একটি সাঁঝরঙা গল্প পর্ব-১৪+১৫

0
96

#একটি_সাঁঝরঙা_গল্প
#তানিয়া_মাহি
#পর্ব_১৪

ফালাক দ্রুতপায়ে নিশোর পাশের চেয়ারে এসে বসলো। হাসি হাসি মুখ করে বলল,“আপনাকে মিস করছিলাম।”

নিশো ফালাকের দিকে তাকালো। মৃদু গলায় বলল,
“এতগুলো দিন পর আবার এ ধরণের কথা কেন? তুমি বলেছিলে এটা নিয়ে আর কোন কথা কখনো বলবে না। ”

ফালাক প্রশ্নপত্র টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“আপনি যেন আমাদের বাড়িতে থাকেন তাই ওটা বলেছিলাম৷ আপনি ওখানে থাকলে আমার কথা রাখতাম। ইভেন কয়েকটা মাস হয়ে গেল আপনি আমাকে পড়াচ্ছেন৷ আমি কি একদিনও আর বলেছি? বলিনি তো৷ আপনি আমাকের পড়ানোর সময় একদিনও বলিনি। আচ্ছা, বিরক্ত করলাম না তো সেটা আগে বলুন।”
“ পড়াশোনা একঘেয়েমি লাগছিল। তুমি আশায় যেন প্রাণ ফিরে পেলাম, ক্লান্তি দূর হলো।” বলতে গিয়েও বলতে পারলো না নিশো।

খাতার ওপর হাতের কলমটা রেখে ফালাকের প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল,

“না।”
“তাহলে ঠিক আছে। আরেকটা কথা, আমি যদি আজ আপনাদের বাসায় থাকি আপনার সমস্যা হবে না তো?”

নিশো ভ্রু কুঁচকে বলল,“তুমি এখানে কেন থাকবে?”
“পরিক্ষার আগে এবার এক সপ্তাহ ছুটি। রুটিন চেঞ্জ হয়েছে তাই ভাবলাম কাজ একটু এগিয়ে রাখি।”
“কী কাজ?”
“ওসব আপনাকে জানতে হবে না। আপনার কোন সমস্যা থাকলে বলুন।”
“প্রশ্ন কেমন হয়েছে? সহজ নাকি কঠিন?”
“আমি কী জিজ্ঞেস করলাম আপনাকে আর আপনি কী বলছেন?”
“বাড়ি আমার না। এটা জাফর ইকবালের বাড়ি। তার থেকে অনুমতি নেওয়ার হলে নাও। আমার কোন সমস্যা নেই।”
“প্রশ্ন সহজ হয়েছে। আমি আসছি তাহলে।”
“প্রশ্নের কী কী আন্সার করেছ? মিলিয়ে নাও।”
“দাগানো আছে দেখুন। পরিক্ষা ভালো হয়েছে।”

ফালাক নিশোর চায়ের কাপ থেকে এক চুমুক চা খেয়ে দৌঁড়ে বাহিরে চলে গেল। নিশো তাকিয়ে তাকিয়ে ফালাকের চলে যাওয়া দেখল। ফালাক পাশের রুমে ঢুকতেই নিশো চায়ের কাপের দিকে তাকালো৷ চা এঁটো করে রেখে গেল মেয়েটা! চায়ের কাপটা হাতে নিলো নিশো। কিছু একটা ভেবে মৃদু হাসলো অতঃপর ফালাকের খাওয়া চায়ের কাপে সে নিজেও ঠোঁট ডুবালো।
_____

ফালাক আর তোয়া আজ রান্নাঘর দখল করেছে। রূম্পা বেগমকে কোনমতেই রান্নাঘরের আশেপাশে আসতে দিচ্ছে না তারা। রান্নাঘরে যেতে না পেরে তিনি ড্রয়িংরুমে বসে বসে ফেলে রাখা বইটা শেষ করছিলেন। জাফর সাহেব বাসায় প্রবেশ করলেন। তাকে দেখেই রূম্পা বেগম শুকনো ঢোক গিললেন। ফালাক এসেছে অনেক দিন পর। জাফর সাহেব আবিরকেই এ বাড়িতে আসতে দেখা পছন্দ করেন না। আজ ফালাক এসেছে। মেয়েটাকে উল্টাপাল্টা কিছু বলে না বসে- এই ভয়টা পাচ্ছেন তিনি।

জাফর সাহেব বাহিরের জুতো খুলে ভেতরেরটা পরে নিলেন। রূম্পা বেগম হাতের বইখানা পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। জাফর সাহেবের দিকে এগিয়ে গিয়ে শান্তস্বরে বললেন,

“এখন বাড়ি এলে যে?”

