Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩৮ এবং শেষ পর্ব

মন কেমনের মরশুম পর্ব-৩৮ এবং শেষ পর্ব

0
423

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৩৮ (অন্তিম পর্ব)

ফুলে সুশোভিত খাটের মাঝে গুটিশুটি মেরে বসে আছে নীলু। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। একটু ভয়, একটু দুশ্চিন্তা আর অনেকটা ভালো লাগা। বসন্তের নবসূচনা কেবলই। শীতকাল বিদায় জানালেও প্রকৃতিতে রেশ থেকে গেছে। এখনো রাতের বেলা বেশ ঠান্ডা থাকে পরিবেশ। নীলু মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে অথচ কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম৷ নিজের নিয়ন্ত্রণেই নেই সে।

রোশান এখনো আসেনি। কে জানে কি করছে। নীলু একবার ভাবে উঠে যেয়ে দেখবে কোথায় সে। কি এমন হবে? পুরো ফ্লাট ফাঁকা। রোশানের অল্প কিছু আত্মীয়স্বজন এসেছিলো তারা চলে গেছে সন্ধ্যার পরেই। নীলু ঠিক করেছে কিছুদিন বাবাকে এখানে এনে রাখবে আবার কিছুদিন ওরা যেয়ে বাবার কাছে থাকবে। বাবার তো কাছের মানুষ বলতে এই একটাই মেয়ে আর রোশানের তো কেউই তেমন নেই।

এসব ভাবতে ভাবতে নীলু উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবে এমন সময় কাঠের দরজা খোলার শব্দে সচকিত হয় সে। আবারও গুটিয়ে যায় নিজের মধ্যে। হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে ধকধক করে ওঠে সহসাই।

ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরনে রোশান। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। রোশান ঘরে ঢুকতেই বেশ মিষ্টি একটা সুবাস নীলুর নাকে ধাক্কা খায়। আতরের বোধহয়, রোশান আতর মেখেছে। ফুলের গন্ধের সাথে মিশে যায় সেই সুবাস। নীলুর মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে।

“নীলু।”
“হুম।”
“এখনো এই ভারী শাড়ি পরে আছো? কষ্ট হচ্ছে না?”
নীলু না-সূচক মাথা নাড়ে। বুকটা কাঁপছে ভীষণ ভাবে। মনে হচ্ছে রোশান আরেকটু এগিয়ে এলেই নীলুর কম্পমান বুকের শব্দ শুনতে পাবে।

“আলমারিতে তোমার কাপড়চোপড় আছে। পছন্দ মতো একটা পরে নাও। এভাবে ঘুমানো যায় নাকি?”
নীলু পূর্ণ দৃষ্টি মেলে রোশানের দিকে তাকায়। লোকটাকে এতো সুদর্শন লাগছে কেনো আজ? নীলু দুইবার ঢোক চাপে। নিজের সর্বনাশ দেখতে পাচ্ছে সে মানুষটার চোখে।

রোশান মুচকি হেসে এগিয়ে আসে। নীলুর মাথা থেকে ওড়নাটা খুলে ফেলে আস্তে করে। খোঁপায় গুঁজে থাকা গোলাপগুলো একেক করে খুলে টেবিলে রাখে। নীলু শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে।

“একটু দাঁড়াও।”
রোশান আলমারি খুলে টকটকে লাল একটা শাড়ি বের করে নীলুর হাতে দেয়।

“লাল আমার খুব প্রিয়। মেয়েদের কাপড়চোপড় আমি তেমন বুঝিনা। তবে তোমার জন্য বেশ কয়েকটা শাড়ি কিনেছি, সবই লাল।”
নীলু গাঢ় গলায় বললো,”ধন্যবাদ।”
“এবার যাও, এটা পরে এসো।”
নীলু আস্তে করে মাথা নেড়ে বাথরুমে চলে যায়।

ঘরে ফিরতেই নীলুর আরেকটা ধাক্কা লাগে। ঘরের লাইট বন্ধ, তার বদলে জ্বলছে গাঢ় নীল আলো। সেই আলোয় চারপাশটা অপার্থিব সুন্দর লাগে। লাল ফুলগুলো কালচে লাগে।
রোশান পাশেই একটা সোফায় বসে ম্যাগাজিন উল্টেপাল্টে দেখছিলো, নীলুকে বের হতে দেখেই উঠে দাঁড়ায়।

নীলুর কপালের উপরে আসা অবাধ্য কিছু চুল খুব যত্নে কানের পিছে গুঁজে দেয় রোশান। নীলু আঁচল চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। ভয়টা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসছে। এমন অস্থির কেনো লাগছে তার?

