ওড়নার দোষ শেষ পর্ব

0
668

ওড়নার দোষ
শেষ পর্ব।
Israt জাহান

লিভিংরুমে সবাই পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে বসে আছে।কারো মুখ থেকেই কোনো আওয়াজ বের হচ্ছেনা। রুবা মুখে ওড়না চেঁপে কাঁদছে।সবার এমন স্থির ভাব ছন্ন মোটেই আশা করেনি।ওদিকে মেঘা ঘরে গিয়ে দরজা আটকে কান্না করছে।অবশ্য সেটা ছন্নই বলেছিল মেঘাকে।বাসায় ফিরে যেন চুপচাপ ঘরে চলে যায় ও। থমথমে পরিবেশ দেখে ছন্ন নিজেই বলে উঠল,
“তোমরা এভাবে সবাই স্ট্যাচু হয়ে গেলে কেন?”
“এমন একটা কাজ করার আগে তোর কী একবারও আমার কথা মনে হলোনা ছন্ন?কীভাবে পারলি তুই আমাকে এ বাড়ির মানুষগুলোকে ঠঁকাতে?”
রুবা কর্কশস্বরে বলল ছন্নকে।রুমেন সাহেব তখনো একদম নিশ্চুপ।রুবেলের ও রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে।কিছু না বললে ওর ও শান্তি লাগবেনা।
“তোমার কী একটুও বুক কাঁপলোনা ছন্ন?একটুও ভয় কাজ করেনি তখন?”
ছন্ন গুটি গুটি পায়ে নানুর পাশে গিয়ে বসল।নানুর হাতটা ধরে বলল,
“আমি কী দেখতে খুব খারাপ নানু?আমার পজিশন আমার ক্যারিয়ার,জব এগুলোও কী তোমার অপছন্দ? মোট কথা আমি কী মেঘার জন্য পারফেক্ট নই?”
নানু নড়েচড়ে বসে ওর দিকে গরম চোখে তাকাল।বলল,
“এভাবে না জানিয়ে এমন একটা জঘন্য কাজ করে এখন আবার মুখে মুখে কথা বলছো তুমি?তোমার যদি মনে এমন কিছুই ছিল তাহলে বলোনি কেন?”
“বললে বুঝি তোমরা খুব সহজে মেঘাকে আমার হাতে তুলে দিতে?তোমাদের একটায় লজিক আমরা ফুপাতো মামাতো ভাই বোন।তাই আমাদের বিয়েটা একদমই বেমানান।এটা কোনো লজিক্যালি পয়েন্ট হলো?এমন সম্পর্কে কী কোথাও বিয়ে হচ্ছেনা?”
“তাই বলে না জানিয়ে?”
“জানাতে গেলে অনেকদিন আমাকে অপেক্ষা করতে হতো।”
“এই ছন্ন তুমি কী বলছো বলো তো?”
এলিনার কথার উত্তরে ছন্ন মুখটা লজ্জা লজ্জা ভাব করে বলল,
“তোমাদেরকে ম্যানেজ করতে করতে অনেক সময় লেগে যেতো।আমার অতো ধৈর্য নেই।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ছন্ন নিজের রুমে চলে গেল। লিভিংরুমে বসা সবাই নির্বাক হয়ে ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল।
“এই ছেলেটার সাহস যে অত্যাধিক তা তো বিয়েটা করেই প্রমাণ করেছে।কিন্তু লজ্জার বিন্দুর পরিমাণ তো ভেতরে থাকা উচিত নাকি?আর আমার ভাতিজির কথাই বা কী বলবো।এতকিছু আমার সাথে শেয়ার করে আর ওই মুহূর্তে এই কাজ করার আগে আমাকে একবার জানালো না?ইচ্ছে তো করছে পুচকেটাকে একটা আছাড় মেড়ে আসি।কিন্তু তাই বলে মেঘাটার কষ্টও সহ্য করা মুশকিল আমার জন্য।”
