গোধূলির শেষ আলো পর্ব ১৩+১৪

0
377

গোধূলির শেষ আলো?
#পর্ব ১৩+১৪
Writer Tanishq Sheikh Tani

“রাতের চাঁদ তারা থেকো গো সাক্ষী
প্রিয়ার বাহুডোরে হলাম আমি বন্দী
আমার বুকের লোমে কিংবা তার ওষ্ঠ জুড়ে
দুজনেই দুজনাতে মিশে রবো যেভাবে মিশে রয় চাঁদের আলো অন্ধকারে”

পূর্ণ চাঁদের আলো জানালার গ্রিল ভেদ করে খালিদের ঘুমন্ত গোলাপ রাঙা বউয়ের অধরে এসে সদর্পে খেলা খেলছে।আলো আঁধারের এই খেলা খালিদ অপলক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে।একবার চাঁদের দিকে একবার স্ত্রীর মুখ পানে চেয়ে মৃদু হেসে চাঁদকে তাচ্ছিল্যভরে বললো,
“- তুই আজ হেরে গেলি আমার প্রিয়তমার রূপের কাছে।না! তোকে তো ছুঁতে দেবো না ওর ওষ্ঠ,চিবুক। ও যে একান্তই আমার শুধুই আমার।খট করে জানালাটা মেরে দেয় খালিদ।তানি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। উন্মুক্ত বুকের উপর থেকে কম্বল কিছুটা সরে যেতেই খালিদ সেটাকে আবার ভালো করে জরিয়ে তানিকে বুকে টেনে আনে।স্বপ্ন পূরণের আলাদা অনুভূতি আছে যা সহজে কোনো মাধ্যমে বা উপায়ে পরিপূর্ণ প্রকাশিত হয় না।এই যেমন খালিদের ভালোবাসা প্রাপ্তি খুশিতে এখন মনে হচ্ছে আরেকবার গভীরভাবে আদর করতে তানিকে।এই আদর, ভালোবাসার রজনীর দীর্ঘতা কামনা করছে খালিদ।দীর্ঘ হলেও কি মন ভরবে খালিদের ভালোবাসার এই নেশায়? না মন তো ভরবেই না বরং তৃষ্ণা বেড়েই যাবে।আরো গভীর আলিঙ্গনে স্ত্রীকে নিজের বাহুডোরে জরিয়ে নিল।রাতের অন্ধকারে আলো বিলীন হওয়ার মতোই নিজেও আরেকবার স্ত্রীর মাঝে বিলীন হল।

আজানের ধ্বনি কানে আসতেই হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেলো তানির।চোখ খুলতেই অদ্ভুত অনূভূতির সাড়া পেলো।সমস্ত শরীর মন বেয়ে এ অনুভূতি দেহে বিস্তার হচ্ছে।স্বামীর ভালোবাসায় পূর্ণ সে!বিশেষ রজনীর মোহনীয়তার ছোঁয়া এখনও অঙ্গে অঙ্গে উপলব্ধি করতে পাচ্ছে তানি।ঘরের ভেতরের বাথরুমের দরজা খুলে আধা ভেজা শরীরে মাথা মুছতে মুছতে বের হয় খালিদ।কাঁধে পানি নিংড়ানো লুঙ্গি।তানি লজ্জায় ঘুমের ভান ধরে শুয়ে থাকে।তানির দিকে একপলক তাকিয়ে মৃদু হেসে ঘরের বাইরে লুঙ্গি নাড়তে চলে যায়।তানি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে খালিদের ফিরে আসার অপেক্ষায়। ফিরে আসতেই আবার চোখ বন্ধের খেলা শুরু করে।টিপ টিপ করে সামনে তাকিয়ে দেখতে থাকে খালিদকে।স্কিন কালার পাঞ্জাবিটা পড়ে টুপি পকেটে নিয়ে তানির শিওরে এসে আলতো করে তানির গালে চুমু দেয়।

“-শুভ সকাল বউ!বরকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হচ্ছে তাই না?আমি তো তোমারই লুকিয়ে কেন দেখো হুমম!লুকিয়ে দেখতে গিয়ে লজ্জায় যে লাল টমেটো হয়ে গেছো সে খেয়াল আছে?

তানির এতোক্ষনে বুঝতে পারে চোর ধরা খেয়েছে। খালিদ সব বুঝে গেছে শুনে তানি খালিদের কোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলে।

“-ওঠ!আমি গরম পানি এনে দিচ্ছি গোসল করে নামাজ পড়ে নাও।ততক্ষণে আমি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে আসছি।তানির চুলে হাত বুলিয়ে উঠে গিলো।তানি উঠে শাড়িটা কোনোরকমে খালি গায়ে পেচিয়ে নিল।তখনি মাঝারি এক বালতি গরম পানি নিয়ে ঘরে ঢুকলো খালিদ।বালতিটা বাথরুমে রেখে ঘরে ঢুকে তানিকে রাতের হলুদ শাড়িতে জড়োসড়ো দেখলো।মৃদু হেসে কাছে গিয়ে টেনে বুকের উপর নিয়ে আসলো।

“- কি করছেন!

“- আদর করছি বউকে।

“- আপনার নামাজের সময় চলে যাবে যান আপনি।

“- হুমম।

“- কই ছাড়েন!

