#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ২৩
ইরা যখন কাঁচাপাকা বাড়িটার সামনে যেয়ে দাঁড়ায় তখন আসরের আজান দিচ্ছে। ছোট্ট গেটটা সবসময় আটকানোই থাকে, আজ খোলা। ইরার বুক কাঁপছে। ছোট থেকে বড় হওয়া যে বাড়িটায় সেই বাড়িটা কেমন অচেনা লাগছে তার। মনে হচ্ছে কতো বছর পর যেনো এলো। বাড়ির গেটের মাধবীলতা গাছটা মৃতপ্রায়। অথচ কতো জলজ্যান্ত ছিলো গাছটা, কতো ফুল ফুটতো রোজ। ইরা যত্ন করতো খুব গাছটার। এখন বোধহয় কেউ আর যত্ন করেনা।
ইরা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে গেটে হাত রাখে। ভিতরটা চুপচাপ, কারো কোনো কথা নেই, আওয়াজ নেই। সৎমায়ের মুখটা মনে পড়লে ভয় করছে। কিন্তু বাবার কথা চিন্তা করে আর পিছু হটতে পারেনা সে। গেট খুলে দৃঢ় কিন্তু ধীর পায়ে ঢোকে বাড়ির মধ্যে।
এক ফালি ছোট্ট উঠোন পেরিয়ে একতলা একটা বাড়ি। টিনের চাল কিন্তু পাকা ঘর, পাকা মেঝে। ভিতরে মোট তিনটে ঘর। একটা ঘরে তার বাবা থাকে, আরেকটা ঘরে পলাশ। পলাশের ঘরটাই আগে ইরার ঘর ছিলো। পলাশ বড় হওয়ার পর ইরাকে বাধ্য করা হয় ঘর ছাড়তে।
অন্য যেটা আছে ওটাকে ঠিক ঘর বলা যেতো না, বড় টানা বারান্দার এক পাশে পর্দা লাগিয়ে আলাদা করা হয়েছে। ওখানে ইরা থাকতো, ইরার সাথে ইরার ছোট বোন মীরাও থাকতো। মেয়েটা পলাশেরও ছোট, সামনে মাধ্যমিক দিবে। মীরাও ইরাকে খুব একটা পছন্দ করতো না কখনো। একসাথে থাকতে হতো কারণ আর কোথাও জায়গা ছিলো না। ওটুকু ঘরকেই ইরা সাজিয়ে রাখতো নিজের মতো করে, পরিপাটি করে। ছোট্ট আয়নায় লাগানো থাকতো টিপ, তার পাশেই কাজল আর চুড়ির জন্য ছোট্ট একটা ঝুড়ি। ইরার বুকটা খা খা করে ওঠে। খুব ইচ্ছা করে একটাবার নিজের সেই খুপড়ি ঘরটা দেখে আসতে। কিন্তু না, সে আজ এখানে এসেছে শুধু তার বাবাকে দেখতে। কোনো স্মৃতিচারণ করতে নয়।
ইরা আস্তে আস্তে বাবার ঘরের পর্দা সরাতেই দেখে তার বাবা বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। পাশেই মীরা বসে আছে খারাপ করে। তার মা কে কোথাও দেখতে পায়না।
বাবার শ্রান্ত মুখটা দেখে ইরার কলিজা ছিঁড়ে যায়। এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো তার? এই মায়ার উৎস কোথায়?
“মীরা…”
মীরা যেনো ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। এক লাফে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে ইরার দিকে। ইরা এদিক ওদিক তাকিয়ে তার সৎমাকে খোঁজে।
“ইরা আপা, তুমি?”
ইরা সিক্ত গলায় বললো,”কেমন আছিস মীরা? বাবা কেমন আছে?”
মীরা উত্তর দেয়না। কেমন ভীত চোখে তাকিয়ে থাকে ইরার দিকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
“কি রে? চুপ করে আছিস কেনো? বাবার কি অবস্থা এখন?”
“তোমাকে কে খবর দিলো? কেনো এসেছো তুমি?”
ইরা কিছুটা ক্ষোভের সাথে বললো,”আমার বাড়িতে আমার বাবাকে দেখতে আসতে পারিনা আমি? অনুমতি লাগবে তোদের?”
মীরা দুই পা পিছিয়ে যায়। ইরা কখনো এভাবে কথা বলতো না। রাগ হলেও প্রকাশ করতো না। কেমন যেনো যন্ত্রের মতো ব্যবহার ছিলো তার। এই ইরাকে মীরা চিনেনা।
ইরা মীরাকে পাত্তা না দিয়ে তার বাবার কাছে এসে দাঁড়ায়। এক ধাক্কাতেই বয়স বেড়ে গেছে যেনো মানুষটার। কেমন নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। ইরা বাবার কপালে হাত দেয়, তাপমাত্রা স্বাভাবিক। ইরা কিছুটা স্বস্তি পায়।
মীরা আর এক মুহুর্ত দেরী না করে পড়িমরি করে দৌড়ায়, বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে।
ইরা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বাবার কাছে এসে বসে। একটা সময় এই মানুষটার উপর সীমাহীন অভিমান ছিলো ইরার। তার জীবনের এই অবস্থার জন্য এই মানুষটাকেই দায়ী করেছে। উপরে প্রকাশ না করলেও ভিতরে সবসময় চাপা রাগ ছিলো তার বাবার উপর। কিন্তু আর যাই হোক তাকে এই অবস্থায় কখনো দেখতে চায়নি ইরা, তাকে হারাতেও চায়নি কখনো।
জালাল আলীর চোখ খুলে যায়। হালকা আধবোজা চোখে তাকায় সে। তাকাতেই শরীর শীতল হয়ে ওঠে তার।
“আমি স্বপ্ন দেখছি তাই না রে ইরা?”
