কল্পকুঞ্জে কঙ্কাবতী পর্ব-২৯+৩০

0
277

#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ২৯|

“কী সমস্যা আপনার? কী করতে যাচ্ছিলেন, কী? চাচ্ছিলেন কী? মরে যাই? আরে! আমি তো মানসিকভাবে প্রতিদিনই মরছি। আনুষ্ঠানিকভাবে মারার দরকার কী?”

হাঁপাতে হাঁপাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে তেজী কণ্ঠে কথাগুলো বলছি। কুঞ্জ ভাই অনিমেষনেত্রে তাকিয়ে আছেন। আমার কথা শেষ হতেই বললেন, “ডোন্ট ইউ ট্রাস্ট মি?”

আমি হতাশ হয়ে বললাম, “আই ট্রাস্ট ইউ বাট… এভাবে কেউ বাইকিং করে?”

কুঞ্জ ভাই হাসলেন। বললেন, “তোমার বিশ্বাসের নমুনা দেখলাম। কখনও এমন কোনো সিচুয়েশন এলে, আমায় বিশ্বাস করবে কি না– তা দেখলাম। আচ্ছা, আমাকে এখনও এটুকু চিনতে পারোনি? আমি নিজে মরলেও তোমার ক্ষতি চাইব না, হতে দেবও না।”

“যদি কিছু হয়ে যেত? কী প্রুভ করতে চাইছিলেন?”

ভ্রু-কুঞ্চিত করে কথাটুকু বললাম। বাঁকা হেসে বললেন, “না, কিছু না।”

কথাটি সম্পূর্ণ করেই ধীর পায়ে মেইনরোডের বাঁয়ে থাকা ঝোপের দিকে পা বাড়ালেন। বড্ড অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। বাজে ক’টা? উম.. তিনটে? কুঞ্জ ভাই ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে বিলীন হতে লাগলেন। আমি হাত উঁচিয়ে ডাকলাম, “আরে! আরে! করছেনটা কী? যাচ্ছেন কই?”

কুঞ্জ ভাই ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকালেন আমার দিকে। সরু রাস্তাটি বরাবর চাইলে, ছোটো খাটো একটা জঙ্গল বলে দিতে দ্বিধা করবে না কেউ। চারোপাশে ঝোপঝাড়, লতাগুল্মে সাজানো বিশালাকৃতির গাছপালা, ভেতরে হয়তোবা অজানা-অচেনা-অদেখা আরও অনেক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আছে। গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে মোহময়ী চাঁদের অতিরঞ্জিত আলোতে কুঞ্জ ভাইকে অন্য রকম লাগছে। বে-শ অন্যরকম। আমি যতদূর জানি, লোকালয়ে এমন জায়গা পাওয়া দুষ্কর। তবে এটা কী?

কুঞ্জ ভাই আমার থেকে অনেকটা দূরে। আমি রোডে দাঁড়িয়ে আর উনি ভেতরের দিকে। না হলেও ৬০-৭০ মিটার দূরে আছেন! উনি ডাকলেন আমায়, “নবনী!”

নিস্তব্ধ রাতে ওঁর আওয়াজটা বাতাসে বাড়ি খেল, এভারেজ শব্দটা জোরেশোরেই শোনা গেল। পরপর আবার বললেন, “এসো।”

আমি পিছু পিছু গেলাম। উনি দাঁড়িয়ে আছেন। আমি যেতেই উনি আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুড়ে নিলেন। হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে ভাঁজে নিজের আঙ্গুল রাখলেন, বেশ শক্ত করে আটকে নিয়ে পা বাড়ালেন সামনের দিকে।

জ্যোৎস্না রাত, সরু রাস্তার দুপাশ দিয়ে গাছপালা, উপরের দিকটা সামান্য খোলা, আকাশের ঠিক উপরে এক ফালি চাঁদ, তারা-নক্ষত্রের মেলা, বাতাসের রোমাঞ্চিত শব্দগুচ্ছ আর পাশে প্রিয় পুরুষটি! সবে মিলে মনটা এলোমেলো করে দিচ্ছে। যেতে যেতে কুঞ্জ ভাইকে শুধালাম, “কই যাচ্ছি?”