“- ইচ্ছা করছে না ছাড়তে।পরে যাই মসজিদে অনেক সময় আছে এখনও।

“- এই না! না! এক্ষুনি যাবেন। যান

“- তুমি বড় নিষ্ঠুর তানি।এতো আবেদনময়ী বউকে ছেড়ে যেতে বলছো তুমি? এ আমি পারবো না।

“- ভালো হয়ছে। এখন যান তাড়াতাড়ি আপনি।

“- তাহলে বলো আমি আসার পরও এভাবে থাকবে।

“- সেটা কি করে সম্ভব হয়!গোসল করবো না?

“- করবে বাট এভাবেই শাড়ি পেছিয়ে বসে থাকবে ভেজা ভেজা চুলে। হুমম

“- আদিক্ষ্যেতা করেন না যান।আমার লজ্জা লাগছে কিন্তু। যান না।

“- যাচ্ছি। যা বলেছি তাই কিন্তু হওয়া চাই।এটা তোমার স্বামীর আদেশ ওকে?

খালিদ চলে যায়।তানি গোসল করে। গরম পানি বলেই বাঁচা।নয়তো ঠান্ডায় নিউমোনিয়া হয়ে যেতো।পুষ্পা বলেছিল ওকে বরফ ঠান্ডা পানিতে গোসল করা লাগে সকাল বেলা। সেকথা ভেবে তো ভয়ে লোম দাড়িয়ে গেছিলো কিন্তু খালিদ যে সাধারণের মধ্যেও অসাধারণ স্বামী সেটা আজ আবার প্রমাণ করলো সে।সত্যি এমন স্বামী আজকাল কয়জন হয় যেকিনা বউয়ের সকল সুবিধা অসুবিধার খেয়াল রাখে।খালিদের কথামতো শাড়ি পেচিয়ে ভেজা চুলে তোয়ালে পেচিয়ে কম্বলের নিচে বসে রইলো।লজ্জায় কম্বল মুড়ি দিয়ে খালিদের অপেক্ষা করতে লাগলো।
,
,
,
সকালে খালিদের বাড়ির পরিবেশ জমজমাট হয়ে উঠলো নতুন বউ দেখতে আসা আশেপাশের মানুষের ভীরে।তানিকে সুন্দর করে নীল কাতান শাড়ি পড়িয়ে সাজিয়ে বারান্দার চেয়ারে বসিয়েছে লিজা।মনটা তার আজ ভীষন রকম খারাপ লিজার।কাল রাতে একটুও ঘুম হয়নি।ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যের বাহুডোরে ঘুমাতে দেখে কার ই বা ঘুম আসবে?লিজা মন ভার করে দাড়িয়ে আছে তানির পাশে।এ গ্রামের অনেকে তানিকে চেনে কারন সে পাশের গ্রামেরই মেয়ে। তবুও দশ জনের দশ রকমের কথা শুনে তানির মন খারাপ হলো।
কেউ বললো বউ খালিদের জন্য সুন্দর হয়ছে,আবার কেউ কেউ বললো একটু খাটোই হয়েছে।অন্য কোথাও বিয়ে করলে এর জন্য বেশি কিছু পেতো শ্বশুরবাড়ি থেকে।খালিদ ঘরে বসে সবার কথায় শুনছে।রাগে চোয়াল ফুলে উঠছে এসব কথায়।মা’কে হাজারটা নিষেধ করা স্বত্বেও মা সবার সামনে সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে গেলো তানিকে।খালিদের কথা আমার বউ ভালো মন্দ যা সবই আমার জন্য। কাওকে এভাবে সাজিয়ে দেখানোর দরকার কি? বউ যখন হাটবে ঘুরবে তখনি দেখে নেবে তারা।বিয়ে করেছি কুরবানীর গরু কিনি নাই যে সবাই এসে দেখে মতামত দেবে কেমন হয়েছে।আস্তে আস্তে ভীর কমে গেলে খাদিজার আদেশে লিজা তানিকে নিয়ে খালিদের ঘরে ঢোকে।খালিদ তানির মুখে স্পষ্ট অপমানবোধ দেখতে পায়।লিজা চলে যেতেই খালিদ দরজাটা দপ করে লাগিয়ে তানির ঝুকে অবনত হওয়া মুখটা তুলে ধরে।
চোখের কোনে জল চিকচিক করছে তানির।একটানে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে খালিদ।

“- মন খারাপ করবে না একদম অন্য লোকের কথায়।তুমি যা তাতেই আমি ধন্য। আমার কাছে তুমি আমার সাত রাজার ধন সমতুল্য।

“- মানুষ এমন ক্যা বলেন তো? আমি খাটো সেটা কি আমার দোষ? আমি কি ইচ্ছা করে খাটো হয়ছি বলেন?

“- চুপ! কোনো কথা না।কিছু মানুষ আছে স্বভাব দোষে দুষ্ট।এদের স্বভাবই অন্যের দোষ বের করা।তুমি মন খারাপ করছো কেন? আল্লাহ ছাড়া কোনো মানুষই সয়ংসম্পুর্ন নয় সবারই খুত আছে।আল্লাহ চেয়েছে তাই তুমি এমন।নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু ভালো জানেন আমাদের সম্পর্কে।অন্যের কথায় নিজেকে ছোট মনে করবে না।তুমি সেরা আমার কাছে এবং আজ থেকে এখন থেকে সেটা নিজের কাছেও হবে।আর ভাববে কখনও কারো কথায় নিজেকে ছোট?

“- না!

