Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-২১+২২

মন কেমনের মরশুম পর্ব-২১+২২

0
292

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ২১

আরশাদ খুব ধীর গতিতে বাইক চালাচ্ছে, ইরা অসহিষ্ণু হয়ে পিছন থেকে একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। আরশাদ নিরুত্তর, যেনো শুনতেই পারছে না ইরার কথা।

“এইযে কতোক্ষণ ধরে বলেই যাচ্ছি। কানে কথা যাচ্ছে না?”
“নো।”
“নো মানে?”
“নো মানে না, মুরগি তোর মা। শিয়াল তোর নানি, ঠ্যাং ধরে টানি।”
ইরা আঁৎকে উঠে বললো,”তার মানে? এসব কি বলছেন?”
“তোমাকে বলিনি। প্রাইমারি স্কুলে থাকতে বন্ধুবান্ধব মিলে এসব ছড়া বানাতাম।”
“তো এটা এখন বলার মানে কি? আমি কি আপনার প্রাইমারির বন্ধুবান্ধব?”
“না তা না। তবে প্রাইমারি স্কুলে থাকতে এক কন্যার প্রেমে পড়েছিলাম। দুই ঝুটি করে স্কুলে আসতো। সাহস করে একদিন প্রেম নিবেদনও করেছিলাম। প্রেমপত্রে লিখেছিলাম, ‘বিনি আমার বিনি, আমার সোনামণি। হাজার কয়লার মাঝে তুমি সোনার খনি।’ কন্যার নাম ছিলো বিনি।”
ইরা হতবাক হয়ে যায় আরশাদের কথা শুনে। প্রথম প্রথম ভেবেছিলো বোধহয় রাশভারি গোছের ভদ্রলোক। ভাজা মাছ উলটে খেতে জানেনা। এ তো ভাজা মাছ কাঁটা সহ খেয়ে নিতে পারে। প্রাইমারিতে বয়স কতোটুকু থাকে? তখনই এই অবস্থা?

“তারপর কি হলো? বিনি আপনার প্রেমে সাড়া দিলো?”
আরশাদ মন খারাপ করে বললো,”নাহ, প্রত্যাখ্যান করলো।”
“কেনো? আপনার ছন্দ পছন্দ হয়নি?”
“তা না। কন্যার প্রেমিক ছিলো। আমরা তখন চতুর্থ শ্রেণিতে। সেই প্রেমিক পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তো। বিরাট পালোয়ান সে প্রেমিক। মোটাসোটা, গায়ে গতরে খোদার খাসি। আমি হ্যাংলা পাতলা, তালপাতার সেপাহি তখন। প্রেমের ভাতে ছাই বাড়লাম। প্রেমই করবো না আর, সে প্রতিজ্ঞা নিলাম।”
ইরার রাগ হলেও প্রকাশ করেনা। একটু আগে কি বিশাল কান্ড ঘটিয়ে এলো। অথচ এমন ভাবে কথা বলছে যেনো কিছুই হয়নি।

“আপনার তো আমাকে নিতে আসার কথা ছিলো না। আমি তো একাই চলে যেতাম। আপনি কেনো এলেন?”
“না এলে ভালো হতো?”
“হতো বোধহয়। অন্তত কারো শত্রু হতে হতো না আপনাকে।”
“ও আচ্ছা!”
“ও আচ্ছা মানে? এখন ওরা যদি কোনো ক্ষতি করে আপনার?”
আরশাদ বাইকের গতি বাড়িয়ে দেয় হঠাৎ। ইরা ভেবাচেকা খেয়ে আরশাদের কোমরে হাত রাখে।

“সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়?”
ইরা ভ্রু কুঁচকে বললো,”তার মানে?”
“মানুষ যখন সমুদ্রে শয্যা পাতে তখন কি সে শিশির বিন্দুকে ভয় পায়?”
“তো আপনি কোন সমুদ্রে শয্যা পাতলেন?”
“ইরাবতীর সমুদ্রে।”
ইরা থতমত খেয়ে যায়। এরপর আর কিছুই বলতে পারেনা। আরশাদের মোটরসাইকেল হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে যেনো। ইরা ভয়ে আরেকটু আঁকড়ে ধরে আরশাদকে। অজানা ভয় আর দুশ্চিন্তা জেঁকে ধরে তাকে। যেভাবে ছেলেগুলো কথা বলছিলো, বোঝাই যাচ্ছিলো ওদের হাত অনেক লম্বা। নিজেকে নিয়ে ইরা ভয় পায়না। কিন্তু তার জন্য আরশাদ ঝামেলায় জড়ালো এখানেই তার ভয়। ধুর! কেনো যে থাপ্পড়ের কথা বলতে গেলো। নিজের উপর নিজেরই রাগ লাগছে এখন।

হঠাৎ ইরা চমকে ওঠে আরশাদের গানে।
“এ চুমকি চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে? হার মেনেছে দিনের আলো, রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো। এ সুন্দরী চলেছে একা পথে….”
ইরা ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক তাকায়। রাস্তার মানুষ বেশ অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। ইরা ওড়নাটা মুখের উপর চেপে ধরে। বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত ওড়না সরাবেই না সে, কোনোভাবেই না।

অনেকদিন পর আশাকে আজ পড়াতে এসেছে মহিবুল। আসার পর থেকেই গম্ভীর হয়ে আছে। পড়া বাদে আর কোনো কথা বলছে না।
আশা মাথা নিচু করে রেখেছে প্রথম থেকেই। ইরা যা যা শিখিয়েছে বার বার আওড়ায় মনে মনে কথাগুলো। কিন্তু মহিবুল সেদিকে কথা বাড়াচ্ছে না।

“আশা।”
আশা ঈষৎ কেঁপে ওঠে মহিবুলের ডাকে।
“জি স্যার।”
“তোমাকে যেটা বলেছিলাম কি ভাবলে তা নিয়ে?”
আশা জানে মহিবুল কোন কথা বলছে। আর সে এই অপেক্ষাতেই ছিলো। তবুও না বোঝার ভান করে বসে থাকে।

