Home "ধারাবাহিক গল্প হামিদা হামিদা পর্ব-৫৫+৫৬+৫৭

হামিদা পর্ব-৫৫+৫৬+৫৭

0
392

#হামিদা(৫৫)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

জব্বার গোপন সূত্রে খোঁজ পেয়ে ও পাড়ার মসজিদের ইমামের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে রবিন পথ আটকালো।

“কই যাও, জব্বার কাকা?”

জব্বার একটু থেমে বলল,

“যাই ও পাড়া কাজে। কিছু কইবা, বাজান?”

“না, কিছু না।”
রবিনের চোখের পাতা মৃদু কাঁপল। চোয়াল সামান্য কঠিন হলো৷ যেন না চাইতেই। হেসে গদগদকণ্ঠে বলল,

“বাইকে ওঠো, নিয়ে যাই তোমাকে। বয়স হইছে না? এখন অত হাঁটাহাঁটি করলে কোমর বা হাঁটু নড়বড়ে হয়ে যাবে! ওঠো, ওঠো!”

জব্বারের ভারি ভালো লাগল। রবিন যে এতটুকু ভাবলো তার জন্য এতেই তার মন গলে গেল। উঠে বসল ওর পেছনে। কিছুদূর গিয়ে রবিন জিজ্ঞাসা করল,

“কী কাজে যাচ্ছ ও পাড়ায়?”

জব্বার রবিনকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। বলল,

“তোমাকে বলেছিলাম না হামিদার ব্যাপারে?”

“কোনটা? ওই যে কে যেন ওকে পালাতে সাহায্য করল! সেই কালপিটটার খোঁজ পেয়েছ না কি?” বলল রবিন। জব্বার হাঁপ ছাড়ল,

“পেয়েছি বৈ কী! ব্যাটা বড্ড ধুরন্ধর! বার বার মুঠ পিছলে বেরিয়ে যায়।”

রবিন গোপনে কুটিল হাসল। বলল,

“ছাই দিয়ে ধরবে। পিছলে যাওয়ার চান্স নেই।”

জব্বার হাসল। তার মনটা আনচান করে। এতদূর খোঁজ খবর করে সে বুঝে গেছে, হামিদার পেছনের ছায়াটা কাছেরই কেউ হবে। বড়ো গুটিবাজ, ধুরন্ধর সে! নয়ত জব্বার বা মহসীনের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে বার বার জিতে যেতে পারত না। এতদিন লাগত না ওর খোঁজ পেতে। কী সাংঘাতিক সাহসী আর ধূর্ত! যতবার জব্বার ভেবেছে এই তো এক্ষুনি খপ করে ধরবে, ততবারই শূন্য ধরেছে। অথচ, বাড়ির কাওকে সন্দেহ করতে গেলেই গুলিয়ে যায়।

কিন্তু আজ ওর নিস্তার নেই। আজ জব্বার ধরবেই।
ওইতো সামনে মসজিদ দেখা যায়।

হেলমেট পরিহিত রবিনকে দেখতে লাগল জব্বার। সন্দেহ একবার ওর ওপর হয় আবার হয় না। হামিদাকে এ ছেলে মোটে দেখতে পারে না। এ কেন সাহায্য করবে! সেটাও আবার বাপের মান ইজ্জত দফারফা করে। মহসীন কবির কতটা নির্মম লোক তা কি ওর জানা নেই!

“না, রবিন হবে না। তবে কে?”

রবিনের বুক কাঁপছে। মনোযোগ ঠিক রাখতে পারছে না। সামনে আগত বাসটাকে পাশ কাটাতে গিয়ে বাইকের হাতল শক্ত করে ধরল রবিন। কাত করতে গেল। স্পিডোমিটারে গতি ৫০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই গ্রাম্য পথে এত গতি কেন দিয়েছিল ও। জব্বার বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। ছিটকে পাশ্ববর্তী খালে পড়ে গেল।

রবিন বেজায় চোট পেয়েছে। প্যান্টের একেপাশে কিছুটা ছিঁড়ে রক্তে ভিজে আছে। কনুই ও হাতে আচরের মতো লেগেছে। এত শখের বাইকটা রাস্তায় ওভাবে ফেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে খালের পাড়ে গেল।

“জব্বার কাকা, জব্বার কাকা!”

জব্বারের পুরোনো হাড়। ওভাবে খালে পড়ে বেজায় ব্যথা পেয়েছে। রবিনের ডাকে আশপাশ থেকে কয়েকজন এগিয়ে এলো। ধরাধরি করে সকলে জব্বারকে কাঁদা পানি থেকে তুলে আনলো উপরে। জব্বার বেহুঁশের মতো শরীর ছেড়ে দিয়েছে। এত শক্ত পোক্ত শরীরটা কদিন ধরে জ্বরে কাহিল ছিল। এজন্য এইটুকু ধাক্কা সহ্য করতে পারেনি।

সকলে ভ্যানে করে তখনই হাসপাতালে নিয়ে গেল। রবিন বাইক তুলবে সেই মুহূর্তে আরমান(পূর্বে রাব্বি) এলো। হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। যেন প্রাণ মুঠোয় নিয়ে এতদূর এসেছে। রাস্তায় তখন তেমন কেউ ছিল না। জব্বারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় কমেছে। আরমান রবিনের বাহু চেপে ধরল। চাপা স্বরে বলল,

“এত নিচে নামতে পারলি তুই? মানুষটাকে সত্য জানতে দিবি না ঠিক আছে। কিন্তু তাকে মেরে ফেলতে চাইবি? রবিন, এ তুই কী হয়ে যাচ্ছিস!”

পা ও বাহুর ব্যথা গিলে হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইল রবিন। সত্যি কি ও জব্বারকে হত্যা করতে চেয়েছিল!

“আন্দাজে কথা বলিস না, আরমান! জব্বার কাকাকে মারতে যাব কেন? মানুষ মারার মতো কলিজা কি আমার আছে?”

“তুই বলতে চাইছিস এই দুর্ঘটনা কাকতালীয় ছাড়া কিছু নয়!”

“অবশ্যই!” রবিনের দৃঢ় স্বর। কিন্তু ওর মনের কোণে কোথাও পাপবোধ চেপে বসে। আরমান বিশ্বাস করছে না ওকে। রাতারাতি এত অবিশ্বাসের হয়ে গেল রবিন!

আরমানকে উপেক্ষা করে বাইক তুলতে যায়। কিন্তু হাতের ব্যথায় পেরে ওঠে না। আরমান ওকে সরিয়ে বাইক তুললো। তারপর আবার রবিনকে আপাদমস্তক দেখল। ওর কপালের কুঞ্চন কিছুতেই আর মিলিয়ে গেল না। রবিন চটে গেল,

“শালা, মেয়ে দেখতে এসেছিস? তখন থেকে কুনজর দিয়ে যাচ্ছিস। বাইকে উঠলে ওঠ নয়ত সর আমি চালাবো।”

রবিন সামনে বসল। আরমান এদিক-ওদিক দেখল। কেউ নেই। রবিনের কাঁধে হাত রেখে আবার জিজ্ঞেস করল,

“সত্যি করে বল রবিন, তুই..!”

কথা শেষ করতে দিলো না রবিন। দু হাত এগিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,

“নে শালা, জেলে ভরে দে। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে। আর ও তখন থেকে বক বক করে যাচ্ছে। বিশ্বাস যখন করিস না তখন জেলে ভরে দে। যা পুলিশ ডাক!”

