#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ৫
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় আরশাদের। পাশ ফিরে দেখে ইরা পাশে নেই। আবার মেঝেতে ঘুমানোর সিনেমার ভূত মাথায় উঠেছে কিনা দেখার জন্য নিচের দিকে উঁকি দেয়, না সেখানেও নেই।
আরশাদ উঠে বসে। বাথরুমে গেলো কিনা দেখার জন্য বিছানা ছাড়তেই দেখে ইরা বারান্দায়। ঘরের সাথে লাগোয়া দক্ষিণের বারান্দাটা ভীষণ সুন্দর। গ্রিলের বাইরে থেকে সুন্দর প্রকৃতির একাংশ দেখা যায়।
আরশাদ বারান্দার দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায় বুকে হাত গুঁজে। দূর থেকে আসা স্ট্রিট লাইটের নিয়ন আলোয় মেয়েটা মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়ছে। আরশাদ ভ্রু কুঁচকে দেখে ‘Positive Philosophy’ বইটি, লেখক ওগ্যুস্ত কোঁৎ। তার শেল্ফেই ছিলো। এক সময় সমাজবিজ্ঞান, দর্শন এসবের মধ্যে মারাত্মক টান ছিলো তার। অনেক বই কিনতো। কিন্তু বিধি বাম! পড়তে হলো কিনা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো খটমটে বিষয়ে।
খুট করে বারান্দার লাইট জ্বলে ওঠে। ইরা ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। লাফ দিয়ে বারান্দায় পাতা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়।
“আপনি? আপনার ঘুম ভাঙলো কীভাবে? আমি তো খুব সাবধানেই…”
আরশাদ পাশের চেয়ারটায় যেয়ে বসে। ইরাকে ইশারা করে পাশে বসার জন্য।
ইরা ইতস্তত করে বসে। বইটা শক্ত করে ধরে রেখেছে হাতের সাথে। তার বই ধরার কারণে কি রেগে যাবে?
“সিগারেট ধরাতে পারি? যদি তোমার আপত্তি না থাকে।”
“আপত্তি থাকলেও ধরাতে পারেন।”
আরশাদ মুচকি হেসে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। আবার কি মনে করে ঢুকিয়ে রাখে পকেটেই। ইরা কিছুই বলেনা।
“এমন কঠিন বিষয়ের বই পড়ছো। অনেক গল্পের বই আছে, সেগুলো পড়তে পারো তো। মেয়েরা গল্পের বই পছন্দ করে।”
“মেয়েরা গল্পের বই পছন্দ করে তাহলে ওগুলো আপনার শেল্ফে কেনো? আপনি তো মেয়ে নন।”
আরশাদ ইরার সূক্ষ্ম মজাটা বুঝতে পেরে জোরে হেসে দেয়। নাহ, মেয়েটার দম আছে বলতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বেশ শান্ত আছে। আর কোনো মেয়ে হলে বোধহয় পারতো না।
“বইগুলো নীলুর জন্য কেনা। ও গল্পের বইয়ের পোকা। তবে ওর বাবা গল্পের বই পড়া পছন্দ করেননা। তাই ও আমাকে কিনতে বলতো। ও এখানে এসে পড়তো। আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরটা নিজের বানিয়ে রাখতো। আমার মায়ের কাছে কতোবার যে বকুনি খেয়েছে না খেয়েদেয়ে সারাদিন গল্পের বই পড়ার জন্য।”
ইরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরশাদের মুখের দিকে তাকায়। কথাটা বলার সময় আরশাদের মুখে কি হালকা যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট হয়েছে? ইরার অবাধ্য মন কি চাচ্ছে আরশাদ নীলুর নামটাও আর উচ্চারণ না করুক? নিজের উপর নিজেই মহাবিরক্ত হয় ইরা। সে কোথাকার রাজকন্যা যে তার জন্য….