“নীলু তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো?”
“কেনো?”
“এইযে গতকাল কাউকে কিছু না বলে, লুকিয়ে, বোরকা পরে তোমাকে দেখতে গেলাম। আবার ধরাও খেলাম। আমার জন্য নিশ্চয়ই লজ্জা পেয়েছো তুমি। নিশ্চয়ই শুনতে হয়েছে এই বয়সে লোকটা এসব কি করছে, ভীমরতি হলো কিনা!”
নীলু কিছুক্ষণ রোশানের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দেয়।

“হাসছো কেনো? তোমার নিজেরও তো এসব ছেলেমানুষী পছন্দ না।”
নীলু আচমকাই দুই পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়। রোশানের চোখে চোখে রেখে ফিসফিস করে বলে,”মাঝে মাঝে ছেলেমানুষীর দরকার আছে রোশান সাহেব। নাহলে বেঁচে থাকার আনন্দ ফিকে হয়ে যাবে তো।”
রোশানের হাত নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে নীলুর কোমরের কাছে চলে যায়। দুই হাতে জাপটে ধরে সে নীলুকে। নীলুর শরীর কিছুটা ঝাঁকি দিয়ে শান্ত হয়ে যায়।

“তার মানে তুমি খুশি হয়েছো?”
“আগে বলুন এই ছেলেমানুষী কেনো করতে গেলেন? একদিন পরেই তো পুরোপুরি ভাবে আমাকে পেয়ে গেলেন। একটু অপেক্ষা করতে পারলেন না?”
“কি করবো? তোমাকে হলুদের সাজে কেমন লাগছে সামনাসামনি দেখার জন্য অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। কোনোভাবেই নিজেকে আটকাতে পারলাম না।”
“তাই বলে বোরকা পরে? এমনিতেই যেতেন।”
“এটুকু অ্যাডভেঞ্চার জীবনে না থাকলে বুড়োকালে নাতি-নাতনীদের কি গল্প দিবো?”
নীলু শব্দ করে হাসে। রোশান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কিছু একটা বলতে যেয়েও থেমে যায়। নৈসর্গিক দৃশ্যে তার ঘরটা ঝলমল করছে। এমন সময় কথা না বলাই ভালো।

“রোশান…”
“বলো নীলু।”
“আমার খুব ইচ্ছে ছিলো বিয়ের রাতে আমরা দু’জন চাঁদ দেখবো। আচ্ছা আজ কি চাঁদ উঠেছে?”
“আকাশে তো ওঠেনি, অমাবস্যা তিথি চলছে।”
নীলুর মুখটা অন্ধকার হয়ে যায় সাথে সাথে।
রোশান নীলুর বাম হাতটা ধরে তাকে কাছে এনে হাতের পৃষ্ঠে ঠোঁট ছোঁয়ায়। নীলু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

“আকাশে ওঠেনি তাতে কি? রোশান নামক ক্ষুদ্র একজন মানুষের ছোট্ট নীড়ে চাঁদ উঠেছে। সে চাঁদের নাম নীলাঞ্জনা নীলু। আমি আজ মন ভরে সেই চাঁদের জ্যোৎস্না বিলাশ করবো।”
নীলু বাঁকা ঠোঁটে হেসে বললো,”ডাক্তার না হয়ে কবি হলেই ভালো হতো বোধহয়।”
“কেনো? চিকিৎসাশাস্ত্রের সাথে সাহিত্য বুঝি সাংঘর্ষিক?”
নীলু মাথা নিচু করে মিটমিট করে হাসতে থাকে। অনেকক্ষণ যাবৎ কেউ কোনো কথা বলেনা। ঘরে পিনপতন নীরবতা। শুধু ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের হালকা শোঁ শোঁ শব্দ।

আচমকাই নীলু কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে শুন্যে আবিষ্কার করে। ভয় চোখ বন্ধ করে ফেলে সাথে সাথে। রোশানের বাহুডোরে অনড় পড়ে থাকে।

“কি করছেন? নামান বলছি।”
“কেনো? ভয় পাচ্ছো নাকি?”
“পড়ে যাই যদি?”
“খাঁদের কিনারা থেকে উড়ন্ত বাজপাখির মতো ছোঁ নিয়ে চলে আসবো তাহলে।”
নীলু রোশানের বুকে মাথা লুকায়। লজ্জায় নুইয়ে পড়ছে সে। রোশান শক্ত করে জাপটে ধরেছে তাকে আষ্টেপৃষ্টে।

