Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩৭

মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩৭

0
255

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৩৭

মিনিট দুয়েক ইরা ওভাবে মুখ ঢেকে বসে থাকে। এভাবেই তার জীবনটা শেষ হয়ে যাবে? এভাবেই মৃত্যু লেখা ছিলো তার?

কুকুরের ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা যাচ্ছে খুব কাছ থেকে। ইরা শেষবারের মতো নিজেকে বাঁচাতে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। ঠিক সাথে সাথে দুইবার বিকট শব্দ হয়। পরক্ষণেই কুকুরগুলোর চিৎকার। তারা ইরার গা ঘেঁষে ছুটে যায়। ইরা শ্বাস আটকে বসে থাকে। এই মুহুর্তে চোখ তুলে তাকানোর সাহস নেই তার। কিসের আওয়াজ হলো? কি হচ্ছে তার চারপাশে?

“ইরা তুমি ঠিক আছো?”
সহসাই ইরা চোখ তুলে তাকায়। প্রথমেই নিজের চারপাশে। কুকুরগুলো নেই, শুধু পড়ে আছে আরশাদের ক্র‍্যাচ দু’টো। ক্র‍্যাচ এখানে থাকলে আরশাদ কোথায়?
ঝট করে সামনের দিকে তাকাতেই স্তম্ভিত হয়ে যায় ইরা। ঠোঁট দু’টো কেঁপে ওঠে ঝড়ের মুখে পড়া গুল্মলতার মতো। সে নিশ্চিত সে স্বপ্ন দেখছে। জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর কিংবা সবচেয়ে মধুর কোনো স্বপ্ন। এর আগে কখনো এমন স্বপ্ন দেখেনি সে।

“ইরা কথা বলছো না কেনো? সব ঠিক আছে?”
ইরার ঘোর কাটে না। মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আরশাদ, ক্র‍্যাচ ছাড়াই। এটা কীভাবে সম্ভব? তার মানে ওই বিকট শব্দ দু’টো ক্র‍্যাচের ছিলো? আরশাদ ছুড়ে দিয়েছিলো কুকুরগুলোর দিকে? কিন্তু তাহলে এখন সে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে? তার পা দু’টোয় যে বিন্দুমাত্র কোনো শক্তি ছিলো না।

“আরশাদ….”
আরশাদ ভীত চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে। তার মাথাতেই নেই সে ক্র‍্যাচ ছাড়াই দাঁড়িয়ে। তার মাথায় একটাই চিন্তা, সে আসার আগেই ইরার কোনো বিপদ হয়নি তো?

“আপনি….”
“আমি কি?”
“আপনি আপনি….”
“আরে বলবে তো? কি আমি?”
“আপনার ক্র‍্যাচ কোথায়?”
“কুকুরগুলোর দিকে ছুড়ে দিয়েছিলাম। ওই মুহুর্তে আর কিছু মাথায় আসছিলো না।”
“তাহলে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কীভাবে?”
এতোক্ষণে ধাতস্থ হয় আরশাদ। বৈদ্যুতিক শক লাগে যেনো শরীরে। ঝটকা দিয়ে ওঠে শরীর। নিজের পায়ের দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে। দ্রুতগামী কিছু শ্বাস ছোটে, অচিরেই শ্বাসের গতি বাড়তে থাকে। মনে হচ্ছে সে পড়ে যাবে। আর শক্তি পাচ্ছে না। অথচ এতোক্ষণ সে দিব্বি নিজের পায়েই দাঁড়িয়ে ছিলো?

বুকে ধাক্কা লাগতেই সম্বিৎ ফিরে পায় আরশাদ। ইরা ছুটে এসে ঝাপিয়ে পড়েছে তার বুকে। হাউমাউ করে কাঁদছে মেয়েটা। কান্নার মধ্যে কি যেনো বলছে একনাগাড়ে, আরশাদ বুঝতে পারেনা কথাগুলো। শুধু ইরার চোখের পানিতে তার বুকের কাছে শার্ট ভিজে যাচ্ছে টের পায়।

“ইরা, কাঁদছো কেনো? শান্ত হও।”
ইরা আবারও কান্নার মধ্যেই অস্ফুটে কিসব বলে। আরশাদ বুঝতে পারেনা। তার নিজেরও শরীর কাঁপছে। এখনো কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে সে? এ শক্তি কীভাবে এলো তার শরীরে?

