘দেখেছি। কিন্তু…বলতে বলতে থেমে গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। আবারও বলল,
‘কিন্তু ভেবেছি আমার চোখের ভুল। তুমি আবার ফিরে আসবা ভাবতে পারিনি।’

‘ওহ।’ বলে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল। পানি পান করে আবারও সেটা ইভানের হাতে ধরিয়ে দিল।

কিছুক্ষণ ওরা দুজনই নিশ্চুপ রইল। জানালা দিয়ে দুপুরের কড়া সোনালী রোদ ঘরের অর্ধেক মেঝে মাখিয়ে রেখেছে। বাকি গোটা কামরা রোদের হলদে আলোয় ঝলমল করছে।
বেলা সোয়া দুইটা বাজে। নিনাই অবশেষে নিরবতা ভে*ঙে
ইতস্তত ভাবে বলল,
‘তুমি ফিরে কেনো এসেছো?’

‘তোমার শুধু এটাই জানার আছে? আর কিছু বলার নেই?’

‘আর কী বলার থাকবে?’

‘আমি যখন চলে যাচ্ছিলাম তখন তো অনেক কিছুই বলতে চাচ্ছিলা।’

নিনা অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। ইভানের দিকে চুখ তুলে তাকাল। ধীরে ধীরে শান্ত কন্ঠে বলল,
‘আমি তোমাকে আগেই বলেছি আমি যাকে আপন ভাবি তার দূরে সরে যাওয়া আমার সহ্য হয় না। আমার মনে হয় না তুমি চলে যাওয়ার পর আমার যা অবস্থা হয়েছে তা দেখার পরও তোমার মনে হতে পারে এইসবই একটা নাটক ছিল।’
বলে অন্য দিকে তাকাল।

‘না। নাটক ছিল না মনে হয় বলেই তো এখনো এখানে বসে আছি। অবশ্য ফিরে আসার কারণটা ভিন্ন ছিল।’

‘কী কারণ ছিল?’

‘আমি তোমার ওপর রেগে থাকি আর না থাকি, তোমার প্রতি
আমার অনুভুতি তো মুছে যায়নি। তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যদি শুনি আমার জন্য তোমার কিছু হয়েছে তাহলে ছুটে আসবো না?’

‘তুমি তো চলে গিয়েছিলা। এটা জানলাই বা কিভাবে?’

‘এ্যাভরিল ফোন করেছিল। জীবনে প্রথমবার ওর কাছ থেকে ঝারি খেলাম।’

নিনা নিরবে ম্লান হাসলো।
ইভান বলল,
‘তোমার এখন কেমন লাগছে?’

‘ভালোই। মাথাটা শুধু একটু ঝিমঝিম করছে।’

‘এ্যাভরিল বললো তুমি সেই সাত ঘন্টা আগে নাস্ত করেছিলা। কিছু খাওয়া দরকার। ওহ হ্যা আঙ্কেল এর মধ্যে একবার বাসা থেকে ঘুরে গিয়েছেন।’

‘ওহ ফাতিমা আপা এসেছে? আর অমিত?’

‘হ্যা উনি এসেছেন আর অমিতও এখনো এখানেই আছে।’

ইভান উঠে দাঁড়াল।

‘চলে যাচ্ছ?’ জিজ্ঞেস করল নিনা।

‘কে বললো? আমি শুধু ওদের জানাতে যাচ্ছি তোমার হুঁশ এসেছে।’
বলে দরজার দিকে গেল। বের হওয়ার পূর্বে জিজ্ঞেস করল,
‘তোমার কিছু লাগবে?’

নিনা না সূচক মাথা নাড়ল। নিনা তড়িঘড়ি করে উঠে হাত মুখ ধুয়ে এসে মাত্র বিছানায় আবার বসল তখন কামরায় একে একে এ্যাভরিল, অমিত ও ফাতিমাপা সকলকে নিয়ে ইভান প্রবেশ করল। ফাতিমা আপা এসেই পাশে বসে বললেন,
‘শরীরটা কেমন লাগছে মা?’