“আমার ভয় করছে….”
“ভয় পেলে তো হবে না। আমাকে চাঁদ দেখানো উপহারস্বরূপ আপনাকে স্বর্গ দেখিয়ে আনি, চলুন ম্যাডাম নীলাঞ্জনা।”
নীলু শ্বাস আটকে পড়ে থাকে। একরাশ ভালো লাগা গ্রাস করছে তাকে। এ ভালো লাগা থেকে পালানোর উপায় নেই, শুধু উপভোগ করতে হয়।

বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরেই কয়েকবার বমি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ইরা। আরশাদ বুঝতে পারেনা কি করবে। আশ্চর্য! বাড়ির সবাই কেমন শান্ত হয়ে আছে। আর এই বোকা মেয়েটা আবার হাসছে। এতো অসুস্থতার মধ্যেও কেউ হাসে? ও কি পাগল?

“মা আমার মনে হয় ওকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া দরকার। এক্ষুনি।”
রাবেয়া বেগম হালকা গলায় বললো,”এতো রাতে নিয়ে কাজ কি? সকালে নিয়ে যাস।”
আরশাদ বুঝতে পারেনা তার মা এতো শান্ত কীভাবে? অসুস্থতা কি সকাল বা রাত দেখে হয়? রাতে যদি বাড়াবাড়ি হয়?

“মা আমি আশ্চর্য হচ্ছি তোমার ব্যবহারে। ওর চোখ উলটে যাচ্ছে বমি করতে করতে। আর তুমি বলছো সকালে ডাক্তারের কাছে যেতে? আমি এখনই যাবো।”
রাবেয়া কিছু বলার আগেই রাশেদুল এগিয়ে এসে আরশাদের কাঁধে হাত রাখে আলতো করে।

“ঠিক আছে যাবি। এখন ঘরে যা। ইরা তোকে কিছু বলতে চায়।”
আরশাদ বিরক্ত হয়ে বললো,”ও আর কি বলবে বাবা? নিজেই একটা পাগল। তুমি বলো কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এতোবার বমি করে হাসে?”
রাশেদুল হাসতে যেয়েও হাসে না। হাসিটুকু মুছে ফেলে সাথে সাথে।

“আচ্ছা বুঝলাম ও পাগল। ইরা পাগল, তোর মা পাগল, আমি আর আশাও পাগল। শুধু তুই সুস্থ।”
“অবশ্যই তাই। তোমাকে দেখেও অবাক হচ্ছি বাবা। তুমি কবে থেকে এমন হলে?”
“যেদিন থেকে সুখবর পেয়েছি, সেদিন থেকেই।”
“সুখবর মানে?”
রাবেয়া বেগম স্বামীর হাতে চিমটি কাটে, রাশেদুল হাত বুলায় সেখানে।

“যা তো তুই ঘরে যা। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে আমাদের। তোর পাগলামি দেখার সময় নেই।”
রাশেদুলের হাত ধরে টানতে টানতে রাবেয়া ঘরে চলে যায়।
হতভম্ব হয়ে ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে আরশাদ। পাগলামি কে করছে? আরশাদ?

ঘরে ঢুকতেই আবার কিছুটা শঙ্কিত হয়ে যায় আরশাদ। বিছানায় শরীর এলিয়ে শুয়ে আছে ইরা। চোখ বন্ধ, তবে সে ঘুমায়নি আরশাদ বুঝতে পারছে। তার ঠোঁটের কোণে এখনো হাসি।
আরশাদ ইরার পাশে যেয়ে বসে তার হাতের উপর হাত রাখে।

“ইরা…”
“হু বলুন।”
“বাবা মায়ের কথা শুনতে হবে না। এখনো এতোটা রাত হয়নি। জরুরি বিভাগে ডাক্তার পাওয়া যাবে।”
ইরা মুখ টিপে হাসে।

“ইরা আমার এসব পাগলামি দেখতে ভালো লাগেনা। হাসছো কেনো?”
ইরা উঠে বসে। বালিশে হেলান দিয়ে আরশাদের দিকে তাকায় একদৃষ্টিতে। আরশাদের চিন্তিত চেহারা দেখতে ভালো লাগছে। আনন্দ পাচ্ছে ইরা।

