Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-০৬

মন কেমনের মরশুম পর্ব-০৬

0
354

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৬

রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটছে আরশাদ আর ইরা। বিয়ের পর এই প্রথম বাইরে আসা ইরার। অনুভূতিটা ভালোই কিন্তু কোথায় যেনো একটা বিষাদের সুর। তার পাশে হেঁটে চলা এই অসম্ভব সুদর্শন পুরুষটা তার হয়েও তার নয়। সে অন্য কারো। বরং ইরা-ই তার জীবনে উড়ে এসে জুড়ে বসা নারী। যার অস্তিত্ব শুধুমাত্র কাগজে-কলমে, তার অন্তরে নয়।
আরশাদের যদিও এসবে খেয়াল নেই। তার হাতে বাদামের ঠোঙা। বাদাম খাচ্ছে সে একমনে। ইরা আড়চোখে তাকায় তার দিকে। ধূসর রঙা শার্ট, চোখে কালো সানগ্লাস। আজ কি তাকে একটু বেশি ভালো লাগছে দেখতে?

“তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়।”
“কেনো?”
“এইযে, আসার সময় কলেজের কাগজপত্র সব এনেছিলে। খুব ঠান্ডা মাথার মেয়ে তুমি। ওরকম অবস্থায় সব গুছিয়ে আনা অসম্ভবের কাছাকাছি। তুমি এই অসম্ভব কাজটা করেছো। আমি তো ভেবেছিলাম আবার নতুন করে সব কাগজপত্র তুলতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”আমি কিন্তু চাইনি আমার জন্য এই কষ্টটুকু আপনি করেন।”
“কষ্ট তো কমিয়েই দিয়েছো তুমি, আর কিসের কষ্ট? এবার মন দিয়ে পড়াশোনা করবে।”
ইরা অন্যদিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে।

“কি হবে আর পড়াশোনা করে? কার লাভ হবে এতে?”
আরশাদ দাঁড়িয়ে পড়ে, সোজাসুজি তাকায় ইরার দিকে। বাধ্য হয়ে ইরাও দাঁড়ায়।

“পড়াশোনা করবে নিজের জন্য, নিজের লাভের জন্য। অন্য কারো লাভের জন্য নয়। পড়াশোনা মানে নিজের শক্তি। যাতে কেউ তোমার অস্তিত্বের দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে। তোমার মতামতের তোয়াক্কা না করে তোমার উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে না পারে। যাতে তুমি সহজলভ্য না হয়ে যাও কারো কাছে। তোমাকে যে কেউ চাইলেই ভেঙে দিতে না পারে। বুঝেছো?”
ইরা নির্বিকার ভাবে তাকায় আরশাদের দিকে। চোখ দু’টো সানগ্লাসে ঢাকা হলেও সে বুঝতে পারছে এক জোড়া ভরসার চোখ তাকে স্বপ্ন দেখতে উদ্দীপনা জাগাচ্ছে।

“নাও বাদাম খাও।”
“না খাবো না।”
“সবকিছুতে এতো না কেনো তোমার? আমি খোসা ছিলে দিয়েছি। হাত বাড়াও।”
ইরা ডান হাত বাড়াতেই আরশাদ কিছুটা চমকে ওঠে সেদিকে তাকিয়ে। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ভালো করে তাকায়। ইরা মুখ টিপে হাসছে।

“এটা…?”
“কোনটা?”
“এই চুড়িটা তোমার?”
“কেনো? চেনা চেনা লাগছে নাকি?”
“এটা তুমি কোথায় পেলে?”
ইরা চুড়িটা নেড়েচেড়ে বললো,”আপনি যাকে দিয়েছিলেন উনি আমাকে দিয়েছেন। ঠিক উপহার হিসেবে নয়, আমাকে বলেছিলেন আমি চাইলে ফেলে দিতে পারি। কিন্তু এতো সুন্দর জিনিস। উনি নিজে না ফেলে আমার হাত দিয়ে ফেলাতে চান। আমার ভালো লেগেছে, আমি রেখে দিয়েছি। আপনি কি রাগ করেছেন?”
আরশাদ ঘন ঘন শ্বাস ফেলে। আচমকা হাতের ঠোঙাটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে। ইরা কিছুটা অবাক হয়ে যায়।

