#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ৩৩
“আপনার কফি…”
আরশাদ ঘোলাটে চোখে তাকায় ইরার দিকে। মেয়েটা জোর করে হাসছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বত্রিশ দিন পর আরশাদ নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে। এই পুরো সময়টাতেই ইরা আঠার মতো লেগে ছিলো তার সাথে। তার ক্লান্ত চেহারা, চোখের নিচের চওড়া কালি প্রমাণ করছে কতো নির্ঘুম রাত সে পার করেছে। জলোচ্ছ্বাস ধ্বংসাত্মক গতিতে বয়ে যাওয়ার পর কোনো এলাকা যতোটা এলোমেলো দেখায়, ইরাকে তেমন লাগছে। তবুও আরশাদের সামনে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তার লুকিয়ে থাকা কান্নাগুলো আরশাদের সামনে স্পষ্ট।
“খেতে ইচ্ছা করছে না।”
“একটু খান, ভালো লাগবে।”
“আচ্ছা টেবিলে রেখে দাও, পরে খাবো।”
“ঠান্ডা হয়ে যাবে তো। আচ্ছা আমি মুখের কাছে ধরছি, আপনি খান।”
“বললাম তো খাবো না। কেনো জিদ করছো?”
আরশাদের হালকা ধমকে ইরা কিছুটা কেঁপে ওঠে। বিচলিত হলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়।
“আচ্ছা আমি রেখে দিচ্ছি। আপনার যখন খেতে ইচ্ছা করবে বলবেন, আমি গরম করে এনে দিবো।”
আরশাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো,”আমার সামনে একটু বসো না ইরা। আমি কিছু কথা বলতে চাই।”
ইরা সাথে সাথে আরশাদের হুইল চেয়ারের সামনে মেঝেতে বসে পড়ে। আরশাদ নির্লিপ্ত চোখে তার দিকে তাকায়।
“মেঝেতে বসতে বলেছি? চেয়ার টেনে সামনে বসো।”
ইরা মাথা নেড়ে উঠে যায়। চেয়ার টেনে জড়োসড়ো ভাবে বসে আরশাদের সামনে। আরশাদের চুল, দাড়ি বড় হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই অস্বস্তি লাগছে তার। ইরা ঠিক করে আজকে নিজেই কেটে ছোট করে দিবে, একটু আরাম পাবে। আপাতত নিজে থেকে তেমন কিছুই করতে পারছে না আরশাদ।
“ইরা কতোদিন ঘুমাও না?”
ইরা জোর আবার হেসে দেয়।
“রোজই ঘুমাই। কে বললো ঘুমাই না?”
আরশাদ ইরার দিকে ঝুঁকে আসে কিছুটা।
“আমার থেকে লুকাচ্ছো?”
“কি লুকাবো? আপনি তো আমার অন্তর ছুঁয়ে ফেলেছেন। আপনার থেকে লুকিয়ে আমি যাবো কই? হ্যা সত্যিই ঘুমাই, ঘুমাতে হয়। না ঘুমালে বাঁচবো কীভাবে? আমাকে যে এখন আপনার জন্য বেঁচে থাকতে হবে। একটা সময় ছিলো যখন আমি নিজের মৃত্যু কামনা করতাম। এখন আমি সেইদিনটা পর্যন্ত বাঁচতে চাই যেদিন পর্যন্ত আপনি এই পৃথিবীতে আছেন। বিশ্বাস করুন তার বেশি আর একটা দিনও না।”
আরশাদ দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছে তার। ইচ্ছা করছে ইরাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরতে।
“আচ্ছা আমি তো এখন বাড়িতে এসেছি। আজ তুমি বিশ্রাম নিবে। অনেকটা সময় নিয়ে ঘুমাবে। বুঝেছো?”
“না বুঝিনি। আক্কেলটা কি আপনার বলুন তো? এখন কি আমার ঘুমের সময়? একটু পর পর আপনাকে এটা ওটা খেতে দিতে হবে, সময় মতো ওষুধ দিতে হবে, পায়ের এক্সারসাইজ করাতে হবে। আমার বুঝি এখন বিশ্রামের ফুরসত আছে? মায়ের বয়স হয়েছে। তাছাড়া উনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আশা ছোট, বোঝে না এতোকিছু। আমি না করলে কে করবে?”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”ইরা তুমি নিজের জীবনটা এভাবেই শেষ করতে চাচ্ছো? তোমার সামনে ভবিষ্যত নেই?”
ইরা অবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকায়। কি বলতে চাচ্ছেন উনি?
“ভবিষ্যত? হ্যা ভাবছি তো আমার ভবিষ্যত নিয়ে। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যতে দুইটাই তো আপনি। আপনাকে নিয়েই ভাবছি।”
আরশাদের কণ্ঠ ধরে আসে। খেই হারাচ্ছে বার বার সে। ভেবেছিলো কঠিন হবে, কিন্তু পারছে না।
“ইরা তুমি কি বুঝতে পারছো আমার অবস্থা? আমি যে পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে গেছি বুঝতে পারছো তুমি? এই দুইটা পা দিয়ে আমি আর কোনোদিন উঠে দাঁড়াতে পারবো না, হাঁটতে পারবো না। এই হুইল চেয়ার আর দু’টো ক্র্যাচ আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। এটা বুঝতে পারছো তুমি?”
ইরা হালকা চিৎকার করে ওঠে সাথে সাথে।
“না বুঝতে পারছি না। বুঝতে চাচ্ছিও না। ওরা মিথ্যা, ওরা ভুল। আমার বিশ্বাস আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন। আবার হাঁটবেন নিজের পায়ে। আমাদের যে একসাথে এখনো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।”
আরশাদ হাসে, প্রথমে নিঃশব্দে তারপর শব্দ করে। ইরা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় তার দিকে।
“হাসছেন কেনো আপনি? বাচ্চা মানুষের প্রলাপ মনে হচ্ছে আমার কথা আপনার কাছে?”
“হ্যা মনে হচ্ছে। বাচ্চারাও এতোটা আকাশ কুসুম চিন্তা করেনা ইরা।”
“আমি আকাশ কুসুম চিন্তা করছি?”