“- এই তো আমার লক্ষি বউ।শীতে এই সামান্য শাড়িতে বাইরে বসে হাত পা ঠান্ডা বরফ করে ফেলেছো।চলো কম্বলের নিচে চলো।

“- এই না! আমি ফুপুর কাছে যাবো।

“- ফুপু কি হুমম? বলো মা! বলো আলতো করে তানির গাল টেনে দেয়

“- আমার লজ্জা করে।

“- চেষ্টা করো দেখবে অভ্যাস হয়ে যাবে।বলো মা’য়ের কাছে যাবো।

“- মা’য়ের কাছে যাবো। এখন ছাড়েন।

“- সবসময় ছাড়েন! ছাড়েন করো কেন? মাঝে মধ্যে একটু ধরেন ধরেনও তো বলতে পারো নাকি?

“- ছি! যান লজ্জাহীন একটা

“- মা’য়ের কাছে লিজা আছে তোমার দরকার নেই ওখানে।তোমার দরকার এখন শুধু আমার কাছে।অনেক্ষণ হলো আদর করি নি আসো একটু আদর করি

“-আপনি না! ছাড়েন তো?সবাই কি বলবে?

“- কোনো ছাড়াছাড়ি নাই যখন একবার ধরেছি।লোকের কথা লোক বলবে আর খালিদের কাজ খালিদ করবে।তানি কিছু বলতে যাই কিন্তু পারে না খালিদের ঠোঁট বাঁধা দিয়ে রাখে ঠোঁটে। তানিকে নিয়ে সুখ স্বপ্নের আবির দোলায় দোলে খালিদ।
,
,
,
তাজের হুশ ফিরেছে জেনেও তাসলীর সাহস হচ্ছে না ছেলের কাছে যাওয়ার।কারন সেখানে আব্বাস বসে আছে।তাসলীর গালে এখনও আব্বাসের পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ কালচে হয়ে আছে।ছেলের এই অবস্থার জন্য আব্বাস তাসলী কে দায়ী করে গালে চড় মারে।তাসলী ঢোক গিলে শাড়ির ঘোমটা টেনে তাজ যে কেবিনে আছে সেখানে যায়।তাসলীকে দেখেই ঝাঁঝালো গলায় চেচিয়ে ওঠে আব্বাস

“- এই মাগি! তুই আবার আইছিস ক্যা এনে? ছাওয়ালরে নীতিবান বানাবি তাই না?তোর নীতির গুষ্ঠি মারি আমি।তোরে আমি বহু আগেই তালাক দিতাম খালি ছাওয়ালডার মুখের দিকে তাকিয়ে তোরে কিছু কই না।যা এইহান থে।

তাসলী তাজের দিকে তাকিয়ে আছে ছলছল চোখে।অন্য দিন বাবার এমন অশালীন কথায় তাজ জবাব দিলেও আজ দিলো না দেখে অবাক হলো তাসলী।তাজ মুখটা শক্ত করে এক নিবিষ্টে জানালার বাইরে শূন্য আকাশে চেয়ে আছে।তাসলী সাহস করে তাজকে বললো,

“- ও বাজান!ভাত খাইছো? শরীল ডা কেমন এহন?

“- মাগি তুই আমার ছাওয়ালরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে এহন দরদ দেখাচ্ছিস?ভরাপোড়া কুলক্ষণে তুই মরতে পারিস না। মর তুই।এতো ঘারো ক্যা তুই।ছিনালের বাচ্চা আজই বাড়ি গিয়ে গলায় দড়ি দিবি তুই।নয়তো আমিই তোরে গলাটিপে মারে ফেলবানে।বের হ এহান থে।

আব্বাস ঘার ধরে তাসলীকে কেবিনের বাইরে বের করে দিলো।তাসলী ছেলের নিষ্পলক চোখের দিকে চেয়ে অপমানের দহনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। এতোবড় জোয়ান ছেলের সামনে আব্বাস তাকে যা তা বলে ঘার ধাক্কা দিলো আর তাজ ছেলে হয়ে সব মুখ বুঝে মেনে নিল।এ জ্বালা যে তাসলীর মাতৃত্বের সম্মানকে জ্বালিয়ে দিলো।কেবিনের আশেপাশে সবাই তাসলীর দিকে তাকিয়ে রইলো।তাসলী মুখে আঁচল গুঁজে নিঃশব্দে কেঁদে কেবিনের দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে রইলো।আব্বাস মনমরা ছেলের পাশে এসে ছেলের কাঁধে হাত রেখে তাজকে ঝাকি দিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললো,

“- তুই কার ছাওয়াল তাজ? এই আব্বাস জোয়ার্দারের ছাওয়াল!কোনো কুত্তা বিলাইয়ের বাচ্চা না যে এমন করে পরাজয় মানে বসে থাকবি।

“- তালি কি করবো আব্বা তুমি কও? আমি তো শেষ হয়ে গেছি আব্বা। আমি মরে গেলেই ভালো হতো আব্বা। ডুকরে কেঁদে ওঠে তাজ।

“- মরে যা তুই। হ্যাঁ মর

“- আব্বা!

