#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ৭
ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশাদ। মন বসছে না আজ কাজে। সকালে অফিসে আসার পর থেকে তিন মগ কফি খেয়েছে। তবুও মনোযোগ নেই। তার মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হচ্ছে টের পাচ্ছে, মেজাজ হারালে বিপদ। বাথরুমে যেয়ে মাথায় পানি দিয়ে এসেছে এরমধ্যে। চেয়ারে শরীর এলিয়ে দেয় এসেই। চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে।
“আরশাদ।”
চমকে ওঠে আরশাদ। মাথা তুলেই হতবাক হয়ে যায়।
“নীলু।”
“জানি আশা করোনি, তবুও এসেছি। ভিতরে আসতে বলবে না?”
আরশাদ উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথেই।
“এসো নীলু। কি হয়েছে? হঠাৎ অফিসে কেনো?”
নীলু স্মিত হেসে ঢোকে। চেয়ার টেনে বসে আরশাদের বিপরীতে।
“আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ার কিছু নেই আরশাদ। বসো।”
আরশাদ শান্ত ভাবেই বসে। ঘোলাটে চোখে তাকায় নীলুর দিকে। সে খুব সুন্দর করে সেজে এসেছে। মনে হচ্ছে কোনো অনুষ্ঠানে যাবে।
“তুমি অফিসে কেনো? বাড়িতে যেতে পারতে।”
“ও বাড়ি এখন আমার আর ভালো লাগেনা। দোযখ মনে হয়।”
“এসব কি বলছো? যে বাড়িতেই তোমার অধিকাংশ সময় কেটেছে সেই বাড়ি এখন কি এমন হয়ে গেলো যে দোযখ মনে হচ্ছে?”
নীলু উত্তর না দিয়ে নিজের ওড়না এগিয়ে দেয় আরশাদের দিকে।
“মাথাটা মুছে নাও, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
আরশাদ পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা মুছে নেয়। নীলু কিঞ্চিৎ অপমানিত বোধ করে।
“কি খাবে? ঠান্ডা? কোক দিতে বলবো?”
“কিছু খেতে আসিনি এখানে।”
“তাহলে কি করতে এসেছো?”
“তোমাকে দেখতে এসেছি। এটাও কি বারণ আমার?”
আরশাদ ল্যাপটপটা বন্ধ করে আবারও চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। মেয়েটার কথাবার্তা অসংলগ্ন শোনাচ্ছে। এটা বাড়তে দেওয়া যাবেনা। এটাও মনে রাখতে হবে এটা তার কাজের জায়গা।
“নীলু আমার মনে হয় তোমার দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া দরকার। খালুকে বলো কোথাও নিয়ে যেতে তোমাকে কয়েকদিনের জন্য। তোমার ভালো লাগবে।”
“আমার ভালো লাগা নিয়ে তুমি চিন্তা করো? বাহ ভালো লাগলো শুনে।”
“এভাবে কথা বলছো কেনো?”
“ঠিক কীভাবে কথা বললে তুমি খুশি হবে মিস্টার আরশাদ? শিখিয়ে দাও, সেভাবে বলি। তোমার বউয়ের মতো বলবো?”
“ওর কথা আসছে কেনো এখানে?”
“তোমার খুশির জন্য বললাম, খুশি হওনি?”
আরশাদ উত্তর দেয়না। ক্ষিপ্র হয়ে আছে মেয়েটা। এখন সে কোনো ভালো কথা শুনবে না।
“কেনো এমনটা করলে আরশাদ? একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের সাথে সংসার করাটাকে মহৎ কাজ মনে করছো তুমি?”
“আমি মহান কোনো ব্যক্তি নই নীলু, আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আর সত্য বলতে আমি তোমাকে কখনো ভালোবাসিনি। হ্যা হয়তো ভালো লাগার ব্যাপার ছিলো। ভালো লাগা আর ভালোবাসা এক নয়। জানি কষ্ট পাবে, কিন্তু আমি লুকোচুরি করতে পারিনা। এটা আমার ব্যর্থতা হিসেবেই ধরে নিচ্ছি।”
নীলু বিস্ফারিত চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”তুমি আমাকে কখনোই ভালোবাসোনি?”