“করছো না? জোর করে বাস্তবকে না মানার চেষ্টা করলেই বাস্তব স্বপ্নের মতো সুন্দর হয়ে যায়না ইরা। বোঝার চেষ্টা করো। তুমি যার পাশে হাঁটার স্বপ্ন বুনছো, সে আর তোমার পাশে হাঁটতে পারবে না। কখনো না, কোনোদিন না।”
ইরা উঠে দাঁড়ায়। ঘন ঘন তপ্ত শ্বাস পড়ছে তার ক্রমাগত।
“উঠলে কেনো? আমার কথা শেষ হয়নি। কথা শেষ হবে, তারপর যাবে তুমি।”
ইরা বসে না, কোনো উত্তরও দেয়না আরশাদের কথার।
“ইরা তোমার বয়স খুব কম। তুমি অসাধারণ একটা মেয়ে। একটা সুন্দর ভবিষ্যত তোমার সামনে। এটা আমার মতো একটা পঙ্গু মানুষের পিছনে নষ্ট করে দিও না। আজ আমি তোমাকে আরশাদ নামক খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিলাম। তুমি আকাশে উড়ে যাও। আমি তাকিয়ে তোমার ওড়া দেখবো।”
“মানে?”
“তোমার যা যা প্রয়োজন, আমি তোমাকে তাই দিবো। কিন্তু আমার জন্য নিজেকে এভাবে উৎসর্গ করে দিও না। আমি সহ্য করতে পারবো না। তুমি পড়াশোনা করো, আমার বিশ্বাস তুমি ভালো কিছু করতে পারবে।”
ইরা চোখের দু’ফোঁটা পানি মুছে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”আপনাকে আমার কখনো এতোটা কাপুরুষ মনে হয়নি আরশাদ। আমার কাছে আপনি একজন সুপুরুষ। আর আপনি আজ….”
আরশাদ অন্য দিকে তাকায়। বুক থেকে গরম ভাপ বের করে দেয়। অসহ্য কষ্ট হচ্ছে তার বুকে।
“ইরা জীবনটা কোনো সিনেমা নয়। কোনো উপন্যাসের পাতাও নয়। বাস্তব তোমাকে মানতে হবে। আর তাতে যদি আমি তোমার কাছে কাপুরুষ হয়ে যাই, তবে তাই।”
ইরা একবার আরশাদের দিকে তাকিয়েই বারান্দায় ছুটে যায়। ফিরে আসে পাখির খাঁচাটা হাতে। ইরার অনুপস্থিতিতে আশা মাঝে মাঝে ওদের খাবার দিতো। অনেকটাই অসুস্থ আর দূর্বল হয়ে পড়েছে ওরা, তবুও বেঁচে আছে।
“এদিকে তাকান, তাকান বলছি।”
আরশাদ তাকায় খাঁচাটার দিকে।
“মনে আছে কি বলেছিলেন আপনি? বলেছিলেন ওরা খাঁচাতে থেকেই অভ্যস্ত। ওদের যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, ওরা মুক্ত আকাশে উড়তে পারবে না। হয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে যাবে আর নাহয় খাদ্য হবে কোনো শিকারী পাখির। তারচেয়ে ওরা খাঁচায় থাকুক, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বাঁচুক। মনে পড়ে?”
আরশাদ উত্তর দেয়না।
“আমিও তো খাঁচায় আবদ্ধ পাখি আরশাদ। আপনার খাঁচায় আমার বাস। আমি যে মুক্ত আকাশে উড়তে শিখিনি। আমি তো খাঁচার মধ্যেই ভালোবেসে সিক্ত হতে শিখেছি। আপনি আমাকে সেই ভালোবাসা শিখিয়েছেন। তাহলে কেনো আমাকে মুক্ত করে দিতে চান? আমিও যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে যাবো আর নয়তো খাদ্য হবো কোনো শিকারী পাখির। সহ্য করতে পারবেন তখন?”
আরশাদ ঠোঁট কামড়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়, তার চোখ লাল।
“জীবনকে সিনেমা হতে হবে না, উপন্যাসের পাতা হতে হবে না। ইরার কাছে জীবন মানে আরশাদই থাকুক। এই অধিকারটুকু কেড়ে নিবেন না আমার থেকে৷ আপনি আমার সাথে চলবেন আবার। আমার পায়ে হাঁটবেন আপনি।”
ইরা ঝড়ের বেগে চলে যায় ঘর ছেড়ে। আরশাদ মূর্তির মতো বসে থাকে নিজের মাথার চুল চেপে ধরে। মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে। ইদানীং অল্প চাপ নিলেই মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হয়। সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশের। বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে ছুঁতে ইচ্ছা করে ভীষণভাবে।
★
সন্ধ্যার কিছু সময় পর দরজায় কারো ছায়া দেখে আরশাদ মাথা তোলে। সে ভেবেছিলো ইরা এসেছে। সকালের পর ইরাকে দেখতে পায়নি একবারের জন্যেও৷ ইচ্ছা করে তার সামনে আসছে না। তার যা যা দরকার আশাকে দিয়ে পাঠাচ্ছে। সম্ভবত কোথাও বসে কাঁদছে। আরশাদের ব্যবহার তাকে কষ্ট দিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে। কিন্তু সে কি কোনোদিন বুঝবে আরশাদ তাকে এগুলো কেনো বলেছে?
“আরশাদ…”
বাবার ডাকে আরশাদ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে। খাটের উপর শুয়েছিলো সে। হুইল চেয়ারটা দেখলেই কেমন অসহ্য লাগছে তার। জীবনটাকে অভিশপ্ত লাগছে।
“এসো বাবা।”
“লাইট জ্বালাসনি কেনো? অন্ধকারে শুয়ে আছিস।”
“অন্ধকারই ভালো লাগছে বাবা। পাশে এসে বসো।”
রাশেদুল ম্লান হেসে আরশাদের পাশে এসে বসে।
“নামাজ পড়েছিস?”
“পড়েছি বাবা, বসে বসেই।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আরশাদ মৃদু হাসে, কিছু বলেনা। তার কাছে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে হাস্যকর কথাটা হলো ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। সে জানে আর কিছুই ঠিক হবে না, আর কিছু ঠিক হওয়ার নয়।
“ইরাকে কি বলেছিস তুই?”
“কি বলবো?”
“যে মেয়ে এই বত্রিশটা দিন না কান্নাকাটি করে, না ভেঙে পড়ে তোর সেবা করে গেছে। খাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমের ঠিক নেই শুধু তোর কথা ভেবেছে। রাতের পর রাত তোর বেডের পাশে বসে নামাজ পড়েছে। তুই একটু নড়েচড়ে উঠলেও চিৎকার করে ডাক্তারকে ডেকে এনেছে। সেই মেয়ে আজকে পুরোপুরি ভেঙে গেছে। সারাদিন কান্নাকাটি করেছে আশার ঘরে বসে। চোখমুখ ফুলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। আর তুই বলছিস কিছু বলিস নি ওকে?”