“শান্তির নীড়ে।”

আমি তো ঠিক এই হাতের মুঠোতেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছি। আর কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই আমার। এখানেই বেশ আছি। পথ ফুরোলেই যদি হাত ছেড়ে দেন? থাক, যাওয়ার প্রয়োজন নেই! মনে মনে কথাগুলো আওড়ালেও মুখে আনতে পারলাম না। কেমন যেন ঘোরে আচ্ছন্ন আমি। যা দেখছি, তাই ভালো লাগছে। মন ভালো থাকলে বুঝি দূরপাল্লার বাসের হর্নের শব্দও সুরেলা গানের ধ্বনি লাগে?

বেশ এগোতে এগোতে একটা ঝিলের কাছে গেলাম। ছোট্টো গোলাকার একটা ঝিল। ঝিলের সম্পূর্ণ পাড় ৮-১০ হাত জায়গা নিয়ে করা। ফাঁকা জায়গাটুকুতে ছোটো-ছোটো মসৃণ ঘাস জন্মেছে। এছাড়া ঝিলটিকে সম্পূর্ণ ঘিরে রেখেছে পেরিয়ে আসা গাছের দলেরা। দেখে মনে হচ্ছে– কেউ খুব যত্নে এই জায়গাটি বানিয়েছে। কুঞ্জ ভাই হাত ছেড়েছেন কখন– জানা নেই। আমি ঘুরে-ফিরে পুরোটা দেখলাম। কী স্নিগ্ধ লাগছে!

জুতো খুলে এগিয়ে গিয়ে ঝিলের টলটলে জলে পা ভিজিয়ে বসে পড়লাম। পরনে একটা হালকা রঙের স্কার্ট আর সাদা ক্রপটপ ছিল, এর উপরে মোটা শাল জড়ানো। ঝিলের হিমশীতল জলে পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সেই সাথে ভালো লাগার আবেশে মন জুড়িয়ে গেল। এতক্ষণে কুঞ্জ ভাইও জুতো খুলে, জিন্স গুটিয়ে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন।

আমি ওঁর দিকে আবেগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। উনি তা দেখে বললেন, “শীত করছে?”

মিথ্যে বললাম না, “একটু করছে।”

উনি ব্যস্ত হয়ে হুডিটা খুলতে লাগলেন। বললেন, “এটা নাও, শীত কম করবে। বাইকেও অনেক শীত করেছিল, না?”

“হুম.. কিন্তু লাগবে না।”

“কেন?”

“বেশি শীত করছে না। একটু করছে.. সামান্য।”

“তো, নাও।”

“আপনার শরীর খারাপ করবে। তাপমাত্রা ১২° সেলসিয়াসের কম এখানে।”

উনি আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, তার আগেই আমি বলে উঠলাম, “প্লিজ, অযথা জেদ করবেন না। ভালো লাগছে এভাবেই। রাগ করতে চাচ্ছি না।”

অগত্যা উনি আর কথা এগোলেন না। চুপ করে আকাশের দিকে তাকালেন। আমি ওঁর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে একবার আমার নজরে যতটুকু আঁটে, দেখে নিলাম। ডান পাশটা, বাঁ পাশটা, সামনেটা, ঝিলের পানির মাঝে খোলা আকাশের উপরের ওই চাঁদটা… সবটা দেখে নিলাম। আবার কুঞ্জ ভাইয়ের দিকে তাকাতেই উনি সাঁই বেগে ঘাসে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লেন। চোখ বুঁজেই বললেন, “জানো– আমি এখানে প্রায়ই আসি?”

অবাক হলাম। সেই সাথে ওঁর এই জায়গাটা খুঁজে পাবার রহস্যও ভেদ করলাম। মস্তিষ্কে বিচলিত হলো একটা কথাই, ‘দুনিয়াতে রহস্য বলে কিছু নেই। যা আমরা জানি না– তাই আমরা রহস্য নামে আখ্যায়িত করি। নতুবা সবেরই এক ব্যাখ্যা আছে।’

আমি মিহি কণ্ঠে বললাম, “জানতাম না।”

উনি বলা শুরু করলেন, “৬-৭ বছর আগে এসেছিলাম।”

“আপনার কলেজ লাইফে? তখন তো বেশ ভদ্র-সদ্র পড়াকু ছেলে ছিলেন। কোথাও তেমন যাওয়া-আসা ছিল না। কীভাবে কী? সাথে কে এসেছিল?”

“একাই এসেছিলাম।”

“মানে? কীভাবে?”

