Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩৫+৩৬

মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩৫+৩৬

0
274

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৩৫

ইরা ফেরে দুপুরের একটু আগেই। তার চোখমুখ ঝলমল করছে। দেখে বোঝাই যাচ্ছে ফলাফল আশানুরূপ ভালো হয়েছে।
ইরা ঘরে ঢুকেই দেখে আরশাদ খাটে বসে আছে। তার চোখমুখ ভীষণ শান্ত। ইরার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।

“শুনছেন?”
আরশাদ উত্তর দেয়না। ইরা কিছুটা দমে গেলেও পরক্ষণেই আবার সামলে নেয় নিজেকে।

“বলুন তো আমার ফলাফল কি?”
“কীভাবে জানবো? তুমি তো এখনো বলোনি।”
ইরা অবাক হয়ে আরশাদের পাশে বসে। আরশাদের হাতের উপর আলতো করে নিজের হাতটা রাখে। অন্য সময় আরশাদ ইরার হাতটা জড়িয়ে নেয় নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে। কিন্তু আজ তা করেনা, কিন্তু হাতটা সরিয়েও নেয়না।

“কি হয়েছে আপনার? সব ঠিক আছে তো? যে চাকরিটা হওয়ার কথা ছিলো…..”
আরশাদ চুপ করে থাকে।
ইরা জোর করে হেসে বললো,”তাতে কি হয়েছে? একটা সুযোগ গেলে আরো দশটা আসবে। তাই বলে এভাবে মন খারাপ করে থাকতে হবে? আর তাছাড়া…”
ইরার কথা মাঝপথে আটকে দেয় আরশাদ। শান্ত দৃষ্টিতে ইরার চোখের দিকে তাকাতেই ইরা থতমত খেয়ে যায়।

“ইরা তোমাকে একটা কথা বলবো?”
“হ্যা বলুন।”
“তুমি কি আমাকে করুণা করছো?”
ইরা বিস্ফারিত চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। কিছু বলতে যেয়েও মুখে আটকে যায়। তার কথাগুলো কেউ গলার সাথে চেপে ধরে রেখেছে যেনো।

“আমার এই অবস্থায়, নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে আমার সেবা করে কাটিয়ে দিচ্ছো। তুমি চাইলে তো অনেক কিছু করতে পারতে। তা না করে নিজেকে আমার পিছে উৎসর্গ করে দিচ্ছো। আমি কি তোমাকে চার দেওয়ালের মাঝে বন্দী করে দিলাম ইরা?”
ইরা তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ায়। ভীষণ ভাবে কাঁপছে সে। কি বলবে সেগুলো নিজের মধ্যে গুছিয়ে নেয়। ভীষণ রাগ কিংবা ক্ষোভের সময় ইরার কথা এলোমেলো হয়ে যায়।

“আপনি আবার ওই কথাগুলো বলছেন?”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”ইরা আমার কথা কিন্তু শেষ হয়নি এখনো।”
ইরা ভিতরের সমস্ত উত্তাপ কণ্ঠে ঢেলে দেয়। মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরণ আন্দোলিত হচ্ছে মাথার মধ্যে। বিষাক্ত লাগছে সবকিছু।

“আর একটা কথাও আপনি বলবেন না। আসল করুণা তো আপনি করেছেন আমাকে। মা মরা একটা মেয়ে, যার বাবা থেকেও নেই। এক বুড়ো লোকের সাথে সৎমা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলো। আপনি করুণা করে সেই মেয়েকে বিয়ে করে এনেছেন এই বাড়ি। একটা ঘর দিয়েছেন, একটা সংসার দিয়েছেন। ভালোবাসা যদি হয় তা পরে হয়েছে। প্রথমে তো করুণা বাদে আর কোনো অনুভূতি ছিলো না আপনার আমার জন্য। অস্বীকার কর‍তে পারবেন?”
আরশাদ চুপ করে থাকে, উত্তর দেয়না।

“জানি তো উত্তর নেই। আজ আমার সাথে আপনার বিয়ে না হলে নীলু আপাকে নিয়ে সুন্দর একটা সংসার সাজাতে পারতেন আপনি। আপনার পরিবারও তো তাই চেয়েছিলো।”
আরশাদ গাঢ় গলায় বললো,”ইরা এবার একটু বেশি বলে ফেলছো।”
“কেনো? এখন খারাপ লাগছে শুনতে? হ্যা, এই একই কষ্ট আমারও হয়। যখন আপনি আমাকে এই কথাগুলো বলেন। আচ্ছা একটা কথা বলুন তো। আজ যদি আপনার জায়গায় আমি থাকতাম? হুইল চেয়ারে ভর করে চলতো আমার জীবন। আপনি বুঝি আমাকে ফেলে দিতেন? মুক্ত আকাশে উড়তে চাইতেন?”
আরশাদ কি মনে করে মুচকি হাসে। ইরা রাগান্বিত চোখে তাকায় তার দিকে। সে রাগে না, সে চিৎকার করেনা। কিন্তু আজ তার সমস্ত অনুভূতি যেনো বান ডেকেছে। বাঁধ ভেঙেছে ধৈর্য্যের।

আরশাদ বসা অবস্থাতেই ইরার হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে। বসায় তাকে পাশে। ইরা শক্ত হয়ে বসে থাকে। এই মুহুর্তে সে কাঁদতে চাচ্ছে না। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখে।

“তোমার এই অবস্থা আমি কোনোদিন হতে দিবোও না ইরা। তোমার উপরে আসা সমস্ত বিপদের ঝড় আমি নিঃশ্বাসে মিশিয়ে নিবো। এটা প্রতিটা স্বামীর ওয়াদা তার স্ত্রীর কাছে।”
ইরা বুঝতে পারে শক্ত হয়ে বসে বিশেষ লাভ হবে না। তার ভিতরের সূক্ষ্ম ভেজা অনুভূতিগুলো আরশাদ জাগ্রত করে দিয়েছে। ইস্পাতের মতো শক্ত মেয়েটাও অল্প আঘাতে কাঁদে।

আরশাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিছানার চাদরের নিচ থেকে একটা খাতা বের করে। ইরা মাটির দিকে তাকিয়ে ছিলো তখন। ইরার মুখের দিকে খাতাটা এগিয়ে দেয় আরশাদ।

“এটা তোমার?”
ইরা একবার সেদিকে তাকাতেই স্তম্ভিত হয়ে যায়। বড় বড় চোখে একবার খাতার দিকে, আরেকবার আরশাদের দিকে তাকায়।

“সম্ভবত তোমার। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তোমার ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেওয়ার জন্য। আসলে আলমারিতে একটা জিনিস খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওটা খোঁজার সময়ই এটা নিচে পড়ে যায়।”
ইরা আরশাদের থেকে দূরে সরে বসে৷ মুখ থমথম করছে তার।