“কি হলো কি? চুপ করে আছো কেনো? নিজের সম্মান বাঁচাতে চাও না?”
আশা ক্ষীণ গলায় বললো,”চাই স্যার।”
“তাহলে তো আমার কথা শুনতেই হবে সোনা। আর সেইটা যতো তাড়াতাড়ি হবে তোমার পক্ষেই ভালো।”
আশা ঢোক চেপে বললো,”এরপর আমার ওসব আজেবাজে ছবি আর রাখবেন না তো আপনার কাছে?”
ফিচেল হাসি দেয় মহিবুল। মনে হচ্ছে পাখি ধরা পড়েছে খাঁচায়।

“ভদ্রলোকের এক জবান। ওসব আর রাখবো না আমার কাছে।”
আশার শরীর রাগে চিড়বিড় করে উঠলো। ভদ্রলোক? এই জানোয়ারটা নিজেকে ভদ্রলোক দাবি করছে? অসভ্য কোথাকার।

“স্যার।”
“বলো।”
“একটা কথা বলতে চাই।”
মহিবুল শান্ত গলায় বললো,”আমার প্রস্তাবে তোমাকে রাজি হতে হবে আশা। এ বাদে আর যা বলবে বলো।”
আশা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করে।

“স্যার আমাকে তো কলেজে বাবা দিয়ে আসে আর মা নিয়ে আসে। এ বাদে তো আমার একা কোথাও যাওয়া হয়না।”
মহিবুল রেগে বললো,”তবে কি চাচ্ছো তুমি….”
“স্যার আমার পুরো কথাটা শুনুন। আমি বলছিলাম যে…”
“আশা কথাবার্তা ভেবেচিন্তে বলবে।”
আশা ঢোক চেপে বললো,”অবশ্যই স্যার, অবশ্যই। আমার মা আগামী সপ্তাহের সোমবারে বাড়িতে থাকবে না। দুপুরে বাবা, ভাইয়াও বাড়িতে থাকে না। আমি একাই থাকি।”
মহিবুলের মুখটা চকচক করে উঠলো।

“তবে তুমি বলতে চাচ্ছো এখানেই?”
ঘৃণায় আশার শরীর রি রি করে ওঠে। ঠিক এই সময় তার সামনে বসে থাকা দুই পায়ের মানবমূর্তিটাকে নর্দমার কীট মনে হচ্ছে। ছিহ, কি ঘৃণ্য বিশ্রী একটা মুখ।

আশা মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে।
হঠাৎ মহিবুলের মুখটা অন্ধকার হয়ে যায়।
“আর তোমার ওই অতি চতুর ভাবীটা? সে কোথায় থাকবে?”
আশা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”ভাবীর কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে। উনিও ওই সময় বাড়িতে থাকবে না।”
ইরার কথা মনে পড়তেই মহিবুলের ঘাম ছুটে যায়। বাপ রে! ওটা মেয়ে নাকি সাক্ষাৎ এনাকোন্ডা। দেখতে তো শান্তশিষ্ট। কিন্তু দৃষ্টিটাই কেমন ভয়ংকর। শুধু দৃষ্টি দিয়েই হৃদয় ভেদ করে ফেলতে পারে। মহিবুল রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মোছে।

আশার ভীষণ হাসি পায় মহিবুলের অবস্থা দেখে।
“স্যার আপনি কি ভাবীকে ভয় পেয়েছেন?”
“কি বললে? কি বললে তুমি?” মহিবুলের কণ্ঠে উত্তাপ।
আশা তাড়াতাড়ি করে বললো,”মজা করলাম স্যার, রাগ করেননি তো?”
“এসব ফালতু মজা আর করবে না, একদম না।”
“জি আচ্ছা।”
“আর মনে রাখবে পরের সপ্তাহের সোমবার। ওদিন না হলে কিন্তু….”
“হবে স্যার, অনেক কিছুই হবে। আপনি চিন্তা করবেন না।”
মহিবুল হাসে। এটা হলে আশা তিন নাম্বার। আগে দুইটা পাখি শিকার করেছে সে। একটা বেশি ভীতু ছিলো। আত্মহ*ত্যা করে ফেললো শালীটা। ভাগ্য ভালো তার নাম লিখে যায়নি। মেয়েদের সাইকোলজির সে খুব ভালো বোঝে। ওরা ইজ্জত, সম্মান রক্ষা করতে সবকিছু করতে পারে। অথচ সেই ইজ্জতই খুইয়ে বসেছে দুইজন তার কাছে। আরেকজনও সেই পথে। ভালোই তো জীবন, এভাবে চললে ক্ষতি কি?

বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে নীলু। জুতাটা ছেঁড়ার আর সময় পেলো না। নতুন জুতা, ইটে বেঁধে গেলো ফট করে ছিঁড়ে বেকায়দা। তপ্ত রাস্তার উপর খালি পায়ে হাঁটা অসম্ভব। নীলুর ত্বক খুবই সংবেদনশীল, পায়ে ফোস্কা পড়ে যাবে নির্ঘাৎ।
এই রাস্তায় রিকশা পাওয়াটাও অসম্ভবের কাছাকাছি। প্রশাসন এদিকে রিকশা চলতে দেয়না, কিছুটা হেঁটে রিকশা নিতে হয়। কদাচিত নিয়ম ভেঙে দুই/একটা আসে।

রাগে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে নীলুর। তার কপালটা তাকে সঙ্গ দিচ্ছে না আজকাল। শেষমেশ ঠিক করে ফোস্কা পড়ে পড়ুক। খালি পায়েই হেঁটে যাবে রিকশা না পাওয়া পর্যন্ত।

হঠাৎ তার সামনে ঝড়ের বেগে একটা গাড়ি এসে থামে। নীলু চমকে উঠে দুই পা পিছিয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে তাকায় সে।

“এইযে রাবিশ, চোখ নেই? গাড়ি চালানোর সময় খোদার দেওয়া চোখ দু’টো ব্যবহার করতে পারেন না? নাকি বাড়িতে রেখে আসেন? আরেকটু হলেই তো গায়ের উপর উঠিয়ে দিচ্ছিলেন।”
গাড়ির কাঁচ খুলে যায়। নীলু হতবাক হয়ে দেখে আর কেউ না, রোশান। নীলুর রাগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

“এ কি আপনি?”
“কোনো অসুবিধায় পড়েছেন?”
“পড়লেও বা আপনার কি? আপনি কি সুপারম্যান? আমাকে সর্বাবস্থায় সাহায্য করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন?”
রোশান ঈষৎ হেসে সানগ্লাস খোলে। নীলু রাগে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে।

“আমি সুপারম্যান না, আমি খুব সাধারণ ম্যান। সাধারণ ম্যান হিসেবে সাহায্য করতে চাচ্ছি। গাড়িতে উঠে আসুন, আপনাকে নামিয়ে দিই।”
নীলু অবাক হয়ে যায় লোকটার সাহস দেখে। অতিরিক্ত করতে করতে মাথায় উঠে যাচ্ছে। সেদিন এতো বার বলার পরেও?

