অবশেষে তুমি আমার পর্বঃ ০৯

0
3935

অবশেষে তুমি আমার
পর্বঃ০৯
লেখাঃ তাসনিম রাইসা

রাজকে আর বাঁধা দেওয়া ক্ষমতা তার নেই। এদিকে অধরা রাজের সাথে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভালোবাসার জগতে হারিয়ে যায়।

এক পর্যায়ে রাজ অধরার পাশে শুয়ে পড়ে। অধরা বুঝতে পারলো সে তার নারীত্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা হারিয়ে ফেলছে। নিজেকে কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছে। মনে হচ্ছে সব থেকেও কি যেন নেই তার। হ্যাঁ তার নেই, মেয়েদের গর্ব করার যে বিষয়টা থাকে সে বিষয়টা সে বলি দিয়েছে। নিজেকে বড্ড খারাপ লাগছে বড্ড খারাপ। পৃথিবীতে সব মেয়েরাই চায় তার মূল্যবান সম্পদটা তার স্বামীর হাতে তুলে দিতে। রাজ কি তাকে স্ত্রী করে নিবে? না সে কিছু ভাবতে পারছে না। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে শরীরে। তার চেয়ে যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে। কবে যে এ যন্ত্রনার অবসান হবে। বাহিরের কষ্টের চেয়ে ভেতরের কষ্টটা অনেক বেশি। বাহিরের কষ্টটা হয়তো কয়েকদিন পরেই ভালো হয়ে যাবে। কিন্ততু ভেতরের কষ্টটা কি শেষ হবে? অধরার চোখে ঘুম আসছে না। অধরা রাজের দিকে তাকিয়ে দেখে কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে। মনেইই হচ্ছে না এই ঘুমন্ত মানুষ তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা ভোগ করেছে। অধরা বুঝতে পারে না এতো অত্যাচার করার পরও লোকটাকে দেখলে কেন যেন মায়া কাজ করে অধরার। ঘুমন্ত মানুষটাকেকে একদম নিষ্পাপ শিশুর মতো মনে হচ্ছে! জানালার কাচ ভেদ করে চাঁদের আলো রাজের নাকের উপর পড়ছে। এ যেন এক অন্যরকম।সৌন্দর্য ভর করেছে। হঠাৎ রাজ ঘুমের মাঝেই ঘুরে একদম অধরার কাছে চলে আসলো। রাজের নিশ্বাস অধরার গালে পড়ছে। অধরার মন চাচ্ছে ডেভিলটার গলা টিপে ধরতে। কিন্তু একটা থাপ্পর দেওয়াতেই যা করলো তাতে মনে হয় গলা টিপে ধরলে কি হয়। সবশেষ কষ্টটা অধরারই হবে। এসব ভাবতে ভাবতে রাজ অধরার উপর পা তুলে দেয়।

-অধরা রাগে ফুসতে ফুসতে বলে এতোক্ষণ জালিয়ে শান্তি হয়নি এখন ঘুমিয়েও জালাচ্ছে। মনে হয় পা টা ভেঙে দেয়। অধরা তার উপর থেকে যখন পা সরাতে যাবে তখনি রাজ অধরাকে জড়িয়ে ধরে।
– অধরা বুঝতে পারে রাজ অধরাকে ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরে কি যেন বলছে। অধরা একটু মনোযোগ দিতেই শুনতে পারলো রাজ বলছে,’ তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যেয়ো না। আমার আর কেউ নেই তুমি ছাড়া। কথাগুলো বলতে বলতে অধরাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। অধরাকে কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। একবার মন চাচ্ছে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে। আবার ভাবছে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়াতে যদি ঘুম ভেঙে যায়।আর ঘুম ভাঙলে যদি আবার ওসব করে। তাহলে তো আমি শেষ! এসব ভেবে অধরার শরীর শিউরে উঠে! কিছু না ভাবতে পেয়ে অধরা রাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। অধরা একদম রাজের বুকে চলে যায়। অধরা রাজের প্রতিটা হার্টবির্ট শুনতে পাচ্ছে।রাজ এতটা কষ্ট দেওয়ার পরও অধরার বুকে শান্তির পরশ বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন অধরা কিছু বুঝতে পারছে না। তিয়াস এসব জানলে কি ভাববে? থাক ওসব পরে ভাবা যাবে, এখন ঘুমায়। অধরা রাজের বুকেই ঘুমিয়ে যায়।

– সকালে রাজের ঘুম ভাঙতেই দেখে অধরা ছোট্ট বাচ্চার মতো রাজের বুকে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত অধরাকে দেখে রাজের প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। রাজের মনে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা সব সৌন্দর্য অধরার গায়ে ঢেলে দিয়েছে। এতোটা নিপুণ হাতে সৃষ্টিকর্তা মানুষ সৃষ্টি করেছে। সে আল্লাহ না জানি কতো সুন্দর। কিন্তু রাজের দ্বারা প্রেম করা তো সম্ভব না। অধরাকে তো প্রশ্নই উঠে না।

– রাজ অধরাকে ধাক্কা দিয়ে তার বুক থেকে সরিয়ে দেয়। অধরার ঘুম ভেঙে যেতেই রাজ বলে, ‘ এই তোর কি করে সাহস হয় আমার বুকে ঘুমানোর ?