“আমি কোনোদিনও ভাবতে পারিনি, যার লেখা প্রতিটা শব্দ আমার মস্তিষ্কে আঘাত হানে। প্রতিটা অক্ষরকে আমি আমার মধ্যে ধারণ করতে পারি। প্রতিটা বাক্যে আমি দিশাহারা হয়ে যাই। সে আর কেউ না, সে আমার প্রেয়সী। আমার ইরাবতীই আমার ভ্রমর।”
ইরা আরশাদের ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যেয়ে থেমে যায়।

“আমার এখনো মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি। ইরা, তুমি জানতে চেয়েছিলে না ওই কথাগুলো আবার কেনো বললাম তোমাকে? আমি আসলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাচ্ছি, অনুতপ্ত হচ্ছি। সাধারণ মেয়েটার মধ্যেই এক অসাধারণ রমনীর বাস তা আমি আগে কেনো জানতে পারলাম না? তোমার প্রতিভাগুলোকে আমি নষ্ট করে ফেললাম না তো? তুমি যে অধরা সৃষ্টি। সেই উদ্যোমী মেয়েটাকে আমি মূল্যায়ন করতে পারলাম না।”
“এসব কেনো বলছেন?”
আরশাদ বামহাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে। সত্যিই সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে তার। ইরাই ভ্রমর, ভ্রমরই ইরা?

“বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে বলতে চেয়েছিলাম। কোনো একটা বিশেষ দিনের অপেক্ষায় ছিলাম আমি। বিয়ের পর আপনি আমাকে কতো কিছু উপহার দিয়েছেন। কিন্তু আমি তো কিছুই দিতে পারিনি। এই রিক্ত মনটা চেয়েছিলো আপনাকে কিছু উপহার দিতে। ভ্রমর আপনার খুব প্রিয়। তাই চেয়েছিলাম ভ্রমরের আসল পরিচয়টাই হতে পারে আপনার উপহার।”
আরশাদ খাতার পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে থাকে আস্তে আস্তে।

“প্রথম যেদিন আপনার মুখে ভ্রমরের কথা শুনলাম সেদিন চমকে উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম সব বলে দিবো। কিন্তু আমি চাইনি আপনি আমাকে ভ্রমর হিসেবে ভালোবাসুন। আমি ইরা হিসেবেই আপনার ভালোবাসা পেতে চেয়েছিলাম।”
আরশাদ খাতাটা পাশে রেখে ইরার দিকে তাকায়।

“তারপর কি বুঝলে?”
“তারপর বুঝলাম একজন সুপুরুষের কাছে তার স্ত্রী বাদে আর কেউ প্রিয় হতে পারে না।”
“তুমি নিশ্চিত?”
ইরা ম্লান হেসে বললো,”কেনো? আপনি নিশ্চিত ছিলেন না ভালোবাসার আগে?”
“এখন কি বিশেষ মুহুর্তের ভালোবাসার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে? তুমি ভ্রমর নাকি ইরা?”
ইরা অবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকায়।
আরশাদ এক হাতে তাকে জড়িয়ে নিজের বুকের কাছে নিয়ে আসে। চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় তাকে।

“তোমাকে নিয়ে স্বপ্নটা বেড়ে গেলো ইরা। তোমাকে আমি সত্যিই সুবিশাল ক্যানভাস উপহার দিবো। যেখানে তুমি ইচ্ছামতো রঙ চড়াবে। তোমার প্রতিটা বাক্য সেখানে চিত্র হয়ে পরিস্ফুটিত হবে। আমার এই ছোট্ট নীড়ের চেয়ে অনেক বড় হবে সেই ক্যানভাস। অনেক সফলতা পাবে তুমি। আমি দূর থেকে সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে দেখবো।”
ইরা আরশাদের বুকের মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে আদুরে বিড়ালের মতো।

“আমি দূর আকাশের নক্ষত্র হতে চাইনা। যেখানে কিনা আপনার সাথে আমার এক আলোকবর্ষের দূরত্ব সৃষ্টি হবে। এই বুকটাই আমার নীড়, এরচেয়ে বড় ক্যানভাস ইরা চায়না।”
আরশাদের বুকটা শীতল হয়ে যায়। সে জীবনে চন্দ্র পায়নি যে অন্যের আলোয় আলোকিত হবে। সে উজ্জ্বল নক্ষত্র পেয়েছে। নিজের আলোতেই যে সর্বদা দীপ্যমান, ভাস্বর।

“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
রোশান নীলুর দিকে না তাকিয়েই বললো,”যেখানে আপনি চান।”
“কিন্তু আপনি তো আমাকে বললেন আপনি আমাকে কি যেনো জানাতে চান আপনি। একটা বিশেষ জায়গায় না গেলে বলতে পারবেন না।”
“হুম।” বলেই রোশান চুপ হয়ে যায়। তাকে খুব অস্থির লাগছে। অল্পস্বল্প ঘামছে। নীলু ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে দেয়। রোশান স্মিত হেসে টিস্যুটা নিয়ে কপাল মোছে। আজ গাড়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার, ব্যাকসিটে দুইজন বসে, কিছুটা দূরত্ব নিয়েই।

নীলু চুপ করে থাকে। রোশানকে দেখে তার মাঝে মাঝে মনে হয় ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সাথে শুধু শরীরের বয়সের সংখ্যাটাই বেড়েছে। কিন্তু তার মনের বয়স এখনো কিশোর বয়সে আটকে আছে। সে কি ভয় পাচ্ছে কোনো কারণে? কি অদ্ভুত!

“আজ যদি আপনার বাড়িতে ফিরতে একটু দেরি হয়, তাহলে কি খুব অসুবিধা হবে?”
নীলু শান্ত চোখে রোশানের দিকে তাকায়।
“না না অন্য কিছু ভাববেন না। বিকাল হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। তাই আর কি। আমি নিজে আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিবো।”
“আপনাকেই বা এতোটা বিশ্বাস করি কীভাবে?”
রোশান কিছুটা অবাক হয়ে বললো,”আমাকে অবিশ্বাস করছেন?”
“করতেই পারি। বিপত্নীক পুরুষ আপনি, আমি একা মেয়ে মানুষ। বুঝতেই পারছেন….”
রোশান দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ। এরপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বললো,”আনিস গাড়ি ব্যাক করো, আমরা ফিরবো।”
নীলু হকচকিয়ে যায়।

“আনিস ভাই আপনি আপনার মতো চলুন। উনার কথা কানে নিতে হবে না। এখন থেকে আপনি আমার কথাতেই চলবেন, বোঝা গেছে?”
আনিস মিটমিট করে হাসে। সে খুব বুঝতে পারছে এখন থেকে স্যারের কথা নয়, ম্যাডামের কথাই শুনতে হবে।

