তুই হবি আমার পর্ব-০৮

0
1692

#তুই_হবি_আমার??
#DîYã_MôÑî
#পর্ব__০৮

বর্তমানে আরাভের হাতে স্যাভলন লাগাচ্ছে আলিজা। আর আরাভ গালে হাত দিয়ে একমনে আলিজার দিয়ে চেয়ে আছে। মেয়েটার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে,, নাকের ডগাটা লাল হয়ে গেছে কান্নার জন্য। ঠোট দুটোও কাঁপছে। মেঘরা চলে এসেছে ততক্ষনে।

মেঘ : কি রে তোদের কথা শেষ.? বলেছিস সব.?

মেঘের গলা শুনে ওরা দুজন মেঘের দিকে তাকালো। আরাভ অসহায় চোখে রোজের দিকে তাকালো। রোজ আরাভের অবস্থা দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

রোজ : আমার দিকে তাকাও কেন.? অন্য মতলব আছে নাকি.? অর্ধেক ধুলাভাই। আরেহ বাহ আমার আপিলাকে তো নার্স বানিয়ে নিয়েছো। এখনই এতো খাটাচ্ছো.?

মেঘ : ওই তুই থামবি.?
রোজ : অকে আমি চুপ। কিন্তু আমিও জানতে চাই সব। আমাকে না বললে তোমাদের কারোর বিয়ে হবে। অভিশাপ দিমু। আর মনে রেখো আমার অভিশাপ কিন্তু লেগে যায়।

আলিজা : উনি এখনো কিছু বলেনি। আর হাতটা দেখেছিস.? গায়ে জ্বরও আছে। এতো জ্বর নিয়ে এখনো বসে আছে। আর তোরা? একের পর এক প্রশ্ন করে জ্বালাচ্ছিস।

রোজ : এখনই এতো প্রেম। বাবাহ। ১০দিন হলো না কলেজে আসছো এর মধ্যে এতোকিছু। মাঝখান দিয়ে আমাকে বিরক্ত করছে তোমার জামাই সেদিকে কারোর হুশ নাই। আমার ওপর কারোর নজরই নাই।

মেঘ : নিজের চেহারা দেখছিস্ আয়নায়.? ডাইনি লাগে। তোর দিকে যে নজর দিবে তার গা গুলিয়ে আসবে। বমি করে দেবে সে। বুঝলি.?

রোজ : তো তুমি কোন মহারাজ..? তুমি নিজের চেহারা দেখছো.? খালি সাদা চামড়া আর ব্রাউন আইস,, তাছাড়া কি আছে। আফ্রিকান জঙ্গল থেকে পলাতক সজারু। যত্তসব।

মেঘ : থ্যাংকস ফর ইউ কমপ্লিমেন্ট।
রোজ : ইউউ। আজ যদি আপিলারা না থাকতো তাহলে বুঝিয়ে দিতাম আমি কে..? রোজকে অপমান করলে সে কাউকে ছেড়ে দেয় না।

মেঘ : ছাড়তে বলছে কে..? ধরে রাখ। হাত ধরবি নাকি পা.? হাতই ধর আর একটু টিপে দে ব্যাথা করছে।

রোজ : গলা টিপে দেই.? দাড়াও।

রোজ মেঘের দিকে হাত উচু করে তেড়ে যেতেই স্লিপ করে মেঝেতে পড়ে যায়।

রোজ : আল্লাহ গো গেলো আমার কোমরটা। কুত্তা হারামি গুলোর জন্য বিয়ের আগেই মরতে হবে মনে হচ্ছে। আমার জামাই,, জান দেখো তোমার বউ এর ওপর টর্চার করছে এরা। আল্লাহ উঠতে পারিনা কেন আমার পা,,, পায়ে ব্যাথা করতেছে কেন..?