কথাগুলো মনে মনে ভেবে রুবেল বড় ভাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ালো।ব্যাপারটাকে তো এভাবে ফেলে রাখলে কোনো সমাধান হবেনা।ছন্ন’র এমন ভুলের জন্য যদি রুমেন আবার তার বোনকে দূরে সরিয়ে দেয়?সেটা রুবেল কোনোভাবেই হতে দেবেনা।অনেক সময় অপেক্ষা করে আজ সম্পর্কগুলোকে এক করতে পেরেছে।এই সম্পর্ক আর কোনো ভাবেই ভাঙ্গতে দেওয়া যাবেনা।কী বলে শুরু করবে,কীভাবে এর সমাধান করবে সেটাই দাঁড়িয়ে ভাবছে রুবেল।দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে রুবেল বললো,
“আমার কিছু কথা ছিল এই বিষয়ে ভাইয়া।যেগুলো তোমাকে ঠান্ডা মাথায় একবার শুনতে হবে।আম্মার রুমে এসো।আপা আম্মা তোমরাও এসো।”



“দ্যাখো ওরা যে কাজটা করেছে তা অত্যন্ত অন্যায়জনক। এর শাস্তি তো ওদেরকে পেতেই হবে।কিন্তু আমি ভাবছি মেঘাও আমাদের মেয়ে আর ছন্নও আমাদেরই ছেলে। এমন ধরনের ভাই-বোন সম্পর্ক থেকে আজকাল অহোরহো বিয়ে হচ্ছে।ছন্ন যে ধরনের ছেলে আমরা হয়তো মেঘার জন্য এমন কোনো ছেলেই খুঁজতাম।সেই হিসেবে ছন্ন খারাপ ছেলে নয়।আর মেঘাও ছন্ন’র কাছে খুব খারাপ থাকবেনা বরং ভালোই থাকবে।যেখানে ওর নিজের ফুপি আছে সেখানে ওর খারাপ থাকার প্রশ্নই আসেনা।”
এতক্ষণে রুমেন মুখ খুললো।প্রচন্ড চটে গিয়ে ভারী কন্ঠে জবাব দিলো,
“তার মানে তুই এখন এই বিয়েটা একদম স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে বলছিস তাইতো?”
“ভাইয়া প্লিজ একটু ঠান্ডা করো মাথাটা। আমি বলেছি আমার কথাগুলো তোমাদের ঠান্ডা মাথায় বুঝতে হবে।যা করার তা তো ওরা করেই ফেলেছে।এখন এই ব্যাপারটা যাতে কোনোভাবেই বাইরে কোনোভাবে না যায় আমাদের সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।আরএর জন্য ওরা উপযুক্ত শাস্তি পাবে।ওদের বিয়েটা এই মুহূর্তে গোপন থাকবে দরকার।মেনে নেওয়া ছাড়া তুমি কী আর কোনো উপায় পাচ্ছো?ছন্ন’র ভুলের শাস্তি তুমি প্লিজ আপাকে দিওনা।আর তুমি আর যাই হোক ওদের সেপারেশনের কথা ভেবোনা।”
“আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছেনা রুবেল।মাথা ফেটে যাচ্ছে আমার রাগে।আমি যে কী থেকে কী করে ফেলবো…..”
“তুমি একটা কথা বলো তো।ছন্নকে কী তোমার পছন্দ নয়?ওকে কী তুমি নিজের ছেলের মত ভালোবাসোনা?বলো।”
“(নিশ্চুপ)”
“ভাইয়া?এটা তো সত্যি।ছন্ন যদি এভাবে বিয়েটা না করে আগে আমাদের কাছে মেঘাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতো আমরা তা কখনোই মেনে নিতাম না।”
“তাই বলে ও এতো বড় দুঃসাহস দেখাবে?”
“তুমি কী ওকে একদমই অপছন্দ করো?”
“আমি কিচ্ছু জানিনা।আমার সহ্য হচ্ছেনা।”
“তোমার যদি ওকে অপছন্দ হয় তাহলে তুমি যা ভালো মনে করো তাই করবে।কিন্তু তুমি যদি ওকে পছন্দ করে থাকো তাহলে প্লিজ এটা সমাধানের ব্যবস্থা করো।ব্যাপারটাকে পেন্ডিং রাখার কোনো মানেই হয়না।”
“অপছন্দ তো বলিনি।কিন্তু ও…..”
