অদ্ভুত পূর্ণতা Part-05

0
892

#অদ্ভুত_পূর্ণতা
writer – তানিশা
part – 5

কাব্য : আমাকে দেখতে কোনদিক থেকে বুড়া মনে হচ্ছে?

— তানিশা কাব্যর দিকে তাকিয়ে দেখে কাব্য তার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। আজ বিকেলের কথা গুলো মনে পরতেই তানিশার ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেছে। টেবিলে থাকা এক গ্লাস পানি নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। ভয়ে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,,,

তানিশা : না মানে,, ভাইয়া আপনি দেখতে অনেক সুদর্শন। মনে হয় আরও ৪০ বছরেও বুড়া হবেন না। আমি এটা বলতে চাইছিলাম যে আপনার তো যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এখন যদি বিয়ে না করেন পরে তো ঠিকি বুড়া হয়ে যাবেন। তাইনা??

— তানিশাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে অনেক ভয় পাচ্ছে। পাশ থেকে নীলা করুণ দৃষ্টিতে কাব্যর দিকে তাকিয়ে আছে। কাব্য তানিশার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,,,

কাব্য : আচ্ছা,, তোমার কাছে যে পাত্রী আছে, কে সে??

তানিশা : আপনি যে মেয়েকে পছন্দ করেন আমি তার কথাই বলছি। ( মাথা নিচু করে )

কাব্য : তুমি চিনো তাকে? ( রাগী গলায় )

তানিশা : না। ( মাথা নাড়িয়ে )

কাব্য : তাহলে অযথা এতো কথা বলছো কেন?

তানিশা : আমি তো আপনার হেল্প করতে চাইছিলাম।

কাব্য : আমি তোমার কাছে হেল্প চাইছি? আর কোনো কাজ নেই তোমার? ( রাগী গলায়।)

— বলেই কাব্য তানিশার থেকে চোখ নামিয়ে খাওয়া শুরু করলো। তানিশা মাথা নিচু করে বসে আছে। বেচারি তানিশা কাব্যর হেল্প করতে এসেছিল। কাব্য এভাবে তার সাথে কথা না বললেও পারতো। মনটা খারাপ করে তানিশা খাওয়া ছেড়ে উঠে চলে গেলো। নীলা পিছন থেকে কয়েকবার ডাকার পরেও শুনেনি। নীলা খাওয়া ছেড়ে উঠে কাব্যকে বলল,,,

নীলা : ভাইয়া তুমি এভাবে তানিশার সাথে কথা বললা কেন? ও কি এমন ভুল বলছে? তুমি তো জানোই ও এমন। এটা তো নতুন কিছুনা।

কাব্য : আসলে আমি বুঝতে পারিনি ও মন খারাপ করবে। ( নিচু গলায় )

নীলা : এই বাড়িতে ও এমনি এমনি চলে আসেনি। আঙ্কেল আন্টিকে অনেক রিকুয়েস্ট করে নিয়ে এসেছি। তুমি এই আচরণ করবা জানলে কখনোই নিয়ে আসতাম না। আর কখনো ওকে এই বাড়িতে নিয়েও আসবো না।

কাব্য : তুই বললেই হলো নাকি নিয়ে আসবি না? তুই না নিয়ে আসলে আমি নিয়ে আসবো।

— কাব্য খাওয়া ছেড়ে উঠে নীলার রুমে গিয়ে দেখে তানিশা মন খারাপ করে বিছানার এক কোণে বসে আছে। কাব্য গিয়ে তানিশার পাশে বসলো। তানিশা কাব্যর দিকে একবার তাকিয়ে উঠে যেতে লাগলো। কাব্য তানিশার হাত ধরে নরম সুরে বলল,,,

কাব্য : বসো তোমার সাথে কিছু কথা বলি।

— তানিশা মাথা নিচু করে বসে পরলো। কাব্য বলল,,,

কাব্য : আচ্ছা মনে করো আমি যে মেয়েটাকে পছন্দ করি সেই মেয়েটা তুমি। এখন তুমি কি আমাকে বিয়ে করবা?