“আমার কোনো ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগবে না। মায়ের সাথে গিয়েছিলাম, ডাক্তার শুধু বিশ্রাম নিতে বলেছে।”
“এ আবার কেমন অসুখ? বিশ্রাম নিলেই সুস্থ হয়ে যাবে? ওষুধ খেতে হবে না?”
“না আপাতত কোনো ওষুধ খেতে হবে না। এখন ওষুধ শুধু সকাল, দুপুর, রাত তিন বেলা আপনার চুমু খাওয়া। আজ দুপুরের চুমুটা বাদ আছে। দিন তো, দুইবেলারটা একবারে খেয়ে ফেলি।”
এই বলে ইরা আবার হাসে।
রাগে আরশাদ উঠে দাঁড়ায়। মুখ লাল হয়ে গেছে তার। ইরা হাসি থামায় সাথে সাথে।

“ইরা তোমাকে আমি যথেষ্ট বাস্তববাদী মনে করেছিলাম। আমি এসব পছন্দ করিনা। আমি সহজ ভাবে চিন্তা করি। এতো ঘোরানো প্যাঁচানো কথা আমি বুঝতে পারিনা।”
ইরা আরশাদের হাত ধরে তাকে আবার পাশে বসায়। আরশাদ বসলেও মস্তিষ্ক বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে তার। অন্যদিকে তাকিয়ে আছে থমথমে মুখে।

ইরা আরশাদের ডান হাত টেনে এনে নিজের পেটের উপর রাখে। উষ্ণ স্থানে হাত পড়তেই আরশাদ ঘুরে তাকায় ইরার দিকে।

“কি হয়েছে? পেটে ব্যথা করছে? আমি ঠিক বুঝেছিলাম পেট খারাপ হয়েছে। বিয়ে বাড়ি যাওয়ার আগে কি খেয়েছো? আশার সাথে আবার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চটপটি, ফুচকা খেয়েছো তাইনা?”
“ধুর, আপনি কিচ্ছু বুঝেন না।”
“কি বুঝতে বলছো? আমার বউ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। ডাক্তারের কাছে যেতে চাচ্ছে না। এখানে কি বোঝার আছে আমার?”

ইরা আরশাদের হাতটা পেট থেকে উঠিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে জোরে। সহসাই কেঁদে দেয়। প্রথমে আস্তে, এরপর জোরে চিৎকার করে। কাঁদতে কাঁদতে শরীর কাঁপে তার।

স্তম্ভিত হয়ে যায় আরশাদ। ইরা’কে দুই হাতে জড়িয়ে নিজের বুকের মধ্যে ঠাঁই দেয়। ঝড়ে পড়া কবুতরের মতো ইরা আরশাদকে জাপটে বসে থাকে।

“ইরা কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো তুমি?”
“আরশাদ, আরশাদ….”
“বলো, এইতো আমি।”
“আপনি কি আজ সারারাত আমাকে এভাবে জড়িয়ে বসে থাকবেন? একটুও যেনো আলগা না হয় বাঁধন।”
“আমি আছি তো ইরা, সবসময় আছি। কিন্তু তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে? রাত কিন্তু বেশি হয়নি এখনো।”
ইরা মাথা তোলে। তার ঈষৎ লাল চোখ ভর্তি নোনা অশ্রু। কি মায়াময় লাগছে মুখটা। যেনো স্বচ্ছ ঝিলের জলে একটা সদ্য পরিস্ফুটিত পদ্ম দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

“আরশাদ….”
“বলো।”
“আমার মা’কে খুব মনে পড়ছে, বাবাকেও।”
“আচ্ছা আগামীকাল তোমার বাবার কাছ থেকে ঘুরে আসবে। আমি নিয়ে যাবো, ঠিক আছে?”
“আরশাদ আমি তো আমার মা’কেও চাই।”
আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”এই দুনিয়ায় তো তাকে আর দেখা সম্ভব না। পরকালে যদি খোদা চান, তবে অবশ্যই দেখা হবে তার সাথে তোমার।”
ইরা মাথা নিচু আবার হেসে দেয়, কান্নার মধ্যেই। আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকার তার দিকে।

“কি হলো আবার?”
“কেমন হয় যদি এই দুনিয়াতেই আমার মা’কে আবার ফিরে পাই?”
“তা আর সম্ভব নয় ইরা।”
“সম্ভব। আল্লাহ চাইলে তা-ও সম্ভব।”
আরশাদ নির্লিপ্ত চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা হঠাৎ এমন বদলে যাচ্ছে কেনো? তার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে নিজের মধ্যে নেই সে। ওর হয়ে আর কেউ কথা বলছে।

