অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ পর্ব-০১

0
157

#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#সূচনা_পর্ব

পাত্র হিসেবে স্বয়ং নিজের মেডিকেল কলেজের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর উমায়ের হোসেন শুভ্রকে দেখে রীতিমত ভড়কে গেলো তুলি। নাক বেয়ে ঘাম ছুটে গেলো তার।তুলি আড়চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্রর মুখ দেখে বোঝা গেলো, সে নিজেও কিছুটা বিব্রত। যতই মায়ের বান্ধুবির মেয়ে হোক। তুলি তার ছাত্রী। সেদিন তুলিকে ভাইভা টেবিলে যাচ্ছেতাই বলে অ পমান করার পর আজকে এমন একটা অবস্থায় দুজন মুখোমুখি হবে, শুভ্রর নিজেরও সেটা কল্পনার বাইরে ছিলো। শুভ্র সবার কথার ফাঁকে তীক্ষ চোখে তুলিকে দেখে যাচ্ছে। তুলি সম্পর্কে শুভ্রর একটি কিঞ্চিত ধারণা তৈরি হয়েছে।সেটা হলো, তুলি মেয়েটা বড্ড নাছোড়বান্দা।বন্ধুদের সঙ্গেও তার বড্ড তিরিং বিরিং স্বভাব। এমন একজন মেয়েকে শুভ্রর মতো বিচক্ষণ পুরুষ কিছুতেই নিজের বউ বানাবে না। শুভ্র নিজের সিদ্ধান্ত মনেমনে ঠিক করে ফেললো।

ছাদে দুজনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়া হলে তুলি ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার ধার ধারলো না। সোজা বলে বসলো,

‘স্যার, আপনার মুখ দেখেই আপনার মনে হচ্ছে আপনার আমাকে খুব একটা পছন্দ হয়নি। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি বিয়ে করবো না। আপনি এখন নিচে গিয়ে বলবেন আমাকে আপনাদের পছন্দ হয়নি। কারণ হিসেবে বলবেন, আমি দেখতে তেমন সুন্দর নই। আপনার গায়ের রঙের সঙ্গে আমার গায়ের রং বেমানান।’

শুভ্র চোখের চশমা ঠিক করে বেশ গাড় চোখে তুলির দিকে তাকালো। ভ্রু নাড়িয়ে জবাব দিলো,

‘আমি মিথ্যা বলি না। তাছাড়া গায়ের রং নিয়ে সুন্দর বিবেচনা করতে নেই। এটা অন্যায়।’

তুলি বিরক্ত হলো কিছুটা।
মুখ স্বাভাবিক রাখতে চাইছে, কিম্তু বারবার রাগ মুখে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।তুলি নিজেকে সামলে বলল,

‘কারো ভালোর জন্যে একবার মিথ্যা বললে আল্লাহ গোনাহ দেন না।’

শুভ্র এবার রাগলো।
মেয়েটা তো ভারী বেয়াদব। কথায় কথায় কেমন চোখ রাঙাচ্ছে। শুভ্রকে চোখ রাঙায়? এ মেয়ের সাহস দেখে অবাক শুভ্র। নিজে বিয়ে করতে চাইছে না। আর দোষ চাপাতে চাইছে শুভ্রর উপর।শুভ্র রেগে বললো,

‘তুমি ভীষণ বেয়াদব একজন মেয়ে। নিজেকে শোধরাতে পারলে তবেই বিয়েতে বসবেন। আমি কারণ হিসেবে কী বলবো আমার ভাবা হয়ে গেছে।’

কথাটা বলে শুভ্র চলে আসতে নিচ্ছিলো।

তুলি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই নিজেই নিজের শাড়ির কুচিতে পা বেজে পরে যেতে নিচ্ছিলো। তবে ধরে ফেললো শুভ্র।
ভয় পেয়ে তুলি চোখ খিঁচে শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরেছে। শুভ্র খানিক পর হুঁশে ফিরলো। ধরেছে কোথায়? সোজা তুলির উন্মুক্ত কোমরে।
শুভ্র হাতে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেতেই তাকালো। তুলির কোমরে নিজের হাত দেখে সঙ্গেসঙ্গে ছিটকে সরে দাঁড়ালো। তুলি নিজেকে ঠিকঠাক করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঘটনাটা দুজনের জন্যই অস্বস্তিকর অবশ্যই।

শুভ্র চশমা ঠিক করে বললো,

‘আম সরি। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই অনিচ্ছাকৃত! পরেরবার-‘

তুলি সঙ্গেসঙ্গে লজ্জায়-অস্বতিতে দৌড়ে ছুটে গেলো নিচে। শুভ্র থমকে গেলো। তুলি এভাবে দৌড়ালো কেনো? লজ্জা পেল? নাকি শুভ্রকে পুরুষরূপী পশু ভাবল? ভাবল কী শুভ্র সুযোগ নিয়েছে? ছিঃ, ছিঃ। শুভ্র নিজের ছাত্রীর সঙ্গে এমন কিছু করার কল্পনাই করবে না কখনো। শুভ্রর এতটাও খারাপ দিন আসেনি।

শুভ্র তারপর চশমা শার্টের আস্তিন দিয়ে ভালো করে মুছে আবার চোখে পরে নিয়ে ধীরেসুস্থে নিচে নামলো।

নিচে নেমেই দেখা গেলো তুলি বসে আছে সবার সামনে। শুভ্রর মা তুলিকে নিজের আনা মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছেন। পাশেই তুলির মা শুভ্রর মায়ের সঙ্গে রাজ্যের খাতিরদারির আলাপ জমিয়েছেন। শুভ্র গিয়ে মায়ের পাশে বসলো। তারপর মায়ের এক হাত চেপে ধরলো। শুভ্রর মা ছেলের দিকে তাকালেন। তুলি শুভ্রকে দেখে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ। পরেই কাজের বাহানা দিয়ে ছুটে পালালো সেখান থেকে। শুভ্র মায়ের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,

‘আম্মু, আমার এই বিয়ে নিয়ে কথা আছে তোমার সঙ্গে। আমরা আপাতত বাসায় যাই?’

