Home "ধারাবাহিক গল্প হামিদা হামিদা পর্ব-৬৭+৬৮+৬৯

হামিদা পর্ব-৬৭+৬৮+৬৯

0
267

#হামিদা(৬৭)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

মহসিন কবির ভূঁইয়া বিরক্ত মেজাজে বসে আছেন অফিস ঘরের টেবিলের সামনে। দাবার বোর্ডটি থেকে চোখ সরছে না। তার প্রিয় গুটি হাতি হারিয়ে গেছে অনেকদিন। কীভাবে সেটার রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি। নতুন গুটি এনেছিলেন। সেই হাতিটির দিকে তাকালে পুরাতনটার মায়া ফিরে আসে। এটাকে আপন আপন ঠেকে না। মহসিন আজকাল খেলায় মনোযোগ দিতে পারেন না। হাতিটিকে দিয়ে ওই ঘরের রানিকে কব্জা করা হয়ে ওঠে না৷

“জব্বু, এই জব্বু!” গলা চড়িয়ে ডাকতে লাগলেন। কোথা থেকে একপ্রকার দৌড়ে এলো জব্বার। সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকল। মহসিন কবিরের গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আনত মুখে দাঁড়িয়ে বলল,

“জি, ভূঁইয়া সাব!”

“তোর জি, ভূঁইয়া সাব ডাকের নিকুচি করি। বয়স বাড়লে মানুষের হাঁটুর জোর কমে যায়। তোর তো হাঁটু ও মাথার জোর কনি আঙুলের নখের আগায় গড়াগড়ি করছে। সব কাজ ঠিকঠাক করতে পারছিস না। আমার হাতি গুটি হারিয়ে গেল সন্ধান পেলি না। কীভাবে হারালো বলতে পারিস না। তোকে খাইয়ে, খাইয়ে চেহারা দেখতে রেখেছি আমি?”

মহসিন কবির হাঁপাতে লাগলেন। জব্বার লজ্জায় মুখ নিচু করে আছে। মনিব সিগারেট ঠোঁটে গুঁজে দিয়াশলাই খুঁজতে ও দৌড়ে গেল। লুঙ্গির কোমরে গুঁজে রাখা দিয়াশলাই বের করে জ্বালিয়ে ধরল সিগারেটের মুখে৷ মহসিন তাকালেন। সিগারেট পুড়ল যেমন আগুনে তেমনই তার দুটি চোখ। বার কয়েক টান দিয়ে একটু শান্ত হলেন। চেয়ারে গা এলিয়ে বললেন,

“পেয়েছিস ওই হতচ্ছাড়াটার খোঁজ?”

“জি, ভূঁ..মনিব!” বলল জব্বার। দিয়াশলাই হাতের মুঠোয় বদ্ধ। মহসিন বললেন,

“কোথায়?”

জব্বার ইতস্তত করল বলে ধমকে উঠলেন,

“একই কথা দু’বার বলাবি না জব্বার!”

“বাউল ফকিরের বাড়ি!”

মহসিন কবির ভূঁইয়া যেন থমকে গেলেন। পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে রবিন বাউলের বাড়ি কেন গিয়েছে! এ অঞ্চলের সকলে জানে বাউলের ধর্ম চর্চা, জীবন জ্ঞান ভিন্ন। গ্রামের সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা নয় তার। তাই তো এক ঘরের মতো বসবাস করে। বউ নেই, ছেলেপুলে নেই। পথে পথে গান গেয়ে ভিক্ষা করে দিনাতিপাত করে। ওই লোকের বাড়ির পানি খাওয়াও তো মানহানি মনে করে মহসিন কবির ভূঁইয়া। আর তার ছেলে কি না সেখানে গিয়ে উঠেছে।

“ঘাড় ধরে নিয়ে আয় বজ্জাতটাকে। কতবড় সাহস ওই ছোটোলোক, এক ঘরে লোকের ঘরে গিয়ে উঠেছে। মান সম্মান যেটুকু আছে সেটুকু না ডুবালে যেন চলছে না হারামজাদার। ওই মারে কাজ হয়নি, হ্যাঁ? মেরে হাড্ডি মাংস আলাদা করে ফেলব এবার! যা ধরে নিয়ে ওকে!”

জব্বার নড়ল না। মহসিন কবির গর্জে উঠলেন,

“যাচ্ছিস না কেন?”

“গিয়েছিলাম সেখানে আমি। বাজান সাফ না করে দিয়েছে। বলেছে এ বাড়ির ভাত আর খাবে না।”

মহসিন কবির স্তব্ধ মুখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অট্টহাসি দিয়ে সিগারেটে এক টান মেরে বললেন,

“তাই বলেছে না কি? আমি সত্যি শুনলাম না কান বাজল রে, জব্বার?”

“সত্যি বলেছি, মালিক!”

জব্বার বলল। মহসিনের মুখ বদলে গেল। ক্রুর হেসে অ্যাশট্রেতে অবশিষ্ট সিগারেট ঠেসে নিভিয়ে বললেন,

“এ বাড়ির ভাত খাবে না? কোন বাড়ির খাবে? ওই ভিক্ষা করা বাউলের বাড়ির? হজম হবে ওই বাড়ির ভাত? ও ভাত তো ভূঁইয়া বাড়ির ভাতের মতো সরু চালের নয়। বাউলের কড়াইয়ে ছাপ্পান্ন ভোগ তৈরি হয় না রোজ রোজ! বাউলের ঘরে ফ্যান আছে রে জব্বার? শীত গেলে আমার পুত্রের উপায় হবে কী? ও যে গরমে ঘুমাতে পারে না।”

কথাগুলো বলতে বলতে মহসিন কবিরের ক্রুরতা ঠোঁটের কোণে মিলিয়ে যায়। চোখে কী এক মায়া জ্বলে ওঠে। রবিন! তার আদরের দুলাল! এমনি করে অবাধ্য হয়ে গেল! মহসিন কবির কখনো কোনো কাজ করে অনুতাপ করেন না। কিন্তু সেদিন রাগের মাথায় ছেলেটাকে মেরে ঘুমাতে পারেননি। খেতে বসে ছেলেটার শূন্য চেয়ার উপেক্ষা করতে পারেন না। কিন্তু তার ছেলে সেই একগুঁয়ে, অবাধ্য! কত বড় সাহস বলে কি না এ বাড়ির ভাত খাবে না। ও কি ভেবেছে? মহসিন কবির ভূঁইয়া অনুতপ্ত হয়ে ওর হাত ধরে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসবে!

“থাক ওখানে তবে। আমিও দেখব কতদিন বাউলের হাঁড়ির ভাত ও হজম করতে পারে। খবরদার ওকে আর ফিরিয়ে আনতে যাবি না জব্বার। যে তেজে অবাধ্য হয়েছে সেই তেজ কতদিন ওকে অবাধ্য রাখে আমিও দেখে নেব। গুনে রাখ দিন জব্বার! এক সপ্তাহ! এর মধ্যে রবিন ভূঁইয়া বাড়িতে সুরসুর করে ফিরে আসবে। এই বাপ ছাড়া এর বেশিদিন ও চলতেই পারবে না।”

জব্বার নীরবে শুনল মহসিন কবিরের অহংকার। ওর মনে জাগ্রত শঙ্কা তাড়িয়ে দিয়ে ভাবল,

“আপনার কথাই সত্যি হোক, ভূঁইয়া সাব। রবিন নত হোক। ফিরে আসুক এ বাড়িতে।”

কিন্তু মন কেন যেন কু গাইল। অজানা আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠল। মহসিন কবির ভূঁইয়া রবিনের জেদের মূল কারণই জানেন না। জানলে অত দৃঢ়ভাবে বলতে পারতেন না। অহংকার করতেন না। জব্বার আনত মুখে ফিরে এলো বাইরে। হামিদা কলেজ থেকে ফিরেছে সে সময়। জব্বার ওকে দেখতে রাগত স্বরে বলল,

“সব দোষ তোর। এ বাড়িতে যত অশান্তি হলো সবকিছুর মূলে তুই আছিস, হামিদা। কী? ভেবেছিস আমি কিছু জানি না?”

