তোমাতে আমাতে পর্ব ০২

0
1839

#তোমাতে_আমাতে
পর্ব ০২
লেখা আশিকা জামান

কোনরকমে পাটা সোজা করে বিছানা থেকে নিচে নামলাম কিন্তু কিছুতেই ফ্লোরে এক পা নামাতে পারছিলাম না। আমি এক পা উপরে তুলে হা ডু ডু খেলার মত লাফাচ্ছিলাম আর উঁহু মা গো উহু করছিলাম। ইমন আমার এই কান্ড দেখে ভেটকি মাছের মত দাত কেলিয়ে হাসতে লাগলো। আমার রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছিলো। প্রচণ্ড রেগে গেলে আমি চোখমুখ বন্ধ করে নিচে তাকিয়ে থাকি যাতে রাগটা একটু কন্ট্রোলে আনতে পারি। হঠাৎ ই আমার পায়ে কারো স্পর্শে আমি শিহরিত হয়ে উঠে বুকে ধুকপুকুনি শুরু হয়ে যায়।আরেকদফা লাফ দিয়ে পড়ে যেতে নিলে ইমন আমাকে ধরে ফেলে। প্রথম দিনই এত কাছে আসতে আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমার হার্টবিট দ্রুত কাজ করছিল। মনে হচ্ছে এখনি হার্ট ব্রাস্ট হয়ে যাবে। ইমন ইতস্তত করে আমাকে ধরে খাটে বসিয়ে দিলো। তারপর আমার পায়ের আংগুলগুলো টেনে দিলো।এই প্রথম কোন ছেলে আমার পায়ে স্পর্শ করল। আমি টোটালি ফ্রিজড।
ইমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলতে লাগলো
— রিলাক্স, এই সামান্য কারনে এইভাবে কেউ লাফালাফি করে। এখন ঠিক লাগছে..?
আরেকটু হলেইতো পড়ে কোমড় ভেংগে চিতপটাং হতেন।
ছোটবেলা থেকেই এই টাইপের ঞানমার্কা কথা শুনলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমি ইচ্ছে করেই কিছুটা উদ্ধুত ভাবে পাটা ঝাড়া মেরে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম।
ইমন চরম বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। হয়তবা এই মূহূর্তে ওর আমাকে চরম অসভ্য মনে হচ্ছে । ভাবলে ভাবতে পারে তাতে আমার কি যায় আসে। আমি সোজা ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেলাম। তারপর একে একে সব গয়না খুলতে লাগলাম। আয়নায় ইমনের দিকে চোখ পড়লো ও একমনে ফোনের স্ক্রিনে স্ক্রলিং করেই যাচ্ছে। হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে ওর ব্যাগটা বিছানার উপর এনে চেইন খুলতে লাগলো। একটা হুয়াইট টি শার্ট আর ব্ল্যাক থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট বের করলো তারপর টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আমার স্বভাব বরাবরই মতই সোজা না করে উলটা কাজ আগে করি। আজকেও তার ব্যাতিক্রম হলো না। অবশ্য হবারি কথা একজন সূদর্শন পুরুষের সাথে আজকে আমাকে রাত কাটাতে হবে এটা ভেবেই আমার মাথা আউলা ঝাউলা লাগতেছিলো। আমি সব গয়না না খুলে আগে চুল খুলতে লাগলাম। এমন ভাবে চুলে গিট পাকিয়ে দিয়েছে চুলের বারোটা বাজার আশাংকায় আমার মন দ্বিগুন খারাপ হয়ে গেল। ওদিকে কোমড় অব্দি ছাড়ানো সিল্কি চুলগুলো হঠাৎই ছাড়া পেয়ে আমার গলার হারের হুকের সাথে এমনভাবে বাজলো যে এইটা ছাড়াতেই আমার সারা রাত পার হয়ে যাবে। সব সময় আমার সাথেই কেন এমন হয়? অগত্যা আর নিজের কপালকে দোষ না দিয়েই মিশন চুল বনাম গলার হার শুরু করে দেই। ওদিকে ইমন ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে এসে বিছানায় ধপাশ শুয়ে পড়লো কপালে হাত দিয়ে।
