তুমি শুধু আমারই হবে পর্ব-৪+৫

0
196

#তুমি_শুধু_আমারই_হবে
#তানিয়া_মাহি(নীরু)
#পর্ব_০৪ ও ০৫

পরদিন সকালবেলা-

আটটার দিকে মুহিব রেডি হচ্ছিল অফিসে যাওয়ার জন্য। অনামিকা মুহিবের জন্য নাস্তা বানিয়ে নিয়ে আসে। মুহিব জানায় তার হাতে বেশি সময় নেই তাই খেতে পারবে না। অনামিকা কিছুতেই ছাড়বে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। মুহিবকে খেয়ে যেতেই হবে।

” শোনো তুমি খেয়ে যাবে, নাহলে কিন্তু আমি খাব না বলে দিলাম।”

” এত পাগলামি কেন করো তুমি বলো তো অনু?”

” তোমার মা অন্যকাউকে আনলে আর পাগলামি করব না নাও আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”

” একদম বাজে কথা বলবে না। আমার জীবনে আর কোন নারী কোনদিন আসবে না। আল্লাহ যেন তোমাকে হারানোর আগে আমাকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যান। ”

” এখন আপনি বাজে কথা বলছেন। নিন খেয়ে নিন এখন।”

” শোনো যেকোন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর বরসা রাখতে হয়। তুমি তো দেখো আমি তো মাকে কম বুঝাই না। মা খুব তাড়াতাড়ি সব বুঝবে তুমি আশা ছেড়ো না। মায়ের কথায় কোন জবাব দিও না তার কথায় খারাপ লাগলে, মন খারাপ করলে কান্না পেলে এসে সিজদাহ্তে বসে যাবে আল্লাহকে কষ্টের কথা জানাবে তিনি ঠিক করে দিবেন সবকিছু। তিনি চাইলে সবরকম মীরাক্কেল ঘটতে পারে। আর শোন আমার বাচ্চার প্রয়োজন নেই তুমি থাকলেই হবে। বাচ্চার আশা করে আমি তোমাকে বিয়ে করি নি তাই এখনও বাচ্চা চাইছি না। কত শিশু মা-বাবা ছাড়া আছে দেখেছো? তাদের মধ্যেই কেউ নাহয় আমাদের সন্তান হলো, সবই তো আল্লাহর সৃষ্টি।”

” কিন্তু মা কি মেনে নিবেন?”

‘ ওসব আমি দেখব তুমি চিন্তা কোরো না। মাথার ওপরে আল্লাহ আছেন, তিনি সবকিছু ঠিক করে দিবেন ইন শা আল্লাহ। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। মার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তোমার স্বামী বেঁচে আছে।”

কথা বলতে বলতে অনামিকা মুহিবকে খাইয়ে দিতে থাকে। এই লোকটা আসলেই ভিন্নরকম। বিয়ের দুই বছরে মুহিব কখনও অনামিকার ওপর বিরক্ত হয়ে ‘উহ’ শব্দটাও করে নি। এরকম মানুষকে ভালো না বেসে থাকা যায় না, সব মেয়েই হয়তো মুহিবের মতো কাউকেই আশা করবে।

***
বিকেল পাঁচটা, অনামিকা-জারার সাথে দেখা করে বাসায় ফিরে দেখে তার খালাশাশুড়ি মনিকা এসেছেন। অনামিকা সেখানে প্রবেশ করেই উনাকে সালাম দিলেন। মনিকা বেগম ও হাসি মুখে সালামের জবাব দিলেন।

” এসো বউমা এখানে এসে বসো। কোথাও গিয়েছিলে বুঝি?”

ছেলের বউয়ের সাথে বোনের এত মধুর কথা মেরিনা বেগম যেন ভালোভাবে নিতে পারলেন না। বোনকে এনেছেন পরামর্শ করার জন্য কীভাবে অনামিকাকে তাড়ানো যায় আর তার বোন কি না মুখে মধু নিয়ে কথা বলছে!

অনামিকা গিয়ে মনিকা বেগমের পাশে বসে। মনিকা বেগম অনামিকার পিঠে হাত দিয়ে পাশে থেকে জড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নেন। এটা দেখে মেরিনা বেগম যেন আর বেশি করে ক্ষুব্ধ হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর অনামিকাকে ছেড়ে দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায় অনামিকা। নিজের রুমে এসে গায়ের কাপড় বদলে রান্নাঘরের দিকে যায় খালাশাশুড়ির জন্য নাস্তা বানাতে।

***
” তোমাকে একটা কারণে ডেকে পাঠিয়েছি আপা।”

মেরিনা বেগমের কথা শুনে তার দিকে দৃষ্টি দেয় মনিকা বেগম।

” কারণে? কি কারণে শুনি?”

