Home "ধারাবাহিক গল্প হামিদা হামিদা পর্ব-৭০+৭১+৭২

হামিদা পর্ব-৭০+৭১+৭২

0
365

#হামিদা(৭০)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

রবিন মায়ের ঘরের বিছানায় ঘুমিয়ে গেল। ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন জেবুন্নেসা। কোলে রাখা মাথার চুলে বিলি কাটছেন। মর্জিনা সে সময় ঘরে ঢুকলো এঁটো থালাগুলো নেওয়ার জন্য। ফিরে যাবে তখনই নিচু ও শীতল গলায় বললেন,

“উনি কোথায়?”

“নাশতা খেয়ে উপজেলায় গেছেন। সঙ্গে জব্বারও গেছে!” বলল মর্জিনা। জেবুন্নেসা বললেন,

“যা, হামিদাকে ডেকে আন!”

মর্জিনা বেরিয়ে গেল। জেবুন্নেসা ঘুমন্ত ছেলের মলিন মুখে আরেকবার তাকালেন। কত শুকিয়ে গিয়েছে তার আদরের মানিক। ছেলেটা আগের মতো নেই। এত কষ্ট, এত দুদর্শায় কী করে ঠেলে নিলো নিজেকে! ও তো এমন ছেলে ছিল না যে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হতে চাইবে। সুখ বিলাসে গড়া তার রবিন। বাপের বড়ো আজ্ঞাবাহী ছিল। জেবুন্নেসা নিজের কষ্ট, নিজের জীবনের অন্ধকারের আঁচ ছেলের গায়ে পড়তে দেননি। তবুও সেই ছেলে লেলিহান শিখার ন্যায় জ্বলে উঠল। পিতার বিপক্ষে গেল! জেবুন্নেসা এ তো চাননি। ক্রমে ক্রমে তার মুখে আঁধার নামল।

আলগোছে ছেলের পিঠের শার্ট তুললেন। নড়েচড়ে উঠল ঘুমের মধ্যে রবিন। জেবুন্নেসা দেখলেন তার আদরের দুলালের পিঠে ভূঁইয়াদের গরিমার প্রতীক সেই লাঠির আঘাতের কালসিটে দাগ বসে গেছে৷ কাঁপা আঙুলে দাগের ওপর ছুঁয়ে দিতে কান্না ঠেলে এলো। আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলেন। পাছে রবিন শুনে ফেলে তাই ছেলের কপালে চুমু খেয়ে আস্তে আস্তে নেমে এলেন।

হামিদা আনত দাঁড়িয়ে আছে জেবুন্নেসার সামনে। ওর বড়ো ভয় ভয় করছে। জেবুন্নেসা ডাইনিং-এর চেয়ারে বসে আছেন। টেবিলের ওপর এক হাত রাখা। দৃষ্টি সদর দরজার বাইরে।

“তখন রবিন তোকে জড়িয়ে ধরেছিল কেন?”

“আমি জানি না। পানি খেতে এসেছিলাম। তার..তারপর শুনলাম দ..দরজার বাইরে কেউ ডাকছে। একটু কান খাড়া ক..করতে উনার গলা শুনতে পাই। দরজা খুলতে উনি জড়িয়ে ধরে মা, মা ডাকতে লাগলেন!” হামিদা আরও সুন্দর করে কথা সাজিয়েছিল। কিন্তু বড়োমায়ের সামনে তেমন গুছিয়ে বলা হলো না। ওর গা কাঁপছে। জেবুন্নেসা থম ধরে বললেন,

“তুই বলতে চাচ্ছিস, আমাকে মনে করে তোকে জড়িয়ে ধরেছিল?”

হামিদা ঢোক গিললো,

“মনে হয়!”

“মনে হয় বলছিস কেন রে, হারামজাদি?” জেবুন্নেসা চিৎকার করে ওঠেন,

“আমার রবিন জ্ঞাতসারে কোনোদিন তোকে ছোঁবে না। আর তুই বলছিস মনে হয়! আমাকে কি হনুফা বেগম ভেবেছিস রে, বান্দির বাচ্চা বান্দি! তোর মা তার নাকের ডগা দিয়ে দুই ছেলের সঙ্গে লটরপটর করেছে। আর উনি কিছুই দেখেননি, কিছুই জানেননি। চোখ থাকিতে অন্ধ, জবান থাকিতে বোবা। আমার চোখ এখনও পরিষ্কার বুঝেছিস! তখন তোর মুখ দেখে আমি স্পষ্ট বুঝেছি কিছু তো একটা লুকাচ্ছিলি। সত্যি করে বল, নয়ত ভূঁইয়া সাব আসলে তোর রক্ষা নেই!”

জেবুন্নেসার বিপি যেন লাফ দিয়ে উঠল তার ক্রোধের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। শ্যামলা মুখখানি অমাবস্যায় ঢেকে গেল। চাচির সব কথা মুখ বুঁজে শুনলো হামিদা। প্রতিবাদ করল না। ওর নীরবতায় ফুঁসে উঠলেন জেবুন্নেসা,

“জবান দেয় নাই আল্লাহ? কথা ক কইছি!”

“কিছুই লুকাচ্ছি না, বড়ো মা। একটু আগে যা বলেছি সব সত্যি ছিল। আমার মতো মেয়ের দিকে উনি ফিরে পর্যন্ত তাকাবেন না। আর আপনি..!”

হামিদা থমকে গেল কাঁধে ভারি একটা হাত পড়তে। ভরাট কন্ঠে রবিন বলল,

“কে কার দিকে তাকাবে না রে, বিল্লি?”

হামিদা চমকে তাকালো। রবিনের চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু। হামিদা আর্ত মুখে চাচির দিকে তাকায়। রাগে, বিস্ময়ে হতবিহ্বল জেবুন্নেসা। রবিনকে গোপনে কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো হামিদা। রবিন বিরক্তি প্রকাশ করে। অন্য হাতে কনুই চেপে ধরে বলে,

“কী সমস্যা তোর! গুতাগুতি করছিস কেন?”

“রবিন!” মায়ের ধমকে সচকিত হলো যেন রবিন। হামিদার কনুই ছেড়ে চোখ ডলে মাকে বলল,

“তুমি এখানে বসে আছো, মা? আমি সারা বাড়ি তোমাকে খুঁজে হয়রান!”

অথচ, মাত্র মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে ও। জেবুন্নেসা কড়া চোখে হামিদার কাঁধে রাখা ওর হাতটার দিকে তাকিয়ে আবার হামিদার পান্ডুর মুখে তাকালেন। সন্দেহ এবার পোক্ত হলো। হামিদা রবিনকে ফিসফিস করে বলল,

“বড়োমা দেখছে। কাঁধ থেকে হাত সরান, রবিন ভা..!”

“থাপড়াইয়া তোর জিহ্বা ব্যথা করে দিবো রে বিল্লি! কীসের ভাই ভাই করছিস? মা, আমি কি ওর ভাই হই?”