“এ কি? ফেলে দিলেন কেনো?”
“তোমার কি কি প্রয়োজন এটা কি আমি লিখে দিতে বলিনি? তখন কেনো বলোনি তোমার চুড়ি পরার শখ হয়েছে? অন্যের পুরোনো জিনিস কীভাবে হাতে ওঠানোর রুচি হলো তোমার?”
ইরা স্মিত হেসে বললো,”মানুষটাই তো অন্যের ছিলো। সেখানে পুরোনো জিনিসের আর দোষ কি?”
আরশাদ দমে যায়। বুক দুই হাত গুঁজে অন্যদিকে তাকায়। সে কি কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে? নাকি নেহাৎ ইরার ভুল ধারণা? ইরা কি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললো? বেশি অধিকার ফলাতে গেলো? যেখানে ভালোবাসা নেই সেখানে কি অধিকার খাটে?

“তুমি একটু বেশি ভাবছো এগুলো নিয়ে। সন্দেহ শুধু যন্ত্রণার মাত্রা বৃদ্ধি করবে, আর কিছুই না।”
“এসব কি বলছেন? সন্দেহ করবো কেনো?”
“যেটাই করছো তা আর করোনা। আমরা নেহাৎ ভালো বন্ধু ছিলাম, আমার দিকে থেকে সে বন্ধুত্ব এখনো আছে। জানিনা ওর দিক থেকে আছে কিনা। ব্যস! এটুকুই।”
“বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, কোনো ছেলে মেয়ে পরস্পর বন্ধু থাকতে পারেনা। তারা কিছু সময়ের জন্য হলেও একে অন্যের প্রেমে পড়বে।”
আরশাদ চুপ করে থাকে। ইরা হঠাৎ-ই ধাতস্থ হয়। বলতে বলতে কতোটা বেশি বলে ফেললো সে। এতোটা অনধিকার চর্চা করার সাহস কীভাবে হলো তার? চুপ করে যাওয়াই শ্রেয় ছিলো না?

“হ্যা আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমি নীলুর প্রেমে পড়েছিলাম। তার রূপের নয় তার সরলতার, তার যত্নের। আমি অফিস থেকে ফেরার আগে সে আমার জন্য শরবত বানিয়ে অপেক্ষা করতো। কখনো আমাদের বাড়িতে রাতে থেকে গেলে, মাঝরাতে কফি বানিয়ে আমার ঘরের দরজায় দাঁড়াতো। কারণ প্রায় রাতেই আমাকে রাত জেগে অফিসের কাজ করতে হয়। ও উচ্ছল ছিলো। সামান্য কিছুতেই খুশি হয়ে যেতো। আমার এই ছোট্ট ছোট্ট উপহারগুলো পেয়ে ও শিশুদের মতো উল্লাস করতো। আমি খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও ওর এই স্নিগ্ধতার প্রেমে পড়েছিলাম৷ কিন্তু সব প্রেমে কামনা থাকেনা, শারীরিক টান থাকেনা। যেসব রাতে ও কফি বানিয়ে আমার ঘরের দরজায় দাঁড়াতো, আমি কফিটা হাতে নিয়েই ওকে চলে যেতে বলতাম। আমি চাইনি ও আমার ঘরে আসুক আমার উপস্থিতিতে। তার মানে এটা নয় যে আমি দূর্বল, আমি নিজেকে সামলাতে পারবো না। আমি ওর সম্মানের কথা ভাবতাম। আমি চাইনি আমার জন্য ওর বিন্দুমাত্র কোনো অপমান হোক কখনো। ব্যাপারটা তোমার ক্ষেত্রেও তাই, আমার জন্য কেউ অপমানিত হবে এটা আমি সহ্য করতে পারবো না। কিন্তু এর বেশি কিছু না।”

আরশাদ থামে। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে ইরা। আরশাদের বলা প্রতিটা বাক্য তার হৃদয়ে শেলের মতো বিঁধে। হয়তো মনের কোনো এক কোণে ছোট্ট হলেও একটা আশা ছিলো যে আরশাদ নীলুকে ভালোবাসে না। অবাধ্য মন না চাইতেও জোর করে কষ্ট পাচ্ছে। মানব মন কোনো মেশিন তো নয়।

