তোমাতে আমাতে ২ পর্ব-০৪

0
647

#তোমাতে_আমাতে ২
পর্ব ০৪
লেখা আশিকা

মা শত কাজ ফেলে শুধু আমাদের জন্যেই যে টবিলে বসে আছে, এটা আমি ভালোভাবেই বুঝি। আমি একবার ইমনের দিকে তাকাই, ও একমনে খাচ্ছে আর হঠাৎ হঠাৎ টুকটাক এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে মাকে।
আমি না তাকিয়ে নিজের খাওয়াই মনযোগ দিলাম।
হুড়মুড়িয়ে ভাইয়া আর ভাবী টেবিলে এসে বসলো। আমিতো ওদের দিকে লজ্জায় তাকাতেই পারছি না। তারউপর ভাবী যেভাবে মুখিয়ে আছে, নির্ঘাৎ কিছু একটা বলে বসবে। ইমনের দিকে তাকালাম, ওর বিন্দুপরিমাণ ও ভাবান্তর হলো কি না কে জানে?
” কি ননদিনী আমাকে বাসায় এনে, নিজে ঠিক দরজা আটকে বসে থাকলে। এটা কিন্তু ঠিক না।আফটার অল, আমি তোমার একমাত্র ভাবী।
তাছাড়া তুমিই ঠকেছো আমার আর কি?
কি বলো আহির?”
আমি কিছু একটা বলতে যাবো তার আগেই ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
” আমি আর কি বলবো? যেখানে মাই আমাকে পর করে দিয়ে তার একমাত্র আদরের জামাইকে পরম যত্নে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে। সেখানে আমি নির্বাক।”
” আহা! আপনারাও বসুন না। এই যে কত কত খাবার পড়ে রয়েছে। প্লিজ নিননা। আমার ভালো লাগবে।”
ইমন তার সহজাত হাসি ঝুঁলিয়েই কথাটা বললো।
” না ভাই আপনিই খান। আমরা যথেষ্ট সময় সচেতন, সকালেই ব্রেকফাস্ট করি।
এই সদুরে ব্রেকফাস্ট করার কোনই ইচ্ছা নাই।”
ভাবী একরকম ঠোট বাঁকিয়েই কথাটা বললো।

” এক্সিউজ মি ভাবী, এই সদুরের মানে কি?
আসলে আমার বুঝতে একটু অসুবিধে হচ্ছে।”
আমরা সবাই বেশ উৎসুক হয়ে ভাবীর দিকে তাকাই। এররকম শব্দ জীবনে কোনদিন শোনিনি।
” অসুবিধেরতো কিছু নাই। না সকাল না দুপুর ওই এক্সাট সময়টাকেই আমি সদুর বলি।”
” ওহ আচ্ছা আপনি যখন বলেন তখন ঠিকাছে।”
” হুম আমি অলওয়েজ ঠিকই বলি।”
” তাতো বটেই। ”
কথাটা,বলেই ইমন এমনভাবে হাসলো যেন এমন মজার কথা সে জীবনে শুনেনি।
” মা, আমি কিন্তু খেয়ে একটুও দেরি করবোনা এখনি বেরিয়ে পড়বো। ”
আচমকা এই কথাটা শুনেই মনটা যেন কেমন করে উঠলো। এখনি যেতে হবে? কই আমাকেতো আগে থেকে কিছু বললোনা। চাপা অভিমান কাজ করতে লাগলো।

” সে, কি এখনি যাবে? এটা কেমন কথা হলো। উঁহু এখনতো যেতেই দিচ্ছিনা।
মা কিছু বলে তোমার জামাইকে আটকাও।”
ভাইয়ার কথায় মা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ইমনের দিকে তাকায়।
ইমন মায়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠলো।
” মা, আমাকে কিছুতেই এমন কিছু বলবে না যাতে আমি কাজ ফেলে থেকে যাই। ঠিক না মা।”
” আসলে, তোমরা ভালো আছো এরথেকে বেশি
কিছু বোধ হয় আমার চাওয়ার নেই। এই যে তুমি খুব একটা আসোনা এটা নিয়ে আগে আমার খুব মন খারাপ হতো। কিন্তু এখন আর হয়না। ওই যে, একটু আগেই যে শান্ত্বনার বাণী শোনালাম ওটারই সদ্ব্যবহার করি সময় সুযোগে।”
এই পর্যায়ে সবাই চুপ করে যায়। ভাবী পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বলল,
” আপনার যেখানে খুশি যান। আদৃতা যাচ্ছেনা। এটাই ফাইনাল।
আমার ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন জানেন? ”
” না বললে, জানব কি করে?”