‘এইতো ঠিক আছি আপা।’

‘তোমার জন্য খাবার রেডি। আমি আনছি।’ বলল এ্যাভরিল।

‘আমার কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।’ কথাটা নিনার মুখ থেকে বের হওয়া মাত্র এ্যাভরিল ওর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল। বলল,
‘একদম বেশি জেদ করবা না। তোমার শরীরের প্রতি খেয়াল নেই বলেকি আমরাও চুপ করে বসে থাকবো? তোমার ইচ্ছা থাকুক না থাকুক এখন খেতে হবে। না ঔষধ কিভাবে খাবা?’

নিনা আর কিছু বলার সাহস পেল না। এ্যাভরিল কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো।

‘তুইও একটা জিনিস, হুদাই খাব না খাব না করে জেদ করিস কেন? সকালে ভালো করে নাস্তা করলে এত দুর্বল হয়ে পরতি না।’ বলল অমিত।

নিনা চোখের মণি ঘোরাল। কিছুক্ষণ ফাতিমা আপা ওর সাথে বসে রইলেন। নিচে এখনো রান্নাবান্না বাকি।
ইভান, অমিত ওদের জন্য ভালো ভালো রান্না হচ্ছে। সেই রান্নার সুস্বাদু সুবাস নিনার কামরা পর্যন্ত উড়ে এসেছে।

নিনা অমিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘তুই এখনো আছিস?’

‘হ্যা। তুই বেহুশ, এই অবস্থায় এ্যাভরিলকে তোর সাথে একা ফেলে কিভাবে যাই?’

‘আমিও এখানে ছিলাম।’ বলল ইভান।

‘হুহ তোমার কারণে ওর এই অবস্থা। তোমার না থাকলেও চলতো ।’

‘তুমি…ইভানের কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নিনা বলল,
‘ওফ প্লিজ তোমরা চুপ করো। আজাইরা তর্ক করো না।’

‘আচ্ছা আচ্ছা। বাট এটা কী অবস্থা হয়েছে তোর? মনে আছে আগামীকাল টেস্ট পরীক্ষা আর আজ তুই বিছানায় পরে আছিস।’

‘সমস্যা নেই আমার প্রস্তুতি নেওয়া আছে। কাল স্কুলে যাব..’

‘একদম না তোমার কয়েকদিন বিশ্রাম নেওয়া উচিৎ।’
জোড় গলায় বলল ইভান। নিনা হতাশ ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এখন আর জেদ করে তর্ক করতে ইচ্ছে না।
অমিত বলল,
‘জানিস যখন বেহুঁশ হয়ে পরেছিলি, তোকে দেখতে একদম ঘুমন্ত ভ্যাম্পায়ার কুইন লাগছিলো। সুন্দর কিন্তু ফ্যাকাসে, কঙ্কালের মতো দেখতে।’ নিনা হালকা হাসল। ইভান অমিতের কথায় বিরক্ত হয়ে চোখের মণি ঘোরাল। নিনা সেটা খেয়াল করে পুনরায় মুচকি হাসলো। বুঝতে পারছে, অমিত ইচ্ছা করে ইভানকে জ্বালাচ্ছে। ঠিক তখনই এ্যাভরিল কামরায় প্রবেশ করল। নিনাকে হাসতে দেখে বলল,
‘ওমা কে জানি হাসছে!’ বলতে বলতে একটা ট্রে নিয়ে এগিয়ে এলো। বেড সাইড টেবিলে ট্রে টা রাখল। গরম গরম স্যুপ এনেছে ও। টেবিলের ড্রয়ারগুলো ঘাটাঘাটি করে বলল,
‘প্যারাসিটামলের পাতা মনে হয় নেই এখানে। দাঁড়াও নিচ থেকে আনছি।’ বলে আবার বেরিয়ে গেল। ইভান বলল,
‘আমি স্যুপটা দিচ্ছি।’

‘আরেহ থাম। আমি তো এক্সি*ডেন্ট করে পঙ্গু হয়ে যায়নি। জাস্ট অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।’
তবুও ইভান স্যুপের বাটটা হাতে নিয়ে বিছানার পাশে বসল।
বলল,
‘বাট এমন তো সচরাচর হয় না।’
নিনা নিশ্চুপ রইল। অমিত বলল,
‘আচ্ছা হারিন গতকাল তোকে শেষে কী বললো?’