মেঘ হাসতে হাসতে রোজকে কোলে তুলে নিলো।
মেঘ : গলা টিপতে আসছিলি নাহ..? দেখ কেমন লাগে। ফ্লোরের ওর চিতপটাং।

আলিজা : আচ্ছা এবার তো বলুন কি বলার জন্য ডেকেছেন। একঘন্টা তো চুপ করে বসেই রইলাম।আর রোজ তুই আমার পাশে বস আমি স্প্রে করে দিচ্ছি পায়ে আমার কাছে স্প্রে আছে। ব্যাথা কমে যাবে।

রোজকে আলিজার পাশের চেয়ারে বসালো মেঘ। কলি কিছু খাবার নিয়ে এসে বসে পড়লো টেবিলে। মেঘ রোজের পায়ের কাছে বসে আছে। ডান পা মচকে গেছে। মেঘ পা টা উচু করতেই চিল্লিয়ে উঠলো রোজ। শুধু মচকে যায়নি ফ্লোরে কাঁচের টুকরো ছিলো সেটা অর্ধেক গেঁধে গেছে পায়ে।

মেঘ : ওয়েটার,,, ওয়েটার,,, ( জোরে চিল্লাতে লাগলো মেঘ। ওর গলার স্বরে তীব্র রাগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দুইতিনজন ওয়েটার ছুটে আসলো।)

ওয়েটার : জি স্যার।
মেঘ : তোমাদের এখানে রাখা হয়েছে কিজন্য..? মেঝেতে কাঁচের টুকরো পড়ে আছে দেখোনি.? কি করো সারাদিন.? খেয়াল থাকে না.?ডিউটিতে কে ছিলো..? তাকে বলে দিও আর কাজে আসতে হবে না। এমন এমপ্লয় লাগবে না মেঘের।

ওয়েটার : সরি স্যার। আমরা বুঝতে পারি নি। প্লিজ আমাদের চাকরি থেকে বের করবেন না। এমন ভুল আর কখনো হবে না।

কলি : আরে বাদ দাও ভাইয়া। আগে রোজের পা টা দেখতে দাও। আরআপনারা যান।
ওয়েটার : থ্যাংকইউ ম্যাডাম।

ওয়েটাররা চলে যেতেই মেঘ আবার রোজের পায়ের কাছে বসলো,, কাঁচটা টেনে বের করতেই রোজ আলিজার হাত চেপে ধরে ব্যাথায়। মেঘ রোজকে তুলে ওর পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিলো। আর আরাভকে পাঠিয়ে দিলো আলিজার পাশে। তারপর রোজের পা তুলো নিজের কোলের ওপর রেখে কটন দিয়ে ড্রেসিং করাতে লাগলো। মেঘের চোখে পানি চলে এসেছে। তা দেখে রোজ হেসে উঠলো।

রোজ : ব্যাথা পেলাম আমি আর কাঁদছে উনি।
মেঘ : চুপপপপ। দেখেশুনে চলতে পারিস না.? সারাদিন উড়নচন্ডি ভাব। দেখেছিস পায়ের কি অবস্থা। এখনো হাসি পাচ্ছে তোর..? পরে টের পাবি ব্যাথা কেমন।

মেঘের রাগ আর কষ্টগুলো দেখে আলিজা কলি হা করে চেয়ে আছে। সত্যিই তো রোজের ব্যাথায় মেঘ কাঁদবে কেন.?

রোজ : ইচ্ছা করে করেছি নাকি.? এক্সিডেন্ট ছিলো। তোমার জন্য হইছে সব।
মেঘ রোজের পা টা হাল্কা উচু করতেই রোজ মেঘের ঘাড়ে ছোট করে চর দিলো।

রোজ : আরে পা উচু করছো কেন উল্টা ঝুলে যাবো তো। পা কেটে শান্তি হয়নি.? মাথা ফাটানোর ইচ্ছা হয়েছে.?

মেঘ রোজের কথা না শুনে রোজের পায়ের আঙ্গুল মুখে পুরে দিয়ে রক্ত চুষতে লাগলো। রোজের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো। উপস্থিত সবার চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। রোজ নিজের জামা শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বুজে রইলো। ওদের দেখে কলি আলিজাসহ আরাভও ব্লাসিং হচ্ছে।

কলি : হাউ রোম্যান্টিক।

কলির কথা কানে যেতেই মেঘ রোজের পা ছেড়ে দিলো। ব্যাথার একটা টেপ পেচিয়ে কোলের ওপর রাখতেই রোজ পা টেনে নিলো। মেঘ রেগে আবার রোজের পা তুলে নিজের কোলের ওপর রাখলো।