” এই মেয়েকে আমি বাড়িছাড়া করব। কি করে করব সেই পরামর্শ নিতেই তোমাকে এনেছি। ”

” কি! বউমাকে বাড়িছাড়া করবি মানে? কি বলছিস মেরিনা?”

” হ্যাঁ আপা। এই মেয়েকে আমি আর এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারছি না। হয় একে আমি বাড়িছাড়া করব নইলে খু*ন করব। আমার ছেলেকে আমার থেকে আলাদা করেছে, আমার ছেলে এখন আর আমার কথা ভাবে না। সারাক্ষণ বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরছে। ”

” তোর মেয়েও তো বিয়ে দিয়েছিস। এখন তোর মেয়ের জামাই যদি মেয়ের ওপর অত্যা*চার করে তাহলে কেমন লাগবে তোর? সবকিছু খারাপ হয় না রে।”

” আমার মেয়ের সাথে এই মেয়ের তুলনা করবে না আপা। এই মেয়েকে আমার একদম সহ্য হয় না। বিয়ের আগে থেকেই তো অপছন্দ করি। সেদিন আবার ডাক্তার বলেছে সে নাকি মা হতে পারবে না। বাচ্চাই যদি না দিতে পারে তবে এই বউ রেখে আমি কি করব শুনি?”

” এই যুগে এসেও এমন কথা কি করে বলতে পারিস মেরিনা? মেয়েরা মোটেও বাচ্চা তৈরির মেশিন না। আর এসব তো উপরওয়ালার হাতে, মানুষ এসবের কি করবে? তবে চিকিৎসা তো দারুণ উন্নত হয়েছে।”

” আপা আমি তোমাকে কি করে বোঝাবো এই মেয়েকে আমি…..”

” তুই ওর প্রতি এমন কেন? কি করেছে ও?”

” একে তো আমার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে, মা হতে পারবে না, আমার ওপরে হাত ঘোরায়, অন্য বউয়েরা বাবার বাড়ি থেকে কতকিছু নিয়ে আসে এই মুখপু*ড়ির তো বাপ মা-ই নেই। বলতে গেলে হাজারটা কারণ আছে।”

” তোর সাথে কেমন আচরণ করে এটা বল তো?”

” সবসময় গায়ে পড়ে কথা বলার জন্য।”

মনিকা বেগম একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। কপালের ভাজটা এবার টান হয়ে গেল, মুখটা মলিন হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন অনামিকাকে তাড়ানোর কারণ বিয়েতে কিছু নিতে পারে নি, ছেলে আর বউয়ের মাঝে সম্পর্ক ভালো। মনিকা বেগম নিজের বাড়ির কথা মনে করলেন।

” মেরিনা একটা কথা বলি শোন, তাকে তাড়ানোর হাজারটা কারণের মাঝে যদি রেখে দেওয়ার কারণ হিসেবে তোর সাথে ভালো ব্যবহার থেকে থাকে তাহলে ওকে ভালোবেসে যত্নে রেখে দে বোন। দোয়া করি আমার মতো অবস্থা যেন তোর না হয়।”

মেরিনা বেগম এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

” তোমার মতো যেন না হয় মানে? ”

” ঘরের কথা বাহিরে বলতেও কেমন একটা লাগে। কার দোষ জানি না তবে আমি আমার ছেলের বউয়ের সাথে ভালো নেই। এই বয়সে আমার হাত পু*ড়িয়ে রান্না করে ওদের খাওয়াতে হয়, বাড়ির সব কাজ করতে হয় তবুও ছেলের বউয়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। আর এদিক দিয়ে অনামিকা খুব ভালো একটা মেয়ে, ও তোকে কখনও অসম্মান করবে না। তুই হয়তো ভাবছিস অনুকে তাড়িয়ে আরেকটা সুন্দর বউ নিয়ে এসে তার সাথে সুখে থাকবি। এরকম হয় না রে বোন, ভবিষ্যতের কথা বলা যায় না, ভবিষ্যৎ আরো খারাপ হতে পারে, তোর মাথায় যা চলছে তা ঝেড়ে ফেলে দে।”

অনামিকা কিছু নাস্তা নিয়ে আবার রুমে প্রবেশ করে। অনামিকাকে দেখে দুইবোন চুপ হয়ে যায়। অনামিকা দুজনের মাঝে প্লেট দুটো রেখে মিষ্টি হেসে চলে যাবে ঠিক তখনই মনিকা বেগম অনামিকাকে ডেকে পাশে বসান।

” কি ব্যাপার মেয়ে! নিজে একা একা এতকিছু করলে আর শুধু আমাদের এগুলো দিয়ে যাচ্ছো? এখানে বসো, শাশুড়ীর সাথে সময় কাটালেই না সম্পর্ক মা-মেয়ের মতো হবে!”

