অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ পর্ব-০৭

0
124

#অ্যারেঞ্জ_ম্যারেজ
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_৭

কথা হয়েছে বড়দের মধ্যে। বিয়ের বাকি কথা এখনি সেরে নিচ্ছেন তারা। বিয়ে হতে চার বছর আরও। শুভ্র আর তুলি সেসময় নিজেদের জেনে নিতে পারবে। সংসার করার মূলকাঠিই তো একে অপরকে জানা বোঝা, ভালোবাসা। শুভ্র বড়দের কথার মধ্যে বিরক্ত হচ্ছিলো কিছুটা। তুলি পাশে নেই। চাচাতো বোন এসে রুমে নিয়ে গেছে। শুভর বিরক্তি বুঝে, ইয়াসমিন বললেন,

‘শুভ্র, বাবা তুমি ঘরে গিয়ে বসো নাহয়। তুলিকে আমি পাঠাচ্ছি!’

শুভ্র শুনে হ্যাঁ বললো। একজন এসে শুভ্রকে তুলির ব্যক্তিগত বেডরুমে নিয়ে গেলো। শুভ্র বেডরুমটা দেখল। ছোট দুজনা পালং, একটা বইয়ে ঠাসা পড়ার টেবিল, কাঠের আলমারি, ছোট্ট একটা মিনি সাইজের বুকশেলফ, একটা ছোট দোলনা। বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা ঘরটা। তুলি বেশ গোছানো মেয়ে সেটা তার ঘর দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শুভ্র গিয়ে পড়ার টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো। হাতে একটা বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। হঠাৎ বইয়ের ভেতর থেকে একটা কাগজ খসে পড়লো। শুভ্র মাটিতে তাকালো অবাক হয়ে। তারপর একটু হেসে কাগজ হাতে তুলল। কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরে দেখলো, সেখানে মার্কার পেন দিয়ে কয়েকবার পরপর লেখা,

‘তুলি শুভ্র স্যারকে বিয়ে করবে না,
তুলি শুভ্র স্যারকে বিয়ে করবে না
তুলি শুভ্র স্যারকে বিয়ে করবে না।’

শুভ্র কাগজের লেখা পড়ে বেশ কিছুসময় কাগজটার দিকে চেয়ে থাকল। তারপর আচমকাই হেসে উঠলো শব্দ করে। সেসময় তুলি শাড়ি সামলে ঘরে ঢুকছে। তুলি ঘরে ঢোকার সাথেসাথে বাইরে থেকে কেউ একজন ওদের ঘরের সিটকিনি দিয়ে দিলো। তুলি সিটকিনির শব্দে একবার পেছন ফিরে তাকিয়েই, আবার শুভ্রর দিকে তাকাল। শুভ্র তুলির দিকে চেয়ে হাসছে। তুলি শুভ্রের হাসি দেখলো। বুকে কেমন একটা করে উঠল তুলির।হাসিটা এত্ত মারাত্মক লাগলো তুলির কাছে, বলা অসম্ভব। তুলি চোখের পলক ফেলে আবার তাকাল শুভ্রর দিকে। শুভ্র হাসি থামিয়ে তুলিকে বললো,

‘শুভ্র স্যারকে বিয়ে করবে না করবে না করেও বিয়ে করে বসে আছো। এবার এই কাগজটার কী হবে তুলি?’

তুলির ঘোর ভেঙে গেছে শুভ্রর কথা শুনে ততক্ষণে। তুলি তীক্ষ চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো। তারপর চোখ গেলো শুভ্রর হাতের কাগজের দিকে। তুলি সঙ্গেসঙ্গে ছুটে এসে শুভ্রর থেকে কাগজ কেড়ে নিয়ে ড্রয়ারে রাখতে রাখতে বললো,

‘ওটা অনেক আগে লিখেছিলাম। তখন জানতাম না বিয়েটা হবে যে।’

শুভ্র মৃদু হাসলো। তুলি কাগজ ড্রয়ারে রেখে বিছানায় বসলো। আজও শাড়ি পরেছে তুলি। শাড়িতে তুলিকে শুভ্রর কাছে কেন যেন মারাত্মক লাগে। এই প্র্রথম শুভ্র তুলিকে দেখলো। আপাদমস্তক, গাঢ় চোখে। তুলি সুন্দর, এক কথায় শ্যামা সুন্দরী। তুলি ছাত্রী না হলে হয়তো শুভ্রর তুলিকে বিয়ে করতে এতটা আপত্তি থাকতো না।