রবিনের মুখ রাগে লাল। এতই যখন সাধু তাহলে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে না কেন আজ! আরমান দাঁত পিষল। বলল,

“পেছনে বস। বাইক আমি চালাব!”

রবিন সন্তুষ্ট হলো। কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না। তর্কেও গেল না। চুপচাপ পিছিয়ে বসল। আরমান বাইক ছুটিয়ে চললো সামনে। সোজা গেল উপজেলার একটি সরকারি হাসপাতালে।

আশঙ্কাজনক কিছু হয়নি জব্বারের। তবে এক সপ্তাহ বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। ব্যথা নাশক ওষুধ চলবে। মাথা, হাঁটুতে সামান্য জখম হয়েছে। ডান হাতটা একটু বেশিই জখম। ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। রবিন হাত ও পায়ে ড্রেসিং করে জব্বারের শিওরে বসল। তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। আস্তে আস্তে কেমন বিস্ময় ও করুণ হয়ে উঠল চাহনি। কপাল কুঁচকে গেল। আপনমনে বিড়বিড় করল,

“না, না, জব্বার কাকাকে মারতে চাইনি আমি। অসম্ভব!”

রবিন মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। পায়ে ব্যথায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। আরমান বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে পাশ কেটে একেবারে হাসপাতালের সামনের মাঠে গিয়ে দাঁড়ালো। লম্বা শ্বাস নিলো। আরমান নিঃশব্দে পেছনে দাঁড়ালো। রবিন কাঁপা হাতে বলল,

“সিগারেট দে, আরমান!”

আরমান পকেট হাতড়ে দুটো সিগারেট বের করল। রবিন ঠোঁটে গুঁজে নিলো। আরমান দিয়াশলাই জ্বালিয়ে দেয়। তারপর নিজের ঠোঁটে গোঁজা সিগারেট জ্বালালো। দু বন্ধু নীরব সিগারেট ফুঁকছে। রবিনের পায়ে খুব ব্যথা করছে। একটু বসতে পারলে ভালো হতো। আরমানের নীরবতা অসহ্য লাগল। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল,

“তুই সত্যি বিশ্বাস করিস জব্বার কাকাকে আমি মারার চেষ্টা করতে পারি?”

আরমান সময় নিয়ে বলল,

“উনাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে দিতে চাসনি তুই।”

“এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে কেউ কাউকে মেরে ফেলতে চায় না কি? কী সব বলছিস!” সহজ হাসার চেষ্টা করল রবিন। আরমান বলল,

“কোনো সামান্য ব্যাপার ছিল না রবিন। জব্বার কাকা আজ লক্ষ্যে পৌঁছে গেলে তোর আর হামিদার সম্পর্ক মহসীন কবির ভূঁইয়া জেনে যেত। তোর বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পেয়ে যেত। তারপর…!”

রবিন খপ করে ধরল আরমানের কলার চেপে। সিগারেট সমেত হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে এনে বলল,

“চুপ কর, আরমান। একদম চুপ!”

রবিনের চোখ-মুখ বদলে গেল। ভয়, শঙ্কা আর ভিন্ন কিছু ছিল ওতে। কেমন গা ছমছমে চাহনি। আরমান ঢোক গিললো। রবিন আবার স্বাভাবিক মুখ করে বলল,

“ভুল কিছু করিনি আমি। জব্বার কাকা বেঁচে আছেন। ওইটুকু আঘাতে উনার কিছু হবে না। তুই তার অতীত জানিস না। জানলে এই সামান্য আঘাত পেয়েছে বলে এত ঘ্যানঘ্যান করতি না। আমিও তো কম আঘাত পাইনি। কী রে শালা, একবার আমার জন্য তো দরদ দেখালি না। বন্ধু বন্ধু বলে আবার মুখে ফেনা তুলিস! তোর বন্ধুত্বের গুষ্টি কিলাই।”

রবিন সিগারেটে শেষ টান দিয়ে জুতোয় পিষে ফেললো। খুঁড়িয়ে চললো বাইকের দিকে। আরমান হাঁপ ছাড়ল। ব্যাপারটা কেবলমাত্র আঘাত পাওয়া নিয়ে নয়। কিন্তু রবিনকে সেকথা বুঝাতে গেলে বিবাদ শুরু করবে। ওর বুঝের ওপর পৃথিবীর কারো বুঝ খাটবে না।

অলি নাছোড়বান্দা। হয় মরবে নয়ত সরোয়ারের শেষ দেখে ক্ষান্ত হবে। করিমুদ্দি ছেলেকে কত বুঝিয়েছে। অলি ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধের নেশায় পাগল। কারো কথা ও শুনছে না।

সরোয়ার সেদিন রাতে করিমুদ্দির বাড়িতে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল অলিকে শাসিয়ে আসবে। কিন্তু অলি ঘরে ছিল না। করিমুদ্দি বাজার থেকে ফেরেননি তখনও। তার বউটা বড়ো ছেলের মৃত্যুর শোকে স্তব্ধ, শয্যাশায়ী। সফুরা ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে কাঁথায় সুই সুতো দিয়ে ফোঁড় তুলছিল।

রাত নিঝুম। সকলের দরজা বন্ধ। করিমুদ্দির টিনের ঘরের জানালা দিয়ে সফুরার মুখ দেখা যায়। সফুরার বয়স আর কত! বিশ কী বাইশ। স্বামী শাশুড়ির নির্যাতনে সুন্দর দেহখানা অমাবস্যার চাঁদের ন্যায় ম্লান হয়েছে। তবুও তো তা চাঁদ। সরোয়ারের নারীলিপ্সু চোখ দুটো অন্ধকারে পিশাচের মতো চকচক করছিল। লোভ সামলাতে না পেরে সেই সময় হুট করে করিমুদ্দির ঘরে ঢুকে যায়। ঘরে আরেকজন না থাকলে সেদিন সফুরার সঙ্গে কিছু একটা করত ও।

সরোয়ার দেখতে কালো, স্থুলকায়। চোখদুটো বড়ো বড়ো। মুখে বসন্তের দাগ। মাথায় চুল কম। পরনে সবসময় লুঙ্গি থাকে। গায়ে খাদি পাঞ্জাবি।

ভীত আতঙ্কিত সফুরা মায়ের চৌকির ওপাশে গিয়ে আঁচলে মুখ ঢাকলো। সরোয়ার কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। নিজের লালসা সংবরণ করতে না পেরে সফুরার হাড় জিরজিরে হাতটা ধরে বলে,

“ও সফুরা, আমার কথা শুনবি? আমার কথা শুনলে তোর সব দুঃখ গাঙে ভাইসা যাইব। আয়, শোন। ওই ছেরি, ভয় কীসের? আয় না!”

“মা গো!”
সফুরা ভয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। করিমুদ্দির বউটা অন্ধকার চোখে তাকায়। দুর্বল গলায় জিজ্ঞাসা করে,

“সফু, ও সফু, কী হইছে?”