ইরা বাবার বাম হাত চেপে ধরে জোরে।
“কোনো স্বপ্ন দেখছো না বাবা, তুমি তো জেগে আছো।”
জালাল আলী ম্লান হাসে।
“তুই বললেই হবে? আমি জানি আমি স্বপ্ন দেখছি। আমি দেখছি আমার মেয়ে আমার পাশে। যাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু জীবনের শেষ মুহুর্তে এসে তাকেই বারবার মনে করছি। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব। আমার মেয়ের আমার প্রতি আকাশ সমান ঘৃণা। সে কখনো আসবে না আমার কাছে।”
ইরার চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা পানি আলগোছে বেয়ে পড়ে।
“বাবা ও বাবা, আমি সত্যি তোমার সামনে। কোনো স্বপ্ন দেখছো না তুমি। আমি সত্যি এসেছি বাবা। তোমার অসুস্থতার খবর শুনে আমি আর দূরে থাকতে পারিনি।”
জালাল আলী অনেক কষ্টে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায় ইরার দিকে। ইরার মুখটা পরিষ্কার ভাবে দেখা যাচ্ছে এখন। কি মায়াভরা একটা মুখ। ইরা কোথায়? এ যে হুবহু তহুরা বসে আছে, তার মৃত স্ত্রীর মুখটা দেখতে পায় যেনো সে।
“ইরা তুই সত্যি এসেছিস? আমি স্বপ্ন দেখছি না?”
“না বাবা তুমি স্বপ্ন দেখছো না। তুমি আমাকে মনে করেছো, তাই আল্লাহ আমাকে তোমার কাছে এনেছে। আর কিসের ঘৃণার কথা বলছো? পিতামাতার উপর সন্তানের ঘৃণা থাকতে পারে কখনো? রাগ হয়, অভিমান হয় কিন্তু ঘৃণা নয় বাবা।”
জালাল আলী ফ্যাসফ্যাসে গলায় কাঁদে আর কি কি যেনো বলে। কিচ্ছু বোঝা যায়না। ইরা বারবার দরজার দিকে তাকায়। পলাশ এখনো ডাক্তার নিয়ে আসছে না কেনো?
“আমি তোর সাথে অনেক অন্যায় করেছি রে মা। আমি একজন মেরুদণ্ডহীন ব্যর্থ বাবা। আমি সেই শাস্তি পাচ্ছি। শুধু এই দুনিয়ায় না, আমি পরকালেও শাস্তি পাবো। আমি আমার ঘরের জান্নাতের সাথে অন্যায় করেছি, শাস্তি পাবো না? অবশ্যই পাবো।”
ইরা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”চুপ করো না বাবা। দয়া করে চুপ করো।”
“তুই থাকবি তো আমার কাছে একটু?”
ইরা চুপ করে থাকে। আরশাদকে জানানো প্রয়োজন সে এখানে। কি তুলকালাম ঘটায় নাহলে ঠিক নেই। ইরার মাথা আপাতত কাজ করা ছেড়ে দেয়।
★
“যতো জ্বালা হয়েছে আমার। বুড়োটা কবে মরবে ঠিক নেই। দুই পয়সার রোজগার নেই, কিন্তু বিছানায় পড়লে ঠিকই আমার সেবা করা লাগবে।”
আঞ্জুমান রাগে গজগজ করছে আর পাতলা সুজি রান্না করছে উনুন ঠেলে। জালাল আলী কিচ্ছু খেতে পারছে না পাতলা সুজি ছাড়া।
“মা, ও মা….”
মীরা হাঁপাতে থাকে একনাগাড়ে। আঞ্জুমান ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে।
“কি রে? বুড়োটা মরেছে?”
মীরা মায়ের উপর কিছুটা রাগ হলেও প্রকাশ করেনা।
“উফফ মা, একটু থামবে?”
আঞ্জুমান গরম কড়াই চুলা থেকে নামাতে নামাতে বললো,”তোদের ঢং দেখে গা জ্বলে যায়। কি হয়েছে দ্রুত বল। আর এখান থেকে বিদায় হ। তোদের দেখতে ইচ্ছা করছে না।”
মীরা চাপা গলায় বললো,”মা ও আবার এসেছে।”
আঞ্জুমান কাজ করতে করতেই বললো,”কে এসেছে?”
মীরা ঢোক চেপে কণ্ঠ আরো নামিয়ে বললো,”ইরা… মানে ইরা আপা এসেছে।”
আঞ্জুমানের হাত থেকে স্টিলের চামচ পড়ে যেয়ে ঝনঝন শব্দ হয়। কিছুটা গরম সুজি ছুটে এসে গায়ে পড়ে, জ্বালা করে ওঠে সাথে সাথে। কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। স্তম্ভিত হয়ে যায় সে।
“কি বললি তুই?”
“হ্যা মা, এই মাত্রই। বাবার কাছে এসে বসেছে। আবার বলছে এই বাড়ি তার, বাবা তার সে আসতেই পারে।”
“তাই বলেছে?”
মীরা মাথা নাড়ে। আঞ্জুমান ঘন ঘন তপ্ত শ্বাস ফেলতে থাকে। তার রাগ হওয়া উচিত, রাগে চিৎকার করা উচিত। কিন্তু অবাক ব্যাপার, তার রাগ উঠছে না। কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না। শুধু জানতে ইচ্ছা করছে এতোদিন পর এখানে কি মনে করে? তাও আবার বাবার অসুস্থতার সময়ে। বাড়ির ভাগ নিতে? এই বাড়ির সিংহভাগ যে ইরার নামে, এটা সে জানতে পেরেছে কোনোভাবে?
★
বিকেলের পর হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে ঝড় নেমেছে। যেনোতেনো ঝড় নয়, প্রকৃতিতে যেনো প্রলয় ডেকেছে। গাছপালা আছড়ে পড়ছে। এক পর্যায়ে সে ঝড় ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়েছে। কেউ কেউ বলছে গত কয়েক বছরে এমন ঝড় নামেনি। বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে পিলে চমকে উঠছে সবার।
ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বাড়ি ঢোকে আরশাদ। শরীর ভিজে গেছে একদম। বাসায় ঢুকতেই বসার ঘরে পাংশু মুখে রাবেয়া বেগম আর আশাকে বসে থাকতে দেখে ম্লান হাসে সে।
“মা ভীষণ মাথা যন্ত্রণা করছে। ঘরে যাচ্ছি, পরে কথা বলবো তোমার সাথে।”
আরশাদ ঘরে চলে যায়। ফিরে আসে দুই মিনিট পরেই।
“মা ইরাকে দেখছি না ঘরে। ও কি রান্নাঘরে? তাহলে ওকে বলো আমার জন্য এক মগ কফি বানিয়ে আনতে। আজ অনেক ধকল গেছে, মাথা ধরেছে।”
রাবেয়া বেগম একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। ভীত মুখে আশাও দাঁড়ায়। মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে আছে তার।
আরশাদ কিছুটা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়।
“মা সব ঠিক আছে তো?”