মেঘ : এভাবে রাখ রক্ত পড়া বন্ধ হলে টুইস করে দিবো ব্যাথা কমে যাবে। ( দাঁতে দাঁত চেপে বললো )

রোজ : ঠিক আছে। নাও এবার আরাভ ভাইয়া বলো কি বলতে চেয়েছিলে।

মেঘ : আমি বলছি। ও বলতে পারবে না।
৪বছর আগে,, আমরা তখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আমাদের ক্লাসে জয়েন করে হিয়া রহমান নামের একটা মেয়ে। আরিফ রাহমান #AR শোরুমের ওনারের বড় মেয়ে। আরাভ ওকে দেখেই পছন্দ করে ফেলে। কিন্তু মেয়েটা ছিলো বেশ স্টাইলিশ আর ফ্লট। আর আমাদের আরাভ তখন বোকাসোকা আর একটু গেয়ো টাইপের ছেলে ছিলো। অলঅয়েজ মাথায় তেল,, সিম্পল শার্ট প্যান্ট। আর চোখে চারকোনা চশমা।

মাস খানেক পর মেয়েটা নিজেই আরাভকে বলে যে ও আরাভকে পছন্দ করে। আরাভও নিজের মনের কথা বলে। এটাও বলে যে ও একজন বিজনেসম্যানের ছেলে & ওদের স্টেটাস এক সো কোনো প্রবলেম হবে না। ও ওর বাবাকে রাজি করাতে পারবে। এটাই ছিলো ওর সবচেয়ে বড় ভুল।

মেয়েটা নানা অযুহাতে আরাভের কাছ থেকে টাকা নিতো সবরকম ফেবার নিতো। এমনকি আরাভদের বাড়ি অবধি গেছে। আরাভও বোকার মতো মেয়েটার সব কথা মেনে নিতো। বিশ্বাস করতো। যদিও মেয়েটার ওপর আমার আগে থেকেই সন্দেহ ছিলো।

তখন ওদের রিলেশনের বয়স হয়তো ৭মাস। আমার সাথে আরাভের বিশেষ কারন ছাড়া খুব কমই দেখা হতো। সেদিন ক্লাসের পর আমি যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন দেখলাম হিয়া একটা ছেলের বাইকে উঠে ছেলেটাকে জরিয়ে ধরে বেরিয়ে যাচ্ছে।

আরাভের কাছে জানতে পারি ও আরাভকে রুম ডেটের অফার দিয়েছে। ও নাকি আরাভকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যদি আরাভ ওকে ছেড়ে যায়.? যদি বিয়ে না করে তাই ও আরাভের বেবি ক্যারি করবে। ব্যাপারটা হাস্যকর তাইনা.? কোনো মেয়ের মাথায় এমন চিন্তা আসবে ভাবাও অসম্ভব ছিলো আমার কাছে। কিন্তু আমি এটা সিউর ছিলাম যে মেয়েটা একটা ফ্লট। ওদিকে আরাভও ডিসিশন নেয় ও হিয়াকে বিয়ে করবে। তাহলে হিয়া আর ওর কারোরই কোনো ভয় থাকবে না।

” ভ্যালেন্টইন ডে ” বিকাল বেলা আরাভ ফুলের দোকান থেকে হিয়ার পছন্দের লাল গোলাপ কিনছিলো। তখনই ওর হাতে গেলাপের কাটা ফুটে যায়। ও হাত ঝাকিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই ওর চোখ যায় কিছুটা দূরে একটা গাছের নিচে দাড়িয়ে থাকা গাড়ির ভেতর হিয়া আর একটা ছেলে লিপকিস করছে। ও ধীরে ধীরে গাড়িটার দিকে এগিয়ে যায়। হিয়া ওকে দেখে সরে গিয়ে স্কার্ফ দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। আরাভও কোনোকিছু না বলে ফিরে আসে । তারপর থেকেই গোলাপ সহ্য করতে পারে না ও। আর রোজের ওপরও এজন্যই বেশি রাগ।

