#নীল_রঙা_উপাখ্যান
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা।
#পর্ব_০৩
নেওয়াজ বাড়িতে মেহমান দের ঢল। বিয়েতে আসা প্রত্যেকে তখনো বাড়িতে উপস্থিত।
বুসরা সবার মাঝে বসে গল্প করছে। নতুন বউ সে। ঠোটে সর্বক্ষণ মৃদু হাসি লেগেই আছে।
তিতলি সকাল থেকে বের হয়নি। জোরপূর্বক না পাঠালে এখানে আসবার মোটেই ইচ্ছে ছিলনা তার।
বোনের দিকে চেয়ে আসাটা হয়েছিল।
কিন্তু প্রতিটা প্রহরের সাথে চারিদিক থেকে আসা দমকা একটা হাওয়া তার দম বন্ধ করে দিচ্ছে। যেন আশেপাশের সকল দুঃখ তাকে চেপে ধরে রেখেছে।
শ্যামলতার গোলকের মত চোখ দু’টো দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে।
আরফানের মায়ের কথা গুলো কেমন হজম হয়নি তার। যদিও এটা নতুন কিছু নয়। তবুও এই মুহুর্তে তার একটু বেশি ভয় করছে।
আরফানের জন্য কোন অনুভুতি তার নেই। তবে কোন মেয়েই চাইবে না এমন একটি পুরুষ তার জীবনে না আসুক। সবাই চাইবে তার মত স্বামী। এতে তিতলির কোন দোষ নেই।
তিতলি বসেই ছিল এমন সময় মারিয়া আসে গেস্ট রুমে।
মারিয়া, আরফান এবং ইরফানের খালাত বোন। দেখতে মাসআল্লাহ অনেক সুন্দরী। তবে আচরণ খুব একটা সুবিধার নয়।
মারিয়া হটাৎ করেই আওয়াজ দেয়।
“তিতলি।”
তিতলি একটু চমকে উঠে। ফিরে তাকায় মারিয়ার দিকে।
“হ্যাঁ বলো।”
“তুমি নাকি কিছু খাওনি সকাল থেকে। মামনি তোমায় ডাকছে”
তিতলি জানে মারিয়া রেহেনুমা পরভিন কে মামনি বলে ডাকে।
“আসছি তুমি যাও।”
“দ্রুত এসো। তোমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না সবাই।”
তিতলি উঠে দাঁড়ায় । অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করার মত মেয়ে সে নয়।
বুকে হাত গুঁজে চোখের দিকে তাকায় মারিয়ার,
“অপেক্ষা কে করতে বলেছে? উল্টে না বলায় এমনি এমনি অপেক্ষা করে খুব বেশি উপকার হয়ে গেল।”
কথাটা বলে তিতলি বেরিয়ে যায় রুম থেকে। মারিয়া তাকিয়ে রইল তিতলির যাওয়ার দিকে।
“সুরত হলো ওই কাইল্লা। কথার ভার দেখোনা। যেন তির ছুটছে।”
মারিয়া বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসে।
সবাই খেতে বসেছে। তিতলি গিয়ে বোনের পাশে বসে। হাবাত্বের মত খাওয়া সোভা পায়না। ভদ্র ভাবে বসে বোনের পাশে। মনে মনে তার অনেক কিছুই চলছে এই মুহুর্তে। তবে এখন কিছু করতে পারছে না সে। না কিছু বলতে পারছে৷ তার প্রয়োজন ধৈর্যের।
খাবার শেষে সবাই তিতলিদের বাড়ির দিকে রওনা করবে।
প্রথম কথা ছিল তিতলি, ইরফান এবং বুসরা যাবে। কিন্তু এর মাঝেই তিতলির বাবা ফোন করে সবাইকে দাওয়াত করলেন। তিতলির চাচাত বোন মিষ্টির বিয়েটা দিয়ে দিবে এই সময় থাকতে থাকতেই।
আরফানকে স্পেশাল রিকোয়েস্ট করা হয়। আরফানও নাকি ছুটি নিবে বলেছে।
তিতলি বিরক্ত হয়ে যায়। কোথায় ভেবেছে বাড়িতে গিয়ে একটা সুরাহ বের করবে। তা না হয়ে হলোটা কি এইটা।
তিতলি বিরক্ত হয়ে রুমে চলে আসে।
বুসরা যদিও খেয়াল করেছিল বোনের অস্থিরতা।
বুসরা অনেক কষ্টে সবাইকে পাশ কাটিয়ে গেস্ট রুমে চলে আসে। তিতলি জামা গুছিয়ে নিচ্ছিল। বুসরা গিয়ে বিছনায় বসে।
তিতলি বোনকে দেখে মৃদু হাসে,
“আপা তুই হটাৎ? ”
বুসরা এগিয়ে গিয়ে তিতলির হাত ধরে।
“কিছু হয়েছে তিতলি যা আমি জানিনা? ”
“কেন এমন কেন হবে?”