“কলেজ বাঙ্ক দিয়ে।”
আমার চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম। শেষমেশ উনি কলেজ বাঙ্ক দিতেন– এটা জানা হলো আমার? উনি আমাকে চমকে যেতে দেখে হাসলেন। বললেন, “বাইক নিয়ে মানিকগঞ্জ যাচ্ছিলাম, একটা স্কুল ফ্রেন্ডকে পিক করতে। মাঝপথে বাইক থেমে যায়, আর স্টার্ট নিচ্ছিল না। আশেপাশে কোনো গ্যারেজও ছিল না। তাই সেই ফ্রেন্ডকে কল দিয়ে প্রবলেমটা শেয়ার করলাম। ও এখান থেকে কিছুটা দূরেই থাকে। মেকানিক নিয়ে ঘন্টা খানেকের মাঝেই আসবে, ওয়েট করতে বলল। আমি ওয়েট করতে করতে হাঁটতে লাগলাম। তখনই এই ঝিলটা দেখেছি। প্রচুর ভালো লেগে যায়। এরপর মাঝেসাঝেই আসা হয়। তখন অবশ্য এত গোছালো ছিল না। এটা এরকমই সতেজ ও সুন্দর যাতে থাকে– সেজন্য পরিচর্যার লোকও রেখেছি। এখানে শরৎকালে এলে বেশি শান্তি লাগে। কাশফুল ফোঁটে ওদিকটায়।”

হাত দিয়ে দেখালেন উনি। তারপর আমার দিকে চাইলেন। আমি ওঁর দিকেই তাকিয়ে আছি। মুচকি হেসে বললেন, “আচ্ছা, তোমার কাছে জীবন মানে কী?”

“বেঁচে থাকার ইচ্ছে।”

“ইচ্ছে ফুরিয়ে গেলেই কি মানুষ মারা যায়?”

“আত্মার মরণ তো তখনই হয়।”

“তবে শারীরিক ভাবে বেঁচে থাকে কেন? পুরোপুরি বিলীন হলেই তো পারে!”

“জানেন? প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার একটা উদ্দেশ্য থাকে। আপনি হয়তো কোনো একসময় ভাববেন– এই জীবনে আর পাবার কিছুই নেই, সব শেষ। কিন্তু না। সব শেষ হলে, কখনই আপনি বেঁচে থাকতেন না। আপনি জানবেনও না– জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও কীভাবে, কার উপকারে আসছেন। এমনকি মৃত্যুর পরও আপনার দেহটা অন্যের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে। উম.. পোকামাকড়ের খাদ্যরূপে, মাটির উর্বতার জন্য সার রূপে!”

“ভালোই কথা শেখা হয়েছে– দেখছি!”

“ও একটু-আধটু আগে থেকেই জানি। কেবল কারও কাছে বলার ইচ্ছেটা ঠিক হয়ে ওঠে না– বলেই কেউ জানে না।”

“তা আজ আমার কাছে কেন হলো?”

“হবে না? আপনার কাছে তো গোটা আমিটাকেই ভেঙেচূরে উপস্থাপন করেছি!”

কুঞ্জ ভাই স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। কিছুটা থমকে থাকা সময় যেতেই বললেন, “ভালোবাসা মানে কী বোঝো?”

আমার অকম্পিত জবাব, “আপনাকে বুঝি।”

উনি চুপ মেরে গেলেন। আমি সামান্য হেসে বললাম, “বলবেন কি?”

লম্বা একটা শ্বাস টেনে বললেন, “আমার চোখের ভাষা কী তোমার জানা নয়? সেই ছোট্টোটি থাকতেই তো শিখে নিয়েছিলে। তবে এখন কেন মুখ ফুটে সব বলতে হবে?”

“যাতে ভবিষ্যতে কোনোদিন অস্বীকার করতে না পারেন আমায়। কোনোদিন বলতে না পারেন– আমার আপনার উপর অধিকার নেই। অব্যক্ত কথার খেলাপ করার জন্য বাহানা না দিতে পারেন যে, আপনি কোনো অঙ্গিকার করেননি।”

“আমাকে বিশ্বাস করো না?”

“করি। সময়কে করি না, সিচুয়েশনকে করি না। একটা কথা জানেন কি? সময় আর পরিস্থিতি যে কোনো মানুষকে বদলে দিতে পারে।”

“অভিজ্ঞতা এত?”