“সত্যি করে বলুন তো আপনি কি আমাকে অনুসরণ করছেন?”
“করলে কি রাগ করবেন?”
“অবশ্যই করবো। জীবনটা কোনো সিনেমা নয়, আপনি যা ভাবছেন। আর একটা কথা, আপনার বয়সটাও কিন্তু এসব করার নয়।”
রোশান মুচকি হাসে, নীলুর গা জ্বলে যায় হাসি দেখে। নেহাৎ লোকটা বাবার অসুস্থতার সময় অনেক সাহায্য করেছে। নাহলে কি যে করতো সে!

“বন্ধু হিসেবে সাহায্য করতে চাচ্ছি, তাতেও আপত্তি?”
“জি আপত্তি। আমার কোনো বন্ধুর দরকার নেই আর না তো দরকার আছে সাহায্য। দয়া করে আমাকে অনুসরণ করা বন্ধ করুন। খুবই বিরক্ত লাগছে আমার। নিজের বয়সের কথাটাও মাথায় রাখবেন।”
“কম বয়স হলে সাহায্য নিতেন?”
নীলু কথা বলেনা। জুতা খুলে হাতে নেয়। গাড়ি ফেলে উলটো দিক হাঁটা শুরু করে। নীলু ভেবেছিলো লোকটা আবার তার পিছন পিছন আসবে। কিন্তু না, নীলুর ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে গাড়িটা ভুস করে বেরিয়ে যায়। নীলু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। বাস্তব জীবনকে সিনেমা বানাতে ইচ্ছা করে না তার।

কিন্তু মিনিট দুই/তিন হাঁটতে না হাঁটতেই একটা খালি রিকশা দেখে নীলুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। যাক অবশেষে তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে।
গন্তব্য বলেই তাড়াতাড়ি উঠে বসে নীলু রিকশায়। রিকশা চলা শুরু করে। মোড় ঘুরতেই নীলু তীক্ষ্ণ চোখে দেখে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে এখনো। নীলু চোখ ফিরিয়ে নেয়।
রিকশাটা দৃষ্টিসীমা পার হতেই রোশান সানগ্লাস পড়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। নীলু বোধহয় কোনোদিন জানতেও পারবে না রিকশাটা রোশানই পাঠিয়েছে তার জন্য। জানলে কি সে উঠতো? মনে হয়না। যে তেজ বাপ রে!

হাতের ক্ষতটা কেমন দগদগে হয়ে আছে। বখাটেগুলো ছুড়ি চালিয়েছিলো। ইরা বার বার জোর করে আরশাদকে একবার ডাক্তার দেখিয়ে আসতে। আরশাদ পাত্তা দেয়না।
ইরা ওষুধ লাগিয়ে কাপড় পেঁচিয়ে দিয়েছে। আরশাদের সামান্য কিছু হলেও যেনো ইরার বুকটা ফেটে যায়। কি আশ্চর্য! সে কি কখনো ভেবেছিলো মাত্র ক’দিনের পরিচয়ে কাউকে এতোটা ভালোবেসে ফেলবে সে?

“কেনো করলেন এমন?”
“কি করলাম?”
“কেনো বখাটেগুলোর সাথে ঝামেলা করতে গেলেন?”
আরশাদ খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে পা নাড়াতে থাকে।

“তো তুমি কি আশা করেছিলে? তুমি একটা পাঠাকে বিয়ে করেছো? যে স্ত্রীর অপমান দেখে আঙ্গুল চুষবে? শাস্তি তো আরো বাকি ওদের।”
ইরা শিউরে উঠে বললো,”আর কিচ্ছু করবেন না আপনি। কলেজেই যাবেন না আপনি আর।”
“গেলে কি হবে?”
ইরা তেতে উঠে বললো,”ওরা যদি আপনার কোনো ক্ষতি করে দেয়?”
আরশাদ ইরার দিকে এগিয়ে আসে। ফিসফিস করে কানের কাছে যেয়ে বলে,”হারানোর ভয় পাচ্ছেন নূরবউ?”
ইরা নিজেকে সামলে বললো,”এটা কি স্বাভাবিক না? আপনি কি আশা করেছিলেন আপনার ক্ষতি দেখেও আমি নির্লিপ্ত থাকবো? আপনি কি একটা পাঠীকে বিয়ে করেছেন?”
আরশাদ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ইরার দিকে তাকিয়ে জোরে শব্দ করে হেসে দেয়। ইরা রাগে অন্যদিকে তাকায়।

“শোনো ইরা, পুরুষ মানুষ সবকিছু সহ্য করতে পারে। শুধু নিজের প্রিয় নারীদের অপমান বাদে। আমার জীবনে বর্তমানে সেই তালিকায় আমার মা, বোন আর তুমি। আমি ধ্বংসের শেষ প্রান্তে যেয়ে হলেও তোমাদের রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ নিয়ে নিশ্চয়ই তোমার কোনো অসুবিধা নেই।”
ইরা অন্যমনস্ক হয়ে যায়। একবার ভাবে মহিবুলের কথাটা বলে দেয় আরশাদকে। কিন্তু কি মনে করে থেমে যায়। আশা যখন বলেনি, ইরাও বলতে চাচ্ছে না আপাতত। তবে ইরা জানে যেদিন সত্যি আরশাদ জানতে পারবে, মহিদুলকে খু*ন করে ফেলতেও বোধহয় দুইবার ভাববে না আরশাদ।

“কি ভাবছেন নূরবউ?”
“কিছু না তো।”
আরশাদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। আজ পূর্ণিমা না, আবার অমাবস্যাও না। কিন্তু বেশ সুন্দর একটা চাঁদ উঠেছে আজ। এটা শুক্লপক্ষের চাঁদ। একদম যেনো রূপো গলে গলে পড়ছে প্রকৃতিতে।

