Home "ধারাবাহিক গল্প নীল রঙা উপাখ্যান নীল রঙা উপাখ্যান পর্ব-০২

নীল রঙা উপাখ্যান পর্ব-০২

0
4844

#নীল_রঙা_উপাখ্যান
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা।
#পর্ব_০২
আরফানের রুমটা তখন টিমটিম আলোতে উজ্জ্বল। তিতলির ভয় হচ্ছে। তিতলির অবস্থা বড্ড করুন দেখাচ্ছে কারণ সে যে মানুষ টাকে ভয় পাচ্ছে এই মুহুর্তে সে অন্য কেউ নয় তার স্বামী। তার বিয়ে করা কাগজে কলমে লিখিত স্বামী।
তিতলি আরফানের সার্ট হাতরায়। আরফান এখন তার ক্যাজুয়াল পোশাকেই আছে।
আরফান তিতলিকে বিছনায় রেখে তিতলির সামনে একটা শাড়ি রাখে। শাড়িটা নীল রঙা।
তিতলি মাথা তুলে তাকায়।

“যাও তৈরি হয়ে এসো।”

“ক কিন্তু।”

তিতলির কন্ঠ কাঁপছে। কথায় ভয়ের ছাপ। আরফান বাঁকা হাসে তিতলি কম্পিত ঠোঁটে আঙ্গুল রাখে,

“যেটা বলছি সেটা করো। আমি তোমায় বউ সাজে দেখতে চাই। খুব বেশি চালাকি করোনা। এই রুমে এই মুহুর্তে তুমি এবং আমি বাদে কেউ নেই। তোমার অবগতের জন্য জানাচ্ছি যে, রুমটা সাউন্ড প্রুফ। চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে ফেললেও বাহির থেকে কেউ আসবে না। অর্থাৎ এই মুহুর্তে তোমার সামনে আমি ছাড়া গতি নেই।”

আরফানের কথা গুলো তিতলির ভেতরের ভয়কে আরও বাড়িতে দিল।
তিতলি জানে এখন শাড়িটা না পরে , পালাতে চাইলে আরফানের ক্রোধ বাড়বে তাই সে উঠে যায়। শাড়িটা জড়িয়ে ওড়ানাটা দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে নেয়।
তিতলি আরফানের রুমে এসে দেখে আরফান নেই। তিতলি গিয়ে বিছনায় বসে পড়ে। নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে।
পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য।
এরপরেই ঘটা আরফানের অদ্ভুত ঘটনা।

—–
ভোরের আলো যখন ধরণী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
আরফান চোখ মেলে তাকায়।
পাশে সাইড টেবিলে ফোনের এলার্ম টা বেজে উঠছে বার বার। বিরক্ত হয়ে আরফান মাথা তুলে ফোনটা নিয়ে বিরক্তিকর শব্দ টা বন্ধ করে।
আরফান ফোন বন্ধ করে নিচের দিকে দৃষ্টি স্থির করে।
শ্যামলতা ঘুমিয়ে আছে। চোখের পাপড়ির ভাজে ভাজে লুলিকে থাকা উপাখ্যান।
আরফান কিছুক্ষণ তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী এর দিকে ওভাবেই তাকিয়ে থাকে।
চোখের কোণায় লেগে থাকা শুঁকনো পানি জানান দিচ্ছে কাল সারাটা রাত হয়ত মেয়েটা কান্না করেছে।
আরফান, আলতো হাতে তিতলির হাত উঠিয়ে হাতে চুমু খায়।
এরপর ধির গতিতে উঠে আরফান, তিতলিকে পাজকোলে তুলে নেয়।
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে গেস্ট রুমে তিতলিকে শুইয়ে দেয়।
এরপর বেরিয়ে আসে।
নিজের রুমের প্রবেশ করার পর বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু করে।
তিতলির নীল রঙা ঘোমটা ওড়না টা তখনো তার বিছনার এক কোণায় পড়ে ছিল।
আরফান গিয়ে ওড়নাটা আলতো হাতে গুছিয়ে দেয়।