“আমার মনে হচ্ছে তুই কিছু নিয়ে চিন্তিত।”
“সেরকম নয়। আসলে.. ”
“এক্সকিউজ মি।”
হটাৎ করেই আরফানের কন্ঠ শুনে তিতলির শরীর কেঁপে উঠে। বুসরা তা লক্ষ করে। তিতলির শরীরে কম্পনের ঝাকি সেও অনুভব করে। বুসরা অবাক হয়ে তিতলির দিকে তাকিয়ে থাকে।
তিতলি সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করার জন্য বুসরাকে বলে,
“আ আরে। হটাৎ করেই না আওয়াজ শুনলাম।”
“আমিত জিজ্ঞেস করিনি কিছুই।”
“আপু তুইও না। তোর চোখ দেখেই আমি বুঝি।”
আরফান এগিয়ে আসে,
“তোমায় ইরফান খুজছে আপু।”
বুসরা মাথায় কাপড় টেনে নয়ে।
“জি ভাইয়া যাচ্ছি।”
বুসরা বেরিয়ে যায়। তিতলির বুক ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল। আরফান ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেওয়ায় তিতলির আরও ভয় লেগে ওঠে।
“কি করতে যাচ্ছিলে?”
“ক কই কিছু নাত।”
“আমি স্পষ্ট দেখলাম কিছুত একটা বলতে যাচ্ছিলে।”
“না ভুল। আমি কেন কিছু বলব।”
আরফান এগিয়ে আসে। হাতের থেকে একটা কাগজ তিতলির দিকে এগিয়ে দেয়।
তিতলি অবাক হলেও কাগজ নিয়ে নেয়।
কাগজ খুলতে দেখতে পায় বুসরার রিপোর্ট আর এক্স বয়ফ্রেন্ড এর সাথে কিছু ক্লোজ ছবি।
তিতলির চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
“এ এগুলা কি?”..
” বুসরার বয়ফ্রেন্ড এর সংখ্যা অনেক গুলো। তুমিও ভালো করেই জানো। এখন কথা হচ্ছে ওদের বিবাহিত জীবনের শান্তি তোমার উপর ডিপেন্ড করে আছে। যেমনটা দেখছে পাচ্ছো। রিসেন্ট ছবি গুলো। ইরফান কে যদি বলি বুসরার বাচ্চা টা রোহানের। প্রমাণ হিসাবে ছবি গুলো তাহলে কেমন হয়? ”
“মি মিথ্যা কথা আপু সে দিন ইরফান ভাইয়ের সাথেই ছিল জীবনের প্রথম।”
“সিওর কিভাবে বলছো? ডি এন এ টেস্ট ত বলছে বাচ্চা টা রোহানের।”
তিতলির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। রিপোর্ট হাতে তিতলি আরও অবাক হয়ে যায়।
“এ এগুলা কি?”