হয়তবা ওর চোখগুলো লেগে আসছিলো। আমার উহু আহ ইশ আর গয়নাগাটির ঝনঝন শব্দে ও বিছানা থেকে উঠে বসে। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে আমি মাইনকার চিপায় পড়েছি।
যুদ্ধ করে করে যখন নাজেহাল অবস্থা তখন আমার পিঠে আমি কারো স্পর্শ অনুভব করি। ইমনের হাত আমার পিঠে পড়তেই আমার কলিজাট ধক করে উঠলো।চরম ভয়ে ওর দিকে ঘুরে তাকাই। আমি লজ্জায় জমে যাচ্ছিলাম। ইমন এটা বুঝতে পেরে যায় তাছাড়া ও নিজেও লজ্জা পেয়ে বারবার কাচুমাচু করে নিচে তাকাচ্ছিলো।
— পিছন দিকে ঘুরুন নাহলেতো ঝট খুলবেনা। প্লিজ তাড়াতাড়ি করুন আমার এই শীতে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে মোটেও ভালো লাগছে না।
আমি কোন টু শব্দ না করে বাধ্য মেয়ের মত সামনে তাকালাম। ও খুব সাবধানে হারের লকটা থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিলো।
তারপর গলার হারটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে বিছানায় গিয়া বসলো।
আমি গয়নাগুলো গুছিয়ে রেখে ওয়্যারড্রোব থেকে আমার একটা হুয়াইট কালার থ্রি পিস বের করে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষন পর ফ্রেস হয়ে বের হয়ে আসতেই ইমনের দিকে চোখ পড়লো ও ঘোর লাগা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার চাহনী দেখে ও নিচে তাকালো।
আমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে যেতেই ইমন আমাকে বলতে লাগলো,
— আচ্ছা আপনি কি এখন আবার সাজতে বসে যাবেন। প্লিজ যা করার তাড়াতাড়ি করুন। আমার আবার লাইট জ্বালানো থাকলে ঘুম আসেনা। প্লিজ লাইট বন্ধ করে ঘুমাতে আসুন।
আমি ভ্রুকুচকে ইমনের দিকে তাকালাম। এই ছেলে বলেকি? আমি লাইট বন্ধ করে বিছানায় যাবো? তাও আবার এই ছেলের সাথে অসম্ভব।
হঠাৎই দেখলাম দুইটা বালিশ একসাথে লাগানো। এইটা দেখে আমি আবার ঘামতে শুরু করলাম। ইমন আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে বিছানার দিকে তাকালো তারপর দুইটা বালিশ বিছানার দুই কর্নারে রাখলো। তারপর বিশ্বজয় করার হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালো।
— আচ্ছা আমরা কি এক বিছানায় ঘুমাবো?
বোকার মত প্রশ্নটা ইমনের দিকে ছুড়ে দিলাম।
ইমন কিছুটা এদিক সেদিক তাকিয়ে তারপর আমার দিকে তাকালো,
— নাহ, আশে পাশে আরতো কোন বিছানা দেখছি না। তবে হ্যা আপনি চাইলে ফ্লোরে ঘুমাতে পারেণ। সেটা একান্তই আপনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু দয়া করে এই শীতের রাতে আমাকে ফ্লোরে ঘুমাতে বলে লজ্জা দিবেন না।
ব্যাপারটা আমিও বুঝে গেলাম। কিন্তু একটা মাত্র ব্ল্যাংকেট এটা ভাবতেই আমার মাথা ভারী হয়ে উঠছিলো। উহু আর কিছু ভাবতে পারছি না। ইমন কিছুক্ষন আমার দিকে ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে থেকে তারপর বিছানা থেকে নেমে ডোরটা শব্দ করে লক করে দিলো। তারপর সহসাই লাইট টা বন্ধ করে বিছানায় চলে গেল। কেমন আসভ্য রে বাবা মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।
আমি উঠে গিয়ে লাইট টা জ্বালালাম।
— আপনি খামোকা লাইট্টা বন্ধ করতে গেলেন কেন?