“তা নয়তো কী? এই-যে, যেখানে আপনি আমার সাথে কথা না বলে থাকতেই পারতেন না, আমাকে না জ্বালালে যেন আপনার ঘুমই হতো না; সেখানে সেই আপনিই মাসের পর মাস যোগাযোগ রাখেননি।”

“ব্যস্ত ছিলাম।”

“সে-বাহানা আমায় দেওয়া লাগবে না। আপনি কতটুকু ব্যস্ত হলে কতটুকু সময় আমাকে দেন, তা আমার মুখস্ত।”

“ভুল বুঝছ তুমি।”

“না। তবে এক্সপ্লেনেশন চাচ্ছি। নয়তো আপনার কল আসতেই আপনার কাছে চলে আসতাম না। আপনার সাথে এই মাঝ রাতে এখানে আসতাম না। আমার রাগ সামলাতে পারবেন। কিন্তু অভিমান! সেটা এতটাও ঠুনকো নয়।”

“শুনেই ছাড়বে?”

“বলতে চাইলে, বলুন। নতুবা জোর করার অভ্যেস আমার নেই।”

“আমার উপর কার জোর খাটে– তাও কি বলা লাগবে?”

আমি চুপ রইলাম এবার। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মানসপটে ভেসে উঠছে পুরোনো সব কান্ডগুলো। এই অসভ্য পাষাণটার প্রেমে কী করে পড়লাম, ভেবে পাচ্ছি না। তাকিয়ে দেখলাম, ওঁর চোখ আমার মাঝেই নিবদ্ধ। আমাকে তাকাতে দেখেই বললেন, “আরে! বলছি তো! মন খারাপ করো কেন? তোমায় বলব না তো কাকে বলব? তুমি হচ্ছ কী এ আমার, কী যেন! উফ! মনে পড়ছে না।”

“তা মনে পড়বে কেন?”

“আসলে বয়স হচ্ছে তো, মনভুলো হয়ে যাচ্ছি।”

এই মুহূর্তে আমার খুব হাসি পেল এবং আমি হেসেও দিলাম। আমার হাসির শব্দ বাতাসে বেজে আমারই কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হাসি চাপিয়ে রাখার মতো ভয়ঙ্কর কষ্টসাধ্য কাজ দ্বিতীয়টি নেই। লোকটা নেহাতই পাগল!

“মে-বি হুমায়ূন আহমেদ স্যার ঠিকই বলেছেন। বেশিরভাগ রূপবতী মেয়ে নকল হাসি হাসে। হাসার সময় ঢং করার চেষ্টা করে। তখন, তাদের হাসি হায়েনার হাসির মতো হয়ে যায়।”

কথাটা কানে যেতেই আমার হাসি তৎক্ষনাৎ থেমে গেল। ডানে তাকিয়ে দেখলাম– উনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। আচ্ছা, উনি কী বললেন এটা?

চলবে…

#কল্পকুঞ্জে_কঙ্কাবতী
লেখনীতে: নবনীতা শেখ
|পর্ব ৩০|

“কুঞ্জ ভাই! আপনি কি জানেন– আপনি খুব খারাপ?”

“উঁহু। জানাও।”

“উফ! আমার সাথে কথাই বলবেন না আপনি।”

“সেটা তো হওয়ার নয়।”

আমি মুখ গোমড়া করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। হুট করেই কোলের উপর ভার পড়াতে চকিতে চাইলাম। কুঞ্জ ভাই আমার কোলে মাথা রেখেছেন। চোখ বন্ধ তার, ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি। আমি গাল ফুলিয়ে বললাম, “এটা কী হলো?”

উনি হাসি প্রশস্ত করে আমার হাতটা টেনে নিজের চুলগুলো এলোমেলো করে নিলেন। তারপর বলা শুরু করলেন,

“তখন আমি কলেজে পড়ি। সামনে এইচএসসি। অথচ পড়াশোনায় মন নেই। এলাকার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে তার ভার্সিটিতে যাই। সেখানে সাক্ষী হই এক নির্মম ঘটনার।
মঈন ভাই! সেই ভার্সিটির ভিপি ছিলেন। বড্ড অহংকারী, জেদি। ভার্সিটির অন্য আরেকটা পড়াকু ছেলেকে বলেন, তাদের সাথে গিয়ে কোনো এক গণ্যমান্য মন্ত্রী কাজে ঝামেলা পাকাতে। ছেলেটি নিজের পড়ালেখার দোহায় দিয়ে বলল, সে পারবে না। অতঃপর তথাকথিত ছাত্রনেতার পা-চাটা গোলামেরা ছেলেটিকে ইচ্ছে মতো মারে। ছেলেটি মাসখানেক হসপিটালে ছিল। জানতে পারলাম, জোর করে ধরে-বেঁধে এদেরকে দিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করায় সেই ভার্সিটির সাবেক ছাত্রনেতারা। অনৈতিকতা কি কেবলই এদের মধ্যে ছিল?