আরশাদ শান্ত গলায় বললো,”আমি ওকে মুক্তি দিতে চেয়েছি আমার এই অভিশপ্ত জীবনটা থেকে। একে তো পঙ্গু, চাকরিবাকরিও নেই। ওর ভবিষ্যতটা কীভাবে নিজে হাতে নষ্ট করবো বাবা? ওর যা যা লাগবে আমি দিবো, শুধু আমার জীবন থেকে ও চলে যাক। এটুকুই বলেছি। আমার জন্য ওর জীবনটা নষ্ট হোক তা চাইনা।”
রাশেদুল চশমা খুলে কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে হাসে।
“বাপজান রে! বিয়ের পর আমার জীবন, তোমার জীবন বলে আর কিছু হয়না রে। একটাই জীবন, তা হলো আমাদের জীবন। তুই ওকে মুক্ত করতে চাস? একটা বার ইরার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে কল্পনা কর। দেখ তো ওর চারপাশে আরশাদ নামক বেষ্টনী ছাড়া আর কিছু আছে কিনা।”
আরশাদ চুপ করে থাকে জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকায়।
“তুই জানিস, ও ডাক্তারকে বলেছে আমি আপনাদের রিপোর্টকে ভুল প্রমাণ করে দেখাবো। আরশাদ আবার হাঁটবে, এটা ওর বিশ্বাস।”
আরশাদ ক্ষীণ গলায় বললো,”বাবা তুমিও কি ওর ছেলেমানুষীকে প্রশ্রয় দিচ্ছো? আমার অবস্থা, আমার রিপোর্ট তুমি তো জানো। আমার পক্ষে আর কোনোদিন হাঁটা সম্ভব না।”
“পৃথিবীরটা বড় অদ্ভুত রে বাপ! অনেক কিছুই ঘটে। তোর জন্মের সময় ডাক্তাররা বলেছিলো তুই পৃথিবীর আলো দেখবি না। আমি ভেঙে পড়েছিলাম৷ প্রথম সন্তান, তার মুখে বাবা ডাক শুনতে পাবো না? তাই কি হয়? তোর দাদী আমাকে সাহস দিয়ে বলেছিলো, বাঁচা-মরা একমাত্র আল্লাহর হাতে। আমরা কেউ না। বিজ্ঞানের ছাত্র তোরা, সবসময় প্রমাণ চাস। এটা কি বড় প্রমাণ না?”
“বাবা আমি….”
“আর কিছু বলিস না বাজান। আমি জানি তুই ওর সাথে ইচ্ছা করে খারাপ ব্যবহার করেছিস, যাতে ও নিজে থেকে তোর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে। কিন্তু সত্যটা কি জানিস? তুই যতো ওকে দূরে ঠেলে দিবি, ও তত তোর কাছে সরে আসবে। এটাই স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন। সৃষ্টির শুরু থেকে এমনটাই আল্লাহর বিধান। তুই এ বিধান লঙ্ঘন করবি কীভাবে?”
“আমার জীবনটা যে এই হুইল চেয়ারে আবদ্ধ হয়ে গেলো বাবা। আমি কোন সাহসে ওকে ভালোবাসবো?”
“ভালোবাসতে হৃদয়ের অনুভূতি প্রয়োজন। যা তোদের দুইজনের হৃদয়ে রয়েছে। ব্যস! আর কিছু লাগবে না।”
আরশাদ চুপ করে বসে থাকে। মাথা যন্ত্রণাটা আবার ফিরে আসছে। কিন্তু তার মন বলছে তার কাজল চোখের প্রেয়সী তার পাশে এলেই সব যন্ত্রণা শুন্যে মিলিয়ে যাবে। ইরা যে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে সবসময়। তার প্রেম যে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইরাকে হারিয়ে সে নিজেও কি ভালো থাকতে পারবে?
রাশেদুল উঠে দাঁড়ায়, ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে আলতো করে চাপ দেয়।
“মনোবল হারাস না। এক মনোবলের জোরেই বিশ্ব জয় করা যায়। মানবিকের ছাত্র ছিলাম বলে খুব বলেছিস একসময় আমাকে, বাবা আমরা বিজ্ঞানের ছাত্র। যুক্তি, তর্ক, প্রমাণে বিশ্বাসী। আজ তোর এই মানবিকের ছাত্র বাবাটার কথা শোন, মাঝে মাঝে যুক্তি, তর্ক, প্রমাণের চেয়েও মনোবল বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।”
আরশাদ বাবার হাতটা আঁকড়ে ধরে।
“আমি চললাম, বিশ্রাম নে।”
“বাবা একটু শোনো…”
“বল।”
“ইরা কে একটু ডেকে দিবে?”
রাশেদুল ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বেরিয়ে যায়। বাবা হয়ে সন্তানের মনের অলিগলি, চোরাগলি চিনবে না? এতো সহজ?
★
সকাল ছয়টা, ফজরের নামাজ শেষ করে আরশাদকে বারান্দায় নিয়ে এসেছে ইরা। তার খুব ইচ্ছা আরশাদকে বাইরে নিয়ে যাবে। খোলা মাঠে কিংবা নদীর পাড়ে। আরশাদ হাঁটতে পারছে না তো কি হয়েছে? ইরা তো পারছে, তাহলেই হবে।
কিন্তু ডাক্তার বলেছে এখনই ক্র্যাচে ভরা দেওয়া যাবেনা। হুইল চেয়ার ছাড়া চলাচল বারণ। দোতলা থেকে নামানো যাবে না। ইরা আপাতত কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।
“দেখুন সকালটা কতো সুন্দর। শ্বাস নিন, বুক ভরে। দেখুন পৃথিবী কতো সুন্দর।”
আরশাদ ইরার দিকে তাকায়। মেয়েটা শুকিয়ে কাঠির মতো হয়ে গেছে কয়দিনেই। গায়ের রঙ কালচে হয়ে গেছে। না আঁচড়াতে আঁচড়াতে চুলগুলো রুক্ষ, এলোমেলো। বোঝাই যায় কতোদিন তেল পড়েনি চুলে। অযত্নের ছাপ চোখেমুখে। তবুও এতো সুন্দর লাগছে কেনো তাকে? মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য একাই দখল করে বসে আছে। কে যেনো বলেছিলো, ‘প্রেয়সী কখনো অসুন্দর হয়না’। কথাটা ঠিক, একদম ঠিক।
“রোদ ওঠেনি এখনো ভালো করে।”
“কে বলেছে ওঠেনি?”