ভয়ে হামিদার মুখের রঙ উড়ে গেল। পিছিয়ে যেতে জব্বার ওর বাহু চেপে ধরে সজোরে। যেন নখ ঢুকিয়ে দেবে চামড়া ভেদ করে। জব্বার এদিক ওদিক সতর্কে তাকিয়ে দাঁত খিচিয়ে বলল,

“রবিনের মতো রাজপুত্র তোর মতো দাসী বান্দির প্রেমে পাগল হয়ে বিয়ে করবে এ কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস? আরে ও তো দু চোখে তোকে সহ্য করতে পারত না। নিশ্চয় তুই আর তোর দাদি মিলে আমার বাজানটাকে জাদুটোনা করেছিস!”

” দাদিজানকে নিয়ে মন্দ কথা বলবেন না, জব্বার কাকা!” হামিদা সভয়ে প্রতিবাদ করতে জব্বার ওর চোয়াল চেপে ধরে হুঙ্কার করে বলল,

“মন্দ কথা বলব না? আল্লাহরে ডাক যেন ভালোই ভালোই বাজান ঘরে ফিরে আসে। নয়ত তোরে আমি জিন্দা দাফন করব রে, হামিদা। কাকপক্ষীও জানতে পারবে না তোর কবরের খোঁজ। ভুল তো হয়েছে আমার। যখন তোর মা টাকা নিয়ে তোকে ফেলে গিয়েছিল তখনই উচিত ছিল গলা টিপে মেরে ফেলা। ওই ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে এখন। উপরওয়ালারে ডাক, হামিদা। খুব খারাপি আছে কিন্তু তোর কপালে।”

ছাঁদ থেকে সফুরা নেমে এসে এ দৃশ্য দেখে ফেললো। থ মেরে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিল কী হচ্ছে। বুঝতে বুঝতে জব্বার হামিদাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে বেরিয়ে গেল। সফুরা ছুটে এলো।

“ব্যথা পেয়েছিস?”

হামিদার টলমল চোখ। মুখ দেখতে বলল,

“ইশ! চোয়ালে আঙুল বসে গেছে। মেরেছে তোকে?”

হামিদা চোখ মুছে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। চোয়াল ও বাহুর ব্যথা আর কতটুকু! জব্বারের কথার ভয় তারচেয়েও বেশি। জব্বারের অভিযোগের তির বড়ো নির্মম। হামিদা ঘরের দিকে গেল। সফুরার বড্ড মায়া হলো। আবার রাগও ওঠে জব্বারের প্রতি। লোকটা খুব খারাপ!

জেবুন্নেসা ছোটো ছেলের পথ চেয়ে বসে থাকেন। তার ঠিকমতো নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। দিনভর সদর দরজা খুলে রাখেন। ভাবেন এই বুঝি রবিন এলো। কিন্তু রবিনের ছায়াও আর দেখতে পান না জেবুন্নেসা। কষ্টে তার বুকের ভেতর ভার হয়ে আসে। স্বামী বড়ো নিষ্ঠুর মনের মানুষ। সন্তানের মায়ার চাইতেও তার কাছে জেদ বড়ো, সম্মান বড়ো। কিন্তু জেবুন্নেসা তো মা। মায়েদের কাছে সন্তানের আগে কিছু নয়। রবিনটা বড়ো নিষ্ঠুর। একটিবার কি ওর মায়ের কথা মনে পড়ে না। কেন একবারের জন্যেও ছুটে এলো না। ওর পিঠে ক্ষত কি খুব বেশি হয়েছে? এখন শুকিয়েছে? ঠিক মতো খাবার খায়? আরও কতশত ভাবনা ভাবতে ভাবতে জেবুন্নেসা আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদেন।

হামিদা পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। জেবুন্নেসা ডেকে বলেন না,

“কাজ নেই তোর? যা রান্না ঘরের এঁটো থালাগুলো পরিষ্কার কর গে।”

বরং হঠাৎ করে একবার ডেকে নরম গলায় বললেন,

“কলেজে আসতে যেতে রবিনকে দেখেছিস?”

হামিদা দেখেছে দূর থেকে এক দু’বার। কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি বা সে সুযোগ ছিল না। কিন্তু বড়ো মাকে তা বলবে কী করে? মিথ্যা বলল,

“দেখিনি!”

খানিক রাগ হলেন জেবুন্নেসা। রবিনকে দেখেনি তাতেও যেন হামিদার দোষ। পরে আবার মাতৃহৃদয়ে বুঝ এলো। হামিদার ওপর রাগ রইল না। হামিদা চলে যাচ্ছিল। হাত ধরতে গিয়েও স্বভাবদোষে দুষ্ট জেবুন্নেসা কোলেই হাত ফেলে বসে রইলেন। এই তো দুদিন আগেও চাইতেন হামিদা রবিনের ছায়ার কাছেও না আসুক। আর আজ ওর কাছেই খবর জানতে চান! জেবুন্নেসা চিবুক তুলে জিহবা কামড়ে বসে রইলেন চুপচাপ।

হামিদা ঘরে এলো। রবিনের চিন্তায় দাদিজানও মনমরা হয়ে বসে আছেন। জেবুন্নেসার মতো তিনিও একই প্রশ্ন করেন। হামিদা একইভাবে মিথ্যা বলে। নীরব থেকে একসময় বলেন,

“তোর দুঃখের সময় পাশে ছিল না রবিন? মার খেয়ে যখন অন্ধকার ঘরে পড়েছিলি কে গিয়েছিল? বাপের সম্মানের কথা ভুলে গিয়ে সেবার কে তোর ওই বিয়ে ভাঙল? মরতে চেয়েছিলি কে বাঁচিয়েছিল? তুই সেসব মনে রাখিসনি, হ্যাঁ? তোর মনে তবে কী আছে? ওর অতীত? অতীত কার নেই বুবু? আর অতীত আঁকড়ে থাকিস না৷ ওর বর্তমানরে একটু মনে ঠাঁই দে। তোর ধারণা ও কি তোর শরীরই ছুঁয়েছে রে বুবু? মনে একটুও ছায়া ফেলেনি?”

হামিদা মুখ ঘুরিয়ে বলে,

“না, না!”

হনুফা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“তুই বড়ো পাষাণ, অকৃতজ্ঞ হামিদা।”

হামিদা মাথা পেতে নেয় সে তিরস্কার। কিন্তু দাদিজান সে কথা বলে ওকে বুকে টেনে নিলেন। ভেজা গলায় বললেন,

“তুই পাষান নস, অকৃতজ্ঞ নস। ও তোর স্বামী বুবু। একটুও কি কষ্ট হয় না ওর কষ্টে তোর?”

হামিদা নিরুত্তর। হনুফা বেগম নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে অনুরোধ করলেন,

“একটিবার যা ওর কাছে। তোকে দেখলে ওর মাথা ভালো হয়ে যাবে। রাগ কমবে। ও বুঝবে। বল যাবি?”

হামিদা শুধু বলল,

“জব্বার জানলে মেরে ফেলবে, দাদিজান। আমার বড়ো ভয় করে। যাব না আমি। আর বলো না দোহাই!”

হনুফা বেগম হতাশ হয়ে গেলেন। বড়ো কষ্ট পেলেন মনে।

একদিকে জেবুন্নেসা ও হনুফা বেগমের কষ্ট, আরেকদিকে জব্বারের ভয় হামিদাকে বড়ো পীড়া দেয়। রবিনকে দূর থেকে দেখে সে পীড়া অস্থিরতায় রূপ নেয়। কেমন আছে ওই মানুষটা! হামিদার হঠাৎ করে মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যায়। রবিনের সেই আঘাতে জর্জরিত মুখখানা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। হামিদা বিছানার এপাশ ওপাশ করে। ঘুম আর হয় না। উঠে কলপাড়ে এলো। তাহাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। ওর মন বড়ো অশান্ত! ও একটু স্বস্তি চায়। ভেতর থেকে শেফার উপায় বলল,

“ওকে দেখলে তোর মনে শান্তি ফিরবে। না, ওমন দূর থেকে নয়। আরও কাছে গিয়ে দেখে আয়।”

হামিদা থম ধরে বসে রইল। কিংবা বলা যায় অগ্রাহ্য করতে চাইল মনের কথা। কিন্তু মনের ওপর জোর ক’জনার আছে!