“না সব ঠিক নেই।”
“মানে? কি হয়েছে?”
রাবেয়া বেগম শীতল গলায় বললো,”তোমার স্ত্রী কলেজ থেকে বাড়ি ফেরেনি আজ।”
প্রকৃতিতে নয়, বাজটা পড়ে আরশাদের মাথায়। যেনো পারমাণবিক বো মা বিস্ফোরণ ঘটে মস্তিষ্কে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেনো কিছু মুহুর্তের জন্য।
“মা আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। দয়া করে মজা করোনা। ইরা বাড়িতেই আছে হয়তো, ডাকো ওকে।”
“তোমার সাথে মজা করার ইচ্ছা বা সময় কোনোটাই আমার নেই। ইরা আজ কলেজের পর বাসায় আসেনি।”
আরশাদ আচমকা চিৎকার করে ওঠে। পাশে থাকা একটা পিতলের ফুলদানিতে তার ছোঁয়া পড়তেই ঝনঝন শব্দ করে মেঝেতে পড়ে।
“মা একটা মেয়ের কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার কথা বিকালে। সেখানে এখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। মেয়েটা বাড়ি ফেরেনি। আর তুমি সেইটা আমাকে এখন জানাচ্ছো?”
“চিৎকার করবে না আরশাদ। গলা নামিয়ে কথা বলো। নিজের মোবাইল দেখো। কতোবার ফোন করা হয়েছে তোমাকে? কেনো বন্ধ করে রেখেছো? তোমার বাবা এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ওর কলেজে পর্যন্ত গেছে সবটা শুনে। এরপর কোথায় কোথায় খুঁজে বেড়াচ্ছে তাও জানিনা। আর তুমি কিনা চিৎকার করছো। এসব শিক্ষা কে দিয়েছে তোমাকে বেয়াদব?”
আরশাদ মাটিতে বসে পড়ে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে। আজ অফিসে অনেক বেশি চাপ ছিলো। বিদেশী ক্লায়েন্ট এসেছিলো প্রজেক্টের কাজে। হয়তো তাদের অফিস থেকে একজনকে যেতে হবে বাইরে। বস চাচ্ছে আরশাদ যাক। কারণ সে দারুণ সামলাতে পারে এগুলো। এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিলো সারাদিন। ফোনটা বন্ধ করে রাখা সে কারণেই। এই মুহুর্তে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। খু নের আসামীও তার চেয়ে কম অপরাধী।
“আরশাদ একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো। ওই মেয়েকে তুমি এ বাড়িতে তুলেছো, আমরা নই। বাড়িতে একটা পোষ্য থাকলেও তার জন্য মায়া হয়। ইরার জন্য সেখান থেকেই মায়া আর সেই মায়া থেকে দায়িত্বের সৃষ্টি হয়েছে। তোমাকে না পেয়ে তোমার বাবাকে জানিয়েছি। সে মানুষটা কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আমি জানিনা। আমি নফল নামাজ পর্যন্ত পড়েছি দুশ্চিন্তায়। আর তুমি বিবেক বর্জিত বেয়াদবের মতো আমার উপরই চিৎকার করছো। তোমার খারাপ সময় না গেলে চড় মেরে তোমাকে উচিত শিক্ষা দিতাম আমি।”
আরশাদ হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করা যাবে না। যেখান থেকে হোক ইরাকে খুঁজে বের করতে হবে। হঠাৎ কলেজের ওই ছেলেগুলোর কথা মনে পড়ে আরশাদের। ওরা কিছু করলো না তো ইরাকে?
রাগে, ক্ষোভে নিজের মাথার চুল নিজের ছিঁড়তে ইচ্ছা করে আরশাদের। এতোটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কীভাবে হতে পারলো সে? আচ্ছা ইরা বেঁচে আছে তো?
আরশাদের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। শরীরের শেষ বিন্দু শক্তিটাও যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে।
“দেখো আরশাদ, ওই মেয়ে এখন তোমার দায়িত্বে। আল্লাহ না করুন ওর খারাপ কিছু হলে….”
“কিছু হবে না, কিছু হবে না।”
রাবেয়া বেগম থেমে যায়। আরশাদকে স্বাভাবিক লাগছে না। রক্তের মতো লাল হয়ে আছে মুখটা।
“বেরোচ্ছি আমি।”
“কোথায় যাবে ঠিক করেছো? কোথায় যেতে পারে ও?”
আরশাদ ভাঙা গলায় বললো,”জানিনা মা, কোথায় যাচ্ছি তাও জানিনা। শুধু জানি ওকে না নিয়ে ফিরলে আমিও ফিরতে পারবো না।”
“আরশাদ….”
“তুমি আরেকটু কষ্ট করো। জায়নামাজে যেয়ে বসো। আর কারো জন্য না হোক, তোমার ছেলের জন্য। আমি শেষ হয়ে যাবো মা।”
আরশাদ বেরিয়ে আছে প্রকৃতির ঝড়ের মতো গতিতেই।
রাবেয়া বেগম নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুদিন আগেই যে মেয়েকে বিয়ে করে এনেও স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি যে ছেলে, সেই ছেলের অবস্থা আজ এই? এটা শুধুই দায়িত্ব? নাকি অন্যকিছু?
★
বারান্দায় দ্রুত গতিতে হাঁটছে ইরা। এ মাথা থেকে ও মাথা। বারবার ভয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাচ্ছে। ঝড় বাড়ছেই শুধু, থামার লক্ষণ নেই। কিছুক্ষণ আগেই ঝড়ের মধ্যেই বেরোতে যাচ্ছিলো ইরা। যা আছে কপালে হবে কিন্তু এই মুহুর্তেই বাড়ি পৌঁছাতে হবে। কিন্তু ঠিক তখনই বাড়ির সামনের একটা বড় আম গাছের ডাল ভেঙে পড়লো।
জালাল আলী এই অবস্থায় মেয়েকে কোনোভাবেই যেতে দিতে চায়না। যদিও মেয়ের দুশ্চিন্তার কারণ সে বুঝতে পারছে। আরশাদের কঠিন রূপ সে দেখেছে। কিন্তু এরমধ্যে কীভাবে ছাড়বে সে মেয়েকে?