“নীলুর মা মানে আমার মেজো খালা নীলু খুব ছোট থাকতেই মারা যান। এরপর থেকে নীলু বলতে গেলে আমার মায়ের কাছেই মানুষ। আমার মা ওকে নিয়ে সবসময় একটু বেশি ভাবতো। আমার স্ত্রী বানিয়ে এ বাড়িতে রেখে দিতে চাইতো। সম্ভবত নীলুর মনেও এমনটাই ছিলো।”
“আর আপনার মনে?”
আরশাদ ধারণা করেছিলো ইরা এই প্রশ্নটা করবে। মেয়েটা পাথর খেয়ে হজম করতে পারে কিন্তু কখনো কখনো কিঞ্চিৎ আবেগীও হয়ে যায় বটে। স্বল্প পরিচয়ে এটুকু বুঝতে পেরেছে আরশাদ।
“আমার মনের কথা আমি মুখে বলার থেকে তোমার বুঝে নেওয়াটা ভালো হবে মিসেস আরশাদ।”
ইরা কোমল চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। তার মন ও মস্তিষ্ক উভয়ই বলছে আরশাদ কখনো না কখনো নীলুর প্রেমে পড়েছে। এমন রূপবতী মেয়ে যে কিনা নিজেই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে কোনো পুরুষের সামনে, সেই পুরুষের সাধ্য কি দূরে থাকার?
“সেসব ছাড়ো। এখন বলো এতো বই রেখে এই খটখটে বই নিয়ে বসেছো কেনো এতো রাতে? বারান্দার আলোটাও জ্বালাওনি।”
“আলো জ্বালালে আপনার ঘুমের অসুবিধা হতো তাই। আর সমাজবিজ্ঞানকে আমার কাছে কখনোই খটখটে মনে হয়নি। বরং ভালোই লাগতো। এজন্যই সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার আগ্রহ জন্মালো উচ্চমাধ্যমিকের পর।”
আরশাদ বেশ অবাক হয়ে ইরার দিকে তাকিয়ে বললো,”তুমি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী?”
ম্লান হাসে ইরা।
“ছিলাম একসময়।”
“ছিলাম এক সময় মানে?”
“মানে চন্দ্রলাল কলেজে সমাজবিজ্ঞান নিয়ে ডিগ্রী শুরু করেছিলাম। দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার পর আমার মায়ের মনে হলো আমাকে পড়িয়ে আর কোনো লাভ নেই। এরচেয়ে বাড়ির কাজ করাই শ্রেয় আমার জন্য। কলেজ ছাড়ানো হলো, পুরোদমে নিজের বাড়ির কাজের লোক হওয়ার ট্রেনিং শুরু হলো আমার।”
আরশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”মা মানে তোমার এই সৎমা?”
ইরা মাথা নাড়ে।
“তুমি ওই মহিলাকে এখনো মা বলে ডাকছো?”
“সম্পর্কে তো সে আমার মা-ই হয়, তাইনা?”
“রাবিশ….”
দু’জনের মধ্যে নিস্তব্ধতা। কেউ কোনো কথা বলছে না। আরশাদের হুট করে মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়ার স্বভাব আছে।
“তুমি পড়াশোনা শেষ করতে চাও?”
“না।”
“না কেনো?”
“এখন আর পড়তে ইচ্ছা করে না।”
“তাহলে কি করতে ইচ্ছা করে? চলো সেইটা করি।”
ইরা বিস্তারিত চোখে আরশাদের দিকে তাকায়, আরশাদ হাই তোলে।
“কি বলছেন কি?”
“পড়তে ইচ্ছা না করলে আর কি করতে ইচ্ছা হতে পারে তাই ভাবছি। খেলতে ইচ্ছা করে? চলো খেলি।”
ইরা থতমত খেয়ে বললো,”এতো রাতে কি খেলবো?”
“তোমার যা ইচ্ছা।”
“না আমি খেলতে চাইনা।”
“যাহ বাবা! পড়তেও চাও না, খেলতেও চাওনা। তাহলে করবে কি?”