জানিস, নবু? আমি সেদিন কিচ্ছুটি করতে পারিনি। অধৈর্য না হয়ে শান্ত মস্তিষ্কে ভেবেছি– এদের সাথে এভাবে পারা যাবে না। এদের লেভেলে না এসে, কিছুই করা যাবে না। আমি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দিকে নজর রাখা শুরু করি। লিস্ট করি– কোন কোন ভার্সিটিতে দূর্নীতি হচ্ছে। কিন্তু বেশিদিন শান্ত থাকতে পারলাম না। দেশের অবস্থা দিনকে দিন খারাপের পথে এগোচ্ছে। এখানে ক্ষমতাধর ব্যক্তির পা চেটে থাকতে পারলেই তুমি বেঁচে যাবে। নয়তো, বেঁচে থাকা তোমার জন্য দূর্বিষহ হয়ে পড়বে।
এরপর থেকে রোজ দেখছি। কোনটা বলব? কোনটা রেখে কোনটা বলব? সে বছর দেখলাম– ৩২ বছর বয়সী প্রবাসীর সাথে চৌদ্দ বছর বয়সী এক মেয়ের বিয়ে। এখানে বাল্যবিবাহ আইন কী করবে? যেখানে বরপক্ষ চড়া যৌতুকে রাজি, কনেপক্ষ মেয়ে-বোঝা নামাতে পেরে রাজি আর ভয়ে-ডরে কনেও রাজি। আমি না-হয় পুলিশ নিয়ে এলাম। কিন্তু, এরপর? এরা নকল বার্থ সার্টিফিকেট যে আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছে– আমি কি তা জানি না?
জানি। সব না জানলেও, বেশ জানি। কিন্তু ক’জনের জন্য করব? গ্রামে এখনও এমন ঘটনা অহরহ।”

কুঞ্জ ভাই থামলেন। আমি এক দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে আছি। উনি হেসে চোখের পলক ফেলে আমাকে আস্বস্ত করে বললেন, “জানিস, নবু? ক্ষমতার লোভ বড্ড ভয়ঙ্কর রে! বড্ড বেশি। সৎ মানুষের বড্ড অভাব। অথচ, অভাবীর অভাবের অভাব নেই।”

একটা দম ফেলে আবার বলা শুরু করলেন, “দুর্নীতির লিস্ট কেবল ছাত্রদের মাঝেরগুলোই পেয়েছি। উপর লেভেলে যেতে পারিনি। যতটুকু দেখলাম, তাতে ঢাবিতেই বেশি পেলাম। বুয়েটের ইচ্ছা ছেড়ে ঢাবির অ্যাডমিশন দিলাম। পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না বলে হয়ে গেল। প্রথম এক বছর নিজ উদ্যোগে সবার সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখি। তখন সহ-সভাপতি ছিলেন আজিজ ভাই। উনি ভালো ছিলেন। তবে টিকতে পারেননি। বলছিলাম– ক্ষমতার লোভ ভয়ঙ্কর। তবে এই লোভ ওঁকে কাবু করতে পারেনি। প্রথম দিকে ভালো থাকলেও সম্পাদক, সহ-সম্পাদক এবং আরও সদস্যরা উপরের পর্যায়ের কিছু ব্যক্তিদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। তাদের সাথে তাঁকেও যোগ দিতে বলা হয়েছিল। আজিজ ভাই বরাবরই বাবার নীতি-আদর্শকে মান্য করতেন। তাই তিনি বিরোধিতা করেন। এজন্য অবশ্য বেশ ঝুঁকিতে থাকতে হয়েছিল ওঁকে। শেষমেশ, পরিবারের দিকে আঘাত হানা হয়। ফলে উনি আর ভালো হয়ে টিকতে পারেননি। পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে বিগত সাড়ে তিন বছর ধরে ডাকসুর ভিপি আমি।”

কথাটা আমার কানে বাজতে লাগল। ডাকসুর ভিপি! অথচ আমি জানলাম না? অবশ্য খবর-টবরও তো দেখা হয় না! তবুও বিস্ময় ভাব কাটাতে পারলাম না। অনিমেষনেত্রে তাকিয়ে রইলাম।

কুঞ্জ ভাই বললেন, “প্রথমে বাবা শুনে আপত্তি করে খুব। রাজনীতি তার পছন্দ নয়। আমি এরপর বড়ো আব্বুর সাথে আলোচনা করি।”

“মেজ মামা?”

