#হামিদা(৫২)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
এমপি সাহেব মোবাইলে হুমকি দিয়েছেন। এই অপমান তিনি আজীবন মনে রাখবেন। মানসিক চাপ ও উত্তেজনায় ছোটোখাটো স্ট্রোকের ঝড় বয়ে গেছে মহসীন কবিরের ওপর দিয়ে। মহসীন কবির দুদিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারলেন না। ডাক্তারের পরামর্শে বেড রেস্টে আছেন। দুশ্চিন্তা করতে বারণ করা হয়েছে তাকে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যাবে শান্ত, নীরব তিনি। চিন্তার রেখা নেই কপালে। কিন্তু ভেতরের খবর কেউ জানে না। মহসীন কবির টেবিলের ওপর রাখা দাবার বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার ওমন সাজানো গোছানো বোর্ডটা অগোছালো করে রেখেছে কে?
“জব্বার!”
জব্বার ছুটে এলো। মহসীন আঙুল তুলে বললেন,
“কে আমার দাবার বোর্ড এলোমেলো করেছে? কার এত সাহস!”
বেশ উঁচু গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন। জব্বার সভয়ে টেবিলের দিকে যেতে যেতে বলল,
“এক্ষুনি গুছিয়ে দিচ্ছি, ভূঁইয়া সাব।”
“তোকে কী প্রশ্ন করেছি?”
“তখন আপনার বিপির ওষুধ খুঁজতে গিয়ে হয়ত রবিন বাজানের হাতে লেগে আউলে গেছে। ঠিকঠাক গুছিয়ে দিচ্ছি। এই দেখুন!”
জব্বার তাড়াতাড়ি ঠিক করতে গিয়ে আরও উলোট-পালোট করে ফেললো। কিছুতেই শান্ত থাকতে পারলেন না মহসীন কবির। তার ভেতরে ভেতরে অসহ্য রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে। মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। রবিনকে তিরস্কার করতে করতে হাঁপাতে লাগলেন। জব্বার দৌড়ে এসে হাত ধরল,
“অত উত্তেজিত হতে নিষেধ করেছে ডাক্তার সাবে৷ আব্বাজান ইচ্ছে করে করেনি। রাগ কইরেন না খামোখা। আপনার শরীর খারাপ হবে!”
মহসীন কবির ঝাড়া দিয়ে হাত সরিয়ে ফেললেন। তপ্ত স্বরে বললেন,
“আমার মান ইজ্জত সব ধুয়ে গেল। আর তুই বলছিল শান্ত হতে? একেবারে মরলে শান্ত হব আমি। তার আগে নয়। তোকে যে কাজ দিয়েছিলাম পেরেছিস? এনেছিস খোঁজ?”
জব্বার আমতা আমতা করতে মহসীন কবির আচমকা লাথি দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলেন। উঠে বসলেন বিছানার ওপর। জব্বারকে বললেন,
“তোরে ভরসা করেছিলাম আমি, জব্বার। কিন্তু তুই, তুই আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখিসনি। ভুল আমারই ছিল। বোঝা উচিত ছিল যে, বুড়ো হয়ে গেছিস তুই। আগের মতো বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা নেই তোর মধ্যে। তাই তো বার বার ব্যর্থ হচ্ছিস। আমাকেও হারিয়ে দিচ্ছিস। দেখ কী হাল হয়েছে আমার! তুই বোধহয় চাস আমি মরি, হ্যাঁ?”
“না, না! এসব কী বলছেন। আমি এমন কথা ভুলেও ভাবতে পারি না।”
জব্বার আহত মুখে বলল। তারপর উঠে এসে সভয়ে মহসীন কবিরের পায়ের কাছে মেঝেতে বসল। মহসীন কোনো মতে আরেকবার লাথি দেওয়া থেকে বিরত হলেন।
“বিশ্বস্ত কুকুরটা বুড়ো হয়ে গেলে আর কাজে আসে না। তখন সেটাকে কাছে রেখে বোঝা বাড়িয়ে কী লাভ?”
জব্বার সহজে কাঁদে না। ওর মনটা পাষাণ। কিন্তু আজ ওর চোখ ছলছল করল। মহসীনের পা জড়িয়ে ধরে বলল,
“দুনিয়ায় আপনি ছাড়া আর কে আছে আমার? মারেন, কাটেন যা মন চায় করেন কিন্তু আমারে তাড়িয়ে দিয়েন না, ভূঁইয়া সাব। আমি কথা দিচ্ছি, আমার শরীরে শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত আর আপনাকে অপমানিত হতে দেবো না। যে বা যার কারণে আপনার মান গেছে তাকে খুঁজে বের করব আমি। আল্লাহর কসম!”
মহসীন পা গুটিয়ে নিলেন। মুখ গম্ভীর। চোখে নিরাসক্তি। মাছি তাড়ানোর মতো করে বললেন,
“যা! এই তোর শেষ সুযোগ। সফল হতে না পারলে ওই মুখ আর দেখাবি না।”
জব্বার উঠে দাঁড়ায়। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো। মুখ ভর্তি কাচা-পাকা দাড়ি গোফ। চুল উসকো-খুসকো। পরনে লুঙ্গি আর মলিন শার্ট। দরজার বাইরে বেরিয়ে পেটের কাছ থেকে শার্টের কোণা তুলে চোখ মুছল। রবিন সামনে পড়ল। হাতে পায়েসের বাটি। দাদিজানের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। পথে জব্বারের ম্লান ও আহত মুখ দেখে বলল,
“কী হয়েছে তোমার?”
“কই? কিছু না তো।”
এই রবিনকে দেখলে জব্বারের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে যেত। যেচে কথা বলতে আসত। আজ এক রকম পালিয়ে গেল। রবিন তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ সেদিকে। তারপর কাঁধ তুলে, “ধুর!” বলে দাদিজানের ঘরের দিকে গেল।
অসুস্থ মহসীনকে নিয়ে এ বাড়ির সকলে চিন্তিত। জেবা স্বামীকে ভালোবাসে না। এমন নয় যে তিনি কখনো ভালোবাসেননি। এখন তা আর অবশিষ্ট নেই। এর দায় অবশ্য মহসীনের নিষ্ঠুরতাই। তাই বলে ওঁর অমঙ্গলও চায় না জেবুন্নেসা। এ বাড়ির কেউ ই তা চায় না। লোকটা স্ত্রীকে পছন্দ করুক বা না করুক কিন্তু বিপদে পড়লে জেবুন্নেসা ছাড়া তার আর উপায় হয় না। সুস্থ হয়ে বসা না পর্যন্ত জেবুন্নেসা তার পাশে ছিলেন। জব্বার, মর্তুজা ও রবিনও সাহায্য করেছে। জুবিন এসে খোঁজ নিয়ে যায়। হামিদা এর ওর কাছে শুনতে পায়। ওর মনে ভয় জাগে এই কারণেও বড়ো আব্বা ওর ওপর আবার না রুষ্ট হয়৷ মিনারা বিদায় হওয়ার আগে খুব কথা শুনিয়েছে হামিদার দুর্ভাগ্য নিয়ে। সিনথিয়া টিপ্পনী করেছে। জেবুন্নেসা তাদের মতো যা তা না বললেও সায় দিয়েছে ওদের কথায়।
মৌলিকে মহসীন দেখতে পারেন না এখন। দুপুরে মহসীন নিজের ঘরে ডেকেছিলেন ছোটো ভাইকে। মর্তুজা সব ভুলে গেছে। ওর সেই দুর্বিষহ অতীত। শিউলির ধোঁকা। ওর অপকর্মের লজ্জায় ডুবে পিতার মৃত্যু। ভুলে গেছে কী শর্তে হামিদাকে ছেড়ে গিয়েছিল। ভুলে গেছে ভূঁইয়া বাড়ির ত্যাজ্য সন্তান ও। ভুলে গেছে শুধুমাত্র মহসীন কবিরের দয়ায় এ বাড়িতে মা ও মেয়েকে বছর বছর দেখার সুযোগ পায়। এখনও তার দয়ায় ভূঁইয়া বলে পরিচয় দিতে পারে। আর ওর এত স্পর্ধা!