“ব্যাস সমস্যা তো মিটেই গেলো।তুমি আজকের রাতটা ঠান্ডা মাথায় ভাবো কীভাবে কী করবে?ভেবে নাও এমনটায় হয়তো হওয়ার ছিলো।”



রুমেন সাহেব রাতের মধ্যেই সবকিছু ভেবে ফেলেছে।সে নিজেও চায়না ছন্ন’র অপরাধের শাস্তি সে কখনোই তার বোনকে দিবেনা।অনেকদিন বোনটা তাদের থেকে দূরে ছিলো।এই ঘটনার জন্য সে তার বোনটাকে আর পরিবার থেকে দূরে রাখবেনা।যা শাস্তি পাওয়ার তা ছন্ন পাবে আর তার মেয়েও।
“এটাই আমার সিদ্ধান্ত।আমি এই বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান করবোনা।”
“ভাইয়া অনুষ্ঠান একেবারে না করলে কেমন যেনো হয়ে যায় ব্যাপারটা।”
“যেমন খুশি তেমন হোক।আমার আর কিছু যায় আসে না। আর ওকে যত তাড়াতাড়ি পারো ওখানে ব্যাক করতে বলো।”
কথাগুলো শেষ করে উঠে যাচ্ছিলো রুমেন।তখন রুবা বললো,
“কিছু কথা জানানোর ছিলো তোমাদের।কখনো ভাবিনি কথাটা তোমাদের জানাবো।”
“কী কথা আপা?”
রুবেলের প্রশ্নে রুবা বললো, “ছন্ন আমার নিজের ছেলে নয়।
আমার বড় ভাসুরের ছেলে।”
রুবা ছন্ন’র পরিচয়টা খুলে বলল রুমেন সবাইকে।কথাগুলো হজম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো সবার।কিন্তু ছন্ন’র দুর্ভাগ্যের জন্য সবার মনে ওর জন্য একটা সফ্ট কর্নার ছিলো।মেঘার দাদীবু তো ওকে নিজের নাতনি বলেই মেনে নিয়েছিলো। হঠাৎ করে কী সেই আদর স্নেহের জায়গা থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব?তা কখনোই কারো পক্ষে সম্ভব নয়।তাই বলে শাস্তি মওকুফ করা যাবেনা তার।সবকিছু মেনে নিলেও ওদের দুজনের জন্য বিশেষ করে ছন্ন’র জন্য চরম শাস্তির ব্যবস্থা করলো সবাই।পনেরো দিনের মধ্যে ছন্ন’র অস্ট্রেলিয়া ব্যাক করার টিকেট বুকিং করে দিলো রুমেন সাহবে।ওখানে গিয়ে নিজের জবটা মন দিয়ে করতে হবে ওকে।ছয়মাস পর মেঘা অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে রুবা আর রুশার সঙ্গে ।এই ছয়মাসের মধ্যে ছন্ন মেঘার সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে কোনো যোগাযোগ করতে পারবেনা।টোটালি ওদের কথা বলা বন্ধ থাকবে।মেঘার থেকে ওর পার্সোনাল সেলফোনও নিয়ে নেওয়া হলো।আর এভাবে বিয়েটা করার জন্য ওদের সত্যি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রিসিপশনের আয়োজনও করবেন না মেঘার বাবা।যেদিন ফ্লাইট তার আগের দিন রাতে ছন্ন মামনির হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল,
“মামনি এমন নিষ্ঠুর আচরণ তোমরা আমার সাথে কীভাবে করছো বলো তো?বিয়ে করা বউয়ের ধারের কাছেই ঘেষতে দিচ্ছোনা একদম।ওর ফোনটাও নিয়ে নিয়েছো।এগুলো কী ঠিক করছো?”
“তুমি যদি এভাবে বিয়েটা করতে পারো তাহলে আমরাও তোমার সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারি।আর তুমি এতো কষ্ট পাচ্ছো কেন?কই মেঘা তো একদম স্বাভাবিকই আছে।ওর তো তোমার মত এত মাথা ব্যাথা নেই।”
“সত্যি?”
“হুম তা নয়তো কী?”
ছন্ন একদম মনমরা হয়ে বসে থাকল।মনে মনে বিশ্রি গালাগালি দিলো মেঘাকে।তারপর মামনিকে আবার বলল,
“কাল সকালেই তো আমার ফ্লাইট।”
“তো?”