“হুঁ। বড়ো আব্বু হেসে কেবল একটা কথাই বলেন, এই জগতে ভালো হয়ে বেশিদূর এগোতে পারব না। সেই উদাহরণ হিসেবে আজিজ ভাই-ই আছেন। আমি তাই ভালো হলাম না। একটু খারাপ থাকলাম। মনটাকে পাথর বানিয়ে নিলাম। কাজ-কর্মে গাম্ভীর্যতা আনলাম। এরপর ধীরে ধীরে মাথায় চেপে ধরতে লাগল, সংসদ আসনের স্বপ্ন! আগে তো কেবল মানুষের জন্য কাজ করার ছোটোখাটো একটা ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এটা এখন আমার উদ্দেশ্য, আমার একমাত্র গন্তব্য।”

“আর আমি?”

কুঞ্জ ভাই তাঁর সেই দুনিয়া ভুলানো হাসি দিয়ে বললেন, “আমার সহচরী।”

“আচ্ছা। এরপর?”

“এরপর, এভাবেই এগোচ্ছিল। সৌভাগ্যক্রমে পরের নির্বাচনে আগের অনেকেই পদ পায়নি। নতুন যারা এসেছিল, তাদের মাঝে বেশ কয়েকজনকে সাথে নিয়ে নিজস্ব একটা দল করি। সেখানে মোট ৩৬ জন আমরা। ঢাবির ৬জন আর বাকি ৩০জন বিভিন্ন ভার্সিটির। অনেক যাচাই-বাছাই করা হয়েছে সবাইকে। বেশ বিশ্বস্ত তারা। আমি সেই দল নিয়ে ইনফরমেশন কালেক্ট করি। বেশ কিছু রাজনৈতিক সনামধন্য ব্যক্তিদের মুখোশ উন্মোচিত হয়। লাস্টবার খাদ্যমন্ত্রীর যেই কীর্তি ফাঁস হয়েছে না?”

“হুঁ।”

“সেটা আমার দলের লোকেরাই করেছে।”

“আচ্ছা, তবে কোথাও আপনাদের নাম নেই কেন?”

“কেননা যাদের ফাঁস করেছি, তারা একা নয়। বিশাল সংখ্যক মানুষ। তারা একে অপরের সাথে জড়িত থাকুক বা না থাকুক, আমার বিষয়ে জানতে পারলেই উঠে পড়ে লাগবে আমাদের টপকাতে।”

“ওও।”

“হ্যাঁ। শুধু তাই নয়। তারা আমাদের খোঁজ বিগত তিন বছর ধরে করছে। পাচ্ছে না। কেন জানো?”

“কেন?”

“তারা আমাদের দিয়েই আমাদের খোঁজ করাচ্ছে।”

এই পর্যায়ে কুঞ্জ ভাই সজোরে হেসে উঠলেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, “মানে?”

“বুঝলে না?”

“না।”

“তবে শোনো। বললাম না– খারাপ হয়েছি? তাদের চোখে আমি খারাপই। তাদের সাথে হাত মিলিয়েছি। তাদের বেশ কিছু চ্যালাপেলা আমার দলের লোক। তারা ভাবতেও পারে না– এ-সব কলকাঠি পেছন থেকে আমি নাড়ছি।”

“আমাকে বলেননি কেন?”