“কি আশ্চর্য! কি খেলার কথা বলছেন? কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“দাবা, ইংরেজিতে বলে চেজ। পারো?”
ইরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। না বেশিক্ষণ এখানে বসা যাবে না। এই লোক নির্ঘাৎ পাগল নাহয় বেশি সেয়ানা। কোনো সন্দেহ নেই।
“এমনিতে তুমি কি ভেবেছিলে?”
“কিছুই ভাবিনি। আপনি ঘুমাবেন না?”
“খেলবে না? দাবা…”
“না।”
“আমি শিখিয়ে দিবো।”
“প্রয়োজন নেই আমি পারি।”
“পার্টনার ছাড়া একাই?”
ইরা উঠে দাঁড়ায়। তার সামনে বসা এই অতি সুদর্শন মানবটির প্রেমে পড়ে যাচ্ছে সে, খুব বিশ্রীভাবে। যেটা সে মোটেই চাচ্ছে না এখন। যদি সত্যিই বিড়াল-কুকুরের মতো কোনোদিন বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, সেদিন আশ্রয়হীনতায় যতোটা কষ্ট পাবে, প্রেমহীনতায় তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পাবে।
“ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনাকে তো সকালে বেরোতে হয়।”
আরশাদও উঠে দাঁড়ায়। দূরের নিয়ন আলোয় মেয়েটাকে অন্যরকম রূপবতী লাগছে। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আচমকা ভ্যাপসা গরম৷ মেয়েটার নাকের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
“ঘামটা মুছে নাও। তা না হলে এই রাতে তোমারই কষ্ট হবে।”
“কি?”
“মানে ওই আর কি। আমার আবার ক্যাফেইন লাগতে পারে। তোমাকেই কফি বানিয়ে আনতে হবে। তবে হতে পারে এবার মিষ্টি সহ।”
ইরা ওড়না দিয়ে ঘাম মোছে। আরেকটু সাবধান হতে হবে। তার গন্ডি খুব শক্ত প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এই গন্ডিতে সবার প্রবেশ নিষিদ্ধ। কেউ হুট করে প্রবেশ করলে পরবর্তীতে অভ্যাস পরিবর্তন করতে যেয়ে সে ভেঙে পড়বে।
“লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি এমন নারীর রূপ দেখতো তবে নিশ্চয়ই মোনালিসার নাকের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম এঁকে দিতো।”
ইরা এবার আর বিচলিত হয়না। ঈষৎ হাসে।
“আপনাকে দেখলে বোঝা যায়না যে এতো ভালো ফ্লার্ট করতে পারেন। ফ্লার্টিং একটা আর্ট হলে আপনি খুব ভালো আর্টিস্ট হতেন।”
“বলছো?”
“বলছি।”
“যাক কিছু তো প্রশংসা পেলাম। আমি ধন্য।”
ইরা আচমকা শব্দ করে হেসে দেয়। শরীর দুলিয়ে হাসা। তার খোঁপা খুলে যায় হাসির দমকেই। আরশাদ শান্তভাবেই ঠোঁট কামড়ে তাকে দেখে। এই প্রথম মেয়েটার এমন উচ্ছল হাসি দেখলো সে। তাকে স্বাভাবিক করার জন্যই আরশাদ এতোটা খোলামেলা কথা বলছে তার সাথে। অতীত ভুলে স্বাভাবিক হয়ে যাক সে।
পরদিনের সকালটা আগের সকালের চেয়ে তুলনামূলক ভালো বলা যায়। রাবেয়া যথারীতি সকাল সকাল উঠেছে। একাই নাশতা বানিয়েছে। টেবিল গুছিয়েছে একা হাতেই। ইরা ভেবেছিলো তাকে সাহায্য করবে, কিন্তু সাহস করেনি। দরজায় জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। সত্যিই সে যেনো অদৃশ্য রাবেয়ার চোখে, রাবেয়া দেখতেই পাচ্ছে না যেনো তাকে।
“ইরা তুমি ওখানে কেনো? এদিকে এসো।”
রাশেদুলের কথায় ইরা ম্লান হাসে কিন্তু এক পা-ও এগোয় না। আশা ততক্ষণে টেবিলে এসে বসেছে, তার গায়ে কলেজের পোশাক। বাবার উপর খানিক বিরক্ত সে।
“ভাবীকে রেখে একাই বসে পড়লে? যাও তাকে নিয়ে বসো।”
“বাবা…”
“তুমি আজকাল কথার অবাধ্য হচ্ছো আশা। আমি এগুলো সহ্য করবো না।”
“তাই বলে আমি ওকে হাত ধরে টেবিলে এনে বসাবো? ওর পা নেই? ও কি খোঁড়া?”