রাত গভীর! কাছে কোথাও শেয়াল ডেকে ওঠে। ঝিঁঝি পোকা ডেকে যাচ্ছে অবিরাম। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক।

হামিদা চাদরে মুখ ঢেকে চললো সম্মুখে। বাউল বাড়ি ঘণ্টা খানেক দুরত্বে। হামিদা কোনোদিন ও বাড়িতে যায়নি। কিন্তু দূর থেকে দেখেছে। শীত মৌসুমে কখনো কখনো রাতভর গানের আসর বসে। ও বাড়ি যাওয়া উচিত নয় জেনেও কত লোক মুখ লুকিয়ে যায় সে রাতে।

নির্জন পথে গভীর রাতে একলা গা ছম ছম করে।হামিদা সব শঙ্কা, ডর তাড়িয়ে এগিয়ে চললো কুয়াশার জালা ছিঁড়ে। যত এগোয় ততই ভাবে, এককালে যে আমার অশান্তির কারণ ছিল, তাকে দেখলে স্বস্তি আসবে কেন? কী উদ্ভট কথা।

ওই তো ফসলহীন ক্ষেতটা পেরোলেই বাউলের ছনের ছাউনির মাটির ঘর। চারিদিকে বন ঝাড়ে ঘেরা। একতারা, মন্দিরা, ডুগি তবলা ও বাঁশির সুর ভেসে আসছে। হামিদার পা জমে গেল। যেন পৌষের সমস্ত শীত ওর পায়ে জড়িয়ে গেছে। অথচ, ফিরে যাওয়ার নাম মুখে আনল না। নিজেকে বলল,

“বড়ো মা উনার জন্য কাঁদে। দাদিজান মন খারাপ করে বসে থাকেন। তাদের জন্য চল হামিদা। কত কী এতকাল বলেছে উনি। আরেকটু বললে সহ্য করে নিবি। চল, এগিয়ে চল।”

হামিদা আবার পা বাড়ালো।

বাউলের ঘরের বারান্দায় পাটির ওপর বসে আছে রবিন। গায়ে জড়ানো কালো চাদর। মাথা ও গলায় প্যাঁচানো মাফলার। খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে বসল। এখান থেকে চাঁদটা কী সুন্দর দেখা যায়। যেন ওর দিকে এক নিবিষ্টে চেয়ে আছে। কটাক্ষ করছে? কানে এলো মজনু মিয়ার বাঁশির সুর। হৃদয়ে ঝড় তুলে দেয় ওই সুর। আনমনা করে। বুকের ভেতর আনচান করে। বাউল চাচা একতারা বাজায়। শরাফতউল্লাহ ডুগি-তবলা বাজাতে লাগল। রবিনের হাতের মন্দিরা তাল হারিয়েছে। বাউল চাচা যেন ওর মনের খবর জানেন। বলেন,

“ও রবিন, এমুন করে তো বাপজান রাত কাটবে না। একটা গান ধর।”

অন্য সময় হলে রবিন মানা করে দিতো। গানের গলা তো আরমানের। শুনলে লোকে মুগ্ধ হয়। রবিনের গলা অবশ্য একেবারে বেসুরো নয়। ওই চাঁদের দিকে চেয়ে চেয়ে প্রহেলিকা দেখে। দেখে একটা সোনা মুখ। যার কারণে মান, কূল সব ভুলে গেছে ও। যার কারণে বুকে অতল গহ্বর। কোথায় সেই হামিদা? ওই চাঁদে? একটিবার এলো না দেখতে? না, ওই তো চেয়ে চেয়ে দেখছে।

“কী রে রবিন, গা!” বাউল চাচা ফের উৎসাহ দিলেন। রবিনের হাতের মন্দিরা বেজে ওঠে,

“চাঁদনি পসরে কে আমারে স্মরণ করে,
কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে।
তাহারে চিনি না আমি,
সে আমারে চিনে!!
বাহিরে চান্দের আলো, ঘর অন্ধকার
খুলিয়া দিয়াছি ঘরের সকলও দুয়ার,
তবু কেন সে আমার ঘরে আসে না
সে আমারে চিনে কিন্তু আমি চিনি না!!…..”

হঠাৎ কারো ছায়া পড়ল বাউলের ঘরের পাশের উঠোনে। শরাফতউল্লাহ প্রথম দেখল। বলল,

“কেডা রে?”

ছায়াটি ভয়ে পিছিয়ে গেল। রবিনের প্রহেলিকা কাটলো। চাদরে মোড়ানো ছায়া দেখতে চমকে ওঠে। হাতের মন্দিরা শব্দ করে নিচে পড়ে। এখানে কেউ না চিনলেও ওর চিনতে ভুল হবে না। বিমর্ষ মুখখানায় জ্যোৎস্নার আলো লুটিয়ে পড়ল। লাফিয়ে উঠতে বাউল চাচা বললেন,

“কই যাস?”

রবিন ওই ছায়ার দিকে আঙুল তুলে বলে,

“ওই যে আমারে ডাকে।”

মজনু বলে,

“কে ডাকে? ও তো নিশিভূতও হইবার পারে রবিন। যাস না। ওরে থাম!”

রবিন থামে না। বারান্দার শেষ মাথায় গিয়ে বলে,

“নিশিভূত নয় রে, মজনু ভাই। ও আমার নিশি রাতের চাঁদ।”

সেই চাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে রবিন বোবা হয়ে গেল। কী বলবে? কী অনুযোগ করবে? না কি রাগ দেখাবে! ভ্রমর কালো আঁখি নির্নিমেষ দেখল ওকে। সভয়ে, সলজ্জে বলল,

“কেমন আছেন, আপনি?”

রবিনের মনে হলো ও কেঁদে ফেলবে৷ নিজেকে তিরস্কার করল। ঢোক গিললো। খপ করে ধরলো হামিদার ঘাড়। কপালে কপাল রেখে ভারি শ্বাস ফেলে চাপা স্বরে বলল,

“তুই দেখে বল। ভালো করে দেখবি কিন্তু!”

বাউলের ঘরের বারান্দায় মজনু আবার ওর গাওয়া গানটি বাঁশির সুরে তুললো।

চলবে…

#হামিদা(৬৮)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

রবিনের জীবনটা সুখে ভরপুর না থাকলেও ঝঞ্জাট ছিল না। ছিল না ভবিষ্যৎ নিয়ে পেরেশানি। পিতার একমাত্র উত্তরাধিকারী বলে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াত। আরমানের মতো ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা ছিল না। গ্রামের আর পাঁচটা সমবয়সী ছেলেদের মতো কী করব, কী হবে, টাকার চিন্তা, খাওয়ার চিন্তা এসব রবিন কখনোই করেনি। সেসব দিক বিবেচনায় ও সুখীই ছিল। জীবন ওকে ভরপুর দিয়েছিল বলেই অহংকারী হয়ে উঠেছিল। ওর মা বলতেন, ভূঁইয়াদের রক্তে মিশে আছে অহংকার। বংশ পরম্পরায় যা প্রবাহিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

সেই অহংকার ওকে নত হতে বাধ সাধে। ছোটো বেলা জেদ আর অবাধ্যতার কারণে অনেকবার পিতার হাতে প্রহার হয়েছে রবিন। কিন্তু তা ছিল ছোটো বেলার কথা। এই বয়সে কোন পিতা ছেলের গায়ে এভাবে হাত তোলে? এখন ওর দোষ কি ছিল? সত্য বলেছে এই? রবিনের ক্রোধ কমে না বরং বাড়তে থাকে।