অনামিকা মেরিনা বেগমের পাশে গিয়ে বসে। মেরিনা বেগমকে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বলে,

” আমি আর মা তো সময় কাটাই অনেক। মা আমাকে কত কি বানিয়ে খাওয়ায়! সেদিন তো অনেকটা পরিমাণের দুধ ঘন করে পায়েস রান্না করে খাইয়েছে। পায়েসটা অসম্ভব সুন্দর হয়েছিল। আমি তো মার সাথে সাথে থেকে শিখে নিয়েছি, আপনারা খাবেন? খেলে আমি বানিয়ে দিতে পারব, চেষ্টা করলে হয়তো নিশ্চয়ই পারব।”

অনামিকার মুখে এরকম মিথ্যা কথা শুনে বেশ অবাক হয় মেরিনা বেগম। মেরিনা বেগম ভাবতে থাকে সে তো কখনও এরকম করে নি তাহলে অনামিকা মিথ্যা কেন বলল? এই মিথ্যা কথা বলে কি তবে সম্পর্ক ঠিক করতে চাইছে? অনামিকা যদি এটাই চেয়ে থাকে তাহলে তার চাওয়া কখনো পূরণ হবে না। আমি কোনদিন ওকে মেনে নেব না। আমি যেহেতু ভেবেছি আমার ছেলেকে আবার বিয়ে দেব তার মানে আমি মুহিবকে বিয়ে দেবই। ছেলেকে বিয়ে দিতে যদি বাড়ি বা আত্মীয় সকলের বিপক্ষে যেতে হয় তাহলে তাই যাব।

চলবে………

নেক্সট না চেয়ে গল্প বিষয়ক কমেন্ট করবেন সকলে।
হ্যাপি রিডিং🌼

আগামী পর্ব আগামীকাল মাগরিব পর সাতটার দিকে পেয়ে যাবেন ইন শা আল্লাহ।

#তুমি_শুধু_আমারই_হবে
#তানিয়া_মাহি(নীরু)
#পর্ব_০৫

” অনু আজ কালো শাড়িটা পরো তো, আজ তোমাকে নিয়ে একটু বের হব। অনেকদিন হলো তোমাকে নিয়ে বের হওয়া হয় না। আজ অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়েই কিন্তু বের হব, তুমি রেডি হয়ে থেকো।”

রুমে এসে ফোনে মুহিবের মেসেজ দেখে অনামিকার মন ভালো হয়ে যায়। মুহিবের বাসায় ফিরতে তো বেশি সময় নেই তাই অনামিকা তাড়াতাড়ি রেডি হওয়া শুরু করে। আলমারি থেকে বেছে বেছে কালো শাড়িটা বের করে নেয়। এই কালো শাড়িটা মুহিবের খুব পছন্দ। সে নিজে থেকে এই শাড়িটাই প্রথম অনামিকাকে উপহার দিয়েছিল। সবজায়গায় দেখা যায় প্রেমিক কিংবা স্বামী প্রথমে প্রেমিকা বা স্ত্রীকে নীল শাড়ি উপহার দেয় কিন্তু মুহিব দিয়েছিল কালো শাড়ি।

অনামিকা শাড়িটা পরে তৈরি হচ্ছে এমন সময় মনিকা বেগম দরজায় এসে দাঁড়ায়, দেখে অনামিকা শাড়ি পরে সাজগোজ করছে। তিনি বুঝতে পারেন হয়তো দুজনের বেরোনোর কথা হয়েছে। তিনি দরজায় নক করেন।

” কি রে মা আসব?”

অনামিকা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে মুহিবের আন্টি দাঁড়িয়ে আছে। সে মিষ্টি এসে এগিয়ে গিয়ে মনিকা বেগমকে পাজা করে ধরে ভেতরের দিকে নিয়ে আসে।

” ছেলের রুমে আসতে অনুমতি নিতে হবে কেন শুনি?”

” ছেলে তো একা থাকে না এই রুমে, ছেলের বউও থাকে। যদিও এখন ছেলে নেই তবুও রুমে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা ভালো কাজ।”

” আচ্ছা বুঝলাম। কেমন লাগছে আমায়?”