শুভ্র একসময় চোখ সরালো। একটু সোজা হয়ে বসে একটা প্যাকেট তুলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

‘তোমার জন্যে।’

তুলি তাকালো এবার চোখ তুলে। শুভ্রর দিকে একবার চেয়ে প্যাকেটের দিকে তাকালো। তারপর হাত বাড়িয়ে প্যাকেট হাতে নিল। তুলির হাতের চুড়ির রিনিঝিনে শব্দে শুভ্রর ঘোর লেগে এলো। শুভ্র অপলক চেয়ে রইল তুলির হাতে লেপটে থাকা চুড়িগুলোর দিকে। তুলি প্যাকেট হাতড়ে দেখল। শুভ্র বললো,

‘চাইলে খুলে দেখতে পারো।’

তুলি প্যাকেট খুলতে লেগে গেলো। প্যাকেট থেকে বেরিয়ে এলো সুন্দর একটা মেরুন রঙের জামদানি শাড়ি। শাড়ি দেখেই তুলি শাড়ির প্রেমে পরে গেল যেমন। শুভ্রর পছন্দ মারাত্মক লাগল তুলির কাছে। তুলি শুভ্রর দিকে চেয়ে মৃদু হাসলো। বললো,

‘থ্যাংকস, ভীষণ সুন্দর শাড়িটা।’

শুভ্র উত্তরে হাসলো। তারপর আবার তুলি চুপ হয়ে গেলো। শুভ্রর সঙ্গে তুলি খুব একটা কথা বলেনি এখন অব্দি। শুভ্র সামনে এলেই যেমন তুলি বোবা হয়ে যায়। অথচ শুভ্র জানে, তুলি বড্ড মিশুকে, উরণচণ্ডী স্বভাবের। মেয়েটা শুভ্রকে এত ভয় পায়!

শুভ্র ভাবল, বিয়েটাকে তাদের এত কমপ্লিকেটেড না করে সেটাকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত দুজনের। এভাবে দুজনেই যদি লজ্জায় চুপ হয়ে থাকে, তবে বিয়েটা টিকবে কী করে?

শুভ্র ভাবলো। তারপর তুলির দিকে চেয়ার একটু এগিয়ে আনতেই তুলি হাবিজাবি চিন্তা করে ভয় পেয়ে পেছনে ঝুঁকে গেলো। শুভ্র সঙ্গেসঙ্গে পিছিয়ে গেল আবার চেয়ার নিয়ে। অপ্রস্তুত গলায় সাথেসাথে বললো,

‘আরে, ভয় পেয়ো না। আমি জাস্ট তোমার সঙ্গে গল্প করতে চেয়ার এগিয়েছিলাম।’

তুলি শুভ্রর দিকে তাকাল। পরপরই নিজের বোকামো দেখে হালকা হেসে ফেলল। নিজেও লজ্জা নিয়ে বললো,

‘সরি, আসলে এমন পরিস্থিতি আমি আগে ফেইস করিনি। তাই একটু নার্ভাস আমি।’

শুভ্র বললো,

‘তোমার কী মনে হয় আমি নিজেও চৌদ্দটা বিয়ে করে বসে আছি? আমিও এই লাইনে নতুন। আমিও নার্ভাস, তবে তোমার মতো নয়, অল্প। সেটা কাটানোর ট্রাই করছি। তুমি হেল্প করলে নারভাসনেস কাটানো দুজনের পক্ষেই সম্ভব।

তুলি মাথা দোলালো। শুভ্র এবার নিশ্চিন্তে চেয়ার এগিয়ে আনল তুলির দিকে। তুলিও এগিয়ে বসল খানিক। শুভ্র প্রথমে শুরু করলো,

‘শুরুতে জেনে নেওয়া যাক। তোমার নিজের সম্পর্কে বলো, শুনি।’

তুলি শুভ্রর দিকে তাকাল। বললো,

‘কী বলব?’
‘শখ, ইচ্ছে, প্যাশন এগুলাই।’

তুলি উত্তর দিলো,

‘শখ বলতে আমার গাছ লাগানো ভালো লাগে। বারান্দায় অনেক গাছ লাগিয়েছি আমি। এখানে অল্প, ছাদে আমার লাগানো প্রচুর গাছ আছে। সেগুলোর পেছনে আমার দিনের অর্ধেক সময় যায়। আপনার?’