“আনিস, আমার কথা কানে যাচ্ছে না তোমার? কানে সমস্যা তোমার?”
নীলু ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে বললো,”কানে সমস্যাটা আপনার বোধহয়, আনিস ভাইয়ের না। আপনি শুনলেন না আমি আনিস ভাইকে কি বললাম?”
রোশান গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়।

আচমকা নিজের হাতের উপর উষ্ণ, কোমল একটা হাতের স্পর্শ পেতেই ভয়াবহভাবে চমকে ওঠে সে। নীলু এমন ভাবে বসে আছে যেনো কিছুই হয়নি। রোশান অনিচ্ছাসত্ত্বেও(!) নিজের হাতটা আস্তে আস্তে গুটিয়ে নেয়। সেদিকে নীলু একবার তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসে।

“নীলু….”
“আমি জানি আপনি আমাকে কি বলতে চাচ্ছেন। তবে আপনাকে দিয়ে ওই আনুষ্ঠানিকতা হবে না। ফুল দিয়ে, হাঁটু গেড়ে সামনে বসে ওসবের বয়স বা প্রয়োজন কোনোটাই আমাদের নেই। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা একটা মেয়ে, এতোটাও বোকা না রোশান সাহেব।”
রোশান কঠিন গলায় বললো,”যেখানে বিশ্বাস নেই, সেখানে আর কিছুই থাকে না।”
নীলু নখের সাথে নখ ঘষতে থাকে আপনমনে। যেনো এটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

রোশান অধৈর্য্য হয়ে যায়।
“শুনতে পেয়েছেন কি বলছি?”
“শুনেছি।”
“বুঝেই যখন ফেলেছেন তবে ফেরা যাক? আপনার আনিস ভাইকে দয়া করে বলুন ফিরতে। সে আজকে আমার কথা শুনবে বলে মনে হচ্ছে না।”
নীলু ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললো,”আনিস ভাই, সুন্দর দেখে একটা গান ছেড়ে দিন তো।”
“কোনটা ছাড়বো ম্যাডাম, বলে দিন।”
রোশান নির্লিপ্ত চোখে আনিসের দিকে তাকায়।

“ওই গানটা ছাড়ুন, বলবো না আকাশের চাঁদ এনে দিবো, বলবো না তুমি রাজকন্যা। শুধু জিজ্ঞেস করি হবে কি পাড়ি হোক যতো ঝড় বন্যা? আমার ছোট তরী বলো, যাবে কি…?”
নরম সুরগুলো আবদ্ধ গাড়ির মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। রোশান চুপচাপ বসে তখনও।

“রোশান সাহেব।”
“হু।”
“ঠিকই বলেছেন যেখানে বিশ্বাস নেই, সেখানে আর কিছুই নেই। আমি যদি আপনাকে বিশ্বাস না করতাম, এতোগুলো দিন এভাবে একা আপনার সাথে বের হতাম না। আপনার উদ্দেশ্য যদি আমার ক্ষতি করারই হতো, তবে এতোদিন দেরি করতেন?”
রোশান নীলুর দিকে তাকিয়ে বললো,”তাহলে আমার উদ্দেশ্য কি?”
“আপনার উদ্দেশ্য আমাকে ক্ষতি করা না। আপনার উদ্দেশ্য আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বাকিটা জীবন পার করে নিজের ক্ষতি করে দেওয়া।”
রোশান আচমকা হেসে দেয় নিঃশব্দেই। নীলু সেদিকে তাকিয়ে ভাবে, আচ্ছা যে নারীর হাসি সুন্দর তাকে শুচিস্মিতা বলে। যে পুরুষের হাসি সুন্দর তাকে কি বলে? বাংলা ব্যকরণ অনুযায়ী কি তবে পুরুষের হাসি সুন্দর না?

“খুব বেশি গল্পের বই পড়েন তা আপনার কথা শুনেই বোঝা যায়।”
নীলু হালকা গলায় বললো,”এজন্যই কি নিজের বাড়িতে বুকশেলফে গল্পের বই ভর্তি করছেন? আমার জানামতে আপনি তো ডাক্তারির বই বাদে আর কোনো বই পড়তে পছন্দ করেন না। তবে ওগুলো কার জন্য?”
রোশান ভ্রু কুঁচকে নীলুর দিকে তাকায়।

“আপনাকে কে বললো?”
“আমাকে ঠিক কতোটা বোকা মনে হয় আপনার রোশান সাহেব? সত্যি করে বলুন তো।”
“আপনার সামনে আমি নিজেই তো বোকা হয়ে যাচ্ছি।”
“আপনি বোকা নন রোশান সাহেব। বোকারা এতোটা আত্মবিশ্বাসী হয়না। আপনার আত্মবিশ্বাস অসাধারণ। নাহলে হবু স্ত্রী’কে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার আগেই তার শখের বই সাজাচ্ছেন নিজের ঘরে? যদি আপনার হবু স্ত্রী আপনার প্রস্তাবে রাজি না হয়?”
রোশান এবার হতভম্ব হয়ে শক্ত হয়ে বসে। মেয়েটা সাংঘাতিক তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু….

“দেখুন গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আনিস ভাই এখানে গাড়িটা থামান। আমি শেষ বিকেলের রোদটা গায়ে মাখতে চাই।”
আনিস সাথে সাথে গাড়ি থামায়। নীলু নেমে যায় গাড়ি থেকে। রোশান কি করবে ভেবে পায়না। নীলু জানালায় উঁকি দিয়ে বলে,”বোকার মতো বসে থাকবেন না তো। বেরিয়ে আসুন।”
আনিস দাঁত বের করে হাসে। রোশান তার দিকে বিষদৃষ্টি ফেলে গাড়ি থেকে নেমে যায়। নীলুর থেকে কিছুটা দূর‍ত্ব নিয়ে দাঁড়ায়।

“রোশান সাহেব।”
“বলুন।”
“আপনি কি আমার হাতটা একটু ধরবেন?”