ইমন বুঝে গেছে আমি খেপে গেছি তাই গলাটা নরম করে বলে,
— না আসলে আমি ভেবেছিলাম আপনি বোধ হয় ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে বসেই বাকীরাতটা পার করবেন। তাই আরকি। নাহ হয়তো!! মেয়েরাতো এমনি ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে খায়, ঘুমায়, পড়ে আসলে ওইটা ছাড়াতো ওরা অচল। আজকে না হয় আপনি ঘুমালেন। অবশ্য আগেও এমন অভ্যাস আপনার আছে কিনা সেটা আমার জানা নেই। যাই হোক কুল ডাউন।
আমি রাগে গজ গজ করতে করতে আলমারি থেকে একটা কোলবালিশ নিয়ে বিছানার মাঝখানে রাখলাম। তারপর ব্ল্যাংকেট গায়ে দিয়ে এক কর্নারে শুয়ে পড়লাম।
ইমন বেচারি আবার লাইট অফ করতে গিয়ে আবার কি মনে করে যেন ফিরে আসলো।
ব্যাগের চেইন খুলার শব্দ পেলাম। তারপর হালকা কেশে আমার দিকে ঘুরে বলতে লাগলো,
— এক্সিউজ মি, আপনি কি ঘুমিয়ে গেছেন।
— হ্যা ঘুমিয়েছি। কিছু দরকার হলে বলতে পারেন।
— ওহ আই সি আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও তাহলে কথা বলতে পারেন। ভালো তো আপনারতো গিনেজ বুকে নাম উঠার কথা।
এরকম প্রতিভা কয়জনের থাকে বলুন।
আমি এক লাফে শুয়া থেকে উঠে বসলাম।
— আপনি জানেন কি না জানিনা। তবে আপনি একটা চরম বিরক্তিকর পারসোন।
ইমন আমার কথায় হয়তবা খুবি আহত হলো।
— আসলে আপনার নামটা আমি ভুলে গেছি। কেউ যদি আপনার নামটা জিজ্ঞাস করে। আর না বলতে পারলে ব্যাপারটা খুবি হাস্যকর হবে।
— ওহ গড এখন এইটাই শোনার বাকী ছিল।
আদৃতা এবার হয়েছে..
আমি আবার কম্বল গায়ে দিয়ে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
— আসলে হয়েছে কি?
আমি ভ্রুকুচকে ওর দিকে তাকালাম।
ইমন একটা ডায়মন্ড রিং এর বক্স বের করে আমার সামনে ধরলো।
— নিন, ধরুন এটা আপনার। মা এইটা আপনাকে দিতে বলেছে।
ওর ওই দেয়ার ভঙ্গী আর মা দিতে বলেছে কথাটা শুনেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
— এইটা আমার লাগবে না। রেখে দিন..
আর কেন দিতে বলেছে?
— কেন দিতে বলেছে সেটা আপনি জানেন না?
— নাহ জানিনা।
বলেই আমি শুতে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ করেই ইমনের বলে উঠল,
— আদৃতা রিংটা পরে নাও প্লিজ। তুমি করেই বলছি কারণ এমনিতেও আমার থেকে বয়সে ছোট হবা।
আমি ওকে ইগ্নোর করে শুতে যাচ্ছিলাম তখনি আমার হাত ইমন টেনে ধরলো। আমি কেপে উঠি। তারপর আস্তে আস্তে ইমনের ওই অদ্ভুত সুন্দর নীল চোখের দিকে তাকাই।
ইমন আমার দিকে কোন মনোযোগ না দিয়েই বক্স খুলায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। তারপর রিংটা আমার আংগুলে পড়িয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ে। আমি আমার রিং পড়ানো হাতটা অন্য হাত দিয়ে ধরে অদ্ভুত ভালোলাগায় ভেসে যেতে লাগলাম। ইমনের সেইদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ও লাইট বন্ধ করে দিয়ে বিছানার এক কোণায় শুয়ে পড়লো।
আমার কেন যানি ঘুম পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে সময় যদি থমকে যেত এই ভাললাগার মূহূর্তটা যদি শেষ না হতো
(চলবে)