সে বলেছে ঝড় একটু কমলেই সে নিজে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে মেয়েকে ও বাড়ি দিয়ে আসবে, দরকার হয় পলাশও যাবে তার সাথে। জালাল আলী এখন কিছুটা সুস্থ। ডাক্তার দেখে গেছে, ওষুধ দিয়েছে। শরীর প্রচন্ড দূর্বল হলেও বিপদ বোধহয় কেটে গেছে।
কিন্তু ইরার মন মানছে না। চোখ বন্ধ করলেই সেদিন সমুদ্রের সামনে থাকা আরশাদের অসহায় সাথে প্রচন্ড ক্ষোভে লাল হয়ে যাওয়ার মুখটা ভাসছে। সেদিন ইরা কথা দিয়েছিলো আরশাদকে না জানিয়ে সে কোথাও আর যাবে না। প্রায় চার ঘন্টা অতিক্রম হয়ে গেছে, সে বাড়ি ফিরতে পারেনি। আরশাদ এতোক্ষণে নিশ্চয়ই জেনে গেছে।
কিন্তু ইরার কি-ই বা করার ছিলো? বাবার অসুস্থতা শুনে সে এখানে না এসে লক্ষী বউয়ের মতো বাড়ি চলে যেতো? হ্যা বাবা তার প্রতি হয়তো অনেক অন্যায় করেছে। কিন্তু সব বাদ দিয়ে হলেও সে ইরার বাবা, ইরার জন্মদাতা বাবা। অস্বীকার কীভাবে করবে সে?
এসে যে এমন প্রলয়ের মুখে পড়তে হবে এটাও কি সে জানতো?
মোবাইলটা আবার অন করার চেষ্টা করে ইরা। চার্জ নেই একদমই, কীভাবে অন হবে? এ বাড়িতে মোবাইল বলতে পলাশের একারই আছে। তার এরকম চার্জার নেই। ইরার ইচ্ছা করে বারান্দায় বসে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে। কি হতো সকালে মোবাইলটায় চার্জ দিলে? এতোটা বেখেয়াল কীভাবে হতে পারলো সে?
“ইরা।”
ইরা স্তম্ভের মতো পিছন ঘুরে তাকায়। আঞ্জুমান দাঁড়িয়ে আছে। আসার পর থেকে আঞ্জুমান একটা কথাও বলেনি ইরার সাথে, ইরাও বলেনি। দু’জনের মধ্যে যেনো এক অদৃশ্য প্রাচীর ছিলো পুরোটা সময়। অবশ্য ইরার বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে আর কিছু মনেও ছিলো না।
“ছোট মা….”
আঞ্জুমান ঠান্ডা গলায় বললো,”কেনো এসেছিস এখানে?”
ইরা কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। কেনো এসেছে এর উত্তর কি এই মহিলা জানেনা? শখ করে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসার মতো সাজানো গোছানো জীবন তার?
“কি হলো বল? বাবাকে দেখতে এসেছিস? বাবার মুখে চুনকালি লাগিয়ে একটা অচেনা ছেলের হাত ধরে যখন চলে গেলি, তখন বাবার জন্য দরদ ছিলো না? এখন দরদ উথলে পড়ছে?”
“ছোট মা এসব কি বলছেন? চুনকালি আমি মাখিয়েছি বাবার মুখে? আর আপনি যে একটা সত্তর বছরের বুড়োর সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। তাতে বুঝি আপনাদের সম্মান খুব বেড়েছিলো?”
হঠাৎ আঞ্জুমান ইরার মুখ টিপে ধরে শক্ত করে। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে ইরা।
“কি করছেন কি? ছাড়ুন আমাকে।”
“একদম চুপ। কি যোগ্যতা আছে তোর? তোর জন্য রাজপুত্র পেতাম নাকি সত্তর বছরের বুড়ো ছাড়া?”
ইরা জোর করে নিজেকে ছাড়ায়। একটা সময় এই মহিলার সব অত্যাচার, অনাচার সে মেনে নিয়েছে মুখ বুঁজে। কারণ তার যাওয়ার জায়গা ছিলো না আর কোথাও। বাবা থেকেও নেই। এই মহিলা তাকে হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছিলো সবসময়। কিন্তু আর না।
“আপনি কোন সাহসে আমার শরীরে হাত দেন? কে দিয়েছে আপনাকে এতো সাহস?”
আঞ্জুমান হতবাক হয়ে যায় ইরার কথায়। ইরা যেনো আজ স্ফুলিঙ্গ। সমস্ত দুশ্চিন্তা, রাগ যেয়ে পড়ে আঞ্জুমারের উপর।
“দূরে থাকুন আমার থেকে। আর কিসের যোগ্যতার কথা বলছেন? যদি আমার কোনো যোগ্যতা না-ই থাকবে তাহলে ওই বুড়ো কেনো আপনাকে উল্টে টাকা দিয়েছে আমাকে বিয়ে করার জন্য?”
আঞ্জুমান থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই আলোয় ইরাকে কেমন ভয়ংকর লাগে। অপরিচিত ইরা।
“আর কি বললেন? রাজপুত্র আসবে না আমার জন্য? তবে শুনে রাখুন আমি রাজপুত্র নয়, স্বয়ং রাজা পেয়েছি আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে। আমাকে সে রানী বানিয়ে রেখেছে তার মহলে। মেয়ে আপনার ঘরেও আছে। এতো টাকার লোভ হলে তাকে এবার আশি বছরের বুড়োর সাথে বিয়ে দিন। লোভী মহিলা কোথাকার। দূর হয়ে যান চোখের সামনে থেকে।”
“ইরা….”
“চোখ গরম করবেন না। চোখ উপড়ে ফেলবো একদম। খুব তো বলতেন আপনার ভাইয়ের টাকায় এই সংসার চালান আপনি। আমাকেও খাইয়েছেন, পরিয়েছেন। তবে আমার মায়ের তেরো ভরি গহনা কোথায়? তার বাবা তাকে দিয়েছিলেন ওগুলো, আপনার স্বামী দেয়নি। আমি ছোট ছিলাম, কিছু বুঝতাম না। আপনি সুযোগ মতো সেগুলো সরিয়েছেন। ফিরিয়ে দিন আমাকে সেগুলো। গাধার খাটুনি খাটতাম আপনার সংসারে। একটা কাজের লোক রাখলেও তাকে খেতে পরতে দিতে হতো। উপরন্তু আমার মায়ের গহনা লোপাট করেছেন। এই বাড়ি আপনার সন্তানদের একার নয়, এখানে আমারও ভাগ আছে। ভয় পাবেন না, আমি ভাগ নিতে আসবো না। তবে যে কয়দিন আমার বাবা বেঁচে আছে, আমি এ বাড়ি আসবো বাবাকে দেখতে। দেখি আপনার কোন বাপ আটকায় আমাকে।”
আঞ্জুমান কাঁপতে কাঁপতে দূরে সরে যায়। ইরা এভাবে কথা বলছে কেনো? যে ইরাকে সকালসন্ধে দমিয়ে রেখেছে সে এক সময়, কোন বলে তার মুখে আজ এতো কথা ফুটেছে?