“আমি কি একবারের জন্যেও কখনো বলেছি আমি তোমাকে ভালোবাসি?”
নীলু চোখের কোণে নোনাপানি জমা হয়। আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজেকে সামলাতে। আরশাদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
“তাহলে কাকে ভালোবাসো তুমি? তোমার বউকে? দুইদিনেই তার জন্য ভালোবাসা উথলে পড়ছে?”
“না আমি তাকে ভালোবাসিনা। সে আমার দায়িত্ব, কারণ সে আমার বিবাহিত স্ত্রী। তবে হয়তো কখনো না কখনো তাকে ভালোবাসবো। ভালোবাসা ছাড়া তো সংসার হয়না।”
নীলু উঠে দাঁড়ায়। লাথি দিয়ে নিজের চেয়ার সরিয়ে দেয়। আরশাদ কিছুই বলেনা। শুধু ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“অন্যের সুখ কেড়ে কখনো নিজে সুখী হওয়া যায়না আরশাদ। এটা ওই মেয়েকে আমি বুঝিয়ে দিবো।”
“তোমার রাগ আমার উপর, ওকে কেনো কষ্ট দিচ্ছো তুমি? তোমার ব্যবহার করা পুরোনো জিনিসগুলো ওকে দিয়ে তুমি সূক্ষ্ম একটা যন্ত্রণা তৈরি করতে চেয়েছো ওর হৃদয়ে। হয়তো কিছুটা সফল তুমি। ও কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু ততটাও নয় তুমি যতোটা আশা করেছো। ও যখন নবম শ্রেণিতে পড়ে তখন ওর নিজের মা মারা যায়। সেই মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিলোনা। উনি আত্ম’হ’ত্যা করেন। ইরা নিজের চোখে দেখেছে মৃত মা’কে ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকতে। এরপর ওর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎমায়ের অত্যাচার কতোরকম হতে পারে সবরকমই দেখেছে ও। ছোট্ট এই জীবনে যতো রকম যন্ত্রণা পাওয়ার, ও পেয়েছে। তোমার মা ছিলো না, কিন্তু সে অভাব কখনো আমার মা তোমাকে বুঝতে দেয়নি। তোমার অযত্ন হবে বলে তোমার বাবা কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেনি। তুমি কষ্ট পেলে, তুমি কাঁদলে তোমার চোখের পানি মোছানোর অনেকেই ছিলো, আছে। কিন্তু ইরার কেউ নেই। ও কষ্ট সহ্য করে অভ্যস্ত। তাই তুমি ওকে এভাবে ভেঙে দিতে পারবে না। ওর ভিতরটা ইস্পাতের মতো শক্ত। এখন যদি আমি ওকে বাড়ি থেকে বেরও করে দিই, ও চিৎকার করবে না, ও কাঁদবে না কিংবা ও আশ্রয়ের জন্য আকুতিও করবে না। ও নিঃশব্দে চলে যাবে। বলো এমন মেয়েকে তুমি কীভাবে মানসিকভাবে ভেঙে দিবে? এই নোংরা খেলাটা খেলো না। তুমি আমার কাছে একজন উচ্ছল নারী, যে কোমল, স্নিগ্ধ। এই নারীর কলুষিত রূপটা আমি দেখতে চাইনা। তুমি সুখী হও, আমার চেয়েও হাজারগুণ ভালো, শুদ্ধতম পুরুষ তোমার জীবনে আসুক। আমি নিজে সুখী না হলেও তোমার সুখ দেখে স্বস্তি পাবো। শুধু একটাই অনুরোধ, আমাকে যা ইচ্ছা বলো কিন্তু ওকে আর কিছু বলো না।”
আরশাদ থামে, টেবিলে দুই হাত ঠেকিয়ে মাথা চেপে ধরে। এই মুহুর্তে তার মনে হচ্ছে মাথা ছিঁড়ে পড়বে ব্যথায়।