রবিন বালকের ন্যায় প্রশ্ন করল মাকে। জেবুন্নেসা কটমট করলেন,

“তাহলে কী তুই ওর?” কাঁধে রাখা হাতটার দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে ধমকে ওঠেন,

“হাত সরা ওর কাঁধ থেকে!”

রবিন ভুরু কুঁচকালো। হাত সরালো না। হামিদা নড়ল বলে কাঁধ চেপে গাল ফুলিয়ে বলল,

“তুমিও না মা, কিছুই বোঝো না। ওকে কি বোন বলে মানি?”

হামিদার দিকে বুনো চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আরেকবার ভাই বললে আমার বাচ্চার মা বানিয়ে ছাড়ব তোকে। গর্দভ কোথাকার!”

জেবুন্নেসা ফিসফিস ছাড়া কিছুই শুনলেন না। কিন্তু ওইটুকু আর বরদাস্ত করতে পারলেন না।

“রবিন!” মায়ের সতর্ক গলা শুনে রবিন হামিদার কাঁধ ছেড়ে দিলো। তারপর ওর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,

“ঘরে যা!”

হামিদা দাঁত পিষল। চাচির দিকে তাকালো সভয়ে। রবিন মা, মা বলে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। জেবুন্নেসার চোখে-মুখে সন্দেহ। হামিদার এত সহজে নিস্তার নেই। তবে এখনকার মতো রবিনের ছল চাতুরীর কারণে মুক্তি পেল। তাড়াতাড়ি কেটে পড়ল। রবিন মায়ের কাঁধে মাথা রেখে দেখল হামিদার চলে যাওয়া। ওর এই চোখে ঘুমের রেশ নেই।

“সত্যি করে বল রবিন, তুই আমাকে ধোঁকা দিচ্ছিস না তো?”

মুখে তোলা লোকমা স্থির হলো। রবিন তাকালো মায়ের বিমর্ষ ও আহত মুখে। লোকমা মুখে পুরে বলল,

“ধোঁকা? কী বলছ?”

“ভনিতা করিস না! আমি তোকে পেটে ধরেছি, তুই আমাকে পেটে ধরিসনি, রবিন। রাতে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলি। এখন আমি সামনে বসে আছি জেনেও ওর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিস। কেন? আগে তো এমন করতি না! সত্যিটা বল আমাকে রবিন। ও তোকে ফুসলেছে না? কী করেছে বল না!”

“কিছুই করেনি ও, মা।”

“মিথ্যা বলছিস! মাকে মিথ্যা বলিস না, রবিন।”

ভাতের প্লেট চেটেপুটে খেয়ে পানি পান করল রবিন। তারপর শব্দ করে ঢেঁকুর তুললো। অথচ, খাবারটা খেয়ে ও তৃপ্তি পায়নি৷ মায়ের সামনে স্বাভাবিক থাকার সে কী চেষ্টা! ওর মা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। রবিনের বুকে বড়ো লাগল। অপরাধ যা করার করেছে। এখন সেটা শুধরাবে কেমন করে? সত্যি বললে ওর মা আরও আঘাত পাবে। আর মিথ্যা বললে হামিদাকে অস্বীকার করা হবে। কী করবে রবিন! মাথার চুল টেনে ছিঁড়বে?

“ও মা, হামিদাকে এত অপছন্দ করো কেন তুমি?”

জেবুন্নেসা জবাব চেয়েছিলেন, এই প্রশ্ন নয়। ধাক্কা খেলেন। সময় লাগল ধাতস্থ হতে।

“তুই জানিস না! এতকাল পরে এসে এই কথা কেন জিজ্ঞাসা করলি? কেন আমার প্রশ্নের বিপরীতে এই প্রশ্ন করলি?”

রবিন তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,

“আচ্ছা ভুল হয়েছে। উত্তেজিত হয়ো না, মা। তোমার বিপি বেড়ে যাবে।”

জেবুন্নেসা বললেন,

“আমার প্রশ্নের জবাব না দিলেও বিপি বাড়বে। হিতাহিতজ্ঞান হারাব। সত্যি বল, রবিন!”

রবিন চুপ করে রইল। ওর দৃষ্টি স্থির মায়ের শঙ্কিত মুখে। হাঁপ ছাড়ল। বলল,

“সত্যি বললে তোমার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার চান্স আছে। থাক না, মা। বাদ দাও!”

“রবি..!”
জেবুন্নেসার কথা শেষ হলো না। ঠিক সেই সময় সরোয়ার ঢুকলো ভূঁইয়া বাড়িতে। হাতে মিষ্টির ব্যাগ। বেশ পরিপাটি হয়ে এসেছে।

“কাকি আম্মা, ভালো আছেন?”

“হ্যাঁ, তুমি কেমন আছো সরোয়ার?” থতমত খেয়ে বললেন জেবুন্নেসা। মহসিন কবির ভূঁইয়া পরপরই ভেতরে এলেন। পেছনে জব্বার।

“সফুরা, সরোয়ারের হাত থেকে মিষ্টির ব্যাগগুলো নিয়ে যা!”

জেবুন্নেসা বললেন,

“সফুরা ও মর্জিনাকে একটা কাজে বাইরে পাঠিয়েছি।”

সরোয়ার টেবিলের ওপর রাখল ব্যাগটা। পাঁচ প্যাকেট মিষ্টির বাক্স। রবিন ভুরু কুঁচকে রইল মিষ্টির দিকে। কোন উদ্দেশ্যে সরোয়ার এত মিষ্টি নিয়ে এ বাড়িতে এলো?

সরোয়ার এগিয়ে এসে জেবুন্নেসার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে বিব্রত হলেন সে। বললেন,

“আরে এসব করছ কেন? থাক না!”

“কী যে বলেন না, কাকি আম্মা! আপনি মুরুব্বি মানুষ। আপনার একটা সম্মান আছে না?”

রবিনের দিকে ফিরে বলল,

“তা কেমন আছো, রবিন? শুনলাম রাগ করে বাড়ি ছেড়েছিলে? রাগ কমেছে বুঝি?”

রবিন জোরপূর্বক মাথা দুলালো। পিতার কঠোর চাহনি এড়িয়ে গেল। মহসিন কবিরের সঙ্গে এসে অব্দি কথা বলেনি ছেলেটা। ওর কি ক্ষমা চাওয়ার কথা নয়? অন্তত অনুতপ্ত তো হবে। কিন্তু ওর মুখ অনুতাপহীন। স্ত্রীকে আবারো কি ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন? ভাবলেন, এখন থাক। স্ত্রীকে বললেন,

“অফিস ঘরে চা নাশতা পাঠাও। চলো সরোয়ার!”

সরোয়ার আবারো ক্যাবলামি করে হাসতে হাসতে মহসিন কবিরের পিছু নিলো। রবিন মুখ বিকৃত করে বলল,

“শুয়োরটা কী করতে এসেছে?”

“আস্তে বল, শুনবে!” জেবুন্নেসা সতর্ক করলেন। পাছে কেউ শোনে তাই নিচু গলায় পূর্বের কথার জের টেনে বললেন,

“তুই কিন্তু এখনও সাফ সাফ কিছু বলিসনি, রবিন। ভাবিস না আমি কিছু বুঝি না। শুনে রাখ, ওকে আমি কোনোদিন পুত্রবধূ হিসেবে মানবো না। মরে গেলেও না!”