ইরা অবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”কোথায় রোদ?”
“এইযে আমার পাশে। এক ফালি রোদ। যে হাসলে আরশাদের দুনিয়ায় সকাল হয়, যে মন খারাপ করে বসে থাকলে আরশাদের দুনিয়ায় রাত নেমে আসে।”
ইরার ভিতরটা ভালো লাগায় ছেয়ে যায়। আজ কতোগুলো দিন পর আরশাদ সেই আগের মতো করে কথা বলছে। ইশ! সকালটা আসলেই ভীষণ সুন্দর।
কিন্তু নিজের ভালো লাগাটা উপরে প্রকাশ করেনা। মুখ বাঁকায় আরশাদের দিকে তাকিয়ে।
“খুব ঢং হচ্ছে এখন। একদম এসব বলবেন না। গতকাল তো আমাকে জীবন থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেই ফেলেছিলেন।”
আরশাদ ম্লান হেসে বললো,”তো যাবে না? আজীবন এই পঙ্গু বরটাকে সেবা করে কাটিয়ে দিবে?”
ইরার চোখ ছলছল করে ওঠে। সুন্দর সকালটার দিকে তাকিয়ে বিতৃষ্ণা ওঠে আবার।
“বসুন, আমি কফি নিয়ে আসছি।”
ইরা চলে যেতে গেলে আরশাদ তাকে আটকায়।
“কফি লাগবে না৷ এখন কোথাও যেও না, পাশে থাকো।”
“যাতে আমাকে আরো কষ্ট দিতে পারেন?”
“ইরা তুমি আমার অংশ। তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমার লাভ কি?”
ইরা আরশাদের পায়ের এসে বসে। কোলের উপর রাখা আরশাদের হাত দু’টো নিয়ে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে। ঝাপসা চোখে তাকায় আরশাদের দিকে।
“আমি তো সেদিনই মারা যাচ্ছিলাম, যেদিন আপনার নিথর শরীরটা ওই ঠান্ডা ঘরে আবদ্ধ ছিলো। কিন্তু আমি বেঁচে আছি দেখুন। কীভাবে বেঁচে আছি জানেন? আমার বিশ্বাসের উপর ভর করে। আমার বিশ্বাস আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন, পুরোপুরি। আমার এই বিশ্বাসটাকে দয়া করে ভেঙে দিবেন না। গুড়িয়ে দিবেন না আমার মনোবলটুকু। এটা ভেঙে গেলে আমিও শেষ হয়ে যাবো।”
আরশাদ ইরাকে নিজের কাছে টেনে এনে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। ইরার উষ্ণ অশ্রুর উপস্থিতি টের পায়।
“ভাগ্যিস এসেছিলে আমার জীবনে। নাহলে আমি জানতেই পারতাম না এভাবেও ভালোবাসা যায়।”
ইরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজায় কারো ঠকঠক আওয়াজ পেয়ে সচকিত হয় দুইজনই।
“আমি দেখছি।” বলে ইরা চলে যায় ঘরে।
দরজা খুলতেই ইরার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। ভোরের রোদ সাথে নিয়ে যেনো প্রবেশ করেছে নীলু। কাঁচা হলুদ রঙা সালোয়ার কামিজে কি মিষ্টি লাগছে তাকে দেখতে।
নীলু ইরার মুখে আলতো করে হাত ছোঁয়ায়।
“বিরক্ত করলাম?”
“একদমই না, আসুন না।”
নীলুর হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে আসে ইরা।
“কাল আসেননি কেনো নীলু আপা?”
নীলু অপ্রস্তুত হয়ে যায়, উত্তর দিতে পারেনা। আরশাদের মুখোমুখি হতে গতকাল নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে সে। শেষরাতের দিকে নিজেকে বুঝিয়েছে আরশাদ তার খালার ছেলে। সেই সাথে তার বন্ধুও। স্বামী বা প্রেমিক না হোক, অন্য সম্পর্ক তো আছেই। সে কেনো যাবে না?
“এমনিতেই…”
আরশাদ ততক্ষণে হুইল চেয়ারে নিজেই ঘরে চলে এসেছে। নীলুর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় সে।
“নীলু, তুমি? এতো সকালে?”
নীলু চোখ নামিয়ে নেয়। আরশাদকে এই অবস্থায় দেখার মতো সাহস এখনো তৈরি হয়নি তার।
ইরা নীলুকে খাটে বসায়।
“নীলু আপা, আপনি কফি খাবেন তো? আপনাদের দু’জনের জন্য বানিয়ে আনছি।”
“ইরা কোথাও যেতে হবে না। এখানে বসো তো। তোমাদের দেখতে এসেছি। এক্ষুনি চলে যাবো।”
ইরা নীলুর কথা শোনেনা। ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। নীলু ইতস্তত করতে থাকে।
“কেমন আছো নীলু?”
নীলু মুচকি হেসে বললো,”ভালোই।”
দুইজন চুপচাপ বসে থাকে, কে কি বলবে ভেবে পায়না। নীলু একবারের জন্যেও আরশাদের দিকে তাকাতে পারেনি এখনো।
“নীলু তোমাকে ধন্যবাদ।” নীরবতা ভাঙে আরশাদই।
“কেনো? কিসের ধন্যবাদ?”
