তোমাতে আমাতে ২ পর্ব-০১

0
1198

# তোমাতে_আমাতে ২
লেখা আশিকা জামান
পর্ব ০১

সোনালি রঙা শাড়ীতে নিজেকে জড়িয়ে যেন নিজেকেই চিনতে পারছিনা । কপালের টিপটার জন্যই বোধ হয় বড্ড মোহনীয় লাগছে । কি জানি কানের বালি জুড়াও বোধ হয় নজকাড়া। হাতের
চুড়িগুলোর রিণিক ঝিনিক শব্দেও কি ইমনের রোমান্স পায়না। আচ্ছা ইমনের পায় টা কি?
বড্ড হাসি পাচ্ছে। হয়তোবা দুনিয়ার সব থেকে অদ্ভুত মানুষ আমি! নাহলে ইমনের এত অগোছালো, এলোমেলো লাইফটাকে কেউ নিজের করে নিতে পারে!
আমি চারপাশটায় মনোযোগ দিতে লাগলাম। সবাই সবার পার্টি লুক নিয়েই যে যার মত ব্যাস্ত। এই এতো সুন্দর সাজানো গোছানো মুখের পিছেনেও আরেকটা মুখ রয়েছে। ওই মুখের সাথে এই মেকি সাজসজ্জায় আচ্ছাদিত মুখের বড্ড অমিল। ওই মুখের চারপাশটা এতো হাসোজ্জ্ব্যল থাকে না। থাকে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, গ্লানি, ক্লেষ, বিরহ, অশ্রু গাথা।
হুট করেই মনে বিষাদবেলার উপখ্যান, নাহ্ বড্ড বেমানান। তবুও মাথায় চড়ে বসলো।
দুচোখের কোণে আচমকা জল গড়িয়ে গাল বেয়ে পড়ার আগেই কারো স্পর্শে তা মুছে যায়। হ্যা এ আমার ইমনের স্পর্শ! বড্ড চেনা স্পর্শ।
” আদি তুমি কাঁদছিলে কেন? সিরিয়াসলি আজকে কি কাদাঁর দিন।”
” কেন আজকে কি কাদাঁর দিন নয়?”
কপট রাগ দেখিয়ে বললাম।
” ওহ হ্য, আজকে তো কাদাঁর দিন! ইশ্ মনে ছিলোনা। তাছাড়া মনে থাকবে কি করে আমাদের বিয়ের সময় কি কেঁদেছিলা? কই কোন কান্নাটান্না তো করনি?
তাছাড়া আজকেতো তোমার ভাবি কাদঁবে? চলে যাওয়ার সময় কেঁদে টেদে কাজলের কালি সারা গালে মেখে পরে না বাড়ি যাবে? সিরিয়াসলি তখন কি সুইট টা না লাগবে?”
ইমন দাত কেলিয়ে হাসতে লাগলো।
সত্যিই ওর কাছে কিছু আশা করাটাই ভুল। একেতো লেট করে এসেছে। একমাত্র সুমন্ধীর বিয়ে তাও উনি এসেছেন সোজা বিয়ের দিন! তারপর আমার বিরহের হদিস উনার বড্ড অজানা । আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমাকে কেমন লাগছে এটাও উনি বলতে পাচ্ছেন না। কিন্তু আমার ভাবীকে কেমন লাগবে সেটা উনার কল্পনায় ঠিকি আকাঁ হয়ে গেছে। এতো দুঃখ রাখি কোথায়?
“আচ্ছা ভাবীকে এতো সুইট লাগবে তো ভাবীর আচল ধরেই দাঁড়িয়ে থাকোনা।
আমার কাছে কি?”