জেবুন্নেসা সদর দরজার বাইরে চলে গেলেন। ভীষণ রেগে আছেন। মহসিন কবির ভূঁইয়ার ভয়ে আর কথা বাড়ালেন না। এ যাত্রায় রক্ষা পেল রবিন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বসে রইল। তারপর হেলান দিলো চেয়ারে। পকেট হাতড়ে অলির জিপ্পো লাইটারটা বের করে আনল। জ্বালালো আর নিভালো। ওর মাথার ভেতর বড়ো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে পড়ছে অতীত জীবন।

হামিদা ওর জীবন বদলে দিয়েছে। বড়ো জটিল করেছে। না, দোষ হামিদার নয়। দোষ রবিনের। অথচ, এই দোষের দাগ রবিন চন্দন মনে করে সারা দেহে লেপটে নিয়েছে। তবুও হামিদাকে ত্যাগ করার কথা কল্পনা করতে পারবে না। ভয়! শুধু মাকে নিয়ে ওর ভয় হয়। তাছাড়া আর কীসের ভয়? চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সরোয়ারের আনা মিষ্টির একটা বাক্স খুলে দুটো চমচম মুখে নিলো। স্বাদ পেল না। থু, থু করে ফেললো। তারপর দাদিজানের ঘরের দিকে যেতে যেতে শিষ বাজায় বলিউডের বিখ্যাত সেই গানের সুরে,

“যব পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া,
যব পেয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া।

পেয়ার কিয়া কোই চোরি নেহি কি,
ছুপ ছুপ আহে ভরনা কিয়া….”

অফিস ঘরে কথা বলতে বলতে শুনলেন সেই শিষ মহসিন কবির ভূঁইয়া। তার কপালে ভাঁজ পড়ল। রবিন উচ্চস্বরে কোনোদিন শিষ বাজায়নি পূর্বে। জব্বার ভুলেও তার চোখে চোখ রাখল না। বড়ো শ্যেনচক্ষু মহসিন কবির ভূঁইয়ার। পাছে রবিনের গানের অর্থ ধরে ফেলেন। এত কিছুর পরেও রবিনের শিক্ষা হলো না! ফের সেই স্পর্ধা!

সরোয়ার হাসল দাঁত বের করে,

“আনারকলির গান সেলিম গায়। হে, হে, হে! ছ্যামড়ার মাথা খারাপ হইছে। হে, হে, হে!”

মহসিন কবির ভূঁইয়ার গম্ভীর মুখ আর নির্মোহ দৃষ্টি দেখে সরোয়ার হাসি থামিয়ে দিলো। গলা ঝাড়ল। হাত দিয়ে পাতলা চুল টেনে পেছনে আচরে নিলো। তারপর বলল,

“কোথায় যেন ছিলাম আমরা ভূঁইয়া সাব?…. ওহ, হামিদাতে!”

চলবে….

#হামিদা(৭১)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

হামিদা দাঁড়িয়ে আছে মহসিন কবির ভূঁইয়ার সামনে। আনত, সংকুচিত। মনে অজানা শঙ্কা! মহসিন কবির সরাসরি তাকালেন না ভাতিজির দিকে। টেবিলে রাখা খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

“ঢাকার খবর কী?”

ঢাকার খবর অর্থ কী জানতে চাচ্ছেন হামিদা বোঝে। ওই তো মর্তুজা আর সুরাইয়া মৌলির কথা। হনুফা বেগম আর হামিদা ছাড়া এ বাড়ির কেউ তাদের খোঁজ খবর রাখে না। এখন তো এদের সামনে কথা বললেও রুষ্ট হয়। সুরাইয়া মৌলির সঙ্গে তাই আর আগের মতো কথা বলে না হামিদা। এ নিয়ে খুব বেজার সে। হামিদা বদলে যাচ্ছে, সোনা মাকে ভুলে যাচ্ছে ইত্যাদি কত অনুযোগ। কিন্তু হামিদার অনুযোগ প্রকাশ পায় না।

“কথা হয়নি অনেকদিন। বোধহয় ভালো আছেন!” মিথ্যা বলল হামিদা। মিথ্যা বলতে ওর ভালো লাগে না। বড্ড অস্বস্তি হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে তাতেই যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

মহসিন কবির কিছুক্ষণ আবার নীরব। জবাব শুনে সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি নিজেও চান না ওদের সঙ্গে কোনো রকমের যোগাযোগ রাখুক হামিদা৷ সুরাইয়া মৌলির সঙ্গে তো নয়ই৷ বললেন,

“তোর বাপটা একখান মানুষ। মেয়ে জন্ম দিয়ে খালাস। ঢাকায় যাওয়া অব্দি কথা বলেছে তোর সঙ্গে?”

হামিদার মুখ লজ্জায় লাল হলো। মাথা নাড়ায় দুদিকে। মহসিন বললেন,

“তাহলে বোঝ কেন সেদিন ওসব কথা বলেছিলাম তোকে। শোন হামিদা, জন্ম না দিই কিন্তু তোর বাপের চেয়ে কম নই আমি। কী করিনি তোর জন্য বল তো! আর ওই মর্তুজা ও মৌলি, ঢাকায় আরাম আয়েসে সংসার পেতে বছরে একবার এসে তোর সঙ্গে ভালোবাসার নাটক করে যায়৷ তুই এখন বড়ো হয়েছিস। বুঝিস তো সবকিছু। কে তোর আপন আর কে তোর পর, তোকে কি বুঝিয়ে দিতে হবে?”

হামিদা আবারো দুদিকে মাথা নাড়ায়। মাথা হেঁট হয়ে যায়। মহসিন কবির চশমার ওপর থেকে চোখ তুলে দেখলেন। তারপর বললেন,

“তোকে আমি যতই আমার ছায়ায় মানুষ করি না কেন, তুই যে শিউলির মেয়ে একথা সূর্যের আলোর মতো সত্য। গ্রামের আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো কপাল হবে না তোর। মায়ের কলঙ্কের দাগ তোকেও বহন করতে হবে। গ্রামের মানুষকে তো জানিস। কোথাও ভালো বিয়ের কথা উঠলে তোর মায়ের কুকীর্তি, তোর বাপের আলাদা সংসার সব চাউর হয়। আমি কি চাই না তোর ভালো জায়গায় বিয়ে হোক, সুখে থাক! কিন্তু সব শুনে তারা কিছুতেই তোকে ঘরের বউ করতে চায় না। তখন আমার কী করার থাকে বল। তুই তো মনে হয় রাগ করে আছিস যে, গতবার বড়ো আব্বা আমাকে ওমন খারাপ লোকের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। লোকটা খারাপ ছিল না, বুঝলি! ফাঁসানো হয়েছে তাকে। কে ফাঁসিয়েছে জানিস? থাক! আর সেসব কথা না তুলি!”