“ইরার কাছে সব শুনেছি। যেভাবে তুমি ওর পাশে ছিলে, তা শুধুমাত্র একজন বড় বোন ছাড়া আর কেউ পারেনা। ওর তো তেমন কেউ নেই। তুমি ছিলে বলে ও শক্ত হতে পেরেছে।”
“ওই সময় আমার যেটুকু করাটা ঠিক মনে হয়েছে, তাই করেছি। আমার কাছে ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে ইরার চেয়ে অসহায় আর কাউকে মনে হয়নি। খালু, খালাম্মা কিংবা আমরা সবাই সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছিলাম। কারো কষ্ট কারো চেয়ে কম না। কিন্তু ইরা? যাকে তুমি এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা দিয়েছো, তার কষ্টের মাত্রা শুধুমাত্র যে ভালোবাসা হারিয়েছে সে-ই বোঝে। আমি বোধহয় কিছুটা বুঝেছিলাম। তাই আর নিজেকে ওর থেকে দূরে রাখতে পারিনি।”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আবারও নীরবতা কিছুক্ষণের।
“তবে আরশাদ তুমি ভাগ্যবান, অসম্ভব ভাগ্যবান। ইরা তোমাকে ওর সমস্তটা দিয়ে ভালোবেসেছে। ওর দুনিয়ায় তুমি বাদে কেউ নেই, এমনকি আমার মনে হয় ও নিজেও নেই।”
আরশাদ স্মিত হেসে বললো,”আমি চাই এমন নিখাঁদ ভালোবাসা তোমার জীবনেও আসুক। কেউ খুব যত্ন করে সাজিয়ে দিক তোমার জীবনটা, ফুলের বাগানের মতো। আমার ভালোবাসাকে যে তার বিপদে আগলে রেখেছে, তাকেও কেউ একইভাবে যত্ন নিয়ে আগলে রাখুক। বিশ্বাস করো, আমি খুব করে চাই।”
নীলু উঠে দাঁড়ায়। বেশিক্ষণ এখানে বসতে পারবে না। তার বুকে কোথাও যেনো সুঁচ বিঁধছে। সূক্ষ্ণ যন্ত্রণাটা সহ্য করতে পারছে না।
“নিজের যত্ন নিও আরশাদ। যদিও আমি জানি কেউ একজন আছে, যে তোমার চেয়েও তোমার যত্ন বেশি করে নেয়।”
“ভালো থেকো নীলু।”
“তুমিও….”
নীলু বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। আরশাদ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে আবার বারান্দায় চলে যায়। ইরা ঠিকই বলেছে, আজকের সকালটা আসলেই ভীষণ সুন্দর।
(চলবে……)
#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ৩৪
বাতাসে শীত শীত গন্ধ, কার্তিক মাসের মাঝামাঝিতেই এ বছর যেনো শীতকালের আভাস। আগেভাগে কুয়াশাজড়ানো ভোরের যেনো বড্ড তাড়াহুড়ো প্রকৃতির।
মাঠে মাঠে সোনারঙা ফসল, কৃষকের বাড়িতে নবান্নের উৎসব লেগেছে। নীলু এর আগে কখনো প্রকৃতির এতো কাছে আসেনি। তার জীবনটা পড়াশোনা আর তার ফাঁকে ফাঁকে ঘরের এক কোণে গল্পের বইতে ডুবেই কেটে গেছে। প্রকৃতি যে একেক মরশুমে একেক সৌন্দর্যে সেজে ওঠে এতোটা কাছ থেকে কখনো খেয়াল করেনি কেনো সে? এখন আফসোস হচ্ছে।
রওশানের গাড়িটা এসে থেমেছে এমনই এক ধান ক্ষেতের পাশে। বেশ অনেকটা সকালেই রওনা দিয়েছিলো সে আর নীলু। নীলু কথায় কথায় কিছুদিন আগে বলেছিলো তার বিদেশ ঘোরার খুব ইচ্ছা। দেশের পর্যটন কেন্দ্র যেগুলো আছে সবগুলোতেই ঘোরা হয়ে গেছে। দেশে আর কিছু দেখার নেই। রোশান বলেছিলো, যদি দেখাতে পারি? নীলু পাত্তাই দেয়নি রোশানের কথা।
গতকাল রাতে হঠাৎই রোশান নীলুকে বলে পরদিন খুব ভোরে যেনো তৈরি হয়ে থাকে, তার গাড়িতে একটু দূরে কোথাও যাবে। একটু গ্রামের দিকে। প্রথমে নীলু ইতস্তত করে। কয়েক মাসের পরিচিত একটা মানুষের সাথে দূরে যাওয়া যায়? তবে নীলুর মনে হচ্ছে ভাগ্যিস সে রাজি হয়েছিলো। নাহলে এতো সুন্দর দৃশ্য তার কাছে অজানাই থেকেই যেতো বোধহয়। এ দেশের আনাচে কানাচেই তো সৌন্দর্যের পসরা সাজানো, অদ্ভুত সে খেয়ালই করেনি আগে?
ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডা পড়ায় নীলু কালো শাড়ির উপর কালো একটা পাতলা চাদর পেঁচিয়েছে। চুলগুলো খোঁপা করা সুন্দর করে। কিছু অবাধ্য চুল দিনের প্রারম্ভিকের মিষ্টি বাতাসে এলোমেলো হয়ে চোখে, কপালে আছড়ে পড়ছে। চোখের কালো ফ্রেমের চশমাটার জন্য তাকে একটু ভারিক্কি লাগছে। তবে সৌন্দর্যের কমতি নেই মোটেই।
রোশান গাড়িতে হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকানো। আর নীলু অপার মুগ্ধতায় আলুথালু চোখে প্রকৃতি দেখছে। পাকা ধানের মিষ্টি গন্ধে ম ম করছে চারপাশ।
“বিউটিফুল….”
রোশান নীলুর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,”আসলেই বিউটিফুল।”
নীলু ভ্রু কুঁচকে তাকায় রোশানের দিকে।
“কিছু বললেন?”
“উহু।”
“রোশান সাহেব গাড়িতে আমার ক্যামেরাটা আছে একটু দিন না। এতো সুন্দর দৃশ্য ফ্রেমবন্দী না করলে চলবেই না। বাবাকে যেয়ে দেখাবো।”
রোশান ক্যামেরাটা এনে নীলুর হাতে দেয়। নীলুর ক্যামেরায় ক্রমাগত ছবি ওঠে সবুজ প্রকৃতির মাঝে সোনালী ধানের, কিছু নাম না জানা পাখির, কাকতাড়ুয়া আর শিশিরের।
নীলুর পিছনে আরেকটা ক্যামেরাতেও ছবি ওঠে একের পর এক। নীলু বুঝতেও পারেনা। রোশানের ক্যামেরায়, মুগ্ধ নীলুর ছবি।
“সবকিছু এতো সুন্দর কেনো রোশান সাহেব?”
রোশান মুচকি হাসে নীলুর দিকে তাকিয়ে। নীলু যেনো ছোট বাচ্চা হয়ে গেছে, যা দেখছে তাতেই অবাক হচ্ছে।
“খেঁজুরের রস খাবেন? এরকম শীতের সকালে কাঁচা খেঁজুরের রস অমৃতসম লাগে।”
নীলু ভ্রু কুঁচকে তাকায় রোশানের দিকে।
“এই সময় খেঁজুরের রস কোথায় পাবেন?”