ভাইয়ের সেসব কথা শেলের মতো বিঁধতে লাগল মর্তুজার গায়ে। ঠিক ওর মেরুদণ্ড বরাবর। কুঁজো হয়ে গেল। লজ্জায় নত হলো। ক্ষমা চাইল। মহসীন কবির ক্ষমাশীল নয়। ভাই বলে মর্তুজাকে বার বার ক্ষমা করতে পারবেন না। ভরা মজলিসে মর্তুজা তাকে হেয় করেছে। কথা শোনেনি। এর ক্ষমা নেই। সুতরাং আজ এক্ষুনি এ বাড়ি ত্যাগ করতে হবে মর্তুজাকে।
মর্তুজার কিছু করার থাকে না। শিউলিকে ভালোবেসে ও সর্বস্ব খুইয়েছে। মান, কুল সব। একদিন মরতে চেয়েছিল। শিশুকন্যা হামিদা ও মৌলির মায়া ওকে মরতে দেয়নি। মর্তুজা এই বাড়িতে কোনোদিন মাথা তুলে ঢুকতে পারেনি আর। তবুও এসেছে। মেয়েকে দেখবে বলে। কিন্তু মেয়েকে দেখেও শান্তি কোথায়? ওর মুখে শিউলির আদল। শিউলির ছায়া ঘোরে যেন ওর সঙ্গে। মর্তুজার বারবারই সর্বনাশ হয়।
মর্তুজা শিউলিকে ভালোবাসে না। কিন্তু ওর দেওয়া ধোঁকা এখনও ওকে খুব ভুগাতে থাকে। এই যে এখন কুঁজো হয়ে বেরিয়ে আসতে হলো ভাইয়ের ঘর থেকে। আজ সিনা টান করে মেয়ের পক্ষ হয়ে একটা কথাও আর বলতে পারে না। পিতৃত্বের দাবি করার মুখ নেই ওর। হামিদাকে একদিন স্বত্ব ত্যাগ করে মহসীনকে দিয়েছিল। এরপর ওর জীবনে মৌলি এলো, হিমু-মুমু এলো। হামিদা হলো অবাঞ্ছিত। মর্তুজা বোঝে। কিন্তু বুঝেও ও হামিদাকে নিজের নতুন জীবনের সঙ্গে সাজাতে পারে না। এ ওর সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার কারণে মৌলির চোখে ছোটো হয়ে যায়, হামিদার চোখে নাম সর্বস্ব পিতা হয়ে যাকে কেবল।
“সন্ধ্যার গাড়িতে ঢাকা ফিরতে হবে আমাদের, মৌলি।”
মৌলি সবে গোসল করে এসেছিল। চুলে গামছা পেঁচানো। থমকে গেল,
“অসম্ভব! অনেক কষ্টে হামিদাকে রাজি করিয়েছি তিনদিন পর একসঙ্গে আমরা ঢাকা যাব। আজ গেলে ও যেতে পারবে না।”
মর্তুজা বুকে পাথর চাপা দিয়ে বলল,
“এবার থাক। পরেরবার ওকে নিয়ে যাব।”
“মর্তুজা!” মৌলি বাক্য হারালো স্বামীর এমন কথা শুনে। মর্তুজা পাষাণ হয়ে বলল,
“আজই যাব। আমার কথার বিপক্ষে যেয়ো না মৌলি। নয়ত…।”
“কী বলছ বুঝতে পারছ তুমি, মর্তুজা? কীসের ভয় দেখাও আমাকে তুমি?”
” আর একটা কথা বলবে না। তুমি যা বলো আমি তাই শুনি। তাহলে আমার কথার বিপক্ষে এত কথা কেন? তাড়াতাড়ি ব্যাগ গোছাও!”
মৌলির বাহু চেপে ধরে শক্ত করে। তারপর অন্য হাতে ব্যাগ তুললো বিছানায়।
“হারি আপ! প্লিজ, ফর গডস সেক, প্লিজ!”
মর্তুজা ক্ষোভে ফেটে পড়ে হঠাৎ। মৌলি স্তব্ধ মুখে তাকিয়ে রইল। মর্তুজা অস্থির হাতে কাপড় ভরছে ব্যাগে। মৌলি ধীরে ধীরে ওর কাছে এলো। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোমার?”
“কিছু হয়নি। যা বলেছি তাই করো, দোহাই তোমার মৌলি। এ বাড়িতে দমবন্ধ হয়ে আসছে। যদি চাও আমি মরি তবে জেদ করে থাকো।”
“মর্তুজা!”
মর্তুজার যেন হুঁশ এলো। মৌলির সামনে বিস্ময়াপন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মৌলির
হাত দুটো দিয়ে নিজের দু গালে আঘাত করতে লাগল। মৌলি জড়িয়ে ধরে। পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।
“এখান থেকে চলো মৌলি। নয়ত দমবন্ধ হয়ে মরে যাব আমি। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।”
অশ্রুরুদ্ধ মর্তুজার গলা। মৌলি কোনদিকে যাবে? হামিদা যে বড়ো আশা করে বসে আছে। মর্তুজা কাঁদছে। মৌলি বিপন্ন হয়ে গেল। কী করবে? বুকে পাথর চাপা দিয়ে মৌলি সিদ্ধান্ত নেয়,
“আমি যাব তোমার সঙ্গে। আজই যাব। কিন্তু কথা দাও সত্য বলবে। সব সত্য!”
মর্তুজা কিছুই বলল না। প্যানিক অ্যাটাক হলো ওর। এ নতুন কিছু নয়। কিন্তু ওকে এই অবস্থায় দেখলে বড্ড কষ্ট হয় মৌলির। দিশেহারা মৌলির মুখখানা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভাবলো, রবিনের সঙ্গে দ্রুত কথা বলতে হবে৷
সোনা মা ও হিমু-মুমুকে বিদায় দিয়ে হামিদা পুকুরপাড়ের নির্জনে মন মরা হয়ে বসে আছে। সোনা মা ওকে নিয়ে যাবে বলেছিল। তবে আজই কেন গেল? যাওয়ার সময় একবারো জিজ্ঞেস করল না,
“সঙ্গে যাবি?”
শুধু বলেছিল,
“ভালো থাকিস। কিছু হলে জানাস আমাকে।”
চোখে পানি টলমল করছিল তার। অনেক কথা বলতে গিয়েও নির্বাক হয়ে গিয়েছিল।
দাদিজানের পঙ্গুত্ব ও পিতার অসন্তুষ্টতার কারণে হামিদা এতদিন ঢাকা যেতে চায়নি। কিন্তু দাদিজান যখন জোর করে বললেন,
“একেবারে না যা, কদিন ঘুরে আয়।”
সোনা মা ও হিমু-মুমুও খুব বলতে লাগল। ওর অসন্তুষ্ট পিতাও সেদিন বলেছিল,
“যেয়ো সঙ্গে। মাকেও সাথে নিয়ে যাব। হাওয়া বদল হয়ে এলে ভালো লাগবে।”
হামিদা পিতার মুখে আড়চোখে চেয়েছিল। অনিচ্ছা ছিল না। অসন্তোষও নয়। সুতরাং ও রাজি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওর কপাল মন্দ। সকলে ওকে রেখে চলে গেল। ওরা বোধহয় তাড়াহুড়োতে হামিদার কথা ভুলে গেছে। কিছু পথ গিয়ে যদি ফিরে আসে! হামিদা পথের দিকে তাকিয়ে রইল। উন্মুখ দৃষ্টি ক্রমশ উদাস হয়ে যায়। বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। হামিদা মিছেই আশা বেঁধেছিল মনে। আপনমনেই হাসল।
“বিকেল বেলা একলা এই নির্জনে বসে হাসছিস কেন? ভূতে-টুতে ধরল না কি?”