“খুব অবাক হয়েছো তাইনা। ভাবছো কেন আমি এমন করলাম। আমি জানি আমি যা করেছি তা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি সব ঠিক করে দেব। এ পৃথিবীর সব আধার তুমি গ্রাস করলেও সেই আধারে আলোর দিশা হয়ে আমি প্রবেশ করতে চাই তিতলি।
তোমার ছোট্ট ছোট্ট ডানা হতে চাই। আমি জানি এরপর যে ঝড় আসতে চলেছে তা সহ্য করার জন্য তুমি এবং তোমার ছোট্ট হৃদয় খানা ভীষণ দুর্বল। কিন্তু আমি সেই ঝড় মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। সব শেষ পরিণতি তুমি রয়ে গেলেই হবে।
তুমি নামক সুখটা বাদে পৃথিবীর সব সুখই আমার কাছে ফিকা।”

ওড়নাটা নিতান্তই জড়ো বস্তু। ওড়ানা কি মানুষের কথা শুনতে পারে। অনুভুতি বুঝতে পারে? পারে না। পারে না বলেই হয়ত আরফান নিজের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা কথা গুলো বলে ফেলল।
আরফান খানিকটা সময় পর ওড়ানাটাকে কাবার্ডে সাজিয়ে রাখে। খুবই যত্নে।

—-

বিয়ে বাড়িতে বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুম কারোরই হয়না।
তবুও বেশ বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে সবাই।
বুসরা নতুন বউ লাল টুকটুকে শাড়িতে সে নিচে নেমেছে।
শ্বাশুড়ির সঙ্গে কাজ করছে।
রেহেনুমা পারভিন সকাল সকাল বউকে দেখে বললেন,

“বউমা। তুমি এত সকালে কেন উঠেছো?”

“আম্মা ভাবছিলাম আপনাকে সাহায্য করে দেই।”

“কোন প্রয়োজন নেই। নতুন বউ হয়ে সকাল সকাল রান্না ঘরে আসতে নেই। ”

বুসরার মুখে প্রশান্তির হাসি।তার শ্বাশুড়ি মাটির মানুষ সে অনেক আগে থেকেই শুনে এসেছে। তার ইঞ্জিনিয়ার বর এবং ডক্টর ভাসুরকেও খুব ভালোই শিক্ষা দিয়েছে।
ইরফান আর আরফানের ভেতর বয়সের তফাত বেশি হয়। বছর দু-এক হবে।
তবে ইরফান প্রথম রাতে বুসরাকে একটা কথাই বলেছে।

“আম্মা মাটির মানুষ । তবে তার অবাধ্য হলে তিনি ভীষণ রেগে যায়। চেষ্টা করবে তার বাধ্য হয়ে চলতে। আবার তার কিছু সেকেলে সভাব আছে। তিনি একটু কুসংস্কার বিশ্বাসী। তাই তিনি যখন এইসব কথা বলবে চেষ্টা করবে এড়িয়ে যাওয়ার।”

বুসরা ভাবে। এটা আর তেমন কি। এত বছর পড়ালেখা করে এত টুকু বুদ্ধি করে তার চলতেই হবে।
বুসরা চায়েক কাপ গুলো সাজাতে শুরু করে।
রেহেনুমা পারভিন চায়ের পেয়ালা বুসরার পাশে রাখে।

“আমার শখ আমার আরফানের জন্য তোর মত দুধে আলতা রঙা একটা মেয়েকে বউ বানিয়ে আনব।
তোর মত সুন্দরী হবে। লক্ষী মন্ত্র মেয়ে।”

বুসরা মিষ্টি হাসে।

“ইনশাআল্লাহ। এক সাথে খুজব আমরা।”

রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কথা গুলো শুনছিল তিতলি।
আরফানের জন্য মেয়ে খুঁজবে তার মা।
তাহলে তার কি গুরুত্ব এখানে।
আরফান এটা কেন করল।
তিতলি এখন কি করবে। কিভাবে এই গোলকধাঁধা থেকে বের হবে। আদও কি বের হতে পারবে। আরফানের আম্মা কখনোই তিতলিকে মেনে নিবে না। তিতলি শ্যামবর্ণ হওয়ায় ছোট থেকেই সে জানে মানুষ একটা শ্যামবর্ণের মেয়েকে ঠিক কতটা ঘৃণা করতে পারে।
এমনটা নয় তিতলি তাদের কোন ক্ষতি করেছে। কিন্তু আবার এমনটাও নয় তিতলি কারোর কাজে বাঁধা দিয়েছে। তবুও মানুষ তাকে বিনা কারণেই ঘৃণা করে।

বুসরা চায়ের কাপে চা ঢালতে ঢলাতে তিতলির দিকে লক্ষ করে,

“আরে উঠে গিয়েছিস তুই? আয় ভেতরে আয়।”

বোনের ডাকে ধ্যান ফিরে তিতলির।
সে এগিয়ে যায় বোনের পাশে।
তবে তিতলি লক্ষ করল তাকে দেখে রেহেনুমা পরভিন বেশি একটা খুশি হয় নি।

“আপু বাড়িতে কখন যাব আমরা? ”

“বোধহয় আজ বিকালে তাইনা আম্মা?”

রেহেনুমা পরভিন জোরপূর্বক হেসে বললেন,

“হ্যাঁ। তিতলি এখানে ভালো লাগছে না? কত মানুষ এখানে।”

“না তা নয়। আসলে।”

“আসলে কি? আম্মা আব্বার থেকে দুরে থাকেনিত কখনো। তাইনা তিতলি ।”

তিতলি হাসে।

“হ্যাঁ তাইত।”

“কিন্তু তিতলি তোকেত আমি এখানে রাখব আমার কাছে।”

কথাটা শোনা মাত্র তিতলি সবে মাত্র পানির গ্লাস হাতে নিয়েছিল সেটা মাটিতে পড়ে যায়।
কাচের গ্লাস হওয়ায় সেটা ভেঙে যায়।
বুসরা তা দেখে দ্রুত বোনের দিকে এগিয়ে আসে,

“তিতলি কি হলো? কোথাও লাগেনিত?”

তিতলি আমতা আমতা করে বলে,

“ই ইয়ে ম মানে না আপু। আ আমি দুঃখিত। আ আসলে কখন হাত থেকে।”

“না না সমস্যা নাই।”

বুসরা সমস্যা নেই বললেও রেহেনুমা পরভিনের যে কাজটা মোটেই পছন্দ হয়নি সেটা তার মুখশ্রী দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
তিতলি মাথা নুইয়ে রেহোনুমা পরভিন কে সরি বলে,

“সরি আন্টি।”

“তিতলি নতুন বউয়ের প্রথম দিন রান্না ঘরে কাচ ভাঙা শুভ নয়।
এমনটা করা উচিত হয়নি তোমার। তুমি কি চাও তোমার মত তোমার বোনের জীবন টায় ও শুখ না আসুক।”

কথা গুলো শুনে বুসরা অবাক হয়।
তিতলির ভীষণ কষ্ট লাগে। বুসরা কিছু বলতে নিলে তিতলি বোনকে বাঁধা দেয়।
নতুন নতুন বিয়ে। এখনি শ্বাশুড়ির সঙ্গে কোন তর্কে জড়ানোটা মোটেই শোভা পায়না।
বুসরাও কিছু বলেনা।

“সরি আন্টি ভুল হয়ে গেছে।”

“আচ্ছা আচ্ছা তুমি এখন বাহিরে যাও। কখন না কি করে ফেলো আবার।”

তিতলি বেরিয়ে যায়।
বুসরাও বোনকে যেতে দেখে তবে এই মুহুর্তে সে রান্না ঘর ছেড়ে গেলে শ্বাশুড়ি মা ভুল ভাববে। তাই আর যাওয়া হলোনা।