রোশান থতমত খেয়ে যায়। নীলুর চোখেমুখে সৌন্দর্য উপচে পড়ছে। গোধূলির আলোয় তাকে একটা পুতুলের মতো লাগছে। যাকে ছোঁয়ার সাধ্য রোশানের নেই।

“কি হলো? ধরবেন না?”
রোশান কিছুটা ইতস্তত করে এগিয়ে যায়। নীলু নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয়। রোশান হাতটা ধরে। উষ্ণ হাতটা হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে।

“এ কি? আপনার হাত তো ঠান্ডা। বাইরে থাকতে হবে না, গাড়িতে উঠুন।”
“একটু ভরসা দিন, উষ্ণ হয়ে যাবে আবার। শুধু বলুন ছেড়ে যাবেন না।”
রোশান নীলুর দুই হাতই নিজের মুঠোবন্দী করে ফেলে। তাকে নিজের উষ্ণতাটুকু ছড়িয়ে দিতে চায়। নীলুর গায়ে পাতলা একটা শাল, সে ঈষৎ কাঁপছে। রোশান তৎক্ষনাৎ নিজের জ্যাকেট খুলে নীলুর শরীরের উপর রাখে।

“যদি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকতো তাহলে আপনার শত আহ্বানেও নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিতাম না। আমি জানি ভালোবাসা হারানোর কষ্ট। যে এই কষ্ট বোঝে সে চায়না তার শত্রুও এই কষ্ট পাক। সেখানে আপনি তো আমার শত্রু নন।”
“আমি আপনার কি?”
“সবই তো উপলব্ধি করেছেন। এটুকু বুঝতে পারছেন না?”
“সবকিছু বুঝতে চাইও না। আপনি বলুন।”

রোশান লম্বা একটা শ্বাস ফেলে নীলুর দিকে তাকায়। আলো ততক্ষণে অনেকটা কমে এলেও নীলুর সৌন্দর্য কমেনি একফোঁটাও।

“বাকিটা জীবন আপনার হাতটা ধরার অনুমতি পেতে পারি?”
“ইশ! কি ম্যাড়মেড়ে আপনি।”
রোশান অবাক হয়ে বললো,”কি বললেন?”
“তা নয়তো কি? মনে হচ্ছে আপনি স্কুলে পড়েন আর আমি আপনার হেড-মিস্ট্রেস। আপনার পেট ব্যথা হয়েছে তাই ছুটির জন্য আমার কাছে অনুমতি চাচ্ছেন।”
রোশান হেসে দেয়, নীলুও হাসে।

“তাহলে কি করবো? হাঁটু গেড়ে সামনে বসবো? তখন তো আপনি বলবেন এই বয়সে কিশোর ভর করেছে আমার উপর।”
“মাঝে মাঝে কিশোর হওয়া মন্দ না।”
“অনুমতি দিচ্ছেন?”
“অনুরোধ করছি।”

রোশান সত্যি বসে পড়ে নীলুর সামনে, হাঁটু গেড়ে। নীলু চোখ বড় বড় করে তাকায় তার দিকে।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি নীলু। প্রেম করার বয়স, সময় বা ধৈর্য্য কোনোটাই আপাতত নেই। বাকি প্রেমটা যদি বিয়ের পর করতে চাই? খুব অসুবিধা হবে আপনার?”
নীলু আলুথালু চোখে রোশানের চোখের দিকে তাকায়। সে চোখজোড়ায় নীলু নিজের আগামীর দিনগুলো দেখতে পাচ্ছে। সূর্য ততক্ষণে পুরোপুরি ডুবে গেলেও পশ্চিমাকাশ তখনও সিঁদুর লালে রাঙিয়ে আছে।

“জমানো সব প্রেম তখন উশুল করা হবে রোশান সাহেব, মনে থাকবে তো?”
“খুব থাকবে, খুব…..”

আরশাদকে রাতের ওষুধ খাইয়ে মাত্রই ঘর থেকে বেরিয়েছে ইরা। রাত তখন প্রায় দশটা। কলিং বেলের আওয়াজে সচকিত হয় সে। ভ্রু কুঁচকে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। এতো রাতে কে আসবে?

এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে নিজেই দরজা খুলে দেয়। সাথে সাথে থমকে যায় ইরা।

“বাবা তুমি?”
জালাল আলী ম্লান হাসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। ইরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। মানুষটা শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। অসুস্থ লাগছে তাকে আরো।

“মা রে, ভালো আছিস?”
“বাবা….”
ইরা বাবার হাত ধরে ঘরে ঢোকায়। জালাল আলী কিছুটা ইতস্তত করছিলো। গতবার তাকে একরকম অপমানিত হয়েই এ বাড়ি থেকে বিদায় নিতে হয়েছিলো।
ইরা কি করবে বুঝতে পারেনা। রাশেদুল আর রাবেয়া বাড়িতে নেই। আরশাদের একমাত্র ফুপু অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ায় দুইজনই বেরিয়েছে।

ক্র‍্যাচে ভর দিয়ে আরশাদ বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।
“কে এসেছে ইরা?”
ইরা চুপ করে থাকে। বসার ঘরে জালাল আলী দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখছে। কি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। একদম যেনো সদ্য পরিস্ফুটিত পদ্ম। মেয়ের মা কম বয়সে এমন সুন্দরী ছিলো। ভালোবাসায় মুড়ে থাকলে সব মেয়েকেই বুঝি এমন ফুটন্ত ফুলের মতো সুন্দর দেখায়।

“আপনি?”
আরশাদও অবাক হয়ে জালাল আলীর দিকে তাকিয়ে আছে। জালাল আলী আরশাদের পায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।

“ইরা উনাকে বসতে দাওনি এখনো? শীতে কাঁপছেন তো। দ্রুত গরম কিছু বানিয়ে দাও। স্যুপ বা চা।”
“না না বাবা! আমি কিছু খাবো না। আমি একটা কাজে এখানে এসেছি। কাজটা হয়ে গেলেই আমি চলে যাবো।”
ইরা অবাক হয়ে বললো,”কাজ? এখানে? এতো রাতে?”
আরশাদ শান্ত গলায় বললো,”সে পরে দেখা যাবে। আগে বসুন, গরম কিছু খান। ইরা দাঁড়িয়ে থাকবে এখনো?”
ইরা দোমনা করে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। বুকের মধ্যে কেমন খচখচ করছে। কোনো দুঃসংবাদ না তো?

“বসুন।”
জালাল আলী বসে, মুখোমুখি আরশাদ।

“আমাকে দেখে মাথা নিচু করে থাকবেন না দয়া করে। আমার নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় তাহলে। মনে হয় আমি পঙ্গু বলে সবাই কষ্ট পাচ্ছে আমাকে দেখে।”
“ছি ছি বাবা। এসব কি বলছো? পঙ্গু হবে কেনো? তুমি ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে। তুমি আবার নিজের পায়ে হাঁটবে।”
আরশাদ নিঃশব্দে হাসে।

“তারপর বলুন আপনার শরীর কেমন আছে? আর আমার এই অবস্থার কথা কার কাছ থেকে শুনেছেন? ইরা বলেছে?”
“না ইরা আমাকে কিছু জানায়নি।”
“তাহলে?”
জালাল আলী কিছু বলার আগেই ইরা চলে আসে। তার হাতে একটা ট্রে। ট্রে-তে রুটি, ভাজি আর চা।

