অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ পর্ব-৮+৯

0
140

#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৮

তুলি কদিন হলো ক্লাস, ওয়ার্ড, পড়াশোনায় ভীষণ ব্যস্ত দিন পাড় করছে। আকদের পর শুভ্রও ব্যস্ত। দুজনের কথা-টথা তেমন একটা হয়না। তবে আজ ওয়ার্ড এ ক্লাস নিবে শুভ্র। তুলি অন্যদিন মুখে পানি ছিটিয়েই এপ্রোন গায়ে দৌড়ায় ওয়ার্ডে। তবে আজ তুলি কেন যেন খুব সময় নিয়ে ফেইসওয়াস করলো, মুখে ক্রিম দিলো, ঠোঁটে টিন্টেড লিপবাম দিলো। ওয়ার্ডে সাজগোজ তুলি তেমন করেনা। তবে শুভ্র আসছে আজ। তুলি চায়না, তাকে দেখতে কোনো কবরস্থান থেকে উঠে আসা দেহ মনে হোক।

শুভ্র ক্লাস নিচ্ছে। ফর্মাল গেটআপে শুভ্রকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে তুলির কাছে। তুলি বারবার চোখ দিচ্ছে শুভ্রর দিকে। অথচ শুভ্র এখন অব্দি তুলির দিকে একটিবারও তাকায় নি। তুলি বিরক্ত হলো। ভাব দেখানো হচ্ছে তাকে? তুলি তারপর রেগে গিয়ে নিজেও আর একবারও শুভ্রর দিকে তাকালো না।

শুভ্র একটা বেডের পাশে দাঁড়িয়ে রোগী দেখছে। রোগীর চোখ দেখতে দেখতে সে স্টুডেন্টদের প্রশ্ন করলো,

‘হিস্ট্রি নেওয়া হয়েছে পেশেন্টের?’

সবাই উত্তর দেওয়ার আগে একটা মেয়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে ঠিক শুভ্রর কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর এলিয়ে-এলিয়ে বললো,

‘হ্যাঁ স্যার।’

শুভ্রর এতকিছু খেয়াল নেই। সে রোগী দেখতে ব্যস্ত। রোগীর দিকেই সকল মনোযোগ তাক করে সে প্রশ্ন করলো,

‘হিস্ট্রি বলে যাও একটা একটা করে।’

একটা ছেলে বললো,

‘স্যার দিস প্যারেন্ট হ্যাস ড্রাউজিনস, ফ্যাটিগ, নেইল ব্যাড ডিপ পেলোর অ্যান্ড এ কেইস অফ ওয়ান টাইম আনকনশিওয়াসনেস।’

শুভ্র এবার জিহ্বা দেখলো রোগীর। মেয়েটা এবার আগ বাড়িয়ে বললো,

‘স্যার আমি উনাকে ফলফাক্কর খেতে বলেছি। আই থিঙ্ক অ্যানিমিক প্যাশেন্ট।’

শুভ্র এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তুলি মেয়েটার এত বেলেল্লাপনা দেখে যারপরনাই বিরক্ত। আঙুলের ডগায় কলমটা পিষে ধরল। রাগ মেটানোর জন্যে নিজেই নিজের দাঁত দিয়ে জিহ্বা কামড়ে ধরলো। শুভ্র এতসব লক্ষ করেনি। তার মাইন্ড আপাতত ডাইবার্ট। শুভ্র মেয়েটাকে বললো,

‘এসব আই থিঙ্ক, ইউ থিঙ্ক দিয়ে প্যাশেন্ট চিকিৎসা করবে? এভাবে প্যাশেন্টকে তার রোগ ডেসক্রাইব করলে পেটাবে ধরে। সিউর হয়ে বলতে পারলে রোগের চিকিৎসা করবে নাহলে না। এভরিওয়ান গট ইট?’

সবাই মাথা নাড়লো। শুভ্র প্যাসেন্টের দিকে তাকালো এবার। সুন্দর করে মিষ্টি হেসে প্যাশেন্টকে বললো,

‘চাচা, আপনার শরীরে রক্তশূন্যতা আছে। ব্লাড ট্রান্সফিউশন লাগাতে পারে। আমি সিস্টারকে বলে যাচ্ছি। সে কয়েকটা পরীক্ষা করে আমাকে জানাবে।’

গ্রামের এই বৃদ্ধ লোক ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন,

‘আমি কী মইরা যাইবার পারি?’