” দারুণ লাগছে। আমার অনু মাকে কি খারাপ লাগতে পারে? একদম অপ্সরা লাগছে কালো শাড়িতে।”

” সত্যি!”

” হ্যাঁ সত্যি। তো কি দুজনের কি বের হবার কথা আছে নাকি?”

” হ্যাঁ আন্টি। রুমে এসে দেখি আপনার ছেলে মেসেজ দিয়ে রেডি থাকতে বলেছে। হয়তো এখনই চলে আসবে।”

” একটা কথা বলতে আসলাম রে মা।”

” হ্যাঁ আন্টি বলেন শুনি।”

” তোর শাশুড়ি কি তোকে খুব খারাপ রেখেছে?”

মিসেস মনিকার কথায় এবার একটু থতমত খেয়ে যায় অনামিকা। যতই উনার বোন হোক না কেন যাকে নিয়ে প্রশ্নটা করেছে সেটা তো তার শাশুড়ি। খারাপ বাসলেও তার আরেকটা মা আর ভালোবাসলেও তার আরেক মা। মা যে তাকে ভালোবাসে না সে কথা তো বাহিরে কাউকে বলা যাবে না।

” কি হলো অনু?”

দ্বিতীয়বার একই প্রশ্ন শুনে অনামিকা প্রশ্নের উত্তরটা গুছিয়ে নেয়। বাড়ির আসল পরিবেশ তো বাহিরের মানুষকে জানতে দেয়া যাবে না।

” কি বলেন আন্টি, মা কেন খারাপ রাখবে? উনি তো আমাকে খুব ভালোবাসেন।”

” আর তুমি?”

” আমার তো নিজের মা-বাবা নেই, উনাকেই তো মা ভাবি আর বাবাকে বাবা। দুজনই আমাকে খুব ভালোবাসেন আর আমিও তাদের খুব ভালোবাসি। ”

দুজনের মাঝে আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলে। মনিকা বেগম খুব বিচক্ষণ মানুষ তিনি অনামিকার সাথে কথা বলেই তিনি বুঝতে পারেন অনামিকা খুব ভালো একটা মেয়ে। মেরিনা শুধু শুধু তার সাথে খারাপ কিছু করতে চলেছে। সে ইদানীং ছোটবেলার চেয়ে বেশি লোভী হয়ে গেছে এজন্যই এই অবস্থা। অনামিকা কত সংগোপনে ঘরের খবর লুকিয়ে ফেলল!
***
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা রুমের দরজায় মুহিব এসে হাজির। অনামিকা জারার সাথে ফোনে কথা বলছিল। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে, ছেলে অস্ট্রেলিয়াতে থাকে। খুব ভালো একটা চাকরি করছে সেখানে। ছেলের মা ছাড়া কেউ নেই, তাই মাকেও ওখানে নিয়ে গিয়েছে। মা ছেলে দুজন মিলে ওখানেই থাকে। দেশে এসেছে বিয়ে করবার জন্য। জারাকে তারা ভীষণ পছন্দ করেছে বিয়েটা তাড়াতাড়ি করে ফেলতে চায়। বিয়ের এক বছরের মাঝেই জারাও সেখানেই চলে যাবে। জারার বাবা-মাকেও নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তারা এদেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না জানিয়ে দেয়।

অনামিকা কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দরজার দিকে তাকাতেই দেখে মুহিব দাঁড়িয়ে আছে। দরজার পিঠ ঠেকিয়ে অনামিকাকে দেখেই যাচ্ছে। মুহিবের এমন আচরণে অনামিকা বেশ লজ্জা পেয়ে যায়।

” কি গো তুমি কি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি ভেতরে এসে নিজেও তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নিবে? আমি তো একদম রেডি।”

মুহিব এবার রুমে প্রবেশ করে। ব্যাগটা রেখে অনামিকার দিকে এগিয়ে যায়। অনামিকার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে এক পলকে অনামিকার দিকে তাকিয়ে থাকে।

” কি অসম্ভব সুন্দর লাগছে আমার অনুকে সেটা কি অনু জানে?”

অনু লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলে। অনুর লজ্জা পাওয়া দেখে মুহিবের মুখে এক চিলতে হাসি দেখা যায়।

” তুমি যদি কথা দাও আজ শাড়িই পরে থাকবে তাগলে ঘুরতে যাব নইলে যাব না।”

মুহিবের মুখে এমন একটা কথা শুনে মাথা উঁচু করে তাকায় অনামিকা। ভ্রু কুচকে বুঝতে চেষ্টা করে এমন কথা কেন বলল সে! নাহ, কথাটা মাথায় ঢুকলো না!