“আমি জানি এই বিয়েতে যদি সবচেয়ে বেশি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে তা হলো নীলু। ও ভেবেছে আমি নিজেকে মহৎ প্রমাণ করার জন্য ওর ভালোবাসা নিয়ে খেলেছি। কিন্তু সত্যি বলতে আমি নিজেকে মহৎ প্রমাণ করতে চাইনি কখনো। ওই পরিস্থিতিতে আমার যেটা করতে মন সায় দিয়েছিলো, তাই করেছি। কিন্তু এটা আমার মা কিংবা নীলু কেউ বুঝতে পারছে না। নীলু যদিও এই জিনিসগুলো ফেরত দিয়ে, তাও আবার তোমার হাতে খুব একটা ভালো কাজ করেনি। কিন্তু আমি চাইলেও ওর উপর রাগ করতে পারছি না। কারণ….”
“কারণ আপনি মুখে যতো যা-ই বলুন না কেনো, নীলু আপাকে আপনি এখনো ভালোবাসেন। আর ভালোবাসার মানুষ যতো বড় অন্যায় করুক না কেনো তার উপর রাগ করা যায়না।”
আরশাদ অবাক হয়ে তাকায়, ইরা নির্লিপ্ত।

“আমার জন্য দু’জন নিরপরাধ মানুষ কষ্ট পাবে এটা আমি ভাবতেও পারিনা। আপনি আমাকে যেখান থেকে এনেছিলেন সেখানেই রেখে আসুন। মায়ের হাত-পা ধরে আমি ঠিক আশ্রয়টুকু পেয়ে যাবো। সেখানে আমার বাবা আছেন। যতো যা-ই হোক, আমি তার মেয়ে। ফেলে নিশ্চয়ই দিবেন না। আর দিলেও বা কি? পৃথিবীটা অনেক বড়। কোথাও একটা জায়গা ঠিক করে নিতে পারবো। কিন্তু প্রেম একবার হারিয়ে গেলে আপনি তা আর কোনোদিন ফিরে পাবেন না। আপনি নীলু আপাকে বিয়ে করুন। উনি অসাধারণ একটি মেয়ে। হয়তো কিছু সময়ের জন্য রাগ করে আছে আপনার উপর। কিন্তু যখন জানতে পারবে তার প্রতি আপনার প্রেম আগের মতোই আছে। বিয়ে করা স্ত্রীকে আপনি ছুঁয়েও দেখেননি তার জন্য। তখন নিশ্চয়ই আর রাগ করে থাকতে পারবে না।”
আরশাদ হতভম্ব হয়ে যায় ইরার কথা শুনে।

“ইরা তুমি বুদ্ধিমতী। সামাজিক বা ধর্মীয় ভাবে তোমার আমার প্রতি পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু আমি কি করবো না করবো তা একান্তই আমার ইচ্ছা। বিয়ে আমার জীবনে একবারই হয়েছে, সে সংখ্যা কোনোদিন আর বাড়বে না। এরপর তোমার যদি চলে যেতে ইচ্ছা হয়, যাও। তার মানে এই নয় যে তুমি চলে গেলেই আমি নীলুকে বিয়ে করবো। ও সুখী হোক, কিন্তু আমার সাথে আর নয়। আমাদের দু’জনের পথ দু’দিকে সরে গেছে। আর কোনোদিন মিলবে না। আশা করি এ নিয়ে তুমি দ্বিতীয় বার আমাকে আর কিছু বলবে না।”
ইরা চুপ করে তাকিয়ে থাকে আরশাদের দিকে। আরশাদের চোখেমুখে যন্ত্রণার ছাপ। কিসের এই যন্ত্রণা? নীলুকে না পাওয়ার নাকি ইরার চলে যাওয়ার ভাবনা?

“ভিতরে আসি?”
ভয়াবহ ভাবে চমকে আশা পিছন ঘুরে তাকায়। নিজের ঘরে টেবিলে বসে পড়াশোনা করছিলো সে।

“তুমি এখানে?”
“ভিতরে আসতে বলবে না?”
ইরার হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে সহসাই থেমে যায় আশা। বারণ করতে পারেনা। শুধু বারবার উঁকি দিয়ে দরজার বাইরে তাকায়। মা দেখতে পেলে দক্ষযজ্ঞ বাঁধাবে।

“এখানে কেনো এসেছো তুমি? আমার কাছে কি চাও?”
ইরা আশার পাশের চেয়ারে বসে। আশা ভয়ে ভয়ে শুধু দরজার দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটা তাকে নির্ঘাৎ মায়ের কাছে বকা খাওয়াবে।