“- কি আব্বা! তুই যেভাবে বাঁচে আছিস এইটা কি বাঁচা কয়?তুই তো মরা মানুষ।মরা মানুষরে যেমন যে দিক নেয় সেদিক যায় তুই তো তেমন করিস।তোর মায়ের নীতির পথে যাইয়ে কি পালি? আমি কই! মরণজ্বালা আর পরাজয়।আমারে দেখ! কারো সাধ্য আছে আমারে পরাজিত করবি?আমার ছাওয়াল তুই তাজ আমার রক্ত। জ্বলে নয় জ্বালিয়ে যাওয়ায় তোর মন্ত্র হবি।যা তোর তা হাসিল তোরে করতিই হবি।তবেই তুই আমার রক্ত হবি।

“- কি করে আব্বা? আমি যে সব পথ হারায় ফেলছি।

“- আমি তোরে পথ দেহাবো।তোরে আমার মতো শক্তিশালী করবো।তালিই সব পাবি তুই সব।লোকে তোরে দেকলি সালাম ঠুকবি,ভয়ে কাছে আসার সাহস পাবি নে তারা।আপোষে না হোক জোর করে হলিও সব পাবি তুই।চলবি আমার পথে ক?

“-চলবো আব্বা।চলবো তোমার দেখানো পথে।তুমি যা বলবে সব করবো শুধু তানিরে চাই আমার। চোখ আগুনের লেলিহান শিখার মতো জ্বলে ওঠে তাজের।

“- সাব্বাস!তুইই হবি আমার ওয়ারিশ।এই জেলায় শুধু আব্বাস জোয়ার্দারের হুকুমি চলবি।পারবি না বাপ, বাপের মান রাখতি?

“- তোমার দোয়া থাকলি সব পারবো আব্বা। আমি এতোদিনে বুজেছি ক্ষমতায় সব।জোর যার মুল্লুক তার।আমার ক্ষমতা চাই আব্বা। প্রবল ক্ষমতা! যা দিয়ে ঐ খালিদকে আমি শেষ করে দিতি পারবো।

“- এই তো আব্বাস জোয়ার্দারের ছাওয়ালের মতো কতা।সদর্পে ছেলের কাঁধ ঝাঁকায় আব্বাস। শোন আব্বা এ লাইনে দয়া,আত্মীয়তা,মহব্বতের কোনো খানা নাই।তুই য়দি ক্ষমতা চাস তালি তোরে নিষ্ঠুর হতি হবি।শিকারী হায়েনার মতো হিংস্র আর ধূর্ত শেয়ালের মতো চতুর হতি হবি।শিকারের চোখের পানি না রক্তই হবে তোর লক্ষ্য বস্তু।নিজেরে গড়ে তুলতি তোরে দুই মাস ঢাকা থাকতি হবি তার জন্যি কালই যাবি তুই।আমি তোর থাকা খাওয়ার সব বন্দোবস্ত করে রাখছি।

“- কিন্তু আব্বা! তানি?

“- বলছি না তোরে আব্বা! শিয়ালের মতো ধূর্ত আর ধৈর্য ধরা লাগবি শিকার ধরার আগে।অধৈর্য হলি তো হাত ফসকে শিকার চলে যাবি।তুই কোনো চিন্তা করবি না।আব্বার উপর ভরসা রাখ বাপ আমার।তোরে আমি আমার যোগ্য উত্তরসূরি বানাবো।কেউ তোর একটা পশমও ছুতি পারবি নে।

তাজের মন মানে না তবুও এ ছাড়া উপায় নাই।সৎপথে কি পেলো সে কিছুই না।মায়ের শেখানো নীতি তাজ কে দুঃখ বেদনা ছাড়া আর কি দিলো?ভালোবাসার সুখ পাখিটাও আজ অন্যের খাঁচায়। “না! আর না!অনেক আপোষ হয়েছে তানি তোমার সাথে।এবার তোমায় আমার বিরোধিতার আগুনে জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দেবো। সুখ যে পথে ধাবমান আমিও রবো সেপথে এই আমার অঙ্গীকার।
,
,
,
খালিদ বাড়ির চারপাশে অল্প কিছু জায়গায় বোনা শাকসবজির চারা ও বিজে পানি দিচ্ছে পাইপ দিয়ে।তানি শ্বাশুড়ি ও লিজার সাথে বাইরে বসে মুড়ি মাখানো খাচ্ছে আর খালিদকে দেখছে।খালিদও নাক উচু, ঠোঁট উচু করছে তানিকে দেখিয়ে।লিজা এদের ভালোবাসা দেখে আর বসে থাকতে পারে না।কান্নার জলে চোখ ভরে আসছে ওর।উঠে চলে যায় তাড়াতাড়ি কাপড় গুছানোর বাহানা দিয়ে।খাদিজা বেগমও কিছুক্ষণ পর ঘরে চলে যায়।তখনি খালিদ এসে বসে পড়ে তানির সামনে।

“- আআআ! খাইয়ে দাও

“- জ্বী না! আপনার হাতে আপনিই খান।

“- এই দেখো হাতে ময়লা।দাও খাইয়ে নয়তো,,,,ঠোঁট কামড়ে চোখ টিপে খালিদ।

“- খুব খারাপ আপনি।সবসময় শুধু ভয় দেখান।নিন হা করেন।

“- এবার আমি যাই।

“- এই একবার খাইয়েছো কেন? আমার বউ তো এককিলে মেরে ফেলবে আমাকে।তখন কিন্তু তুমি বিধবা হয়ে যাবা।আরেকবার খাওয়াও বলছি তাড়াতাড়ি।আমার বউয়ের আদর আমি মিস করতে চাই না অকালে মরে।

“- এক কিলে মেরে ফেলবি তাইনা? তানি রেগে চোখ ছোট করে কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে থাকে খালিদের সামনে।খালিদ মুড়ি চাবাতে চাবাতে পাটিতে বসে মুচকি হেসে মনমরার ভান ধরে বলে,