পরের দিন কলেজে না আসায় আমি ওর বাড়ি যাই,,, ওর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে আতকে উঠি আমি। এতোদিন শুধু সন্দেহ করতাম, আরাভের কষ্টের কথা ভেবে চুপ করে ছিলাম। কয়েকদিন আগে যাকে নিয়ে আমার সম্পর্কের কথা তোলা হয়েছিলো সেটা হিয়া ছিলো। তবে ছেলেটা আমি ছিলাম না ছিলো ওরই সৎ ভাই। আরিফ রহমানের বড় ছেলে। আমার কথায় গার্ডসরা ওদের দুজনেরই চোখ বেধে ওদের একরুমে রেখে আসে। আফসোস ওদের মতো ছেলেমেয়ে নিজেদের সম্মানের চেয়ে কামনাকে বড় করে দেখে।

রোজ : ওয়েট। আমার প্রশ্ন আছে। যদি আপনার কথা মানি তাহলে আরাভ ভাইয়ার চোখে সমস্যা আছে। তাই চশমা পড়ে। আর তেলো ভাইয়ার এতো পরিবর্তন? ১৬-১৭ বছরের অভ্যাস পাল্টালো কিভাবে.? আর রুমডেটের কথা.? আপনারা কেউ ভার্জিন না.?

মেঘ : আরাভ কোনো মেয়ের সাথে রুডমেট করেনি। আর আমিও করিনি। আমাদের টার্গেট সেসব খারাপ মেয়ে যারা ছেলেদের ঠকায়। আমরা সেসব মেয়েকেই তার প্রাক্তনের সাথে এক রুমে।

রোজ : থাক বুঝছি আর বলতে হবে না। আমি এখনো ছোট।।।।।।।।।। যাক বাবা ভার্জিন জিজু পেলাম আমি তো ভাবছি আপনাদের সবার ক্যারেক্টার ঢিলা। অবশ্য যেটা ভাবছি সেটা হলেও কোনো হেলদোল হতো না। কারন আপনাদের মতো ছেলেদের এমন দু একটা কেস থাকেই।

মেঘ : আরাভকে আমি নিজের মতো করে তৈরি করেছি। চোখে লেন্স, চুলে জেল। জিন্স, কোট,টি-শার্ট এগুলোর ফ্যাশান সেন্স জানতে হেল্প করেছি। দ্যাট্স ইট।

কলি : কিন্তু এগুলো করে তোমার লাভ কি মেঘ ভাইয়া? আরাভ নাহয় প্রতিশোধের আগুন নিভানোর জন্য এমন করে কিন্তু তুমি.?

মেঘ : আরাভ আর আমার অতিতের ঘটনায় খুব একটা অমিল নেই।

কথাটা শুনতেই চমকে উঠলো রোজ। কেন জানি না খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। তবে কি মেঘেরও ভালেবাসার মানুষ ছিলো। যাকে মেঘ এখনো ভালোবাসে। আর সেটাই রোজকে নানাভাবে বোঝাতে চেয়েছে.?

রোজ : তারমানে তোমারও Gf ছিলো।তুমি দেখছি বহুত শেয়ানা।

মেঘ : আমার Gf ছিলোনা। আর না ছিলো এমন ভালেলাগার মানুষ যাকে নিয়ে মিনিমাম ভাবনা ছিলো।

রোজ : তাহলে আবার কি.? তোমার কেস এক হলো কিভাবে.?

আরাভ : মেঘের মা নাই।
রোজ : সেটা তো জানি। ছোটবেলায় আন্টি মারা গেছে। মেঘরোদ্দুর তো বলেছে আমাকে। কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছি মেঘরোদ্দুরের রাগের কারন।

আরাভ : মেঘের মা মেঘদের ছেড়ে অন্য একজনের সাথে চলে গেছে। মেঘের বয়স তখন তিনবছর। ও তখন কিছু বুঝতো না। কিন্তু যখন কলেজে উঠলো তখনই জানতে পারলো সব ঘটনা।

রোজ : মানে.? আর এসব কি? মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। একটু ক্লিয়ার করে বলো।