” নাউযুবিল্লাহ! ওটা তোমার ভাইকেই মানায়। আমি বরং নিজের বউ এর আচলটাই ধরি কেমন!”
ইমন খপ করে এসে সত্যি সত্যি আচল ধরে ফেললো।
” এই করছোটা কি? চারপাশের মানুষজন দেখছে। ছিঃ সবাই কি ভাবছে তারউপর আমি বরের বোন। ইমন ছাড়ো বলছি।”
” ওয়ান কন্ডিশন!”
” কি?”
” আগে বলে তুমি আমার উপর রেগে নেই?
আমি জানি তোমার রাগ করাটা স্বাভাবিক। তবুও সরি। হস্পিটাল ক্লিনিক সব মিলিয়ে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছি, তোমাকে বোঝাতে পারবোনা আমি ঠিক কতোটা বিজি। তাই ছুটিও নিতে পারিনি। ”
” আমি রেগে নেই। হয়েছে এবার ছাড়। আচ্ছা তুমি এখানে থাকতে পারবেনা ভাল কথা , তাহলে শুধুশুধু আমাকে একা কেন পাঠালে?”
” ও মা পাঠাবো না। তোমার ভাই এর বিয়ে! বাপের বাড়ীতে থেকে কয়টা দিন আনন্দ ফূর্তি করবে এতে আবার দোষের কি?”
ইমন আচল ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াল।
” হুম খুব দোষের? আমি তোমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারিনা তুমি বোঝনা। যাও সরো সামনে থেকে।”
আমি হনহন করে পেছন দিকে হাটাঁ দিতেই ইমন দৌড়ে এসে খপ করে হাতটা ধরে ফেলে।
” এই যাচ্ছ কোথায়?
তুমি বললেটা কি?
মাথাটা নষ্ট করে দিয়ে এখন আবার চলে যাওয়া হচ্ছে?”
” দেখছোনা সবাই খেতে ডাকছে? খাইতে যাব খিদা লাগলে আসো?”
” উঁহু চল বাসায় যাই ঘুমাবো। অনেকদিন একসাথে ঘুমাইনা। বড্ড ঘুম পাচ্ছে চল! চল।”
” মানেটা কি?”
তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? এখন কি বাসায় যাওয়া পসিবল।”
” হুম চাইলেই সম্ভব!”
তারপর বিড়বিড় করে বললো,
” মানুষ হয় বউ পাগলা আমার আদি হয় জামাই পাগলা। তাই আরকি নিজেও পাগল হচ্ছি”
জীবনেও মানুষটার আক্কেল হবেনা। কোথায় কখন কি বলতে হয় বোধ বিবেচণা সত্যিই নেই।
আমি চরম রেগে গেছি। চুপচাপ খেতে বসে গেলাম। ইমন বেচারাও লেজ গুটিয়ে আমার পাশে বসে পড়লো।
একটু পরেই ভাবির ছোট ভাই নীরব ভাইয়া দৌড়ে আসে আমাদের দিকে। আমার সাথে সাথে ইমন ও অনেকটা অবাক বনে যায়।
নীরব ভাইয়া সহাস্যে বলে উঠলেন,
” আদৃতা, আপনি এখানে কেন? আপনারতো ভাইয়া ভাবীর পাশে বসার কথা। প্লিজ ওখানে গিয়ে বসুন। আপনাদের জন্য স্পেশালভাবে সবকিছু অ্যারেন্জ করা হয়েছে।”