রবিন পেয়ারায় এক কামড় দিয়ে বলল। দাঁড়িয়েছে পাশের মেহগনি গাছটায় হেলান দিয়ে।
হামিদার গা ছুঁয়ে হিমেল বাতাস বয়ে গেল যেন।হামিদা মনের কষ্ট মনে চাপা রেখে উঠে দাঁড়ায়।
“কোথায় যাচ্ছিস?” রবিন কপাল কুঁচকালো।
“জাহান্নামে!” হামিদা নিচু গলায় বলল। রবিন এলো পিছু পিছু। হামিদা কটমট করে বলল,
“খবরদার পিছু নেবেন না!”
রবিন তবুও পিছু পিছু এলো। হামিদা জোরে জোরে পা ফেলে এগোলো। রবিনের পা লম্বা। অত জোরেও ফেলতে হলো না। হামিদা নাকের পাটা ফুলালো। তারপর ভো দৌড় দিলো ঝোপঝাড় মাড়িয়ে। ভেবেছিল রবিন পিছু নেবে না। কিন্তু রবিনও দৌড়ে পিছু ধরল। কী আশ্চর্য! মানুষ দেখছে যে।
হামিদা বাড়ির পেছন দিয়ে ঘুরে কাচারি ঘরের পেছনে লুকালো। কাচারি ঘরের পেছনে গাছ-গাছালি, ঘন ঝোপঝাড়ে ভরা। ও পাশের মাঠ দেখা যায় না তেমন৷ ভাবলো এবার রবিন ওর পিছু ছাড়বে। কিন্তু ওকে খুঁজে পেতে খুব বেশি সমস্যা হলো না রবিনের। হামিদা হাঁপাচ্ছে। ঘরের বেড়া ঘেঁষে মিশে দাঁড়ালো। রবিন পাশে এসে দাঁড়াল বুঝে এক হাত ঘোমটা তুললো।
ওর লজ্জা রবিন উপভোগ করছে। চোখে নেশা নেশা লাগে। হামিদার একটা হাত চেপে ধরে কাছে টেনে নিয়ে আসে।
“ভয় পাচ্ছিস আমাকে?” রবিনের গলার স্বর চাপা। হামিদা মিনমিনে গলায় বলল,
“জীবনেও না!”
হাত ছাড়ানো চেষ্টা বৃথা গেল। রবিন কোমর জড়িয়ে ধরে বুকের ওপর আছড়ে ফেলে কাঁধে মুখ গুঁজল। হামিদা শিউরে ওঠে, জমে যায়। ধাতস্থ হতে রবিনের বুক দু হাতে ঠেলতে থাকে। রবিন পাহাড় যেন। একচুল টলে না। বরং আরও নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে। গ্রীবাদেশ, চিবুক তারপর ঘোমটার ভেতরে গিয়ে ঠোঁটজোড়া দখল করে নেয়।
“হামিদা, অ্যাই হামিদা!”
জেবুন্নেসা ডাকছেন। হামিদার হুঁশ ফিরল। কিন্তু রবিন ছাড়ছে না।
“ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে!”
রবিন ওর ঘাড় চেপে ধরে মুখটা খুব কাছে নিয়ে এলো। পরস্পরের শ্বাস ওরা খুব অনুভব করছে। রবিন অন্য হাতে হামিদার গাল দুটো চেপে ধরে। ঠোঁট সরু হতেই কামড়ে ধরে। দাগ বসে যেতে ছাড়ল। বলল,
“আমি ছাড়া আর কার স্পর্ধা হয় তোর সর্বনাশ করে? ধ্বংস করে ফেলব না তাদের!”
জেবুন্নেসা ফের ডাকছেন। বেশি ডাকাডাকি করলে রেগে যাবেন। হামিদা রবিনের হাত কামড়ে ধরে। রবিন অপলক তাকিয়ে রইল। ব্যথা যত বাড়ল ততই দৃষ্টি বুনো হলো।
“কাচারি ঘরের পেছনে কেডা?” মর্জিনা খালা শব্দ পেয়ে এদিকেই আসছে। শুকনো লাকড়ি রাখতে এসেছিল। হামিদা ভয়ে শেষ। রবিনের হাত থেকে মুখ তুললো। দাঁতের দাগ বসে গেছে। রবিনের মধ্যে হেলদোল নেই।
“ছাড়ুন না!” হামিদা ফিসফিস করে বলল।
“তাহলে রাতে তোর আগের ঘরে আসবি বল!” রবিন শর্ত দিলো। মর্জিনা বেশিদূরে নয়। হামিদা নিরুপায় হয়ে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা!”
রবিন হাত আলগা করতে যে দেরি হামিদার দৌড়ে পালাতে সেই দেরি নেই। পেছন ফিরে মুখাভিনয় করে বলল,
“জীবনেও যাব না!”
রবিনের হাসি ক্রুর হলো। ওকে একলা এখানে দেখে মর্জিনা চোখ-মুখ কুচকে বলল,
“এই সময় এইখানে করো কী বাপজান?”
“প্রেম করি।” রবিনের সোজাসাপ্টা জবাব।
“অ্যা?” মর্জিনা এদিক-ওদিক কাওকে দেখে না। ভাবে মশকরা করছে। এই ছেলে যে বিচ্ছু। রবিন মুখখানা গম্ভীর করে বলল,
“তুমি কিন্তু ওর আর আমার মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছ, খালা। ও রেগে যাচ্ছে। পরে ক্ষতি-টথি হলে বলতে এসো না!”
মর্জিনার মুখ বদলে গেল। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে বলল,
“কী কও আবোল-তাবোল কথা! লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ়ালিমিন।”
খালা তখনই প্রস্থান করলো। রবিন কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের বেড়ায় হেলান দিয়ে। ঠোঁটের কোণে বুনো হাসি। হামিদা ওকে ফের ফাঁকি দিলো।
চলবে….
#হামিদা(৫৩)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
মোহনার পরীক্ষা চলছে। হামিদার ক্লাস আর ওর পরীক্ষার সময় আলাদা। সুতরাং হামিদাকে এই কয়েকদিন একলা যেতে আসতে হচ্ছে। একলা ঠিক নয়। রবিন প্রতিদিন ব্রিজের ওপর বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছুটির সময়। হামিদাকে দেখলে বাইকে চড়ে বসে। সামনে থেমে হুকুম করবে,
“ওঠ!”
সকলে জানে ওরা চাচাতো ভাই বোন। কিন্তু প্রতিদিন একই বাইকে আগে দেখা যায়নি ওদের। এখন সে নিয়মের ব্যতিক্রম হলে চোখে পড়বে না? বাড়িতে জানাজানি হওয়ার ঝুঁকিও আছে। রবিনের সাঙ্গ পাঙ্গ ও বন্ধুরা কিছুটা আঁচ পেয়েছিল। পাবেই বা না কেন!
রবিন আগে হামিদাকে চোখে দেখতে পারত না। হামিদাকে নিয়ে বিদ্রুপ করলে ওর এসে যেত না। আর এখন, হামিদা যেখানে ও সেখানে। হামিদাকে নিয়ে বিদ্রুপ করবে তো দূর ওর নাম মুখে নেওয়াও এদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই তো ওদের নিয়ে বন্ধুমহলে সন্দেহ দিনকে দিন ঘনীভূত হচ্ছে।
হামিদা সকলের নজর বোঝে। তাই সতর্ক হয়। মহসীন কবিরের দ্বারা প্রহারের সেই স্মৃতি দুঃস্বপ্ন হয়ে এখনও মাঝরাতে ঘুম কেড়ে নেয়। রবিন কিছু বুঝতে চায় না। ওর দৃষ্টি হামিদার দিকেই স্থির। বাকি দুনিয়ায় কী হলো সে খেয়াল হামিদাকে দেখলে থাকে না।
বেশ সময় হয়েছে। কলেজ ছুটি হওয়ার কথা আগেই। হামিদার দেখা এখনও পেল না কেন তবে রবিন!