“মা রে আমার কাছে একটু বোস। তোকে একটু দেখি। আমি কিছুই খাবো না। তোকে দেখেই চলে যাবো।”
ইরার বুকটা কেমন করে। বাবাকে কখনোই তেমন ভালোবাসতে পারেনি সে। নিজের সব দুর্গতির জন্য বাবাকে দায়ী মনে করতো। কিন্তু বাবার কাছ থেকে দূরে আসার পর থেকে এই মানুষটাকে দেখলে তার বুকের কোথাও যেনো একটা ভোঁতা যন্ত্রণা হয়, চিলিক দেওয়া যন্ত্রণা।

ইরা জালাল আলীর পাশে বসে। মাথায় হঠাৎ বাবার মমতাভরা স্পর্শ পেতেই হতবাক হয়ে তাকায়। এই স্পর্শটুকুর জন্য কতো দিন ইরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। কিন্তু পেতো না।

“তুই কতোটা বড় হয়ে গেলি মা? নাহয় আমি তোর ব্যর্থ বাবা। কিন্তু তাই বলে এতোটা চাপা কষ্ট বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখলি। আমাকে জানালি না একটা বার।”
“বাবা তোমাকে দুশ্চিন্তা দিতে চাইনি।”
জালাল আলী চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। ইরাও চুপ। কে কি বলবে ভেবে পায়না।

হঠাৎ চাদরের নিচে থেকে একটা ব্যাগ বের করে জালাল আলী। ইরার দিকে এগিয়ে দেয় ব্যাগটা।
“এটা রাখ।”
“এটা কি বাবা?”
“নিজেই দেখ।”
ইরা কিছুটা বিচলিত হয়ে ব্যাগটা হাতে নেয়। ব্যাগের ভিতরে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার।

“বাবা….”
“এগুলো তোর, শুধুই তোর। আর কারো না। এগুলো তোর কাছে পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব ছিলো। সারাজীবন তোর প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করিনি। বাবা হিসেবে এটা আমার ব্যর্থতা। কিন্তু শেষ সময়ে এসে যদি এটুকুও না করি তাহলে উপরে যেয়ে কি জবাব দিবো?”
“কিন্তু এগুলো তো মায়ের গহনা। ছোটমায়ের কাছে ছিলো। উনি কখনো আমাকে দিতে চাইতেন না।”
“এখনো চায়না। সে তার ছেলেমেয়েকে দিতে চায় এগুলো। কিন্তু এর উপর তো শুধু তোর হক আছে, আর কারো না। এগুলো তোর মায়ের, তোর নানাভাই এগুলো তাকে দিয়েছে। আমারও কোনো অধিকার নেই এগুলোর উপর।”
“তুমি কীভাবে আনলে?”
“আমি জোর করে এনেছি আঞ্জুমানের কাছ থেকে।”
“কিন্তু তারপর..?”
“তারপরের চিন্তা আর করিস না রে মা। আরশাদকে সুস্থ করতে হবে। এই গহনা গুলো বিক্রি করে ওর চিকিৎসা করা তুই।”
আরশাদ এতোক্ষণ চুপ করে বাবা-মেয়ের কথা শুনছিলো। জালাল আলীর শেষ কথাটা শুনে সোজা হয়ে বসে। চোখ কুঁচকে তাকায় তার দিকে।

“বাবা এসব কি বলছো তুমি? টাকার জন্য কি উনার চিকিৎসা আটকে আছে?”
“আমি জানিনা। আমার মেয়ের একটা জীবন আমি শান্তিতে কাটাতে দিতে পারিনি। বিয়ের পর তুই সুখী আছিস ভেবে শান্তি পেয়েছি। কিন্তু এই খবর শুনে আমার মাথা আর কাজ করেনি। আমি…”
আরশাদ ক্র‍্যাচ হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে। ইরা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। ছুটে আরশাদের দিকে এগিয়ে যায় সে।

“আপনি কিছু মনে করবেন না। বাবা না জেনে বলেছেন।”
“ইরা আমি কিছু মনে করিনি।”
আরশাদ জালাল আলীর সামনে এসে দাঁড়ায়, জালাল আলীও উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে।

“ইরার মায়ের গহনা, ওর কাছে থাকবে এটা খুব স্বাভাবিক। বাবা হিসেবে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। একটা সময় আপনার উপর আমার খুব রাগ হয়েছে। কিন্তু আজ সেই রাগ শেষ। ইরা তার গহনা আজীবন তার কাছেই রেখে দিবে। তার মায়ের স্মৃতি ওগুলো। আমার এতোটাও খারাপ অবস্থা আসেনি যে স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে নিজের চিকিৎসা করতে হবে। পুরুষ মানুষ যতোদিন শ্বাস নিতে পারে ততদিন পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়েই পৃথিবীতে আসে। এটাই অলিখিত নিয়ম। আমার পায়ে শক্তি নেই কিন্তু এই মস্তিষ্কটা আর এই হাত দু’টো এখনো আছে। তার মানে এখনো আমি দূর্বল নই।”
“বাবা তুমি কি রাগ করলে আমার উপর? আমার মাথা ঠিক নেই খবরটা শোনার পর থেকে। কি বলতে কি বলেছি।”
আরশাদ মুচকি হাসে তার দিকে তাকিয়ে।

“আমি যদি কোনোদিন বাবা হই তবে আপনার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন হবো না। তবে আপনার মতো সন্তানকে ভালোবাসবো। আপনি আজ যা করেছেন তা আপনার মেয়ের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। সত্যিই আজ আপনাকে একজন সত্যিকারের বাবার মতো দেখতে লাগছে।”
ইরা দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে, বাবার বুকে মাথা দিয়ে হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠে।

“বাবা এগুলো আমার লাগবে না। এগুলোর জন্য তোমাকে ওরা ছোট করবে, বাজে কথা শোনাবে। তারচেয়ে এগুলো তুমি নিয়ে যাও।”
“যা তোর, তা তোরই। এরজন্য আমাকে ওরা যা বলে বলুক। ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এগুলো নিয়ে আসিনি আমি।”
জালাল আলী মেয়ের মাথা তুলে দাঁড় করায় পাশে। তার একটা হাত নিয়ে আরশাদের হাতে তুলে দেয়।

“এই হাতটা তোমার কাছে আমানত হিসেবে রেখে গেলাম বাবা। আসলেই আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন। তবে আমি ওর জন্য যা করতে পারিনি, তুমি তা করো। ওকে এক জোড়া ডানা দিও, ওকে উড়তে দিও। ওকে কখনো ভুল বুঝো না। আর অনেকটা ভালোবেসো। ও ভালোবাসা পায়নি। এক ফোঁটা দিলে ও এক সমুদ্র ফেরত দিবে।”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”আমি-ই ওকে এক মহাসমুদ্র দিবো। এ আমানত আমি জীবন দিয়ে আগলে রাখবো।”

জালাল আলীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মেয়ের মাথায় শেষবারের মতো একবার হাত বুলিয়ে সে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। ইরা পাগলের মতো ছোটে তার পিছে।

“বাবা আবার কবে আসবে?”
জালাল আলী পিছন ফিরে হাসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে, কোনো উত্তর দেয়না। ধীর পায়ে চলে যায়।

তাকে যতক্ষণ দেখা যায় ইরা একদৃষ্টিতে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের মধ্যে কেমন যেনো করছে তার। মা যেদিন মারা গেলো, তার আগের রাতে এমন করছিলো তার বুকের মধ্যে। আজ এতো বছর পর হঠাৎ সেই কথা মনে পড়লো কেনো তার?
ইরার পিছনেই আরশাদ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। ইরাকে তাড়া দেয়না। তার যতক্ষণ বাবাকে দেখতে ইচ্ছা করে, দেখুক। কোনো তাড়াহুড়ো নেই আজ।

(চলবে…..)