“বাহ, বাহ! খুব ভালো। তোমার উন্নতি চোখে পড়ার মতো আরশাদ। একটা দুইদিনে মেয়ের জন্য তোমার এতো দরদ। কিন্তু যার সাথে তোমার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। যে তোমাকে তার সমস্তটা উজাড় করে ভালোবেসেছে তার জন্য বিন্দুমাত্র দরদ নেই তোমার। আমার আসলে তোমার উপর না, নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে। কারণ আমি তোমার মতো একটা অসভ্য ছেলেকে ভালোবেসেছিলাম। আমি তোমাকে ঘৃণা করি আরশাদ, আমি আমাকেও ঘৃণা করি। তুমি আমার ভালোবাসার যোগ্য নও।”
আরশাদ ক্লান্ত গলায় বললো,”তুমি কি দয়া করে বাড়িতে যাবে নীলু? বাকি কথা বাড়িতে যেয়ে শুনবো নাহয়। আমার অসহ্য মাথা যন্ত্রণা করছে। একটু বোঝার চেষ্টা করো।”
নীলু আর এক মুহুর্তও দাঁড়ায় না। খরস্রোতা নদীর মতো ধেয়ে চলে যায়। আরশাদ হাতের কাছে থাকা কফির মগটা সজোরে ছুঁড়ে মারে মাটিতে। সাথে সাথে কয়েক খন্ডে খন্ডিত হয়ে যায় মগটা। সেদিকে তাকিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে থাকে সে।
ঘরটা আজ খুব পরিপাটি করে গুছিয়েছে ইরা। থাকার ঘরটা পরিষ্কার না হলে তার মন বসে না সে ঘরে। নিজের কিছু ব্যক্তিগত কাগজপত্র নিজের ব্যাগে লুকিয়ে রাখে। বাকিসব সাজায় নিজের মন মতো। আজ তার মনটা কোনো কারণ ছাড়াই ভালো। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে কিন্তু ঝলমলে রোদ। তার ইচ্ছা করছে একা একা কিছুক্ষণ হেঁটে আসতে বাইরে থেকে।
আরশাদের টেবিলটা গোছাতে যেয়ে চুড়ির বাক্সটা নজরে এসেছে তার। বাক্সের উপর কালো কালিতে ছোট্ট করে লেখা, ‘অভিমানী মেয়েটির জন্য নতুন চুড়ি।’
ইরা বাক্সটা খুলে অবাক। সে নীলুর যে চুড়িটা পরেছিলো, অবিকল সেরকম দেখতে দুই ডজন চুড়ি। ইরা ভেবে পায়না এমন পাগল মানুষ এতো বড় চাকরি কীভাবে করে। সেদিন একই রকম ব্লাউজ এনেছে তিনটা। আজ আবার একই রকম চুড়ি এতোগুলো।
ইরা কয়েকটা চুড়ি হাতে ঢোকাতে যেয়েও কি মনে করে রেখে দেয়। না, এতো সহজে ধরা দেওয়া যাবে না। সে যেমন ধরা দিতে সময় নিচ্ছে, ইরাও তাই করবে। নারীর মন কি এতো সহজেই পাওয়া যায়? সে যে বড় সাধনার।
বাক্সটা আলমারিতে তুলে রাখে ইরা।
হঠাৎ দরজার বাইরে একটা ছায়ামূর্তির উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুরে তাকায় ইরা। কেউ যেনো তাকে দেখে দ্রুত সরে গেলো। ইরা বুঝতে পারে কে। যাক, ওষুধে কাজ হয়েছে তাহলে। ইরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সে কিছুই দেখেনি এমন ভাব করে নিজের কাজ করতে থাকে।
“তুমি কি করছো?”
ইরা অন্যদিকে ফিরে মুখ টিপে হাসে। এরপর হাসি মুছে ঘুরে তাকায় দরজার দিকে।
“আরে আশা যে! এসো এসো।”
“না ভিতরে যাবো না। মা দেখলে রাগ করবে।”
“ঠিক আছে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।”
ইরা বালিশ ঠিক করে আর আড়চোখে তাকায়। আশা কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইরা পাত্তা দেয়না। সে জানে আশার এখন ইরাকে প্রয়োজন। নিজেই আসবে, অসুবিধা নেই।
আচমকা আশা ঘরে ঢুকেই দরজা আটকে দেয় ভিতর থেকে। ইরা বুকে দুই হাত গুঁজে তাকায় আশার দিকে।
“বসবেও না? নাকি ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে?”