“তোর মনে হয় আরেকটু সতর্কে প্রেম-টেম করা উচিত। গ্রামের মানুষের চোখ কিন্তু খুব তীক্ষ্ণ। কোনদিন না ধরে বসে। আর একবার কিছু রটিয়ে দিলে তোর বাপ ভূঁইয়ার কানে চলে যাবে। তখন কি হবে ভেবেছিস? সাবধান হ।” রাব্বি কাছে এসে আস্তে আস্তে বলল। একটু দূরে ওদের আরো কয়েকজন সাঙ্গ পাঙ্গ গল্প করছে।
রবিন মোবাইল থেকে চোখ তুললো। বিরক্ত মুখে তাকালো। যেন রাব্বি ইচ্ছে করে ওর মেজাজ খারাপ করে দিয়েছে। রাব্বি হাঁপ ছাড়ল। মন মেজাজ ওরও খুব ভালো নেই। ওর গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে ঠিক হয়েছে। রাব্বি বেকার। চালচুলোহীন। রবিনের আশ্বাসে পালিয়ে বিয়ের পস্তাব দিয়েছিল। মেয়েটা রাজি হয়েছিল প্রথমদিকে। এখন কেমন এড়িয়ে চলছে। কল দিলে কল ধরে না। অথচ, আগে ঘণ্টায় ঘণ্টা কথা না বললে ওর না কি দমবন্ধ হয়ে আসত। গতকাল রাতে রাব্বি কল দিয়েছিল। কিন্তু কথা আর জমেনি। মেয়েটা কাঁদছিল। ও বড়ো অসহায়। রাব্বিকে ভালোবাসে কিন্তু বাবা-মায়ের কথা অমান্য করার সাধ্য নেই। শেষ কথা ছিল,
“ক্ষমা করে দিয়ো আমাকে তুমি। ভালো থেকো।”
রাব্বির রাতে ঘুম হয় না। পুরুষ মানুষ না কি সহজে কাঁদে না। রাব্বিও তো পুরুষ। কিন্তু আজকাল একা হলেই চোখ পোড়ে, বুকে জ্বালা করে। চোখে পানি আসে। বেকারত্ব ওর প্রিয় মানুষটাকে কেঁড়ে নিলো। দোষ কি শুধুই বেকারত্বের?
“ধুর!” রবিনের রাগ ভরা গলার স্বর শুনে চকিতে তাকালো রাব্বি। রবিন বাইকের দিকে যাচ্ছে। চোয়াল কঠিন। রাব্বি গেল না। রবিন বাইকে উঠে বন্ধুর দিকে তাকালো।
“চল!”
“তুই যা। বাড়িতে কাজ আছে আমার।” বলল রাব্বি।
রবিন আরও রাগ হলো। বলল,
“কতবার বললাম চল গিয়ে তুলে নিয়ে আসি। না, তা করবে না। নীতিতে বাঁধবে ওর। নীতির গুষ্টি কিলাই। ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাঁকা হয়ে উসটা খা শালা। খবরদার, ছ্যাঁকা খাওয়ার শোক সামলাতে না পেরে মরতে যাস না যেন।”
রবিন বাইক ছুটিয়ে কলেজের দিকে গেল। রাব্বি আনত হয়ে রইল কিছুক্ষণ। মরতে সত্যি ইচ্ছে করছে। কিন্তু মরবে না। বাবা-মা বড়ো কষ্টে মানুষ করেছে ওকে। বোনটার বিয়ে দেওয়া হয়নি। রাব্বি মরলে ওরাও যে একপ্রকার মরেই যাবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির পথে রওয়ানা হলো। ঠিক তখনই পাশ দিয়ে একটা বাস গেল। রাব্বি মুখ তুলতে জানালার পাশে হামিদাকে দেখতে পায়। ওর এত দুঃখের মধ্যেও হাসি পেল। এতক্ষণে রবিনের রাগের কারণ বুঝল। ভালোই নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে ওকে হামিদা।
কলেজে হামিদা নেই। ওকে না পেয়ে রবিন সোজা বাড়িতে এলো। হামিদার ওপর রেগে আছে। কিন্তু বাড়ি এসে দেখল বাবা ডাইনিং এ বসে খাচ্ছেন। রবিন রাগ গিলে খেলো। মহসীন কবির ছেলেকে এক পলক তাকিয়ে দেখলেন। রবিন মাথা নিচু করে ঘরের দিকে যাচ্ছিল। মহসীন কবির ডাকলেন,
“শুনে যাও, রবিন!”
রবিন থমকে গেল। ওর বুকের ভেতর একটু কেঁপে উঠল বাবার গলার স্বর শুনে। সব জেনে গেল না তো!
“জি, আব্বা!” সুবোধ বালকের ন্যায় নিরাপদ দুরত্বে বাবার পাশে দাঁড়াল। জেবুন্নেসা ছেলেকে বললেন,
“বাবার পাশের চেয়ারটা টেনে বস। ডাবের পানি দিই এক গ্লাস?”
রবিন বসবে মহসীন কবির বলে উঠলেন,
“একটু বাজার গিয়ে ঘুরে এসো। কয়েকদিন জব্বার বাড়ি আসেনি। ওর খোঁজ নিয়ে এসো।”
ইলিশ মাছ রান্না হয়েছে। সঙ্গে বড়ো বড়ো ইলিশের ডিম ভুনা৷ ইলিশ মাছের ডিম রবিনের ভীষণ প্রিয় খাবার। দুপুর বেলা খিদেও পেয়েছিল। খেতে ওর বেশিক্ষণ সময় লাগে না।
“ভর দুপুর বেলা না খেয়ে যাস না। বয় দু মুঠ খেয়ে তারপর যা।” মায়েরা সন্তানের মুখ দেখলে না বলা কথা বুঝতে পারে। জেবুন্নেসাও বুঝলেন। রবিন বসতে গেলে মহসীন কবির আপত্তি করলেন,
“জোয়ান ব্যাটা ছেলে ও। এক বেলা না খেলে মরে যাবে না। দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা! জব্বারকে সাথে নিয়ে তবেই ফিরবি।”
জেবুন্নেসা মনঃক্ষুণ্ন হলেন। স্বামীকে মুখের ওপর কিছু বলতে পারেন না ভয়ে। আবার ডাক্তার বলেছেন তাকে উত্তেজিত না করতে। ছেলের শুকনো মুখ দেখে জেবুন্নেসার চোখ ছলছল করল। ডাবের পানির গ্লাস হাতে দৌড়ে দরজায় গিয়ে থামিয়ে বললেন,
“এইটুকু অন্তত খেয়ে যা, আব্বা!” রবিনের খিদে মরে গেছে। কিন্তু মাকে ফিরিয়ে দিলে কষ্ট পাবে। কাঁদবে। রবিন এক ঢোকে সবটা পান করে এক মুহূর্ত বাড়িতে আর দাঁড়ালো না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। জব্বারকে খুঁজে পাওয়া গেল। বাজারের এককোণে বটতলায় শুয়ে আছে। রবিন কাছে গিয়ে গা স্পর্শ করতে টের পেল জ্বরে কাঁপছে।
“জব্বার চাচা, ও জব্বার চাচা!”
“কে? বাজান?” জব্বারের গলা স্বর কাঁপছে। চোখ মেলে তাকাতে পারছে না।
“হ্যাঁ, আমি। জ্বরে দেখি কাঁপছ রীতিমতো। বাড়ি যাওনি কেন?”
“কোন মুখে যাব গো, বাজান। কী জবাব দেবো?”
রবিন টেনে তুললো। জব্বারের কথা বুঝে ওঠার আগেই বাজারের মাঝে হট্টগোল শোনা গেল। পরিচিত একটা ছেলে ওকে দেখে দৌড়ে এলো। চোখে-মুখে আতঙ্ক।
“গুরু, অলিকে সরোয়ারের পোলাপান বেদম মারছে।”
জব্বারকে ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“হাসপাতালে নিয়ে যা কাকাকে। আমি দেখছি!”