“আপনি আমাকে পাগল ভাবছেন তাইনা?”
“হ্যা ভাবছি। তার কারণগুলো স্পষ্ট।”
“এখন আপনাকে আমি যা শোনাবো তা শুনে আমি না, আপনি পাগল হয়ে যাবেন।”
আরশাদ জিজ্ঞাসু চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইরা চোখে মুছে টলতে টলতে বারান্দায় যেয়ে দাঁড়ায়।
পাখি দু’টো ঘুমিয়ে গেছে। মেয়ে পাখিটা ডিম দিবে, তাই ইদানীং সে একটু কম ডানা ঝাপটায়। পুরুষ পাখিটা বেশি কিচিরমিচির করে। বোধহয় নিজের খুশি প্রকাশ করে। ইরা খাঁচার উপর হাতে রেখে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে। আরশাদ ততক্ষণে তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। বাইরেটা বেশ ঠান্ডা। উত্তরে শীতল হাওয়া বইছে। আরশাদ নিজের চাদরের মধ্যেই ইরাকে আবৃত করে।

“এবার বলো তো কি হয়েছে। আমি এতো বক্র চিন্তা কর‍তে পারিনা। আমার মাথায় চাপ সৃষ্টি হয়।”
ইরা বাইরের আঁধারের দিকে তাকিয়ে খোলা গলায় বললো,”মা’কে হারিয়েছিলাম অনেক ছোট থাকতে। মায়ের মাথায় সমস্যা ছিলো। প্রায় রাতেই চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠে যেতো। বাবা বিরক্ত হতো। কিন্তু আমি হতাম না। মা’কে শান্ত করার চেষ্টা করতাম। আস্তে আস্তে মায়ের সমস্যাটা বাড়ে। মা দিনের বেলায়ও কি যেনো দেখে ভয় পেতো। বাবা শুধু বকাঝকা করতো। এতে মা আরো গুটিয়ে যেতো ভয়ে। শেষমেশ আত্মহ*ত্যার মতো ভয়াবহ একটা কাজ করে ফেলে। আমি স্কুলে ছিলাম, বাবা তার কাজে। বাড়িতে মা একাই ছিলো। মুক্তি মিললো তার অভিশপ্ত ভয়টা থেকে। কিন্তু আমার জীবনে আঁধার নেমে এলো। সৎমা নির্যাতন করতো, বাবা তেমন কিছু বলতো না বা বলতে পারতো না। তাই বলতে পারেন বাবা বা মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েই আমার কৈশোর পার হয়েছে। যৌবনের শুরুতে আপনাকে পেলাম। আমার সব কষ্ট, সব যন্ত্রণা মিলিয়ে গেলো হাওয়ায়। পূর্বের সব অপূর্ণতাকে বিদায় জানালাম। আমি আপনাতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হলাম।”
আরশাদ ইরার মাথা বুলিয়ে দিতে থাকে আলতো করে।

“তবে বাবা মায়ের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আমার তাদের খুব মনে পড়ে।”
“আপাতত বাবাকেই দেখে এসো।”
ইরা ঝট করে আরশাদের দিকে তাকায়। দূরের নিয়ন আলোয় জ্বলজ্বল করছে তার মুখটা। ঠোঁট কাঁপছে তিরতির করে।

“আরশাদ আমার সে শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ হতে চলেছে।”
“মানে?”
“মানে আমি মা হতে চলেছি। আমার গর্ভের অনাগত প্রাণ জানান দিচ্ছে সে আমার মা বা বাবা হয়ে উঠবে পুরোপুরি।”

বরফের মতো জমে যায় আরশাদ। মিনিট খানেক চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে ইরার দিকে তাকিয়ে। ইরার সেদিকে খেয়াল নেই। বারান্দা থেকে দূরে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে।

“ইরা…..”
“হু।”
“ইরা আমার দিকে তাকাও।”
“না তাকাবো না।”
“বলছি এদিকে তাকাও।”
আরশাদ এক হাতেই ইরাকে ঘুরিয়ে নিজের সামনে এনে দাঁড় করায়। ইরা হাতের নখ কামড়াতে থাকে।

“আমি যা শুনলাম তা সত্যি?”
“কি শুনেছেন আপনি?”
“ইরা মজা করো না। তুমি নিশ্চিত?”
ইরা আরশাদের চোখে চোখে রেখে ফিসফিস করে বললো,”কেনো আপনি নিশ্চিত ছিলেন না? নাকি আদরের সময় অন্য জগতে চলে যান?”
আরশাদ কিছু সময় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে বড় বড় শ্বাস ছাড়ে। মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরন যেনো আন্দোলন শুরু করেছে। এ কি শান্তি, এ কি সুখ! দুনিয়ায় এতো শান্তি আছে? বেহেশতের সুখের কাছে নাকি দুনিয়ার শান্তি কিছুই না। এরচেয়ে শান্তির আর কি হতে পারে?