তানিশা : না। ( মাথা নেড়ে )

কাব্য : কেন করবেনা?

তানিশা : কারণ আমি আপনাকে ভালবাসিনা।

কাব্য : exactly… এটাই কারণ সেও আমাকে ভালবাসেনা। তাই আমি এখন বিয়ে করবো না। আমি চাইলে এখন তার পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখতে পারি। যদি সে সম্পর্কটাকে মেনে না নিয়ে বিয়ের জন্য না করে দেয় তখন?

— অনেকটা বিনয়ী হয়ে কাব্য কথাটা বলতেই তানিশার মায়া লাগলো। হাজার হোক নীলার ভাই। নীলার জন্য হলেও তার একটু হেল্প করা দরকার এটা ভেবে তানিশা বলল,,,

তানিশা : ভাইয়া আপনি শুধু বলেন কোন মেয়েটা। আমি আর নীলা মিলে ঐ মেয়েকে রাজি করিয়ে ছাড়বো। ও রাজি হবেনা তো ওর চৌদ্দ গুষ্টি রাজি হবে।

কাব্য : যদি বলি তুমি? বিয়ে করবা আমাকে?

— কাব্যর কথা শুনে তানিশা ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,,,

তানিশা : আমি?

কাব্য : হুম, করবা আমাকে বিয়ে?

তানিশা : জীবনেও না।

কাব্য : সেটাই,, প্রত্যেকটা মেয়ের নিজের একটা ভাললাগা, পছন্দ, অপছন্দ থাকেতেই পারে। তার ভাললাগা, পছন্দটাকে প্রধাণ্য দিয়ে আমি চাই সেও আমাকে ভালবাসুক। আমার রাগ, জেদ, মান অভিমানকে একপাশে রেখে আমার ভালাবাসাকে প্রধাণ্য দিক। আমাদের সংসারটা ভালবাসাময় হোক।

তানিশা : সেটা তো বিয়ের পরেও হতে পারে।

কাব্য : ও তো বিয়ের জন্য রাজিই হচ্ছে না।

তানিশা : ঐ বজ্জাত মেয়ের পুড়া কপাল। ভাইয়া আপনি ঐ মেয়ের কথা ভুলে যান।

— তানিশা কথা শুনে কাব্য একগাল হেসে বলল,,,

কাব্য : ভালবাসাটা যতো সহজ, ভুলে যাওয়াটা ততো সহজ না। আর তখনকার জন্য sorry…

তানিশা : আমি কিছু মনে করিনি। নীলার মতো আমিও তো আপনার ছোট বোন। তাইনা? নীলার সাথে এভাবে কথা বললে কি আর নীলা আপনার সাথে রেগে থাকতো নাকি?

— কাব্য তানিশার কথার জবাব না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝেমাঝে প্রচন্ড রাগ হয় তানিশার উপর। প্রত্যেকবার কেন নিজেকে নীলার সাথে তুলনা করতে হবে? বেস্ট ফ্রেন্ডের ভাই বলে সারাক্ষণ শুধু ভাইয়া ভাইয়া করবে নাকি?? কাব্য তাকে বোনের নজরে দেখেই না। এটা তানিশা কেন বুঝেনা। কাব্য কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

— সকাল ১০ টায়, কাব্য অফিসে চলে গেছে। তানিশার ভাই তন্ময় এসেছে তানিশাকে নিয়ে যাবার জন্য। তানিশা কাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে নিচে চলে এসেছে। কাব্যর মা তানিশাকে অনেক স্নেহ করে। ওনি তানিশাকে জড়িয়ে ধরে বলল,,,

কাব্যর মা : মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে আত্মীয়তা করে তোকে সারাজীবনের জন্য আমাদের বাসায় রেখে দেই। কিন্তু আমার ছেলেটা তো এই ব্যাপার এখনো কিছুই বলেনা।