“আমার ক্র‍্যাচ দু’টো এনে দিবে ইরা? আমি মনে হচ্ছে আর দাঁড়াতে পারবো না, পড়ে যাবো। আমার শরীর কাঁপছে।”
ইরা মাথা তোলে, দুই হাতে আঁজলা করে আরশাদের মুখ চেপে ধরে। আরশাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ইরার অন্তর ভেদ করে যায়।

“না আপনি পড়বেন না। আপনি আবার নিজের পায়ে হাঁটবেন। আমি বলেছিলাম না? বিশ্বাসের কাছে পৃথিবীর সব চিকিৎসাশাস্ত্র ভুল হতে পারে।”
“এগুলো আবেগের কথা ইরা। সত্যিই আমি আর পারছি না। দয়া করে এনে দাও। আমি সত্যি এবার পড়ে যাবো।”
ইরা আরশাদের হাত নিয়ে নিজের কাঁধের উপর রাখে। আরশাদের কোমর জড়িয়ে নেয় হাত দিয়ে।

“আমি আছি না? আমি আপনাকে পড়তে দিবো না। আপনার নূরবউকে বাঁচিয়েছেন আজ। তার বিনিময়ে আমি জনম জনম ধরে আপনার অবলম্বন হয়ে বাঁচবো।”
আরশাদ কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। এই মুহুর্তে তার শরীরের অসম্ভব কাঁপুনি কিছুটা কমেছে। পায়ে শক্তি না পেলেও মনে হচ্ছে পড়ে যাবে না, তার নূরবউ তাকে পড়তে দিবে না।
ইরা’কে দমিয়ে রাখলেও নিজেই হতভম্ব হয়ে যাচ্ছে বার বার। তার রিপোর্টে ভালো কোনো দিক ছিলো না যাতে ডাক্তাররা আশার আলো দেখাতে পারে। সে নিজের নিয়তি মেনেই নিয়েছিলো। শুধু ইরার বিশ্বাস ছিলো আরশাদ আবার হাঁটবে, ক্র‍্যাচে ভর দিয়ে না নিজের পায়েই হাঁটবে। আরশাদ সেসব কথা হেসেই উড়িয়ে দিতো। কিন্তু আজ এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে ইরা বোধহয় পুরোটা ভুল না। ‘বিশ্বাসের কাছে পৃথিবীর সব চিকিৎসাশাস্ত্র ভুল হতে পারে’ সারাজীবন বিজ্ঞানে বিশ্বাস করা, বিজ্ঞানে আপোষ করা আরশাদ ইরার এই কথাটাকে বিশ্বাস করতে চায়। সত্যিই কি তবে মানব মনের বিশ্বাস এতো শক্তিশালী হতে পারে?

গাঢ় নীল পাড়ের হলুদ কাতানটায় ইরাকে একটা পরিস্ফুটিত সূর্যমুখীর মতো লাগছে। নীল আঁচলটা হলো এক খন্ড আকাশ। আগের চেয়ে ওজনটা বেশ বেড়েছে। এতে সৌন্দর্য বেড়েছে আরো কয়েকগুণ। আরশাদের ভালোই লাগে। তবুও মাঝে মাঝে ইরাকে রাগিয়ে দেয় ওজন নিয়ে খোঁটা দিয়ে। কোনো এক অজানা কারণে মেয়েটা রাগে না, বরং হাসে। কেমন লজ্জা লজ্জা মুখে হাসে। রাবেয়া বেগমের কানে এনে উলটো আরশাদকে রাগ করে। ওজন বেড়েছে তাতে আরশাদের কি? এ জাতীয় বকাঝকা। আরশাদ তার মায়ের রাগের কারণের কোনো দিশা পায়না।

আজ নীলুর গায়ে হলুদ। ইরা ঠিক করেছে আজ সে খুব করে সাজবে। নিজের গায়ে হলুদের কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। অপূর্ণতা তো আছেই। যদিও আরশাদ তার হাজারটা অপূর্ণতার মাঝে এক অনন্য পূর্ণতা। খোদা তার ডাক শুনেছে। আরশাদ এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। যদিও নিজে থেকে অল্প হেঁটেই পায়ের শক্তি হারায়। কিন্তু ডাক্তার বলেছে এটাও আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠতে পারবে। ডাক্তার নিজেও হতবাক। মিরাকল বলে সত্যিই দুনিয়ায় কিছু আছে এটা তাদের মানতেই হয় মাঝে মাঝে। ডাক্তার হলেও তারা তো মানুষ!