আচমকাই ইরাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে আরশাদ। ইরা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। আরশাদকে কখনো এভাবে কাঁদতে দেখেনি সে। তার গমগমে গলার আওয়াজে ইরা হতবিহ্বল হয়ে যায়।

“আপনি কাঁদছেন কেনো?”
“ইরা আমাকে ছেড়ো না। এভাবেই থাকো। আমার অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। আমি জানিনা এখন আমাকে কি করতে হবে। আমি শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেলছি।”
ইরা আরশাদের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। আরশাদের উষ্ণ অশ্রুর উপস্থিতি টের পাচ্ছে সে।

“ইরা এই অসহ্য সুখের সীমা কোথায়?”
“কিছু সুখের কোনো সীমা হয়না আরশাদ।”
“এই সুখময় যন্ত্রণায় যদি আমি নিঃশেষ হয়ে যাই?”
“আমি শুন্য থেকে আলো জ্বেলে আপনাকে আবার জাগ্রত করবো। এখন যে আপনাকে আমাদের ভীষণ প্রয়োজন। আমার আর…”
ইরা কথা শেষ না করেই আরশাদের হাতটা আবার নিজের পেটের উপর রাখে। বসন্তের বাতাস তখন মৃদুলয়ে বয়ে যাচ্ছে। এক ফালি অপার্থিব সুখ তাদের আঙিনা জুড়ে।

আরশাদ হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ে। ইরার শাড়ি সরিয়ে তার উন্মুক্ত পেটে ঠোঁট ছোঁয়াতেই ইরা থমকে যায়। এতোদিনেও এ স্পর্শ এতো শিহরণ জাগায় কেনো তাকে?

“এই নিশ্ছিদ্র আঁধারকে সাক্ষী রেখে বলছি, ইরাবতী আমার নূরবউ আজ তুমি আমার কাছে যা চাইবে আমি তোমাকে তা দিবো। এই রাতে তুমি আমাকে সর্বোচ্চ শান্তি উৎস এনে দিলে। তুমি কি চাও বলো? আমার সাধ্যের সীমানার বাইরে যেয়ে হলেও তা হাজির করবো।”
ইরাও বসে পড়ে মেঝেতে, আরশাদের মুখোমুখি। মানুষটা ছোট্ট বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। তাকে এভাবে কখনো দেখা হয়নি।
ইরা আরশাদের মুখটা উঁচু করে ধরে। ঘন দাড়ি চুঁইয়ে পড়া অশ্রুর ফোঁটাগুলো ইরা আলতো করে মুছে দেয়।

“আজীবন ভালোবাসুন, ভালো রাখুন। আমাকে যত্ন করে লুকিয়ে রেখে দিন আপনার হৃদয় প্রকোষ্ঠে। মন কেমনের মরশুমগুলো মন শান্তির মরশুম হয়ে ধরা দিক আমাদের উত্তপ্ত হৃদয়ে। শীতল করে দিক দুইটা সত্ত্বাকে। যারা ভালোবেসে কাছে আসেনি, তারা কাছে এসে ভালোবেসেছে।”
আরশাদ ইরার দুই হাত মুঠোবন্দি করে। হাত দু’টো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে ইরার।

“আমার ভালোবাসা ইরাবতীর নামে উৎসর্গ করলাম। দলিল ছাড়াই অলিখিতভাবে একটা গোটা হৃদয়ের মালিক তুমি। তোমার জীবনের প্রতিটা মরশুম আমি সাত রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলাম। আমৃত্যু আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবো।”

রাত বাড়ছে, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু বুনো জোনাকির আনাগোনা। আরশাদ মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে, তার দুই পায়ের মাঝে জড়সড় হয়ে ইরা। চন্দ্রহীন আকাশ বোধহয় ভাবছে, আজ কি পূর্ণিমার কোনো প্রয়োজন ছিলো? বোধহয় না! ভালোবাসায় মুড়ে থাকা সত্ত্বাগুলো জ্যোৎস্না ছাড়াও অদৃশ্য আলোয় ডুবে থাকে, চন্দ্রের বিশেষ কাজ নেই এখানে।

(সমাপ্ত)