রবিন পিঠের ঘায়ে কোনো প্রকার ওষুধ লেপন করেনি। ব্যথানাশক ছুঁয়ে দেখেনি। ওই ব্যথা ও জিইয়ে রেখেছে। আজকাল ব্যথাগুলো সহ্য করতে করতে ও নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। ওর দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। জীবনের অর্থ বদলে যায়। বদলে যায় ও নিজেও। এত বদলে হঠাৎ হঠাৎ ও বড়ো দিশেহারা হয়ে ওঠে। নিঃসঙ্গতায় হাসফাস করে। বুকের ভেতর শূন্যতা দাপাদাপি করে। কাওকে ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করে।

সেই ইচ্ছেটা পূরণ হলে মনে হয় পৃথিবীতে বাঁচা যায়,শ্বাস নেওয়া সহজ হয়।

বাউলের বাড়ির পেছনের মাঠ পর্যন্ত বাঁশি ও একতারার সুর ভেসে আসছে। বাউলের গলায় হাসন রাজার সেই গান শোনা গেল।
“আগুন লাগাইয়া দিলো কনে, কনে?………”

হামিদা আনত মুখে বসে আছে মাঠের আইলের ওপর। চাদরে আড়াল করা রাঙা মুখ। ঠোঁটে এখনও রবিনের স্বৈরাচারী স্পর্শ টের পায়। অথচ, সময় গিয়েছে অনেকক্ষণ। ওইটুকুই কেবল ছুঁয়েছিল রবিন। কিংবা বলা যায় হামিদা ছুঁতে দিয়েছে। তারপর ছিটকে সরে গিয়েছিল। রবিন হতাশ হয়েছিল। খানিক রাগও। কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। হাত ধরে এনে এখানে বসে আছে। পাশাপাশি কিন্তু হামিদা ওর উষ্ণতা থেকে দূরে।

রবিন নিজের গলা থেকে মাফলার খুলে হামিদার আপত্তি স্বত্তেও গলায় জড়িয়ে কান দুটো ঢেকে দিলো।

“তোর ভয় করেনি একলা এতদূর এসেছিস?” রবিন নীরবতা ভেঙে বলল। ওর এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না হামিদা এসেছে। ওর খোঁজ নিতে। রবিন মোহমুগ্ধ হয়ে রইল। হামিদা তারা ভরা আকাশে তাকিয়ে ছোট্ট জবাব দিতে থেমে গেল। অতীত স্মরণ হতে বলল,

“না, একজন অনেক আগেই আমার ভয় কাটিয়ে দিয়েছে।”

রবিন ভুরু কুঁচকে তাকালো। ঈর্ষায় ওর বুক জ্বলতে লাগল। চোয়াল কঠিন করে বলল,

“কার কথা বলছিস তুই?”

হামিদা ওর ঈর্ষা টের পেয়ে বুনো চোখে তাকিয়ে বলল,

“জানেন না কার কথা বলছি? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন? এক রাতে মাঝরাস্তায় আমাকে একলা ফেলে গিয়েছিলেন। মনে পড়ে? আরও বিস্তারিত বলব?”

“চুপ কর!” রবিন চাপা ধমক দিলো। সেদিনের সেই স্মৃতি আজ ওর কাছে বড্ড দুর্বিষহ লাগছে। এতটা যে কিছুক্ষণ আর কোনো কথা বলতে পারল না। হামিদা বেশ উপভোগ করল ব্যাপারটা। অতীত স্মরণ করে বর্তমান বড়ো তিতকুটে ঠেকল। রবিন ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। এই এত কাছাকাছি বসে ওর মনে প্রতিশোধস্পৃহা জাগল। আত্মগ্লানিতে রবিন আহত জেনেও আঘাত করতে বলল,

“কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম! ওমন ভয় কোনোদিন আমি পাইনি জানেন। এক এক কদম এগোচ্ছিলাম আর মনে হচ্ছিল এই বুঝি শেষ রাত আমার জীবনে। আচ্ছা, সেদিন যদি মরে যেতাম কী করতেন আপনি? নিশ্চয় খুব খুশি হতেন?”

রবিন হামিদার মুখের ওপর হাত রাখল। বড়ো শীতল হাতটা। মুখখানা থমথমে। চোখে অমাবস্যার ছায়া। আহত গলায় বলল,

“থাম হামিদা, থাম! আজ এর বেশি আমি আর নিতে পারব না। তুই যদি আমাকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে বলে থাকিস তবে সফল হয়েছিস।”

হামিদা তাকিয়ে রইল। রবিন ও চোখে চোখ রাখতে পারে না। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো হাতটার সঙ্গে। দুজনে আবার নীরব। হামিদা ভাবল বাড়ি ফিরে যাবে। রাত ভোর হতে দেরি নেই। এতক্ষণ এই শিশির জমা ঘাসের ওপর বসে বসে ওর পা ভিজে জমে যাওয়ার উপক্রম। শীতে কাঁপছিল। কিন্তু উঠল না।

মানুষটা ওরই প্রশ্নে ওকে প্রশ্ন করেছে। জবাব কেউই পায়নি। হামিদা ভাবল, রবিনকে কি একবার জিজ্ঞেস করবে,

“আপনার পিঠে কি এখনও ব্যথা আছে? রাতে ঠিকমতো খেয়েছেন? এখানে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না? বড়োমা আপনার পছন্দের খাবার রান্না করে খুব কাঁদে। বাড়ি ফিরবেন না?”

রবিন চাদর মেলে ওকে কাছে টানতে লাফিয়ে উঠল হামিদা। ঘাবড়ে গিয়ে বলল,

“আলো ফুটলে লোকের চোখে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। আমি বরং এখন আসি!”

রবিন কিছুই বলল না। ওর পথ আটকালো না। চুপচাপ মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। হামিদা কিছুদূর গিয়ে থামল। ঘুরে দেখল রবিনকে। অতদূর থেকেও রবিনের বেজার মুখ দেখতে পেল। হঠাৎ করে ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“ভালো নেই আপনি। বড়ো ছন্নছাড়া দেখাচ্ছে আপনাকে। বাড়ি ফিরে আসুন। বড়োমা দিন-রাত আপনার পথ চেয়ে আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদেন। দাদিজান মুখ ভার করে থাকেন। সবাই আপনার ফেরার পথ চেয়ে আছে। দোহাই ফিরে আসুন!”

রবিন তাকালো ওর মুখে। তাকিয়ে রইল। হামিদা হাঁপ ছাড়ল,

“এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। ফিরবেন কথা দিন!”

“ফিরলে খুশি হবি তুই?” রবিন জানতে চাইল। হামিদা মুখ ফিরিয়ে বলল,

“সবাই খুশি হবে!”

রবিন কটমট করে বলল,

“সবার কথা জানতে চেয়েছি? তোর কথা বল!”

হামিদা স্বীকার করবে না, করবে না করেও বলল,

“হ্যাঁ, হব।”

সঙ্গে সঙ্গে সামনে হাঁটতে লাগল। কিন্তু এবার রবিন ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। হামিদা নিজেকে ছাড়াতে গেলে ধমক দিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজে রবিন বলে,

“কেন খুশি হবি? আমাকে না ঘৃণা করিস! আমার থেকে না মুক্তি চেয়েছিলি?”

হামিদা নিরুত্তর। রবিন ওর ঘাড়ে চুম্বন করতে শিহরিত হয়। সরে যেতে চায়। রবিনের বাহুর ভীষণ জোর। রবিন কানের কাছে চাপা স্বরে বলল,

“সত্যি করে বলতো হামিদা, মুক্তি চাস আমার কাছ থেকে?”

হামিদা এবারো বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল। রবিনের একহাত ওর গলায় উঠে এলো। চেপে ধরে বলল,

“বল!”

“আমার জায়গায় থাকলে আপনি কী চাইতেন, হাসনাইন কবির রবিন?” হামিদা নির্ভয়ে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল। রবিনের হাত জমে গেল ওর গলায়। পরক্ষণেই ওর গালে চুমু দিয়ে মুচকি হাসল। বলল,

“তোকে চাইতাম, শুধু তোকে!”