“- হুমম

তানি ঠাস করে খালিদের পিঠে একটা কিল মেরে দৌড় দেয়।যেতে যেতে জিব বের করে ভেংচি কেটে হেসে কুটিকুটি হয়।

চলবে,,,গোধূলির শেষ আলো?
পর্ব ১৪
Writer Tanishq Sheikh Tani

পুরো গ্রাম জুড়ে থমথমে পরিবেশ। পুলিশের আনাগোনা,মানুষের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ সবকিছু মিলিয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে চেয়ারম্যান বাড়িকে কেন্দ্র করে।পুলিশের এক হাবিলদার মানুষের ভীর সামলাতে না পেরে বিরক্ত মুখে ইন্সপেক্টর মফিজের কাছে এসেছে।চল্লিশোর্ধ্ব মোটা সোটা গড়নের মফিজুল ইসলাম পান চিবিয়ে চিবিয়ে কি যেন বলছিল আব্বাস জোয়ার্দারকে।হাবিলদারকে আসতে দেখে দুজনই গম্ভীর হয়ে গেলো।হাবিলদার মুখটা কাচুমাচু করে এসে শান্ত গলায় বলে,

“- স্যার! মানুষের ভীর তো বেড়েই যাচ্ছে।

“- তুমি মিয়া কোনো কাজের না।হুদাই তুমাগো মতো কামলা রাখছে সরকার।যাও লাশ গাড়িতে ওঠাও।পোষ্টমোডেম করে লাশ দাফন করতে হইবো তো? মুর্দা বেশিক্ষণ ফালাই রাখন ঠিক না।যাও কামে লাইগা পড়ো।কথাগুলো বলে ফচ করে গাল ভরে পানের পিক ফেললো মাটিতে

“- জ্বী স্যার।হাবিলদার রজব ইন্সপেক্টর মফিজুল ইসলাম কে মনে মনে ঘৃণা করেন।রজবের দেখা সবচেয়ে বড় লোভী আর স্বার্থবাদী লোক হলো মফিজ।স্বার্থের জন্য সব করতে পারেন তিনি।এসব অর্থ লোভী পুলিশের জন্য সমস্ত পুলিশ ফোর্সের বদনাম।রজব সৎ হয়েও মুখ বুঝে অন্যায় করে যায় সিনিয়রের হুকুম তালিম করতে গিয়ে।এই যেমন আজকের ঘটনাটার কথা বলি! রজব চেয়ারম্যানের বউয়ের লাশটা দেখে সাথে সাথে বুঝে গেছে এটা খুন আত্নহত্যা না।তবুও তাকে সিনিয়র মফিজুলের কথা মেনে সত্যি চাপা দিতে হচ্ছে নিরবে।মাঝে মাঝে শরীর বিষিয়ে ওঠে এমন লোকের আন্ডারে কাজ করতে গিয়ে তবুও করতে হয় কারন ঘরে ৫টা মুখের আহারের দায়িত্ব যে তারই।মুখটা মলিন করে সাথে দু’জন হাবিলদার সহ লাশটা খেজুরের পাটিতে মুড়িয়ে নিল।
তখনি আরেকজন হাবিলদার রজবের হাত চেপে ধরলো। রজব তাকিয়ে দেখলো হাবিলদার করিমের মুখে ভয়ের ছাপ।

“- কি হলো করিম?

“- রজব ভাই! লাশটার মাথার পেছনে দেহেন রক্ত জমে আছে।ঠোঁটও কাটা।

“- হুমম।

“- তুমি বুঝছো তাই না রজব ভাই।এই মহিলা আত্নহত্যা করে নাই তারে খুন করা হয়ছে।

“- চুপ যাও করিম।স্যার শুনলে রাগ করবো।

“- হেইতো একটা খবিস! লোভী কুত্তার মতো জিহ্বা লকলকায় মাইনষের তে টাকা খাওয়ানের লাইগা।মানুষ এতো পাষাণ কেন কও তো রজব ভাই? বউডারে কি নির্মম ভাবে মাইরা ফাসিতে ঝুলাইয়া কয় আত্নহত্যা করছে।দিন দিন মানুষ পশুর মতো নির্দয় হয়ে যাচ্ছে। দয়া মায়া সব উঠে যাচ্ছে দুনিয়ার থে।সব কেয়ামতে লক্ষণ বুঝলা।দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে করিম।

“- ওতো কথার কাম নাই।চুপচাপ কাজে হাত বাড়াও তো? আমাগো মতো চুনোপুঁটির মানুষের চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।যার ক্ষমতা তারই জবান চালানো মানায় এ যুগে বুঝছো?নাও লাশটা গাড়িতে উঠাও।

গাড়িতে লাশ উঠিয়ে নিতেই কান্নার চাপা রোলটা গগনবিদারী হলো।মাতম শুরু হয়ে গেলো ও তাসলী,,তাসলী রে,,,বলে।
সবচেয়ে বেশি কাঁদছে যে সে হলো তাসলীর সই নুরুন্নাহার। কাঁদতে কাঁদতে হিচকি উঠে গেছে বেচারির।প্রতিবেশী মহিলারাও চেয়ারম্যানের বউয়ের অকস্মাৎ আত্নহত্যা করাই বিলাপ করে যাচ্ছে যাচ্ছে।তাসলী কতো ভালো ছিল? এমন কাজ কি জন্যি করলো? তাদের একটু বললোও না নিজের দুঃখের কথা ইত্যাদি নানা সুরে বোলে কাদতে লাগলো প্রতিবেশি মহিলারা।নুরুন্নাহারকে মাথায় তেল পানি দিয়ে বারান্দার চকিটাই শুইয়ে রাখা হয়েছে।বিরবির করে কাঁদছে থেকে থেকে এই বিরবিরানী চিৎকারে পরিবর্তন হচ্ছে। তানির মা কাকিরা তাসলীর আত্নহত্যার কথা শুনে ছুটে এসেছে।তানি আসতে চাইলেও তাকে আনা হয়নি কারন নতুন বিয়ে হয়েছে এবং খালিদদের সাথে এ বাড়ি সম্পর্ক খারাপ তাই।।তানির মা কে দেখে নুরুন্নাহার ফুঁসে ওঠে।ঝাঁঝালো গলায় বলে ওঠে,