“ইরা।”
“হু।”
“বাইরে হাঁটতে যাবে?”
“এতো রাতে?”
“ঘুম পাচ্ছে? তাহলে থাক।”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে করে বললো,”চলুন।”

চাঁদ তখন মধ্য গগণ থেকে কিরণ ছড়াচ্ছে। পিচের রাস্তা চিকচিক করছে সে রূপো গলা আলোয়। দুই মানব-মানবীর পদচারণা নিস্তব্ধ রাস্তাকে প্রাণ দিচ্ছে। কালো পাড়ের একটা সাদা শাড়ি পরেছে ইরা। চুলের আলুথালু খোঁপা তার শ্যামবর্ণা সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। অবাধ্য কিছু চুল ছন্দহীন বাতাসে মুখে আছড়ে পড়ছে বারবার। ইরা সরিয়ে দেওয়ার তাড়া অনুভব করেনা।
আরশাদ শক্ত করে চেপে ধরেছে ইরার বামহাত। নিজেকে ছোট্ট শিশুর মতো মনে হয় ইরার। মনে হয় এই শক্ত হাতের উপরই তার শান্তি, এখানেই তার আশ্রয়।

“নূরবউ আপনাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।”
ইরার শরীর আবারও শিরশির করে ওঠে।
“আচ্ছা নূরবউ ডাকার সময় ‘আপনি’ সম্বোধন করেন কেনো?”
“এই ডাকটা আমার দাদাজানের। তিনি সবসময় দাদীকে আপনি বলে ডাকতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন উনি আমার বাড়িওয়ালী, আপনি বলে ডাকবো না?”
ইরা গাঢ় গলায় বললো,”কতোটা ভাগ্যবতী হলে এতো ভালোবাসা পাওয়া যায়। আপনার দাদী বুঝি খুব রূপবতী ছিলেন?”
“শুধু রূপবতী হলেই কি ভাগ্যবতী হওয়া যায়? আমার দাদী তথাকথিত সুন্দরী ছিলেন না। ভ্রমর কালো ছিলো তার গায়ের রঙ। কিন্তু সেই রূপেই আমার দাদাজান মুগ্ধ ছিলেন। ভালোবাসা রূপ দেখে হয় নাতো।”

ইরা কি মনে করে একটু সাহসী হয়ে ওঠে। আরেক হাতে আঁকড়ে ধরে আরশাদের এক বাহু। আরশাদ অবাক হয়, কিছু বলেনা। শুধু হাসে ছোট্ট করে। শ্বেতশুভ্র পাঞ্জাবিতে অসম্ভব সুদর্শন লাগছে তাকে। ইরা বিশ্বাস করতে পারেনা এই রূপবান পুরুষটা তার মতো শ্যামবতীতে মুগ্ধ হয়েছে। এটা ভ্রম নয় তো?

“ইরা তোমার জন্য ছোট্ট একটা উপহার আছে।”
“উপহার? আমার জন্য?”
আরশাদ দাঁড়ায়, ইরাও দাঁড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ আরশাদ হাঁটু গেড়ে বসে ইরার সামনে। ইরা থতমত খেয়ে যায়। তার নিটোল সুন্দর বাম পা আরশাদ অতি যত্নে নিজের উরুর উপর রাখে। ইরা স্তম্ভিত হয়ে যায়।

পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা রূপার নূপুর বের করে আরশাদ। ইরা বিমুগ্ধ! চাঁদের আলো পড়ায় চিকচিক করে ওঠে নূপুরটা। আরশাদ ইরার পায়ে পরিয়ে দিতেই যেনো নূপুরের সৌন্দর্য বেড়ে যায় আরো।

“আপনাকে অফিশিয়ালি প্রেম নিবেদন করা হয়নি নূরবউ। অনুমতি দিলে করি?”
ইরা কম্পমান গলায় বললো,”প্রেমে পড়াটাই তো যথেষ্ট, নিবেদনের প্রয়োজন কি?”

আরশাদ কিছুক্ষণ থেমে বললো,”শুনছো রূপ রূপাঞ্জন অঙ্গনা, আমার হৃদয়ে জমেছে যন্ত্রণা। আমি ভ্রমর, তুমি সদ্য পরিস্ফুটিত জেসমিন, তোমার কস্তুরী সুবাসে মাখামাখি এ আস্তিন। রূপো রঙা চন্দ্র মধ্য গগণে, যার সৌন্দর্য ফিকে শুধু তোমার পানে। সুহাসিনী সুস্মিতা কিসের এতো ভয়? সখী ভালোবাসা কাহারে কয়, সখী এ যাতনা কাহারে কয়?”

মূর্তির মতো জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ইরা। তার মনে হয় এই মুহুর্তে একটু নড়লেই তার সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। তাকিয়ে দেখবে তার জ্যোৎস্না মাখা রজনীর বদলে একরাশ আঁধার।
এক অপার্থিব ভালোবাসায় মাখামাখি হওয়া দুই মানব-মানবী। যাদের নিখাঁদ, পবিত্র ভালোবাসার সাক্ষী হয় একটা ধূসর রাত, এক খন্ড বাঁকা চাঁদ। যে রাত সেদিন আঁধারে ঢাকেনি, যে চাঁদে সেদিন গ্রহণ লাগেনি।

(চলবে……)

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ২২

ভোরের নরম আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে যায় ইরার। বহু বছরের পুরোনো অভ্যাস। খুব ছোট থাকতে স্কুলের জন্য সকালে ঘুম থেকে ওঠা লাগতো। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করতো না মোটেই। সকালের ঘুমটাই যেনো স্বর্গীয় ছিলো ওর কাছে। মা বলতো সকালে যারা দেরি করে ওঠে তাদের শরীরের শক্তি কমে যায়, চোখের জ্যোতি কমে যায়। তখন ইরা খুব মানতো মায়ের কথা। মায়ের ভিত্তিহীন কথাগুলোও কি ভীষণ টানতো তাকে! এরপর তো সৎমায়ের সংসার। খুব সকালে উঠে ঘরের কাজ অনেকটা করেই কলেজে যাওয়ার জন্য ছুটি মিলতো। আর এখন চাইলেও দেরি করে উঠতে পারেনা।