“এই কথাগুলো আমার আগেই বলা দরকার ছিলো। যেদিন আমার পড়াশোনাটা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কি ভেবেছিলেন আমার কফিনের শেষ পেরেক পুঁতে ফেলেছেন? একটা কথা শুনুন লোভী মহিলা, উপরে একজন আছেন। উনি সব দেখেন, সব শোনেন। সবাই সবার কৃতকর্মের ফল পাবে। আপনিও পাবেন। শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
আঞ্জুমান দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে আসে ইরার দিকে। ইরা দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কি করবে উনি? মারবে?
“পায়ের তলার মাটি খুব শক্ত হয়ে গেছে তাইনা? ধরাকে সরা জ্ঞান করছিস না। এখন রূপ-যৌবন আছে, তোকে ভোগ করছে। মোহ কেটে গেলে ছুড়ে ফেলে দিবে আস্তাকুঁড়ে। তখন কোথায় যাবি তুই?”
ইরা আর্তচিৎকার করে বললো,”ছিহ ছোটমা…..”
“ভোগ করে ছেড়ে দেওয়ার হলে কলমা পড়ে বিয়ে করতাম না ম্যাডাম। এমনিতেই অনেক মেয়েকে পেয়ে যেতাম। তার জন্য বিয়ে করার প্রয়োজন হতো না।”
ইরা ঈষৎ কেঁপে ওঠে। তার মনে হয় সে ভুল শুনছে। অবশ্যই ভুল, এ হতে পারে না। এ অসম্ভব…..
(চলবে….)
#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ২৪
আরশাদ ইরার দিকে তাকায় না। ইরা একবার তার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। উনি কীভাবে জানলেন ইরা এখানে? এবার কি করবেন উনি?
আঞ্জুমান রাগী চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। মীরা ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ বড় বড় করে সে আরশাদের দিকে তাকায়।
বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে গেছে আরশাদ। চোখমুখ শান্ত কিন্তু কোথাও যেনো একটা ঝড়ের চিহ্ন মুখে।
“কিছুক্ষণ আগে আপনি আমার স্ত্রীকে খুব নোংরা ভাষায় কিছু বলেছেন। আপনার ভাগ্য অত্যন্ত ভালো, কারণ আপনি আমার ইরার বাবার স্ত্রী। তা না হলে…”
“এই ছেলে মুখ সামলে কথা বলো। এটা আমার বাড়ি। আমার বাড়িতে এসে আমাকে চোখ গরম দেখাও।”
আরশাদ চুলের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে হাসে। আঞ্জুমান অবাক হয় সে হাসি দেখে।
“শুধু চোখ না, আমার মাথাটাও গরম। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে টুকটাক ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম। মানুষটা আমি ভালো না। আজকাল ভালো মানুষ হওয়ার অভিনয় করি। কিন্তু আদতে আমি একটা বাজে লোক। তাই দয়া করে আমার বা আমার স্ত্রীর সাথে লাগতে আসবেন না। এটা ওর বাড়ি, ওর বাবা বেঁচে আছে এখনো। ওর ইচ্ছা হলে ও আসবে। আপনি কিচ্ছু বলবেন না। বললে ভালো হবে না।”
আঞ্জুমান কিছু বলতে যেয়ে থেমে যায়।
আরশাদ শার্টের কলার ঠিক করতে করতে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,”ইরা তোমার বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসো। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”
ইরা থতমত খেয়ে যায়। আরশাদের কণ্ঠ কেমন অপরিচিত শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে শুধু প্রকৃতিতেই না, বড়সড় একটা ঝড় তার উপরেও আসবে। কোনো সন্দেহ নেই তাতে।
★
পুরোটা রাস্তা আরশাদ খুব আস্তে আস্তে বাইক চালায়। কিছুটা দূরত্ব নিয়েই বসেছে। ইরা দুই বার পিছন থেকে স্পর্শ করায় আরশাদ একটু নড়েচড়ে বসে। ইরা বুঝতে পারে তার স্পর্শ চাচ্ছে না সে। ইরা হাত সরিয়ে নেয়। অনেকবার অনেক কিছু বলতে চায়। কিন্তু গুছিয়ে উঠতে পারেনা। কথাগুলো যেনো দলা পাকিয়ে গলায় আটকে আছে। কোনোভাবেই বের হয়না। কি বলা উচিত এখন? কি বললে নিজের দিকটা পরিষ্কার করা যাবে?
কক্সবাজারের সেইদিনে ইরা আরশাদের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছিলো বোধহয়, তবে তার গভীরতা কম ছিলো। বরং অনেকটা নির্বিকার ছিলো। কিন্তু আজকে? ইরার বুকটা ভার হয়ে আসছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেনো। আরশাদ কি তাকে ক্ষমা করবে?
পুরো রাস্তা পাশাপাশি থাকা দুই মানব-মানবীর মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। কেউ কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। বোধহয় খানিকটা অভিমান হচ্ছে। অপর মানুষটা কেনো তাকে একটু বুঝতে চাচ্ছেনা। আর অন্য মানুষটার মনে কি চলছে শুধু সে-ই জানে হয়তো। বিগত এক ঘন্টা তার উপর যে প্রলয় নেমে এসেছে তার উৎস এই মাটি নয়, ওই আকাশ নয়। তার উৎস তার ভালোবাসা…? কে জানে!