সফুরা সে কথার জবাব দিতে পারে না। সরোয়ারের হাত থেকে কোনো রকমে নিজেকে ছাড়িয়ে অন্ধকারে দিশাহীন দৌড়ে পালায়। ও না দেখেও বুঝতে পারে অশরীরির মতো সরোয়ার ওকে অনুসরণ করছে। সফুরা প্রাণ-পণে ছুটছে। কোথায় যাচ্ছে ও জানে।

হঠাৎ কেউ ওর হাত টেনে ধরে ঝোপের আড়ালে নিয়ে এলো। চিৎকার করতে মুখ চেপে ধরে। ইশারায় বুঝায়,

“ভয় পেয়ো না, সফুরা। এই তো আমি, তোমার আরেক ভাই। ভয় কীসের?”
জোনাকির আলোয় সফুরা সজল বিস্ময়াপন্ন চোখে তাকিয়ে রইল আরমানের দিকে। ওর চোখ গড়িয়ে ঢল নামলো। বুকের ভেতর স্বস্তি এলো।

সরোয়ারের পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সফুরা ভয়ে জমে গেল। আরমানের চোয়াল কঠিন। এত দুঃসাহস সরোয়ারের! মনে মনে তিরস্কার করল। ঘাড় তুলে রবিনকে দেখল।

“সরোয়ার ভাই, আপনি!”

রবিনের বিস্মিত হওয়ার অভিনয় নিখুঁত। সরোয়ার ভড়কে গেল। এদিক ওদিক তাকালো। শিকার ধরতে ব্যর্থ হলে যেরূপ মুখ হয় শিকারির, সরোয়ারের তেমনই হলো। ঠোঁটের কোণে চাপা অসন্তোষ। কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলল,

“আরে, রবিন যে। খবর কী?”

“আমার খবর তো আলহামদুলিল্লাহ। আপনারটা বলেন শুনি?”

“ঝাক্কাস!”

“এদিকে কেন এসেছিলেন?” রবিন থমকে যাওয়ার ভান করল। পরক্ষণেই মুখ মলিন করে বলল,

“সরোয়ার ভাই, আপনাকে না অনুরোধ করেছিলাম অলিকে ইগনোর করতে। ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে ও বেচারা পাগলপ্রায়। পাগলের কথা কেউ ধরে বলেন তো। তাছাড়া আপনার একটা চুল বাঁকা করার ক্ষমতা ওর আছে! আপনি কেন ওর মতো চুনোপুঁটিকে ধরতে এখানে এসেছেন! ওকে শায়েস্তা করতে আমি আছি না? আমাকে বলবেন। ঘাড় ধরে আপনার সামনে নিয়ে আসব।”

সরোয়ার যেন বিব্রত হলো। রবিনের কাঁধে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল,

“আরে কী কয় এই ছ্যামড়া! আমার কি এত সময় আছে ওসব অলি গলির পাগলামি দেখার। আমি এসেছিলাম ও পাড়ায় বিশেষ একটা কাজে। বিশ্বাস না করলে চল তোকে নিয়ে যাই। ও কী, পায়ে কী হয়েছে?”

রবিনের কাঁধ ধরে চাপ দিলো। রবিন ঘুরে কাঁধ ছাড়িয়ে নিয়ে হেসে বলল,

“আরে, আরে, কিছু না। ওই ফুটবল খেলতে গিয়ে চোট লেগেছে।” দম নিয়ে বলল,

“আর কী যে বলেন না সরোয়ার ভাই। আপনারে বিশ্বাস না করলে কারে বিশ্বাস করি আমি? ইউ আর মাই ব্রাদার ফ্রম অ্যানাদার মাদার। ভেরি গুড ব্রাদার! বুঝেছেন না?”

ইংরেজিতে প্রশংসা করলে সরোয়ার খুশি হয়। ওকে খুশি করিয়ে রবিন মোটেও খুশি হয় না। তাই বলে তোষামোদি কম করে না। সরোয়ার গলে গলে যায় সেসব প্রশংসা শুনে। রবিন প্রশংসা করে আর ও হাসে। ও হাসলে রবিনের মনে হয় যেন একটা শুয়োর ঘোৎ ঘোৎ করে হাসছে। মনে মনে দশবার থু থু ফেলে।

মূল সড়কে উঠে এলো দুজন। রবিন বাইক রেখে এসেছে। আরমান সফুরাকে নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দিয়ে বাইক নিয়ে আসবে। ততক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না রবিন। সরোয়ারের বাইকে বাড়ি পর্যন্ত এলো। বাবাকে ইতোমধ্যে জব্বারের দুর্ঘটনার কথা মোবাইলে জানিয়েছে। শুনে কেমন থম ধরে ছিলেন। বলেছেন, অফিস ঘরে এসে দেখা করতে। সরোয়ারকে বিদায় দিয়ে রবিন অফিস ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। সরোয়ার বাইক ছুটিয়ে চলে যাচ্ছে। কাঁধ ও হাত ঝেড়ে রবিন পেছনে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে নিচু গলায় বলল,

“শালা, শুয়োর কোথাকার!”

চাঁদনি রাত। হিম হিম হাওয়া। জোনাক টিম টিম আলো জ্বালিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ঝিঁঝি পোকা ডেকে যাচ্ছে এক নাগাড়ে। গায়ে ওড়না জড়িয়ে বাইরে এলো হামিদা। নিজের ও দাদিজানের এঁটো থালা বাসন পরিষ্কার করতে কলপাড়ে এলো। রবিন ওত পেতে দাঁড়িয়েছিল অন্ধকারে। হামিদা থালা বাসন নিচে নামিয়ে রাখতে রবিন আলোতে এলো। চমকে ওঠে হামিদা। বুকে থু থু দিয়ে রুষ্ট স্বরে বলল,

“এভাবে ভয় দেখান কেন, ইতর!”

রবিন এগিয়ে এলো,

“সারাদিন পর ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে স্বামী ফিরল। তাকে দেখে কোথায় জড়িয়ে ধরে আদর সোহাগ করবি তা নয়, বকছিস!”

হামিদা কলের হাতল ধরল,

“বকা খাওয়ার কাজ না করলেই পারেন।”

রবিন ওর পাশে এসে দাঁড়াল।

“তাহলে জড়িয়ে ধরে আদর সোহাগ করবি?”

হামিদা মনে মনে বলে,

“ইশ, জীবনেও না!”

কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটে কল চাপছিল। আচমকা রবিন ওকে টেনে জড়িয়ে ধরে।

“কী করছেন!”

“এখন চুপ করে থাক কিছুক্ষণ!”

কী আশ্চর্য! হামিদা শুনলো সে কথা। রবিনের কী যে ভালো লাগল। ওর ঘামে ভেজা শরীরের সাথে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করে রইল। দুজনেই শুনছে দুজনার হৃৎস্পন্দনের গতি। রবিনের বুকের হাসফাস ক্রমশ হালকা হয়ে এলো। ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। চিবুক তুলে ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন করল ততক্ষণ যতক্ষণ হামিদা ওর বুকের বা’পাশ খামচে না ধরল!

“সব সময় এমন কেন করেন আপনি? ভালো লাগে না!”

হামিদা উলটো হাতে ঠোঁট মুছে হাঁপাতে লাগল। লাজে রাঙা মুখ। রবিন হাসল। চোখে-মুখে ঘুম ঘুম ভাব। হামিদা এঁটো থালাগুলো পরিষ্কার করছে। রবিনকে উপেক্ষা করার কত চেষ্টা! রবিন বসল ওর সামনে। ভেজা হাতটা টেনে ধরে বলল,

“ওই যে বিয়ের দিন কিনে দিয়েছিলাম আলতা। আছে না? আগামীকাল হাতে-পায়ে নিবি।”

হামিদার চিবুক তুললো আবার,

“কপালে টিপ পরবি। গলার চেইনটা খুলেছিস কেন? ওটাও পরবি বুঝলি। আর কোনো গহনার দরকার নেই। আমিই তো তোর সবচেয়ে মূল্যবান গহনা। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক দিবি। মুখে পাউডার দিলেও চলবে না দিলেও সমস্যা নেই। খবরদার চুল বাঁধবি না কাল।”

হামিদা বোকা বোকা মুখে বলল,

“কাল কী?”