শুভ্র এবার নিজেরটা বললো,

‘আমার গাছ লাগানো তেমন পছন্দ না। আমি বেশিরভাগ সময় বই পড়ি, থ্রিলার। আমার তোমার মতো ছোট বুকশেলফ নেই। আছে মস্ত বড় বুকশেলফ। সেল্ফ ভর্তি শুধু থ্রিলার বই, হরর বই আর টুকটাক সাইন্স ফিকশন আছে।’

তুলি কথা কাটল,

‘রোমান্টিক বই নেই কেন?’

‘আমি পড়ি না এসব। কেন যেন অবাস্তব মনে হয় এসব রোমান্টিসিজম। তুমি বই পড়ো?’

তুলি মন খারাপ করে বললো,

‘হু, রোমান্টিক।’

শুভ্র তুলির মন খারাপ দেখে হাসল। বললো,

‘ঠিকাছে। তুমি আমার বাড়িতে আসলে বুকসেলফের একটা অংশ খালি করি রাখবো। সেখানে তোমার রোমান্টিক বইগুলো রাখবে। তবে প্লিজ আমাকে পড়তে ফোর্স করবে না। আমি এসবে নেই।’

তুলি শুভ্রর কথার ধরন শুনে হেসে উঠলো। শুভ্র বললো,

‘কোন ইউনিক ইচ্ছা আছে, যেটা ফুলফিল করতে চাও?’

তুলি ভাবলো। তারপর উত্তর দিলো,

‘একটা না। কয়েকটা আছে।’

‘বলো সেসব।’

‘প্রথমত, আমি আমার কোনো এক জন্মদিনে বয়স অনুযায়ী অনেকগুলো রোমান্টিক বই পাবো।
সেকেন্ড, আমি তারা খসা দেখতে চাই, জীবনের একবার হলেও দেখতে চাই।
থার্ড, এটা বলা যাবে না।’

শুভ্র বলল,

‘কেন বলা যাবে না।’

তুলি উত্তর দিলো,

‘উহু। কেন বলা যাবে না এটার কারণও বলা যাবে না। প্লিজ ফোর্স করবেন না।’

শুভ্র বললো, ‘ঠিকাছে।’

তুলি শুভ্রকে জিজ্ঞেস করলো,

‘আপনার ইচ্ছে?’

শুভ্র মাথা চুলকে হাসল খানিক। তারপর বললো,

‘ফার্স্ট অফ অল, জীবনে একবার আম্মু, আমি আর যে বউ হবে তাকে নিয়ে হজ্জ করবো। আম্মুর খুব ইচ্ছে হজে যাওয়ার।
সেকেন্ড, একদিন অনেকগুলো ছুটি পাব তারপর দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে দেখব। মানে ট্রাভেলিং এর শখ।
আমার আপাতত কোনও থার্ড ইচ্ছে নেই। আমি ইচ্ছে কম রাখি, যা রাখি সেটা পূরণ করার ট্রাই করি অলটাইম। বেশিরভাগ পূরণ করেছি, এ দুটো বাকি শুধু।’

তুলি বলল,
‘হজ্জ তো পূরণ করতেই পারতেন।’

শুভ্র মৃদু হাসলো। বললো,
‘বউ কোথায় পাব? বিয়ে তো আজ করলাম। ইন শা আল্লাহ, আরও চার থেকে পাঁচ বছর পর এই ইচ্ছাও পূরণ হয়ে যাবে।’

তুলির বুকটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো। শুভ্রর প্রতি সম্মান যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেলো। মানুষটা এত ভালো কেন? তার চেহারার দিকে তাকালে তুলি আকণ্ঠ ডুবে যায়। আর উঠে দাঁড়াবার জো রয় না। মানুষটার হাসি, কথা বলার ভঙ্গিমা, ভ্রু কুঁচকে তাকানো, এপ্রোন পরে করিডোর দিয়ে হাঁটা, তুলিকে ‘তুমি’বলে সম্বোধন করা, তার নরম গলা সব, এই সবকিছুর প্রতি তুলি ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুভ্র মানেই এক আকাশ আসক্ততা, তুলি ইদানিং সেটাই বিশ্বাস করতে বসেছে।
শুভ্রর কথা শুনে তুলি মৃদু স্বরে বিড়বিড় করল,

‘ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ আপনার ইচ্ছে শীঘ্রই পূরণ করুন।’

শুভ্র মৃদু হেসে বললো, ‘আমিন।’

#চলবে