রবিন হনহনিয়ে ভিড়ের কাছে গেল। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখল অলিকে মোটা লাঠি দিয়ে বেদম পেটাচ্ছে চারজন যুবক ছেলে। ওদের মুখ কাপড়ে বাঁধা। চেনার উপায় নেই। অলির নাক-মুখ ফেটে রক্ত পড়ছে। এত মানুষ অথচ, কেউ সাহস করে এগিয়ে আসছে না। রবিন দেখল একটা ছেলে লুকিয়ে ছুরি বের করল। অলিকে আঘাত করতে উদ্যোত হয়। তার আগেই রবিন ছুটে গিয়ে ছুরি হাতের ছেলেটার বুক বরাবর লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। খসে পড়ল ছুরিটা। রবিন লুফে নিলো। উপস্থিত সকলে বিস্মিত। কী সাহস চেয়ারম্যানের ছোটো ছেলেটার!
অলি মার খেয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। ছেলেগুলো ওকে ছেড়ে রবিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ওরাও অবাক হয়েছে। ওদের চোখ দেখে চিনে ফেললো রবিন। ছুরি তুলে কাছে গেল। একজন এগিয়ে এলো আক্রমণ করতে। রবিন মুষ্টি বদ্ধ হাতটা চেপে ধরে অন্য হাতে। ঘুরে গলা জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বলল,
“তোকে কিন্তু চিনেছি আমি পলাশ।”
ছেলেটা জমে গেল। ঘাবড়ে গিয়ে হুমকি দিয়ে বলল,
“সরোয়ার ভাই শুনলে ছাড়বে না তোকে, রবিন।”
“সে আমি দেখে নেবো। এখন চুপচাপ এখান থেকে যা। নয়ত গণধোলাই দিয়ে কবরে পাঠিয়ে দেবো। আমাকে চিনিস তো, না?”
পলাশকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। রাগ ও ভয় ওদের চোখে। রবিন নির্ভয়ে, বুক টান করে দাঁড়িয়ে রইল। পলাশ এগিয়ে আসার সাহস করে না। ইশারায় ছেলেগুলোকে পিছিয়ে যেতে বলল। তারপর বাজারের ভেতর কোথাও মিলিয়ে গেল।
অলির অবস্থা গুরুতর। রবিনসহ আরও কয়েকজনে মিলে অলিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ইতোমধ্যে বাজারে রবিনের সাহসের বাহাবা ভেসে বেড়ালো। সকলে বলল,
“চেয়ারম্যানের ছেলের সাহস আছে বটে! বাঘের বাচ্চা!”
ক্লান্ত শ্রান্ত রবিন বাড়ি ফিরল রাতে। অলির রক্ত লেগে আছে শার্টে। এই অবস্থায় বাড়িতে কেউ দেখলে ঝামেলা হবে। ও কলপাড়ে ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকবে তখনই জুবিন বেরিয়ে এলো। ওর শার্টে রক্ত দেখে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“কাকে মার্ডার করে এসেছিস তুই, রবিন?”
“চুপ কর। কাওকে মার্ডার টাডার করিনি। বিস্তারিত শুনতে চাইলে ঘরে আয়।”
রবিন দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো। জুবিন ইতস্তত করল। তারপর ঢুকলো। দরজা বন্ধ করল ভেতর থেকে। মা রবিনকে এভাবে দেখলে চিন্তা করবে। ঘরের ভেতর দেখল। একটুও বদলায়নি ঘরটা। ঠিক রবিনের মতো অগোছালো, ছন্নছাড়া রয়ে গেছে।
“সরোয়ারের গুন্ডাপান্ডা অলিকে পিটিয়েছে বাজারে আজ।….. ”
ভাইকে অলি ও সরোয়ারের ঝামেলা নিয়ে বলতে লাগল রবিন। অলি এখন হাসপাতালে। ডাক্তার বলেছেন এখনও ঝুঁকিতে আছে ও। রাব্বি ও শাহিনকে রেখে এসেছে রবিন। অলির বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে। ওরাও বোধহয় এতক্ষণে পৌঁছে গেছে। রবিন সকালে আরেকবার যাবে দেখে আসতে৷ তার আগে সরোয়ারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওর বাবার কান পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই।
সব শুনে জুবিনের মুখ ভার হয়ে গেল। আকাশ ওর কত ভালো বন্ধু ছিল। জুবিন বন্ধু হিসেবে কী করতে পারল? এতদিন পর রবিনের ওপর ওর রাগ হলো না৷ মনে হলো রবিন ঠিক করছে। এমনই করা উচিত।
রবিন একটানে শার্ট খুলে ফেললো। আলমারিতে আরেকটি শার্ট খুঁজতে লাগল। হাতের কাছে পেয়েও গেল। কিন্তু কী ভেবে সব কাপড় মেঝেতে ফেললো। জুবিন ভুরু কুঁচকে দেখে গেল। রবিনের গা ম্যাজম্যাজ করছে। রক্ত লেগে শুকিয়ে আছে। গোসল না করলেই নয়। কিন্তু তার আগে বাবার সঙ্গে কথা বলে আসতে হবে। জুবিন ঘরে গেল। রবিন ওর বাবার অফিস ঘরের দরজায় টোকা দিলো।
“এসো!” ভেতর থেকে রাশভারি গলায় বললেন মহসীন কবির ভূঁইয়া। রবিন আনত মুখে গিয়ে দাঁড়াল।
“জব্বার চাচাকে পেয়েছি। জ্বরের চোটে বাজারের বটগাছের নিচে শুয়ে কাঁপছিল। আমি ধরে হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছি।”
মহসীন কবির বিচলিত হলেন না মোটেও। তবে মুখে আঁধার পড়ল। মায়া-দয়া ভেতরে খুব একটা নেই তার। মর্তুজা তার অনুজ। তবুও ওর প্রতি করুণা হয়নি কখনো। কিন্তু এত বছর ছায়া হয়ে ছিল জব্বার। জব্বার তাই বিশেষ মহসীন কবিরের কাছে। ভাইয়ের সমতুল্য। তাই তো করুণা হলো। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা জব্বারকে এখন তার ভীষণ দরকার। তার ঘরের শত্রু বিভীষণকে খুঁজে বের করতে হবে না? বললেন,
“কাল গিয়ে দেখে এসো আরেকবার। সুস্থ হলেই আমার কথা বলবে। বলবে ওকে বাড়িতে আসতে বলেছি আমি।”
“ঠিক আছে, বলব।”
তারপর ইতস্তত করে বলল,
“আব্বা, যাব?” অনুমতি চাইল রবিন। মহসীন কবির কাগজ উলটে পালটে বললেন,
“খেয়েছ কিছু?”
“হ্যাঁ!” মিথ্যা বলল রবিন। মহসীন কবির বললেন,
“আচ্ছা যাও।”
রবিন হাঁপ ছাড়ল। দাদিজানের দরজার দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে থেমে গেল। জেবুন্নেসা রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। রবিন গলা তুলে ডাকল,
“মা, হামিদাকে বলো কল চেপে পানি ভরে দিয়ে যেতে! গোসল করব।”
জেবুন্নেসা এগিয়ে এলেন। না খেয়ে সারাদিন রোদে পুড়ে রবিনের শ্যামলা মুখখানা কালো মেঘের মতো হয়ে গেছে। ছেলের মুখটা ওড়নার আঁচলে মুছে দিয়ে বললেন,
“গোসল পরে করিস। সারাদিন কিছু খাসনি। কিছু খেয়ে নে আগে, আব্বা!”
“না, এই ময়লা শরীরে খেতে পারব না। তুমি ওকে ডাকো তো!”