উদাসীন ভাব নিয়ে বলল রুবা।ছন্ন নিচুস্বরে বলল,
“আজকে রাতে অন্তত আমার বাসরঘরের ব্যবস্থাটা করতে।”
কথাটা বলেই উঠে দৌঁড় লাগাল ছন্ন মামনির হাতের চাপড় খাওয়ার আগে।রাতে চুপিচুপি মেঘার রুমের দরজা নক করলো। দরজা খুলতেই নিজের মামনিকে দেখে সেই স্থান ত্যাগ করতে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলোনা।সকালবেলা ছন্নকে বিদায় দিতে এয়ারপোর্ট সবাই এলো।সবাইকে দেখে ছন্ন’র খুব আনন্দ হলো।ও বাড়ির মানুষ যে ওকে সত্যি ক্ষমা করেছে তার প্রমাণ পেলো আজ।এতোগুলো দিন ও বাড়ির কেউই ওর সাথে দরকার ছাড়া কথা বলেনি।আর নিজের শ্বশ্বুড় তো নয় ই।কিন্তু আজ সেই শ্বশ্বুড় ও এসেছে তাকে বিদায় জানাতে।খুবই ভালো লাগছে ওর।তবে এতো মানুষের মাঝে ছন্ন মেঘাকেই খুঁজে পাচ্ছেনা।
“মামনি মেঘা আসেনি।”
“না।”
“তোমরা ওকে আসতে দাওনি তাইনা?”
“কী আজব! আমরা আসতে দেবোনা কেন ওকে?”
রুবেল দাঁড়িয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে।রুমেন, মল্লিকা,এলিনা সবাই একটু মজা পেলো ছন্ন’র মুখটা দেখে।রুবেল বলল,
“তাকে অনেকবার আসতে বলা হয়েছিল।সে বলেছে তার কাউকে বিদায় দেওয়ার সময় নেই।সামনে পরীক্ষা তার অনেক পড়া আছে।”
“এটা মোটেও সত্যি কথা নয় মামা।”
“এই ভাইয়া তোকে মিথ্যা বলতে যাবো কেন রে?মেঘা কে তো আমিও অনেকবার বলেছিলাম।কিন্তু ও আসেনি।”
রুমেন এসে ছন্ন’র কাঁধে হাত রেখে বলল,
“এসব বন জঙ্গল ছেড়ে এবার নিজের গিয়ে মনযোগী হও এবার।আমি আমার মেয়েকে ওই বন জঙ্গলে নিয়ে থাকার কোনো অনুমতি দিবোনা কিন্তু।এতো সহজে সব মেনে নিয়েছি বলে তোমার এলোমেলো চলা ফেরাও যে মেনে নিবো তা ভেবোনা।সাবধানে যাও আর নিজের খেয়াল রেখো।”
“জ্বী মামা।”
সুবোধ ছেলের মত ঘাড় বাঁকিয়ে বললো ছন্ন।ওর মুখে মামা শুনে রুমেন একটু অবাক হলো।শ্বশ্বুড়কে এই ছেলে এখনো মামা বলছে কোন আহ্লাদে?এলিনা ধমকে বলল,
“একটা চড় খাবি।তোর মামাটা কে?”
জিহ্বা কামড়ে ছন্ন অন্যদিকে মুখ ঘুরাল।একে একে সবার থেকে বিদায় নিলো।মামনির থেকে বিদায় নিতে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল ছন্ন।বললো,
“ছয়টা মাস আমি তোমাদের ছাড়া থাকব কী করে বলো তো?”
“ঢং কম করো।আমাদের ছেড়ে থাকার কথা ভাবছো নাকি বউকে ছেড়ে থাকবে বলে কাঁদছো?সেটা তো বুঝতেই পারছি।”
“এভাবে বলতে পারলে?খুব স্বার্থপর তোমরা মেয়েগুলো। পরিবারকে পেয়ে তাই আমাকে ছাড়া থাকতে পারছো। আর ওই পুচকেকলিটাও একেবারে বড় স্বার্থপর। একটাবার দেখতেও এলোনা আমাকে।খুব খুব স্বার্থপর তোমরা।সবার কথা মনে রাখব আমি।ওকে বলে দিও, আসার পর ওকে আমি অনেক বড় পানিশমেন্ট দিবো এর জন্য। পুরো একমাস ওকে আমি জঙ্গলের মধ্যে রেখে দেবো।”
“এ মা ভাইয়া তুই মেয়েদের মত ন্যাকা কান্না করতে শিখলি কবে থেকে রে?”