রবিন তাকিয়ে রইল। এই মেয়ে সব ভুলে গেল! রবিন এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেনি। এই এক সপ্তাহ ওর কাছে শত জনমের কম লাগেনি। রবিন উপেক্ষা করল ওর প্রশ্ন। পরনের কাপড়ের দিকে তাকালো। বলল,

“লাল বেনারসি পরবি। সেদিনকার মতো। আচ্ছা, এক রকম হলেই হলো। শুধু বউ বউ লাগলেই চলবে। কার বউ, বউ বল তো শুনি?”

হামিদা বলতে চায় না। লজ্জায় আনত হয়। রবিন ওর ঘাড় চেপে ধরে,

“বল বলছি!”

“হুঁ, আপনার বউ, বউ!”

রবিনের কানে এত মধুর লাগে যে নিজেকে সামলাতে পারে না। হামিদাকে ফের জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। সারা মুখে ও ঠোঁটে। বসার ঘরে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। হামিদা দু হাতে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। রবিন উঠে দাঁড়ায়। এক কদম এগিয়ে গিয়ে আবার হামিদাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। চোখে-মুখে হাসির ঝরণা। বলে,

“আবার বল, হামিদা!”

“আপনার বউ, বউ!”

রবিন কী যে খুশি হলো। খুশিতে হেলেদুলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সলজ্জে গাল ফুলিয়ে হামিদা বলল,

“পাগল কোথাকার!”

হঠাৎ ওর বোধোদয় হলো। রবিনের বলা কাল বুঝতে পেরে লজ্জায় অবশ হয়ে বসে রইল। কাল কী উপায় হবে ওর! অদূরে কোথাও রবিনের গলা শোনা যায়। হেঁড়ে গলায় গান ধরেছে,

“পাগল তোর জন্য রে, পাগল এ মন, পাগল!!”

চলবে…

#হামিদা(৫৬)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

চেতনা ফেরার পর থেকে জব্বার বারবারই বেড ছেড়ে উঠে যেতে চাইছে। শরীর চলে না তবুও স্থির নেই। মহসীন কবির ভূঁইয়াকে আর কতবার নিরাশ করবে! মানুষটা জব্বারের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে না? জব্বার হাসপাতালের বেডে শুয়ে শান্তি পায় না। ইমাম সাহেবের সাক্ষাৎ করতে হবে যে করেই। ঢাকা যাওয়ার আগে শেষবার তার ওখানে হামিদাকে দেখা গিয়েছে। কিন্তু সঙ্গে কে ছিল! ওই সঙ্গীর খোঁজ জব্বারের চায়।

এখানে আসার আগে হামিদাকে কৌশলে, ভয় দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছিল। তাতে সতর্ক করা হতো। মহসীন কবির নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া হামিদা মুখ খুলবে না। খুললেও সত্য বলবে না। সেদিন অত মার খেয়ে বলেছিল কারো নাম?

“জেগে গেছ দেখি, জব্বার কাকা। এখন কেমন বোধ করছ?”

রবিন টিফিনবাটি নামিয়ে রাখল পাশে। বসল পায়ের কাছে। জব্বার হাসার চেষ্টা করে বলল,

“আছি কোনো রকম। ডাক্তার বললেন, পায়ে চোট পেয়েছ তুমি বাজান৷ বেশি লেগেছে?”

“আরে না। ব্যাটা ছেলেদের অইটুকু আঘাতে কিছু হয় না। তোমার কথা বলো। খুব কষ্ট হচ্ছে? আরও ভালো ডাক্তার দেখাব?”

“ঠিক আছি আমি।”

তারপর মহসীন কবির ও রবিনের কথোপকথন শুনলো। দুজনে আরো কিছু সময় কাটিয়ে দিলো। এদিকে দুপুর গড়াচ্ছে। বাপের হুকুম তামিল করতে এক্ষুনি জেলা সদরে যেতে হবে। দেরি করলে রাত হবে ফিরতে। রাত! এখন আর রাতের ভাগ কাওকে দেবে না রবিন। এখন থেকে সব রাত কেবল হামিদা আর ওর। কী বিষম উত্তেজনা সৃষ্টি হলো ভেতরে! মনে দোল লাগল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির হিমেল হাওয়ার দোল। মাথার মধ্যে কেবলই বসন্তের কোকিলের মতো কেউ ডাকল,

“হামিদা, হামিদা, হামিদা!”

“তুমি তাহলে রেস্ট করো, আমি উঠি। ওহ শোনো, ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে লাভ নেই। আমি খোঁজ নিয়ে এসেছি। হামিদা একা ছিল সেদিন। আপাতত ওসব বাদ দাও। শরীরটা ঠিক হোক তারপর আবার লেগে যেয়ো ছাই হাতে নিয়ে।”

রবিন প্রফুল্ল মনে বিদায় নিয়ে চলে গেল। জব্বার সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল। হঠাৎ ওর কপাল কুঁচকে গেল। চোখ দুটো বিস্ফোরিত। পিছু ডাকতে গিয়েও ডাকল না। হাতটা ঠাঁই শূন্যে রইল।

আরমান কলেজ শেষে হেঁটে ফিরছিল। রবিন আজ ওর সঙ্গে নেই। বিশেষ কাজে জেলা সদরে গিয়েছে। যাওয়ার সময় বলে গেছে,

“হামিদার খেয়াল রাখিস।”

আরমান সে কারণে এতদূর পথ হেঁটে মহিলা কলেজের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে সরোয়ারের সঙ্গে দেখা। এই লোকটাকে ইদানীং মোটে পছন্দ করে না আরমান। ঘৃণায় ভেতর পর্যন্ত রি রি করে ওঠে। ওর যদি ক্ষমতা থাকত তবে এই সরোয়ারকে পৃথিবী থেকে ভ্যানিশ করে দিতো। এখন যেহেতু সে ক্ষমতা নেই তাই লোক দেখানো সৌজন্য বজায় রাখতে হয়। সরোয়ার জিজ্ঞাসা করল,

“কলেজ থেকে ফিরলি না কি রে, ছ্যামড়া?”

আরমান মেকি হাসল,

“জি, সরোয়ার ভাই। আপনি কোথা থেকে এলেন?”

“ওই তো ও পাড়ায় কাজ ছিল। তোদের মতো কি আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘোরার সুযোগ আছে আমার। তা হেঁটে যাচ্ছিস কেন? আয়, বাইকে ওঠ। এগিয়ে দিই সামনে।”

সরোয়ার বলল। আরমান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“আরে না, না। হেঁটে যেতে সমস্যা হবে না।”

সরোয়ার পীড়াপীড়ি করল,

“ধুর, ছ্যামড়া! ওঠ, আয়!”

আরমান বুঝল না করে লাভ হবে না। পেছনে উঠে বসল। সরোয়ার বাইক ছুটিয়ে বলল,

“তোর বন্ধু কই? আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। ব্যাপার কি বলত!”