আরশাদ ততক্ষণে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। আশার শেষ কথাটা তার কানে গেছে। ইরার ইচ্ছে করে বারান্দায় যেয়ে বসে থাকতে।
“এসো বসবে।”
“আপনারা খেয়ে নিন, আমি পরে খাবো।”
“যদি সত্যিই খোঁড়া হয়ে থাকো তাহলে অন্য ব্যবস্থা আছে।”
ইরা আঁৎকে উঠে বললো,”কি ব্যবস্থা?”
“তোমার হাতে পাঁচ সেকেন্ড সময়। এরমধ্যে আমার সাথে টেবিলে না গেলেই টের পাবে কি ব্যবস্থা।”
ইরা সচকিত হয়ে সামনের দিকে তাকায়। কেউ আবার শুনে নিলো না তো আরশাদের কথা? লোকটাকে বিশ্বাস নেই। কি করে বসবে তার নেই ঠিক। তার চেয়ে গুটি গুটি পায়ে টেবিলে এসে বসে পড়াই শ্রেয়।
“বাবা একটা কথা ভাবছিলাম।”
রাশেদুল রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”কি ব্যাপারে?”
“ইরা নাকি সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রী। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে আর পড়তে পারেনি। ওকে আমি আবার কলেজে ভর্তি করিয়ে দিতে চাই। এমনিতেও বাড়িতে সারাদিন ওর কোনো কাজ নেই। পড়াশোনা করুক, সময়টা ভালো কাটবে।”
রাবেয়া আড়চোখে তাকায় ছেলের দিকে। মুখে এক চিলতে হাসি। কেনো হাসছে বোঝা যায়না। হয়তো টিটকারির।
“না না, এসব কি বলছেন? আমি কি বলেছি আমি পড়তে চাই?”
রাশেদুল ইরার দিকে তাকিয়ে বললো,”অসুবিধা কোথায়? তোমার বয়স কম। এখনই কেনো পড়াশোনা থেকে অব্যাহতি নিতে চাও? এই বয়সটাই তো পড়াশোনার। তাছাড়া কোনো কাজের মধ্যে থাকলে মনটাও ভালো থাকবে।”
রাবেয়া চামচে শব্দ করে, বেশ জোরেই। সবাই একযোগে তাকায় তার দিকে। বাকিরা খেতে বসলেও সে বসেনি।
টেবিল ছেড়ে চলে যেতেই আরশাদ তাকে আটকায়।
“মা খেতে বসো।”
“তুমি আমাকে আদেশ দিচ্ছো?”
“অনুরোধ করছি।”
“যার তার সাথে এক টেবিলে বসে খাওয়ার অভ্যাস নেই আমার।”
ইরা উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে। মিষ্টি করে হাসে।
“আপনি বসুন না। আমি চলে যাচ্ছি। আমার খিদেও নেই।”
রাবেয়া ঘুরে তাকায় ইরার দিকে।
“প্রয়োজন নেই। আমরা কাউকে অভুক্ত রাখিনা। কোনো ভিখারি এলেও না। তুমি-ই বা থাকবে কেনো?”