“খুঁজলে তো আলাদীনের চেরাগও পাওয়া যায় নীলু ম্যাডাম। আপনি চাইলে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে হলেও এনে দিবো।”
“আয়রনি করছেন?”
“একবার চেয়েই দেখুন।”
“বেশ, খাবো।”
“চলুন তাহলে….”
নীলুকে নিয়ে রোশান খেঁজুরের রসের সন্ধানে নামে। ওদিকে হালকা হালকা রোদের আভাস কুয়াশা সরিয়ে। নীলু চাদর খুলে হাতে নেয়। রোশান এমনভাবে খেঁজুরের রস খুঁজছে যেনো একটা প্রাণঘাতী রোগের প্রতিষেধক, পেতেই হবে। তার অবস্থা দেখে নীলু হেসে দেয়।
“বাদ দিন রোশান সাহেব। চলুন ফিরে যাই। এমনিও এখন কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।”
“আর একটু খুঁজি? পেয়ে যাবোই।”
নীলু আর কিছু বলেনা। রোশান শান্তশিষ্ট হলেও জেদী। সে একবার কিছু চাইলে তা করেই ছাড়ে।
সত্যিই খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও যায়। এক কিশোর ছেলে গাছ থেকে হাড়ি নামাচ্ছে মাত্রই। রোশান দৌড়ে যেয়ে তাকে ধরে।
“তুমি কি রস বিক্রি করো?”
ছেলেটা আপাদমস্তক রোশানকে দেখে এরপর নীলুর দিকে তাকায়।
“জে।”
“আমি কিনবো। দাম কতো? দাম বলো।”
রোশান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে।
ছেলেটা বিরস গলায় বললো,”আপনার ধারে রস বেচবো না।”
“সে কি কেনো?”
“আমার ইচ্ছা।”
“এটা কেমন ইচ্ছা? তোমার দরকার রস বিক্রি করা, কার কাছে করবে এটা তোমার দেখার বিষয় না। আমি তো টাকা দিয়েই কিনবো।”
“বেচবো না বলছি যখন বেচবো না।”
নীলু বিরক্ত হয়ে বললো,”চলুন তো রোশান সাহেব। আমার খাওয়ার ইচ্ছাও নেই।”
রোশান যাবে না কোনোভাবেই। সে যেনো পণ করেছে নীলুকে আজ সে খেঁজুরের রস খাওয়াবেই। আর এই ছেলের কাছ থেকেই কিনবে।”
“তোমাকে টাকা বাড়িয়ে দিচ্ছি।”
“ওইযে দেখেন গাছে আরেকটা হাড়ি আছে। এতো ইচ্ছা করলে ওটা পাড়েন। খেঁজুর গাছে উঠতে পারেন?”
“আমি পাড়বো?”
“খাইতে চাইলে পাড়েন, অসুবিধা কি?”
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে রোশান। নীলু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রোশান কি সত্যি সত্যি গাছে উঠে যাবে? ভাবসাব দেখে তো মনে হচ্ছে অসম্ভব না।
সত্যিই অসম্ভব না। রোশান জুতা খুলে রাখে, প্যান্ট ভাঁজ করে নেয়।
“এ কি? আপনি সত্যই গাছে উঠবেন?”
“না হলে খাবো কীভাবে? তুমি তো আর বিক্রি করবে না। এ ছাড়া উপায় কি?”
নীলু মুখ চেপে ধরে হাসছে। লোকটা বিশ্রীভাবে তার প্রেমে জড়িয়ে গেছে, একদম আষ্টেপৃষ্টে। শুধু প্রকাশ করতে পারছে না। আশ্চর্য মেয়ে হয়ে কি সে আগে প্রস্তাব দিবে? লোকটার মাথায় কি কিছুই নেই?
“খেঁজুর গাছে কিছু প্রচুর কাঁটা। ফুটে গেল….”
রোশান “আল্লাহ ভরসা” বলে সত্যিই গাছে উঠতে চলে যায়। নীলু হতভম্ব। লোকটা পাগল হয়ে গেছে নির্ঘাত। এসব কি?
শেষ মুহুর্তে রোশানকে গাছে ওঠা থেকে বাঁচায় ওই ছেলেটাই। হাতে থাকা হাড়িটা এগিয়ে দেয় তার দিকে।
“ধরেন এটা। খাবেন কিসে? গেলাসের ব্যবস্থা করবো?”
“হাড়ি ধরে খেয়ে নিতে পারবো।”
“আপনি পারবেন সবই, বোঝা হয়ে গেছে। আপায় কি পারবে?”
নীলু দ্রুত বেগে মাথা নাড়ে। হাঁড়ি ধরে রস খাওয়া অসম্ভব।
হালকা শীতের সকালে গ্লাস ভর্তি তাজা খেঁজুরের রস। নীলু একই সাথে মুগ্ধ আর হতভম্ব। ইশ জীবন কি সুন্দর। এতোটা সুন্দর আগে অনুভব করেনি কেনো সে?
রোশান হাড়ি ধরেই খায়। ছেলেটা ধৈর্য্য ধরে দাঁড়িয়ে তাদের খাওয়া দেখে। রসকষহীন মুখ ছেলেটার, তবুও এই অচেনা মানুষ দু’টোর খাওয়া দেখতে তার ভালো লাগছে।
“কতো দাম দিবো? বাড়িয়েই দিবো। যতোই হোক গাছে ওঠা থেকে বাঁচিয়েছো বলে কথা।”
ছেলেটা সেই পূর্বের মতোই বিরস গলায় বললো,”দাম লাগবে না।”
“দাম লাগবে না মানে?”
“বাংলা কথা বুঝেন না নাকি? দেন হাঁড়ি দেন, আমি যাই।”
“কিন্তু এটা তো তোমার বিক্রি করার জন্য ছিলো।”
“ভালো হইছে।”
এই বলে এক ঝটকায় রোশানের হাত থেকে ফাঁকা হাঁড়ি কেড়ে নেয় সে, নীলুর হাত থেকেও খালি গ্লাসটা নিয়ে নেয়।
“এই ছেলে দাঁড়াও, টাকা নিয়ে যাও।”
ছেলেটা মুখটা বাংলার পাঁচের মতো বানিয়েই ছুটে চলে যায় সেখান থেকে। রোশান কিছুক্ষণ দৌড়ায় তার পিছনে।
“অদ্ভুত তো! পাগল নাকি?”