নিনা একটু কিছু একটা ভাবল। তারপর বলল,
‘ও বলেছিল আমি গ্রেউড বাড়ি থেকে জুসের বোতলের সঙ্গে মুড়িয়ে যে কাগজগুলো এনেছিলাম, সেগুলোই টনির ডায়েরির ছেঁ*ড়া পৃষ্ঠা।’

‘ওহ মাই গড! সিরিয়াসলি! তুই খু*নের দুই তিনদিনের মাথায়ই আসল প্রমাণ হাতে পেয়ে গিয়েছিলি?’

‘টনির ডায়েরির পৃষ্ঠা তোমার কাছে কিভাবে আসল?’ অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল ইভান।

‘আরেহ লম্বা কাহিনি। পরে বলবো।’ তারপর থেমে আবার বলল,
‘তাছাড়া আমরা তো এখনো জানি না আদৌও ওই পৃষ্ঠা গুলোয় কাজের কিছু ছিলো কিনা। কিন্তু যেহেতু ছিঁ*ড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল ওভাবে। ধরেই নেওয়া যায় হয়তো কিছু ছিল।’

‘তো ওগুলো কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল অমিত।

‘ওয়েল আমি ওগুলো এনে জাস্ট ফেলে রেখেছিলাম। আমার যতটুকু মনে আছে তার পরের দিন আমি ইনভেস্টিগেশনের চার্ট তৈরি করতে বসেছিলাম।’

‘তোমার ইনভেস্টিগেশনের চার্টও আছে।’

‘হ্যা আছে।’

‘তো ওইসবের সাথে পৃষ্ঠা গুলো তুই কে*টে ফেলেছিস?’ বলল অমিত।

‘জানি না। তখন অনেক কাগজ কাটাকাটি করেছিলাম। অবশ্য ফাতিমা আপা পরিষ্কার করার সময় কামরায় পরে থাকা কাগজ পত্র সব ফেলে দেন। আমি কালকে খুঁজা খুঁজি করেছিলাম কিন্তু একটা টু*করা ছাড়া আর কিছু পাইনি।’

‘কিসের টুকরা?’

নিনা ড্রেসিং টেবিলের দিকে ইশারা করে বলল,
‘ওটার ড্রয়ারে আছে।’ অমিত উঠে গেল। ইভান সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে নিনার দিকে এক চামচ স্যুপ তুলে ধরল।
তখনই এ্যাভরিল ফিরে এলো।
অমিত ড্রয়ার থেকে কাগজটা বের করল। কোন পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা ছেঁড়া অংশ। লেখা আছে,

‘লিজাকে দেখতে পেলাম না আর। এদিকে ও এখনো বইয়ের মধ্যেই ডুবে আছে।………গ্লাসটা রাখল।’

এতটুকুই লেখা। অমিত নিনার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ইভান জিজ্ঞেস করল,
‘কী লেখা?’
অমিত এসে কাগজটা ইভানের হাতে দিল। ইভান সেটা পড়ে ভ্রু কুঁচকালো।
নিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘হ্যা ওই দিন ওখানে আরেকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিল।’

‘কিসের কথা বলছো?’ জিজ্ঞেস করল এ্যাভরিল। ইভান কাগজটা এ্যাভরিলের দিকে এগিয়ে দিল। সেটা পড়ে জিজ্ঞেস করল,
‘এটা কী টনির হাতের লেখা না?’

‘হ্যা।’ উত্তর দিল নিনা।

‘কিন্তু আমি তো ওখানে গিয়ে টনি ছাড়া বাড়িতে আর কাউকে দেখিনি।’ বলল ইভান।

‘এমনও তো হতে পারে তুমি যাওয়ার কেউ এসেছিল।’

‘হ্যা লিজা এসেছিল।’

‘কী!? লিজা গিয়েছিল? এটা কোথা থেকে শুনেছো?’
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ইভান।

‘এমিলি আর ক্লোই সেদিন কথা বলছিল এসব নিয়ে।’

‘আমি কেনো জানি না এসব নিয়ে?’ জিজ্ঞেস করল ইভান।

‘কারণ তোমার বোন তোমাকে বলেনি।’ চোখের মণি ঘুরিয়ে বলল অমিত। নিনা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

ইনশাআল্লাহ চলবে।