মহসিন কবির ভূঁইয়ার মেজাজ বিগড়ে গেল। হামিদার সামনে আজ মেজাজ হারালে চলবে না। ঠান্ডা মাথায় মেয়েটার সঙ্গে কথা না বললে আপোষে কাজ হবে না। গতবারের ভুল এ বার আর করবেন না। এইবারের লস বড়ো ঝুঁকি বয়ে নিয়ে আসবে। সামনে নির্বাচন। সরোয়ার কথা দিয়েছে প্রচারণার কাজের সকল ব্যয়-ভার নেবে। তার জয় সুনিশ্চিত করবে৷ শুধু এইবার নয় প্রত্যেকবারই। হামিদাকে লালন-পালন বৃথা গেল না। গলা ঝেড়ে বললেন,

“এবার ভালো একখান বিয়ের প্রস্তাব এসেছে তোর জন্য। ছেলে..!”

“আমি এখনই বিয়ে করব না, বড়ো আব্বা!” মহসিন কবিরের কথা শেষ করতে দিলো না হামিদা। এত সাহস! জিহ্বা কামড়ে ধরে হামিদা। ভয়ও পেল। ভাবল এবার মার খাবে নিশ্চিত। তা হলো না। মহসিন কবির রাগ গোপন করে শান্ত গলায় বললেন,

“এখন বিয়ে করবি না আবার কী রে? বললাম না গতবারের মতো ভুল হবে না। আমি থাকতে তোর ভয় কীসের, পাগলি! কাছে আয়!”

হাত ইশারা করে ডাকলেন। হামিদা ইতস্তত করে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মহসিন কবির উঠে দাঁড়াতে ভয় পেল। ওকে অবাক করে দিয়ে তিনি মুচকি হাসলেন। ও হাসি স্বস্তি দেয় না মোটেও৷ মাথায় হাত রেখে বললেন,

“ভালো ঘরের ছেলে। অর্থ-সম্পদ আছে। ওখানে গেলে তোর সুখ হবে। মাকে নিয়ে ভাবিস না। সফুরা আছে তো। ও দেখবে!”

প্রতিবাদ ঠেলে এলো হামিদার। কিন্তু মহসিন কবিরের হাত ওর মাথায়। মুখ খুললে সে হাতের চড় গালে পড়তে সময় লাগবে না। দেওয়ালে এখনও চাবুকটা ঝুলছে। হামিদা হ্যাঁ, না কিছুই বলল না। মহসিন কবির ধরে নিলেন সম্মতি। খুশি হবেন তখনই হামিদা সভয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

“আমি আরও পড়াশোনা করতে চাই, বড়ো আব্বা। এখনই আমাকে বিয়ে দেবেন না, দোহাই!”

তারপর চোখ খিঁচে রইল। ভাবল এই বুঝি চড়টা গালে পড়ে। কিন্তু পড়ল না। তবে বিরক্ত হলেন মহসিন কবির। বললেন,

“এসএসসিতে এ প্লাস পাস নেই। যা রেজাল্টের বাহার তোর ওতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হতে পারবি না। পড়াশোনা করে করবিটা কী? কেরানি, মাস্টান্নি হবি? ভূঁইয়া বাড়ির মেয়েরা বাড়ির বাইরে গিয়ে শহরে একলা থেকে পড়বে এ হবে না। বিয়ে দিয়ে দেবো তারপর জামাই চাইলে যা পড়ার, যেখানে পড়ার পড়িস।”

হামিদা ঠোঁট আলগা করতে মহসিন কবির মাথার ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। ভয়ে পিছিয়ে গেল হামিদা। কণ্ঠরোধ হয়ে এলো। মহসিন কবির চেয়ারে বসে নিজের সরূপে ফিরলেন,

“মাকে আমি সব খুলে বলব। তিনি রাজি হলে তোর অমতের কিছু দেখি না। নিজের ভালো বোঝার বয়স কি হইছে তোর? আমি তোর অভিভাবক। আমি যা করব তাতেই তোর মঙ্গল। যা এখন!”

হামিদা অফিস ঘর থেকে বের হয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিলো। নিজেকে ধিক্কার দিলো। এত ভীরু কেন! কেন মহসিন কবিরের সামনে শক্ত হয়ে, দৃঢ় গলায় প্রতিবাদ করতে পারল না! জীবনটা ওর। সিদ্ধান্ত ও নেবে। কেন সকলে যে যার মত করে বার বার নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেয়। নিজেকে আঘাত করে শাস্তি দিতে ইচ্ছে করল।

চোখ মুছে বাড়ির বাইরে যাচ্ছিল। মোহনার কাছে যাবে। যেখানে গেলে ও একটু শান্তি পায়। এ বাড়ির ভেতর অসহ্য লাগছে। কিন্তু রবিন পথ আটকালো।

“কোথায় যাস?”

“যেখানে মন চায় সেখানে!” হামিদা পাশ কাটতে হাত ধরল।

“তেজ দেখাচ্ছিস কেন সকাল সকাল? কাঁদছিলি? কী হয়েছে বল!”

রবিনের কপাল কুঁচকে গেল। হামিদা রেগে যায়। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,

“আমি কাঁদলে আপনার কী? আমার কপাল হয়েছে কাঁদার। কাঁদব না তো কী হাসব?”

“ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলছিস কেন রে, বিল্লি? বল কী হয়েছে?”

রবিন কাছে টেনে নিয়ে এলো। বসার ঘরে যে কেউ চলে আসতে পারে। রান্না ঘরে টুং-টুং শব্দ হচ্ছে। জুবিনের ঘরের দরজা খোলা। রবিনের সাহস এত বেড়েছে! কিন্তু ধরা খেলে ফাঁসবে তো হামিদা।

“ছাড়ুন কেউ দেখে ফেলবে!” সভয়ে বলল হামিদা। রবিন কোমর জড়িয়ে ধরে। কপালে কপাল রাখল,

“তাহলে বল কী হয়েছে? কেন কাঁদছিলি?”

হামিদা কম্পিত ঠোঁট কামড়ে আনত হলো। রবিন চিবুক তুলে বৃদ্ধাঙুলে দাঁতের অত্যাচার থেকে রেহাই দিলো নিচের ঠোঁটটাকে। হামিদা মিনমিনে গলায় বলল,

“বড়ো আব্বা ডেকেছিলেন আমাকে। আমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। সম্মতি জানতে চেয়েছিলেন!”

রবিনের চোয়াল কঠিন হলো। বাপটার ওপর আকাশ সমান রাগ হলো। ক্রোধে দাঁতে দাঁত পিষল। বলল,

“তুই কী বলেছিস?”

“কী বলব!” হামিদা কড়া চোখে তাকালো। রবিন ওর চোয়াল চেপে ধরে,

“সত্যি বলবি। বলবি তোর বিয়ে হয়ে গেছে। তুই তার ছোটো পুত্রবধূ৷ এ বাড়ির ভবিষ্যৎ গৃহকর্ত্রী!”