★
আরশাদ যখন ইরাকে নিয়ে বাড়ি ফেরে তখন রাত প্রায় নয়টা। আগেই আরশাদ বাড়িতে সব জানিয়ে দিয়েছে যে সে ইরাকে পেয়েছে। রাশেদুল কেবলই থানায় যাচ্ছিলো, আরশাদ তাকে জানিয়ে দেওয়ায় বাড়ির পথ ধরেছে।
বসার ঘরে মাথায় হাত চেপে বসে রাবেয়া বেগম। আরশাদ আর ইরা ঘরে ঢুকতেই সে শান্ত চোখে তাকায় ওদের দিকে।
“মা, ইরা আসলে ওর এক বান্ধবীর বাড়িতে গিয়েছিলো পড়াশোনার ব্যাপারে কথা বলতে। ও যেহেতু পরে ভর্তি হয়েছে৷ তাই অনেকটাই পিছিয়ে আছে। ও আমাকে জানানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু আমার মোবাইল বন্ধ থাকায় জানাতে পারেনি। এরপর তো ঝড়বৃষ্টিতে আটকে পড়লো। দোষটা আসলে আমার, ওর না। ওকে কেউ কিছু না বললে ভালো হয়।”
ইরা হতবাক হয়ে তাকায় আরশাদের দিকে। আরশাদ সেদিকে না তাকিয়ে ঘরে চলে যায়। ইরা মৃদু কাঁপছে।
রাবেয়া বেগম কিছু না বলে চলে যায় সেখান থেকে। ঈষৎ ভেজা শরীরে ইরা দাঁড়িয়ে থাকে। ভয় করছে কিংবা লজ্জা করছে। কিন্তু আরশাদ মিথ্যা কেনো বললো?
“আপনি তো পুরো ভিজে গিয়েছেন। গোসল দিন।”
আরশাদ শার্ট খোলে। নিজেই তোয়ালে এনে মাথা মোছে। ইরা যে ঘরে আছে, সেদিকে যেনো তার খেয়ালই নেই।
ইরা আরেকটু গলা খাকাড়ি দিয়ে বললো,”কফি খাবেন? বানিয়ে এনে দিই?”
আরশাদ চুপ, কিছুই যেনো শুনতে পারছে না সে।
“আপনি কি শুনতে পারছেন আমার কথা?”
আরশাদ ল্যাপটপ খুলে বসে সোফায়। ঝড়বৃষ্টির মধ্যে এসেছে। কে জানে ল্যাপটপের অবস্থা কি।
ইরা অসহিষ্ণু হয়ে দাঁড়ায় আরশাদের সামনে।
“কি হচ্ছে কি? একটু তাকান আমার দিকে।”
আরশাদ কাপড় দিয়ে ল্যাপটপের কোণা গুলো মোছে। ইরা দাঁড়িয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে থাকে। ইচ্ছা করছে খুব সাহসী কিছু করতে। সাহস তো তার আছে বলেই জানতো সে। কিন্তু এখন ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাচ্ছে কেনো?
আচমকা ইরা আরশাদের কোলের উপর থেকে ল্যাপটপটা উঠিয়ে বিছানায় রাখে। আরশাদ নির্লিপ্ত মুখে নিচে তাকিয়ে থাকে।
ইরা ঝাঁঝিয়ে ওঠে কিছুটা।
“কখন থেকে কথা বলছি শুনতে পাচ্ছেন না? কেনো তাকাচ্ছেন না আমার দিকে? কথা বলুন অন্তত।”
আরশাদ সেই নেশাক্ত লাল চোখে ঝট করে ইরার দিকে তাকায়। ইরা কিছুটা দমে গেলেও দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
“হঠাৎ করে রাস্তায় পলাশের সাথে দেখা। ও যখন বললো বাবা অসুস্থ, আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। কীভাবে জানবো এমন ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে? আমি তারমধ্যেও চলে আসতে চেয়েছি, কিন্তু বাবা….”
“আমি কি তোমার কাছে কোনো এক্সপ্লানেশন চেয়েছি? বলেছি তোমাকে কিছু?”
ইরা কাঁপা পায়ে আরশাদের সামনে বসে।
“কেনো বলছেন না? কিছু বলুন, দরকার হয় বকুন, মারুন যা ইচ্ছা হয় করুন। কিন্তু এরকম নির্লিপ্ত থাকবেন না।”
আরশাদ একটা সিগারেট ধরায়। সময় নিয়েই আস্তে আস্তে ধোঁয়া ওড়ায়। ভিতরে যে তান্ডব চলছে তা কমানো দরকার। নাহলে নিজেকে শান্ত রাখাটা কষ্টকর। ইরা আকুল হয়ে তাকিয়ে থাকে।
“তোমাকে একটা মোবাইল দিয়েছিলাম বোধহয় তাইনা?”
“হ্যা কিন্তু ওটায় চার্জ….”
“ওটা দাও তো।”
“জি?”
“ওটা দাও আমাকে।”
ইরা মাথা নেড়ে ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে আরশাদের হাতে দেয়।
মাত্র দুই সেকেন্ডের ব্যবধান। দুই সেকেন্ডের মধ্যে মোবাইলটা ভেঙে কয়েক ভাগ হয়ে যায়। কিছু অংশ বারান্দায় যেয়ে পড়েছে। বিকট শব্দে ইরা লাফিয়ে উঠেছে। বিস্ফারিত চোখে একবার সেদিকে আরেকবার আরশাদের দিকে তাকায়। আরশাদ তখনও শান্তভাবে ধোঁয়া ছাড়ছে, যেনো কিছুই হয়নি।
“কি করলেন এটা?”
“যে জিনিস প্রয়োজনে কাজে লাগেনা, তা রেখে কি লাভ?”
“তাই বলে ভেঙে ফেলবেন? আপনার রাগ আমার উপর, মোবাইলটার কি দোষ?”
আরশাদ আধখাওয়া সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ইরার দুই বাহু ধরে চেপে ধরে দেওয়ালের সাথে, শক্ত করে। ইরা মূর্তির মতোও দাঁড়িয়ে থাকে। আরশাদের চোখমুখ কঠিন, রক্তের মতো লাল। যে দৃষ্টিতে এতোদিন শ্রদ্ধা কিংবা প্রেম দেখেছে সেই দৃষ্টি দেখে ইরা ভীত হয়ে যায়। ঠোঁট কাঁপতে থাকে তার। কেমন অচেনা লাগছে আরশাদকে।
“নিজের উপর খুব রাগ লাগছে। কেনো কাপুরুষতার শিক্ষা পেলাম না। যদি পেতাম, তোমাকে আজ উচিত শিক্ষা দিয়ে বুঝিয়ে দিতাম রাগ কীভাবে সামলাতে হয়। এই মেয়ে এই, তাকাও আমার দিকে। তুমি জানো ওটুকু সময় আমার উপর দিয়ে কি গেছে? শুধু আমার না, আমার পরিবারের মানুষগুলোও দুশ্চিন্তায় শেষ।”
ইরা চিঁচিঁ করে বললো,”আমি তো বললাম আমি ভুল করেছি। ভুল করেছি মোবাইলটা চার্জ না দিয়ে। কিন্তু আমার দিকটা একবার…”
“এই চুপ!”