“কি বলছি শুনছো না? এখানে কেনো এসেছো? যা বলবে তাড়াতাড়ি বলে চলে যাও।”
“তাড়াতাড়ি বলে চলে যেতে তো আসিনি। ঘরে একা একা ভালো লাগছিলো না। তাই তোমার সাথে গল্প করতে এসেছি। একটু গল্পও করা যাবে না?”
আশা ঢোক চাপে। মেয়েটাকে তাড়িয়ে দিতে পারছে না কোনো এক অজানা কারণে। কড়া করে কথাও বলতে পারছে না। যতো বড় শত্রুই হোক, এভাবে হাসিমুখ করে রাখলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কড়া কথা বলা যায়না।

আশা শান্ত হয়ে তাকায় ইরার দিকে।

“তোমার সাথে গল্প করতে চাচ্ছিনা। আমার পড়া আছে, পড়তে দাও।”
“কি পড়ছো? ইংরেজি? আমি ইংরেজিতে অনেক ভালো। তোমার বুঝতে অসুবিধা হলে আমি সাহায্য করতে পারি।”
“কোনো প্রয়োজন নেই। এসেছো ভালো করেছো। চুপ করে বসে থাকো। মা যেনো তোমার গলার আওয়াজ শুনতে না পায়।”
“যাহ বাবা! চুপ করেই যদি বসে থাকবো তাহলে তোমার এখানে এলাম কেনো? ঘরেই তো থাকতে পারতাম।”
আশা মহাবিরক্ত হয়ে তাকায় ইরার দিকে। কিছু বলতে পারেনা আশা। বসে থাকলে থাকুক, অসুবিধা কি? শুধু মা দেখতে না পেলেই হয়।

“তোমার চুল তো অনেক সুন্দর আশা। তবে বোঝাই যাচ্ছে যত্ন কম নাও। তুমি চাইলে আমি তেল দিয়ে বেঁধে দিবো রোজ। দেখবে আরো সুন্দর হয়ে যাবে।”
“দরকার নেই। তুমি নিজের কাজ করো।”
“আপাতত কোনো কাজ নেই আমার। সামনের মাস থেকে ক্লাস শুরু। এর আগ পর্যন্ত আমি টো টো কোম্পানির ম্যানেজার।”
আশার হাসি পায়, কিন্তু অনেক কষ্ট করে হাসি চেপে রাখে। এই মেয়েকে মাথায় তোলা যাবে না কোনোভাবেই। বড্ড গায়ে পড়া মেয়ে বোঝাই যাচ্ছে। মাথায় তুললে বিপদ।

হঠাৎ ইরা উঠে দাঁড়ায়। আশার চোখের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললো,”গতকাল দেখলাম তোমার টিউশন টিচার চলে যাওয়ার পর তুমি কাঁদছিলে। চোখমুখ লাল হয়ে ছিলো। তুমি চাইলে আমাকে বলতে পারো, না চাইলে নাই। বয়সটা ভুল করার, তবে বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভুলটা যতো তাড়াতাড়ি পারা যায় সংশোধন করে নেওয়ার।”
আশা স্তম্ভিত হয়ে যায় ইরার কথা শুনে। সে ধারণাও করতে পারেনি এই দুইদিনের আসা মেয়েটা এতোটা চালাক হতে পারে। বাড়ির কেউ কিছু বুঝলো না, এমনকি তার মা-ও না। এই মেয়ে কীভাবে বুঝলো? কি আন্দাজ করেছে ও?

ইরা আশার কাঁধে হাত রেখে বললো,”আমি তোমার শত্রু নই। বন্ধুও যে হয়েছি, তা-ও নয়। তবে তুমি চাইলে হতেও পারি। আমি কাউকেই কিছু বলবো না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।”
আশা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”কি আজেবাজে কথা বলছো? এমন কিছুই না। স্যার পড়া দিয়েছিলো, আমি পারিনি তাই বকেছে। এজন্য মন খারাপ হয়েছিলো আমার। আর কিছুই না।”
“না হলেই ভালো। তবে সাবধানে থাকবে। আমাদের চারপাশে মানুষরূপী হায়েনা ঘোরাফেরা করে। দেখতে মানুষের মতোই কিন্তু তারা মানুষ না। এদের থেকে নিজেকে সাবধানে রাখতে হবে।”
“এগুলো তুমি আমাকে বলছো কেনো?”
“এমনিই বললাম, মন চাইলো তাই।”
“চলে যাও। আর কক্ষনও আমার ঘরে আসবে না তুমি।”
“আচ্ছা আসবো না। তুমি পড়ো, আমি চলে যাচ্ছি।”
আশা হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। হৃৎপিণ্ডটা যেনো গলার কাছে এসে ধকধক করতে থাকে। ইরা গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে যায় আশার ঘর থেকে।