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৩৬

আজ আরশাদকে নিয়ে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে এসেছে ইরা। আরশাদের এই অবস্থা হওয়ার পর থেকে এতোটা দূরে কখনো আসেনি তারা। আরশাদ হাঁপাতে থাকে। ইরা ফোল্ডিং চেয়ারটা মেলে তাকে বসায়।

“আজ কি একটু বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম?”
আরশাদ দুই পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসে চেয়ারে। ইরার দিকে তাকায় ভরা চোখে। মেয়েটা আগের চেয়ে কিছুটা মোটা হয়েছে। গায়ের রঙ দুধে আলতা না হলেও ফরসার কাছাকাছি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণটা মিলিয়ে গেছে। চুলগুলোও আগের চেয়ে লম্বা হয়েছে অনেকটা। আজকাল শাড়ি পরে বেশিরভাগ সময়। পরিপাটি করে সেজে থাকার চেষ্টা করে। নিজের যত্ন নিচ্ছে মেয়েটা। আরশাদ এটাই চেয়েছিলো। কড়ি থেকে মেয়েটা সম্পূর্ণ রূপে পুষ্প হয়ে ফুটুক।

“ইরা।”
“বলুন।”
“তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। হুমায়ুন আহমেদ হলে বলতাম ‘আজ তোমারে বড়ই সৌন্দর্য লাগতাছে।’ রবি ঠাকুর হলে বলতাম ‘চোখের পানে চাহিনু অনিমেষ, বাজিলো বুকে সুখের মতো ব্যথা।’ আফসোস আমি কবি কিংবা গল্পকার নই।”
ইরা আরশাদের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে। আরশাদ বাম হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে ইরার গাল ঘষে দেয় আলতো করে।

“আপনাকে কবি বা গল্পকার হতে হবে না। আপনি আপনার ভাষায় আপনার বউকে প্রশংসা করুন।”
“আমার ভাষায়? রাগ করবে না তো পরে?”
“না, রাগ করবো কেনো?”
আরশাদ ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভাবে, কি বলা যায়।

“ইরাবতী তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে তুমি প্রথম সকালের এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি, হতে পারে আফিমের নেশা ওই দুই চোখ। কিংবা মাথাভর্তি দুশ্চিন্তার সময়ে সিগারেটের একটা লম্বা টান….”
ইরা উঠে দাঁড়ায়। তীক্ষ্ণ চোখে আরশাদের দিকে তাকাতেই আরশাদ হেসে দেয়।

“দেখেছো আমি বলেছিলাম তুমি রাগ করবে। কি করবো বলো? আমার কাছে সৌন্দর্যের উপমা মানেই তো ক্যাফেইন। একটানেই দুনিয়া ভুলে যাই।”
“কি বিরক্তিকর!”
“হুম তা বটে। আমি প্রেমিক হিসেবে খুবই বিরক্তিকর একটা মানুষ। ভার্সিটিতে থাকতে একটা মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছিলো। এক ব্যাচ জুনিয়র। সে আমাকে বিভিন্ন ভাবে প্রেম নিবেদন করতে চাইতো। আমি বুঝতাম না। শেষমেশ সে আমাকে অভিশাপ দিলো আমার মতো বিরক্তিকর একটা মানুষের কোনোদিন প্রেম, ভালোবাসাই হবে না।”
ইরা চাপা গলায় বললো,”মেয়েটা দেখতে কেমন ছিলো?”
“ভালোই ছিলো, শুধু হালকা পাতলা গোঁফ ছিলো নাকের নিচে। যদিও আমার তাতে বিশেষ অসুবিধা ছিলোনা।”
“ছিহ! আপনি তাও খেয়াল করেছেন?”
“বাহ রে! আমার প্রেমে পড়েছে বলে কথা। এটুকু খেয়াল করবো না?”
ইরা তপ্ত শ্বাস ফেলে আর আরশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আরশাদ হাসি চাপতে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরায়। ইরা বুঝতে পারে আরশাদ মজা করছে তার সাথে। এই গুণটা এই মানুষটার প্রশংসা করার মতোই। অবলীলায় গম্ভীর মুখে মজা করে যেতে পারে।

“অনেক বিশ্রাম করেছেন, এবার একটু হাঁটুন।”
আরশাদ আধখাওয়া সিগারেটটা ফেলে দেয় দূরে। মুখটা বিষিয়ে উঠেছে হঠাৎ।

“ইরা তুমি অযথাই চেষ্টা করছো। আমি আর হাঁটতে পারবো না কখনো।”
ইরা ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে আরশাদের মুখোমুখি বসে। দুই হাতে আরশাদের মুখটা চেপে ধরে আলতো করে।

“আমার দিকে তাকান।”
আরশাদ তাকায় এক জোড়া ভ্রমর কালো চোখের দিকে। গত রাতে ইরা কাজল দিয়েছিলো চোখে। কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে মুখজুড়ে।

“বলো।”
“আমার মনোবলটা ভেঙে দিবেন না। আমাদের একসাথে অনেকটা হাঁটতে হবে। আমি জীবনে অনেক কিছু পাইনি। সবকিছু পেতে চেয়েছি আপনার কাছে। আপনি যখন বলেন সম্ভব না, আমি তখন হারিয়ে ফেলি সব সম্ভাবনা। আমার জন্য এটুকু করতে পারবেন না? আপনার ইরাবতীর জন্য, আপনার নূরবউয়ের জন্য কিংবা আপনার ভ্রমরের জন্য?”
আরশাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুচকি হাসে। উঠে দাঁড়ায় ক্র‍্যাচে ভর দিয়ে, ইরা তাকে সাহায্য করে।

“আজ আমরা অন্যদিনের চেয়ে আরেকটি বেশি হাঁটবো কেমন? এই ধরুন আধঘন্টা মতো?”
“বেশ তবে তা-ই হোক।”
ইরা আরশাদের এক হাত ধরে।
শীত পুরোপুরি পড়ে গেছে। এই মধ্য সকালেও হাড় হিম করা ঠান্ডা। যদিও নরম রোদ উঠেছে কিন্তু শীত কমেনি তাতে। আরশাদের কষ্ট হলেও কিছু বলেনা। মেয়েটা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আবার নাকি সে হাঁটবে। সে কখনো মিরাকলে বিশ্বাস করতো না। কিন্তু আজকাল খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। গ্যারেজে অযত্নে পড়ে থাকা তার প্রিয় কালো রঙের মোটরসাইকেলটার দিকে তাকিয়ে যে দীর্ঘশ্বাস গুলো পড়ে, তা কি কেউ দেখে? এ যে শুধু সে জানে!