শুভ্র মাথায় হাত বুলালো। বললো,

‘না, চিন্তা নেই। আপনি একদম সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন। এখন রেস্ট নিন। সিস্টার এসে বাকিসব জানাবে আপনাকে।’

মেয়েটা আবারো আগ বাড়িয়ে এলো।তুলি দূর থেকে কোণা চোখে মেয়েটার কাজ দেখছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কী বেয়াদব মেয়ে! শুভ্রর সঙ্গে লাইন মারছে। তুলির ইচ্ছে করছে, মুখের উপর মেয়েটাকে কয়েকটা কথা বলে দিতে। সাহস কত। তার বরের সঙ্গে ঘেষাঘেষি! তুলি অবাক হলো নিজের ভাবনায়। তুলি কবে থেকে শুভ্রর প্রতি এতটা অধিকারপ্রবণ হয়ে পরল? অবশ্য হবেই না কেন? বরের ভাগ কোন বাঙালি নারীই বা দিয়েছে।

শুভ্র বললো এবার সবাইকে,

‘আজ বাসায় সবাই এনিমিয়া নিয়ে ডিটেলসে পড়বে। ফার্স্ট ইয়ারের পড়া ঝালাপালা করবে আবার। উই উইল ফাইন্ড অ্যা লট অফ প্যাসেন্ট উইথ দিস কেইস। আজকের মতো ওয়ার্ড শেষ। গো এভরিওয়ান।’

শুভ্র ওয়ার্ড ছেড়ে চলে গেলো। তুলি কী মনে করল। সোজা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো ওয়ার্ড থেকে। শুভ্র করিডোর দিয়ে হাঁটছে। হাতে ফোন। কাকে কল লাগাচ্ছে। তুলি এক দৌড়ে শুভ্রর পাশে এসে দাড়ালো। শুভ্র পাশে কাউকে হঠাৎ উপলব্দি করে তাকালো। তুলিকে দেখে শুভ্র অবাক হলো। তারপর হেসে বললো,

‘কী ব্যাপার। তু-‘

সঙ্গেসঙ্গে তুলি শুভ্রর একটু কাছে ঘেঁষে শুভ্রর হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে আবার এক দৌড়ে সামনে চলে গেলো। শুভ্র হতভম্ব হয়ে চিরকুট হাতে তুলির যাওয়ার দিকে চেয়ে আছে। মেয়েটা এত উরণচণ্ডী। শুধু চঞ্চলতা আর চঞ্চলতা। এলো আর গেলো? মাঝখানে ঝড় বইয়ে গেলো। শুভ্র হাতের চিরকুটের দিকে তাকালো। চিরকুট দেওয়ার কারণ বুঝতে পারলো না শুভ্র। হালকা হেসে চিরকুট খুলে দেখল সেখানে খুবই বিশ্রী হাতের লেখায় লেখা,

‘আপনি বিবাহিত, এরপর ওয়ার্ড ক্লাসে কথাটা মাথায় রাখবেন প্লিজ।’

শুভ্র প্রথম দফায় অবাক হয়ে চিরকুটের দিকে চেয়ে থাকলো। চিরকুট এর অর্থ বুঝতে তার বেশ সময় লাগলো। যখন বুঝতে পারলো, বিস্মিত হলো। বড়বড় চোখে সামনে তাকালো। তুলিকে খুঁজল। তুলি ততক্ষণে পোগার পা। শুভ্র দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে আঙুল চেপে শব্দ করে হেসে ফেললো। তুলিও পারে। লক্ষ্য করেছে তবে? বিয়ে হাতে না হতেই মেয়েদের মধ্যে বউ-বউ ভাব চলে আসা কী কোন রিফ্লেক্স এর মধ্যে পড়ে? হয়তো!
__________________
শুভ্র গাড়ী ঘুরালো। তারপর গাড়ি থেকে নেমে সোজা বাসায় উঠে কলিং বেল বাজালো। দরজা খুলে দিলো এসে এক রমণী। রমণী কেউ না, বরং তুলি। শুভ্র তুলিকে এখন বাসায় দেখে যারপরনাই অবাক হলো। মুখে হাসি টেনে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,

‘তুমি এখানে? আম্মু ডেকেছে?’