রবিন মেলে দেওয়া গামছা গলায় ঝুলিয়ে কলপাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। জেবুন্নেসা হামিদাকে ডাকলেন। হামিদা কি আর ওই ডাক উপেক্ষা করতে পারে। হনুফা বেগম রবিনের গলা শুনেছেন। তার নাতনি একরোখা। এত যে বুঝাচ্ছেন,
” রবিনকে হেলা করিস, ও যা বলে শোন রে বুবু। স্বামীর কথা না শুনলে পাপ হবে।”
হামিদা মুখ ঘুরিয়ে নেবে। দাদিজানের ওপর রাগ করবে। রবিনের পক্ষে কথা বলল কেন! হামিদা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। হনুফা বেগম আজ আর কাজে যেতে বাধা দিলেন না। ও তো আর ভূঁইয়া বাড়ির কাজে যাচ্ছে না বরং ওর নিজের স্বামীর সেবা করতে যাচ্ছে। হনুফা বেগমের বুকের ভেতর প্রশান্তি বয়ে যায়। এত বছরের স্বপ্ন তার পূরণ হয়ে গেছে। হামিদা এ বাড়ির বউ এখন।
হামিদা গাল ফুলিয়ে কলপাড়ে এলো। মাথার ওড়নায় মুখ ঢেকে আছে। জেবুন্নেসা রান্না ঘরে গেলেন ছেলের জন্য খাবার গরম করতে। আশেপাশে কেউ নেই। রবিন শার্ট টেনে খুলে ভরা বালতিতে ফেললো। গামছা কোমরে বাঁধল।
হামিদা হাত থামিয়েছে কলের হাতলে। রাগ উঠল। এত পানিতে এই একটা শার্ট ফেললো রবিন! অপচয় হলো না? কিন্তু দু কথা বলল না। চুপচাপ শার্টটা তুলে নিয়ে সাবান দিলো। ধুপধাপ কয়েকবার ফেলে পরিষ্কার করে আবার ওই পানিতে ডুবালো। পানিটা ফেলে দিয়ে ফের কল চাপতে লাগল। রবিনের আর ধৈর্যে কুলায় না৷ খপ করে ধরে হামিদার ঘাড়।
“কী করছেন? ছাড়ুন!” হামিদা মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে।
“ওহ, ওয়াও! বোবার মুখে কথা ফুটল তাহলে!”
রবিন শ্লেষ করে ঘাড় ধরে পুরোনো ঘরটার দিকে টেনে নিয়ে এলো। এদিকে আবছা আলো৷ রবিন ঘরে ঢুকলো না। ঝোপঝাড় মাড়িয়ে ঘরের আড়ালে নিয়ে এলো। হামিদার বুক কাঁপছে। অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেন? কী করবে?
“আমি চিৎকার করব কিন্তু। ছেড়ে দিন।”
রবিন ঘাড় ছেড়ে দেয়। হামিদা পালিয়ে যাবে তখনই আবার বাহুবন্ধনে টেনে নিলো। শক্ত করে ধরল। হামিদার মুখ চাপা পড়ল রবিনের ঘামে ভেজা লোমশ বুকে। রবিন হাঁপাতে হাঁপাতে শান্ত হলো। কিছুক্ষণ হাত পা ছুঁড়ে হামিদাও শান্ত হয়ে যায়। শুনতে পেল রবিনের হৃৎস্পন্দনের শব্দ।আস্তে আস্তে সামান্য ঢিলে করল বন্ধন রবিন।
মাথার ওপর বিমূর্ত চাঁদ। চারপাশে ঝিঁঝি পোকা ডেকে যাচ্ছে। লতার মতো জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো দেহের চারিদিকে টিমটিম করে জ্বলছে জোনাকি।
“শুনছেন!” হামিদা শান্ত এবং চাপা স্বরে ডাকল। রবিন প্রথমে সাড়া নিলো না। ওর চোখ বন্ধ। হামিদা আবার ডাকল।
“এই শুনছেন!”
“বল!” রবিনের গলার স্বর ভরাট। হামিদা মিনমিনে গলায় বলল,
“ফিরে চলুন। বড়ো মা আপনাকে খুঁজতে আসল বলে।”
রবিনের মধ্যে তাড়া দেখা গেল না। বলল,
“কলেজ গিয়ে তোকে পাইনি আমি! কেন?”
“খুঁজতে গিয়েছিলেন না কি?” হামিদা অবাক হলো৷ রবিন সে জবাব দেবে না। বলল,
“কথা ঘুরাস না। যা বলছি চুপচাপ জবাব দে।”
“বাসে করে এসেছিলাম।”
“কেন?”
“ইচ্ছে হয়েছিল তাই।”
রবিন বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত করে কাঁধ চেপে ধরে,
“ইচ্ছে হয়েছিল তাই! বাহ! এখন আমার ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে তোর সঙ্গে বাসর করি। করব?”
হামিদার গাল ও কান লাল হয়ে গেল,
“ছি! কী বলছেন।”
“ছি বলছিস কেন? এতদিন বিয়ে হলো। এখন বাসর করতে রাজি না হলে কবে হবি, পরকালে?”
“আপনি পাগল হয়ে গেছেন!”
হামিদা রবিনের বুকে ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে পালাতে গেল। রবিন টেনে ধরে ওর বিনুনি। হামিদা এই চুল কাটবেই কাটবে!
রবিন বিনুনিটা হাতের সঙ্গে পেঁচাতে পেঁচাতে কাছে এলো। হামিদার বুক ধুকপুক করছে। হাত-পা জমে যায়। রবিন সামনে এসে দাঁড়ায়। ওড়না টেনে নিচে ফেলে। হামিদা বিস্ময়াপন্ন। দু হাতে বুক ঢাকলো। গলা শুকিয়ে এলো,
“দোহাই আপনার। আজ নয়। এখানে নয়।”
রবিন বুনো, বেপরোয়া। হামিদার গলা চেপে ধরে। খুব জোরে নয়। তবুও নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো হামিদার।
“আজ নয়, এখানে নয়! তবে কবে, কোথায় হামিদা? আমার ধৈর্য কুলায় না যে আর। বল, বল!”
হামিদা আমতা আমতা করে। ওর শব্দ ও বাক্য এলোমেলো হয়ে গেল। কী বলবে? কীভাবে বলবে? কিন্তু রবিন নাছোড়বান্দা। হামিদা হয় আজ দিনক্ষণ দেবে নয়ত চুপচাপ মেনে নেবে। হামিদা চুপচাপ মেনে নেওয়ার পক্ষে নয়।
“তারপরে মুক্তি দেবেন তো?”
রবিন ভুরু কুঁচকালো৷ মুক্তি! কীসের মুক্তি? কিন্তু গা ছমছমে হেসে বলল,
“হ্যাঁ। এবার বল।”
এত সহজে মেনে গেল রবিন! একদিকে খুশি হলো হামিদা। অন্য দিকে জমে গেল। কোনো রকমে বলল,
“দূরে কোথাও।”
হামিদা দৌড়ে পালাতে গেল। রবিন হাত ধরে,
“কবে?”
হামিদার মাথার ভেতর সব বিক্ষিপ্ত। পারলে বলে, কোনোদিন না। কিন্তু তা বললে মুক্তি হবে না।
“একসপ্তাহ পরে!”
হামিদা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে পালালো। কলপাড়ে আসতে জেবুন্নেসার সঙ্গে ধাক্কা খায়। ভয়ে জমে গেল। জেবুন্নেসা আর্তচিৎকার করে ওঠেন,
“আল্লাহ গো, চোখের মাথা খেয়েছিস? ওমন দৌড়ে এলি কোথা থেকে?”
হামিদা হাঁপাচ্ছে। ধাতস্থ হতে কিছু না বলে দাদিজানের ঘরে ঢুকে গেল। জেবুন্নেসা নাক-মুখ কুঁচকে বললেন,
“জ্বিনে ধরল না কি!”