জাফর সাহেব পাশের সোফায় বসতে বসতে বললেন,“দোকানে সোহানকে বসিয়ে রেখে এসেছি। আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না।”

রূম্পা বেগম তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন। পাশে বসে কপালে, বুকে হাত দিয়ে বললেন,“কী হয়েছে? জ্বরও তো আসেনি।”
“জানি না৷ ভালো লাগছিল না। এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবে?”
“হ্যাঁ, আমি এনে দিচ্ছি, তুমি বোসো এখানে।”

রূম্পা বেগম একগ্লাস পানি এনে জাফর সাহেবের হাতে ধরিয়ে দিলেন। রান্নাঘরের ঝাঁঝ ড্রয়িংরুম অবধি চলে আসায় বারবার হাঁচি হচ্ছে জাফর সাহেবের। ভ্রু কুঁচকে রূম্পা বেগমকে বললেন,

“রান্নাঘরে কোন মাতব্বর? রান্না করছে ওপরের ছোট ফ্যান চালিয়ে দিতে পারছে না?”

রূম্পা বেগম জাফর সাহেবের হাতের গ্লাসটা নিয়ে সরিয়ে রেখে পাশে বসলেন। শান্ত গলায় বললেন,

“শোনো না, ফালাক এসেছে অনেকদিন পর। তোয়ার সাথে রান্নাঘরে কী যেন করছে।”
“ফালাক!”
“হ্যাঁ ফালাক।”
“দুই ভাইবোন এ বাড়িতে এত পাক দেয়া শুরু করেছে কেন? নিষেধ করতে পারো না তুমি?”
“কী নিষেধ করব?”
“ওরা যেন এ বাড়িতে না আসে।”
“বেশি বুঝো না তো! ভুল করেছে তোমার বাপ। ফালাকের বাপ না। তোমার বাপ দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল, মায়ের কথায় ছোটবেলা থেকে জাভেদ ভাইকে দেখতে পারো না। ভাইয়ের কী দোষ এখানে? আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছে। কয়দিনই বা বেঁচে থাকবে? সব ঠিকঠাক করে নাও। তুমি ডাক দিলেই জাভেদ ভাই তোমার জন্য দৌঁড় দেবে। মনে রাইখো, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর জন্য কঠিন শা*স্তি আছে।”

কথাগুলো বলে এক প্রকার ভয়েই মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন রূম্পা বেগম। তিনি অনুভব করলেন জাফর সাহেব ফুটন্ত পানির ন্যায় টগবগে চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি সাহস করে আবার বললেন,

“আমাদের দুই পরিবারে সবার সাথে সবার সম্পর্ক আছে। যাতায়াত হয়, বাহিরে যাওয়াও হয় মাঝখান দিয়ে তুমিই শুধু এসব আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছো।”

জাফর সাহেব রূম্পা বেগমের দিকে নজর স্থির রেখেই ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন। কিছু না বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে রুমে চলে যান।

রাতে খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসেছে শুধু নিশো আসেনি। কিছুক্ষণ আগেই সে বাহিরে গিয়েছে। মূলত সবাই একসাথে খেতে বসলে তাকেও ডাকবে আর সে বাবার সামনে বসে সে খেতে পারবে না। ফালাকের সামনে বাবাকে আর অপ্রস্তুত করতে চাইছে না সে। বাড়ির সামনেই ছোট একটা ব্রিজের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে বসে সিগারেট টানছিল।

রাত এগারোটার দিকে নিশো বাসায় ফিরে। এতরাতে কলিংবেল না চেপে তোয়াকে টেক্সট করে দরজা খুলে দিতে বলে। তোয়া উঠবে তখনই ফালাক তাকে থামিয়ে দিয়ে তাকে রেস্ট নিতে বলে নিজেই উঠে যায়। রূম্পা বেগম জেগে থাকতে চেয়েছিলেন কিন্তু উনাকেও ফালাক নিশোর জন্য অপেক্ষা করতে দেয়নি।

ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বা*লিয়ে দরজাটা খুলে দিল ফালাক। নিশো ভেবেছিল তোয়া নিজেই এসে দরজা খুলবে। সিগারেটে শেষ একটা টান দিয়ে সেটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে আ*গুন নিভিয়ে দরজার দিকে ঘুরতেই ফালাককে দেখামাত্র হয়ে হাতের ডানদিকে ফিরে হাত এদিকে ওদিক নাড়িয়ে মুখের ধোয়া বিলীন করল। ফালাক কেশে উঁঠল। একবার, দু’বার পরপর তিনবার কেশে উঁঠল সে।

নিশো অসহায় ভঙ্গিতে ফালাকের দিকে তাকিয়ে রইল। ফালাক কাশতে কাশতে বলে উঠল,

“আমি আপনাকে বলেছিলাম, আমি যেখানে যখন থাকব আপনি সেখানে তখন সিগারেট খাবেন না। আমি সিগারেটের ধোঁয়া তো দূরের কথা গন্ধও সহ্য হয় না। এসব গু-গোবর খান কীভাবে ছি। রুচিতে বাঁধে না?”

নিশোর এখানে শেষের দুই বাক্যে রেগে যাওয়ার কথা থাকলেও সে রাগলো না। ভুলটা তার নিজেরই। কেন যে বাড়ি অবধি সিগারেট খেয়ে আসতে গেল! নিজের বোন আর চাচাতো বোন কি আর এক হলো নাকি তাও আবার ফালাকের মতো মেয়ে!

নিশো মলিনমুখে বলে উঠল,“স্যরি।”
“ভেতরে আসুন৷ খেতে বসার আগে শুধু ফ্রেশ না একদম দাঁত ব্রাশ করে কুলকুচি করে আসবেন নইলে আমি খাবার সার্ভ করব না।”

নিশো ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,“তুমি সার্ভ করবে মানে? মা কোথায়?”
“রাত এগারো পার হয়েছে। একঘণ্টাও নেই অন্যদিন শুরু হতে। এতরাত অবধি বাহিরে থেকে এখন বাসায় ফিরছেন আর আশা করছে বড়মা জেগে থাকবে। সালাম আপনাকে। এরকম আশা আর করবেন না।”
“বড্ড বেশি কথা বলা শুরু করেছ।”
“বোবাবউ পছন্দ।”

নিশো ফালাকের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,“তোমার মতো এত শাসনের স্বরে কথা বলা বউ অন্তত অপছন্দ হবে। সুর কোমল করো। আমি তোমার সিনিয়র।”

ফালাক এক পলকে নিশোর দিকে তাকিয়ে রইল। নজর স্থির রেখে বলল,”ভাইয়া, ভাইয়া, খেতে আসুন প্লিজ। আমি আপনার জন্য অনেক কষ্ট করে রান্না করেছি। আপনার বাবাও খেয়েছেন। আপনি খেলেই আমার রান্না এবার স্বার্থক হবে।”

নিশো কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো। ফালাক পিছন থেকে ডেকে বলল,

“তাড়াতাড়ি আসবেন, আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না, ভাইয়ায়ায়ায়ায়ায়া।”

#চলবে……

#একটি_সাঁঝরঙা_গল্প
#তানিয়া_মাহি
#পর্ব_১৫

“ভাইয়া, ইয়াদের বিয়ের কথা চলছে। ও তোকে পছন্দ করে জানিস তো তাই না? এরপরও কেন চুপ করে বসে আছিস? ফুপাকে তুই চিনিস না? বিয়ের কথা যেহেতু ভেবেছে সেহেতু বিয়ে দিয়েই দেবে।”

ফালাক তোয়াদের বাড়ি থেকে ফেরার দুদিন পরই জানতে পারল ইয়াদের বিয়ের কথা চলছে। ইয়াদ ফোন করে জানিয়েছে। আবিরের কথা ইয়াদের কাছে জানতে চাইলে সে শুধু বলেছে- জীবনে কতজনকেই তো ভালো লাগে, সেই ভালো লাগার মানুষগুলো কি আমাদের ভালোবাসে?