ইরা চুপ করে যায়। তার সৎমা তাকে অনেক বকেছে, মাঝে মাঝে মেরেছে। কখনো তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি পড়েনি। কিন্তু আজ তার কি হলো? ভিতরটা ভেঙেচুরে কান্না আসছে কেনো?
“এই এদিকে তাকাও, ঠিক আমার দিকে। তুমি কোনো ভুল করোনি, তুমি অন্যায় করেছো। ভুলের ক্ষমা হয় কিন্তু অন্যায়ের?”
“তাহলে কেনো মিথ্যা বললেন আপনার মা’কে? আমি যদি এতোটাই ক্ষমার অযোগ্য অন্যায় করে থাকি সবাইকে বলুন। সবাই মিলে রাগ করুন আমাকে। কেনো বাঁচালেন আমাকে?”
আরশাদ আরো শক্ত করে চেপে ধরে ইরাকে। ঝুঁকে আসে ইরার দিকে।
“আমি তোমাকে বাঁচাইনি। আমার সম্মান বাঁচিয়েছি। বিয়ে আমি করেছি, ওরা না। শাসন করলে আমি করবো। যদিও আজ ওদের উপর যে ঝড় গেছে। আমি সত্যটা বললে নিজেই মাথা তুলতে পারতাম না ওদের সামনে।”
ইরা মাথা নিচু করে ফেলে। খুব কান্না পাচ্ছে তার। কিন্তু ঠোঁট কামড়ে কোনোমতে কান্না আটকায়। মোটেই কাঁদবে না সে। হ্যা তার ভুল হয়েছে, অনেক বড় ভুল। কিন্তু ইচ্ছা করে তো করেনি। মোবাইল বন্ধ থাকা যদি তার ভুল হয় তাহলে আরশাদের মোবাইলও তো বন্ধ ছিলো, নিজেই বললো একটু আগে। নিজের দোষটা কেউ দেখে না!
আরশাদ ইরাকে ছেড়ে দেয়। ইরা হাত বুলায় নিজের বাহুতে। শক্ত হাতের চাপে জায়গাটা কেমন যন্ত্রণা করছে। যদিও এ যন্ত্রণা তাকে কষ্ট দিচ্ছে না। তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যা এই সামান্য যন্ত্রণার কাছে কিছুই না।
“তুমি কিছুক্ষণ আমার সামনে আসবে না। দয়া করে একটা কথাও বলবে না আমার সাথে। আমার মধ্যকার পশু প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করবে না। আমি চাইনা আমার স্ত্রী, যার শরীরে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছি সেই শরীরে আমার নোংরা আঘাত পড়ুক। সত্যিই চাচ্ছিনা আমি সেইটা। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক আগুনে টগবগ করছে। নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছে।”
ইরাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে আরশাদ বারান্দায় চলে যায়।
ইরা ধপ করে বিছানায় যেয়ে বসে। ভেবেছিলো ভীষণ কাঁদবে সে। কিন্তু এক ফোঁটা চোখের পানিও আসছে না। ভিতর জ্বলেপুড়ে অঙ্গার কিন্তু চোখ শুকনো। নিজের হাত নিজেই কামড়ে ধরে সে রাগে, ক্ষোভে। মাথার চুলগুলোও ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। শেষবার এতোটা অসহায় লেগেছিলো মায়ের মৃত মুখটা দেখে। মনে হয়েছিলো তার আশ্রয়টুকু চলে গেছে। একই অনুভূতি হচ্ছে আবার। ইরা চুল চেপে ধরে আর্তনাদ করে ওঠে।
★
কানে হেডফোন গুঁজে বারান্দার চেয়ারে শরীর এলিয়ে দেয় আরশাদ। সিগারেটের প্যাকেটটা কি মনে করে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বারান্দা থেকে। সবকিছু কেমন বিস্বাদ লাগছে, তিতকুটে লাগছে। মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
রেডিও খুলতেই কিছুটা শীতল স্পর্শ ছুঁয়ে যায় তাকে। আজ ভ্রমরের লেখা পাওয়া যাবে। আরশাদ চোখ বন্ধ করে ফেলে। বারবার মনটা অন্যদিকে সরাতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। প্রতি মুহুর্তে ইরার কান্না আটকে রাখা মায়াচ্ছন্ন মুখটা চোখে ভাসছে। আরশাদের মন, মস্তিষ্ক উভয়ই ভ্রমরের লেখায় আকৃষ্ট হতে ব্যাকুল কিন্তু ব্যর্থ। এক নারীর ক্ষমতা কি এতোই? কোন যাদুবলে শারীরিক অনুপস্থিতিতেও কব্জা করে রেখেছে শক্তিশালী সে মন আর মস্তিষ্ক?