হামিদা তাকিয়ে রইল। খামচে ধরে রবিনের বুক। তারপর শ্লেষ হাসল,

“এই সত্যিটা আপনি বলতে পারেন না? জোর করে বিয়ে করতে পারেন, মিথ্যা বলে বাসর করতে পারেন; আড়ালে বউ বউ ডেকে মুখে ফেনা তুলতে পারেন আর বাপের সামনে আমাকে সত্যি বলতে বলেন? ভীরু, কাপুরুষ! চেয়ে চেয়ে দেখেন খালি কীভাবে আপনার বাপ আমাকে আরেকজনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়।”

রবিন চোয়াল ছেড়ে হামিদার গলা চেপে ধরে। বুনো দৃষ্টি। মুখখানা কঠিন। হামিদার শ্বাস রোধ হয়ে এলো। ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর জব্বার ঢুকলো। ঘর থেকে জেবুন্নেসা বেরিয়ে আসলেন। পিনপতন নীরবতা নামল বসার ঘরে। হামিদার চোখে-মুখে ভয়। কিন্তু রবিন ক্রুর হাসল। তাকালো জব্বারের দিকে এক পলক। ও চোখে ভয়-ডরের রেশ নেই। বরং জব্বারকে উসকাচ্ছে যেন। লোকটা হাত মুঠ করে দাঁড়িয়ে রইল।

হামিদা খামচে ধরল রবিনের বুক। রবিন উঁহু পর্যন্ত করল না। জেবুন্নেসা জব্বারকে দেখে ছেলেকে ধমক দিয়ে উঠলেন,

“কী করছিস তুই, রবিন? ছাড় ওর গলা! আরে মেরে ফেলবি না কি!”

মনে মনে বললেন,”ও মরুক আমার দুশমনের হাতে। তুই কেন ওকে ছুঁতে যাস বার বার বজ্জাত ছেলে!”

রবিন মাকে শুনিয়ে বলল,

“ওর জবান বড়ো ধারালো হয়েছে, মা। একটু শাস্তি না দিলে শায়েস্তা হবে কী করে!”

তারপর হামিদার গলায় রাখা হাত ঢিলে করল। শ্বাস নিলো হামিদা। সরে যাবে তখনই রবিন চাপা স্বরে বলল,

“আমার বাপ কেন পৃথিবীর কারো বাপের সাধ্য নেই আমার বউকে অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে দেয়। তোর বিয়ে যদি একশবার হয়, তবে সেটা আমার সঙ্গেই হবে।”

“খালি মুখেই ফটর ফটর। বউ বলে স্বীকৃতি দেওয়ার মুরোদ আছে আপনার? ওই তো জব্বার ও বড়ো মা দাঁড়িয়ে আছে। বলেন ওদেরকে আমি আপনার কী হই? পারবেন? পারবেন না। এজন্যই আমি কাঁদি। দুর্বল তো ছিলামই আমি। আপনি আমাকে অসহায় করেছেন। বলেছিলেন না আপনি আমার মেরুদণ্ড হবেন? ভুল বলেছিলেন। আসলে আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো দুঃখ, হাসনাইন কবির রবিন!”

হামিদার এক একটা বাক্য তিরের মতো এসে বিঁধল রবিনের মগজে। হাত খসে পড়ল ওর গলা থেকে। বুনো চোখ বদলে গেল। নিদারুণ এক মন্দ লাগায় বুকের ভেতর ভার হয়ে আসে।

হামিদা আবার চোখ মুছল। মাথা নত করে জব্বারের পাশ কেটে বাড়ির বাইরে চলে গেল। জব্বার নাখোশ মুখে দেখল। পাত্তা দিলো না। জেবুন্নেসা ছেলেকে কথা শুনাতে লাগলেন। রবিন সেটাও শুনলো না। ঘরে ফিরে যাচ্ছিল তখনই সামনে জুবিনকে দেখল। বড়ো প্রসন্ন মুখ। রবিনের দুর্দশা ওকে বেশ আনন্দ দেয়। রবিনের তা সহ্য হবে কেন!

“ব্রাদার, মিস মি?”

জুবিনের গলা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। জেবুন্নেসা ও জব্বার ভুরু কুঁচকে রইল। এই ছেলে এমন কেন! রবিন ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি যে বাড়ি ফিরে এলাম সকলে এলো, দেখা করল। কিন্তু আমার রক্তের আপন ভাই একবার সামনে এলো না। কেন মা? এমন নির্দয় কেন তোমার আদরের দুলাল?”

“ছাড় আমাকে!” জুবিন ঠেলে সরিয়ে দেয়। রবিন গাল ফুলিয়ে অভিমানী বালকের ন্যায় বলল,

“দেখলে তো, মা! আর তুমিই বলো ওকে আমি হিংসে করি, জ্বালাই। আসলে ও আমাকে দেখতেই পারে না। এ বাড়িতে ফিরে না এলে সবচেয়ে বেশি খুশি তোমার এই ছেলেটা হতো। ঠিক না, বল!”

“অবশ্যই ঠিক। তুই ফিরে এলি কেন? তুই ছিলি না ভূঁইয়া বাড়িতে শান্তি আর শান্তি ছিল। কী নিরিবিলি ছিলাম। আসতেই তো সারা বাড়ি মাথায় তুলে নাচাচ্ছিস।” রাগ ঝাড়ল জুবিন।

“শুনলে মা!” রবিন ফের অনুযোগ করল।

“রবিন!”জেবুন্নেসা ঝামেলা করতে নিষেধ করলেন। কিন্তু রবিন ঝামেলা না করে থাকার ছেলে। জুবিন কেন ওই কথা বলল তা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়ল। জুবিনের সঙ্গে ঝগড়া করল। তারপর বাড়ির বাইরে চলে গেল। জব্বার অফিস ঘরের দিকে যাচ্ছিল। জেবুন্নেসা ডাকলেন,

“তাকে কিছু বলো না, জব্বার।”

জব্বার তাকিয়ে রইল জেবুন্নেসার গম্ভীর মুখে। তারপর মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। জুবিনের মেজাজ বিগড়ে দিয়ে গিয়েছে রবিন। মায়ের ওপর রাগ হলো। বলল,

“সব জেনেও ছেলের দোষ ঢাকছ, মা? ভেবেছ এ আর কী! সামান্য গলা ধরি-ধরিই তো, না?”

“তুই কিছু জানিস না তাই চুপ করে থাক। যেমনই হোক ভাই হয় রবিন তোর। ওমন হিংসে করিস কেন?” বিরক্ত হয়ে বললেন জেবুন্নেসা। জুবিনের মুখ কালো হলো। বলল,

“হিংসে করি? আমি! তুমিও না মা, পেটে রাখলে তবুও ছেলেদের চিনলে না!”

“জুবিন!”

“চেঁচালে সত্য ঢেকে যাবে না, মা। যেটাকে ছেলেমানুষী ভাবছ সেটা আসলে ছেলেমানুষী নয়। ও ছেলে তোমার বড়ো সেয়ানা। তোমার ছেলে ওই হামিদার কাঁধে হাত রাখে, গলা ধরে কেন জানো?”