ফালাক বেশ বুঝতে পেরেছে আবিরের সাথে ইয়াদের কিছু একটা হয়েছে যার জন্য ইয়াদ এমন কথা বলেছে। আবির কর্মব্যস্ততায় থাকে। ফালাক তার সাথে একা একটু কথা বলার সময়ই পায় না। আজ আবির তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরায় ভাইকে ফ্রি পেয়েছে ফালাক।

আবির শুয়ে শুয়ে ফোন চাপছিল এমন সময় ফালাক রুমে প্রবেশ করে উক্ত প্রশ্নটা করে বসলো। আবির কিছুক্ষণ ফালাকের দিকে তাকিয়ে রইল। বলল,

”ওর বিয়ে হলে আমি কী করব? বড় যেহেতু হয়েছে বিয়ে তো করতেই হবে।”

ফালাক এগিয়ে এসে আবিরের পায়ের দিকটায় পা ঝুলিয়ে বসলো৷ দরজার দিকে উঁকি দিয়ে দেখে বলল,

“ইয়াদ তোকে ভালোবাসে, ভাইয়া।”
“আমি ভালোবাসি না।” আবিরের সোজাসাপ্টা জবাব।
“একজন মেয়ে তোকে ভালোবাসে, তুই জানিস, বুঝিস তারপরও পছন্দ না করে বা ভালো না বেসে আছিস? তোর কি অন্য কাউকে পছন্দ? ইয়াদ তো অপছন্দ করার মতো মেয়ে না।”

আবির নিঃসংকোচে বলল,“হ্যাঁ। ”

ফালাক ভ্রু কুঁচকে শুধালো, “কী হ্যাঁ? কাউকে পছন্দ করিস?”

আবির তেজে উঠে বলল,“হ্যাঁ, বললাম তো।”

ফালাক বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকালো। মৃদু গলায় বলল, “কাকে?”

আবির ফোনস্ক্রিনে নজর নিবদ্ধ রেখেই বলল,“সময় হোক জানতে পারবি। তাছাড়া ইয়াদের বয়স কম। এই সময়ে যাকে তাকে ভালো লাগবে। আমাকে ওর কতদিন ধরে ভালো লাগে? চার মাস। এর আগে একটা ছেলের জন্য হাত কেটে, স্লিপিং পিল খেয়ে সাতদিন হসপিটালে এডমিট ছিল ভুলে গেছিস? এরকম নিব্বি টাইপ মেয়েকে বিয়ে করব আমি? সেদিন রাস্তায় দেখা হয়েছিল। জোর করে ধরে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। আশেপাশের মানুষ তাকিয়ে ছিল বিধায় যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেখানেই বসে ওকে ক্লিয়ারলি সব বুঝিয়ে বলে দিয়েছি। কথা মেনেও নিয়েছিল৷ ওর সাথে আমার যায়? পিচ্চি একটা মেয়ে৷”

সব শুনে ফালাক হতভম্ব চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। বলল,“তাহলে ও যে বলল….”

“কী বলল?” প্রশ্ন আবিরের।
“বলল, তুই ওকে কষ্ট দিয়েছিস তাই বাবার কথায় বিয়ে করে নিচ্ছে।”
“ভাইইইই! তুই গিয়ে দেখ বিয়েটা ঠিকই নাঁচতে নাঁচতে করছে মাঝখান দিয়ে তোকে বোকা বানাচ্ছে।”

আবির রেগে যাচ্ছে বুঝতে পেরে ফালাক পায়ের দিক থেকে উঠে মাথার দিকে থাকা পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। আবিরের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে পিছনে টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে বলল,

“তাহলে বল না প্লিজ, তুই কাকে পছন্দ করিস? আচ্ছা ইয়াদকে বাদ দিলাম। ও আসলেই বাচ্চা মানুষের মতো বিহেভ করে। তুই তোর কথা বল।”

আবির পরিমিত হেসে বলল,“তোয়াকে তোর কেমন লাগে?”

ফালাক সুরেলা কণ্ঠে হেসে উঠল। ফালাকের হাসি শুনে রাবেয়া বেগম রান্নাঘর থেকে দৌঁড়ে এসে আবিরের ঘরে উঁকি দিয়ে বললেন,

“কী হয়েছে রে? দুই ভাইবোন কী বলে হাসাহাসি করছিস?”