ইরা কাঁদে না, মন খারাপও করেনা। এই পৃথিবীর সকল ধরণের নিষ্ঠুরতার সাথে পরিচয় আছে তার। এটুকু এমন কিছুই না।
রাশেদুল খাওয়া বন্ধ করে বসে আছে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে তার। হ্যা মেয়েটাকে তারা পছন্দ করে এ বাড়িতে আনেনি। একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে তার প্রবেশ এখানে। কিন্তু তাই বলে এতোটা অসম্মান কি তার প্রাপ্য? রাবেয়া কি এবার একটু বেশি বেশি করছে না?
আরশাদ মায়ের হাত ছেড়ে দেয়। চেয়ারে তার ল্যাপটপের ব্যাগটা পড়ে ছিলো। ক্ষিপ্রতার সাথে ছুটে যেয়ে হাত ধুয়ে ফেলে প্লেটেই। ব্যাগটা কাঁধে ওঠায়।
“মা তোমাদের ওকে পছন্দ না-ই হতে পারে, এটা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কারণ আমি নিজেও ওকে এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারিনি। তবে এটা এখন সবচেয়ে বড় সত্য যে, ও আমার স্ত্রী। সম্মান ওর প্রাপ্য। তুমি ওকে অপছন্দ করলেও, আমার স্ত্রী হিসেবে যতোটুকু সম্মান প্রয়োজন তা অন্তত করতে হবে। তা না পারলেও দয়া করে অপমানটুকু করোনা। ব্যাপারটা এমন না যে, আমি ওর হয়ে কথা বলছি। আমি আমার হয়ে কথা বলছি। কারণ আমি ওকে এ বাড়িতে এনেছি, ও স্বেচ্ছায় আসেনি। তাই ওর অপমান হলে তার সিংহভাগ দায় আমার উপরও বর্তায়।”
ঝড়ের বেগে আরশাদ বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। কষ্টে, ক্ষোভে, অভিমানে রাবেয়ার শরীর কাঁপে, বিন্দু বিন্দু পানি ফোঁটায় ফোঁটায় নামতে থাকে গাল বেয়ে। আশা তাকে জড়িয়ে ধরে ছুটে যেয়ে। ঘরে চলে যায় মা’কে নিয়ে সাথে সাথে। পরিবেশ আবারও থমথমে হয়ে যায় মুহুর্তে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই।
রাশেদুল আলতো করে হাত রাখে ইরার হাতে। ইরা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে দাঁড়ায়। তার মন চায় এ বাড়ি ছেড়ে দু’চোখ যেদিকে যায় চলে যেতে। অন্তত তার জন্য কোনো সাজানো-গোছানো পরিবার এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, এটা সে কল্পনাও করতে পারেনা।
“বসো, পাতের খাবারটুকু শেষ করো।”
“আমি খাবো না, আমার খিদে নেই।”
“খিদে থাকার কথাও না। তবুও বসো। আমি যতক্ষণ টেবিলে বসে আছি, ততক্ষণ বসো?”
ইরা বসে। নিজেকে কেমন নিয়ন্ত্রণহীন লাগে তার। মনে হচ্ছে কোনো এক দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিচ্ছে সে। ঘুম ভাঙলেই দেখবে সব ঠিক।
“শোনো ইরা, তোমাকে একটা কথা বলি। পৃথিবীটা সবার জন্য মসৃণ নয়। অধিকাংশের জন্যই প্রতিটা পথ বন্ধুর বা অমসৃণ। এখানে কেউ তোমাকে জায়গা করে দিবে না। কেউ বলবে না, এসো এখানে বসো, এটা তোমার স্থান। তাই বলে কি তুমি আজীবন ভাসমান থাকবে? তুমি কি কচুরিপানা? তোমার স্থান তোমাকেই করে নিতে হবে। এপাশে যা কিছু হয়ে যাক। মনে রাখবে তোমার তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। যেটা তোমার প্রাপ্য আদায় করে নিবে, জোর করে হলেও।”
ইরা এতোক্ষণ মাথা নিচু করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলো রাশেদুলের কথা। উনি পেশায় একজন শিক্ষক, কলেজের। উনার কথায় আভিজাত্য স্পষ্ট। যেনো নিজের ছাত্রীকে পড়াচ্ছেন গভীর মনোযোগ দিয়ে।
“সবকিছু কি জোর করে হয়? আমরা তো মানুষ, মেশিন নই যে ইনপুট দিলেই আউটপুট পাবো। তা জোর করে হলেও। মানব মন কি জোরজবরদস্তি মানে?”