“মা!” রবিন এগিয়ে এলো অন্ধকার ছেড়ে। জেবুন্নেসা ভয় পেলেন। বুকে থু থু দিলেন। ছেলের পিঠে মৃদু চড় দিয়ে বললেন,
“ভয় পেয়েছি না! পাঁজি ছেলে একটা। গোসল করিসনি দেখি। হামিদা পালিয়ে গে..!”
জেবুন্নেসা চমকে তাকালেন। রবিন যেদিক থেকে এলো, সেদিক থেকে হামিদাও হাঁপাতে হাঁপাতে এসেছে। মায়ের সন্দেহ ভরা চোখে তাকিয়ে রবিন হাসল। গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“বলেছিলাম না ওকে শিক্ষা দেবো। তাই দিয়েছি। জানো মা, কী যে ভয় পেয়েছে!”
রবিন হাসতে হাসতে কলপাড়ে গেল। মগে পানি তুলে ঢালতে লাগল গায়ে৷ জেবুন্নেসার ভয় কাটল। কিন্তু কপালের কুঞ্চন কিছুতেই গেল না। বললেন,
“ওর থেকে দূরে থাকিস। যুবতি হয়েছে। মানুষের চোখে পড়লে কথা রটবে। আমার তা সহ্য হবে না। শুনেছিস, আব্বা? খবরদার হামিদার কাছ ঘেঁষবি না৷”
রবিন মাথা নাড়ায়। মুখে কিছু বলে না। অনবরত পানি ঢালছে মাথায়, সারা গায়ে। ওর কানে বাজতে লাগল,
“এক সপ্তাহ! এক সপ্তাহ।”
চলবে….
#হামিদা(৫৪)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ
সোনা মায়ের সঙ্গে আগের মতো আর কথা বলে না হামিদা। ওর ভারি অভিমান জমেছে মনে। সেই অভিমানের আড়ালে লুকিয়ে রয়, নিজেকে আত্মগোপন করতে চায়। মৌলি সব বোঝে। কিন্তু বুঝেও সে হামিদার মান ভাঙাতে এ বাড়ি আসতে পারে না৷ একদিকে স্বামীর সম্মান, মহসীন কবিরের ভয় আর অন্য দিকে মেয়ের অভিমান। উভয়সংকটে পড়েছে মৌলি। চেষ্টা করছে কোনো ভাবে সংকটটা যদি কাটানো যায়। ততদিন রবিনই ভরসা।
এবার রবিনকে দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছে মৌলি৷ না, ওর দৈহিক গড়নে পরিবর্তন আসেনি। ওর চাল-চলনও সভ্য হয়নি। কিন্তু হামিদার প্রতি ওর দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। যে চোখজোড়া আগে ভূঁইয়াদের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়ে হামিদাকে ছোটো করত। এবারও সে চোখজোড়ায় গৌরব ছিল, কিন্তু হামিদা সেই গৌরবের একাংশ হয়ে গিয়েছিল।
রবিন যখন বিয়ের কথাটা জানালো মৌলি ভয় পেয়েছিল। বিপক্ষে গিয়েছিল। কিন্তু রবিন কী কৌশলেই না ওকে মানিয়ে নিয়েছে। এমনইভাবে আশ্বস্ত করেছে যে মৌলি ওকে বিশ্বাস করে হামিদার দায়িত্ব দিয়ে এসেছে। রবিন সে বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে মৌলি কী করবে!
“ও পারবে। অবশ্যই পারবে!” মৌলি ইতিবাচক ভাবে। মনকে বুঝায়, রবিন ওর বাপের মতো নয়। মায়ের মতোও হবে না। ও হামিদাকে আগলে রাখবে। ও বাড়িতে হামিদাকে পুত্রবধূ হিসেবে যদি কেউ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তবে সে এই রবিন। নয়ত..
মৌলি কাজে মনোযোগ দেয়। হাত কেপে চা পড়ে গেল। আলু কাটতে গিয়ে হাত কাটলো। মন বড়ো শঙ্কিত। কিন্তু মনকে বারংবার বুঝ দিলো,
“রবিন পারবে। হামিদাকে আগলে রাখবে ও।”
জব্বার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। আরমান (ধর্মীয় কারণে রাব্বি নামটা পরিবর্তন করা হলো) ও কিছু সাঙ্গ পাঙ্গদের নজর রাখতে বলেছে রবিন। মহসীন কবির ভূঁইয়া বড়ো চতুর লোক। তার চোখ এড়িয়ে যাওয়া এত সহজ নয়। বাইরের কেউ হলে এতদিনে জব্বার ধরে ফেলতে পারত। কিন্তু রবিন তার আপন সন্তান। চতুর ও নিজেও কম নয়। জব্বারের সঙ্গে আজ-কাল ওর গলায় গলায় ভাব। সদা সতর্ক থাকছে জব্বারের সকল কাজ-কর্মে। ফাঁকি দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই ধরা পড়া যাবে না। অন্তত এ বছরটা নয়।
“মা, মা!” ঘরে এসে ডাক ছাড়ল রবিন। সকাল গড়িয়ে গেছে। ও পাড়ায় নেমন্তন্ন আছে জেবুন্নেসার। মর্জিনা শাড়ি পরতে সাহায্য করছিল। ছেলের ডাক শুনে নিজের ঘর থেকেই জবাব দিলেন,
“বল?”
“আমার আলমারি কী অগোছালো দেখেছ? একটা শার্ট ইস্ত্রি নেই। এখন কী পরব আমি? মেজাজ খারাপ হয় কি না!” রবিন রাগ গলায় বলল। জেবুন্নেসা মর্জিনার দিকে তাকালেন। ও এখন রবিনের আলমারি গোছাতে গেলে তিনি তৈরি হবেন কার সাহায্য নিয়ে?
“হামিদারে ডাকতে কন!” মর্জিনা পরামর্শ দিলো। ওই মেয়েটা তার ছেলেদের ঘরে প্রবেশ করুক সেটা জেবুন্নেসা পছন্দ করেন না। পরামর্শ নাকচ করলেন সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু রবিন চেঁচাচেচি করছে। ঘরের ভেতর শব্দ করে কিছু ফেলছে। মর্জিনা এখন ও ঘরে গেলে তার বড়ো সমস্যা হয়ে যায়। সুতরাং হাঁপ ছেড়ে বললেন,
“হামিদাকে ডাক। বল আলমারি গুছিয়ে শার্টগুলো ইস্ত্রি করে দিতে।”
তারপর ঠোঁটের কোণায় এসে গিয়েছিল,
“দরজা খোলা রাখিস, আব্বা!”
ঠোঁট আলগা করে কথাটা আর প্রকাশ করলেন না। ছেলে যদি কিছু মনে করে। মনে যা আছে তা ছেলেদের সামনে প্রকাশ করা উচিত হবে না। তাছাড়া ছেলেকে বিশ্বাস করেন তিনি। ও কোনোদিন হামিদার প্রতি আকৃষ্ট হবে না। হামিদাকে তো দু চোখে দেখতেই পারে না।
জেবুন্নেসা দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে সাজগোজে মনোনিবেশ করলেন। রবিনের ওপর তার খুব আস্থা।
মায়ের হুকুম জানাতে রবিন এসে দাঁড়ায় দাদিজানের দরজায়। দু’হাত বুকে ভাঁজ করে রাশভারি গলায় ডাকল,
“হামিদা, অ্যাই হামিদা, শুনে যা!”
হামিদা এসে দাঁড়ায় দরজার পাশে৷ দৃষ্টি মেঝেতে। চুল ভেজা৷ গোসল করেছে বোধহয় একটু আগে৷ পেছনে বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছে দাদিজান। রবিনের কণ্ঠ শুনে কানা খাড়া করলেন। হামিদা ওড়না মাথায় টেনে বলল,
“বলেন!”
“আমার ঘরে আয়!”
হামিদা চমকে ওঠে। এদিক-ওদিক তাকালো। রবিনের মুখের ভাব নির্বিকার। ফিরে সামনে পা ফেলতে হামিদা বলল,
“আমি যাব না!”