“- ওরে ফজিলা তুই কি তামসা দেকতি আইছিস লো? আমার সই তোর মাইয়ের জন্যি তো জানডা দিলো রে ওও সই রে।ও মিনার মা তুমি কও না ক্যা? এই বিটির মাইয়ে তে আমার তাজের সাথে পিরিত করে ঢলাঢলি করে পরে ঐ খালিদের সাথে বিয়ে বইছে রে ওও সই রে।ও সই।তুমি কই সই।বিলাপ করতে করতে আবার মূর্ছা যায় নুরুন্নাহার।
সবাই নুরুন্নাহারের কথাতে ফজিলার দিকে এমন ভাবে তাকায় আর ফিসফিস করে যেন খুনটা ফজিলায় করেছে।নিজের মেয়ের নামে এতো বড় অপবাদ শুনে নুরুন্নাহারের উপর প্রচন্ড রাগ হয়।মনে মনে বড়রকম একটা গালি দিয়ে বাড়ির পথে ফিরে আসে।
নিজের বসার ঘরে বসে আলাপে ব্যস্ত আব্বাস।তার যে বউ মরেছে এটা তার মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।যে কেউ দূর থেকে দেখলে বেচারা সদ্য বিপত্নীক স্বামীর কষ্টটা ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারবে।মুখটা গম্ভীর করে বসে আছে আব্বাস। তার গম্ভীরতা ভাঙলো ইনস্পেক্টর মফিজুলের খড়খড়ে গলায়,

“- শোনের চেয়ারম্যান সাব! আপনি মান্যি গন্যি লোক তাই বলছি লাস্ট ৫০ হাজার টাকা।

“- ঐ মিয়া ৫০ হাজার টাকা একসাথে জীবনে কোনোদিন দেখছো? ২০ হাজারের এক পাই ও না।

“-আপনি কিন্তু চেয়ারম্যান সাব খালি খালি চেততাছেন।আপনার বউরে যে কেউ দেখলে কইবো এইটা ১০০% খুন আত্নহত্যা না।তারপরও আপনি টাকা দিতে গড়িমসি করছেন? আমি আপনার সাথে সমঝোতায় আসতে চাই তাই বললাম। পরে পোষ্ট মর্ডেমে কোনো কিছু বাহির হইলে আমাগো কইতে আইবেন না।

“- তোমরা মিয়া নামেই সরকারের পা চাটা কুত্তা।আসলে তো টাকা চাটা কুত্তা।ঠিক আছে দিবো ৫০ হাজার।কিন্তু মনে রাইখে খুনটা যেন আত্নহত্যাতেই চাপা থাকে।

“- আরে চেয়ারম্যান সাব! ডোন্ট ওয়ারি। আমি থাকতে এ খবর কাকপক্ষীতেও জানবে না আপনি শুধু আমার দিক টা খেয়াল রাইখেন।টাকা প্রাপ্তির কথাটা শুনে হাসতে গিয়ে পানের পিক কিছুটা বেয়ে বিদঘুটে দেখাচ্ছে মফিজের মুখটা।বেয়ে পড়া পিক টা হাতে মুছে সেই হাতটা ইউনিফর্মের প্যান্টের পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মোছে।এই ৫০ হাজার মফিজ কেমনে কোথায় খরচ করবে সব ভেবে রেখেছে এখানে আসতে আসতেই।টাকালব্ধীর খুশিতে তার লোভী চোখ দুটো লোভে চকচক করছে।

“- হ ঠিক আছে।এহন তাড়াতাড়ি বিদায় হও।

“- জ্বী স্লামালাইকুম! আর একটা কথা কই চেয়ারম্যান সাব?

“- হুমম।

“- আপনে কিন্তু ভালো অভিনয় করতে পারেন।এই যেমন আপনি খুনি কিন্তু ভাব এমন ধরে আছেন যেন বউয়ের মৃত্যুতে শোকে পাথর আপনি।তা কি জন্যি মারলেন বউটারে? আচ্ছা বারান্দায় যিনি কানতাছেন তিনি কি হন আপনের চেয়ারম্যান সাব? বারান্দায় চকিতে শোয়া নুরুন্নাহারের আচল সরে যাওয়া উচু বুকটার দিকে লকলকে চোখে বিদঘুটে হাসি হেসে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মফিজুল।

“- বেশি কতা কও ক্যা? আম খাও আঁটি গুনতে আইসো না।তালি পরে পোষ্টিং কাল বিয়ানেই কনফারাম।যাও এহন। টাকা সময়মতো পৌঁছায় যাবি।