“আমি বসতে আসিনি। তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি। বলেই চলে যাবো।”
“দেখো আশা, তোমার মা বলেছে আমি যেনো তোমার সংস্পর্শে না যাই। আমি কিন্তু যাইনি, তুমি নিজে এসেছো। এরপর যদি তোমার মা এই কারণে আমি বিড়াল-কুকুর বা ভিখারি বলতে আসে তবে সে দায় কিন্তু তোমার। এবার বলো কি বলবে।”
আশা বেশ অবাক হয়ে ইরার দিকে তাকায়। ইরার কথাবার্তায় যথেষ্ট পরিবর্তন এসেছে। প্রথম আসা ইরা আর এই ইরার মধ্যে বেশ পার্থক্য। দুইদিনে কেউ এমন হয়ে যায়না। নিশ্চয়ই সে আগে থেকেই এমন। ভালোমানুষির ভান ধরে ছিলো।
“শোনো তুমি যা সন্দেহ করেছো ওসব কিছুই না। সেদিন স্যার আমাকে বকা দিয়েছিলো। না না শুধু বকা না, আমাকে মেরেছিলো স্কেল দিয়ে। এজন্য আমি কাঁদছিলাম। তুমি এই কথা ভাইয়াকে বলবে না।”
“প্রথমত তুমি এখন কলেজে পড়ো, ছোট নও। এতো বড় মেয়েকে উনি স্কেল দিয়ে মেরেছেন। দ্বিতীয়ত উনার অনেক বয়স, চল্লিশের বেশি তো হবেই। উনি তোমাকে মারবেন আর তুমি চুপ করে থাকবে? কাউকে কিছু বলতে দিবে না? উনি বুঝি খুব ভালো পড়ান?”
আশা হকচকিয়ে যায় ইরার কথা শুনে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে ইরা তার দিকে। আশা অসহায় বোধ করে। এই মেয়ের চোখ বাজপাখির মতো। কিচ্ছু লুকিয়ে রাখতে দিবে বলে মনে হয় না।
“তুমি এতো কথা কেনো বলছো? উনি আমাকে মেরেছেন আমার কোনো অসুবিধা নেই, তোমার সমস্যা হচ্ছে কোথায়? তোমাকে শুধুমাত্র এটাই বলতে এসেছি যে তুমি ভাইয়াকে বলবে না। ভাইয়া এমনিতে শান্ত। কিন্তু হঠাৎ রেগে গেলে ভয়াবহ আকার নেয় সেই রাগ। স্যারকে মেরেও বসতে পারে, বলা যায়না।”
“আমি কিন্তু তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলাম আশা।”
আশা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। হঠাৎ কান্না পেয়ে যায় তার। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলায়।
“আমার কোনো সাহায্যের দরকার নেই। তুমি নিজে আগে নিজেকে সাহায্য করো।”
“বেশ! সাহায্য না লাগলে নাই। বোধহয় যা বলতে এসেছিলে বলা শেষ হয়েছে তোমার। নাকি আরো কিছু বলবে?”
আশা আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে থাকে। ইরা সেদিকে না তাকিয়ে নিজের কাজ করে। মনে মনে হাসছে সে।
আশা নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় দরজা খুলে। ইরা তার যাওয়ার দিকে তাকায়। একটু মন খারাপ লাগলেও যেচে পড়ে কিছু করতে চায়না সে। তবে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে আশার কথা মিথ্যে। আরো অনেক কিছু ঘটেছে ভিতরে যা আশা বলতে চাচ্ছে না। ইরা নিজে থেকে কিছুই জানতে যাবে না। ছোট্ট একটা টোকা দেওয়ার দরকার ছিলো, সে দিয়েছে। বাকিটা আশা নিজেই বলবে। আজ অথবা কাল। কিন্তু এতে আবার বেশি দেরি না হয়ে যায়। ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জোরেসোরে।
এ বাড়ির ছাদটা দেখার অনেক ইচ্ছা ছিলো ইরার। বলা তো যায়না কবে আবার সত্যিই বিড়াল-কুকুরের মতো বিদায় নিতে হয় এ বাড়ি থেকে। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে নিজের ভাবনায় নিজেই হেসে দেয়। আচ্ছা, আজকাল কি একটু বেশি হাসছে? নিজেকে নিয়ন্ত্রণহীন লাগে। যেনো তার মধ্যে অন্য কারো বাস। সে যা করছে, তার ভিতর থাকা সেই অন্য মানুষটা ওকে দিয়ে করাচ্ছে।
আরশাদ আসার সময় হয়ে গেছে। তার শরবত আর কফি দুইটাই টেবিলে ঢেকে রেখে এসেছে সে। আচ্ছা আরশাদ কি এসে তাকে খুঁজবে? চিন্তা করবে তার জন্য? নাকি স্বাভাবিকভাবেই শরবত খাবে বসে বসে? যা পারে করুক, ইরা ভাবতে চায়না। এই বাইশ বছর বয়সে এটা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছে সে যে নিজের জন্য ভাবনা ছাড়া আর কারো জন্য ভাবা বৃথা। বেশি ভাবলে মানুষটা ভেঙেচুরে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু সে যে না চাইতেও আরশাদের ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। এ থেকে মুক্তির উপায় কি?