ফালাক হাসতে হাসতে মায়ের দিকে এগিয়ে এসে বলল,“মা, বাসায় আমার ভাবি আনার ব্যবস্থা করে দাও।”
____

আগামীকাল ফালাকের পরিক্ষা শেষ। এই কয়েকদিনে সে মোটামুটি ভালোভাবেই সিলেবাস শেষ করেছে। নিশো পড়াতে আসায় তাকে দেখামাত্র ফালাক নিশোকে রুমে বসিয়ে রেখে চা করতে গিয়েছিল। চা বানিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই ফালাককে দেখে নিশো বলল,

“আপনার আগামীকাল পরিক্ষা আর আপনি সেজেগুজে, চা বানিয়ে সময় কেন নষ্ট করছেন?”

ফালাক চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে ওরনাটা মাথায় ভালোভাবে টেনে কপাল অবধি নিয়ে বলল,

“দেখুন তো, এভাবে আমাকে কেউ দেখলে পছন্দ করবে?”
“পছন্দ কেন করতে হবে?”
“বাবার হাত কা*টার পর যে ডক্টর বাবাকে দেখেছিল তিনি আমাকে পছন্দ করেছেন। সন্ধ্যার আগে মাকে নিয়ে এসেছিলেন। কিছুক্ষণ আগেই চলে গেল।”

নিশো ভ্রু কুঁচকে ফালাকের দিকে তাকালো।
“পছন্দ করেছে মানে? কেন পছন্দ করেছে?”
“একটা অবিবাহিত পুরুষ, একটা অবিবাহিত নারীকে কেন পছন্দ করতে পারে?”
“কে কেন?”
“বুঝতে পারছেন না? আমি বলছি শুনুন। ডাক্তার সাহেব আমাকে পছন্দ করেছেন নিজের জন্য। আজ তার মাকে নিয়ে বাসায় এসেছিলেন বিয়ের কথা বলতে। বাড়িতে তো সবাই খুব খুশি।”

নিশো ফালাকের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে মৃদু গলায় বলল,“তুমিও?”

ফালাক চেয়ারে বসলো৷ চায়ের কাপটা নিশোর দিয়ে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমিও কী?”
“খুশি?”
“আপনিই বলুন আমার কী করা উচিৎ? ”

নিশো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেকি হাসলো। কিছু বলতে যাবে তখনই ফালাকের ফোন বেজে উঠল। ফালাকের আগেই নিশোর চোখ গেল সামনে থাকা ফালাকের ফোনস্ক্রিনে। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘ডাক্তার সাহেব’। ফালাক নিশোর দিকে তাকিয়েই খপ করে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো। নিশোকে ইশারায় বোঝালো- সে একটু কথা বলেই আসছে।

ফালাক বসা থেকে উঠে বাহিরে না গিয়ে দরজা আর নিশোর মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করে দাঁড়িয়ে কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলতেই সে বলে উঠল,

“ওহ আচ্ছা। বাড়িতে ঠিকমতো পৌঁছেছেন? কোন অসুবিধা হয়নি তো?”

ওপাশ থেকে আবারও কিছু বলল। ফালাক কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনে বলল,“কালকে তো আমার পরিক্ষা আছে, আপনি পরশু বের হন। আমিও বাবাকে বলে বের হতে পারব। কোথায় দেখা করবেন বলুন?”

ফালাক কথা শেষ করল। দ্রুত এসে আবার আগের মতো চেয়ারে বসলো। সামনে চায়ের কাপ ওভাবেই পড়ে আছে দেখে বলল,

“এ বাবা, আপনি চা এখনো খাননি? চা তো এখন ঠান্ডা শরবত হয়ে গেছে।”
“চা খেতে ইচ্ছে করছে না।” বলেই ফালাকের বইটা বের করল নিশো।

ফালাক ফিক করে হাসতে গিয়েও হাসি আটকে রাখলো। সে বেশ বুঝতে পারছে ডাক্তার সাহেবকে সে ভালোভাবে নিতে পারেনি। তার ঈর্ষা হচ্ছে। ফালাক বিষয়টি আরেকটু ঘাটাতে বলল,