রবিনের অন্য হাত সরীসৃপের মতো করে হামিদার কাপড় ভেদ করে পেট খামচে ধরে। মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে হামিদা। ধাক্কা দিয়ে রবিনকে সরিয়ে দেয়। ভীষণ রেগে বলে,

“আমাকে চাইতেন না আমার শরীর?”

রবিন ভুরু কুঁচকালো। বিরক্ত হয়ে বলল,

“তুই আর তোর শরীর কি আলাদা? তুই কি চাস নপুংসকের মতো হাত গুটিয়ে বসে থাকব তোর আশেপাশে। আমি তোকে চাই মানে তোর সবকিছুই চাই হামিদা। তোর কেন মনে হয় এই চাওয়া কেবল শারীরিক! অপমান করিস আমার চাওয়াকে?”

রবিন কাঁধ জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিয়ে এলো আবার। ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

“তুই ভাবিস তোকে স্পর্শ করতে কেবল কাছে আসি? হ্যাঁ, তা তো সত্যি। অস্বীকার করব না। কিন্তু তা কেবল শারীরিক চাহিদার কারণে নয় রে হামিদা। তুই আশেপাশে থাকলে আমার শান্তি লাগে। তোকে ঘনিষ্ঠভাবে পেয়ে আমি সব ভুলে যাই। মনে হয় পৃথিবীতে এর চেয়ে বড়ো সুখ আর কিছুতেই নেই। শ্বাস নিলেই বেঁচে থাকা বলে না, এই কথাটা আমি তোকে আপন করে জেনেছি। বিশ্বাস কর, এই অনুভূতি আমি কেবল তোকে ছুঁয়েই পাই। তুই বল হামিদা, মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কীসের মায়ায় ছুটছে? সুখের, তাই না? আমার সুখ আমি তোকে কাছে পেলে পাই। তবে কেন আমি স্পর্শ করতে চাইব না তোকে? একশবার তোকে চাইব, তোর শরীরকেও। ওহ, মনটাও বাদ যাবে না!”

“আর আমার সুখ! সে বেলায় আমি চুপ থাকব?”

হামিদা প্রশ্ন করল। রবিন গম্ভীর হলো। বলল,

“তোর সুখ কীসে? আমার কাছ থেকে মুক্তিতে?”

হামিদা তাকিয়ে দেখল রবিনের মুখ বদলে যাচ্ছে। দাদিজানের কথা মনে পড়ল। মনে মনে হাঁপ ছাড়ল। মিনমিনে গলায় বলল,

“আমি এখন বড়ো দ্বিধান্বিত। আপনি একটু সাহায্য করুন। বলে দিন আমার সুখ কীসে হতে পারে?”

রবিন আটকে রাখা শ্বাস ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে ওর কপালে ভাঁজ পড়ল। হামিদার কাঁধ ছাড়তে শ্লেষ হাসল হামিদা। বলল,

“পারলেন না তো! আচ্ছা সময় নিন। পরে আরেকদিন শুনব!”

দূরে পবিত্র আজানের ধ্বনি শোনা গেল। রবিন গম্ভীর মুখে বলল,

“চল তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি!”

“আমি একা এসেছি, একা যেতে পারব।”

হামিদা পা বাড়ালো। রবিন এলো ওর পিছু পিছু। কিছুদূর হেঁটে হামিদা বলল,

“তখন গান গাচ্ছিল কে? আপনি?”

রবিন পাশে এলো। আগ্রহ নিয়ে তাকালো,

“ভীষণ ধেড়ে গলা শুনাচ্ছিল, না?”

“হ্যাঁ!”

রবিন মুখ কালো করতে হামিদা ফিক করে হেসে উঠল। রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেললো,

“আর কোনোদিন গাইব না।”

“আমি শুনতে চাইলেও না?” হামিদার মেকি অভিমান শুনে থমকে গেল রবিন। পরখ করে বলল,

“মজা করছিস?”

“একদম না। আরেকবার গান শুনি।” হামিদার কথা ফেলবে সাধ্য কী রবিনের। গলা ঝেড়ে নিলো। তারপর হামিদার কাঁধ জড়িয়ে নিজের চাদরের মাঝে এনে বলল,

“আস্তে আস্তে শুনাব। নয়ত কেউ শুনে ফেলতে পারে। পরে চেঁচিয়ে বলবে, কোন শালারে রাত বিরাতে গান গাচ্ছে।”

হামিদা সলজ্জে মাথা দুলাতে রবিন হাসল। হাসলে রবিনকে ভীষণ সুন্দর দেখায়। হামিদার চোখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। কী ভাবে এসব! রবিন আবার একবার গলা ঝেড়ে নিলো। হামিদা মুচকি হাসে। আবার হাসি লুকিয়ে ফেলে। রবিন মুখখানা কাছে এনে বলল,

“ওই গান বাদ। চল তোকে ইমরান হাশমির গান শোনাই। এখন আমার ইমরান হাশমির গানের মুড এসেছে। আশিক বানায়া, আশিক বানায়া আপনে…”

“ছি!” হামিদা রবিনের বুকে মৃদু আঘাত করতে রবিন হেসে উঠল। হামিদাকে মোহনা এই গানের ভিডিয়ো দেখিয়েছিল। কী যে লজ্জা পেয়েছিল সেদিন ও৷
ওরা একটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হামিদা রবিনের মুখ চেপে ধরে। ফিসফিস করে বলে,

“আপনি ভালো হওয়ার মানুষ নন!”

রবিন ওর হাতটা মুখের ওপর থেকে সরিয়ে বলল,

“আমি তোর হওয়ার মানুষ। শুধু তোর!”

হামিদা লজ্জায় আর কথা খুঁজে পেল না। রবিনের চাদর ছাড়িয়ে আগে আগে হাঁটতে লাগল। রবিন পিছু পিছু এলো। হামিদা মাথার ওপরের চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়াতে লাগল বাড়ির দিকে। রবিনও পিছু নেয়। ইচ্ছে করলে হামিদাকে ও ধরে ফেলে। কিন্তু এই নির্জন রাতে ওর পিছু দৌড়াতে ভালো লাগছিল। বাড়ির কাছাকাছি আসতে হামিদার পাশে এলো। হাত ধরে সাবধানে অনুচ্চস্বরে বলল,

“সময় হলে বাড়ি ফিরে আসব আমি৷ খবরদার আর রাত করে একলা বের হবি না। কাওকে দিয়ে খবর পাঠালে আমি সেখানে চলে আসব। কিন্তু এই বাড়িতে নয়। ততক্ষণ ভালো থাক, আমার থাক, কেবলই আমার।”

হামিদা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। হাঁপাচ্ছিল। রবিন ওর কপালে চুমু খেয়ে জমে যাওয়া নাক ছুঁয়ে বলল,
“ঘরে যা, আমার হামিদা!”

হামিদা ঘরে যাওয়া অব্দি দাঁড়িয়ে ছিল গেটের বাইরে রবিন। ঘরের দরজা বন্ধ হতে ও আবার উলটো পথে হাঁটতে লাগল।

নামাজ আদায় করে কয়েকজন মুসল্লী বের হয়েছে। রবিন তাদের সালাম দিয়ে বাজারের দিকে গেল। সেখান থেকে সোজা ক্যারম ক্লাবে যাবে। খিদে পেয়েছে ওর।

বাজারের মাঝে, বটতলার কয়েকটা দোকান পরে একটা দোকানের সামনে থামল রবিন। ঝোপের মাঝে কে যেন উবু হয়ে আছে। রবিন সাবধানে কাছে গেল। ডাকল,

“কে? কথা কয় না কেন?”

না সাড়াশব্দ নেই। রবিন ইতস্তত করে মানুষটাকে সোজা করতে চমকে গেল।

“অলি!”