“রবিনকে না গতকালই দেখলেন।” আরমান কৌশলে প্রথম জবাব এড়িয়ে গেল।

“তাই তো!” সরোয়ার ঘ্যাড় ঘ্যাড় করে হাসল। খুব বাজে হাসি। আরমানের বড্ড অস্বস্তি হয় ওর বাইকে বসে। সরোয়ার ওর পরিবারের খোঁজ খবর নিয়ে দু তিন কথা বলে বলল,

“অলিদের বাড়ি যাওয়া আসা আছে না কি তোর?”

আরমান শক্ত হয়ে বসল। মিথ্যা বলল,

“খুব একটা নয়।”

আরমান প্রশ্ন করল না। সরোয়ার কথা বলে মজা পাচ্ছে না। রবিনের সঙ্গে কিন্তু ওর বেশ জমে। আরমানটা গম্ভীর। সরোয়ার এনিয়ে বিনিয়ে সফুরার প্রসঙ্গে এলো। আরমানের চোয়াল কঠিন হলো। ইচ্ছে হলো এক্ষুনি সরোয়ারের জিহবা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। সে দুঃসাহস করা মানে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। সরোয়ার মানুষের আড়ালে জানোয়ার। আরমান সুকৌশলে সফুরার প্রসঙ্গেও ইতি টানল। সরোয়ার আর বেশি কথা বলছে না। আরমানকে সামনে কোথাও নামিয়ে দেবে। কিন্তু মহিলা কলেজের সামনে আসতে আরমান নিজেই বলল,

“এখানেই নামিয়ে দিন সরোয়ার ভাই।”

সরোয়ার বাইক একপাশ করল। কলেজের সাইনবোর্ডের মহিলা শব্দটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এখানে!”

ছুটি হয়েছে। কলেজের যুবতি মেয়েগুলোর শরীরে নজর বুলিয়ে সরোয়ার দুষ্ট হেসে বলল,

“কেউ আছে না কি রে, ছ্যামড়া? বড়ো ভাইদের সঙ্গে পরিচয় করিয়েও তো দিতে পারিস। লাভ বৈ ক্ষতি হবে না। কই তোরটা? ডাক দেখি একটু। দোয়া দিয়ে যাব আরকি!”

সরোয়ার খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল। আরমান দাঁতে দাঁত পিষল। জোর পূর্বক হেসে বলল,

“কী যে বলেন আপনি, সরোয়ার ভাই। আমি ওই মুদি দোকানে বিশেষ কাজে এসেছিল। বিশ্বাস না করলে চলুন!”

সরোয়ার বলল,

“আরে ছ্যামড়া তুই তো মজা বুঝিস না। মশকরা করছিলাম। চলি!”

সরোয়ার বাইক ঘুরাতে ঘুরতে কলেজের গেটে তাকালো। থমকে গেল। হলুদ রঙের থ্রী পিস পরা মেয়েটাকে একদৃষ্টে দেখল। কী সুন্দর হাসি। সরোয়ার এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেল। মেয়েটার সুন্দর মুখখানা চেনা লাগল। পাশেরটার তো আরও চেনা। কোথায় যেন দেখেছে আগে। পাশ ফিরে আরমানকেও দেখল। সেদিকে তাকিয়ে আছে। বাইকটা ঘুরিয়ে চাবি ঘুরাবে তখনই যেন চিনতে পারল। আরমানকে বলল,

“হলুদ থ্রিপিস পরা মেয়েটা রবিনের চাচাত বোন না?”

আরমান চকিতে তাকালো, তারপর আবার হামিদার দিকে। মোহনার সঙ্গে হেসে কথা বলতে বলতে ওরা বাড়ির পথে যাচ্ছে। সরোয়ারের সামনে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,

“কোনটার কথা বলছেন?”

“আরে, ওই যে গোলাপি জামা পরা মেয়েটার পাশেরটা।”

আরমান দেখেও দেখল না।

“কোনটা?”

“আরে ওই যে, সামনে তাকা না!”

ভাগ্যিস হামিদা ও মোহনা ভিড়ের আড়ালে গেল। আরমান ভিড়ে চোখ বুলিয়ে হাঁপ ছাড়ল,

“কোনটার কথা বলছেন, সরোয়ার ভাই। ওইটা, না ওইটা!”

আরমান ভুল দিকে ইশারা করে। সরোয়ার রাগ হলো। ক্ষোভের সঙ্গে বলল,

“ধুর, ছ্যামড়া!”

সরোয়ার চলে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে পেছনে দাঁড়িয়ে তিরস্কার করল আরমান। তারপর দৌড়ে গেল হামিদার পিছু।

হামিদা এক মনে গল্প করছে। কিন্তু মোহনার মনে হলো কেউ যেন অনুসরণ করছে ওদের। আড়চোখে পেছনে তাকালো। আরমান কিন্তু থামল না, দৃষ্টি লুকালো না। চোখে চোখ পড়তে লজ্জা পেল মোহনা। হামিদার বাহুতে মৃদু চিমটি কেটে বলল,

“তোর সোয়ামি দেখি বডিগার্ড পাঠিয়ে দিয়েছে!”

হামিদা ভুরু কুটি করল। বাহু ডলে বলল,

“কী বলছিস!”

পেছনে তাকাতে কাওকে আর দেখল না। মোহনাকে বলল,

“কই? খামোখা চিমটি দিলি কেন? ব্যথা পেলাম কেন? দশ তলা বিল্ডিং। কুত্তা তোর ডার্লিং!”

হামিদা হেসে কুটি কুটি হয়৷ পেছনে তাকালো মোহনা। আরমান খুব চতুর। মেঠো রাস্তা ধরে অনুসরণ করছে। কিন্তু হামিদাকে আর বলবে না ও। মুখ ভেংচে বলল,

“হ, কুত্তা আমার ডার্লিং। আর তোমার ডার্লিং তো শেয়াল, তাই না?”

হামিদার হাসি নিভে গেল। সলজ্জে বলল,

“যা, চুপ কর!”

মোহনা ওর গালের আভা দেখে গাল টেনে বলে,

“ইশ! লজ্জায় পাকা আপেল। তা মুরগি, তোর শেয়াল শিকার করবে কবে তোকে? আজ না কাল!”

“মোহুর বাচ্চা!” মোহনা মূল সড়ক ছেড়ে মাটির রাস্তায় দৌড় দিলো। এদিকে লোকজন কম। এত বড়ো মেয়ে দুটো দৌড়াচ্ছে কেউ খেয়াল করবে না। অন্য দিকে আরমানের জন্যও সহজ হবে। মোহনা খিল খিল করে হাসে। ফিরে ফিরে লম্বা ছায়াটা দেখে।

হামিদার দিন কাটে অস্থিরতায়। রবিন দিনের বেলায় ওর সামনে পড়েনি। জব্বার অসুস্থ। এখানে ওখানে বাবার কাজে ছুটছে রবিন। হামিদার একবার মনে হয় রবিন হয়ত ভুলে গেছে আজকের রাতের কথা। মনে স্বস্তি আসে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ওর মন বড়ো আনচান করে। কোনো কাজে স্থির হতে পারে না। ঘুম আসে না চোখে।

সময় যত ঘনিয়ে আসে ততই হামিদার অস্থিরতা বাড়ে। কোথাও দুদণ্ড বসে শান্তি পায় না। খেতে গেলে অল্পতেই ক্ষুধা মরে যায়। কত যে চিন্তা ঘোরে মাথায়। ভয়, শঙ্কায় বিবশ হয়।