রুশার মাথায় একটা গাট্টা মাড়ল ছন্ন।কান্নার জন্য কথা বলার সময় ছন্ন’র গলা কাঁপছিল। ওকে কাঁদতে দেখে আর ওর কথা শুনে কেউ আর না হেসে পারলোনা।সবাই মুখ লুকিয়ে হাসল।রুবা ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে ওকে বিদায় জানাল।
ছয়টা মাস কেটে গেল।ছন্ন এর মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে।বাড়ি ঘর রং করে নতুন করে সব সাজিয়েছে গুছিয়েছে।গাড়িটাও বদলে নতুন গাড়ি কিনেছে।আর এর মধ্যে ঠিক করে ফেলেছে মেঘা আসলে ওকে নিয়ে কোন কোন জঙ্গলে হানিমুনে যাবে।যদিও মেঘার পাহাড় পছন্দ বেশি।তাও ছন্ন’র জন্য যে ও জঙ্গলেই হানিমুন যাবে সেটা ছন্ন নিশ্চিত।
******************************
সকাল থেকেই ছন্ন খুব এক্সাইটেড হয়ে আছে।বিকাল পাঁচটার সময় মেঘা,মামনি আর রুশা পৌঁছে যাবে। সেই সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত কতরকম রান্না যে করে ফেলেছে ছন্ন’র নিজেরও ও তা হিসেব নেই।পাঁচটা বাজার পনেরো মিনিট আগে ছন্ন রেডি হয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছাল। ওদিকে রুবা আর রুশা বিকেল পাঁচটায় এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেশানের আনুষ্ঠানিকতা সেরে লাগেজ নিয়ে গেটের কাছাকাছি আসতেই ছন্নকে দেখতে পেলো একদম সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে।রুশা দৌঁড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ভাইকে।
“ভাইয়া তুই এই ছয়মাসে কত্ত পাল্টে গেছিস রে।”
“তাই?”
“হুম এখন তোমাকে একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে।”
মামনি এগিয়ে এসে বলল।মামনির কথার পর ছন্ন এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“কেমন আছো মামনি?”
“খুবই ভালো।তোমাকে সত্যি খুব ভালো লাগছে।ব্ল্যাক পলো শার্ট ব্ল্যাক জিন্স।খুবই ভালো লাগছে।”
“হ্যাঁ মম।আরো বেশি ভালো লাগছে ভাইয়ার খোঁচা দাড়িগুলোর জন্য।”
“অনেক অনেক শুভকামনা তোমাদের জন্য।আর আমার এত বেশি প্রশংসা করার জন্য।”
“তো চলো।বাসায় গিয়ে গল্প করা যাবে।”
ছন্ন মামনির পেছনে দেখছে বার বার।এয়ারপোর্টের ভেতর বার বার লক্ষ্য করছে।মেঘাকে কোথাও না দেখতে পেয়ে বলল,
“এখনো তোমরা মজা করবে?ওকে আর কতদিন লুকিয়ে রাখবে মামনি?”
“কাকে লুকিয়ে রাখব?”
“মামনি!”