“হেরা, আফ্রোদিতি কিংবা এথেনা নয়, সে ভ্রমরকে গ্রীক পুরাণ চিনেনা। সে ভ্রমর, সে রুথেনিয়া থেকে বেলগ্রেডস, সে পাললিক থেকে ভূমধ্যসাগর ছুটে বেড়িয়েছে শুধু এক নিশ্ছিদ্র ছায়ার খোঁজে। সে ভ্রমর ক্লান্ত ডুবুরি, সে ভ্রমর প্রেমের আজাদি। সে ভ্রমর কি তবে পেলো মুক্তি? সন্ধিতে স্বাক্ষর নাকি ষড়যন্ত্রের যুক্তি? সে হেরা নয়, এথেনা নয়, সে সেলেনি নয়। সে ভ্রমর, তার ভালোবাসাই তার শক্তি।”
আরশাদের পুরো শরীর কেমন অবসন্ন হয়ে আসে। দু’চোখের পাতা ভারী হয়ে ওঠে। সে না চাইতেও ভ্রমরের প্রতিটা শব্দ বিচরণ করছে তার শরীর জুড়ে, মন জুড়ে, মস্তিষ্ক জুড়ে। সে ভ্রমর রূপে ইরাকে দেখতে পাচ্ছে তার চোখের সামনে। যেনো প্রতিটা কথা ইরার মুখ থেকে শুনতে পাচ্ছে। এটা কেমন হ্যালুসিনেশন? এমন হচ্ছে কেনো তার? গলা শুকিয়ে আসছে। ইরাকে চাই তার, ভীষণ ভাবে চাই। কিন্তু ঘুম জেঁকে বসেছে। কোনোভাবেই আর কিছু মনে করতে পারেনা সে।
★
কতক্ষণ বিছানার উপর বসেছিলো ইরা জানেনা। দুই হাতে হাঁটু আঁকড়ে বসে থাকতে থাকতে তন্দ্রা চলে আসে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় দরজায় করাঘাতের শব্দে। চমকে ওঠে ইরা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। আরশাদ এখনো ঘরে আসেনি, বারান্দাতেই আছে।
ইরা চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। এতো রাতে কে আসবে? এসব ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতেই কিছুটা অবাক হয় সে। রাশেদুল দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা বড় ট্রে।
“আপনি….”
“এটা ধরো।”
ইরা ট্রে টা হাতে নিয়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কি বলবে ভেবে পায়না।
রাশেদুল উঁকি দিয়ে দেখে আরশাদ ঘরে নেই। মুচকি হাসে সে।
“আরশাদ রাতে না খেয়ে থাকতে পারেনা। সারাদিন না খেতে দিলেও রাতে ওর খাওয়াই লাগবে। ওর মা রাগ করে নিজেই খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘরে চলে গেছে। আমি খাবার নিয়ে বসেছিলাম এতোক্ষণ। অপেক্ষা করছিলাম তোমরা কখন আসবে। যখন দেখলাম আর আসার নামই নেই তখন নিজেই নিয়ে চলে এলাম।”
ইরা চাপা গলায় বললো,”আপনি কষ্ট করে আনতে গেলেন কেনো?”
রাশেদুল আবারও হাসে।
“শোনো মা, বাপ মা হওয়ার পর থেকেই মনে করো কষ্ট শুরু। সন্তানদের সুখশান্তির জন্য আমরা কষ্টকে বরণ করে নিই। তোমরা এই শান্তিটুকু উপভোগ করে নাও। নিজেরা বাবা মা হলে তোমাদেরও কষ্ট শুরু।”
ইরা ম্লান হেসে বললো,”তাই বুঝি?”
“হ্যা তাই। এখন যাও আরশাদকে ডাকো, খেয়ে নাও দু’জনে। রাগ, অভিমান মানুষের উপর হয়, খাবারের উপর না।”
ইরা ঝট করে রাশেদুলের দিকে তাকিয়ে বললো,”কোনো রাগ অভিমান নেই তো।”
“না থাকলেই ভালো। পৃথিবীতে সবচেয়ে দৃঢ় বন্ধন হলো স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন। এই সম্পর্কে রাগ থাকবে, অভিমান থাকবে, ঝগড়া থাকবে। কিন্তু দিনশেষে তুমি তার, সে তোমার। কখনো নিজেদের ভিতরে শূন্যস্থান আসতে দিবে না। অনেকেই আছে শুন্যস্থান পূরণ করার জন্য। সে সুযোগ কেনো দিবে?”
ইরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে রাশেদুলের কথাগুলো। একজন শিক্ষক যেনো তার ছাত্রীকে সুন্দর করে পড়া বোঝাচ্ছেন। এতো সুমধুর শোনায় কথাগুলো। ‘দিনশেষে তুমি তার, সে তোমার’ কথাটা মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার। অপার্থিব সুখবাক্য!
“অনেক রাত হয়েছে। আর জেগে থেকো না। খেয়ে শুয়ে পড়ো। তোমাদের মধ্যে যা কিছু হয়ে যাক আমি শুনতে চাচ্ছিনা। শুধু চাই ঘরের ভিতর যা হোক, দরজা খুলবে সবসময় হাসিমুখে। বাইরের দুনিয়াকে কখনো কষ্ট দেখাবে না, দ্বন্দ্ব দেখাবে না। আমরা মানব জাতি বড়ই অদ্ভুত। কারো ভেঙে যাওয়া মনকে আরো ভেঙে দিতে পারলে আনন্দিত হই। সেখানে আমাদের স্বার্থ থাকুক বা না থাকুক। এ আমাদের আদিম ধর্ম!”
ইরা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। রাশেদুল আর কথা বাড়ায় না। দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে যায়।
ট্রে টা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ইরা আবছা আঁধারের মাঝে। কি করবে এখন সে? ডাকবে আরশাদকে? সে যে রাতে না খেয়ে থাকতে পারেনা। কিন্তু এখন ডাকলে কি রেগে যাবে? বলেছিলো যে ইরা যেনো তার সামনে না যায়।
বারান্দায় উঁকি দিতেই ইরা কিছুটা শিউরে ওঠে। ঝড় থামার পর শীতল পরিবেশ। আরশাদ হাত-পা মেলে শুয়ে আছে, তার ঠান্ডা লাগছে। মশাও আসছে বাইরে থেকে।
ইরা ঘর থেকে চাদর নিয়ে আরশাদের গায়ে দেয়। একটা কয়েল জ্বেলে পায়ের কাছে রাখে।
ইরা কাঁপা কাঁপা হাতে দুইবার ডাকতে যায় আরশাদকে। আরশাদ সাড়া দেয়না। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। একরাশ মায়া ভর করে ইরাকে। জাগাতে ইচ্ছা করে না। ইচ্ছা করে নিজেই সারারাত এভাবে বসে থাকতে পাশে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখে যদি আবার রেগে যায়?
ঘরে ফিরে আসে ইরা। খাবারের দিকে এক নজর তাকায়। ওভাবে রেখেই কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়ে সে। আজ সে ইরা নয়, আজ সে ভ্রমর। ভ্রমর আজ লিখবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কোনো লেখা। তার হাতে রচিত হবে আজ অন্যরকম কিছু, যা নিঃসৃত হবে তার প্রতিটা নিউরনকে আন্দোলিত করে।
(চলবে…..)