” এই ধরুন, আদৃতা আমাকে হাতে ধরে ধরে সব দেখিয়ে দিবে কোথায় কি আছে না আছে? দুই বোন মিলে জমিয়ে রান্না করবো, শপিং এ যাবো, অবসরে গল্প করবো, টিভি দেখবো , মাঝেমাঝে একটু চুলোচুলি করবো। উফ কি মজা হবে বলুনতো।”

” তা ঠিকি আছে। শুধু ওই চুলোচুলি জীনিসটা,বাদ দিলে ভালো হয়না।”
” না মোটেও ভালো হয়না । আমার কতোদিনের শখ আপনি জানেন?”
” বেশ কথা যখন শুনবেননা। তখন ন্যাড়া মাথায় আজীবন থাকার জন্য প্রিপারেশন নিতে থাকুন।
আমার বউ আবার চুলোচুলিতে এক্সপার্ট। এই আমার চুল দেখেতো একটু আন্দাজ করেও নিতে পারেন।”
ভাইয়া আর ভাবী মুখ টিপে হেসে আমার দিকে তাকালো।
আমি চেয়ার ছেড়ে সোজা উঠে পড়লাম।
” মা, তুমি কি ইমনকে চুপ করতে বলবে। কিসব বলছে শুনতে পাচ্ছোনা? আমি চুল ছিঁড়ি! চুলোচুলি করি! ”
” হ্যা করোইতো ভুল কি বললাম।”
” না, তুমি সব ঠিক বলেছো। আগামী ১২ ঘন্টার আগে আমার সামনে আসলে চুল একেবারে ন্যাডা করবো তাও মুড়া মরচে ধরা ব্লেড দিয়ে মাথায় থাকে যেন।”
রাগে গজগজ করতে করতে রুমে চলে আসলাম। অবশ্য রুমে এসেও আমি ইমুতেই ডুবে আছি। তবে ভাববার মত বিষয় হল ও যদি সত্যিই ১২ ঘন্টার পূর্বেই আমার সাথে কথা বলতে আসে তবে কি আমি সত্যিই. ওর মাথা ন্যাড়া,করে দিব?’ আচ্ছা ইমনের চুলগুলো সব নাই হয়ে ন্যাড়া বনে গেলে ঠিক কেমন লাগবে!
আমি আর কল্পনা করতে পারলাম না কি বিচ্ছিরি লাগছে!
আমি ন্যাড়া জামাই নিয়া ঘুরতে পারবোনা।
বেশ কিছুক্ষণ পর, মা এসে ডাকলেন। কারণ হলো ইমন চলে যাচ্ছে সত্যি সত্যি! আর আমাকে বলে যাওয়ার মত সাহস করে উঠতে পারছেনা। এখন আমি কি ওকে বিদায় দিতে যাব নাকি এখানেই পড়ে পড়ে শুয়ে থাকবো এটাই জানতে এসেছিলো।
স্বামী চলে যাবে আর বউ স্বৈরাচারীর মত নিজের জেদ ধরে বসে থাকবে! এ হতেই উউপারেনা।
আমি উঠে একদম লাগেজ গুছিয়ে ড্রয়িংরুমে আসলাম।
ইমন তখন মেইন দরজা পার হবার উপক্রম। আমাকে দেখেই সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
আমি কিছু বললাম না শুধু একবার বিড়বিড় করে বললাম,
” ইমন, লাগেজটা কি আমিই বহন করবো।”
ও চমকপ্রদ হয়ে আমার দিকে ঘুরে তাকাতেই আমি সিঁড়ি দিয়ে গটগট করে নিচে নেমে এলাম।
আমাকে গাড়িতে বসিয়েই প্রথম যে কথাটা বললো তা হলো,
” আদি, এভাবে চলে আসলে যে? আমি কিন্তু সত্যি তোমাকে আসতে বলিনি।”