সবে মাত্র রেডি হয়ে নিচে এসেছে আরফান। নিচে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই তার চোখের সামনে ঘটেছে।
তিতলির চোখে চিকচিক করতে থাকা পানির বিন্দু গুলো তাকে বড্ড কষ্ট দিয়েছে।
তবে এই মুহুর্তে সে এমনটা অভিনয় করল জেন সে কিছুই দেখেনি।
আরফানের পরনে নেভী ব্লু সার্ট আর কালো প্যান্ট। এপ্রণ টা হাতে।
আরফানের ফর্সা ত্বকে এইসব রং বেশ মানায়।
ডক্টর পেশাটাও তাকে বেশ মানায়।
আরফান নিচে নামতে রেহেনুমা পরভিন এগিয়ে আসে,

“আরফান বাবা তুইত ছুটি নিয়েছিলি।”

“হ্যাঁ ৩ দিনের। ৩ দিন শেষ। আমার এমারজেন্সি পেসেন্ট এসেছে আম্মু।’

” খেয়ে যা বাপ।”

“সময় নেই আম্মু বাহিরে খেয়ে নেব।”

“হয়ে গেছে টিফিন করে দেই?”

“না আম্মু খেয়ে নেব হসপিটাল থেকে।”

আরফান কথাটা বলে বেরিয়ে যায়।
রেহেনুমা পরভিন তাকিয়ে রয় ছেলের যাওয়ার দিকে।

“বড্ড বেখেয়ালি ছেলেটা। এর জন্য মনস্থির একটা মেয়ে আনব আমি। সব ঠিক করে দেবে।”

বুসরা খাবার টেবিলে রাখতে রাখতে বলে,

“আনিয়েন আম্মা।”

রেহেনুমা পর্ভিন হাসলেন।


গেস্ট রুমে প্রবেশ করার পর।
তিতলি হাঁটুতে মুখ গুজে কান্না শুরু করে,

“কি ঘটে চলেছে আমার সাথে। কেন ঘটে চলেছে। আমি কি করব। কিভাবে বরে হব এর থেকে।”

তিতলি ঘুম থেকে ওঠার পরেই পাশে একটা চিঠি পায়। যাতে লিখা ছিল আরফানের নির্দেশ গুলো।
কাল ঘটে যাওয়া ঘটনা যদি একটা অক্ষর ও কেউ জানে তবে বুসরার প্রেগ্ন্যাসির বিষয়টা সবার সামনে চলে আসবে।
তিতলি জানে এটা খুব কঠিন নয় আরফানের কাছে। বুসরার প্রেগ্ন্যাসির কথাটা সবাই জানলে কি হবে। মেনে নেবে না কেউ বুসরাকে।
তিতলি এটা কেমন গোলকধাঁধায় ফেঁসে গেল। সেটা তিতলি নিজেও বুঝতে পারছে না।

চলবে?

#নীল_রঙা_উপখ্যান
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা
স্পয়লার —-

তিতলির চোখ দু’টো ক্লান্ত। মায়াবী মুখশ্রীতে এই চোখ দুটোই বহু না বলা কথা বলে ফেলে।
তিতলির মনটা ছোট হয়ে আছে।
বিছনায় মাথাটা ঠেকিয়ে শুয়ে আছে। মাঝে মধ্যে ফুঁপিয়ে উঠছে।
আচ্ছা শ্যামবর্ণ হওয়াকি এতটাই দোষের।
গায়ের রং কি এতই প্রয়োজনীয়।
হটাৎ করেই তিতলির মনে পড়ে যায় আরফানের কথা গুলো,

“খবরদার, এটাই শেষ ওয়ার্নিং আমি বার বার বরন করছি আমাদের ভেতরকার কথা কেউ জানবে না। আমার মানে হলো কেউই জানবে না। যত দিন না আমি জানাতে চাই।”

“আপনি কি আদও জানাতে চান?”

তিতলির পাল্টা প্রশ্ন শুনে আরফান, তিতলির চোয়াল টা শক্ত করে চেপে ধরে। এতে তিতলির আধ ভাঙা হৃদয় খানা পুরোটাই ভেঙে টুকরো হয়ে যায়।

“বেশি কথা নয়। শুধু যা বলেছি তাই। তা না হলে৷ ”

আরফান পকেট থেকে ফোন বের করে।