অলির নাকের সামনে হাত দিয়ে দেখল শ্বাস খুব ধীরে পড়ছে। কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই। কিন্তু ওর অবস্থা আশঙ্কাজনক। মদের গন্ধে কাছে ঘেঁষা দায়। অতিরিক্ত পান করেছে! রবিন কাঁধে তুলে নিলো। ছুটল হাসপাতালের দিকে।

চলবে…

#হামিদা(৬৯)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

মহসিন কবির ভূঁইয়া বাইরে থেকে ফিরেছেন। জব্বার ব্যাগটা নিয়ে পিছু পিছু এলো। মহসিন কবির বসলেন বসার ঘরের সোফার ওপর। জব্বার সফুরাকে ডাকল,

“অ্যাই সফুরা, ভূঁইয়া সাবরে এক গেলাস পানি দিয়ে যা!”

বলেই ব্যাগটা হাতে নিয়ে অফিস ঘরের দিকে গেল জব্বার। সফুরা ছাঁদে গিয়েছিল কাপড় আনতে। মর্জিনা কাচারি ঘরের পেছন থেকে চুলা জ্বালানোর খড়ি আনতে গিয়েছে। জেবুন্নেসা রান্নাঘরে ছিলেন। জব্বারের কথা শুনেও তখনই ছুটে এলেন না, সাড়া দিলেন না। স্বামীর ওপর তার অভিমান হতো আগে। আজকাল ক্ষোভ জন্মেছে। এতদিন হয়ে গেল ছেলেটাকে ফিরিয়ে আনার কোনোরকম চেষ্টা নেই মানুষটার মধ্যে। পিতা কি এরই নাম!

কিন্তু ক্ষোভের আগুন ধোঁয়া হয়ে গেল পতি প্রেমে। এই মানুষটা কোনোদিন তাকে শান্তি দেয়নি, ভালোবাসেনি। দিয়েছে অবহেলা আর করেছে অসম্মান। কিন্তু জেবুন্নেসার নারী মন প্রাচীন। তার মন স্বামী অত্যাচারে কষ্ট পাবে, দগ্ধ হবে কিন্তু পরিশেষে স্বামীর দুঃখ ও পীড়া সহ্য হবে না। এই যে লোকটা পিপাসিত জেনেও স্থির থাকতে পারেনি। মনের দুঃখ, ক্ষোভ গোপন করে গ্লাস হাতে নিয়ে দাঁড়াল স্বামীর সামনে৷

কিন্তু মানুষটা তার দুঃখ দেখলেন না, কষ্ট বুঝলেন না; উলটো রাগ দেখালেন। জেবুন্নেসার উপস্থিতি তার মোটেও সহ্য হলো না। পানির গ্লাস ছুঁয়ে দেখলেন না। জেবুন্নেসা নত হলেন। গ্লাস বাড়িয়ে বলেন,

“নিন!”

মহসিন কবির ভূঁইয়া সময় নিয়ে যেন বড়ো অনিচ্ছায় গ্লাসটা হাতে নিলেন। জেবুন্নেসা তার পানি পান করা অব্দি অপেক্ষা করে বললেন,

“অনেক তো সাজা দিলেন ছেলেটাকে। এবার ফিরিয়ে আনুন না। আদরের ছেলে আমার। কী খাচ্ছে, কোথায় ঘুমাচ্ছে! আমার মন বড়ো অস্থির হয় ওর জন্য। ভুল না হয় একটু করেই ফেলেছে। তার সাজা তো দিয়েইছেন। ক্ষমা করুন, দোহাই আপনার৷”

জেবুন্নেসা পাশে বসে হাঁটুতে রাখা হাতটা ধরলেন। মহসিন চুপ করে রইলেন। জেবুন্নেসা অশ্রুরুদ্ধ গলায় বললেন,

“আপনি বললে আপনার পা ধরে ক্ষমা চাওয়াব। দোহা..!”

“পারবি পা ধরাতে আমার?” মহসিনের চোখ মুখ উজ্জ্বল। জেবুন্নেসা ভেতরে ভেতরে একটু ইতস্তত করলেন। ছোটো বেলায় রবিন বেয়াদবি করলে তিনি ঘাড় বা বাহু চেপে ধরে স্বামীর সামনে নিয়ে যেতেন। জোর করে পা ধরে ক্ষমা চাওয়াতেন। রবিন জোর করা পছন্দ করত না। কিন্তু মায়ের অশ্রুসিক্ত মুখ দেখে চুপচাপ মেনে নিতো। এখন কি তা আর করবে? কত বড়ো হয়ে গিয়েছে। পিতার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শিখেছে। জেবুন্নেসার হাতটাও ঠিকঠাক ছেলের ঘাড় অব্দি পৌঁছাবে না।

“পারব! আপনি ওকে ফিরিয়ে আনুন!” জেবুন্নেসা জানেন না এই কথা আদৌ রক্ষা করতে পারবেন কি না। কিন্তু ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে এইটুকু মিথ্যার পরিণাম ভোগ করতে রাজি আছেন।

মহসিন কবিরের ভুরু কুঞ্চণ মিলিয়ে গেল। বড়ো প্রসন্ন মুখে বললেন,

“ঠিক আছে।”

পরক্ষণেই রাশভারি গলায় বললেন,

“ওকে সাবধান করে দিয়ো ফের যেন আমার সামনে বেয়াদবি না করে, তর্কে না জড়ায়।”

জেবুন্নেসা আনন্দে পারে না স্বামীর পা ধরে বসে থাকে। সজল চোখে বললেন,

“ওকে আমি বুঝাব। আর কোনোদিন ওমন কিছু করবে না। ক্ষমা করে দিন। ফিরিয়ে আনুন আমার মানিককে আমার বুকে!”

মহসিন কবির জব্বারকে ডাকলেন। জব্বার এলো। মহসিন কবির বললেন,

“রবিনকে গিয়ে বল আমি বাড়ি আসতে বলেছি। ভালো করে বলবি।”

জব্বার মাথা নাড়ায়। খুশি হয়। আবার ভাবে রবিন যদি এবারো আসতে অস্বীকৃতি জানায়! তখন তো মহসিন কবির ভূঁইয়া চটে যাবেন। তার অহংকারে লাগবে। রবিনকে নত করতে তিনি উঠে-পড়ে লাগবেন। তাতে পিতাপুত্রের সম্পর্ক খারাপ বৈ ভালো হবে না। না, জব্বারকেই কিছু ভাবতে হবে। রবিনকে যেভাবেই হোক এবার ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু…

জব্বার বাড়ির বাইরে আসতে জেবুন্নেসা পিছু ডাকলেন। হাতে একটা টিফিন বাটি। তাতে রবিনের পছন্দের খাবার আর পায়েস। জেবুন্নেসা জব্বারকে দিয়ে বললেন,

“ও যদি কোনো ভাবেই ফিরতে না চায় তবে আমার কসম দেবে ওকে, জব্বার! পুরো দুনিয়া উপেক্ষা করতে পারলেও সন্তান তার মায়ের কসম উপেক্ষা করতে পারবে না।”

তুষের আগুন ফুটছে চুলার ভেতরে। ওপরে কালি লেপা গলা ভাঙা পাতিলটায় ভাত ফুটছে। রবিন চুলার এক হাত দূরে বসে আছে। তাপটা বেশ লাগছে সেখানে বসে৷ চুলার মুখে তুষ আর খড়ি ঠেলে দিলো করিমুদ্দি। ভাতের মাড় গাঢ় হতে ঢাকনা উলটো করে কাঁত করতে মাড় উঠে এলো। করিমুদ্দি রবিনের উদাস মুখে তাকিয়ে বললেন,

“খিদে পাইছে মনে হয় তোমার, বাবা। আরেকটুখানি বসো। ভাতটা হইলেই খাইতে দেবো!”

“খাব না, কাকা। এক জায়গায় দাওয়াত আছে।” মিথ্যা বলল রবিন। সারাদিনে ওর পেটে ভাতের একটা দানাও যায়নি। কিন্তু করিমুদ্দিকে সে সত্য জানালে ওকে না খাইয়ে যেতে দেবে না। ওইটুকু ভাতের হাড়িতে যে পরিমাণ ভাত হবে তাতে তিনটে মানুষের পেট ভরবে না। রবিন ভাগ বসালে বুড়ো করিমুদ্দির খাওয়া হবে না রাতে।

“আমি বরং আজ উঠি, কাকা। অলিকে দেখবেন। রাতে যেন আর বাইরে না বের হয়। সরোয়ারকে বিশ্বাস নেই। কখন কী করে দেয়!”