রাতেও ঠিকমতো খাওয়া হলো না হামিদার। দাদিজান লক্ষ্য করেছেন। জিজ্ঞাসাও করেছেন কারণ। হামিদা সত্য বলেনি। রাত যত ঘন হয় ওর শরীর তত অবশ হয়ে আসে।

দাদিজান ঘুমিয়ে গেছেন। বাইরে বাইকের আওয়াজ শোনা গেল। সারাদিন পর রবিন এলো! হামিদা উঠবে না উঠবে না করেও উঠে গেল জানালার কাছে। রবিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ও যেন জানত হামিদা সেখানে দাঁড়াবে। অপেক্ষা করছিল।

আকাশে কালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। তারাগুলো লুকিয়েছে তার আড়ালে। চাঁদটা ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দেয়। আবার ওটাকে কালো মেঘে ঢেকে ফেলে। ঝিঁঝি পোকা ডেকে যাচ্ছে। মৌনতার সুতোয় বোনা রাত।

রবিন ও হামিদা সেই আবছায়ার মাঝে পরস্পরকে দেখতে লাগল। কারো পলক পড়ল না। কিন্তু হঠাৎ করে হামিদার কী যেন হলো। ঘুরে দাঁড়ালো। দৌড়ে এলো চেয়ারের কাছে। তারপর মেঝেতে বসে রইল। এ কী অনুভূতি! এমন কাঁপিয়ে দিলো কেন ওকে? এত দুর্দমনীয় কেন তা!

মধ্য রাত। দাদিজান বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। হামিদা উঠে দাঁড়ায়। নিঃশব্দে বাক্স বের করে আনে খাটের তল থেকে। লাল বেনারসিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। আগে বলত রবিন ওকে উৎপীড়ন ছাড়া কী দিয়েছে? এখন এই বাক্সের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরের জোয়ারটাকে সামলে বলে,

“এই দিয়েছে, এই দিয়েছে। এর চেয়ে ওই উৎপীড়নই বেশ ছিল!”

হামিদা নিঃশব্দে সাজতে লাগল। গলায় সোনার চেইনটা পরল। অনেকক্ষণ ওটাকে গলায় ছুঁয়ে দেখল। ওর সম্পদ! কাঁচের চুড়ি পরতে টুংটাং শব্দ হলো। হামিদা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে। বুকের মাঝে আড়াল করে। পেছন ফিরে ঘুমন্ত দাদিজানকে দেখল। ক্ষণকাল পা নড়ল না। প্রার্থনা করল দাদিজান জেগে যাক, ওকে বন্দি করে রাখুন এই ঘরে।

হামিদা মাথায় ঘোমটা তুললো। তারপর শব্দ না করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দরজা খুললো। বাইরে দিয়ে দরজা টেনে সন্ত্রস্ত পায়ে চললো রবিনের ঘরের দিকে। ওইটুকু পথ। অথচ, ওর মনে হলো কতশত পথ পাড়ি দিচ্ছে। সতর্কে এদিক ওদিক তাকালো৷ কেউ দেখছে না তো! কেউ নেই। তবুও মনে হলো অন্ধকারে গা লুকিয়ে কেউ দেখছে। মনের ভুল? তাই হবে!

রবিন যেন অপেক্ষা করছিল ওর জন্য। হামিদা দরজার কাছে গিয়ে হাত শূন্যে তুললো টোকা দেবে বলে। তখনই দরজা খুলে খপ করে হাতটা ধরে ভেতরে টেনে নিয়ে গেল রবিন। বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলল,

“এতক্ষণে এলি!”

অনুভূতির আতিশয্যে দুজনেই কাঁপছে। বাইরে ঝড় উঠল। গাছের শাখায় উত্তাল হাওয়া লাগল। শো শো তালে অশান্ত সেসব শাখার নৃত্য। হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলো।

রবিনের ঘরে ঘুটঘুটে আঁধার। সেই আঁধারে রবিন হামিদার চিবুক তুললো। আকাশে বিদ্যুৎস্ফুরণ ঘটে। এক ঝলক আলো এসে পড়ে হামিদার মুখের ওপর। কী অপূর্ব! ঠিক যেন লাল টুকটুকে বউ। রবিনের বউ! অথচ, লাল ওষ্ঠজোড়া স্বৈরাচারের ন্যায় দখল করে নেয় রবিন। টেনে খোলে ঘোমটা। হামিদা বশীভূতের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। ধূসর বুনো দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুক্তির সেই শর্ত বেমালুম ভুলে গেল। রবিন স্থির নয়। হামিদাকে নিজের করে পেয়েছে এইটুকুই যেন ওর ঘোর লাগছে। কিছুতেই এই ঘোর কাটাতে চায় না।

কোলে তুলে নেয় হামিদাকে। হামিদার শাড়ির আঁচল খসে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। দীঘল চুল রবিনের বালিশে ছড়িয়ে পড়ে। ভীরু, লাজুক চাহনি কাজলে লেপটে দেয় রবিন। কাচের চুড়ি ভাঙে। পায়ের আলতার রঙ অবিন্যস্ত চাদরের মাঝে অন্ধকার ঘরে জ্বলজ্বল করে।

রবিনের সারা ঘর হামিদার সুগন্ধে মাতোয়ারা। রবিন সবটা দু হাতে নিজের করতে মরিয়া। হামিদা ওর। ওর সবকিছুও ওরই।
বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। মেঘ গর্জন করে। এ ঘরের আদিম উন্মত্ত মিলনের রাগে সেই সুর মিশে চার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।

হামিদাকে পাওয়ার এই মুহূর্ত রবিন যেন শত বছর সংরক্ষণ করে রাখতে চায়। কেবলই বলে,

“এই রাত শেষ না হোক। এই রাত শেষ না হোক!”

চলবে….

#হামিদা(৫৭)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

মাঝরাতে রবিন পানি পান করতে চুপিচুপি বাইরে এলো। অত রাতে বসার ঘরে কেউ থাকে না। বাড়িসুদ্ধ লোক গভীর নিদ্রায়। রবিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু গ্লাস পানি খেলো। তারপর টেবিলের ওপর ঢাকনা সরিয়ে দেখল খাবার মতো কিছু আছে কি না। বড্ড খিদে পেয়েছে ওর।

টেবিলে ইলিশ মাছ ও মাছের ডিম ভাজা আর ঠান্ডা ভাত ছিল। রবিন প্লেট নিলো না। ওভাবেই দু টুকরো মাছের ডিম খেলো। সঙ্গে দু গাল ভাত। ফ্রীজে আঙুর আর ডালিম ছিল। হামিদার খিদে পায় যদি!