“এই মেয়ে দাঁড়াও।”
ইরা ঘুরে দাঁড়ায়। রাবেয়া সরু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চেহারায় রাগ স্পষ্ট। ফর্সা মানুষ রেগে গেলে গাল দু’টো লাল হয়ে যায় একেবারে।

“বলুন।”
“তুমি আমার মেয়ের ঘরে কি করছিলে?”
“কিছুই করছিলাম না। একা একা ভালো লাগছিলো না, তাই ওর সাথে গল্প করতে এসেছিলাম।”
“তোমার ভালো লাগুক না লাগুক তা আমার দেখার বিষয় না। আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে। একদম ওর সংস্পর্শে আসবে না।”
“জি আসবো না।”
“এমনিতেও কয়েকদিন পর তোমার স্থান হবে…..”
“বিড়াল-কুকুরের সাথে তাইতো? শুনলাম তো আগেরদিনই। এক কথা দুইবার বলতে তো আপনারই কষ্ট। তারচেয়ে এক কাজ কাজ করুন, টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে আমাকে দিবেন। আমি আমার মাথার কাছে রেখে দিবো। একটু পর পর শুনবো। এতে আপনার কষ্টটাও একটু কম হবে।”
রাবেয়া হতবিহ্বল হয়ে যায় ইরার কথা শুনে। কতো বড় বেয়াদব মেয়ে। দেখে তো মনে হয়েছিলো ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানেনা। আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বের হচ্ছে। ছোটলোক ঘরের মেয়ে।

“আর আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে কি-ই বা লাভ হবে আপনার বলুন তো। তারচেয়ে এক কাজ করুন। কদুর মা নামক মহিলাটিকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিন। উনার যাবতীয় কাজ আমি করবো। বিনা বেতনেই করবো, লাভ আপনাদেরই। যে-ই লাউ, সেই কদু।”
রাবেয়া কিছু বলার আগেই ইরা চলে যায় আবারও গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে। মনটা কেনো যেনো খুব ফুরফুরে আজকে তার। প্যাচপেচে বৃষ্টি থেমে ঝলমলে রোদ উঠেছে সারাদিন। রোদ দেখলেই ইরার মন ভালো হয়ে যায়।

রাবেয়া দাঁতে দাঁত ঘষতে থাকে। ইচ্ছা করছে এখনই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে অসভ্য মেয়েটাকে বের করে দিতে বাড়ি থেকে। আরশাদ আর তার বাবার আহ্লাদেই এই অবস্থা। চাবকে সিধে করে দেওয়া দরকার।

আরশাদ অফিস থেকে ফিরেছে অনেকক্ষণ। সে আসার পর থেকে ইরা তেমন কথা বলেনি তার সাথে, আরশাদও আর বলতে যায়নি। শুধু বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে বার বার ইরার দিকে। আরশাদের এনে দেওয়া নীল পাড়ের সাদা শাড়িটি পরেছে ইরা। চুলগুলো খোঁপা করে রেখেছে। কোনো প্রসাধনী বা গহনাগাঁটি নেই শরীরে।

টেবিলের উপর সাথে করে আনা এক বাক্স চুড়ি রাখতে রাখতে আরশাদ খেয়াল করে সেখানে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত ঢেকে রাখা। উপরে আবার বরফ ভাসছে। পাশেই আরেকটা মগে ধোঁয়া ওঠা ব্লাক কফি। আরশাদ মুচকি হাসে। মেয়েটা অসম্ভব বুদ্ধিমতী। তাকে দেখলে তা মোটেই বোঝার উপায় নেই। সে শরবতের গ্লাসটাই আগে উঠিয়ে নেয়। চুমুক দিয়ে দেখে সব ঠিকঠাক। সে যতোটুকু চিনি খায়, ততটুকুই। খুব দ্রুত সবকিছু আয়ত্তে নেওয়ার ক্ষমতা সাংঘাতিক মেয়েটার।