-অধরা ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে,’ আমি কি যেতে চেয়েছি? রাতে আপনিই তো জোর করে বুকে নিয়েছেন।”

– এই মিথ্যা বলবি না। তোর মতো মেয়েকে আমি রাজ কোনদিনই বুকে নিতে যাবো না। ”

– এ্যাহ! আমার মিথ্যা বলার কী ঠেকা লাগছে? নিজেই বুকে নিয়েছে আবার নিজেই বকা দেয়। শুনেন শুধু বুকেই নেননি বুকে নিয়ে বলেছেন, ‘ আমি ছাড়া আপনার নাকি কেউ নেই। আমু যেন আপনাকে ছেড়ে না যাই। ”

– এই তুই কি করে ভাবলি? তোকে আমি এসব বলবো? আরে তোর মতো মেয়েকে নিয়ে রাত্রিযাপন করা যায় বুকে নিয়ে ঘুমানো যায় না।”

– রাজের কথা শুনে অধরা কিছু বলবো না। শুধু নিরবে কয়েক ফোটা জল ফেলল। রাজ অত্যাচারে অধরা যতটা কষ্ট না পায়। তার চেয়ে শতগুণ বেশি কষ্ট পায় রাজের কথায়। রাজের প্রতিটা কথা একদম কলিজায় গিয়ে লাগে। রাজকে বিছানায় শুইয়ে রেখে অধরা শাওয়ার নিতে বার্থরুমে ঢুকে যায়। বার্থরুমে শাওয়া ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। চার দেওয়ালটাও যেন অধরার আত্মনাদে কেঁপে কেঁপে উঠছে। শাওয়ারের পানির সাথে অধরার চোখের পানি মিশে যাচ্ছে। অধরা জানে না এ কষ্টের শেষ কোথায়। সারা শরীর এখনো ব্যাথা করছে। অধরা তার সারা গায়ে সাবান দিচ্ছে আর ভাবছে কার রাত্রে যা হয়েছে সে দাগ কী পৃথিবীর কোন সাবানে মুছে ফেলতে পারবে?

আল্লাহ কী আমাকে এ কষ্টথেকে পরিত্রাণ দিবে না। ইশুটার কথাও খুব করে মনে পড়ছে। বোনটা তার হাত ছাড়া যে খেত না। এখন কি খাচ্ছে না খাচ্ছে। কতদিন হলো দেখিনা। এসব ভাবতে ভাবতে আবারো চোখে অশ্রু এসে ভীড় করে ! প্রায় ঘন্টাখানেক শাওয়ার নিচে বসে কান্না করে গোসল শেষ করে অধরা বেরিয়ে আসে।

– অধরা যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজের চুলগুলো আচঁড়াচ্ছে এমন সময় কারো উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করলো। চোখ দু’টি বন্ধ হয়ে আসলো।
– অধরা বুঝতে পারলো রাজ তার চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ের নিচে তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিচ্ছে। অধরা রাজকে সরাতে পারছে না।

– রাজ একটু পর অধরার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,’ আজ অফিসে মিটিং আছে। তুমি সেজে নাও সুন্দর করে।

– মিটিং এর কথা শুনে অধরার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে! তথাপি কিছু বলতে পারে না। শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়। ”

– এদিকে রাজ রুম থেকে বের হয়ে গেলে অধরা কাঠাঁলি কালার একটা শাড়ি নিজের গায়ের সাথে জড়িয়ে নেয়। চোখে হালকা করে কাজল লাগিয়ে ন্যায়। যদিও সে জানে এ কাজল বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না। চোখের বানে কাজলের বাঁধ যে তার ভেঙে যাবে কোন একসময়।

– অধরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠার আগেই রাজ আবারো রুমে প্রবেশ করলো।

– এই তোর সাজতে এতো সময় লাগে কেন?