ইরা উঠতে গেলেই টান লাগে। ঘুরে তাকাতেই দেখে আরশাদ তার শাড়ির আঁচল চেপে শুয়ে আছে। তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় একটা শিশুর মতো মনে হয়। আরশাদ যেনো খানিকটা চোরাবালি। ইরা প্রতিনিয়ত তাতে ডুবছে, একটু একটু করে। যে ডুবে যন্ত্রণা নেই, যে ডুবে শুধু শান্তি।

ইরা কিছুটা ঝুঁকে আসে আরশাদের দিকে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে অবলোকন করে আরশাদের ঘুমন্ত চোখজোড়া, এলোমেলো চুল, সিগারেট খেতে খেতে কিছুটা ধূসর হয়ে যাওয়া ঠোঁট।
ইরা আলতো করে আঙ্গুল রাখে আরশাদের ঠোঁটের উপর। ভোরের আলোয় একটু লজ্জা করে। সাবধান হয়ে নেয় আবার জেগে আছে কিনা। নাহলে পরে যে লজ্জা দিবে, ইরা মুখ দেখাতে পারবে না আর।

“এই ওষ্ঠদ্বয় শুধু আমার, এখানে শুধু আমার বিচরণ থাকবে। কোনো কালো ধোঁয়ার স্থান থাকবে না আর এখানে। মনে থাকবে?”
কথাটা বলে নিজেই মুখ টিপে হাসে ইরা। মাঝে মাঝে নিজের সাহস দেখে নিজেই অবাক হয়ে যায়। প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আগে কখনো ভাবেনি। সৎমায়ের ভাইয়ের ছেলে শায়ের একবার প্রেম প্রস্তাব দিয়েছিলো। সৎমায়ের সংসারে ইরার দূরাবস্থা দেখে সে বলেছিলো ইরাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবে এখান থেকে, সংসার করবে। ইরা রাজি হয়নি, কখনো চিন্তাও করেনি শায়েরকে নিয়ে। ইরার মনে হয়েছিলো তার মধ্যে হয়তো ভালোবাসার কোনো অনুভূতিই নেই। সে তো কখনো ভাবতেই পারেনি এভাবেও ভালোবাসায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়া যায়।

ইরার আঙ্গুলগুলো আরশাদের ঠোঁট ছেড়ে ঘন দাড়ির মধ্যে বিচরণ করে। অবাধ্য ঠোঁটজোড়া টানে তাকে সেদিকে। আরশাদের মতো মনে মনেই বলে, সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়?
ইরার কোমল ঠোঁটের স্পর্শ পড়ে আরশাদের কপালে, গালে, আর….?

ইরা লাজুক হেসে আরশাদের বাঁধন থেকে নিজের আঁচল ছাড়িয়ে উঠে যায় বিছানা থেকে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার পাখিগুলোকে দেখতে মন চায়। আচ্ছা ওদের কি এই বন্দী জীবন ভালো লাগে? মুক্ত আকাশে উড়তে ইচ্ছা করে না? ইরার খুব ইচ্ছা ওদের ছেড়ে দেওয়ার। সব প্রাণীর যেমন ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনি স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু আরশাদ বলেছে ওদের ছেড়ে দিলে ওরা বাইরে টিকতে পারবে না। ওদের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা এই খাঁচার মধ্যেই। বাইরের মুক্ত পরিবেশ ওদের জন্য দোজখ। মধ্য আকাশে ওঠার আগেই হয় ওরা পড়ে যাবে নাহয় শিকার হবে কোনো শিকারি পাখির। তারচেয়ে ভালোবাসায় মাখামাখি হয়ে এই খাঁচাতেই থাকুক ওরা। ঠিক যেমন ইরা বাসা বেঁধেছে এই আরশাদ নামক মহলে।

খোঁপা করতে করতে ইরা ঘরে ঢুকে দেখে আরশাদ উঠে বসেছে। চোখগুলো কেমন লাল হয়ে আছে তার। সারারাত নাক ডেকে ঘুমানোর পরেও কারো চোখ এমন লাল হয়ে থাকে? ইরা ঠোঁট কামড়ে হাসে।

আরশাদ ভ্রু নাড়িয়ে বললো,”হাসছেন যে?”
“আপনাকে দেখে।”
“আমাকে দেখে আজকাল হাসি পায় বুঝি?”
“না ঠিক আপনাকে দেখে না। আপনার চোখগুলো দেখে। কেমন লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে রাতে না ঘুমিয়ে নেশা করেছেন।”
আরশাদ হাই তুলে শান্ত গলায় বললো,”না ঘুমিয়ে নেশা করিনি। নেশা করে তারপর ঘুমিয়েছি।”
ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় আরশাদের দিকে।

“আপনার ঘুমের আগে তো আমি আপনার সাথেই ছিলাম। নেশা করেছেন মানে? কখন?”
আরশাদ ইরাকে কাছে আসার জন্য ইশারা করে। সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করা দেখে ইরা আর এগোয় না। আরশাদ রেখে দেয় জায়গামতো আবার।

“এবার এসো।”
ইরা মৃদু পায়ে হেঁটে তার কাছে দাঁড়ায়।
“সব নেশা ধোঁয়া ছেড়ে হয়না, কিছু নেশার জন্য শখের নারীর স্পর্শই যথেষ্ট। এবার মনে করে বলুন তো নেশা করেছি কিনা?”
ইরার মুখ লাল হয়ে ওঠে।

“এবার যান, আমার জন্য বড় এক মগ কফি বানিয়ে আনুন। প্রচুর ক্যাফেইন দরকার।”
“প্রচুর দরকার কেনো?”
“কিছুক্ষণ আগে স্বপ্ন দেখছিলাম একটা। স্বপ্নে দেখলাম আমি মাখন খাচ্ছি। মাখন প্রথমে আমার ঠোঁটে, এরপর আমার গালে, কপালে ছুঁয়ে দিলো কেউ। এরপর সেই নরম মাখন আমার….”
ইরা হতভম্ব হয়ে যায় আরশাদের কথায়।

“তার মানে আপনি….”
আরশাদ ইরার বিস্ফারিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়ায়। লজ্জায় ইরার শরীর কাঁপে।

“বরকে আদর করতে এতো লুকোচুরির কি আছে নূরবউ? আমি যখন তখন, যত্রতত্র আপনার জন্য নিয়োজিত।”
ইরা মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে। ভদ্রলোকের বেশে মিচকা শয়তান একটা!