ইরা শুয়ে পড়েছে। পাশেই টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে আজ। একটা গল্পের বই হাতে শুয়েছে। আরশাদ সেদিকে একবার তাকিয়ে বারান্দায় চলে যায়। একদিন পর পর রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান হয়। বিভিন্ন লেখকের গল্প পাঠ করা হয় সেখানে। তবে কিছু পার্থক্য আছে। এই গল্পগুলো গতানুগতিক গল্পের মতো হয়না। একটু অন্যরকম হয়। শুনতে নেশার মতো লাগে। আরশাদ মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে শোনে। তবে সব লেখকের না, ‘ভ্রমর’ নামের এক লেখিকার গল্প খুব পছন্দ তার। একদম বুঁদ হয়ে শোনে সে। কি যেনো একটা আছে তার গল্পে। আরশাদ কোনোভাবেই বাদ দিতে পারেনা।
আরশাদ চেয়ারে শরীর ছেড়ে দিয়ে বসে। কোলে ল্যাপটপ, হাতে কফির মগ আর কানে হেডফোনে ভ্রমরের লেখা গল্প। গল্প নয় বরং যাদু। আরশাদ চোখ বন্ধ করে ফেলে। একজন মানুষ কীভাবে এতো সুন্দর লিখতে পারে? মস্তিষ্ক ভেদ করে যায় যেনো প্রতিটা শব্দ। মাঝে মাঝে শ্বাস নিতেও ভুলে যায় আরশাদ।

মাঝরাতে “এই শুনছেন, এইযে….”
ডাক শুনে ধড়মড় করে উঠে বসে আরশাদ। কখন যে বারান্দাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি সে। যে অবস্থায় বসেছিলো, ওই অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।

“এখানে ঘুমাচ্ছেন কেনো? ঘরে চলুন।”
আরশাদ বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে দাঁড়ায়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করে ইরাকে। আকাশ আবারও মেঘে ছেয়ে গেছে। রাতে জোরালো বৃষ্টি নামবে বোধহয়। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে।

“নিন এবার ঘুমিয়ে পড়ুন।”
“তুমি ঘুমাবে না?”
“আমি ঘুমিয়েছিলাম৷ হঠাৎ পাশ ফিরে দেখি আপনি নেই। খুঁজতে খুঁজতে যেয়ে দেখি বারান্দাতেই ঘুমিয়ে আছেন।”
“ভয় পেয়েছিলে আমাকে না দেখে?”
ইরা চমকে ওঠে। আরশাদের কণ্ঠ মাদকতায় ভরা। যেনো আরশাদ নয়, অন্য কেউ কথা বলছে।

“জি না, এতো অল্পে ভয় পাওয়া মেয়ে ইরা নয়।”
হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকানি, সাথে সাথেই বোধহয় বাজ পড়ে কোথাও। বিকট শব্দ হয়। ইরা কিছুটা ভয় পেলেও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।

“একটা কথা বলেছিলে তুমি, মনে পড়ছে?”
“কি?”
“আমি নাকি অন্য কারো প্রেমে বুঁদ হয়ে আছি এখনো, এ কারণেই আমার স্ত্রী-কে এখনো স্পর্শ করিনি।”
“ভুল বলেছি?”
আরশাদ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বললো,”বলেছো, ভুল বলেছো। স্বামী হিসেবে আমি এখনো তোমার কাছে শতভাগ যোগ্য নই। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা নেই। যেখানে ভালোবাসা নেই, সেখানে শারীরিক সম্পর্ক পশুপাখির ন্যায়ে হয়। আমরা মানুষ, পশুপাখি নই। যেদিন সত্যিই ভালোবাসতে পারবে সেদিন জেনে রেখো তোমাকে স্বর্গ ঘুরিয়ে আনবো।”

আরশাদ কথাটা শেষ করেই বিছানায় যেয়ে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমে তলিয়ে যায় সে। কিন্তু ইরা আর ঘুমাতে পারে না বাকি রাত। অজানা কারণে বুকটা কেঁপে ওঠে একটু পর পরই। আরশাদের শেষ কথাটা তার মস্তিষ্কে গেঁথে যায় পুরোপুরি। একটু পর পর সেখান থেকে সিগনাল পাঠায় আর শরীর কাঁপিয়ে দিয়ে যায়, সারারাত।

(চলবে…..)