আরাভ : হিয়া মেঘের বোন। আর হিমেল হিয়ার ভাই। মেঘের মা মোহনা বর্তমানে আরিফ রহমানের স্ত্রী। মেঘদের অন্যায় এটাই ছিলো যে ওরা মধ্যবিত্ত। আংকেলের তখন পারিবারিক + প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা বেশি ভালো ছিলো না। তবেবে কিছু জায়গা ছিলো সেগুলোকে পুঁজি করে আজ এই অবস্থায় এসেছেন। আন্টির প্রতি ভালোবাসা আর মেঘের চিন্তা করে দ্বিতীয় বার বিয়ে করেননি তিনি। আফসোস আন্টি যে সুখের লোভে ওদের ছেড়ে গিয়েছিলো সেই সুখই আন্টিকে ছেড়ে গেছে। আর তিনি এখন চিরশান্তির স্থানে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন।

কথাগুলো যেন বাজের মতো আঘাত করলো সবার হৃদয়ে। মেঘের চোখদুটো রাগে কষ্টে লাল হয়ে আছে। একটা সন্তানের কাছে এর চেয়ে কষ্টের কি আছে..? তবুও মেঘ নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে এভাবে লুকিয়ে রাখে। নিজের কষ্টকে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে।

মেঘ : আচ্ছা বাদ দে এসব। এবার রোজের ছোটবেলার গল্প শুনবো।

মেঘের মুখে এমন কিছু আশা করেনি কেউ। রোজের মুখটা কালো হয়ে গেছে। কলি জানে রোজ কিছুই বলবে না। আর এই বিষয়ে ও কথা বলতে চায়ও না। কলি কথাটা স্কিপ করতে বললো কিন্তু আলিজা বাঁধা দিলো।

আলিজা : কেন লুকানো হবে সত্যিটা.? এটা সবার জানা উচিত। ১৬বছর আগের অতিত সামনে আসা উচিত। যদি তোরা চুপ থাকতে চাস্ তাহলে ঠিক আছে। আমিই বলবো সবটা।রোজ কেন বিনাঅপরাধে শাস্তি পাবে.?

রোজ : আপিলা প্লিজজ।
আলিজা : তুই চুপ কর।

আরাভ : আরে এতো না না চলছে কেন সিরিয়াস কোনো কিছু আছে নাকি তোমার ডাইনি বোনের লাইফে.? বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে.? এজন্যই তো হোস্টেলে থাকে তাইনা..?

আলিজা : নাহ। রোজকে কেউ বাড়ি থেকে বের করে নি। রোজ নিজে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে আমার আম্মুর জন্য। আমার আম্মু রুশানি যে রোজের সৎমা আর ছোট খালা।

আলিজার কথাটা বোধগম্য হলো না কারোর। মেঘ দেখলো রোজ রুশানির কথা শুনে গুটিয়ে যাচ্ছে। তাই ও এক হাত দিয়ে রোজকে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে রাখলো। আলিজা বলতে লাগলো,,