আরশাদ খাটের উপর বসে আছে শান্ত হয়ে। ইরা আজ ইচ্ছামতো সাজছে। এতো সাজতে ইরা’কে কখনো দেখেনি আরশাদ। হাতভর্তি করে গাছের মেহেদী পাতা বেটে দিয়েছে। লাল টকটক করছে হাত দু’টো। মেয়েটা দিন দিন এতো রূপবতী হয়ে যাচ্ছে কেনো?
নতুন চাকরিতে ঢুকেছে আরশাদ। এতোদিন মেয়েটা সবসময় তার সামনে থাকতো। মনে হতো একটা পুতুল ঘুরছে তার চারপাশ থেকে। এখন দিনের অনেকটা সময় অফিসে কাটাতে হবে ভেবেই আরশাদের হাঁসফাঁস লাগছে।

“ইরা…”
ইরা আয়নার দিকে তাকিয়ে কাজল দিতে দিতেই বললো,”বলুন।”
“তোমরা মেয়েরা এতো সাজো কেনো? বিগত দেড় ঘন্টা বসে তোমার সাজই দেখছি।”
ইরা শান্ত চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”কারণ সাজগোজ মেয়েদের জন্যই, পুরুষদের জন্য না। আপনারা যদি এমন কাজল চোখে দিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক দেন তাহলে আপনাদের খুবই বিশ্রী লাগবে। এজন্য আপনাদের ভাগের সাজটাও আমরা সাজি। তাই দেরি হয়। বোঝা গেছে?”
ইরা আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আরশাদ প্রমাদ গোণে। আগে মেয়েটা চুপচাপ থাকতো, বেশি কথা বলতো না। এখন যেনো কথার খই ফোটে। একটা কথা মাটিতে পড়তে দেয়না।

“তা এতো সেজে কি হলো? সেই তো আমার বউ ইরা-ই আছো। ঐশ্বরিয়া তো হয়ে যাওনি। কিংবা মাধুরী দীক্ষিত।”
ইরা সরু চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”তা আপনি কোন দেশের সালমান খান? এতো কথা না বলে চুপ করে বসে থাকেন।”
আরশাদ থতমত খেয়ে যায়। ইরা যে এমন ধরণের উত্তর দিবে সে ভাবতেই পারেনি। চোখ বড় বড় করে ইরার দিকে তাকায়। ইরা পাত্তা দেয়না বিশেষ।
সাজগোজ শেষ করে নিজেই হাসে আয়নার দিকে তাকিয়ে। কি সুন্দর লাগছে তাকে। ইশ! আবার নিজের নজরই লেগে না যায় নিজের উপর। খাটে আধশোয়া হয়ে বসে ইরার দিকেই অপলক তাকিয়ে আছে আরশাদ। ইরা মুখ বাঁকায় সেদিকে তাকিয়ে।

বিপত্তি বাঁধে গাঁদাফুলের মালাটা খোঁপায় পরার সময়। কোনোভাবেই বাঁধতে পারেনা। হয় খোঁপা থেকে খুলে যায় আর নাহয় মাথার উপর পর্বতসম হয়ে থাকে। ইরার কান্না পায়। দরজার বাইরে রাবেয়া বারবার তাগাদা দিচ্ছে। সবাই তৈরি ওদিকে।

আরশাদের দিকে নরম চোখে তাকাতেই আরশাদ মুচকি হেসে দেয়। ইরা মুখ অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে থাকে আয়নার সামনে।

আরশাদ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। ইরার হাত থেকে মালাটা নিয়ে সযত্নে তার খোঁপায় পেঁচিয়ে দেয়। ইরা শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আয়নায় আরশাদের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই বুকটা ধকধক করে ওঠে।
এই অতি সুদর্শন মানুষটা তার, একান্তই তার। এতোটুকু ভাগ নেই তাতে অন্য কারো।