রবিন ঘাড়ের ওপর থেকে তাকালো। তারপর হামিদাকে অবাক করে দিয়ে গলা তুলে চিৎকার করল,
“মা, হামিদা কাজ করতে পারবে না বলছে।”
ও ঘর থেকে জেবুন্নেসা চেঁচিয়ে উঠলেন,
“কী রে হামিদা, তুই আমার কথা অমান্য করিস? এত সাহস তোর! তাড়াতাড়ি রবিনের ঘরে গিয়ে আলমারি গুছিয়ে দে বলছি! ও যা বলে চুপচাপ শোন!”
হামিদা ভয় পেয়ে গেল। রবিনের দৃষ্টি কুটিল। যেন বলছে,
“আর বলবি, না!”
হামিদা কটমট করে তাকালো। বলল,
“যাচ্ছি আমি।”
রবিনের আগে আগে হাঁটছে। রবিন মনে মনে হাসল। মাকে বলল,
“হামিদা কাজ করতে যাচ্ছে এখন, মা।”
জেবুন্নেসা কিছু বললেন। রবিনের কানে এলো না স্পষ্ট। সকল মনোযোগ ওর দরজায় দাঁড়ানো হামিদার দিকে। হামিদা গাল ফুলিয়ে দেখল আরেকবার। তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।
হামিদা কাপড় ভাঁজ করছিল। দরজা বন্ধের শব্দ পেয়ে থমকে গেল। কিন্তু পেছনে তাকালো না। রবিন বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পড়েছে। পা দুটো হামিদার দিকে।
এ ঘরে পূর্বে অনেকবার এসেছে হামিদা। কিন্তু আজ ওর ভিন্ন অনুভূতি হচ্ছে। তারপর রবিন আর ও একা এ ঘরে। হামিদার হাত কাঁপল। বুক কাঁপল। তাড়াতাড়ি কাজ করতে লাগল। কিন্তু টের পেল রবিনের বুনো দৃষ্টি ওর দিকে স্থির।
“মুভি দেখবি, হামিদা?” নীরবতা ভেঙে বলল রবিন। হামিদা ভুরু কুঁচকে ফেলে। ছোট্ট করে বলল,
“না!”
“দারুণ মুভি। আয় একসঙ্গে দেখি।”
“না, দেখব না।”
রবিন হাঁপ ছাড়ল। মোবাইল টেনে আনল টেবিলের ওপর থেকে। এমন সময় দরজায় এসে দাঁড়ালেন জেবুন্নেসা। শাড়ি পরে সুন্দর করে সেজেছেন।হামিদা ও রবিনের দুরত্ব দেখে সন্তুষ্ট হলেন। ছেলেকে প্রসন্ন গলায় বললেন,
“আমি একটু ও পাড়ায় যাচ্ছি, আব্বা। বাড়ির দিকে খেয়াল রাখিস৷”
রবিন মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা!”
জেবুন্নেসা হামিদার দিকে কড়া চোখে তাকালেন। বললেন,
“মর্জিনাকে নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে করে। ফিরতে দেরি হলে রাতে ভাত-তরকারি রান্না করে রাখিস। জিজ্ঞেস করিস, কে কী খাবে!”
“জি, বড়ো মা!”
রবিন দেখল আড়চোখে ওর মুখ। জেবুন্নেসা মর্জিনাকে সঙ্গে করে চলে গেলেন। বাড়ির সদর দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল রবিন। তারপর উঠে দাঁড়ায়। একটানে শার্ট খুলে ফেলে। এগিয়ে এসে হামিদার হাত টেনে ধরে বিছানায় বসালো।
“কী করছেন?” হামিদা আঁতকে উঠল। দৃষ্টি রবিনের নগ্ন বুক ছাড়া সবখানে। রবিন ওপাশে গিয়ে বসল।
“এখন কিছু করব না। এক সপ্তাহ পরে যা করার করব।”
আধশোয়া হয়ে বলল,
“আরেকটু কাছে এসে বস। কথা দিচ্ছি কিছু করব না। ভয় পাস না। আয়!”
হামিদা কি আর শোনে! রবিন টেনে ধরে পাশে বসালো। তারপর মোবাইল স্ক্রল করতে করতে বলল,
“মুভি পরে দেখি। চল গান শুনি আগে। রোমান্টিক গান।”
“আমি কিছু শুনব না। আলমারি গুছানো শেষ হয়নি আমার। বড়ো মা বকবে। যেতে দিন।” হামিদা বড়ো অসহায় মুখে বলল। রবিন উপেক্ষা করল সে কথা। এক হাতে জড়িয়ে ধরে ওকে নিবিড়ভাবে কাছে টানলো। চাপা স্বরে বলল,
“তুই বড়ো আনরোমান্টিক রে, হামিদা। এত আনরোমান্টিক বউ নিয়ে ইহকাল পরকালে চলব কী করে?”
“হুঁ! যান না, তাহলে রোমান্টিক কাউকে বউ বানান গিয়ে। ট্রেনের গতিতে চলবে তখন!”
ওর বাহুর মাঝে ছটফট করে হামিদা। রবিন আরও শক্ত করে বুকের কাছে টেনে আনল,
“অন্য কাউকে বউ বানালে হিংসে হবে না তোর?”
“একটুও না। উলটো খুশিতে মসজিদে একশ টাকা দেবো আমি। দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করব,’বড়ো বাঁচা বাঁচিয়েছ, মাবুদ!”
রবিন হঠাৎই গম্ভীর হয়ে গেল। হামিদা জিহবা কামড়ায়। একটু বেশি বলে ফেলেছে বোধহয়। রবিন ওর ঘাড় চেপে ধরে মুখের কাছে নিয়ে এলো,
“দেওয়াচ্ছি তোকে মসজিদে একশ টাকা।”
হামিদার ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন করল। শ্বাসরুদ্ধ হতে ছেড়ে দেয়। কপালে কপাল রেখে বলে,
“তোকেই চাই আমার। আনরোমান্টিক হয়েছিস তাতে কী! আমি তোকে রোমান্টিক বউ বানিয়ে ছাড়ব। তোর শিরায় শিরায় প্রবেশ করিয়ে দেবো রোমান্স। লেডি ইমরান হাশমি হবি আমার জন্য তুই।”
হামিদা নাক কুঁচকাতে রবিন হাসল। তারপর আবার ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“ইমরান হাশমির অভিনীত গান শুনি চল। তারপর মুভিও দেখব।”
মুহূর্তে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ইমরান হাশমির রোমান্টিক সব দৃশ্যসম্বলিত গান। হামিদা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলে রবিনের বুকে। রবিন শব্দ করে হাসে। মোবাইল পাশে রেখে হামিদাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। হামিদার বুক কাঁপছে।
“ছাড়ুন, দরজা খোলা। কেউ দেখে ফেলতে পারে!”
রবিন শুনলো না। বাড়িতে তখন জুবিন আর দাদিজান ছাড়া কেউ নেই। ভয় আর কীসের রবিনের! হামিদাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। হামিদা চুলে শ্যাম্পু করেছে। কী সুঘ্রাণ! হামিদার ওড়নাটা বড়ো বিরক্ত করছে। সুতরাং টেনে মেঝেতে ফেললো। আঁতকে উঠল হামিদা। ছটফট করল। রবিন মুখ গুঁজে দিলো ঘাড়ে। কী কোমল আর সুগন্ধযুক্ত ওর ত্বক। গোলাপের ন্যায়। বেশ কিছুক্ষণ ছটফট করে ক্লান্ত হয়ে গেল হামিদা। শান্ত হয়ে বলল,
“কেউ দেখে ফেললে কিন্তু সর্বনাশ হবে!”
রবিনের বড্ড ঘুম ঘুম পাচ্ছে। অস্ফুটে বলল,
“উঁহু! এক সপ্তাহ তাড়াতাড়ি না এলে বরং আমার সর্বনাশ হবে।”
চলবে….