” আমি এখানেই ঠিক আছি।”

তারপর ইমনের দিকে তাকিয়ে উনি বলে উঠলেন,
” এই যে ভাই, আপনি এখানে বসে আছেন কেন বউকে নিয়ে যেতে পারছেন না।”
ইমন আমার দিকে ভাবলেশহীনভাবে তাকায়। তারপর বললো,
” আদি, উনি ঠিকিতো বলছেন চলো! চলো।”
ইমন আমাকে রেখেই উঠে পড়লো। আমি ঠাই বসে থাকলাম।
” এই যে , আপনি এভাবে বসে থাকবেন না প্লিজ বোন বলছি উঠেন..”
নীরব ভাইয়া আচমকা আমার হাত ধরে চেয়ার থেকে টেনে তুললো। আমি অবাক হওয়ার সপ্তম চূড়ায় পদার্পন করতে গিয়েও ইমনে ভয়ে কুঁচকে গিয়ে ওর মুখের পানে তাকাই।
ইমনের চোখে মুখের যাওয়ার ইশারা পেতেই আমি নীরব ভাইয়ার হাত ছাড়িয়ে বলে উঠলাম।
” আপনি যান আমরা আসছি।”
উনি চলে যেতে লাগলে উনার পিছুপিছু আমরাও স্টেজের সাইডে যেখানে বর-বউ এর জন্য খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে সেখানে ঠিক ভাইয়ার পাশে বসে পড়লাম। আমাদের পাশে পেয়ে ভাইয়া যেন হালে পানি পেলো। আমি চারপাশটায় তাকালাম শ্যালিকাদের অত্যাচারে ভাইয়ার অবস্থা নাজেহাল। ইউশাকে দেখলাম সবার সাথে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। এতোক্ষণ প্রানবন্ত থাকলেও আমাদের দেখেই যে ও কিঞ্চিৎ চুপসে গেল এটা বুঝতে বেশি একটা বেগ পেতে হয়না।
আমাদের ফ্লোরের নিচের স্বচ্ছ কাচটায় ইমন ইশারা করতেই আমি নিচে তাকালাম। অ্যাশ ব্লেজার সাথে পেস্ট টাই পাশে বসা সুন্দরি তরুণী বধু নিজেদের দেখে নিজেরাই মুগ্ধ বিস্ময়ে চোখাচোখি করলাম। আবার নীল চোখের প্রেমে পড়ে গেলাম। অবশ্য ঐ চোখের মাঝে অন্তকাল নিদ্বিধায় হারাতে কোন বাধা নেই।
হুট করেই ইউশার বলা একটা কথায় দুজনেই হকচকিয়ে উঠি।
” ইমন তোমাকে খুব হ্যান্ডসাম লাগছে। ”
ইমন ভাবলেশহীন ভাবে একবার আমার দিকে আরেকবার ইউশার দিকে তাকালো।
আমি ইউশার দিকে আড়চোখে তাকাতেই সহাস্যে বলে উঠলো,
” ইউ আর লুকিং গরজিয়াস। মেড ফির ইচ আদার।”
ওর হাসিটা যে মেকি ছিলো ওটা ইমনের মত গাধাটা না বুঝলেও আমি বুঝে গেছি।
জানিনা আমার কি রিএক্ট করা উচিৎ। তবে অদ্ভুতভাবে আমি রেগে গেলাম। তবে সেটা বাহিরে প্রকাশ করলাম না। আমিও মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুললাম। হঠাৎই ইমন আমাকে অবাক করে দিয়ে ইউশাকে বলে উঠলো,
” তোমাকেও বেশ সুন্দর লাগছে।”
আমি সহ্যের সীমা মেবি তখনি পার করে ফেললাম। তবুও আমি বরাবরের মত আঘাত পেয়ে চুপসে খেলাম। চুপচাপ খাবার খেতে লাগলাম। খাওয়ার এক পর্যায়ে ইমন আমাকে খাইয়ে দেয়ার জন্য হাত উপরে তুলতেই আমি ইশারায় চোখ রাঙিয়ে নিষেধ করি। আমার সবার সামনে এই আদিখ্যেতা মোটেও প্রছন্দ হচ্ছেনা।
ভাইয়ার শালিকারা আমাদের এই দৃশ্য দেখে হেসে ফেললো। নবনী তো বলেই ফেললো,
” আদৃতা আপু, ভাইয়া আশা করেছে একটু মুখে নেন। সমস্যা নাইতো। এই দেখুন আমরা চোখ বন্ধ করলাম।”
সবাই মুহুর্তের মাঝেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
আমি চরম রাগে উঠে পড়লাম।ইমন হতবিহ্বল হয়ে আমার দিকে তাকালো।
এই মানুষটা জীবনেও মানুষ হবেনা যখন তখন সবার সামনে আমাকে লজ্জায় ফেলে দেয়।
আমি ফুঁসতে ফুঁসতে ওখান থেকে চলে আসলাম।
ভাইয়া আমাকে পেছন থেকে ডাকলেও আমি সাড়া দেইনি। ভাবি নবনীকে ইচ্ছেমত বকে ওখানের পরিবেশ পুরা নিশ্চুপ বানিয়ে দেয়।
ইমন একটুপরেই লেজ গুটিয়ে আমার কাছে এসে বসে।
চলবে..