“- জ্বী জ্বী! চেয়ারম্যানের ধমকে মেনি বিড়াল হয়ে জোর করা হাসি হেসে বিদায় হয় মফিজুল ইসলাম। মফিজুলের হাসি দেখে আব্বাসের ইচ্ছা করছে এক লাথি মেরে ফাটিয়ে দিতে মফিজের ঝুলে যাওয়া ভুড়িটাতে।ঝোপ বুঝে কোপ মারার মোক্ষম সমটার অপেক্ষায় রাগটা চেপে গেলো আব্বাস।

মফিজুল চেয়ারম্যানের বসার ঘর থেকে বেরোতেই হাবিলদার এসে মফিজুল কে বললো লাশ তারা গাড়িতে উঠিয়েছে।মফিজ সবাইকে নিয়ে জেলা হাসপাতালের দিকে রওনা হলো লাশ নিয়ে।বেলা গড়িয়ে দুপুর হতেই চেয়ারম্যান বাড়ি লোকশূন্য হয়ে গেলো।একটু আগেও যে কোলাহল ছিল এখন তার রেষমাত্র নেই।বাড়িতে মাত্র তিনটা প্রানী এই মুহুর্তে। চেয়ারম্যান, নুরুন্নাহার আর তাসলীর পোষা কুকুর কালু টা।কালু সেই সকাল থেকে দাওয়ায় গুটিশুটি মেরে ছলছল চোখে বসে আসে।তাসলীর লাশ গাড়িতে উঠানোর সময় গলা ফাটিয়ে ডেকেছে কালু।বোবা প্রানীটি বলতে চেয়েছে আমি তো খায় নি মা।আমাকে খাবারটা দিয়ে যাও তুমি।লাশবাহী জিপের পেছনে গ্রাম পেরোনো পর্যন্ত ছুটে গেছে। তাসলী বেচে থাকলে এতোক্ষনে কালুর দুপুরের ভোজন টা শেষ হতো।এই অবলা প্রানীটাও বুঝি মালিকের মৃত্যুতে খাওয়ার কথা ভুলে বসে আছে নিষ্পলক অশ্রুশিক্ত চোখে।নুরুন্নাহার চকি থেকে উঠে বসে শূন্য উঠানে ঘুরে ঘুরে চেয়ে আঁচলে নাক চোখ মুছতে মুছতে চেয়ারম্যানের ঘরে ঢুকলো।চেয়ারম্যান তখন কপালে হাত ঠেকিয়ে শুয়ে ছিল।

“-মরা বউয়ের জন্যি দরদ লাগছে বুঝি?
নুরুন্নাহারের বাকা কথা শুনে কপালের হাত সরিয়ে মৃদু হেসে নুরুন্নাহারের হাতটা টেনে বুকের উপর নিয়ে আসে।

“- যারে নিজ হাতে মারলাম তার জন্যি আবার কিসের দরদ নুরি? আমার দরদ তো সব তোর জন্যি।

“- হ হয়ছে সব মিছে কতা।তুমি সয়া সব আমারে ভুলোনোর জন্যি কও।

“- তালি ক কি কললি তুই আমার মোহাব্বাত বুঝবি?

“- আমারে নিকা করো।অনেক তো নয়নঙ্গ কললে আমার সাথে।স্বামী ছাড়লাম ঘর ছাড়লাম তুমি কি ছাড়লে কও দিনি?নুরুন্নাহার আব্বাসের বুক থেকে উঠে অভিমানে মুখ কালো করে বসে থাকে।
আব্বাস নুরুন্নাহারের উন্মুক্ত পেট চেপে খাটে শুইয়ে দেয়।ঠোটে ঠোঁট চেপে তারপর বলে,

“- তোরে নিকা করবো বলেই তো এতোদিনের বেঁধে থাকা গলার কাটাটা সরালাম।কিছুদিন যাতি দে তারপর এসব আর গোপনে না সবার সামনেই হবি।

“- যাও সরো। বয়স হচ্ছে তাও তোমার যৌবন কমছে না।ছাড়ো কেউ দেকে ফেললি সব শেষ হয়ে যাবি।

“- কেউ দেকবি না তুই চুপ থাক।আয় একটু সোহাগ করি তোরে।নুরির পথের কাটা সরেছে দেখে খুশি তার চোখে মুখে উপচে উঠছে।চেয়ারম্যানকে এই দেহ রূপ দিয়েই ২০ বছর ভুলিয়ে আসছে।বান্ধবীর সরলতার সুযোগ নিয়ে সুচ হয়ে ঢুকে ফাল হলে গেঁথে রইলো নুরি।এতোদিন যা নিজের ঘরে করতো আজ থেকে চেয়ারম্যানের নিজের ঘরে শুরু করলো।আব্বাস উন্মুক্ত ব্যাভিচারে লিপ্ত হলো যেখানে একটু আগেও বউয়ের লাশ রাখা ছিল সেখানে।

লিজা আজ সকালে খাদিজার সাথে বাড়ি চলে গেছে।তানির অনেক ভালো লেগেছে মেয়েটাকে। এতোকরে বলা স্বত্বেও থাকলো না দেখে কিছুটা খারাপই লাগলো।তাছাড়া তাসলী কাকির এমন মৃত্যু তানির মনকে নাড়া দিল।ও বাড়ির এই একটা মানুষকে তানির ভালো লাগতো। কতো মায়া তার মনে।গায়ের কেউ কোনোদিন তার কাছে কিছু চেয়ে খালি হাতে ফিরে যায় নাই।তানিকে দেখলে মাথায় হাত দিয়ে আদর করতো।
বাইরের রান্নাঘরে বসে খালিদের জন্য তরকারি গরম করছিল।এতোটাই আনমনে বসে ছিল যে খেয়ালই করে নাই খালিদের উপস্থিতি। টুপ করে গালে কারো ঠোঁটের স্পর্শ পেতেই ঘোর কাটে তানির।কপাল কুঁচকে তাকাতেই দেখে খালিদ মুচকি মুচকি হাসছে।তানি কিছু না বলেই খালিদের পাশ কেটে খাবার গুলো নিয়ে ঘরের ভেতরের রান্নাঘরে ঢোকে।লাকড়ির চুলার জন্য বাইরে একটা আধাপাকা রান্নাঘর দিয়েছে আর ঘরে সিলিন্ডার বসিয়ে আরেকটা করেছে।