আরফান, গিয়ে খাটের উপর পায়ে পা তুলে বসে,
“তুমি জানো কি। তুমি যা চাও তাই হবে।”
“কি করতে হবে আমাকে?”
“মুখ বন্ধ রাখতে হবে। আমি যতক্ষণ বলব ততক্ষণের জন্য।”
“আপনি কি আমাকে হ্যারাজ করতে চান?”
“বউকে কেউ হ্যারাজ করেনা জান। বউয়ের উপর এমনি অধিকার থাকে। চাইলে এক্ষুনি তোকে বিছনায় ফেলতে পারি। সেটা করিনি শুকরিয়া আদায় কর।”
তিতলি রাগে দাঁত কটমট করতে করতে বলে,
“আপনি একটা মানসিক রোগী। আয়নার ডক্টর দেখানো প্রয়োজন।”
আরফান কথাটা শুনে বসা থেকে উঠে দাড়ায়।তিতলি একটু ভয়ে সংকোচিত হয়ে যায়।
“বউ বলে চুপ আছি। নাহলে না এতক্ষণ তোর দাঁত একটাও মাড়িতে থাকত না।”
তিতলি পিছিয়ে যায় একটু। আরফান পুনরায় গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে।
“সর্তে রাজি? নাহলে ইরফান কে এগুলো দিলে কাজ এমনিই হয়ে যাবে।”
“ন না প্লিজ।”
“অন ইয়োর নিস।”
“হোয়াট? ”
“আই সেইড অন ইয়োর নিস। রাইট নাউ।”
তিতলি ইতস্তত বোধ করতে করতে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে।
“এখন বল। ক্ষমা চাইবি সুন্দর ভাষায়। যতটা সুন্দর হওয়া যায়।”
তিতলি মাথা নুইয়ে নেয়। এতটা অসহায় জীবনে কখনো বোধহয় নি তার।
“আমি ক্ষমা চাইছি। সব দোষ আমার। সকল শাস্তির হকদার আমি। দয়া করুন এমন কিছু করবেন না যাতে করে ওদের নতুন সংসার শেষ হয়ে যায়।”
আরফান তখনো শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। তিতলির চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা।
“আপনার প্রতিটা প্রস্তাবে আমি রাজি। যা বলবেন তাই করব। কথা দিচ্ছি কাউকে কিছু জানতে দেব না। ”
তিতলি একটু থেমে আবার বলে,
“আপনার কোন সমস্যা হবেনা। আমি আপনার স্ত্রী এটা আপনি এবং আমি বাদে কেউ জানবে না। ”
“আর ইউ সিওর ডার্লিং? ”
তিতলি আবার মাথা নামিয়ে নেয়।
“হ্যাঁ।”
আরফান, এবার জায়গা থেকে উঠে তিতলির মুখোমুখি চলে আসে।
তিতলির কপালে টোকা দেয়।
“রিমেম্বার ডার্লিং,
তোমার আচরণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে বুসরা এবং ইরফানের সংসার আর ভবিষ্যৎ।”
তিতলির চাহনিতে অসহায়ত্ব স্পষ্ট।
“আর হ্যাঁ আমি যখন ডাকব আমার সামনে হাজির হবে। তোমার বাড়িতে যাচ্ছি শুধু তোমার জন্য। নাহলে আমার কোন শখ ছিলনা। আমার আশেপাশে না থেকে রুমে থাকলে তোমার খবর আছে। এই বিয়েটা আমি এনজয় করতে চাই।
বিয়ের পর প্রথম তোমার বাড়িতে যাব। বউ পাশে না থাকলে হয় কি।”
আরফান বলছে আর মিট মিট করে হাসছে।
তিতলি পারলে পাশ থেকে ফুলদানি তুলে এক বাড়িতে সাইকোপ্যাথ কে মেরে ফেলে।
চলবে?