নীলু হাসতে হাসতে বসে পড়ে পারলে। কতোদিন এভাবে মন খুলে হাসে না। পেটে হাত দিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় গাছের সাথে।
“রোশান সাহেব আপনি সত্যিই এতো মজার মানুষ।”
“কিন্তু ও বেটা টাকা নিলো না কেনো? এক মিনিট, ও কি আমাকে পাগল ভাবলো? পাগলের কাছে দাম মওকুফ?”
নীলু আবারও শব্দ করে হেসে দেয়। রোশান এবার কিছুটা শান্ত হয়ে নীলুর দিকে তাকায়। তাকে এইভাবে কখনো হাসতে দেখেনি রোশান এ কয় মাসে। নীলু নিজেও মনে করতে পারে না শেষ কবে এভাবে হেসেছিলো।
আসার সময় রোশান ড্রাইভিং সিটে আর নীলু ব্যাকসিটে বসলেও ফেরার সময় নীলু কি মনে করে সামনে বসে, রোশানের পাশে। রোশান কিছুটা অবাক হলেও প্রকাশ করেনা।
“ধন্যবাদ রোশান সাহেব। আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
“কেনো বলুন তো।”
“আমার উচ্ছলতাটুকু আবার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। আমিই তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমি এভাবে হাসতে পারি। এই সুন্দর সকালটা আমাকে উপহার দেওয়ার জন্য। বিশ্বাস করুন এই ছোট্ট স্মৃতিটুকু আমি আমৃত্যু মনে রাখবো।”
রোশান ছোট্ট করে হাসে, কিছু বলেনা। বাকিটা রাস্তা নীলু আর কিছু বলেনা। রোশান মৃদু সুরের একটা নরম গান ছেড়ে দেয়। আসার সময় রাস্তাটুকু যতোটা দীর্ঘ মনে হয়েছিলো, যাওয়ার সময় ততটাই সংক্ষিপ্ত মনে হয়। দু’জনের কাছেই…..
★
খুব সকালে আরশাদকে নিয়ে পাশেই একটা নদীর পাড়ে এসেছে ইরা। এই তিন মাসে আরশাদ অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। পায়ের বিশেষ কিছু উন্নতি হয়নি, এখনো নিজের পায়ে হাঁটার কথা চিন্তাও করতে পারেনা সে। তবে এখন ক্র্যাচে ভর করে কিছুটা হাঁটতে পারে। হুইল চেয়ার ছাড়াও নিজে থেকে চেষ্টা করছে ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটতে। তবে বেশিক্ষণ পারেনা, পায়ের শক্তি হারিয়ে যায়। ইরা তৎক্ষনাৎ ধরে ফেলে তখন। ইরা বলেছিলো, আপনি আমার পায়ে হাঁটবেন। সে তার কথা রেখেছে। প্রায় সকালেই আরশাদকে নিয়ে বের হয় ইরা। প্রথম প্রথম আরশাদ চাইতো না। এখন নিজে থেকেই একটু সাহস পায়। সবচেয়ে বেশি খুশি হয় ইরাকে খুশি করতে পেরে। আরশাদ একটু বাইরে বের হলে ইরা বাচ্চাদের মতো খুশি হয়, উচ্ছ্বসিত হয়। ইরার এই খুশিটুকু দেখার জন্য যে আরশাদ নিজেকেই বিলিয়ে দিতে পারে, এটুকু আর এমন কি?
“ইরা…”
“বলুন।”
“দেখো কি সুন্দর শান্ত নদী। ছোট ছোট স্রোত গুলো তরঙ্গের মতো ভেসে যায়, কি অপূর্ব লাগে দেখতে।”
ইরা আরশাদের দিকে তাকায়। তার বাম হাতটা চেপে কাঁধে মাথা রাখে।
“আপনাকে দেখার পর আর কিছুই অপূর্ব লাগেনা আরশাদ। আপনি আমার দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি। আপনাতেই হাসি, আপনাতেই ফাঁসি। আরশাদ আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি।”
আরশাদ বেশ অবাক হয়ে ইরার দিকে তাকায়। ভ্রমরের একটা কবিতার সাথে ইরার কথাটা এতো মিলে গেলো। ভ্রমর তো বলেছিলো, ‘ওই চোখ দেখে ভ্রমর হাসে, চোখের মাঝেই ফাঁসে। ভ্রমর তার ফুলকে বড্ড বেশি ভালোবাসে।’
“ইরা, তুমি এই কথাটা কোথা থেকে শুনেছো?”
ইরা থতমত খেয়ে যায়। অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলায়।
“শিখতে হবে কেনো? আমি আপনাকে নিজে থেকে কিছু বলতে পারিনা?”
“কিন্তু ভ্রমরের একটা কবিতা….”
ইরা অভিমানী গলায় বললো,”সবসময় ভ্রমর আর ভ্রমর। তাহলে তাকেই বিয়ে করে আনুন।”
আরশাদ খোলা গলায় হাসে। অনেকদিন পর এভাবে হাসছে আরশাদ। এতো ভালো লাগে ইরার। ইশ! সবসময় যদি এভাবে হাসতোও মানুষটা। তাকে দিন দিন এতো বেশি সুদর্শন লাগছে কেনো? ইরা যে প্রেমে ডুবে যাচ্ছে বারংবার। কূল খুঁজে পাচ্ছে না এ অথৈ জলাধার থেকে বাঁচার।
“সতীনের ঘর করতে পারবে?”
“কি বললেন?”
“তুমিই তো বললে ভ্রমরকে বিয়ে করতে।”
“আপনি তাকে দেখেছেন? সে যদি থুরথুরে বুড়ি হয়? মাথায় পাকা চুল, ফোকলা দাঁত, কোঁচকানো চামড়া।”
“ঠিক তোমার মতো, তাইনা?”
ইরা কোমরে দুই হাত বেঁধে আরশাদের দিকে তাকায় সরু চোখে। আরশাদ হাসি থামিয়ে শান্ত চোখে তাকায় ইরার দিকে। কপাল, চোখ, নাক থেকে নেমে গলা, এরপর বুক…
“কি দেখছেন?”
আরশাদ ঠোঁট কামড়ে ইরার দিকে তাকিয়ে বললো,”দেখছি চামড়াটা কুঁচকিয়েছে ঠিক কোথায় কোথায়।”
“ছিহ! কি অসভ্য আপনি। লজ্জা শরম কি আসার সময় বাড়িতে রেখে এসেছেন?”