— কাব্যর মায়ের কথার আগামাথা তানিশা না বুঝলেও নীলা ঠিকি বুঝেছে। নীলা মুচকি হেসে বলল,,,

নীলা : তোমার ছেলে তোমার ইচ্ছে ঠিকি পূরণ করবে। দেখে নিও,,

কাব্য মা : আল্লাহই ভাল জানে। আর কয়টা দিন থেকে গেলে কি হতো? ( তানিশার গালে হাত দিয়ে )

তানিশা : আন্টি নীলাকে বিয়ে দিয়ে দিন। নীলার বিয়ের উপলক্ষে আবার ঘুরতে আসতে পারবো।

— বলেই তানিশা নীলার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো। তাদের থেকে বিদায় নিয়ে তানিশা তার বাড়িতে চলে এসেছে।

রাত প্রায় ১২ টা বাজে, কাব্য মোবাইল হাতে নিয়ে তানিশার নাম্বারের দিকে তাকিয়ে আছে। কল দিবে কিনা দিবে না, এমন একটা দ্বিধায় আছে কাব্য। পরক্ষনে কিছু না ভেবে কল দিয়ে দিলো। ওপাশ থেকে কল রিসিভ করে তানিশা ঘুমঘুম গলায় বলল,,,

তানিশা : আসসালামু আলাইকুম। কে?

— কাব্য চুপ করে বসে আছে, কি বলবে সে? এতো রাতে কেন ফোন দিয়েছে তাকে? ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তানিশা এবার রেগে বলল,,,

তানিশা : ঐ কোন অকর্মার হাড্ডি? কল দিয়ে কথা না বলে এতো রাতে আমার ঘুমের বারটা বাজিয়েছিস।

কাব্য : আমি।

তানিশা : আমি আবার কে? তুই কোন মহা মন্ত্রী? তুই আমি বললেই তোকে চিনে ফেলবো? আফ্রিকান গন্ডার কোথাকার। নাম বল,,

কাব্য : আমি নাহিল মাহমুদ কাব্য। ( স্বাভাবিক গলায় )

— সাথে সাথে তানিশা শুয়া থেকে উঠে বসে পরলো। ভয়ে ভয়ে নিচু গলায় বলল,,,

তানিশা : নীলার ভাইয়া?

কাব্য : হুম

তানিশা : sorry ভাইয়া আমি ভাবছি কে না কে হবে। আপনার নাম্বার আমার মোবাইলে save নাই তো,, তাই এভাবে কথা বলছি। ভাইয়া আমি যে আপনার সাথে এমন আচরণ করছি, আপনি ভুলেও নীলাকে বলবেন না। ও জানতে পারলে আমাকে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে কুচিকুচি করে ফেলবে। ও বলেছিল কখনো যেন আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার না করি। ভাইয়া আমার ভুল হইছে। আমাকে ছোট বোন ভেবে মাফ করে দিয়েন।

— ছোট বোন শুনতেই কাব্য কল কেটে দিলো। এতো রাতে ছোট বোনের কাছে কেউ কল দেয়? ফাজিল মেয়েটা সারাক্ষণ শুধু ছোট বোন আর ভাইয়া ছাড়া কিছুই বুঝেনা। এতটুকু জ্ঞন নেই তানিশার মধ্যে? কাব্য আর কল দিবেনা। প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছে তানিশার উপর।

তানিশা মোবাইল হাতে নিয়ে ভাবছে কাব্য কল কেটে দিলো কেন? এতো রাতেই বা তাকে কল দিলো কেন? না জানি এখন নীলার কাছে কাব্য তার নামে বিচার দেয়। ভাবতে ভাবতেই তানিশা নীলাকে কল করলো। মোবাইলে কল বাজতেই নীলা কল রিসিভ করে বলল,,,

নীলা : কি হইছে গাধী এতো রাতে কল দিলি কেন?