” খাটাশ রা তো বউ ছাড়া থাকতেই বেশী প্রছন্দ করে। বিয়ে করেও নিজেদের ব্যাচেলরের মত ভাবতে তারা বেশ সুখী সুখী ফিল করে।”
কথাটা বলেই ওর কলার টেনে বললাম,
” তোমারো নিশ্চয় এমন বিবাহিত ব্যাচেলর হওয়ার ইচ্ছে।”
” অসম্ভব পাগল নাকি! এমন দজ্জাল বউ থাকলে, এসব মাথায় আসার আগেইতো মাথা কেটে যাওয়ার কথা।”
” হুম, মনে থাকে যেন।”
বলেই ওকে ছেড়ে দিলাম।
বাসায় এসে মামনীতো আমাকে দেখেই ভীষণ খুশি হলেন। এসেই উনার গপ্পো’র তালে পড়তে হলো।
কি হলো, না হলো সবটা উনাকে শুনাতে হবে এই দুঃখে আমি তখনি আধমরা হয়ে গেলাম। অবশ্য ইমনের কাছে যেতে পারছি এই জন্যেই কষ্টটা বেশী হচ্ছে। ওর আবার ফ্রেস হয়ে এখনি বেরোবার কথা।
কিন্তু না মামনী আমাকে অবাক করে দিয়ে নিজেই বললেন,
” আদি, যা মা একটু ঘরে যা। এসে থেকে আমার কাছেই বসে আছিস। ইমনটা আবার এখনি বের হবে। গিয়ে দেখ কি লাগে না লাগে। ”
আমি সানন্দে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে নিজের রুমে যাই। ততোক্ষণে নিজের রুমের চেহারা দেখে নিজেরই করুণা হতে লাগলো।
পুরো বিছানা গুটিয়ে আবার মাঝখানে দরবেশ বাবার মতো ইমন গালভারী করে বসে আছে।
” আদি, তোমার মধ্যে রেসপনসিবিলিটির অনেক অভাব আছে? সেই কখন থেকে আমি একা রুমে কোন খেয়াল আছে?”
” তা বেশ, তুমি একা রুমে। তাই বলে ঘরের উপর অকাম করতে কে বলেছে। আর কাজ খুঁজে পাওনি। তুমি চলে গেলে আমার কত টাইম ওয়েস্ট হবে এই ঘর গুছাতে কোন আইডিয়া আছে? উফ্ আজকে পল্টুর মাওতো নেই। একা একা সব করতে হবে। ”
আমি মাথায় হাত দিয়ে বিছানায় বসে পড়লাম।
ইমন পেছন থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ দুজনেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। কিছুক্ষণ দুজনেই নিশ্চুপ। তারপর ও বললো,
” আদি, দুঃখ করোনা। আমি যা করি তোমার ভালোর জন্যই করি। এই ধরো আমি এখন চলে যাবো, তোমার খুব একা একা লাগবে। তুমি কি করবে? তুমি ঘর গুছাবে আর আমার কথা মনে করবে। ভাল হবেনা।”
আমি ভ্রুকুচকে ইমনের দিকে তাকাই। কেমন যুক্তিরে!
” তুমি আমাকে ছাড়ো আর হসপিটালে যাও। তুমি মোটেও ঠিক কাজ করোনি।”
“আচ্ছা তাহলে এবার ঠিক কাজটাই করি!”
ইমন আমাকে কপালে চুমো চুমো দিতে দিতে কথাটা বললো।
হৃদয়জুড়ে এক অনাবিল প্রশান্তির ঝড় বয়ে যেতে থাকলো। বারবার ইচ্ছে হয় অনন্তকাল নীল চোখের গভীরতায় হারিয়ে যেতে…
চলবে