ছাদে উঠে একটা লম্বা শ্বাস নেয় ইরা। ছাদটাও ভীষণ সুন্দর এ বাড়ির। চারদিকে রেলিং দেওয়া। ইরা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেয় রেলিঙ। বর্ষার পানি জমে আছে, বিকালের পর অল্প বৃষ্টি হয়েছে। তবে এখন মেঘ ভেঙে চাঁদ উঠেছে। বেশ বড় একটা চাঁদ। রূপোলী থালার মতো গোল। তার কিরণে ছাদ সয়লাব। ইরার মা বলতো উথাল-পাতাল জ্যোৎস্না। ইরার মা কলেজ পাশ কিন্তু তাকে দেখলে বা তার সাথে কথা বললে মনে হতো সে উচ্চশিক্ষিত। নামীদামী লেখকদের বই পড়তো। সবাই তাকে পাগল, মানসিক রোগী বলতো। কিন্তু ইরা শুধু জানতো তার মা পাগল নয়।
ইরা নিচের দিকে উঁকি দেয়। আচ্ছা এখান থেকে লাফ দিলে কি সে মারা যাবে? নাকি শুধু হাড়গোড় ভেঙে পঙ্গু হয়ে পড়ে থাকবে? মারা গেলে ভালোই হতো। মায়ের কাছে চলে যাওয়া যেতো। এই দুনিয়াটা বড্ড বিষাদ মা ছাড়া।
“মাঝে মাঝে চুলগুলো ছেড়েও তো দিতে পারো। সবসময় কদুর মায়ের মতো উঁচু করে খোঁপা করে রাখো কেনো বলো তো?”
ইরা চমকে উঠে পড়ে যেতে গেলে তাড়াতাড়ি রেলিঙ চেপে ধরে। বাইরের জামাকাপড়েই আরশাদ ছাদে উঠে এসেছে। হাতে কফির মগ।
“আপনি?”
“কি ভেবেছিলে? আমাকে ভয় দিবে? তোমাকে পাগলের মতো খুঁজতে খুঁজতে দম বন্ধ হয়ে যাবে আমার?”
“এসব কেনো ভাবতে যাবো? আমি এমন কেউ নই যে আমাকে খুঁজতে খুঁজতে আপনি পাগল হয়ে যাবেন।”
“তাহলে কাউকে কিছু না জানিয়ে এখানে এসেছো কেনো?”
“ভুল হয়েছে, ক্ষমা করবেন।”
ইরার রাগ উঠে যায়। তাকে কি এতোটা গায়ে পড়া ভেবেছে এই লোকটা? যদি হারিয়ে যায় তবে একেবারে নিঃশব্দেই যাবে। কাউকে কিছু না বলেই। কেউ খুঁজেই পাবে না কোনোদিন। সে চায়-ও না কেউ তাকে খুঁজুক।
কয়েকদিনের ক্রমাগত বৃষ্টিতে শ্যাওলা জমেছে ছাদে। ইরা রাগ দেখিয়ে দ্রুত হাঁটতে যেয়ে পা পিছলে আচমকা পড়ে যায় ছাদের উপর। ঘটনাটা এতো কম সময়ের মধ্যে ঘটে যায় যে দু’জনের কেউ কিছু বুঝতেই পারেনা কি হয়ে গেলো। মিনিট দুয়েক পর চোখ পিটপিট করে তাকায় ইরা। দেখে সে ছাদে মাঝে বসে আছে। বাম পা’টা মচকে গেলো কিনা কে জানে। তীব্র যন্ত্রণা করছে।
আরশাদ হাঁটু গেড়ে বসে ইরার সামনে। ইরা ব্যথা পাওয়া জায়গাটা ঘষছে হাত দিয়ে। জান বেরিয়েই যাবে যেনো এবার।
“কি লাভ হলো রাগ দেখিয়ে?”