“জানি, খুব জানি! রবিন ওকে ঘৃণা করে। ওকে দেখলে ওর রাগ ওঠে। সহ্য করতে পারে না তাই ওমন করে, শাস্তি দেয়!”

কথাগুলোর সত্যতা নিয়ে জেবুন্নেসা নিজেও সন্দিহান। জুবিন হাসল। বলে,

“বলো তো মা, মানুষ যাকে সহ্য করতে পারে না, তাকে কি জোরপূর্বক বিয়ে করে? রাতে সকলের চোখের আড়ালে ঘরে ডেকে আনে? তুমি বড়ো সরল, মা জননী। বড়ো বোকা!”

জুবিন হাসতে হাসতে হুইলচেয়ার ঠেলে এগিয়ে গেল। জেবুন্নেসার মুখের রঙ উড়ে গেল। মাথা চক্কর দিলো। তারপর পড়ে গেল সেখানে। থমকে গেল জুবিন। ওর যেন বোধোদয় হলো। অনুতাপ ও ভয়ে জমে রইল। ধাতস্থ হতে মায়ের অচেতন শরীরের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। চিৎকার করে ডাকল রবিনকে। কিন্তু রবিন বাড়িতে নেই। সফুরা আর মর্জিনা দৌড়ে এলো। একটু পর জব্বার আর মহসিন।

চলবে….

#হামিদা(৭২)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

জেবুন্নেসার শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে ডানপা’টা একেবারে নাড়াতে পারছেন না। কথা অস্পষ্ট। চোখের সামনে ঝাপসা দেখছেন। ছেলেদের চিনতে তার দেরি হয়। দেখলে অস্পষ্ট আওয়াজ করেন। হঠাৎ শুনলে মনে হবে চাপা আর্তনাদ করছেন। মায়ের এই অবস্থার দায় রবিন পুরোটাই নিয়েছে। ওর ভেতরটা অপরাধবোধে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।

যে জুবিন কালেভদ্রে ঘরের বাহির হতো, আজকাল প্রায় রোজই হাসপাতালে থাকে। সফুরা রোজ খাবার নিয়ে এসে দেখে যায়। মর্জিনা জেবুন্নেসার দরকারে থেকে যায়।

জুবিনের অবস্থা বেহাল। নাওয়া-খাওয়া নেই একপ্রকার। সফুরার বড়ো মায়া হয় মানুষটার জন্য। এখানে ওই মানুষটা থেকে কতটুকই আর লাভ হয়! দৌড়াদৌড়ি সব জব্বার বা রবিনই করে। জুবিন হুইলচেয়ার ঠেলে কতদূর যেতে পারবে। এই অসহায়ত্ব ওকে ফ্রাস্ট্রেটেড করে তোলে। জেবুন্নেসার থেরাপির প্রসঙ্গে সফুরা ওকে বলে,

“নিজের পা দুটোর কথাও একবার ভেবে দেখবেন।”

রবিনের সঙ্গে জুবিনের কথা একেবারে বন্ধ। দুই ভাই মায়ের বেডের দুপাশে কিছু সময় থাকে। কিংবা একজন ভেতরে বসলে আরেকজন বাইরে থাকে। এর বেশি ওদের আর সাক্ষাৎ হয় না। কিন্তু মহসিনের সঙ্গে জুবিনের রোজ হাসপাতালে দু তিনবার করে দেখা হয়। স্ত্রীর খোঁজ খবর নিতে এতবার হাসপাতালে আসছেন যে হাসপাতালের কর্মচারিরা পর্যন্ত তার দায়িত্বজ্ঞানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ওর মায়ের প্রতি বাবার এই দায়িত্বজ্ঞানী হয়ে ওঠা কেন যেন জুবিনের হজম হয় না। এই লোক কোনোদিন ওর মায়ের পরোয়া করেনি। উলটো কারণে-অকারণে অত্যাচার করেছে, ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে। ওর মা জেবুন্নেসা একসময় রাগে-দুঃখে ভূঁইয়া বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু জুবিন ওই সময় ওর অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল তার গর্ভে। জেবুন্নেসা আত্মসম্মান পায়ে পিষে আবার ফিরেছিলেন ভূঁইয়া বাড়িতে। সেই যে নত হলেন সন্তানের জন্য, আর মাথা তুলতে পারেননি। এরপর রবিন জন্ম নেয়। জেবুন্নেসার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ছেলেদের ভূঁইয়া বংশের উপযুক্ত উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে তোলা। তাই করতে করতে তিনি আমূল পাল্টে গেলেন। কিন্তু ওদের বাবা নামক মানুষটা কোনোদিন সেই পরিবর্তনে ভ্রুক্ষেপ করেনি। একটা মেয়ের সরলতা, সুন্দর জীবন ধ্বংস করে; বদরাগী, ঈর্ষাপরায়ণ নারীতে রূপান্তরিত করে বিন্দু পরিমাণ অনুতাপ দেখা যায়নি লোকটার মধ্যে। এই তো যেদিন দূর্ঘটনা ঘটল তার পরেও স্ত্রীর জন্য চিন্তা ছিল না৷ হঠাৎ সেই স্ত্রীকে দেখতে দিন রাত কেন ছুটে আসেন এখন? মহসিন কবির হাসপাতালে এলে জুবিন সুক্ষ্ম চোখে তার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু বাবার মতো দুর্বোধ্য লোককে এত সহজে বুঝে ওঠে না ও।

সূর্য ডুবে গিয়েছে। পশ্চিমে রাঙা গোধূলির কোল ঘেঁষে উড়ে যায় নীড়ে ফেরা পাখির ঝাঁক। মানুষ ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছে। বাজারের দোকানগুলো থেকে ভেসে আসে জিলাপি, সিঙ্গারা, পেয়াজু ভাজার সুবাস! আজ হাঁটবার। রাস্তায় মানুষের বেশ ভিড়!

রবিন মাকে দেখে হাসপাতাল থেকে ফিরছিল বাইকে করে। মাথায় আজ হেলমেট নেই। চুলগুলো উড়ে এসে কপালে পড়ছে। অনেকদিন চুল কাটে না। ঘাড়ে নেমে গেছে। নির্ঘুম চোখদুটো কেবলই পুড়তে থাকে। মাথার ভেতর ভোঁতা যন্ত্রণা। আজকে বাড়ি গিয়ে গোসল করে টানা ঘুম না দিলে হয়ত নির্ঘাৎ অচেতন হয়ে পড়ে যাবে। কিন্তু হাসপাতালে শয্যাশায়ী মায়ের অসন্তুষ্ট দৃষ্টি, আর্তনাদের গোঙানি ওকে ঘুমাতে দেয় না। বুকের ভেতর সেসব পাহাড় সমান ভার হয়ে চেপে বসে। তার ওপর হামিদাকে নিয়ে চিন্তা। রবিন হাসফাস করে। ভেবেছিল বাবা ওকে ডেকে সেই আচরণের জন্য শাসালে সব সত্য বলে দেবে। জব্বার ওর অসুস্থ মায়ের কসম দিয়ে শান্ত করেছে। কিন্তু শান্ত কি আদৌ হয়েছে রবিন!