রবিন উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ চুলার আগুনের তাপে গা গরম গরম লাগছে। করিমুদ্দি উঠে এলো। রবিনকে অপ্রস্তুত করে হাতটা ধরে কেঁদে বলল,

“তুমি বাবা ফেরেশতার মতো আমার ছেলেটারে বাঁচাইলে সেদিন। এই কদিন দিন-রাত খোঁজ নিতাছ। আমার ঘরের নিভানো আলো জ্বালানোর সে কী চেষ্টা তোমার। বউটা ওমনে বিছানা নিলো। কী যে দুর্দশা আমার। কপাল পোড়া মাইয়াডারে তোমরা বাড়িতে ঠাঁই দিলে। তোমাগো এই ঋণ কেমনে শোধ করি আমি!”

রবিন সান্ত্বনা দিতে জানে না। করিমুদ্দির কান্নায় ও বড়ো বেকায়দা পড়ে। কোনো রকমে বলল,

“আল্লাহকে ডাকেন, কাকা। যার কেউ নাই তার আল্লাহ আছে। আমি, আমরা তো কেবল অছিলামাত্র!”

কথাটা বলতেই রবিনের মনের মধ্যে আলোড়ন তৈরি হলো। ও কবে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেছে! কী চমৎকার কথা বলল। অথচ, এই কথাটুকু কখনো নিজেকে বলেনি। ওর অবস্থা কি এই করিমুদ্দির চেয়ে কম শোচনীয়?

করিমুদ্দি ওর হাতটা ধরে শেষ অনুরোধ করল,

“ও রবিন, কোনোভাবে আমার অলিরে ঢাকায় পাঠানো যায় না আবার। এই গ্রামের কালো ছায়া আমার এক ছেলেরে খাইছে। অলিরে বাঁচাও বাবা। যেমনে পারো আমার ছেলেটারে আগের মতো করে দাও!”

রবিন কথা দিতে পারে না। অলি একেবারে বদলে গেছে। শোক ওকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই ধরনের মানুষগুলো সহজে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না।

“আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, কাকা! আসি!”

রবিন অন্ধকার পথে এগিয়ে চলছিল। বাউল চাচা বাড়িতে নেই। দরজায় তালা নেই। তবুও রবিন যাবে না। একলা ভূতূড়ে লাগে ওই বাড়ি। তাহলে কোথায় রাত কাটাবে আজ? ক্যারম ক্লাবে?

রবিন উপায়ন্তর না পেয়ে সে পথে এগিয়ে গেল। খিদে পেয়েছে। গিয়েই ভাত তরকারি অর্ডার করবে। কিন্তু পকেট হাতরে দেখল দশ টাকার দুটো নোট রয়েছে। এ বেলাতেও ভাত খাওয়া হবে না। কলা রুটিও খারাপ নয়। রবিন আপনমনেই শ্লেষ হাসল। কী নিদারুণ কঠিন জীবন! চোখের সামনে থেকে খসে পড়ল বিলাসিতার সেই অতীত জীবন। দাদিজান কথায় কথায় বলতেন,

“বল, বল বাহু বল!”

রবিন আজ বুঝেছে ওই কথার মানে। পৃথিবীতে নিজের বাহুর জোর ছাড়া টিকে থাকা মুশকিল। কিছুই তো নেই ওর। রবিন এতকাল পিতার অধীন কী সুখেই না বেঁচে ছিল। পরজীবির ন্যায় জীবন ছিল। যেই না মহসিন কবির ভূঁইয়া ওকে ছুঁড়ে ফেললো, রবিন জীবনের আসল মানে জানতে লাগল। এই অর্থাভাব, অনাহার ও গৃহহীন জীবন ওকে এমন শিক্ষা দেয় যা ও এতকাল পায়নি বা গ্রহণ করেনি।

“রবিন!”

মুখে টর্চের আলো পড়তে চমকে তাকালো রবিন। টর্চের আলো সরে গেল। সামনের রাস্তা ধরে হেঁটে আসছে আরমান। ওর হাতে টর্চ। রবিন বিব্রত। আরমান মুখোমুখি দাঁড়াল এসে। রবিন শীতল গলায় বলল,

“কী চাস?”

আরমান উপেক্ষা করল ওর রূঢ়ভাষা। একদৃষ্টে বন্ধুকে দেখে বলল,

“এ কী অবস্থা হয়েছে তোর! নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সন্নাসী হওয়ার চিন্তা করছিস না কি!”

“এসব আলগা পিরিতের কথা শোনার টাইম নাই আমার, আরমান। পথ ছাড়!” বলল রবিন

“তোর তো আমার সবকিছু এখন আলগা লাগে। লাগুক। তোর যা মন চায় কর। আর কিছু বলব না আমি। শুধু এখন আমার সঙ্গে বাড়িতে চল। মাকে বলে এসেছি খাবার বেড়ে রাখতে। তোর পছন্দের কবুতরের মাংস রান্না করেছে। চল একসঙ্গে খাব!”

আরমান হাত চেপে ধরে। রবিন শক্ত হওয়ার ভাঁড়ামি করা ভুলে যায়। ওর গলা জড়িয়ে আসে।

“হাত ছাড় আরমান!” রূঢ় হওয়ার কী যে চেষ্টা। আরমান পাত্তা দিলো না মোটেও। হাত ধরে টানতে লাগল। ভারি গলায় বলল,

“চুপ করে থাক, রবিন। শালা, বন্ধুত্ব রাখবি না; রাখিস না। এখনকার মতো শুধু চল আমার সঙ্গে। কসম খাচ্ছি, খাওয়া শেষ হতে তুই আবার কথা বন্ধ করে দিস। দেখেও না দেখার ভান করিস। আমি কিছু বলব না। মনে কষ্টও নেবো না। শুধু এখন চল। তোকে ছাড়া ওই মাংস ভাত আমি মুখেও তুলতে পারব না, রবিন! আজকের রাতটা তুই আমার ওপর করুণা কর, দোস্ত!”

রবিনের চোখ পুড়তে লাগল। করুণা করত ও নিজের ওপর, আরমানের ওপর। কিন্তু সামনের অন্ধকারে জব্বার দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে জাম্পার, মাথায় মাফলার জড়ানো। ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। ওই আগুনে দানবের মতো যেন জ্বলছে ওর চোখ দুটো। রবিন আরমানের হাতের মুষ্টি থেকে ছিটকে সরে গেল,

“ছ্যাঁচড়া দেখছি, শালা তোর মতো দেখি নাই। কতবার বলেছি তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব জমে না আমার। আমি শালা চেয়ারম্যানের ছেলে। তোর সঙ্গে যায় না কি আমার! বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কবুতরের মাংস খাইয়ে হাত করবি না কি?”

আরমান স্তব্ধ মুখে তাকিয়ে রইল। ও দূরে দাঁড়ানো জব্বারকে দেখল না। রবিনের পূর্বের সব নিষ্ঠুরতা মানলেও আজ আরমানের ভেতরটা আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হলো। একটুও করুণা করল না রবিন। এত নির্দয়! আর কত চেষ্টা করবে বন্ধুত্ব রক্ষা করতে। সব দায় কী একা আরমানের! রবিন যদি বাপ আর বাপের চামচার ভয়ে বন্ধুত্ব ছিন্ন করতে পারে, তবে আরমানের কী ঠেকা সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করবে!

“থাক তুই তোর হালে। আর আসব না আমি। কোনোদিন আসব না বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে, মাননীয় চেয়ারম্যানের ছেলে!”