“নাও হয়ে গেছে।”
ইরা মৃদু হাসে আয়নার দিকে।

“আপনার বুঝি খুব পছন্দ ঐশ্বরিয়া আর মাধুরী দীক্ষিতকে?”
আরশাদ হাসি চেপে গম্ভীর গলায় বললো,”সে তো তোমারও সালমান খানকে পছন্দ।”
“আমি মোটেই তেমন কিছু বলিনি।”
আরশাদ ইরার পেট জড়িয়ে ধরে দুই হাতে। ইরা ঠোঁট কামড়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে।

“আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়?”
“কি কাজ?”
“আমরা আজ অনুষ্ঠানে গেলাম না। সবাই চলে যাক। আমি আর তুমি বাড়িতে থাকি।”
ইরা অবাক হয়ে আরশাদের দিকে ঘুরে তাকায়।
“কিন্তু কেনো?”
“এইযে আপনার লাস্যময়ী রূপ দেখে মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। খুব প্রেম প্রেম পাচ্ছে।”
ইরা আরশাদকে হালকা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।

“ধুর! বাজে লোক একটা।”
আরশাদ বাম গালের দাড়ি চুলকায় বিরস মুখে। এজন্য বন্ধুরা বলে বউকে বেশি আহ্লাদ দিতে নেই। এভাবেই মাথায় তুলে নৃত্য করে। কিন্তু বউ তো একটাই, আহ্লাদ না দিয়ে উপায়টাই বা কি?

“কি আর করা? আপাতত দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাই। যাও চট করে আমার জন্য এক মগ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি বানিয়ে আনো। ব্ল্যাক কফি বুঝো তো? কালা কালা কফি। সাদা জিনিসের অভাব মেটাতে কালা কফি। প্রচুর ক্যাফেইন দরকার, প্রচুর।”
ইরা রাগী চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”এখন থেকে ক্যাফেইন বর্জন করার অভ্যাস করুন। কালা বা সাদা কোনোটাই না। কালা মানে কফি আর সাদা মানে…”
“তুমি?”
“না আমি না। সাদা মানে সিগারেট। এই দুইটাই বাদ। বাদ মানে বাদ।”
আরশাদ হাই তুলে বললো,”কালা বা সাদা কোনোটাই বর্জন করতে পারবো না। আর কিছু বলার হলে বলো।”
ইরা আচমকাই আরশাদের অনেকটা কাছে এগিয়ে আসে। আরশাদ জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় তার দিকে।

আরশাদের চোখে চোখ রেখে ইরা ফিসফিস করে বললো,”পারবেন। খুব ভালো করেই পারবেন। কারণ আপনার ক্যাফেইন আপনাকে যে শান্তি দেয়, তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি শান্তি পেতে চলেছেন আপনি। বৃহৎ শান্তির জন্য ক্ষুদ্র শান্তি তো বর্জন করাই যায়, তাইনা?”
“তার মানে?”
“মানে কিছু না। কিছুই না।”
ইরা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ভ্রু কুঁচকে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে আরশাদ। মেয়েটা তো এমন ছিলো না, এমন ঢংঢাং শিখলো কোথা থেকে? হতে পারে এটা মেয়েদের স্বভাবসিদ্ধ আচরণ। এতোদিন প্রকাশ করার সুযোগ পায়নি, এখন পেয়েছে।
আরশাদ মৃদু হেসে নিজেও বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

অপ্সরার মতো লাগছে নীলুকে। মায়েরই একটা হলুদ বালুচরি শাড়ি পরেছে সে। নিজাম হোসেন বারবার নিষেধ করেছে। একমাত্র মেয়ের বিয়েতে কোনো কার্পণ্য করেনি সে, ধুমধাম করেই হচ্ছে। তাহলে হলুদের অনুষ্ঠানে কেনো মেয়ে মায়ের পুরোনো শাড়ি পরবে?
কিন্তু নীলুর এক কথা, এই শাড়িই পরবে সে। মা বেঁচে থাকলে আজকের দিনে কতো আনন্দ করতো। মা তো নেই, কিন্তু মায়ের শাড়িটা পরলে নীলুর মনে হবে মা তার কাছেই আছে। মায়ের প্রতিটা শাড়িতেই যেনো মায়ের শরীরের গন্ধ পায় সে।