“তবে তুমি কি নিজেই নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে চাচ্ছো?”
“যে জায়গায় অন্য কারো স্থান, আমি সেখানে জোর করে খুঁটি গেড়ে বসি কীভাবে? এ যে যার স্থান তার সাথে অন্যায় করা হলো।”
ইরার মুখের ধারালো হাসি দেখে কিছুটা দমে যায় রাশেদুল। মেয়েটা ভুল বলছে না, একদমই না।
রাশেদুল উঠে দাঁড়ায়। তার নিজেরও আর খিদে নেই। কি থেকে কি হয়ে গেলো কিছুই বুঝতে পারছে না সে। কীভাবে এই পরিস্থিতির সামাল দিবে সে?
“আরশাদ যা বলছে মেনে নাও, পড়াশোনা শুরু করো। যে কোনো সাহায্যের জন্য তো আমি আছি-ই।”
ইরা ম্লান হাসে, মুখে কিছু বলেনা। রাশেদুল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে যায়। ইরা কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আরো একটি একাকী নতুন দিনের সূচনা।
“আজ গুন গুন গুন কুঞ্জে আমার
এ কি গুঞ্জরণ…
গানের সুরে পেলাম এ কার
প্রাণের নিমন্ত্রণ।।”
বারান্দার গুল্মলতাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে গুণগুণ করে গান করছিলো ইরা। তার মায়ের গালের গলা ছিলো অসম্ভব মিষ্টি। মাঝে মাঝে কয়েক কলি গেয়ে উঠলে সুরের মূর্ছনায় আবেশিত হয়ে যেতো চারপাশ। কণ্ঠটা ইরা মায়ের থেকেই পেয়েছে। কিন্তু কখনো সুযোগ পায়নি প্রকাশিত করার। ওই মাঝে মাঝে নিজের মনে, খুব মন খারাপ হলে নিজের মস্তিষ্ককে শীতল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে এভাবে।
কিন্তু তার পিছনেই দরজায় কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চুপ করে যায় সে। দুপুর বারোটা প্রায়। কে আসবে এই অসময়ে? আরশাদ তো নয়, তবে?
ইরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই বেশ অবাক হয়ে যায়। চোখের পলক ফেলতেও যেনো ভুলে যায় কিছু সময়ের জন্য।
“থামলে কেনো? খুব ভালোই করছিলে তো গানটা।”
“আপনি?”
“কেনো? রাগ লাগছে আমার উপস্থিতি?”
“কি বলছেন? তা কেনো? আসলে আমি…”
নীলু গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসে চেয়ারে বসে। গতকাল তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো তার উপর দিয়ে বুঝি ঝড় বয়ে গেছে। সে তুলনায় আজ বেশ শান্ত। গতকালের মতো শাড়ি নয়, কালো রঙের ফতুয়া আর জিন্স পরা। বেশ মানিয়েছে তাকে। আধুনিক সাজপোশাকে সবাইকে ভালো লাগেনা, নীলুকে লাগছে।
“দাঁড়িয়ে কেনো? বসো।”
ইরা ইতস্তত করে বসে সামনের চেয়ারে। নীলু ব্যাগ থেকে কিছু ছোট ছোট প্যাকেট বের করে। উপহারের মতো দেখতে।
“এগুলো রাখো।”
ইরা শীতল কণ্ঠে বললো,”এগুলো কি?”