শুভ্র ভীষণ ঘেমে আছে। গাড়িতে এসি থাকা সত্ত্বেও সে ঘেমে একাকার। গরম বোধহয় আজকে খুব বেশি পড়েছে। তুলি রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস পানি এনে শুভ্রর সামনে ধরলো। শুভ্র পানি হাতে নিয়ে মিষ্টি করে বললো,

‘থ্যাংকস।খুব তেস্টা পেয়েছিল।’

তুলি মৃদু হেসে মাথা নাড়লো,

‘বুঝেছি আমি।’

শুভ্র আরও একবার প্রশ্ন করবে, তার আগেই রুম থেকে বেরিয়ে এলেন আফরোজা। শুভ্রকে দেখে তার পাশে গিয়ে বসলেন। শুভ্র মাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘আজকেও তুলিকে পড়া বাদ দিয়ে এখানে ডেকে পাঠিয়েছ, আম্মু? ওর সামনে এক্সাম আছে। তুমিও না।’

আফরোজা কিছু বলবেন, তার আগেই তুলি শুধরে দেবার ভঙ্গি করে বললেন,

‘না না। আন্টি ডাকেন নি। আমিই এসেছি। আমার আন্টির সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে হচ্ছিল।’

শুভ্র তুলির দিকে তাকালো। মায়ের প্রতি তুলির এমন মনোভাব শুভ্রকে আকৃষ্ট করলো ভীষণ। শুভ্র উঠে দাঁড়াল। পানির গ্লাস সোফার টেবিলে রেখে বললো,

‘আমি ফ্রেশ হয়ে আসি। আম্মু চা পাঠিয়ে দিয়ো প্লিজ।’
‘যা তুই। আমি পাঠাচ্ছি।’

শুভ্র শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে রুমে চলে গেলো। শুভ্র যেতেই আফরোজা তুলির দিকে তাকালেন। বললেন,

‘তুলি, চা বানাতে পারিস? শুভ্রকে আজ চা তুই দিবি। দৌড়ে যা তো।’

তুলি আফরোজার কথা বলার ধরন দেখে হেসে উঠলো। দুহাতে আফরোজাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আফরোজার গায়ের খানিক উম নিয়ে আদর আদর গলায় বললো,

‘আন্টি, তোমার কথা শুনলেই না আমার খুব আদর আদর লাগে, জানো?’

আফরোজা হাসলেন। বললেন,

‘তাই বুঝি?’

‘হ্যাঁ, একদম তাই।’

তুলি চুমু খেল আফরোজার গালে। আফরোজা চমকপ্রদ গলায় বললেন,

‘তাহলে আজ থেকে তুইও আদর আদর গলায় আমাকে শুভ্রর মতো আম্মু বলে ডাকিস তো? এই আন্টিটা না কেমন নিরামিষ নিরামিষ লাগে। শুনতে মজা লাগে না।’

তুলি হেসে ফেললো। কী চমৎকার আবদার। নেই কোনো জোর জবরদস্তি, শাসানো। শুধু এক বুক নিঃসংকোচ মিষ্টি আবদার। তুলি বললো,

‘ঠিকাছে আম্মু, ডাকব।এখন যাই, তোমার পুত্রের জন্যে চা বানিয়ে নিয়ে যাও। চা না পেলে এখনই ক্লাস নেওয়া শুরু করবে দুজনের।’

আফরোজার মনে পড়ল। তিনি তাড়া লাগিয়ে বললেন,

‘দ্রুত যা, দ্রুত যা।’

তুলি রান্নাঘরের দিকে গেলো। আফরোজাও পেছনে পেছনে চললেন। তুলি চা বসিয়েছে চুলায়। আফরোজা একটা চেয়ারে বসে তুলির চা বানানো দেখছেন। মেয়েটা রান্নায় কী পটু, ইয়াসমিন বলেছে। শুভ্রও তুলির চায়ের প্রশংসা করেছিলো সেদিন। যাক, রান্না নিয়ে আফরোজার চিন্তা গেলো। এখন বউ শাশুড়ি মিলে রান্না করবেন আর সঙ্গে কয়েক কাপ চা। বেশ জমবে!

আফরোজা তুলির দিকে তাকালেন। তুলি ওড়না কোমরে পেঁচিয়ে চা বানাচ্ছে। আফরোজা হঠাৎ কী মনে করে বললেন,

‘এই তুলি, শাড়ি পরবি?’