আলিজা : বড়মা মানে রোজের আম্মু বিয়ের ৬বছরের মধ্যে কনসিভ করতে পারেনি। বাবা সবসময় বড়মাকে সমর্থন করতো। কিন্তু রিলেটিভরা তো চুপ থাকবে না। তারা বড়মাকে সবরকমের কুকথা শোনাতো। বড়মার সবচেয়ে কাছের মানুষ এবং বন্ধু ছিলো আমার মাম্মা। মাম্মা নিজেই নাকি প্রপোজাল দিয়েছিলো যে সে বাবাকে বিয়ে করে বড়মা আর বাবাকে বেবি গিফট করবে। বাবা কখনো রাজি হয়নি তবে বড়মা আর দাদীর চাপে রাজি হন। দেড় বছরের মাথায় নাকি আমি আসি। আর আমার যখন ৩বছর বয়স তখন বড়মাও কনসিভ করে। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য লাগে সবার কাছে। বড়মাকে জিজ্ঞাসা করলেও সেও নাকি চুপ হয়ে যেত। পরিবারের সবাইকে আমার মাম্মা কনভাইন্স করছিলো ছেলের জন্য। সবাই তাতে সায় দেয় কারন প্রথম সন্তান আমি।আর আমাকে পৃথিবিতে এনেছে মাম্মা। কিন্তু তার ঠিক ৮মাসের মাথায় গিয়ে রোজ আসে। আমিই প্রথম গিয়েছিলাম জানেন আমার জন্য আনা মানুষ পুতুল দেখতে। কিন্তু সবাই আমাকে কালোমুখ করে। বলে কোনো পুতুল আসেনি। শেষে বাবা আমাকে নিয়ে যায়। ছোট্ট সাদা ধবধবে পুতুল। কপালে টিপের চেয়ে অনেক ছোট একটা তিল কপালের ডানপাশে,, গাল দুটো গোলাপী। ঠোটটা লাল। বড়মা আমাকে বলেছিলো এটা নাকি আমার বোন আর আমি বলেছিলাম এটা আমার সবকিছু। বাবা বেবিটার গোলাপের মতো চেহারার আর কাটার মতো বিদ্ধকুটক্তির সংমিশ্রণে ওর নাম রোজ রাখে। বড়মা রাখে সাদিয়া অর্থাৎ সৌভাগ্যবতী। কিন্তু কে জানতো তার সৌভাগ্য অচিরেই শেষ হয়ে যাবে..? সেদিন রাতে রোজ শেষবারের মতো ওর মায়ের কাছে ঘুমায়। শেষবারের মতো নিজের মায়ের বুকের দুধ পান করে। একটা দুধের শিশুকে যখন তার মা একা রেখে চলে যায় তখন তার কি অবস্থা হয় একমাত্র আমি জানি। প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত কাঁদতো রোজ। মাঝে মঝে ঈশা আপু নিয়ে যেতো। প্রথম দুদিন মামি ওকে দুধ খাওয়াতো কারন ঈশানও তিনমাসের বাচ্চা ছিলো। রোজ যখন কাঁদতো তখন বাড়ির সবাই ওকে নানারকম কথা বলতো। তখন বুঝতাম না তবে এখন বুঝি। আমার দাদী তো ওর মৃত্যু অবধি কামনা করেছে। সবার চোখের মনি ছিলাম আমি আর সবার চোখের বালি রোজ। আমার পছন্দের সমস্ত জিনিস আমাকে দেওয়া হতো। আর রোজ দরজার কাছে দাড়িয়ে সেগুলো দেখতো। বড়মার মৃত্যুর সমস্ত দায় রোজের ওপর দেওয়া হয় তাই বাবাও ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। ছোট্ট রোজটা বড় হতে থাকে আমার আর কলির কাছে। বুঝতেই পারছো বর্তমানে এক বাচ্চার বাবা নিখিল ভাইয়া তখন অনেকটা বড়। তাই ও আমাদের সাথে মিশতো না লজ্জা পেতো। এটা হলো ওর চার বছর পর্যন্তের ডেইলি রুটিন।

সবাই একমনে চেয়ে আছে রোজের দিকে। পারিবারিক সম্পর্ক, বাবা মেয়ের সম্পর্ক,, কারোর প্রতি নির্ভরশীলতা,, কারোর আদর, ভালোবাসা কোনো কিছুই পেলো না একটা দুধের শিশু অথচ সেই মেয়েটাই আজ নিজের আগে অন্যের কথা ভাবে,, চিন্তা করে। মেঘ তো তাও নিজের বাবাকে পাশে পেয়েছে। কাছে পেয়েছে। কিন্তু রোজ কি পেলো.? রোজের শরীর গরম হতে লাগলো হয়তো জ্বর আসছে। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে ও। চোখদিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। পড়বে নাই বা কেন.? বড় হওয়ার পর যে ভয়ংকর সত্যিটা জানতে পেরেছে সে। মেঘ ওয়েটারকে বলে ওর নিজের প্রাইভেট রুমের চাবি আনালো তারপর ওদের নিয়ে সেখানে গেলো ।

মেঘ : [সবটা জানতে হবে আমাকে। তোকে যে আর কষ্ট পেতে দেখতে পারবো না রোজ। ভালোবাসি তোকে,, আর তোকে সবসময় হাসি-খুশি দেখতে চাওয়াটা আমার স্বপ্ন। মনে আছে তোর.? তুই শেষ কবে মনখুলে হেসেছিলো আর কবে কেঁদেছিলি..? আমি চলে এসে সেদিন অনেক বড় অন্যায় করেছিলাম রে। তুই বারবার বলেছিলি তুই আমার সাথে আসতে চাস্ অথচ তোকে ওখানে একা ফেলেই স্বার্থপরের মতো চলে আসলাম।আমি খুব খারাপ রে রোজ। খুব খারাপ। ]মনে মনে

চলবে,,