“ও এগুলো? এগুলো ছোট ছোট কিছু জিনিস। ডায়রী, কলম, শুকনো ফুল, চুড়ি, নুপুর। এসব হাবিজাবি জিনিস।”
“এগুলো আপনি আমাকে দিচ্ছেন?”
“হ্যা তোমাকেই দিচ্ছি বলতে পারো। তবে তোমাকে উপহার হিসেবে দিচ্ছি না। এগুলো আরশাদ আমাকে দিয়েছিলো বিভিন্ন সময়ে। এতোক্ষণে এটা বুঝতেই পেরেছো আমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিলো। যে কারণেই হোক সম্পর্কটা এখন আর নেই। তাই এই জিনিসগুলো আমার কাছে আর রাখতে চাচ্ছি না। তুমি রেখে দাও। ইচ্ছা হলে ফেলে দিতে পারো বা চাইলে ব্যবহারও করতে পারো।”
ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় মেয়েটার দিকে। চোখেমুখে কষ্টের বদলে কি দাম্ভিকতা ফুটে উঠেছে মেয়েটার? ইরাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিতে চাচ্ছে সুচতুরভাবে? বোঝাতে চাচ্ছে যে ইরা সেকেন্ডহ্যান্ড জিনিসের যোগ্য?
“জিনিসগুলো তো আপনিও ফেলে দিতে পারতেন। এ বাড়ি পর্যন্ত বয়ে এনেছেন যাতে আমি আমার হাত দিয়ে ফেলি?”
“ওইযে বললাম, পছন্দ হলে ব্যবহারও করতে পারো। অল্প কিছুদিনই আমি ব্যবহার করেছি, আবার পুরোনো ভেবো না দয়া করে। আর ভালো কথা, গতকাল আমাকে কফি বানিয়ে খাওয়াতে চেয়েছিলে। আজ কি পাবো? যদি তোমার অসুবিধা না হয়।”
ইরা আগ্রহ নিয়েই প্যাকেটগুলো হাতে নেয়। নেড়েচেড়ে দেখে সেগুলো। নীলু পায়ের উপর পা তুলে তাকে অবলোকন করতে থাকে।
“বেশ আমি ব্যবহার করবো। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। যে জিনিস আমার জন্য বরাদ্দ তা যেভাবেই হোক আমার হাতে আসবে, এটাই নিয়ম। তা পুরোনো হোক বা নতুন। আমার ভাগ্যে যা আছে তা একান্তই আমার। ও হ্যা কফি অবশ্যই পাবেন। আপনারও কি উনার মতো দুধ-চিনি ছাড়া ব্লাক কফি লাগবে? একটু বেশি ক্যাফেইন, চলবে?”
নীলু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলো। ইরার কথা শুনে সোজা হয়ে বসে। দাঁতে দাঁত ঘষতে থাকে আস্তে আস্তে।
ইরা ছোট্ট করে হেসে উঠে দাঁড়ায়।
“আপনি বসুন, আমি কফি বানিয়ে আনছি। আপনি চাইলে ততক্ষণে ঘরেও বসতে পারেন। আমাদের বিয়ের আগেও শুনেছি আপনি এখানে শুয়ে-বসে গল্পের বই পড়তেন। চাইলে তা-ও করতে পারেন। তেমন কিছুও পাল্টায়নি, আগে যা ছিলো এখনো তাই আছে।”
ইরা চলে যায় বারান্দা ছেড়ে। নীলু হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার উপস্থিত বুদ্ধি তাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। শুধু শেষের কথা গুলো বোঝার চেষ্টা করতে থাকে সে। কি বোঝাতে চাইলো? মেয়েটার চোখেমুখে কি আত্মবিশ্বাসের অহমিকা একটু বেশি ফুটে ওঠেনি?
(চলবে…..)