“এখানে খুন-খারাবি খুবই সাধারণ ব্যাপার। এ অবধি কেউ আমাদের ব্যাপারে জানেনি। এর মানে এই নয় যে, ইন ফিউচার কেউ জানবে না। ধরো, এখন আমার দলের কেউ বেঈমানী করল। তবে, আজ রাতেই আমার লাশ পাবে।”

সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল আমার। ভয় লাগল। খুব ভয় লাগল। উনি অভয় দিলেন না। বললেন, “যেই ভয়াবহ খেলায় নেমেছি আমি, এখানে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি নেই। আজ আছি, কাল না-ও থাকতে পারি। সবটাই ভাগ্যের উপর ডিপেন্ডেন্ট। তাই তোমাকে জানাতে চাইনি। এই যে, এখন ভয় পাচ্ছ। এই ভয় নিয়ে যদি বলো আমায়, এসব ছেড়ে দিতে; আমি ছাড়তে বাধ্য। কিন্তু, চাচ্ছিলাম না তা।”

“এখন যদি ছাড়তে বলি?”

“বলেও ফায়দা নেই। খুব গভীরভাবে জড়িয়ে গেছি। এর কেবল আরও গভীরতায় যাওয়া পসিবল। বের হওয়া অসম্ভবনীয়।”

“এবার?”

“এবার আমার শক্তি হয়ে যাও দেখি।”

আমি কিছুটা লজ্জা পেলাম। রক্তিম গাল লুকিয়ে শুধালাম, “মামার সাথে কী হয়েছিল?”

“তোমার মামার কাছে আমি এক লম্পট, বিগড়ে যাওয়া ছেলে। তাঁর মতে– আমি নেশাখোর, জুয়ারি। এসবের পর জেনেছেন, তোমাকে পছন্দ করি। আমার ব্যাপারে এত এত গুনগুলো জেনে তোমাকে আমার কাছে দেবেন না।”

“সে-কী!”

“হ্যাঁ। আমি কতটা জেদি, জানা আছে তোমার। বাবাকে বোঝাই, তুমিও আমাকে চাও।”

“আপনি জানলেন কী করে?”

“যেভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে, তাতে কি না জেনে উপায় আছে?”

“আমি ড্যাবড্যাব করে তাকাতাম?”

“হুম, অবশ্যই। এরপর শোনো।”

“শুনছি, বলুন।”

“বাবাকে বলার পর বাবা মানতে চান না। রাগ দেখালেন। মা আমাকে এ-ই শিক্ষা দিয়েছে, এই টাইপের প্রশ্ন করলেন। রাগ লাগল, জেদ দেখালাম, বাড়ি ছাড়লাম।”

“এরপর?”

“এরপর এভাবেই চলছিল। বাবার সাথে টোটালি যোগাযোগ অফ। মা বলে, বাবা নাকি চান– আমি সব ছেড়েছুড়ে ফিরে আসি; যেটা তুমি চাইলেও পসিবল না। সেবার, শ্যামাপুর বিয়েতে, নাগরপুর আসনের এমপি আসেন। বড়ো আব্বুর এলাকার চেয়ারম্যান হবার সুবাদে চেনা-জানা অনেক রাজনৈতিক সনামধন্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন, তন্মধ্যে একজন নাগরপুরের এমপি, আসাদুল্লাহ হালদার। এমপি সাহেবের একটু মেয়েদের উপর ঝোঁক আছে, জানতাম। কিন্তু সেই ঝোঁকটা এতটা মারাত্মক, সেদিনই জানলাম। উনি আমাকে আগে থেকেই চেনেন, এর আগেও বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল। কম-বেশি অনেকেই জানে, কালো বাজারের বড়ো বড়ো মাথার সাথে আমার ওঠা-বসা আছে। বিয়েতে দেখা হয়ে যাওয়ায় উনি আমাকে অফার করেন।”

কুঞ্জ ভাইকে থেমে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “কী অফার করেন?”

লম্বা শ্বাস টেনে বললেন, “ওঁর নারী পাচারের ব্যবসার শেয়ার।”

“কী!”

“হ্যাঁ। আমিও অবাক হই। এই ইনফরমেশন আমার কাছে ছিল না। আমি তৎক্ষনাৎ একটা কুটিল প্ল্যান কষে তাকে হেসে জবাব দিই, ‘কী রকম লাভ হবে?’

উনি এতক্ষণ গম্ভীর থাকলেও আমার কথা শুনে হেসে বলেন, ‘অকল্পনীয়।’

আমি রাজি– তা বোঝাতে কেবল হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী কাজ করে দিতে হবে?’

‘তেমন কিছু না। ক্লায়েন্টদের পছন্দ-অপছন্দের খেয়াল রাখবে, ডিল করবে। এই তো।’

‘তা কত পার্সেন্ট পাব?’