“এখন যাও কফি বানিয়ে আনো। পারলে দুই মগ। অল্পে এ মাখনের স্বাদ ভোলা যাবে না।”
ইরাকে ওভাবেই রেখে আরশাদ বাথরুমে চলে যায়। খাটের উপর ধপ করে বসে পড়ে ইরা। সুখ সুখ যন্ত্রণা হচ্ছে তার। আজকাল মায়ের কথাও মনে পড়ছে ভীষণ। তার মা কি জানে তার সেই ছোট্ট মেয়েটা কি এক ভালোবাসার চাদরে মুড়ে আছে। মা কি দেখতে পারছে তাকে? ওই ভূবন থেকে কি এই ভূবন দেখা যায়? খুব জানতে ইচ্ছা করে ইরার।

বিষন্ন বিকেল, বই সামনে বসে আছে ইরা। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে বার বার। বাবার কথা মনে পড়ছে খুব। মানব মন মাঝে মাঝেই ভুল বা অন্যায় বোঝে না। শুধু আবেগকে প্রশ্রয় দেয়। আবেগ আর বিবেক একসাথে লড়াই করে। বিবেক চায় সব ভুলে যেতে কিন্তু আবেগ আঁকড়ে ধরে পুরোনো স্মৃতি, নাড়ির টান। কেনো যে বারবার ওই অসহায় মুখটা চোখের সামনে ভাসছে ইরা জানেনা। আলমারি থেকে সেই ওড়নাটা বের করে, যেটার কোণায় বেঁধে রেখেছিলো বাবার দেওয়া টাকাগুলো। ময়লা, পুরোনো নোট গুলো গুণতে বসে ইরা। সব মিলিয়ে তিনশ আশি টাকা। ইরার চোখের কোণা ভিজে ওঠে। এতো অল্পে ইরার কান্না পেতো না। সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো ওর। আজকাল সামান্যতেই কান্না পায়। কারো আদর স্পর্শ চায়। আরশাদ তার অভ্যাস পালটে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

“আসা যাবে?”
ভয়াবহ ভাবে চমকে ইরা পিছন ঘুরে তাকায়। দরজায় রাবেয়া বেগম দাঁড়িয়ে। খুব শান্ত ভাবেই। তবে তার চোখমুখে রাগ বা ভালোবাসা কিছুই নেই, কেমন নির্লিপ্ত।

ইরা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সে কি আবার কোনো ভুল করে বসলো?
“কেনো আসা যাবে না? অবশ্যই আসবেন। অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই তো।”
রাবেয়া বেগম ঘরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলায়।
“বাহ ভালোই গুছিয়ে রেখেছো সবটা। আমার দুই ছেলেমেয়েই ভীষণ অগোছালো। সবটা আমাকেই গুছিয়ে রাখতে হতো। তা-ও ভালো অন্তত ছেলের আর আমাকে প্রয়োজন নেই।”
ইরা থমথমে গলায় বললো,”মা’কে সন্তানের সবসময় প্রয়োজন, পদে পদে, প্রতিনিয়ত। মায়ের অভাব কেউ পূরণ করতে পারেনা।”
রাবেয়া ঈষৎ হেসে বললো,”তুমি কি বুঝবে? যেদিন মা হবে, তোমার সন্তানও এমনটা করবে সেদিন বুঝবে।”
হাসির বিপরীতে ইরাও হাসি ফিরিয়ে দেয়।
“জীবনে মায়ের গুরুত্ব আমার চেয়ে ভালো আর কে বুঝবে? মা চলে যাওয়ার পর আমার সাজানো-গোছানো জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেলো। তবে হ্যা আপনার কষ্টটিকেও আমি লঘু করে দেখছি না। আমি হয়তো উপন্যাসের নায়িকাদের মতো স্বার্থহীন হতে পারিনি। আমি স্বার্থপর। আর স্বার্থপর বলেই নিজের দিকটা ভেবেছি শুধু। এক টুকরো সুখের আশায় সবকিছু ছেড়ে উনার হাত ধরে চলে এসেছি। আমি আপনার জায়গায় থাকলে সেটাই করতাম যেটা আপনি করছেন।”
রাবেয়া বেগম ইরার বইগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে হাসে।

“প্রথমে ভেবেছিলাম আরশাদ বোধহয় তোমার রূপ দেখেই তোমাকে পছন্দ করেছে। কিন্তু না যদি তাই হতো তবে সে নীলুকে দূরে ঠেলে দিতো না। নীলুর মতো রূপবতী মেয়ে তার সর্বস্ব উজাড় করে অসহায় হয়ে বারবার দাঁড়িয়েছে আরশাদের কাছে। ছোট্ট একটা ভুল বোঝাবুঝি, ওদের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট। যাক সেসব! এখন বুঝতে পারছি আরশাদ তোমার কথার প্রেমে পড়েছে। বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলো। পুরুষ মানুষ কথা শুনেই মোহগ্রস্ত হতে পারে হয়তো।”
নীলুর কথা শুনে মুখটা অন্ধকার হয়ে যায় ইরার। কতোটা গভীর সম্পর্ক ছিলো আরশাদ আর নীলুর? আরশাদ বলেছে খুব অল্প সময়ের জন্য নীলুর সরলতার প্রেমে পড়েছিলো সে। ইরা আরশাদকে বিশ্বাস করে। কিন্তু কি এমন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিলো তাদের মাঝে? ইরা জিজ্ঞেস করতে যেয়েও থেমে যায়।

“হ্যা আরশাদের বিয়েতে আমি কষ্ট পেয়েছি। এখনো মেনে নিতে পারিনি তোমাকে। আরশাদের বাবার মতো আহ্লাদে গদগদ হয়ে যেতে পারিনা আমি সহজে। যতোটা রাগ আরশাদ আমাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছে তার জন্য, তারচেয়েও বেশি কষ্ট নীলুকে এ বাড়িতে আনতে না পেরে। ও আমার বোনের মেয়ে না, ও আমার কাছে নিজের মেয়ের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ওর মা নেই, আমিই ওর মা।”
ইরার বুকটা কেমন মুচড়ে ওঠে। ম্লান হাসে সে।