তানি প্লেট ধুয়ে খাবার গুলো বেড়ে টিভির রুমে নিয়ে গেলো যেখানে খালিদ পা ছড়িয়ে টিভি দেখছে।

“- নিন খেয়ে নিন।

“- কি কথা হয়েছে আমাদের মধ্যে ভুলে গেলে? তানির হাত টা টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নগ্ন ঘাড়ে ঠোঁট চেপে বলে।

“- না ভুলি নেই! আপনি যতোদিন আছেন আমার হাতে খাবেন তাই তো?ছাড়েন আমি বেড়ে দিচ্ছি।

“-শুধু বেড়ে না খাইয়েও দিবা।

“- ঠিক আছে ছাড়েন।

“- ছাড়া ছাড়ি নাই।এভাবেই খাওয়াবা।কথাটা বলে নিজের সাথে আরও জোরে চেপে ধরে খালিদ।

“- এভাবে তো খাবারের কাছেই যাতি পারছি না। কি করে খাওয়াবো শুনি

“- সে আমি জানি না।আমার খিদে পেয়েছে খাওয়াও তো।

“- আপনি না!

“- খুব ভালো স্বামী তাই না?

“- ঠ্যাঙ্গা!

তানি অনেক চেষ্টা করেও খালিদের কোল থেকে উঠতে পারলো না শেষে ব্যর্থ হয়ে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে খাবারটা প্লেটে বেড়ে মাখিয়ে খালিদকে খাইয়ে দিলো।খালিদ ওভাবেই বসে খেতে লাগলো টিভি দেখতে দেখতে।

“- নিন শেষ! এবার তো উঠতে দিন।

“- আচ্ছা যাও।আচ্ছা যাও বলেও খালিদ একচুল ঢিল করলো না হাত।

“- কই ছাড়েন!

“- ইচ্ছা করছে না।থাকো না এভাবে।

“- দেখছেন হাতে কি? আমি কি এখন এইভাবে বসে থাকবো?

“- থাকলে কি হবে? আচ্ছা ব্যবস্থা করছি।
তানির হাতের কব্জি ধরে এটো আঙুলসহ হাতটা চেটেপুটে খেয়েনিল।তানি লজ্জায় রাঙা হয়ে মৃদু হেসে খালিদের জিহ্বা ও ঠোঁটের ছোয়ায় সুরসুরিতে মোচড়াতে লাগলো হাত।

“- এটা কি করছেন?

“- হাত পরিষ্কার করে দিচ্ছি।

“- আল্লাহ গো! এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম আমি।মুখের উপর বা’হাত ঢেকে রাখে লজ্জায়।

খালিদ মুচকি মুচকি হেসে আবার টিভি দেখায় মনোযোগী হয়।খালিদের সাথে তানির বৈবাহিক সম্পর্কের দিনগুলো বসন্তের রঙে রূপে বর্ণিল আর সুখময় কাটছিল।দেখতে দেখতে বসন্ত শেষ হয়ে খররোদ্রদীপ্ত গ্রীষ্মের আবির্ভাব হলো।বসন্তের গাছে গাছে ফুলে ফুলে যে মাধুর্য দেখা দিয়েছিল গ্রীষ্মের রোদ্রদাহে তা মলিন হয়ে নেতিয়ে যেতে লাগলো।তানির মনেও চৈত্রের দাবদাহ শুরু হয়েছে।আর মাত্র তিনদিন তারপর খালিদ সাত সমুদ্রের ওপারের দেশে চলে যাবে।সেই দেশের মরুভূমির উতপ্ত বালুকা তানির বুকে ভেতর পটপট করে ফুটতে লাগলো।খালিদ চলে গেলে তখন ইচ্ছা করলেও তার বুকে নাক ঠেসে ঘুমানো যাবে না।তার আদরের আবিরে দেহমন রাঙানো যাবে না।আজকাল খালিদকে সমস্ত উজার করে ভালোবাসতে ইচ্ছা হয় তানির।মনে হয় অস্তাচলগামী সূর্যের মতো তার ভেতরেই ডুবে যেতে।নিসঙ্গতা এখনই সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরেছে খালিদের এই ষোড়শী অতিক্রান্ত অবুঝ বউটারকে।এই বয়স যে ধৈর্যের বাঁধন হারা আবেগের মোহে মোহাচ্ছন্ন এক চোরাবালির মরিচিকা তা কে বোঝাবে গাঁয়ের এই অবুঝ বধূকে?স্বামীর বিরহে কাতর এক চাতকী দিনান্তে কত পরিবর্তিত হচ্ছে তার খবর বোধকরি সবার অজানাই রয়ে গেলো।মলিন হাসির ছটায় রাতের ক্রন্দনে লেপ্টে যাওয়া কাজল ঢেকে রইলো স্বামীগৃহের দায়িত্বের তলে।

চলবে,,,,