ইরা ঝাঁঝের সাথে বললো,”আমি রাগ দেখাইনি।”
“নাও হাতটা ধরো। ঘরে চলো, বরফ লাগিয়ে দিবো।”
ইরা বাঁকা চোখে তাকায় আরশাদের বাড়ানো হাতের দিকে।
“প্রয়োজন নেই। আমি একাই পারবো।”
“নিশ্চিত তুমি?”
রাগে, কষ্টে, ব্যথায় চোখে পানি চলে আসে ইরার। কিসের রাগ নিজেই বুঝতে পারেনা সে।
“হ্যা নিশ্চিত, আপনি যান।”
“বেশ, আমি চলে যাচ্ছি। আর একটা কথা, তাড়াতাড়ি চলে এসো। বেশি রাত করোনা। অনেকেই বলে শুনেছি রাত হলে এই ছাদে কাদের যেনো দেখা যায়।”
ইরা অবাক হয়ে বললো,”কাদের দেখা যায়?”
“কি জানি! সবাই তো বলে মানুষ না নাকি। লম্বা, সাদা জোব্বা পরা। তাল গাছের মতো উচ্চতা। মানুষের কি এমন উচ্চতা হয়?”
ইরা মুখ বাঁকিয়ে বললো,”আমি ওসবে ভয় পাইনা।”
“গুড গার্ল। আমিও এসব বিশ্বাস করিনা। মানুষ তো কতো কথাই বলে। যাই হোক তাড়াতাড়ি চলে এসো হ্যা?”
আরশাদ উঠে দাঁড়ায়, শিষ বাজাতে বাজাতে চলে যায়।
ইরা একবার তাকায় চারপাশে। ভূত-প্রেতে তার সত্যিই ভয় নেই। কিন্তু এই নতুন পরিবেশে, চাঁদের আলোয় একাকী কেমন যেনো গা ছমছম করে ওঠে তার।
এদিকে পায়ে বেকায়দা লেগেছে। মনে তো হয়না একা একা উঠতে পারবে। ভাবের চোটে তো হাতটা ধরলো না আরশাদের।
“আচ্ছা হাতটা নাহয় ধরিনি। উনার বিবেকটাই বা কি? এভাবে একা রেখে কীভাবে চলে গেলো? আমার জায়গায় উনার ভালোবাসার মানুষ হলে পারতো এটা করতে? এতো নিষ্ঠুর কীভাবে হয় একটা মানুষ?”
বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে একা একা ওঠার চেষ্টা করে ইরা, সাথে সাথে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে।
আচমকা নিজেকে শূন্যে ভাসতে দেখে আর্তচিৎকার করতে গেলেই কেউ যেনো তার মুখ চেপে ধরে। গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে চোখ বড় করে তাকিয়ে দেখে আরশাদ পিছন থেকে এসে তাকে কোলে উঠিয়েছে। ইরার বুকটা ধকধক করছে তখনও। নিচে নামার জন্য ছোঁড়াছুড়ি করে।
“ভালোবাসার মানুষ হলে যেটা পারতাম না, এখনো তা পারছি না। নিষ্ঠুর হতে পারি, তবে এতোটাও না।”
ইরা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো,”নামিয়ে দিন আমাকে, আমি একাই যেতে পারবো।”
“সে পারবে কিন্তু আমি তো আর পাবো না।”
“কি পাবেন না?”
“অকারণে ছুঁয়ে দেওয়ার বাহানা।”
ইরাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আরশাদ সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। ভয় ইরার কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে না, আরশাদের মা এভাবে দেখলে কি কান্ড করে তার। ইশ কোন কুক্ষণে যে ছাদে উঠতে গিয়েছিলো সে!
(চলবে..…)