“মা তো আমারও নেই। তবুও নীলু আপা মায়ের রূপে আপনাকে পেয়েছে। আমি তো তাও পাইনি। আমি কি উনার চেয়েও অসহায় নই?”
রাবেয়া বাঁকা চোখে ইরার দিকে তাকায়। শেষ বিকেলে গোসল দেওয়ায় ভেজা চুল, পাতলা সুতি শাড়ি। ভীষণ মায়াবতী মেয়েটা। হয়তো তাকে মেনে নেওয়াটা কষ্টকর। কিন্তু তাকে কষ্ট দিয়ে বলা কথাগুলো একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। রাবেয়া একটু ইতস্তত করে সেসব ভেবে।

“তুমি বুঝি শাড়ি পরতে খুব পছন্দ করো? প্রায়ই দেখি শাড়ি পরো।”
ইরা স্মিত হেসে বললো,”জি করি। আমার মা শাড়ি পরতেন সবসময়। আমিও ভাবতাম বড় হলে শুধু শাড়িই পরবো।”
“আমারও এক সময় শাড়ির শখ ছিলো খুব। আরশাদের বাবার পছন্দ ভালো না। তাও হাতে করে যা এনে দিতো তাই পরতাম। আরশাদের পছন্দও তার বাবার মতোই। একেবারে যা-তা।” রাবেয়া বেগম হাসে আবারও।
ইরা অপ্রস্তুত বোধ করে। উনি তার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেনো? যেনো সবটা কতো সহজ। ইরার এলোমেলো লাগে কেমন।

“তুমি কি আমার সেই সময়কার শাড়িগুলো দেখতে চাও?”
ইরার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শাড়ি বাঙালী মেয়েদের একটা আবেগের নাম। সে নিজের হোক বা অন্যের। শাড়ি দেখতেই ভালো লাগে।
ইরা আগেপিছে না ভেবেই বললো,”জি দেখতে চাই।”
“চা বানাতে পারো?”
ইরা অবাক হয়ে বললো,”পারি।”
“তাহলে দুই কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো। গল্প করতে করতে চা খাওয়া যাবে।”
ইরা হতভম্ব হয়ে যায়। সবকিছু কেমন গোলমেলে লাগে তার।

“আপনি আমার সাথে গল্প করবেন?”
“তোমার পড়ার ক্ষতি হবে? তাহলে থাক।”
“না না কি বলছেন। কোনো অসুবিধা নাই।”
রাবেয়া বেগম হালকা হেসে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ইরা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কষ্ট পেতে পেতে যে আত্মা অভ্যস্ত, সে আত্মা সহজে বিগলিত হতে চায়না।

বাবাকে ওষুধ খাইয়ে বড় বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে নীলু। আজকাল রাতে তার ঘুম আসেনা। বাবার অসুস্থতার পর ঘুম যেনো একেবারেই বিদায় নিয়েছে। সারারাতই বলতে গেলে জেগে থাকে সে। পুরোনো স্মৃতিগুলো হাতড়ায়। না চাইতেও মস্তিষ্ক আগের কথাগুলো জমা করে চোখের সামনে।
এইতো কিছু বছর আগেই জীবনটা কি সুন্দর রঙিন ছিলো। আরশাদ তার প্রেমে পড়ার প্রারম্ভিক সময়ে। এক তীব্র শীতের রাতে নীলু কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন করে আরশাদকে।

“আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না আরশাদ। তুমি এসো।”
আরশাদ তাড়াহুড়ো করে বলেছিলো,”কি হয়েছে নীলু? শরীর খারাপ?”
“জানিনা কি হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে তোমাকে না দেখতে পেলে আমার দমবন্ধ হয়ে যাবে। আমি মরে যাবো আরশাদ।”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন কেটে দেয়। নীলু ভেবেছিলো আরশাদ আসবে না। আরশাদ শীত সহ্য করতে পারেনা, ঠান্ডায় এলার্জির সমস্যা বেড়ে যায় ওর। জ্বর চলে আসে।

কিন্তু না, নীলুকে অবাক করে দিয়ে ওই শীতের রাতেই আরশাদ বাইক নিয়ে ছুটে চলে আসে। সে যখন পৌঁছায় তখন রাত দেড়টা প্রায়। নিজাম হোসেন দরজা খুলে হতবাক।
“আরশাদ তুমি এতো রাতে?”
“নীলু এখন কেমন আছে খালু?”
নিজাম হোসেন আরো অবাক হয়।
“নীলু অসুস্থ নাকি? কই আমি জানিনা তো।”

আরশাদ বোধহয় সেদিন বিরক্ত হয়েছিলো কিছুটা নীলুর উপর। কিন্তু বসার ঘরে প্রায় ছ’ফুট লম্বা পুরুষটা, যে এই শীতের রাতে ভারী জ্যাকেট, মাফলার পরে কিছুটা রাগী মুখে বসে ছিলো। নীলু ঠিক করেই ফেলেছিলো জীবনে যে কোনোকিছুর মূল্যে এই মানুষটাকে তার চাই। চাই-ই চাই।

“কেনো ছুটে এলে আরশাদ?”
“তুমি অসুস্থ বললে যে। মিথ্যা বলেছো?”
“কেনো? এসে আফসোস করছো এখন?”
“নীলু তুমি কি নিজেকে হুমায়ুন আহমেদের গল্পের নায়িকা মনে করো? এসব কি ছেলেমানুষী?”
নীলু আরশাদের হাত জাপটে বলেছিলো,”তুমি কি রাগ করেছো আরশাদ?”
আরশাদ হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিলো সাথে সাথে।

“যদি তোমার ছেলেমানুষী শেষ হয়ে থাকে তবে আমি এখন ফিরবো।”
“ফেরার কি দরকার? আজ রাতটা থেকে যাও।”
“নীলু আগামীকালই আমাকে খুলনা চলে যেতে হবে। সকাল সাতটায় বাস। সব জেনেশুনেও তুমি…”
“আবার কবে আসবে?”
আরশাদ উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলো,”জানিনা। অপেক্ষা করো, চলে আসবো খুব তাড়াতাড়ি।”

নীলু সেদিন চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলো ‘যেও না আরশাদ। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমি তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি।’
বলতে পারেনি, আরশাদ তখন কুয়েটের ছাত্র। ফিরতে তো তাকে হবেই। নীলু নিজেকে সামলে নিয়েছিলো একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। এই সেই ভবিষ্যৎ? এই দিনের জন্য এতো ত্যাগ ছিলো তার?