” কি বললে? বুঝলাম না ঠিক।”

” বললাম তুমি যদি কথা দাও ঘুরে আসার পরও শাড়ি পরে থাকবে তাহলে সেই শর্তে আমি তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে রাজি।”

” কেন বলো তো?”

মুহিব গিয়ে অনুকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। অনু হকচকিয়ে ওঠে। মুহিবের ভারী নিঃশ্বাস অনুর ঘাড়ে পড়তে থাকে।

” কারণ আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি আমার অনুকে আজ নিদ্রাহীন চোখে দেখে যাব অনেকক্ষণ। ”

” আচ্ছা ঠিক আছে মশাই দেখবেন। আপনার বউকে আপনি ছাড়া আর কে-ই বা দেখবে বলুন? এবার যান তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিন বিশ মিনিটের মধ্যে বের হব। আবার তো বাড়ি ফিরতে হবে নাকি? দেরি করলে মা কিন্তু বকবে, যাও তাড়াতাড়ি যাও।”

” আচ্ছা ঠিক আছে যাচ্ছি।”

অনামিকার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে মুহিব চলে যায় ফ্রেশ হতে। অনামিকা গিয়ে বিছানায় বসে ফোন ঘাটতে থাকে।
****
দুজনের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা বেজে যায়। অনামিকা ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছে, যদিও তাদের কাছে চাবি আছে তবুও ভীষণ ভয় লাগছে। মুহিবের কনুই দুই হাত দিয়ে ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,

” আমার না ভীষণ ভয় করছে।”

এত আনন্দের মাঝে অনামিকার কথাটা কেমন যেন ঠেকলো মুহিবের কাছে। চারপাশে আলো, লোকজন তবুও অনামিকার ভয় লাগছে!

” কেন ভয় লাগছে? আমি আছি তো!”

” মা এমনিতেই আমাকে পছন্দ করে না, আবার আজ দেখো এগারোটা পার হয়ে গেছে বাড়িতে কি হবে আজ সেটাই ভাবছি।”

” ওহ আচ্ছা এই ব্যাপার! মাকে একটু সময় দাও সব ঠিক হয়ে যাবে। ”

” আর কত মুহিব? প্রায় তিন বছর হতে চলল।”

” চিন্তা কোরো না আল্লাহ সবকিছু ঠিক করে দিবেন দেখে নিও তুমি।”

” আল্লাহ যদি তোমাকে ঠিক আগের মতোই না রাখতো তাহলে আমার কি যে হতো! আমার আর তোমার সাথে থাকাই হতো না।”

” এসব কথা আর বলবে না অনু, আমার একদম ভালো লাগে না। আর মুখে আনবে না এসব।”

” হুম।”

অনামিকা এবার একমাত্র ভরসার কাধটায় মাথা রাখে। মুহিবও প্রিয়তমার গালে স্পর্শ করে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আকাশে গোল চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে। রিকশা আপন গতিতে চলতে থাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে আকাশের চাঁদটাও যেন তাদের সাথে ছুটছে। দুই ঘণ্টার এই দুজনের আনন্দের মাঝেও বাড়িতে যেয়ে কি হবে সেই ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে অনামিকার। যে মানুষটাকে মানুষ সবথেকে বেশি ভালোবাসে তাকেই হারানোর ভয় হয়তো মানুষকে কুড়েকুড়ে খায়, অনামিকার বেলাতেও ঠিক তাই। যেভাবেই হোক মুহিবকে কিছুতেই হারানো যাবে না, এরকম মানুষ হাজারে একটা মিলে।

মুহিবের কাধে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকায় অনামিকা। চাঁদটা একাই কেমন অবস্থান করছে! এসময়ে আশেপাশে তারাও নেই। সে নিজে একাই আলো ছড়াচ্ছে চারপাশে। চাঁদকে দেখেও একটা ভাবনা মনে চলে আসে।

নাহ এসব শুধু তার মনের ভাবনা। মুহিব তাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। সে কখনো তাকে ছাড়তেই পারবে না, কখনোই না, একদম না আকার না। মুহিব শুধু তাকেই ভালোবাসতো, ভালোবাসে আর ভালোবাসবে। কথাগুলো ভেবে মুহিবের কাধে মাথা রেখেই একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে অনামিকা। মুখে তার পূর্ণতার হাসি কারণ কেউ তাকে তার জীবন দিয়ে ভালোবাসে।

#চলবে…..