তাজা ফুলের গহনায় তার রূপ ঠিকরে বের হচ্ছে। সন্ধ্যাবেলার অনুষ্ঠান, চারদিকে আলোর ঝলকানি। সেই কৃত্রিম বাতির রোশনাইতে নীলু যেনো বাড়তি আলো যোগ করছে।
নিজাম হোসেন দূর থেকে একবার মেয়েকে দেখে আর দেখতে পারেনি। বুকের নিচটায় কেমন যেনো চিলিক দেওয়া ভোঁতা যন্ত্রণা করে। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে নিজে থেকেই। মায়ের শাড়ি পরা মেয়েটার অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত হয়েছে। আসলেই তাকে অসম্ভব রূপবতী লাগছে এই শাড়িতে।
নিজাম হোসেন চোখ মুছে অন্যদিকে চলে যায়। সন্তানের উপর বাবা মায়ের নজর পড়ে বেশি।

আরশাদের পরনে গাঢ় নীল পাঞ্জাবি। সে শক্ত করে ইরার হাত চেপে ধরে রেখেছে। ইরা বারবার বাঁকা চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। আরশাদের দৃষ্টিতে কি বিন্দুমাত্র প্রেম দেখা যায় নীলুর দিকে তাকিয়ে? পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই শিউরে ওঠে সে। নিজেকে খুব নীচ আর ছোট মনে হয়। এসব চিন্তা কীভাবে করতে পারে সে? ভাগ্যিস নিজের মনের কথা আর কেউ শুনতে পায়না। তাহলে কি লজ্জাটাই না পেতো আরশাদের সামনে।

“ইরা দেখো ওদিকের ফুলগুলো কি সুন্দর লাগছে।”
“হু।”
“ইচ্ছা করছে ওগুলো এনে তোমার খোঁপায় গুঁজে দিই।”
ইরা ম্লান হাসে, কিছু বলেনা।

“ইরা, কোনো সমস্যা? কি হয়েছে তোমার?”
“কই কিছু না।”
“আচ্ছা না বললে বুঝবো কীভাবে? আসার আগে কতো উচ্ছ্বসিত ছিলে। আসার পর থেকে দেখছি কেমন চুপ করে আছো। কি হয়েছে তোমার?”
“ওই একটু মাথাটা ঘুরছে।”
আরশাদ ভীত গলায় বললো,”আগে কেনো বলোনি? তোমার ভালো না লাগলে চলে যাই আমরা?”
“না না ভালো লাগছে।”
“এইযে বললে মাথা ঘুরছে।”
“সে তো এখন প্রায়ই ঘোরে।”
আরশাদ হতবাক হয়ে যায় ইরার কথা শুনে।

“প্রায়ই ঘোরে মানে? এ কথা আগে বলোনি কেনো আমাকে? ডাক্তার দেখাতে হবে না?”
“ধুর এতো ব্যস্ত হবেন না তো।”
“ইরা…”
ইরা অন্য দিকে তাকায়। আরশাদকে তার জন্য দুশ্চিন্তা করতে দেখলে ভালো লাগে। একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়।

কিছুক্ষণ পর ইরা নিজেই আবার আরশাদের একটু কাছে সরে আসে। আরশাদ রেগে আছে, স্পষ্ট বুঝতে পারছে ইরা। আরশাদ রেগে থাকলে ক্রমাগত পা নাড়ে।

“এইযে শুনুন।”
“শুনছি।”
“একটা কথার উত্তর দিবেন? সত্যি সত্যি।”
“কোন উত্তর মিথ্যা মিথ্যা দিয়েছি তোমাকে?”
ইরা মাথা নিচু করে ক্ষীণ গলায় বললো,”শুনেছিলাম নীলু আপার কোনো একটা ভুলের জন্য তার সাথে আপনার সম্পর্কটা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জানিনা সেই ভুলটা কি। কি করেছিলো নীলু আপা?”
ইরা কথাটা বলেই দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে। এই বুঝি আরশাদ রেগে যায়। না বললেই ভালো হতো! ভুল হয়ে গেলো।