“এ কি? আপনি তো ঘেমে গেলেন। এই শীতেও ঘামছেন কেনো? খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
ইরা নিজের কোমল আঁচল দিয়ে আরশাদের কপাল মুছে দেয়।

“তুমি পাশে থাকলে কষ্টটাকে কষ্ট বলে মনে হয় না ইরা।”
ইরা মৃদু হাসে। তার মা যদি জানতো, তার সেই অবহেলায় জর্জরিত হওয়া মেয়েটা এক দুনিয়ার সমস্ত সুখ পেয়ে গেছে এক পুরুষের মাঝেই, তার ফেলে যাওয়া অযত্নের পাথরটিকে কেউ পরম মমতায় আগলে দামী রত্নে রূপান্তরিত করেছে তবে ঠিক কতোটা খুশি হতো? এটা জানার জন্য যে আগে তাকেও মা হতে হবে। সন্তানের প্রতি মায়ের অনুভূতি মা না হলে কি বোঝা যায়?

“সেদিন ছিলো শুক্লপক্ষের রাত,
পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছিলো চাঁদ।
দখিনা হাওয়া অঙ্গে জড়িয়ে,
নিশ্ছিদ্র আঁধার বারংবার পেরিয়ে।
ভ্রমর তার ফুলকে করেছিলো আপন, ভেঙেছিলো সব মান।
তার পুষ্প কি জানে? এ রাত মায়ায় ভরা,
হবে না এ রাতে তোমার আমার চন্দ্রস্নান?”

ইরা থামে, আরশাদ মুগ্ধ চোখে তাকায় তার দিকে। স্বয়ং ভ্রমর তার পাশে, তার মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে একেকটা মধুর পঙক্তি। কি সুন্দর এই দিনটা। এমন দিনের জন্য সহস্র বছর বাঁচতে ইচ্ছা করে। কোটি কোটি রজনী পার করে দিতে ইচ্ছা করে।

বড় বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছে নিজাম হোসেন। নীলু ধীর পায়ে যেয়ে বাবার কাছে দাঁড়ায়। তার হাতে এক কাপ চা।

“বাবা তোমার চা।”
নিজাম হোসেন পত্রিকা সরিয়ে চশমার ফাঁকা দিয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। মেয়েটাকে অস্থির লাগছে কেমন।

“বাবাহ! আজ সূর্য কোনদিকে উঠলো? এক কাপ চায়ের জন্য চেচিয়ে বাড়ি মাথায় তুললেই কেবল জোটে। সেখানে আজ নিজে থেকেই?”
নীলু বিরক্ত হয়ে বাবার সামনে বসে।

“এমনভাবে বলছো যেনো আমি নিজে থেকে কখনোই তোমাকে চা বানিয়ে এনে দিইনা।”
“না তা দিস। সেসব দিনে নিজেকে ভীষণ ধন্য মনে হয়।”
নিজাম হোসেন চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবার পত্রিকায় মন দেয়।

“বাবা।”
“বল।”
নীলু চোখ বন্ধ করে দুইবার লম্বা করে শ্বাস নেয়।

“বাবা আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।”
“বল, শুনছি।”
“আগে তাকাও আমার দিকে, তারপর বলবো।”
“কি অদ্ভুত! শুনবো কান দিয়ে। তাকাতে হবে কেনো? তোর কি ধারণা আমি চোখ দিয়ে শুনি?”
“উফফ বাবা….”
মেয়ের ধমকে নিজাম হোসেন সত্যি সত্যি পত্রিকা সরিয়ে ফেলে। ভাঁজ করে রেখে দেয় পাশে। এই মেয়ে তার মায়ের মতোই। কথা বলার সময় সম্পূর্ণ দৃষ্টি তার দিকে না পেলে কথাই বলবে না।

“ঠিক আছে, এবার বল।”
“আগে বলো, আমি যা চাইবো তুমি দিবে। না করবে না।”
“কি মুসিবত রে বাবা! এখন যদি তুই নীল তিমি বায়না করিস তা আমি কোথায় পাবো?”
নীলু দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলায়।

“বাবা মশকরা করবে না। আমার মশকরা পছন্দ না।”
“তাহলে কি পছন্দ ঝটপট বলে ফেল। নীল তিমি বাদে আর যা চাইবি পাবি। আমার ভয় করে ওটা।”
“বাবা আবার….”
“আচ্ছা বল।”
নীলু দুই হাত ঘষতে থাকে। নিজাম হোসেন অপলক তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে। মনে মনে ভীষণ হাসি পাচ্ছে তার।

“তুই কি বলবি?”
“বাবা আমি ঠিক করেছি আমি বিয়ে করবো।”
“অ্যাহ?”
নীলু দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বসে আছে। এই মুহুর্তে চোখ বন্ধ করে। কোনোভাবেই বাবার দিকে তাকাতে পারবে না সে এখন।

“বিয়ে করবি? তুই?”
“তা নয়তো কি তোমাকে এই বয়সে বিয়ে দিবো?”
“না তা যে তুই করবি না জানি। কিন্তু আগে তোর ব্যাপারটা হজম করতে দে। যে মেয়ে বিয়ের নাম শুনলেই শত হস্ত দূরে থাকতো, সেই মেয়ে নিজে থেকেই বিয়ে করতে চাচ্ছে? এ যে অতীব চমৎকার সুসংবাদ।”
“বাবা মজা করোনা। আমি সত্যি বলছি।”
“তা কাকে বিয়ে করবি বলে ঠিক করেছিস? দয়া করে কোনো নীল তিমিকে বিয়ে করিস না। আমার খুব ভয় করে।”
“বাবা বারবার নীল তিমি নীল তিমি করছো কেনো? আমি একটা মানুষ হয়ে নীল তিমি কেনো বিয়ে করবো?”
“হ্যা যুক্তি আছে তোর কথায়। হয়েছে কি বল তো। গত রাতে স্বপ্নে তোর মা’কে দেখেছি। কিন্তু সে নীল তিমি হয়ে গেছে। আমাকে হাঁ করে গিলতে আসছে। সেখান থেকেই ব্যাপারটা মাথায় ঢুকে গেছে।”

নীলু ওড়নায় আঙ্গুল পেঁচাতে পেঁচাতে বললো,”বাবা আমি আসলে…”
“তুই আসলে?”
“আমি রোশান সাহেবকে বিয়ে করতে চাই। ওভাবে তাকিয়ে থেকো না দয়া করে। হ্যা হ্যা, তোমার ওই অতি প্রিয় ডাক্তার রোশান সাহেবকেই….”
নিজাম হোসেন কিছুটা ঝুঁকে মেয়ের চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করে।
নীলু আচমকাই হরিণের মতো ছুটতে ছুটতে নিজের ঘরে চলে আসে আর শব্দ করে দরজা আটকে দেয়।

বিছানায় কুন্ডলী পাকিয়ে বসে কাঁপতে থাকে। কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার। এরকম বেশরম কীভাবে হতে পারলো সে বাবার সামনে? এমন লাগছে কেনো তার?

দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে ঢোক চেপে সেদিকে তাকায় নীলু।

“হ্যা রে মা! আমার কথাটা না শুনেই তো চলে এলি।”
নীলু ক্ষীণ গলায় বললো,”বলো বাবা।”
“তোর রোশান সাহেবকে বলে দে, বাবা রাজি। কিন্তু ফর্মালিটির একটা বিষয় আছে তো নাকি? আমি মেয়ের বাবা বলে কথা। প্রস্তাব নিয়ে আসতে বল, সাথে দইমিষ্টি আনা কিন্তু জরুরি। তারপর ভেবে দেখি মেয়ে দেওয়া যায় কিনা!”
নীলু বাবার কণ্ঠের রসবোধটা ধরতে পারতেই বালিশ চেপে ধরে মুখের সাথে। ইশ! কিশোরী মেয়েদের মতো লজ্জা পাচ্ছে সে। এটা কোনো কথা?

মিনিট দশেক পর নিজেকে কিছুটা সামলে নীলু খাটের পাশে থাকা ল্যান্ডলাইনের রিসিভারটা তুলে নেয়। রোশান এখন চেম্বারেই থাকে। নাম্বারটা মুখস্থই তার।

দুইবার রিং হওয়ার সাথেই ওপাশ থেকে রোশানের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ।

“হ্যা নীলু, বলো।”
নীলু অবাক হয়ে বললো,”আপনি কীভাবে জানলেন আমি ফোন দিয়েছি?”
রোশান ছোট্ট করে হাসে, কিছু বলেনা।

“আপনি কি ব্যস্ত?”
“হ্যা তা একটু। কিছু বলবে?”
“আচ্ছা তাহলে পরে ফোন দিই?”
“না, যা বলার এখনই বলো।”
নীলু ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,”বাবা রাজি হয়েছে।”
“কোন ব্যাপারে?”
“কোন ব্যাপারে আবার? আমাদের বিয়ের ব্যাপারে। আপনার প্রস্তাব নিয়ে আসতে বলেছে।”
“আর সাথে দইমিষ্টি নিয়ে তাইতো?”
নীলু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললো,”এই আপনি এটা জানলেন কীভাবে?”
রোশান চেয়ারে শরীর এলিয়ে বসে বললো,”কারণ উনি আগে থেকেই সব জানেন। আমি সন্ধ্যায় আসছি। তৈরি থেকো, তোমাকে নিয়ে আজই বিয়ের কেনাকাটা শুরু করবো।”
“মানে কি?”
“মানেটা বাবার সাথে আলোচনা করে নিও। আমার একটা ওটি আছে। উঠতে হচ্ছে। দেখা হচ্ছে কয়েক ঘন্টা পর। আর হ্যা সুন্দর করে সাজবে কিন্তু। রাখছি, কেমন?”
খট করে একটা শব্দ হয়। নীলু তবুও ফোনটা কানের কাছে চেপে রাখে। সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে তার। এভাবেও প্রেমে পড়া যায়?

হাঁটতে হাঁটতে কখন যে নির্জন রাস্তায় চলে এসেছে ওদের খেয়াল নেই। এই রাস্তায় জনমানুষ এমনিও কিছুটা কম থাকে। চারপাশে গাছপালায় ঘেরা। দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার।

“ইরা আমি পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিতে চাই এখানে। পায়ে যন্ত্রণা করছে।”
ইরা সাথে সাথে চেয়ার মেলে দেয়। ডাক্তার বলেছে আর যা-ই হোক, পায়ের উপর বেশি চাপ ফেলা যাবে না।
“অনেক বেশি খারাপ লাগছে? আমি কি টিপে দিবো পা?”
“প্রয়োজন নেই। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
ইরা এই রাস্তায় আগে কখনো আসেনি। আরশাদ সিগারেট ধরানোতে ইরা হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা এগিয়ে যায়। চারদিকে প্রচুর গাছপালা থাকায় ঠান্ডাটা বেশি। ইরা নিজের গায়ের চাদরটা ভালো করে চেপে ধরে। ইরা ঠিক করে আরশাদ সুস্থ হলে এই রাস্তায় ঘুরবে মোটরসাইকেলে, ওরা দু’জন।

বুক ভরে শ্বাস নিতে নিতে ইরা হাঁটে। আপনমনেই হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে যায়।

আচমকাই বিপদ মনে করে ডান পাশে তাকাতেই আঁৎকে ওঠে। ভয়ে হৃৎপিণ্ডটা ধক করে ওঠে। গলার কাছে উঠে আসে যেনো অজানা আতঙ্কে।

ওপাশ থেকে প্রায় আট, দশটা কুকুর ধেয়ে আসছে, ইরার দিকেই। কুকুরগুলোকে স্বাভাবিক লাগছে না। দাঁত খিঁচিয়ে রেখেছে। ইরার ইচ্ছা করে ছুটে পালাতে। কিন্তু সে শুনেছে, দৌড়ালে কুকুর আরো বেশি ধাওয়া করে। তাছাড়া যে গতিতে ওরা ছুটছে ইরা পারবেও না বেশিদূর যেতে। শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে ভয়ে।

হঠাৎই বসে পড়ে সে ওখানেই। দুই হাতে মুখ চেপে ধরে কোনোরকমে চিৎকার করে ওঠে।
“আরশাদ আপনি কোথায়? আমাকে বাঁচান।”
কিন্তু আরশাদ আসবে কীভাবে? সে তো অনেকটা এগিয়ে গেছে। আরশাদ তো দৌড়াতেও পারবে না।

ইরার চোখমুখ ঢাকা নিজের হাতে। তবুও সে টের পাচ্ছে ওরা খুব কাছে চলে এসেছে। ভয়ংকর গোঙানির আওয়াজ পাচ্ছে সে। ইরার ঠোঁট কাঁপতে থাকে। এভাবেই কি মৃত্যু ছিলো তবে তার? শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে সে সহসাই।

(চলবে….)