রুশা ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে মুখটা মলিন করে বলল,
“তুই যাকে খুঁজছিস সে সত্যি আসেনি।আসেনি বলতে মেঘা কে আসতে দেয়নি।”
“তোরা প্লিজ মজা বন্ধ কর।বাসায় গিয়ে মজা করবি। ওকে বেরিয়ে আসতে বল।”
“ছন্ন আমরা মজা করছিনা।বাসায় চলো সব খুলে বলছি।”
ছন্ন’র চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।রাগে মাথা ফেটে পরছে যেন।রুবা ছন্ন’র চোখ মুখ দেখে বলল,
“এত মাথা গরম করে আবার এখনি দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিওনা।আগে বাসায় চলো।তারপর বুঝিয়ে সব বলছি।”
ছন্ন মামনির হাত থেকে লাগেজগুলো নিয়ে গট গট করে গাড়িতে গিয়ে বসল।ফুল স্পিডে গাড়ি ড্রাইভ করছে। এদিকে রাগে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।হঠাৎ একটা ট্যাক্সির সাথে ধাক্কা লাগতে গিয়ে দ্রুত ব্রেক করে সামলে নিলো ছন্ন।ওর এমন অবস্থা দেখে রুবা আর রুশা প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল।রুশা বলেই ফেলল,
“ভাইয়া গাড়িতে তুই একা না আমরাও আছি।মরলে আমরাও মরবো।আর আমার এত তাড়াতাড়ি মরার শখ নেই।”
রুশার কথার কোনো জবাব দিলোনা ছন্ন।ওর কারো কোনো কথাই কানে আসছেনা।বাড়িতে ওদের পৌঁছে দিয়ে গাড়ি নিয়েই আবার বেরিয়ে পরলো।এক সপ্তাহর ভেতরে বাংলাদেশের টিকিট বুক করতে হবে ওকে।ওখানে গিয়ে দরকার হলে জোড় করে তুলে নিয়ে আসবে ও মেঘাকে।থানা পুলিশ করার প্রয়োজন হলে তাও করবে। তবুও ছন্ন মেঘাকে ছাড়বেনা।রাত নয়টার সময় ছন্ন বাসায় ফিরে লিভিংরুমে ঢুকে পুরো হতবাক হয়ে গেল। চাচাশ্বশ্বুড়,চাচাশ্বাশুড়ি,নিজের শ্বশ্বুড়-শ্বাশুড়ি সবাই বসে গল্প করছে মামনি আর রুশার সাথে।পুরো কাহিনী টা ক্লিয়ার হলো ছন্ন’র কাছে এখন।ও তো ভেবে অবাক ওর সাথে সবাই এত সুন্দর করে একটা সাজানো গোছানো নাটক কী করে পরিচালনা করলো?আর ও সেটা ঘুনাক্ষরেও টের পেলোনা।ওকে দেখে সবাই সমানতালে দাঁত বের করে হাসছে।এলিনা ওকে ডাকল,
“কীরে ছন্ন এদিকে আয়।আমাদের দেখে খুশি হোস নি বুঝি?”
ছন্ন মামির পাশে বসতে বসতে বলল,
“এর থেকে খুশি বোধহয় আমি ডেলাভারি হয়েও হইনি। কেমন আছো তোমরা সবাই?”
“খুবই ভালো।তো চমকটা কেমন ছিল?”
“দুর্দান্ত।বাবা-মা আপনাদের শরীরের কী অবস্থা?নানু কেমন আছে?”
“আম্মা তোকে দেখার জন্য পাগল হয়ে আছে একদম। খুব তাড়াতাড়িই তোকে একবার যেতে হবে দেশে।”
মল্লিকার কথার পর রুমেন বলে উঠল,
“কানমলা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাস।তার প্রাণের নাতনিকে এতদূর এসে থাকতে হবে বলে উঠতে বসতে তোকে গালাগাল করে।আবার তোকেও দেখার জন্য পাগলামী করে।আমাদের তো বলেছে তোকে ওখানে নিয়ে গিয়ে ঘরজামাই করে রাখতে।”
“বেশ তো।তাহলে চলুন যাই।আমার তো সমস্যা নেই। মামার টাকায় থুড়ি শ্বশ্বুড়ের টাকায় বউকে নিয়ে বন জঙ্গল ঘুরে বেড়াবো শুধু।”
মামনি ছন্ন’র কান টেনে ধরল।বলল,
“লজ্জা শরম কিছুই তো নেই একদম।সবাই তো বলবে আমি তোকে কিচ্ছু শেখায়নি।”
“মামনি মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক থেকে আমি এমন মজা করতেই পারি।কী বলো তোমরা?”
“তাই তো।কথা তো ভুল বলেনি ছন্ন।”
রুবেল ছন্ন’র কথায় সাঁয় দেওয়াতে রুবা বলল,
“তোমার মতই যে ভাগ্নের আচার-আচরণ তুমি তো সাপোর্ট করবেই।”
“তো এখনো কী তোমাদের নাটক চলছে?মানে এখনো বলবে সে আসেনি?”