আরশাদ হাতটা ক্র্যাচে ভর দিয়ে ইরাকে নিজের কাছে সরিয়ে আনে। ইরা সচকিত হয়ে বললো,”এটা আপনার ঘর না। তাকিয়ে দেখুন বাইরে এসেছি আমরা।”
“বউ পাশে থাকলে অতো চিন্তা থাকে না মাথায়।”
ইরা নিজেকে ছাড়ায় জোর করে।
“চলুন ওদিকটায় যাই। দারুণ হাওয়া দিচ্ছে গাছের নিচে।”
“উহু এখন বাড়িতে যাবো।”
“মাত্রই তো এলাম। আজ তো একটু হাঁটাও হলো না।”
“বাকিটা পরিশ্রম বাড়ি যেয়ে করবো।”
“বাড়ি যেয়ে করবেন মানে?”
আরশাদ ইরার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,”প্রচুর ক্যাফেইন লাগবে নূরবউ, প্রচুর….”
ইরা ঈষৎ লাল হয়ে যায় আরশাদের কথা শুনে। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজের উপচে পড়া আনন্দটুকু দমিয়ে রাখে। এমন একটা সকালের জন্য বিগত কতোগুলো দিন অপেক্ষা করেছে সে। তৃষ্ণায় মরিয়া হয়েছে তবুও শান্ত থেকেছে। মরুভূমির বুকে ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটতে থাকা তৃষ্ণার্ত একজন মানুষ হঠাৎ শীতল জলাশয় দেখলে যেমন খুশি হয় আবার মরীচিকা ভেবে ভয় পায়, ইরার তেমন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। প্রেম কিংবা ভয়, একসাথে।
“যাবে না?”
“এতো পাগল হয়েছেন কেনো? এসেছি যখন একটু ঘোরাঘুরি করে তারপর যাই?”
ইরা অন্যদিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসে।
“আগের মতো অবস্থা থাকলে কোলে তুলে নিয়ে যেতাম। তবে মনে হচ্ছে আর কিছুদিন পর তা-ও পারবো।”
“সে যখন পারবেন তখন দেখা যাবে। আমি এখন আরেকটু ঘোরাঘুরি করবো। এতো সুন্দর আবহাওয়া রেখে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছে না।”
“যতো দেরি করবে, কষ্টটা তোমারই বেশি হবে। ভেবে দেখো কি করবে।”
“আমার কষ্ট হবে মানে?”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নদীর দিকে তাকায়। তার চোখে কিছু খেলা করছে। ইরা বুঝতে পারে এই বাজে লোকটা এখন এমন কিছু তাকে বলবে যা শুনলে তার শরীর শিউরে উঠবে, কেঁপে উঠবে অচেনা ধাক্কায়।
“আরেকটু পর গেলে ক্যাফেইনে কাজ হবে না, অন্য কিছু লাগবে।”
“অন্য কিছুটা কি?”
আরশাদ ইরার দিকে তাকায়, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি।
“আফিমের নেশা…..”
★
ইরা কলেজের ক্লাস তেমন করেনা, বান্ধবীদের থেকে প্রয়োজনীয় খাতাপত্র, সাজেশন নিয়ে বাড়িতেই পড়াশোনা করে। আর সময়মতো পরীক্ষা দিয়ে আসে।
আরশাদের এই অবস্থার মধ্যেই তার প্রথম পরীক্ষা ছিলো কিছুদিন আগেই। আজকে তার ফলাফল প্রকাশ হবে। ইরা দুশ্চিন্তায় পায়চারি করছিলো। এমনিও পরীক্ষা আহামরি ভালো হয়নি। এতোসবের মধ্যে সে যে মাথা ঠান্ডা রেখে পরীক্ষা দিতে পেরেছে এটাই অনেক। যদিও আরশাদ তাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। জোর করে পড়তে বসিয়েছে। তবুও ইরার মন বসতো না পড়াশোনায়।
কিন্তু ফলাফলের দিন এসে মনে হচ্ছে আরেকটু ভালো করে পড়লে বোধহয় ভালো হতো। বাড়ির সবাই অনেক আশাবাদী তাকে নিয়ে, বিশেষ করে আরশাদ। আরশাদের একটাই কথা, তাকে পড়াশোনা করে চাকরি করতে হবে না, নিজের শক্তির জন্য হলেও পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হবে তাকে।
ইরার দুশ্চিন্তা দেখে আরশাদই তাকে জোর করে কলেজে পাঠালো দেখে আসার জন্য। সাথে আশা গিয়েছে আজ। আরশাদ যেতে চেয়েছিলো কিন্তু এরমধ্যে হঠাৎ একটা সুখবর এসেছে।
তার সাবেক বস তাকে ফোন করেছিলো। আরশাদকে সে ভীষণ স্নেহ করে। সে-ই জানালো খুব ভালো একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। আরশাদ যেহেতু তুখোড় প্রোগ্রাম ডেভেলপার, তাই এটা ওর যোগ্য। এটা করার জন্য আরশাদকে বাইরে যেতে হবে না। বাড়িতে বসেই করতে পারবে। কোম্পানিটা সুদূর নেদারল্যান্ডসের। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ রাতেই ইন্টারভিউ হবে। তাতে টিকে গেলে এই দারুণ সুযোগটা আরশাদ নিতে পারবে।
ক্র্যাচে ভর দিয়েই আরশাদ আলমারি খোলে। কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বের করা লাগবে। বেশ কিছু দিন যাবৎ আলমারির দখলদারিত্ব ইরার। আরশাদ জানেও না কোথায় কি গুছিয়ে রেখেছে ইরা। ইরা ফেরা পর্যন্ত দেরিও করতে পারছে না কারণ তারা এখনই কিছু কাগজপত্র দেখতে চায়, মেইল করতে হবে।
আরশাদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে কাগজপত্র এলোমেলো করতে থাকে। ফাইলটা খুঁজে পেলেই হবে।
বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পর পেয়েও যায়। ওটা নিয়েই আলমারি বন্ধ করে দিচ্ছিলো। হঠাৎ একটা খাতা দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায় সে। খাতাটা বেশ লম্বা, জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। উপর থেকে কাটাকাটি করা, আবার গোটা গোটা অক্ষরে কিছু লেখা।
কৌতুহল বশত খাতাটা হাতে তুলে নেয় সে। একেরপর এক পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে। তার বিস্ফারিত দৃষ্টি বিচরণ করতে থাকে খাতা জুড়ে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না সে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ে।
এসব কি? এসবের মানে কি? এ হাতের লেখা তো ইরার। কিন্তু এই কবিতাগুলো? এটা কীভাবে সম্ভব….?
(চলবে…..)