একটু আগে রবিনের বাহুডোর থেকে নিস্তার পেয়ে ও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। রবিন উষ্ণ মুহূর্তের কথা ভেবে মুচকি হাসল। বসার ঘরের একটা জানালা খোলা। রবিনের গা খালি। পরনে টাউজার। সুঠামদেহি গঠন। বৃষ্টি ভেজা বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল। রবিনের সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। বুকের মধ্যে মধুর কাঁপন। মিলন সুখের সেই ঘোর এখনও ওর বুনো চোখে। এত বছরের জীবনে রবিন আজ অন্য রকম অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হলো। ওর কাছে এই অনুভূতি প্রকাশের ভাষা নেই। কিন্তু এইটুকু জানে, এই অনুভূতির জোয়ারে আজ ও বিলীন হয়ে যাবে।

অজান্তেই গুনগুন করে রবিন। পাছে কেউ জেগে ওঠে সে খেয়ালও নেই। ফলের বাটি হাতে করে সঙ্গে নিয়ে চললো ঘরে। ওর হামিদার কাছে।

কিন্তু দেখল না পাশের ঘরের দরজাটা ভেজানো। ওর ফাঁকে দুটো বিনিদ্র চোখ স্থির। যে দেখেছে বিদ্যুৎ স্ফুরণের আলোয় রবিনের পিঠের নখাঘাত।

নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে এলো জুবিন। হুইলচেয়ার থামালো রবিনের বন্ধ দরজার পাশে। রবিন বেপরোয়া, বেহায়া ও দুঃসাহসী। নয়ত ওর মিলনের সুখ শীৎকার হয়ে দরজা ভেদ করে জুবিনের কানে শেলের মতো বিদ্ধ হয়! হামিদা! ওর কেন কোনো বাধা নেই। একটুও না।

জুবিনের সারা শরীর রি রি করে। এখান থেকে এখনই সরে যেতে না পারলে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে। ওর একটা ভুল পুরো পরিবারকে ওলট-পালট করে দিতে পারে। না, জুবিন মরে গেলেও মাকে আর কষ্ট পেতে দেবে না। ভূঁইয়া বাড়ির অশান্তির কারণ হবে না। জুবিন কাঁপা হাতে হুইলচেয়ার ঠেলে সদর দরজায় এলো। তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল অজানা অন্ধকারে।

রাতভর বৃষ্টিতে মাটি ভিজে কাঁদা। এখানে সেখানে পানি জমেছে। তখনও ফজরের আজানের ওয়াক্ত হয়নি। পাখিরা জাগেনি। থেমে থেমে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশে অন্ধকার।

জুবিন হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে কখন যেন বাড়ি থেকে অনেক দূরের বড়ো দিঘিটার পাড়ে এলো। কাক ভেজা শরীর।

মূল সড়ক ছেড়ে কাঁচা রাস্তা ধরে কিছুদূর হাঁটলে দিঘিটা। পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ। কথিত আছে এ গাছে অশুভ কিছুর আবাস। রাতে বা ভর দুপুরে এখানে এলে কেউ কিছু না কিছু দেখে। মাঝে মাঝে শোনা যায় কোনো যুবতি বা গাঁয়ের বধূর লাশ ভেসে উঠেছে দিঘির জলে।

জুবিন কুসংস্কারের জাল থেকে মুক্ত আজ। মৃত্যুকে ওর ভয় নেই। অশুভের দল আর কী করবে! জুবিন হুইলচেয়ার ঠেলে কৃষ্ণচূড়ার নিচে থামল। তাকিয়ে রইল সামনের দিঘির অন্ধকারে। কখন যে হুইলচেয়ার ঠেলে নিচে নেমে এসেছিল জানে না। পানি যেন ওকে টানছে। খুব তীব্রভাবে।

এই রাতের শেষ লগ্নে দিঘির জলে আত্মাহুতি দেবে তখনই অপরপাশে ঝুপ করে শব্দ হলো। একটা নারীদেহ নামল দিঘির পানিতে৷

“কে? কে ওখানে?” জুবিন শক্ত করে ধরল হুইলচেয়ার। মেয়েটি শুনল না ওর ডাক। ক্রমশ ডুবছে শরীর। ওর গলায় কিছু বাঁধা। জুবিন হুইলচেয়ার ঠেলে চললো সেদিকে। কাঁদায় হুইলচেয়ারের চাকা এগোয় না। জুবিন পড়ল দিঘির পাড়ে। কাঁদা পানিতে কনুইয়ে ও বুকে ভর দিয়ে জুবিন মেয়েটিকে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে গেল। মেয়েটির গলা অব্দি ডুবে গেছে। খোলা চুল পানিতে ভাসছে। শাড়ির আঁচলখানিও। গলায় বাঁধা কলসিতে পানি ঢুকছে। ওর যেন চেতনা নেই।

জুবিন পিছলে পানিতে পড়ে গেল। ওর পা অচল। দু হাত ছুড়ছে পানিতে ভেসে থাকার জন্য। কিন্তু ভাসতে আর পারছে না। মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিল ওর জীবনের দুরবস্থার কথা। এখন নিজের জীবন বাঁচানো দায়। জুবিনের নাকে ও মুখে পানি ঢুকে গেল।

এই শেষ রাতে প্রচন্ড অভিমান, ক্ষোভ ও হতাশায় নিমজ্জিত জুবিন মরতে এসেছিল। অথচ, ডুবতে ডুবতে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল বাঁচার জন্য। ওর চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। জুবিন হার মেনে নিয়েছিল। ঠিক তখনই কেউ ওর হাত টেনে ধরে পাড়ে তুলে আনলো। কাঁদার মধ্যে শুয়ে কাশতে লাগল জুবিন। চোখ মেলতে অন্ধকারে একটা সুন্দর মুখ দেখতে পেল। আঁতকে ওঠে জুবিন। স্তব্ধ হয়ে গেল। মেয়েটির ভেজা চুল চুয়ে পড়ল পানি। ঠিক জুবিনের চোখের পাতায়। কোমল অথচ আশ্চর্য গলায় মেয়েটি ডাকল,

“জুবিন ভাই, জুবিন ভাই!”

মেয়েটিকে চিনতে আর ভুল হলো না জুবিনের। এ যে আকাশের আদরের ছোটো বোন সফুরা!

জুবিন উঠে বসতে চেষ্টা করে। সফুরা সাহায্য করল। জুবিন বলল,

“তুমি আকাশের ছোটো বোন সফুরা না?”

“জ্বি!” সফুরা সরে আঁচল টেনে বসল। শীত করছে। ঠোঁট কাঁপছে। জুবিন কপাল কুঁচকে বলল,

“মরতে এসেছিলে?”

সফুরা জবাব দিলো না। জুবিন একটু ধমক দিয়ে বলল,

“মরতে এসেছিলে কেন?”

সফুরা হঠাৎ শব্দ করে কেঁদে ওঠে। হাঁটুতে মুখ লুকায়। জুবিন বড়ো বিব্রতবোধ করল। আকাশের নির্মম মৃত্যু মনে করে বুকের ভেতর ভার হয়ে এলো। বন্ধুর জন্য কিছু করতে পারেনি। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে নিজেকে চার দেওয়ালের মাঝে বন্দি করেছিল জুবিন। বন্ধুর খোঁজ খবর পর্যন্ত নেয়নি। কথা বলা বন্ধ করেছিল। আকাশ অভিমান করে পরে আর আসত না ওর কাছে। জুবিন কেন যে অভিমান ভাঙাতে গেল না! অজান্তেই হাতটা সফুরার মাথার ওপর রাখল। বলল,

“কেঁদো না, সফুরা। আকাশ নেই কিন্তু আমি বেঁচে আছি। আজ থেকে আমি তোমার আরেক ভাই হলাম। খুলে বলো, কেন মরতে এসেছিলে?”