– শেষ তো। চলেন।

– এই দাঁড়া কিসের যেন অপূর্ণতা লাগছে, এই বলে ড্রেসিং টেবিলের উপর পড়ে থাকা, টিপের পাতা থেকে একটি টিপ বের করে অধরার কপালে লাগিয়ে দিয়ে বললো, ‘ এখন একদম পারফেক্ট!”এখন চলো ক্লাইন্টরা অপেক্ষা করছে।

– রাজের মুখে ক্লাইন্টের কথা শুনে সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল অধরার। ভয়ে ভয়ে গাড়িতে উঠলো। রাজ অধরাকে নিয়ে একটা বড় মোবাইলের দোকানে দাঁড়ালো। অধরাকে নিয়ে একটা মোবাইল কিনে গাড়িতে করে রেস্টুরেন্টে।

রেস্টুরেন্টে কফি খেতে খেতে বললো, ফোনটা কেমন?
– অধরা মুচকি হেসে বললো, দেখতে তো ভালোই। ‘

– রাজ অধরার হাতে ফোন দিয়ে বললো,’ এটা তোর ফোন কাল ভেঙেছিলাম সেটার বদলে। ” আমি কারো ঋণী হয়ে থাকতে চাই না।”

– আমার ফোন লাগবে না। যদিও ফোন লাগবে তবুও না করলো অধরা। ”

– এই ফোন নিবি, নাকি ফোনের মতো তুকেও আচাড় দিবো?”
– অধরা ভয়ে ভয়ে ফোন হাতে নিল। এদিকে কফি শেষ করে রাজ অধরাকে নিয়ে আবারো গাড়িতে চড়লো।”

– কিছুক্ষণ পর রাজ অধরাকে নিয়ে একটা বাড়িতে নিয়ে নামিয়ে দেয়। বাড়িটা দেখতে শুনতে অনেক সুন্দর।

– অধরা বাড়ির ভেতরে যেতেই দেয়ালে দেখতে পায় তিয়াসের ছবি। অধরার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে! ”

– রাজ অধরাকে নিয়ে তিয়াসের সামনে দাঁড়ায় আর বলে,’ অধরা না কী তুকে ভালোবাসে? তুই ও নাকি অধরাকে ভালোবাসিস? জানিস কাল রাতে অধরাকে বিয়ে করে ফেলেছি। ”

– কি বলছেন এসব? তিয়াস উনি যা বলছে সব মিথ্যা! তুমি বিশ্বাস করো উনি আমাকে বিয়ে করেনি। সব মিথ্যা বলছে আমার কাছ থেকে তোমাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য!

-রাজ এবার অনেকটা রেগে গিয়ে বললো,মিথ্যা তাই না। তাহলে বলে দেয় কাল রাতের কথা? তিয়াস শোন অধরার কাছে তুমি আর কিছুই পাবে না। অধরা তার সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ আমায় দিয়ে দিছে। এই বলে তিয়াসের সামনেই অধরাকে জড়িয়ে ধরে কিস করে দেয়। এই যে তিয়াস এবার দেখলে তো? এর পরও কী অধরার সাথে যোগাযোগ করার কোন প্রশ্ন আসে? আর হ্যাঁ অধরা তোমাকে যতই ভালোবাসুক সে ভালোবাসায় তুমি আর কিছু খুঁজে পাবে না । সব তো আমায় দিয়ে দিছে। ”

– কথাগুলো বলে রাজ অধরাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে।

– আপনি মিথ্যা বললেন কেন? আমি তো তিয়াসকে ভালোবাসি ও আমাকে ভুল বুঝবে না?

– কি তুই এতকিছুর পরও তাকে ভালোবাসিস? কথাটা বলে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিল।অধরা চড় খেয়েও মুচকি হেসে দিল। এ হাসির রহস্য রাজ ভেদ করতে পারবে না।

– শোন আগামী তিন মাস তুই আমার রক্ষিতা। তিনমাস পর তুই যার কাছে ইচ্ছা যেতে পারিস কোন বাঁধা দিবো না। তবে চুক্তির তিনমাস তুই শুধু আমার। শুধু আমারি না আমার ব্যবসার ত্রাস। ”

– রাজের মুখে রক্ষিতা কথাটা শুনে,’ অধরা আর তার চোখের কাজল ধরে রাখতে পারলো না। তার অজান্তেই কাজল চোখের বানে লেপ্টে গেলো গালের সাথে!

– রাজ অধরাকে নিয়ে মিটিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। বাসায় ফিরতেই ত্রিযামিনী অধরাকে কতগুলো বাজে কথা শুনিয়ে দিল। ত্রিযামিনীর কথাগুলো শুনে রাজ শুধু মুচকি হাসলো কিছু বললো না। অধরা ভেবেছিল রাজ ত্রিযামিনীকে বাঁধা দিবে। কিন্তু না কথাগুলো রাজ আরো মজা নিলো।

– এদিকে কিছুদিন পর অধরার কোন কিছুই ভাললাগে না। খাবারে কেমন যেন অনিহা ভাব এসে গেছে। খেতেও ভালো লাগে না। মাথাটা কেমন কেমন করে ঘুরে! অধরার বু্ঝতে পারে না তার কি হয়েছে। একদিন হঠাৎ কাপড় কাঁচতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়।

– চলবে?????