হঠাৎ প্রশ্নে তুলি ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে গেল। তুলির মনে পরলো, এই নিয়ে দুবার সে শাড়ির কুচি বেজে শুভ্রর গায়ের উপর পরেছে। ভাগ্যিস শুভ্র ধরে ফেলেছে দুবারের দুবারই। নাহলে হাত পা ভেঙে কী লজ্জার কান্ড ঘটতো।তুলি নিজেকে সামলে বললো,

‘আমি শাড়ি সামলাতে পারি না আম্মু। বারবার কুচি বেজে পরে যাই।’

আফরোজা শুনলেন না। বরং তুলির হাত ধরে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,

‘কিচ্ছু হবে না। আমি সুন্দর করে শিখিয়ে দিব কিভাবে শাড়ি পরতে হয়। একবার শিখিয়ে দিলে আর কুচি পায়ে লাগবে না।’

তুলি মৃদু হাসলো। আফরোজা শাড়ি আর দু কাপড় আনলেন। তুলি বললো,

‘কিম্তু চা?’
‘কিছু হবে না, বলক আসুক। ততক্ষনে তোর শাড়ি পড়া হয়ে যাবে। শুভ্র কিন্তু শাড়ি খুব পছন্দ করে, জানিস?’

তুলি লজ্জা পেলো। আবার শাড়ি গায়ে শুভ্রর সামনে যাবে! ইশ! লজ্জায় এক্ষুনি তুলির হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। শুভ্রর সামনে দাড়াবে কি করে?

#চলবে

#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৯

আফরোজার কথামতো তুলি চা বানালো শুভ্রর জন্যে। চা কাপে ঢেলে নিয়ে যাবে, হঠাৎ আফরোজা থামালেন। বললেন,

‘তুলি দাঁড়া তো। তোর মধ্যে কিছু একটা মিসিং। আমি বুঝতে পারছি কি। আমি নিয়ে আসছি ঘর থেকে।’

তুলি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বোকা বোকা চেহারায় মাথা দুলালো। আফরোজা গেলেন আর এলেন। হাতে করে নিয়ে এলেন এক পাতা টিপ। তুলি টিপ দেখেই অবাক হল। টিপ শাড়ির সঙ্গে তো সবসময়ই পরে তুলি। আজ একদম মনে ছিলো না। কোথায় ছিলো মন? অবশ্য ইদানিং তুলির মন একটু খুইয়ে খুইয়ে থাকে। কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভুতি হয় মনের মধ্যে। একটু অন্যরকম অদ্ভুত অনুভূতি।

আফরোজা একটা টিপ খুলে তুলির দুই ভ্রূয়ের মাঝখানে সেঁটে দিলেন। মিষ্টি হেসে বললেন,

‘শাড়ির সঙ্গে টিপ না হলে জমেই না। জানিস তুলি, এই টিপের পাতা অনেক পুরনো। আমার যৌবন কালে টিপের অনেক শখ ছিলো। শুভ্রর বাবা তো পাতার পর পাতা এনে রেখে দিত বাসায়। আমি প্রতিদিন শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে পরতাম। এখন আর পরি না। শুভ্রর বাবা নেই, কাকে দেখাব পরে? তবে তোর তো শুভ্র আছে। আমার এখান থেকে টিপ নিয়ে নিয়ে পরবি আর পরে শুভ্রকে দেখাবি। তারপর শুভ্রর বাবার মতো শুভ্রও তোর জন্যে পাতার পর পাতা টিপ এনে রাখবে।একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।হা হা হা!’

তুলির চোখ জলে ছলছল করে উঠল। তাদের দুজনের সর্ম্পক যেমনই হোক। অন্তত এই মায়ের জন্যে তুলির বোধকরি শুভ্রকে বিয়ে করে ভুল করেনি। মানুষটা মারাত্মক আকৃষ্ট তার সন্তানের প্রতি, তেমনই তুলির প্রতি। তুলি মৃদু হাসলো। টিপটা আলতো করে ছুয়ে দিয়ে বললো,

‘চা ঠান্ডা হচ্ছে আম্মু। যাই?’
‘ওহ হা। যা যা।’