পুরোনো কথাগুলো ভাবতে ভাবতে দূরে তাকায়। আহত সেই কুকুরটা সন্তানসম্ভবা ছিলো তখন। এখন বাচ্চা হয়েছে তিনটা। তাদের আগলে কুকুরটা শুয়ে আছে। এখন সে অনেকটাই সুস্থ। নীলু ছোট্ট করে হাসে সেদিকে তাকিয়ে। সুখী হতে আসলে কি প্রয়োজন হয়? নীলু ভেবে পায়না।

পোস্ট অফিস থেকে বের হয়ে হাঁটছে ইরা। অনেকদিনের লেখা জমেছিলো। সব একসাথে জমা দিয়ে এলো।
উদাস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা পার হচ্ছিলো ইরা। হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় সে। চোখ বড় বড় হয়ে যায় মুহুর্তেই।

রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে পলাশ, তার সৎ ভাই। চোখেমুখে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষা করছে। বড় গাড়ির জন্য পারছে না।
ছেলেটা ইরাকে বড় বোন হিসেবে সম্মান করতো না, অসম্মানও যে করতো তাও না। তার সাথে ইরার সম্পর্ক ছিলো শিথিল। খুব একটা কথাও পলাশ বলতো না ইরার সাথে কখনো।
কিন্তু আজ এতোদিন পর পলাশকে দেখে মনটা কেমন করে ওঠে ইরার। আপন মুখগুলো বড্ড মায়ায় ফেলে।
ইরা কিছু না ভেবেই ছুটে যায় পলাশের দিকে।

“পলাশ।”
পলাশ স্তম্ভিত হয়ে তাকায় ইরার দিকে। তার চোখও বড় বড় হয়ে যায় মুহুর্তেই।
“ইরা আপা, তুই?”
“কেমন আছিস পলাশ?”
পলাশের বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। সে বিশ্বাস করতে পারছে না ইরা তার সামনে।

“কি রে পলাশ? এমন লাগছে কেনো তোকে? কোনো সমস্যা?”
পলাশ কাঁপা গলায় বললো,”ইরা আপা বাবা বোধহয় আর বাঁচবে না রে।”
ইরার মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ ঘটে সাথে সাথে।

“কি বলছিস তুই?” ইরার চিৎকারে আশেপাশের কয়েকজন তাকিয়ে পড়ে তার দিকে। ইরার সেদিকে মাথাব্যথা নেই।
“হ্যা রে আপা। গতকাল বিকাল থেকেই বাবার শরীর খুব খারাপ। মা ডাক্তার ডাকতে দেয়নি। বলেছে এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবে নাকি। আমার কাছে কোনো টাকাও ছিলো না যে নিজেই ডাক্তার ডেকে আনবো। কিন্তু আজ সকালের পর থেকে বাবা সুস্থ হওয়ার বদলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যায়। দুইবার রক্তবমি করেছে। চোখ উলটে পড়ে আছে। আমি আর বাড়ি থাকতে পারিনি রে ইরা আপা। ডাক্তারের পা ধরে হলেও নিয়ে যাবো। বাবাকে বাঁচাতে হবে রে আপা।”
ইরার মাথা ঘুরে ওঠে। এজন্যই বুঝি গতকাল বিকালে বাবার জন্য মনটা কেমন করছিলো। ইরা মাথা ধরে দাঁড়ায়, মনে হচ্ছে ঘুরে পড়ে যাবে।
পলাশ ইরার হাত ধরে।
“আপা তুই ঠিক আছিস?”
“পলাশ, ও পলাশ। বাবা বেঁচে আছে তো? বল না, বাবা এখনো বেঁচে আছে তো?”
“আসার সময় অবস্থা ভালো দেখিনি। এখন কি অবস্থা জানিনা। রাতে বার বার তোর নাম নিচ্ছিলো। কিন্তু সকাল থেকে একেবারে চুপচাপ। কোনো কথাও বলছে না, খাওয়া দাওয়াও করছে না।”
“বাবা আমার নাম নিয়েছে? বাবা?”
“হ্যা অনেকবার।”
ইরা নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়ায়। কম্পমান হাতে ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে পলাশের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

“এক্ষুনি ডাক্তার ডেকে নিয়ে আয় পলাশ।”
পলাশ ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে থাকে তবুও।
“কি রে ধর। বাবাকে বাঁচাতে হবে না?”
পলাশ টাকাগুলো হাতে নেয়। ইরার হাত ভীষণ ভাবে কাঁপছে।

“তাকিয়ে দেখছিস কি? দৌড়ে যা।”
“আপা তুই বাবাকে দেখতে যাবি না?”
ইরা থমকে যায়। কি করবে সে? যাবে ওই বাড়ি? আরশাদ যে চায়না ইরা ও বাড়ি আবার যাক। কিন্তু বাবা? যদি সত্যিই খারাপ কিছু হয়ে যায়? তাহলে নিজেকে ক্ষমা করবে কীভাবে সে? এই কষ্ট, এই গ্লানি তো আজীবন বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। বাবা যে তার নাম নিয়েছে, তাকে দেখতে চেয়েছে বোধহয়।
ইরাকে একটা মোবাইল দিয়েছে আরশাদ। ইরা মোবাইল ব্যবহার করে অভ্যস্ত না। ব্যাগেই পড়ে থাকে। কি মনে করে ওটা বের করতেই দেখে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে, চার্জ নেই।
রাগে ইরার নিজের চুল নিজেরই ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। আরশাদকে না জানিয়ে ও বাড়ি যাবে সে? এদিকে বাবার এই অবস্থা। ইরার মনে হয় এমন বিশ্রী বিকেল তার জীবনে কোনোদিন আসেনি। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার।

“ইরা আপা, শুনতে পাচ্ছিস? কি করবি তুই?”
ইরা পলাশের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রের মতো বললো,”তুই ডাক্তার ডেকে নিয়ে আয়, আমি বাবার কাছে যাচ্ছি।”

(চলবে…..)