আরমান রাগে, ক্ষোভে ও অভিমানে কুঁজো হয়ে মিশে গেল অন্ধকার পথে। রবিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল ওর চলে যাওয়া। কতবার চাইল ছুটে গিয়ে আরমানকে জড়িয়ে ধরতে, সব কথা খুলে বলতে। কিন্তু পেছনে অশুভ ছায়ার মতো এগিয়ে এলো জব্বার। রবিনের এই আচরণে সে সন্তুষ্ট। বলল,

“বাড়ি ফিরে চলো, বাজান!”

“অসম্ভব!” রবিন রাগে ফুঁসতে লাগল।

“ভূঁইয়া সাবের আদেশ অমান্য করবা আবার?”

“করলে কী করবে শুনি? ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে? দাও! কেউ জানবে না। ভাববে হয় ভূতে মেরেছে নয়ত আত্মহত্যা করেছি। মারো!”

“কী আজেবাজে বকছ! মাথা ঠান্ডা করে সিদ্ধান্ত নাও, বাজান। এই কদিনে তোমার শিক্ষা হওয়ার কথা। বোঝার কথা ওই মহসিন কবির ভূঁইয়া ছাড়া তোমার জীবন অচল। সে ছাড়া এই কদিনেই কী হাল হয়েছে। ভাবো ত্যাজ্য করলে কী উপায় হবে তোমার!”

রবিন হেসে উঠল,

“ভয় দেখাও আমারে? আর কত ভয় দেখাবে? কথায় আছে বিষে বিষে বিষক্ষয়। এত ভয় দেখাইয়ো না যেন ভয়ের সিস্টেমই আমার মধ্য থেকে বন্ধ হয়ে যায়।”

জব্বার কথাগুলো আমলে নিলো। শান্ত হয়ে টিফিন বাটিটা সামনে তুলে বলল,

“তোমার মা পাঠাইছে। ধরো!”

মায়ের কথা ভাবতে রবিনের বুকের ভেতর হু হু করে। তবুও মুখ ফিরিয়ে বলে,

“ওই বাড়ির পানিও মুখে দেবো না আমি।”

জব্বারের পাশ কাটতে বলল,

“মহসিন কবির ভূঁইয়া ছাড়াও এই রবিন বেঁচে থাকবে। খুব ভালোভাবে বেঁচে দেখাবে তোমাকে। শীঘ্রই গ্রাম ছাড়ব আমি। মহসিন কবির ভূঁইয়ার বিষাক্ত ছায়া থেকে বহুদূর!”

জব্বার বাহু চেপে ধরে,

“কোথায় যাবে তুমি, বাজান?”

“তোমাকে কেন বলব?” রবিন বাহু ঝাড়া দিয়ে জব্বারের হাত থেকে নিস্তার পায় না। দুহাতে ধরল,

“বোকামি করো না, রবিন। ভূঁইয়া সাব জানলে রাগ করবেন। তার রাগ তুমি ভালো করেই জানো, বাজান। বাপে মারলে কিছু হয় না। তোমারে মাইরা মানুষটা শান্তিতে নাই। দেহো আমারে হুকুম দিসে যেন তোমারে বুঝাইয়ে ফিরাইয়া নিয়ে যাই। আর রাগ কইরা থাইকো না, বাজান। চলো, ঘরে ফিইরা চলো! তোমার মা কইছে আজ তুমি না ফিরলে সে বিষ খাবে। বিষ হাতে বসে আছে তোমার পথ চেয়ে!”

“বলছি না, যাব না!”

রবিন সজোরে হাত টান দিতে জব্বার ছিটকে সরে গেল। হাত খসে পড়ল টিফিন বাটি। খুলে খাবারগুলো মাটিতে পড়ে গেল। রবিন কিছুক্ষণ নড়ল না। ওর রাগ, জেদ ওকে একদিন খাবে! মাটিতে পড়া মায়ের সেই খাবারের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই যেন অভিশাপ দিলো। তারপর হনহনিয়ে এগিয়ে যায় সামনে। জব্বার কত ডাকল। ওর মায়ের কসম দিলো। রবিন শুনলো না। জব্বার হতাশ হলো৷ মনে আতঙ্ক জাগল। জেবুন্নেসার বিশ্বাসকে তিরস্কার করল।

রাতে ক্যারম ক্লাবে শুয়েছিল রবিন। শীতবস্ত্র বলতে চাদরটা। তাতে শীত মানে না। জড়সড় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। স্বপ্নে দেখল ওর মা বিষের বোতল হাতে বসে আছেন ছাঁদের কিনারে। মুখখানা তার বড়ো মলিন।

রাত গভীর। ঝিঁঝি ডাকছে। আকাশে মেঘ খেলা করছে। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে চাঁদটাকে। রবিনের পথ চেয়ে থাকতে থাকতে জেবুন্নেসা হতাশ হলেন। সিক্ত চোখ মুছে বিষের বোতল তুলে নিলেন ঠোঁটের কাছে। ঢকঢক করে গিলে ফেললেন। ছটফট করে ডাকতে লাগলেন রবিনকে।

“মা!”
রবিনের ঘুম ভেঙে গেল। উঠে বসল। সারা শরীর ঘামে ভেজা। কাঁপছে রীতিমতো। কোনো রকমে ক্যারম ক্লাবের দরজা খুলে বাড়িমুখো ছুটতে লাগল। এককোণে শুয়ে থাকা কুকুরগুলো দরজার শব্দে আঁতকে ওঠে। ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ করে ডাকতে লাগল।

হামিদার ঘুম আসছিল না। রবিনকে আজ সারাদিন দেখেনি। কী করছে, কোথায় আছে মানুষটা? সারাদিন কিছু খেয়েছে? হামিদা উঠে বসল। আস্তে আস্তে নেমে এলো বিছানা ছেড়ে। বসার ঘরে এসে পানি পান করে ভাবল, বাউলের বাড়ি গেলে কি পাওয়া যাবে তাকে? রবিনের কড়া নির্দেশ রাত-বিরেতে একলা বের হওয়া যাবে না। কিন্তু হামিদার মন বড়ো আনচান করছে।

ঠিক এমন সময় সদর গেটে শব্দ হলো। কেউ জোরে জোরে শব্দ করছে। হামিদা জানালার কাছে যেতে রবিনের গলা শুনলো। এক মুহূর্ত আর দাঁড়ালো না। দরজা খুলে দৌড়ে গেল গেটের দিকে। ওর পরনের চাদর খসে ভেজা শিশির ও মাটিতে গড়াগড়ি খেলো।

গেটের দরজা খুলতে রবিন ওর কাঁধ চেপে ধরে। রক্তিম সিক্ত চোখে বলে,

“হামিদা, আমার মা-আমার মা!”

হামিদা রবিনের আতঙ্কের কারণ বোঝে না। ও পেছনে বাড়ির দিকে হাত তুলে বলে,

“ওই তো ঘরেই আছে বড়োমা, ঠিক আছে।”

রবিন জড়িয়ে ধরে ওকে। খুব শক্ত করে। কাঁপছে যেন। হামিদা সংকোচে পিঠে হাত রাখল। আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিলো৷

হঠাৎ কেউ সদর দরজায় এসে দাঁড়ায়। তাকিয়ে রইল ওদের দিকে একদৃষ্টে। হামিদা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে ভয়ে একসার৷ রবিনকে ধাক্কা দেয়। রবিন নড়ে না। ওর কাঁপুনি এখনও যায়নি। হামিদা আর্ত গলায় বলল,

“ছাড়ুন, বড়োমা দেখছে!”

“মা!”

রবিন চমকে তাকালো। মাকে সুস্থ ও নিরাপদ দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদল। বলল,

“আমাকে একা ফেলে কোথাও যেয়ো না, মা। এই যে ফিরে এসেছি। আর তোমাকে ছেড়ে যাব না। কোনোদিন না!”

জেবুন্নেসা প্রত্যুত্তর করলেন না। তার চোখ দুটো স্থির রইল হামিদার আতঙ্কিত মুখে। আনত হলো হামিদা। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ অন্ধকারে মিলিয়ে গেল জেবুন্নেসা।

চলবে….