তুলি হেসে চা নিয়ে শুভ্রর রুমে গেল। শুভ্র মাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে। টাওয়াল সোফার উপর ফেলে রাখা। ভিজে টাওয়াল এভাবে ফেলে রেখেছেন? তুলি শুভ্রর মনযোগ আকর্ষন করার জন্য চায়ের কাপে শব্দ তুললো। শুভ্র তখন পেছনে ফিরলো। চা হাতে তুলি দাঁড়িয়ে আছে দেখে শুভ্র সঙ্গেসঙ্গে ভেতরে আসতে বললো। তুলি ভেতরে ঢুকলো। শুভ্র হাত বাড়াল। তুলি চায়ের কাপ শুভ্রর হাতে ধরালো। শুভ্র চায়ে চুমুক দিয়ে সোফায় বসলো। তুলি খানিক এগিয়ে এসে সোফা থেকে ভিজে তাওয়াল তুলে বারান্দায় মেলতে গেলো। শুভ্র চা খেতে খেতে দেখলো এসব। মনেমনে আবারও একটু করে তুলির জন্যে ভালো লাগা জন্মাল। তুলি বারান্দা থেকে ভেতরে ঢুকলে, শুভ্র ডাকলো,

‘তুলি?’

তুলি জবাব দেয়,

‘বলুন।’

শুভ্র মৃদু হেসে বলল,

‘এখনই সংসার গোছানোর এত ইচ্ছে?’

তুলি বুঝতে পারলো না শুভ্রর কথার অর্থ। তুলি প্রশ্ন করল,

‘সংসার গোছাচ্ছি?’

‘হু? নেক্সট টাইম থেকে ভিজে টাওয়াল আর ফেলে রাখব না। নিজেই বারান্দায় মেলে আসব। হবে না?’

শুভ্রর কথার অর্থ এখন বুঝল তুলি। সঙ্গেসঙ্গে লজ্জা পেয়ে গেলো। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বললো,

‘তেমন কিছু না। অভ্যাস নেই এভাবে। সোফা ভিজে যাবে দেখে-‘
‘ইটস ওকে। কৈফিয়ত কেন দিচ্ছ? এ ঘর তোমারই।’

তুলির কথাটা কী যে ভালো লাগলো, বলা অসম্ভব। দু চোখে কেবল শুভ্রর দিকে চেয়ে রইল। শুভ্র চা শেষ করলো। চায়ের কাপ টি টেবিলের উপর রেখে এগিয়ে এলো তুলির দিকে। শুভ্রর এগিয়ে আসা তুলি দেখল। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে তুলি এবার এক পা-ও পেছাল না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিজের জায়গায়। শুভ্র এগিয়ে এসে মুখোমুখি হলো তুলির। গাঢ় চোখে তুলির দিকে চেয়ে বললো,

‘ডু ইউ মাইন্ড, ইফ-‘

পুরো কথাটা শেষ করতে পারলো না শুভ্র। তার আগেই তুলি মুখ ফঁসকে বলে ফেললো,

‘নো-‘

শুভ্র অবাক হলো। বড়বড় চোখে তুলির দিকে চেয়ে তারপর হেসে ফেললো। কী অধৈর্য্য মেয়েটা! শুভ্র মুখ এগিয়ে আনলো। তুলির বুকের ভেতরটা ডিপডিপ করছে। চোখ আবেশে বুজে যাচ্ছে বারবার। শুভ্র মুখ সরাল আচমকা। হাত উঁচু করে তুলির দু ভ্রুয়ের মাঝখানে আঙুল চাপলো। তুলি সঙ্গেসঙ্গে চোখ বুজে ফেলল। শুভ্র তুলির টিপ সোজা করে দিলো। তুলি অবাক হয়ে চোখ খুললো। শুভ্র হালকা হেসে সরে দাঁড়ালো। তুলি ফ্যালফ্যাল চোখে শুভ্রর দিকে চেয়ে আছে। শুভ্র মৃদু হেসে বললো,

‘টিপ সোজা করে পড়বে। বাঁকা করলেও সমস্যা নেই, এই শুভ্র স্কেল দিয়ে মেপে সোজা করে দেওয়ার জন্যে আছে।’

তুলি কিছুক্ষণ শুভ্রর দিকে এভাবেই চেয়ে রইল। শুভ্রও তাকালো। পরপর তুলির হুশ ফিরলে দৌঁড়ে ঘর থেকে ছুটে পালালো। দরজার ওপাশে এসে দরজার হাতলে হাত রেখে জোরেজোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো। শুভ্র বোধহয় তুলিকে শ্বাসকষ্ট দিয়েই মেরে ফেলবে। এমন ভাবে কথা বলে যে, তুলির দুনিয়া এফোর-ওফোঁর হয়ে যায়।

হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে শুভ্র বলে উঠে,

‘আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি তুলি। ইউর হাইড এন্ড সিক গেইম ইজ নট ওয়ার্কিং।’

শুভ্রর আচমকা কথায় তুলির অনুভূতি ছিটকে বের হলো। ‘আল্লাহগো’ বলে তুলি দরজার হাতল ছেড়ে দিলো। শুভ্র ওপাশ থেকে হেসে উঠল শব্দ করে।
__________________
‘না রে হবে না এবার ট্যুর। তোরা যা।’

ডাক্তার ফারহান কাকুতির স্বরে বললো,

‘ভাই ট্যুর দেওয়া লাগবেই এবার। বউ নাহলে আর খাটে জায়গা দিবে না। চল না।’

শুভ্র মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে বললো,

‘তাহলে বউকে নিয়ে যা। আমাকে টানিস কেন?’

‘আরিফও যাচ্ছে কিম্তু বউ নিয়ে। তাহলে তুই বাদ যাবি কেন? ফ্যামিলি ট্যুর হয়ে যাবে, চল।’

শুভ্র আবার মানা করতে যাবে। হঠাৎ কিছু একটা ভাবলো সে। তুলির তো কয়েকদিন বন্ধ আছে সামনে পূজার জন্যে। শুভ্রর ছুটি। তুলিকে নিয়ে একটা প্ল্যান করাই যেতে পারে। সেটা হলে দুজন দুজনকে জানা ব্যাপারটা আরও ইজি হবে। তুলিরও জড়তা কাটবে, সঙ্গে শুভ্ররও। ওদের জন্যে এই ট্যুরটা হওয়া দরকার। শুভ্র তাই বললো,

‘আমি জেনে জানাচ্ছি। তোকে কালকে জানাব আমি।’
‘ওকে, জানাস কিন্তু।’

শুভ্র ফোন কেটে ল্যাপটপের স্যাটার বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। টিশার্ট টেনেটুনে ঠিক করে বসার ঘরের দিকে এগুলো। বসার ঘরে যেতেই কানে গেল সিরিয়ালের শব্দ। শুভ্র বেশি একটা অবাক হলো না। তার আম্মু সিরিয়াল দেখেন, শুভ্র এতেই অভ্যস্ত। কিন্তু আম্মুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ যুগে এসেও তুলিও যে সিরিয়াল দেখে সেটা শুভ্রর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলো।

শুভ্র গিয়ে ওদের সামনে গিয়ে হুট করে টিভি অফ করে দিল। সঙ্গেসঙ্গে তুলি আর আফরোজা চেঁচিয়ে উঠলেন একসঙ্গে,

‘টিভি বন্ধ করলে কেন?’

শুভ্র থমকে গেলো। পরপর বললো,

‘না, সিরিয়াল দেখা কিসের তোমাদের, হ্যাঁ? এসব দেখ আর সারাদিন এসব মানুষের উপর অ্যাপ্লাই করতে থাকো, অসম্ভব। আম্মু তুমি দেখছ, সঙ্গে তুলিকেও দেখাচ্ছ।’

তুলি মিনমিন করে বললো,

‘আমিই সিরিয়াল দেখার জন্যে টিভি অন করেছিলাম। রিপিট টেলিকাস্ট দেখিনি আমি সকালে।’

শুভ্র হতভম্ব। বললো,

‘ওয়াও। তাহলে তো বিরাট লস হয়ে গেলো তোমার। রিপিট টেলিকাস্ট দেখো নি। একটা দেবো ধরে।সিরিয়াল হচ্ছে গার্বেজ, এসব মানুষ দেখে?’

তুলি আর আফরোজা দুজন এবার একসঙ্গে বলে উঠলেন,

‘কিম্তু আমরা তো দেখি, আমরা মানুষ না?’

শুভ্র দুজনের কথায় কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। নিজেকে সামলে বললো,

‘আমার ভুল হয়ে গেছে। মাফ করেন আমাকে।
যেটার জন্যে এসেছিলাম। তুলি, একটু রুমে আসো তো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’

#চলবে