সরোয়ারের কুৎসিত ছায়া পড়েছে হামিদার ওপর। মহসিন কবির লোভে পড়ে ভাতিজিকে বলি দিতে দু বার ভাববেন না। আপন মেয়ে না হোক ভাইয়ের মেয়ে তো! তার চোখের সামনে বড়ো হয়েছে। তাহলে কী করে এত নিষ্ঠুর পাষণ্ড হতে পারেন তিনি? জব্বার! রবিন দাঁতে দাঁত পিষল। সেদিন জব্বার বাধা না দিলে ও কী করত জানে না। এখনও যখন ভাবে মাথায় খুন চেপে যায়। শুধু অসুস্থ মায়ের কথা ভেবে চুপ করে আছে।

হামিদার দিকে কেউ হাত বাড়ালে কাউকে ছাড়বে না ও। জন্মদাতা বাপকেও না। আজকাল বাড়ির বাইরে থাকলে রবিনের মনে অজানা আশঙ্কা জাগে। হামিদাকে পই পই করে বলো এসেছে নাম পরিচয় না জেনে খবরদার যেন দরজা না খোলে। এমনকি ওর অবর্তমানে মহসিন কবির ভূঁইয়ার উপস্থিতিতেও সরোয়ারের সামনে না যায়। তাতে যা হয় রবিন দেখে নেবে। ও জানে এই কথার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা মোটেও করছে না। ওর বাবা যদি হামিদাকে জোর করে তবে ও রুখে দাঁড়াবে। তার সেই সিদ্ধান্তের কথা মনে পড়লে চাপা আক্রোশে রবিনের কপালের রগ ফুলে ওঠে। জব্বারের কথা কানে বাজে,

“মাথা গরম করলে পরিণাম ভালো হবে না, বাজান। আমার কথা শোনো। তোমার মা সুস্থ হওয়া পর্যন্ত শান্ত থাকো, চুপ থাকো। ওয়াদা করছি হামিদাকে সরোয়ারের সঙ্গে বিয়ে হতে দেবো না আমি। একটু সময় দাও আমাকে। তোমার অসুস্থ মায়ের দোহাই দিলাম তোমাকে।”

বাজার পেরোতেই রবিন আরমানকে দেখল। বাজারের ব্যাগ হাতে সভ্য, অনুগত ছেলের মতো পিতার পাশে হেঁটে যাচ্ছে। রবিনের সঙ্গ ত্যাগ করতেই কত পরিবর্তন হয়েছে ওর। এখন আর সময় অসময় আড্ডা করে পড়াশোনায় হেলা করে না। সঙ্গদোষে পড়ে নেশাদ্রব্য পান করার কৌতূহল জাগে না। ও মানুষ হচ্ছে। রবিন খুশি তো হয় অনেক, কিন্তু বন্ধুহীন জীবনের কষ্টও কম নয়। কোথায় হারিয়ে গেল ওর সেই সুখের দিন, বিলাসিতার জীবন!

আরমান দেখে ফেলার আগেই রবিন বাইকের গতি বাড়ালো। বাড়ি যাওয়ার পথ বদল করল। মেঠোপথ ধরে এগোয়। হিন্দু পাড়ার পাশ দিয়ে যেতে দূরে শ্মশানঘাট। অলি নেশার বোতল বুকে জড়িয়ে নির্জন শ্মশানের পাশের বটতলায় আধশোয়া। দিনে দুপুরে লোকে এখানে একা বসে না।

“একলা ভর সন্ধ্যা বেলা বসে বসে বাংলা গিলছিস, ভূতে ধরলে?” রবিন বাইক দাঁড় করে এলো। অলি নেশায় ঢুলছিল। দাঁত বের করে হাসল। বলল,

“মাতালের আবার ভূতের ভয়।”

রবিন বসল ওর পাশে। কুয়াশা গাঢ় হতে গাঢ়তর হচ্ছে। শ্মশানঘাটে ভূতূড়ে আঁধার নামছে। গাছে কোথাও কূজন উঠল আবার থেমে গেল। ঝিঁঝি পোকা ডাকে আর নীরব হয়। অলি ঝিমাচ্ছে। ওর বুকের ওপর থেকে বোতলটা গড়িয়ে পড়তে রবিন তুলে নিলো। এখনও খানিক অবশিষ্ট আছে। ঢকঢক করে গিলে ফেলে। মুখ বিকৃত হয়ে এলো। বলল,

“শালা বহুত কষাটে রে! মাথার ভেতর গিয়ে ঠাপ মারে!”

অলি ঢুলু ঢুলু চোখে তাকালো। অসংলগ্ন গলায় বলল,

“মদ খাস না!”

“হুঁ?”

“ওই শালার মদ খাস না রে, রবিন। শালা খোক্কশ। ও তোরে গিলে নেবে।”

রবিন হাসল। ওকে হাসতে দেখে অলিও হাসল৷ রবিন তাকালো ছেলেটার দিকে।

জেলে পাড়ার ছেলেগুলো কথা শেখার আগে গালাগাল শিখে যায়। বাংলা ভাষায় যত অশ্লীল গালাগাল আছে শৈশব পার হতেই সেসব ওদের মুখস্থ হয়। কিন্তু অলি ছিল আলাদা। বড়ো ভাই আকাশের ছায়ায় বেড়ে ওঠা অলির শিক্ষা, আচার ও চরিত্র জেলে পাড়ার অন্য সকল ছেলেদের বিপরীত ছিল। এমনকি স্থানীয়দের কাছে ও হয়ে ওঠে আদর্শ ছেলে। পড়াশোনার মাথাও দারুণ।

অন্যদিকে রবিন ওর বয়সে স্কুলে গিয়ে বখাটে ছেলেদের সঙ্গে চলা ফেরা শুরু করে। ওদের মতো অশ্লীল গালাগাল রপ্ত করে। স্বভাবে ভীষণ চঞ্চল। গ্রামের ওমক প্রভাবশালীর ছেলে বলে কথা, একটু গুন্ডা গোছের না হলে হয়? সমবয়সী ছেলেরা নয়ত সমীহ করবে কী করে! কলহ, মারপিট যা করত তা নিয়ে সামান্য শাসন চলত ওর ওপর। দাদার আদরের নাতি। পরিবারের ছোটো ছেলে। ওর খাতিরই ছিল রাজপুত্রের মতো। অথচ, সব কিছু এখন চোখে কাটা হয়ে বেঁধে।

“তুই এমন হয়ে গেলি কেন রে, অলি? একবার দরিদ্র বুড়ো বাপ মায়ের কথা ভাবনায় আসে না তোর? সফুরার জীবনটা এই বয়সে এলোমেলো হয়ে গেল।”

অলি পিটপিট করে তাকায়। তারপর হেসে বলে,

“এক মাতাল আরেক মাতালকে বলছে, মাতলামি করিস কেন রে!”