এলিনা হেসে দিয়ে বলল,
“তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।জেট এখনো ছাড়েনি।বেঘোরে ঘুমোচ্ছে।”
ছন্ন আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষা না করে নিজের রুমে চলে গেল।আহ্!তার পুচকেকলি টা কী আরামে শান্তির ঘুম দিচ্ছে।ছন্ন যে এখন কী রেখে কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা।তবে মেঘা আসলে মেঘার জন্য যে পানিশমেন্ট বরাদ্দ করে রেখেছিল তা আজকে পূর্ণ করবেই।ঘুমের মধ্যেই ওকে কোলে তুলে ঘরের পেছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো।মেঘা আতংকে ঘুম মাখা কন্ঠে বলল,
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”
“জঙ্গলে।”
“কী বলছেন?আজই তো এলাম।রাতেই আপনাকে জঙ্গলে যেতে হবে?”
“হুম।অনেক বড় পানিশমেন্ট আছে তোমার জন্য।”
“কিসের পানিশমেন্ট?”
“আমাকে যে কষ্ট দিয়েছো তুমি তার পানিশমেন্ট।”
ছন্ন ড্রাইভ করছে আর মেঘা ওর কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। ওকে এত চুপচপা থাকতে দেখে ছন্ন বলল,
“টেনশন হচ্ছেনা?”
“কিসের জন্য?”
“এভাবে কাউকে না জানিয়ে হুট করে জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছি পানিশমেন্ট দিবো বলে।”
“আপনার পানিশমেন্ট তো? ওটা নিয়ে কোনো টেনশন নেই।”
“কেন?”
“ওটা যে খুব মিষ্টি হবে তা আমি জানি।”
“তাহলে পানিশমেন্ট দেওয়াটা এখান থেকেই শুরু করি?”
“না।ওটা জঙ্গলে গিয়েই নিবো।”
“আর কিন্তু ফিরতে দিবোনা।”
“ফিরতে হবেনা তো।শুধু বেশি বেশি পানিশমেন্ট দিলেই হবে।”
“দিবোনা।কিছুই দিবোনা।জঙ্গলে ফেলে চলে আসবো।এর জন্যই বাঙ্গালী মেয়েগুলাকে সহ্য হয়না।সবগুলো চিটার, বাটপার।”
“আমি কী চিটারি বাটপারি করেছি আপনার সঙ্গে?”
“আবার প্রশ্নও করছো?ইচ্ছে তো করছিলো সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফিরে গিয়ে তোমাকে স্টিক দিয়ে পেটানো শুরু করি।”
“বাঙ্গালী মেয়ে সহ্য হয়না তো লরিন তো ছিলোই।”
নাক কুঁচকে ছন্ন বললো, “ওটাকে কী মেয়ে মানুষ বলে?”
“হুম। সে তো আর আমার মতো রাস্তার মধ্যে পাক্কা দু’মিনিট লিপস্টিক খাওয়াইনি।”
মেঘার কথা শুনে ছন্ন ব্রেক না করে পারলোনা।সিগনাল ছাড়া রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে শান্ত চোখে তাকাল মেঘার দিকে।মেঘার ঠোঁটের কোণে তখন দুষ্টু হাসি।মেয়েটা যে এতো দুষ্টু সেটা ছন্ন জানতোইনা।ওর হাতটা ধরে বুকের মধ্যে টেনে এনে ওর কপালের ওপর থেকে কাটা চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে কপালে আলতো করে একটা চুমু খেলো।
“আজও পিংক?”
“হুম।”
“আমাকে খাওয়ানোর জন্য কী এটাই পারফেক্ট মনে হয় তোমার?”
“একদম।”
“তাহলে খেয়ে নিই?”
“উহুম আমি খাইয়ে দিবো।”
লিপস্টিক টুকু খাওয়ার সুযোগ পেলেও লিপস্টিক খাওয়ার পরের শেষ পরিণতিটুকু আর ঘটতে দিলোনা।দুজন ট্রাফিক পুলিশ এসে গাড়ির কাঁচে নক করলো।দুজনই চমকে তাকালো ওদের দিকে।কখন যে রং সাইডে গাড়ি থামিয়েছে তার খেয়াল আর হয়নি কারোর।