কিন্তু না, আরশাদ রেগে যায়না। যথেষ্ট শান্ত ভাবে বসে থাকে। বরং ক্রমাগত পা নাড়ানোও থামিয়ে দেয়।

“ইরা।”
“বলো।”
“তার ভুলটা আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু হয়তো তুমি ক্ষমা করতে পারবে না। আজীবন সে তোমার কাছে অপরাধী হয়ে থাকবে। তুমি নিজেও অযথাই ভুল বুঝবে, কষ্ট পাবে। দুইটা মানুষকে কষ্ট দিতে চাচ্ছিনা। সে ভুলের কথা ভুলে যাওয়াই ভালো। আজ ওর জীবনের একটা নতুন অধ্যারের সূচনা হচ্ছে। অবিবাহিত জীবনের এখানেই ইতি। সে যেনো সুখে থাকে এটাই আমাদের কাম্য হওয়া উচিত তাইনা? ঠিক যেমন আমরা আছি।”
ইরা অল্প হেসে মাথা নাড়ে। আরশাদের বাহু জড়িয়ে তার কাঁধে মাথা রেখে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে। জীবন সুন্দর, ভালোবাসা আরো সুন্দর। যদি মানুষটা সঠিক হয়।

আচমকাই গেটের দিকে চিৎকার চেচামেচি শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। বেশিরভাগই ছুটে যায় সেদিকে। ভিড়ভাট্টার মাঝে আসল খবর পাওয়াই দায়। ইরাও দৌড়ে এসেছে সবার সাথে। সবাই কেনো হৈচৈ করছে বোঝাই যাচ্ছে না।

মিনিট পাঁচেক পর ওরা জানতে পারলো বিশালদেহী এক মহিলা ধরা পড়েছে গেটের কাছে। মহিলার পুরো শরীর কালো বোরকায় ঢাকা। এমনকি চোখ কিংবা হাত পা-ও দেখা যাচ্ছে না। এই মহিলাকে কেউ দাওয়াত দেয়নি। এমনকি তাকে কেউ চিনেও না। ধরা পড়ার পর থেকে একটা কথাও বলছে না। সবাই ভাবছে চোর-বাটপার বোধহয়।

ইরা আরশাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,”মহিলা কতো লম্বা আর স্বাস্থ্যবান দেখেছেন? আমি এমন ধরণের মহিলা জীবনেও দেখিনি।”
আরশাদ কি মনে করে হাসে ঠোঁট কামড়ে।
“হাসছেন কেনো?”
“এমন ধরণের মহিলা জীবনেও দেখোনি কিন্তু এমন ধরণের পুরুষ নিশ্চয়ই দেখেছো?”
“কি বলছেন কি? পুরুষ কেনো বোরকা পরবে?”
“যখন সে সবার আড়ালে থেকে উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়।”
“মানে কি?”

আরশাদ ইরার কথার উত্তর না দিয়ে বোরকাওয়ালীর দিকে এগিয়ে যায়। বোরকাওয়ালী(!) আরো শক্ত করে বোরকা চেপে রাখে।

ওদিকে নীলু নিজের জায়গায় বসে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে অবাক দৃষ্টিতে। ওদিকে কি হচ্ছে বুঝতেই পারছে না। রাবেয়া তার হাত ধরে বসে আছে, যেতেও দিচ্ছে না।

আরশাদ বোরকাওয়ালীর কানের কাছে এসে চাপা গলায় বললো,”দুলাভাই নিজের বউকে দেখতে আসার জন্য বোরকা পরতে হয়? সিংহের মতো বুক চিতিয়ে আসবেন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে পাশের বাড়ির বউকে দেখতে আসছেন লুকিয়ে।”
রোশান জ্বলজ্বল চোখে তাকায় আরশাদের দিকে। বোরকার মধ্য থেকেই তার দৃষ্টি দেখে আরশাদ হেসে দেয়।

“পরিচয়টা আপনি নিজে দিবেন নাকি আমি সাহায্য করবো?”
রোশান দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। কি কুক্ষণেই না এই বাজে বুদ্ধিটা মাথায় এসেছিলো তার…..

(চলবে…..)