“ডাক্তার সাহেব দেখতে সুন্দর, দেখেছেনই তো! আমার সাথে মানাবে?”
“আগামীকালের পরিক্ষাটা ভালোভাবে শেষ করো। বাহিরের মানুষের চিন্তায় শেষ পরিক্ষাটা খারাপ কোরো না। আমার খুব পরিশ্রম মরতে হয়েছে এই কয়েকটা মাস। নিজেও তো কম পরিশ্রম করোনি। শেষ ভালো যার সব ভালো তার। ভালোয় ভালোয় সব পরিক্ষা হয়ে যাক তারপর যাকে ইচ্ছে তাকে নিয়ে ভেবো।”

ফালাক এবার নরম গলায় বলে উঠল,“আমার পড়া কমপ্লিট।”

নিশো ফালাকের দিকে তাকিয়ে বলল,”বিয়েটা কি সত্যিই হচ্ছে? হওয়ার সম্ভাবনা আছে?”

“হ্যাঁ, কেন থাকবে না?”

নিশো কিছুক্ষণ চুপ রইল। ভাবলো পুরোনো জনের কথা। চুপ থাকলেই তো মানুষকে হারিয়ে ফেলতে হয়। মানুষ একবার হারিয়ে গেলে তার ছায়াও ফিরে আসে না। নিশো কিছু একটা ভেবেই ফালাককে বলল,

“আর তিনটা মাস অপেক্ষা করা যায় না? আমি আমার মেধায় কিছু করে উঠতে না পারলে তোমার বিজনেসটা না হয় বড় করব?”

ফালাক যেন এবার কেঁদেই ফেলল। নিশো যে পরোক্ষভাবে তাকে ভালোবাসার আভাস দিল। ফালাকের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। নিশো আসলেই এই কথাটা বলল! ফালাকের চোখ দুটো টলমল করছে অথচ মুখে হাসি। আঙুল দিয়ে চোখের নিচটা মুছতে মুছতে বলল,

“আমি এই কথাটা শোনার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না বিশ্বাস করুন। প্রতিদিন আপনাকে দেখছি, কেমন প্রফেশনাল সম্পর্ক। গম্ভীরভাব, আমাকে না দেখা আমি নিতে পারছিলাম না। এখন আমি দুই, তিনমাস কেন? আমি আপনার জন্য আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে দুই যুগও অপেক্ষা করতে পারব। আপনি শুধু সফল হয়ে ফিরে আসুন। আমি অপেক্ষা করব।”

নিশোর যেন এবার এই মেয়েটাকে নিজের নিজের লাগছে। সে চুপচাপ ফালাককে দেখে যাচ্ছে। ফালাক দুই হাতের উল্টোপাশ দিয়ে দুই চোখ মুছে নিয়ে বলল,

“আপনি তাহলে আমার কাছে হার মানলেন। আমি আপনাকে জিতে নিলাম শেষ পর্যন্ত।” বলেই হেসে ফেলল ফালাক।

নিশো কিছু বলবে তখন ফালাকের ফোন আবার বেজে উঠল। ফালাক ফোনস্ক্রিনে ‘তোয়া আপু’ নাম দেখে নিশোর দিকে তাকালো।

“আপু কল দিয়েছে। ”

নিশো নিজের ফোন বের করতে করতে বলল,“রিসিভ করো তো। আমার ফোন সাইলেন্ট ছিল, হয়তো কল দিয়ে আমাকে পায়নি তাই তোমাকে কল দিয়েছে।”

ফালাক কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তোয়া বলে উঠল,“হ্যালো ফালাক, ভাইয়া কি তোর ওখানে আছে?”

ফালাক নিশোর দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,“হ্যাঁ আছে তো। কিছু কি হয়েছে, আপু? বাসায় সব ঠিকঠাক?”

তোয়া কান্নাজড়ানো গলায় বলল,“ভাইয়াকে ফোনটা একটু দে। ভাইয়ার সাথে কথা বলব।”

ফালাক আর দেরি না করে নিজের ফোনটা নিশোর হাতে ধরিয়ে দিল। নিশো ফোনটা কানে নিয়ে বলে উঠল,

“কী হয়েছে, তোয়া? বল আমি শুনছি।”

তোয়া এবার শব্দ করে কেঁদে উঁঠল। বলল,“ভাইয়া, বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। বাবা এখন থানায়।”

#চলবে…..