শুভ্রর মা মুহূর্তেই ধরে ফেলেন ছেলের মনের খবর। মিষ্টির প্লেট টেবিলে রেখে ছেলের দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললেন,

‘খবরদার শুভ্র। বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করলে তোকে আমি মে রে মে রে ভর্তা বানিয়ে দিবো। আমার ছোটবেলার শখ, আমার প্রিয় বান্ধুবির মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তা করবো। আজ যখন সুযোগ এসেছে, আমি এটা কোনভাবেই যেতে দিচ্ছি না। তুই বিয়ে করবি আর তুলিকেই করবি। যা এখন আমার সামনে থেকে। ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বল। আমাদের কথাবার্তা শেষ।’

শুভ্র মায়ের ধ মকি-হু মকি শুনে একটা ঢোক গিলে। বরাবরই মায়ের মুখের কথা তার কাছে বেদবাক্যের ন্যায়। মায়ের মুখের উপর কেন যেন শুভ্র না করতে পারে না। এতবড় হয়ে গেছে, একটা সনামধন্য মেডিকেল কলেজে চাকরি করছে। কত ডাক্তার তার আগেপিছে ঘুরে।আর সেই শুভ্র তার মায়ের কথায় রীতিমত উঠবস করে। মায়ের সামান্য অসুস্থতায় অস্থির হয়ে যায় শুভ্র, অথচ এই হাতে কত ক্রিটিকাল রোগী অবলীলায় সামলিয়েছে সে।

মায়ের প্রতি তার এই দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে শুভ্রর বাবা মা রা যাবার পর। বাবা মা রা যাওয়ার পর শুভ্রর মা একদম একা হয়ে যান, চুপচাপ থাকতে শুরু করেন। শুভ্র তখন ছোটো এক ১২ বছরের বাচ্চা। মাকে হাসতে দেখতে তার ইচ্ছে হতো। তাই তারপর থেকেই শুভ্র মায়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। মায়ের সুবিধা অসুবিধার দিকে সেই ছোট্ট থেকে শুভ্রর নজর।
ছোট্ট শুভ্র তখন থেকেই বড্ড দায়িত্ববান, মায়ের প্রতি যত্নবান হয়ে উঠে।

শুভ্রকে বিদায় দেওয়ার জন্যে তুলিকে আলাদা ভাবে বলা হলো। শুভ্র গাড়িতে উঠবে। তুলি এসে দাঁড়ালো শুভ্রর পাশে। শুভ্র তাকালে, তুলি বলল,

‘সরি স্যার। উল্টাপাল্টা বলার জন্যে। ভাইভা টেবিলে প্লিজ এসব কিছু মনে রাখবেন না।’

শুভ্র চশমা সোজা করলো। তারপরও আড়চোখে বান্ধবির সঙ্গে গল্প করা আম্মুর দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

‘চাইলেও মনে রাখা যাবে না। আমাদের আজকে দেখা হওয়াটা মেডিকেল কলেজ অব্দি যেনো না আসে। ওটা আমার কাজের জায়গা, আর তোমার শেখার জায়গা। আমি চাইনা, আমাদের দুজনের লাইফে আজকের ঘটনাটা প্রভাব ফেলুক। ক্লাসে আমরা অচেনা হয়ে থাকবো!আই থিঙ্ক ইউ গট ইট।’

তুলি মাথা নাড়লো বাধ্য মেয়ের ন্যায়। শুভ্র ডাকলো,

‘আম্মু দেরি হচ্ছে আমাদের। চলো।’

শুভ্রর মা গলা জড়িয়ে কোলাকুলি করলেন বান্ধুবির সঙ্গে। একটু এগিয়ে এসে তুলিকেও জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমু খেয়ে দরদ মাখা গলায় বললেন,

‘দ্রুত আমার ঘরে মেয়ে হয় আয়। দুজন মিলে এই শুভ্র-ফুভ্র কে একদম সোজা করে ফেলবো। একদম ডান্ডা মেরে ঠান্ডা।’

তুলি অপ্রস্তুত হয়ে আড়চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো। তুলি মারবে ডান্ডা, তাও শুভ্র স্যারকে। এর আগে নিজেই না অজ্ঞান হয়ে যায়। শুভ্র খুব স্বাভাবিক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। বললো সে,

‘আমার চৌদ্দগুষ্টি পরে উদ্ধার করো আম্মু। আমার দেরি হচ্ছে, কালকে আমার মেডিকেল আছে কিন্তু। তুমি আমার চাকরি খাবে, আম্মু।’

শুভ্রর মা হালকা হেসে তুলির দিকে তাকালেন। মুখ ভেঙ্গিয়ে বললেন,

‘জ্বালিয়ে ছারখার করছে ছোট থেকেই। তুই এলেই এবার আমার রক্ষা। আজকে আসি তাহলে।’

তুলি হালকা হেসে তাদের বিদায় দিলো। শুভ্র যাবার আগে তুলিকে ভালোভাবে একবার দেখে নিলো। মেয়েটার প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করছে না শুভ্র। কী ভাবে এই মেয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতে সে সংসার করবে কে জানে।

চলবে।