তানিশা : এই শুননা,, ভাইয়া আমাকে একটু আগে কল দিছিলো।

নীলা : তো আমি কি করবো? খুশিতে নাচবো নাকি?

তানিশা : নাচানাচি পরে করিস। আগে ভাইয়া জিঙ্গেসা কর কেন কল দিছে।

নীলা : ভাইয়া তোকে কল দিছে তুই জিঙ্গেসা কর?

তানিশা : শাঁকচুন্নি, জলহস্তিনী কোথাকার তুই জিঙ্গেসা করলে কি হবে? তোর মুখে কি পোকা পরবে?

নীলা : পারবোনা, আমি এখন ঘুমাচ্ছি।

— বলেই নীলা কল কেটে দিলো। তানিশা ভাবছে, বজ্জাত মেয়ের এতো বড় সাহস সে ঠাস করে তানিশার কল কেটে দিলো। এখন নীলাকে সামনে পেলে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতো। তারপর চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে কুচিকুচি করে রান্না করে জ্বালিয়ে দিতো। এখন কাব্য কেন কল দিছে এটা জানতে হবে। তানিশা কাব্যকে কল দিতেই সে রিসিভ করে কিছু বলার আগে তানিশা বলল,,,

তানিশা : ভাইয়া তখন কেন কল দিছিলেন?

কাব্য : এই মেয়ে সবসময় এতো ভাইয়া ভাইয়া করো কেন? আমি তোমার কোন দিনের ভাইয়া হ্যা?? ( রাগী গলায় )

তানিশা : sorry… না,, মানে,, মনে হয়ে ভুলে আমার মোবাইল থেকে নিজে নিজে কল চলে গেছে। ( ভয়ে ভয়ে )

কাব্য : ভুলে আসেনি, তুমি নিজেই দিয়েছো।

তানিশা : আসলে,, তখন কেন কল দিছিলেন এটা জানার জন্য। ( আমতা আমতা করে )

কাব্য : তোমাকে miss করছি তাই।

তানিশা : কেন? ( অবাক হয়ে )

কাব্য : সেটা তুমি বুঝবেনা। যাওয়ার সময় আমাকে বলে যাওনি কেন? ( দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে )

তানিশা : আমি তো কখনোই আপনাকে বলে আসিনা। বলবো কিভাবে?? আপনি তো তখন অফিসে থাকেন।

কাব্য : একবার কল দিয়ে অন্ততপক্ষে বলতে পারতে।

তানিশা : আপনার নাম্বার আমার মোবাইলে নাই।

কাব্য : তোমার কি কখনো মনে হয়নি যে আমার নাম্বারটা তোমার মোবাইলে থাকা দরকার।

তানিশা : কেন মনে হবে? আপনার নাম্বার দিয়ে আমি কি করবো? নীলার নাম্বার তো আছেই। নীলার থেকেই তো আন্টির খোঁজখবর নিতে পারি।

কাব্য : আর আমার খোঁজখবর নিতে ইচ্ছে করেনা? ( হতাশ হয়ে )

তানিশা : নীলার থেকে সবার খোঁজখবর নেই তো।

— তানিশা প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছে, এতো রাতে তার ঘুম ডিস্টার্ব করে এগুলো বলার জন্য কাব্য তাকে কল দিছে? এখন যদি পারতো কাব্যকে কুচিকুচি করে ব্লেন্ডার করে জুস বানিয়ে খেয়ে ফেলতো। তানিশা বিরক্ত নিয়ে আবার বলল,,,

তানিশা : ভাইয়া আর কিছু বলবেন? আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে।

কাব্য : আচ্ছা ঘুমাও।

— বলেই কাব্য কল কেটে দিলো। প্রত্যেকবার তানিশাকে নিজের অনুভূতি গুলো বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে কাব্য। তানিশা কেন বুঝেনা কাব্য তাকে কতটা ভালবাসে? আদৌ কি কাব্যর অনুভূতি গুলো কখনো তানিশা বুঝবে?

চলবে,,,
( ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)