অলি বিপথে যাচ্ছে। প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়েছে ও। ঘরে ওকে পাওয়াই যায় না। কোথায় থাকে, কী করে কাওকে বলে না। করিমুদ্দি ও তার স্ত্রী জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছে। মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে সফুরা এসে জুটেছে তাদের দুর্দশাপন্ন জীবনে। সফুরার স্বামী ওকে তালাক দিয়েছে। এদিকে সরোয়ারের কুনজর পড়েছে ওর ওপর। তাই জেনে অলি দা হাতে সরোয়ারকে হত্যা করতে বেরিয়েছিল। ফিরেছে আধমরা হয়ে। সফুরা এজন্য নিজেকে দায়ী করে। সরোয়ার ওদের বাঁচতে দেবে না। কোনো পথ না পেয়ে রাতের অন্ধকারে এই দুঃখ ভরা জীবনটা শেষ করতে এসেছিল দিঘির পানিতে সফুরা।

সব শুনে জুবিন থম ধরে রইল। মনে মনে ওর হাসি পেল৷ নিয়তির ফের বোঝা সত্যি মুশকিল। দুজন মরতে এসে পরস্পরকে বাঁচিয়ে দিলো। জুবিন বলল,

“মরতেও সৌভাগ্য লাগে। আমাদের সেটুকুও নেই সফুরা। ওঠ, সফুরা। বাড়ি যাই!”

“আমার যে বাড়ি ফেরার মুখ নেই, জুবিন ভাই!” সফুরা সজল চোখে বলল। জুবিন বলল,

“তাহলে আমাদের বাড়িতে চল!”

“মানুষ নিন্দা করবে!”

“করুক। আর কারো ভয় করি না।”

“আর সরোয়ার!”

“ওর পিন্ডি চটকাবো ফের তোর দিকে হাত বাড়ালে। ভাইয়ের ওপর ভরসা রাখ। ওঠ তো!”

সফুরা সংকোচে ভেজা চোখ মুখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। তারপর জুবিনের হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে এলো। ধরে বসিয়ে দিতে হাঁপ ছাড়ল দুজনই। অন্ধকার পাতলা হওয়ার আগেই দুজনে নীড়ের পথ ধরল। এই পথ বড়ো আশার। নতুন করে বাঁচার!

রবিন একবার বলেছিল,

“আমি যদি তোকে ছুঁই হামিদা, তুই নিজেকে খুঁজে পাবি না!”

কী বোকা ছিল হামিদা! সেদিন সে কথার অর্থ বুঝতে পারেনি। সাবধান হয়নি। আজ সব খুইয়ে বুঝল। এই বুঝ দিয়ে করবেটা কী এখন! এক মুহূর্তে অতীত ভেসে ওঠে চোখের সামনে। স্পর্শ আর অস্পর্শের মাঝে তফাত বুঝতে পারেনি হামিদা। এত বোকাও কেউ হয়!

দূরে আজানের ধ্বনি শোনা গেল। হামিদা পিটপিট করে তাকালো অন্ধকার ঘরে। ওর সারা শরীর অবশ। কোনো রকমে ঘাড় ফিরিয়ে ঘুমন্ত রবিনকে দেখল। উবু হয়ে শুয়ে আছে। এক হাতে জড়িয়ে ধরে আছে হামিদার নগ্ন কোমর। হামিদার বড়ো হাসফাস লাগে। সাবধানে, নিঃশব্দে রবিনের বাহুর পিঞ্জর খুলে নেমে এলো বিছানা ছেড়ে। অসংলগ্ন হাতে বেনারসি জড়িয়ে দরজা খুলে দুর্বল পায়ে বড়ো জোর দিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো। বেশিদূর এগোতে পারল না। কলপাড়ে বসে পড়ল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজল। কান্না ঠেলে এলো ওর ভেতর থেকে।

ভেবেছিল আজ ওর মুক্তি হবে। মুক্তি! আজ হামিদা নিজের অস্তিত্ব হাতড়ে বেড়ায় অন্ধকারে। রবিন ধূর্ত। মুক্তির লোভ দেখিয়ে ওর সর্বস্ব লুটে নিয়েছে। ভেতরে -বাহিরে কিছু আর হামিদার নিজের নেই। রবিনকে দোষরোপ করে। তিরস্কার করে। উঠে দাঁড়ায়। কলচাপতে শুরু করে। যেটুকু জোর আছে সবটুকু দিয়ে কলচাপছে। ওর কষ্ট হচ্ছে তবুও থামছে না। হঠাৎ অদৃশ্য থেকে কেউ কটাক্ষ করে,

“সব দোষ রবিনের? তুই বুঝি সাধু! কিছু বুঝিস না? এহ! ঠিকই বলে রবিন। তুই গর্দভ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো গর্দভ!”

“এত বোকা কেন হলাম! এখন আমার উপায় কী হবে? এ কী করলাম!”

হামিদা থমকে গেল। কলের হাতল ছেড়ে বসে পড়ল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারপর হুড়মুড়িয়ে মগ বালতিতে চুবিয়ে পানি তুললো। অনবরত ঢালতে লাগল মাথায়, সারা গায়ে। খসে পড়ল বুকের আঁচল। পানিতে ধুয়ে গেল পায়ের আলতার রঙ, চোখের কাজলের কালি। কিন্তু শরীরে রবিন যে দাগ দিয়েছে তা তেমনই রয়ে গেল।

হামিদার খেয়াল নেই। রবিন কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছে কলপাড়ে।

বালতির পানি শেষ হয়ে এলো। তবুও হামিদা মগ ফেলছে আর তুলছে। পানি নেই, ওইটুকুও বোঝে না। রবিন মগসমেত হাতটা ধরল। চেতনা এলো হামিদার। আঁতকে ওঠে, সংকোচে একটুখানি হয়ে গেল। পিছিয়ে যেতে রবিন ওর ভেজা শরীরটা নিজের নগ্ন বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে।

“ভেবেছিস কী, পানি দিয়ে ধুয়ে দিবি আমার স্পর্শ? এত সহজ। আমি তোর শিরায় শিরায় প্রবেশ করেছি রে, হামিদা। আমার থেকে আর তোর মুক্তি নেই!”

“আপনি কথা দিয়েছিলেন আমাকে!”

কাঁপা গলায় হিচকি তুলে বলল হামিদা।
রবিন ওর ভেজা চুলে হাত বুলায়, কপালে চুমু খায়। বলে,

“ওসব কথা গুল্লি মার! তুই আমার রে, হামিদা। আমার!”

“আপনি মিথ্যাবাদী, প্রতারক!”
হামিদা নিঃশব্দে কাঁদছে। রবিন মুচকি হাসল। তারপর ওর চিবুক তুলে ভেজা ঠোঁটের সবটুকু জল শুষে নিয়ে বলল,

“এই মিথ্যাবাদী, প্রতারকই তোর ভাগ্যে আছে৷ মেনে নে।”

হামিদা প্রতিবাদ করতে গেলে রবিন ওর ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন করল। হামিদা খামচে ধরে রবিনের বুক। রক্তাক্ত করে। রবিন উঁহু পর্যন্ত করল না। এমন সময় সদর দরজায় শব্দ হলো৷ রবিনকে ঠেলে লাফ দিয়ে উঠল হামিদা। কোনো রকমে গায়ে লাল বেনারসি জড়িয়ে দৌড়ে গেল দাদিজানের ঘরে৷ রবিন বুনো চোখে চেয়ে রইল সেদিক। পথে হামিদার আলতা ধোয়া পায়ের চিহ্ন রয়ে গেছে। রবিন বুকের রক্তে হাত রেখে বলল,

“তুই মানলে আমার, না মানলেও আমার, বিল্লি!”

চলবে….