তখন উনি বললেন, ‘আমি ৩% পাই। এখান থেকে এক চতুর্থাংশ তোমার। ওকে?’

‘না। হোল প্রফিটের ১০% চাই।’

‘আরে, আমিই তো পাই ৩%।’

‘তবে থাক। এত রিস্ক নিতে ইন্টারেস্টেড নই, আসাদ সাহেব।’

উনি মাথা চুলকাতে লাগলেন। তারপর একটু দূরে গিয়ে কাকে যেন কল দিয়ে ফিরে এসে বললেন, আমি ১০%ই পাব।

বুঝে ফেললাম, এই সার্কেলের এক পেয়াদা এই লোক। পিছে রাঘব বোয়াল আছে। আর আমাকে তাদের নোংরামিতে সামিল করতে আগে থেকেই ইচ্ছুক ছিলেন তারা।
মনে মনে ভাবি, ফিরে গিয়েই হোল টিম একজোট হয়ে এর পিছে নামব। এই কথাগুলো ছাদে বসে হচ্ছিল। আমাকে ডাকতে বাবা এসে সব শুনে ফেলেছিলেন। আমার রাজি হওয়াটা বাবাকে হার্ট করে, সাথে রাগিয়েও দেয়। রাতে বিদায়ের পর বাবা আমাকে এই বিষয় নিয়ে বকাঝকা করেন। ইনডিরেক্টলি ত্যাজ্য করার সিদ্ধান্তে আসেন। এদিকে আমার মাথা খারাপ হয়ে থাকে। এই পাচারকারী চক্রটা ধরার ইচ্ছা রগে রগে বইতে লাগল। ৪-৫ বছর গেল, অথচ এটার ব্যাপারে জানিই না! টেনশনে আমিও বাবার কথার প্রতিক্রিয়া করি। আর বেশ বড়োসড়ো ঝামেলা লেগে যায়।”

“গ্রামে থেকে ফিরে তবে এই কাজে লেগেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“নিউজে তো এখনও তেমন কিছুই পেলাম না।”

“এখনও ধরতে পারিনি। আমাকে কাজ দেওয়া হয়েছিল ডিলের। তাদের মতে– আমার ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গি দেখেই যে কেউ ডিল করতে রাজি হয়ে যাবে। আর হচ্ছিলও তাই। আমি যথাসম্ভব খোঁজ লাগাচ্ছি। এখনও এদের আস্তানার হদিস পাইনি। জানতে পেরেছি, মাথা তিনজন এবং তারা দেশের বাইরে। তবে তারা কে– তা জানতে পারিনি। কখনও আসেন না। এলেও মোটে দু’জন ব্যক্তির সাথে দেখা করেই রাতারাতি ফিরে যান। এই কয় মাসে ৩বার এসেছিলেন। আফসোস, একবারও জানতে পারিনি।

গোপালগঞ্জ, খুলনা, সিলেট, মেদিনীপুর, রাজশাহীসহ আরও কিছু অঞ্চলের এমপিরা এই চক্রের সাথে জড়িত। খোঁজ চলছে এবং প্রতিনিয়ত লিস্ট বড়ো হচ্ছে। দেখা গেছে, এদের অধিকাংশ নারীকেই চাকরির লোভে আনা হয়েছে। আমি জানতে পারিনি– এদের তুলে এনে কই রাখা হয়।

এই কয় মাসে প্রায় দু’শয়ের অধিক স্মাগলিং হয়েছে। আমি এদিকে কিছুই করতে পারছিলাম না। মাথা হ্যাং করছিল। তোমার সাথেও যোগাযোগ রাখতে চাইনি। ভেবেছিলাম কী জানো? আমার এই লাইফে তোমাকে জড়াব না। এজন্য পলিটিক্সে জড়ানোর পর থেকে তোমার কাছে আমি বেশ অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলাম। অ্যা কাইন্ড অব্ অসভ্য, বজ্জাত! তবুও চাইছিলাম দূরে দূরে থাকতে। কিন্তু নিজ ভাবনায় অটল থাকতে পারলাম কই?”

“এরপর কী ভাবলেন?”

কুঞ্জ ভাই ফট করে কোল থেকে মাথা তুলে বসে বললেন, “ভাবলাম– যা হওয়ার হবে। আমার নবু সাহসী।”

আমি পিটপিট করে চেয়ে বললাম, “আপনার?”

চলবে…