রবিন বলল,

“আমি এমনই ছিলাম অলি। কিন্তু তুই তো এমন ছিলি না। তাহলে এভাবে নিজেকে কেন শেষ করে দিচ্ছিস? আমি বখে যাই, পঁচে যাই আমার বাপ-মা অভাবে পড়বে না, বোনের দিকে কেউ কুমতলবে হাত বাড়াবে না। কিন্তু তুই শেষ হয়ে গেলে কাকা কাকি আর সফুরার কী হবে ভেবেছিস? এভাবে নিজেকে শেষ করে দিস না অলি।”

অলি থম ধরে রইল। শ্মশানে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। অলির গায়ে নামেমাত্র একখান শার্ট। সেটাও ছেঁড়া মলিন। ও কাঁপছে ঠক ঠক করে৷ রবিন নিজের গায়ের চাদরটা খুলে ওর গায়ে দিলো। ওর পরনে উলের সোয়েটার। মাফলারে কান ঢাকল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“চল, তোকে বাড়ি দিয়ে আসি।”

অলি রবিনের বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় অলিকে এড়িয়ে চলত রবিন। যেন ওরা দুই জাতের মানুষ। অলির ছোঁয়া লাগলে ওর মান যাবে। সেসব শুধু অর্থবিত্তের গরিমায় করত না রবিন। অলির মতো ভালো ছেলেদের সঙ্গে ওর বনে না বলেই ওমন করত। অথচ, সেই রবিনেরই পরম বন্ধু হয়ে গেল আরমানের মতো ভালো ছেলে। বন্ধুত্ব আসলে ভাগ্যে লেখা থাকে। নয়ত রবিন নিজের গায়ের চাদর খুলে মাতাল, দরিদ্র প্রাক্তন ভালো ছেলে অলিকে পরতে দেয়!

রবিন অহংকারী, বাপের মতো জাত-পাত মেনে চলে, বাউণ্ডুলে; আবার সেই রবিনই অলির পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়, ওর বোনকে নিজের বোন ভাবে। গ্রামের সকলে অলিকে দেখলে ছি ছি করে। কিন্তু রবিন সকলের চোখের সামনে অলির কাঁধ জড়িয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়। সরোয়ারের হাত থেকে বার বার বাঁচায়।

“কই, ওঠ!” রবিন তাড়া দেয়। অলির চোখ ছলছল করে। হাত বাড়ায়। দুজনে বাইকে বসে। রবিন চাদরটা টেনে পেটের ওপর বাঁধল। অলি নেশায় ঢুলতে ঢুলতে যদি পড়ে যায়! রবিন বাইকের চাবি ধরতে অলি শব্দ করে কেঁদে ওঠে। রবিন হাঁপ ছাড়ল। তারপর বাইক ছুটিয়ে চলল জেলে পাড়ার করিমুদ্দির বাড়ি। পথেই কান্না থামিয়ে নিস্তেজ মেরে গেল আবার অলি। রবিন সাবধানে ওকে নামিয়ে বলল,

“একা ঘরে যেতে পারবি?”

অলি ওপর নিচে সজোরে মাথা দুলালো। এখন আর রবিনের দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। টলতে টলতে বাড়ির দিকে গেল। রবিন পিছু ডাকল,

“অলি, প্রতিশোধের নেশায় নিজেকে আর শেষ করে দিস না ভাই!”

“প্রতিশোধ!” অলি আপমন মনে বলল। তারপর রবিনকে ঘাড়ের ওপর থেকে দেখল। বড়ো শূন্যতা ওর চোখে। বিজ্ঞের মতো বলে,

“মদের আর কী নেশা রবিন! একবার যাকে প্রতিশোধের নেশা পেয়ে বসে, হয় সে প্রতিশোধের আগুনে ওই মানুষ বা পশুকে শেষ করে নয়ত নিজেই সে আগুনে শেষ হয়ে যায়।”

দম নিয়ে আবার বলল,

“তুই বুঝবি না রবিন। যা বাড়ি যা!”

হয়ত আরও কিছুদিন আগে শুনলে অলির এই কথা মাথায় নিতো না রবিন। কিন্তু এখন ওর মাথায় গেঁথে গেল। ভাবল আর ভাবল।

বাড়ি এসে গোসল সারল। হামিদা খাবার পরিবেশন করল প্রতিদিনের মতো। আর প্রতিদিনের মতোই রবিন জোর করে ওর হাতে খেলো। হঠাৎ হামিদার শূন্য হাত ধরে বলে,

“খালি হাতে থাকিস কেন? জানিস না বিবাহিতা নারীদের খালি হাতে স্বামীকে খাওয়ানো ঠিক না!”

“ওসব কুসংস্কার।” হামিদা আজ আর নিজের বিবাহিত জীবনের পরিহাস তুলে কলহ করল না। রবিন ক্লান্ত। ওকে দেখলে মায়া হয়।

জেবুন্নেসার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নিলো হামিদা। রবিন বলল,

“একদিন যাবি দেখতে?”

হামিদা মাথা নাড়ায় দুদিকে।

” আমাকে দেখে বড়োমা যদি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাছাড়া জুবিন ভাই ওখানে আছে। থাক।”

রবিন ওর আনত মুখ দেখে। তারপর বলে,
“তুই চিন্তা করিস না, হামিদা। মা সুস্থ হয়ে উঠবেন। আস্থা রাখ আমার ওপর।”

“হুঁ!”

“হামিদা!”

হামিদা চোখ তুললো না। রবিন উঠে দাঁড়ায়। ওর চিবুক তুলে বলে,

“মা সুস্থ হয়ে ফিরুক। বাবাকে যেমন করেই হোক আমাদের বিয়ের কথা বলব আমি। তাতে আমাকে মেরে কেটে যা ইচ্ছে করে করুক। আর তোকে অসম্মানিত হতে দেবো না আমি।”

রবিন বুকের বা’পাশে হাত রাখল। বলল,

“এই আমার বুকে হাত রেখে ওয়াদা করলাম।”

হামিদার বিস্ময়ের সীমা রইল না। ঠোঁট কাঁপল। চোখে পানি এলো। রবিন বুকে জড়িয়ে ধরে মাথার ওপর চুমু খেল। তারপর গম্ভীর সুরে বলল,

“কুসংস্কার হোক আর যাই হোক, তুই দু হাত ভরে চুড়ি পরবি। কাল আমি চুড়ি কিনে এনে দেবো। তারপর নাক ফুলটাও কিনব।”

থেমে বলে,

“এই হামিদা, আরেকদিন শাড়ি পরবি? পরনে শাড়ি, নাকে ফুল আর দু হাত ভরে কাঁচের চুড়ি পরে আমার ঘরে আসবি। আসবি না?”

হামিদা লজ্জায় ওর বুকে মুখ লুকিয়ে রইল। রবিন ওর চুলের ঘ্রাণ নেয়। মাথা ধরা কমে এলো। ঘুম ঘুম চোখে বিড়বিড় করে বলল,

“তোকে আমি সব দেবো, হামিদা। কিন্তু তোকে কাওকে দেবো না। তুই শুধু আমার।”

চলবে….