দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-০১

0
370

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১
#দিশা_মনি

১.
বাসর রাতে মুসকানের কোলে ৬ মাসের একটি ছোট বাচ্চাকে তুলে দিলো তার সদ্য বিবাহিত স্বামী আরিফ। অতঃপর কঠিন স্বরে বলে উঠল,
“আপনাকে আমি বিয়ে করেছি শুধুমাত্র যাতে করে আপনি এই বাচ্চাটার দায়িত্ব নিতে পারেন। আমার কাছ থেকে আর বেশি কিছু আশা করবেন না। আমাদের মধ্যে কোন স্বাভাবিক দম্পত্তির মতো সম্পর্ক হবে না কখনোই।”

মুসকান হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আরিফের দিকে। তার মনের মাঝে তিক্ত অনুভূতি খেলে যেতে লাগল। মুসকান বরাবরই স্পষ্টভাষী মেয়ে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেও কখনো পিছপা হয়না সে।

আরিফের কথার প্রতিবাদে তাই সে বলে উঠল,
“আপনি কি বলছেন এসব? আপনার সাথে বিয়ে হয়েছে আমার। আমি এখন আপনার স্ত্রী। আপনি এভাবে বলতে পারেন না আমায়।”

“এই বিয়েটা আমি নিজের ইচ্ছায় করিনি বুঝলেন? আর আপনি এত বড় গলায় কথা বলছেন কেন? আপনার তো আমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। আমি যদি আজ আপনাকে বিয়েটা না করতাম তাহলে তো আপনার মা-বাবার ঠিক করা ঐ থুত্থুরর বুড়োকে বিয়ে করতে হতো।”

মুসকানের রাগ এমনিই বেশি। আরিফের কথা শুনে তার ভীষণ রাগ হতে লাগল। মুসকান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এমনভাবে বলছেন যেন বিয়ে করে উদ্ধার করে দিয়েছেন আমায়। আপনি বিয়ে না করলে আমি বোধহয় মরে যেতাম। শুনুন আমার অন্য প্ল্যানিং আগে থেকেই রেডি ছিল। নেহাতই আমি ম্যাডামের কথা ফেলতে পারি নি তাই..”

মুসকান এত জোরে কথা বলছিল যে তার কোলে থাকা বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙতেই সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। আরিফ তড়িঘড়ি করে মুসকানের কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিজের কোলে তুলে নেয়। তবুও তার কান্না থামে না। বাচ্চাটার কান্না থামানোর জন্য তাকে নিয়ে বেলকনির দিকে যেতে থাকে আরিফ। যেতে যেতে মুসকানের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,
“দিলেন তো আমার রুহিকে কাঁদিয়ে। অসহ্য!”

মুসকান ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে রইল। এরইমধ্যে হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে ছুটতে তাদের রুমে চলে আসলো আতিকা চৌধুরী, আরিফের মা। আতিকা চৌধুরী রুমে এসেই মুসকানের উদ্দ্যেশ্যে বললেন,
“কি হয়েছে মুসকান? সবকিছু ঠিক তো। কান্নার আওয়াজ শুনলাম। রুহি কি জেগে গেছে? কোথায় ও?”

মুসকান শুকনো মুখে উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ ম্যাডাম রুহি জেগে গেছে। আপনার ছেলে রুহিকে নিয়ে বেলকনির দিকে গেছে।”

মুসকানের মুখের দিকে তাকিয়ে আতিকা চৌধুরী বুঝতে পারলেন কিছু একটা ঝামেলা তো হয়েইছে। তাই তিনি মুসকানকে শুধালেন,
“তোমাকে এরকম লাগছে কেন? আরিফের সাথে কি কোন ঝামেলা হয়েছে?”

মুসকান কোন কথা লুকিয়ে রাখার মতো মেয়ে নয়। তাই সে আতিকা চৌধুরীর সামনে সব কথা বলতে লাগল,
“আপনার ছেলে আমায় বলছিল আমাকে শুধু রুহির দেখাশোনার জন্যই বিয়ে করেছে। আমি যেন ওনার থেকে আর বেশি কিছু আশা না করি।”

“তুমি তো জানোই আরিফের ব্যাপারটা। রুহি হলো আমার মেয়ে সুহানির সন্তান। দুই মাস আগে আমার মেয়েটা…”

কথা বলতে বলতে কেঁদেই দিলেন আতিকা চৌধুরী। তাকে কাঁদতে দেখে মুসকানেরও বেশ খারাপ লাগল। মুসকান আতিকা চৌধুরীর সামনে এসে তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
“আপনি কাঁদবেন না ম্যাডাম। আমি সবটাই জানি। আপনার মেয়ে একটা দূর্ঘটনায় মা*রা গেছে। আর আপনার মেয়ের নিষ্ঠুর স্বামী আপনার মেয়ের মৃত্যুর মাস ঘুরতে না ঘুরতেই দ্বিতীয় বউ ঘরে তুলেছে। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় বিয়ের পর ছোট বাচ্চাটার প্রতিও অযত্ন করেছে। তাই আপনার ছেলে গিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে এসেছে।”

আতিকা চৌধুরী আফসোসের সুরে বলেন,
“সবই তো তুমি জানো মুসকান। তাই আরিফের মনের অবস্থাটাও বুঝতে পারছ।”

“ম্যাডাম আপনি কেন আপনার ঐ রাগী, নাক উঁচু ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিলেন বলুন তো!”

“কি করতাম বলো। তোমার মতো এত মেধাবী, সম্ভাবনাময় একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ তো আমি ন*ষ্ট হতে দিতে পারতাম না। আমাদের কলেজের অন্যতম মেধাবী ছাত্রী তুমি। যখন আমি জানতে পারি তোমার সৎ বাবা টাকার লোভে এক বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছে তখন জানো আমার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠেছিল। তখনই আমি আরিফকে সাথে নিয়ে ছুটে যাই ওখানে। আর গিয়ে বিয়েটা থামানোর কোন উপায় ভাবি। তুমি তো দেখেইছ বিয়েবাড়িতে উপস্থিত সবাই কিভাবে চড়াও হয়েছিল আমাদের উপর। যখন আমি বিয়েটা বন্ধ করতে চেয়েছি তখন সবাই বলেছে এভাবে আমি বিয়েটা ভাঙতে পারি না। আর তোমার সৎ বাবাও তো ঐ বৃদ্ধ লোকটার সাথে তোমার বিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল। বিয়েটা না হলে যে উনি তোমার দায়িত্ব আর নেবেন না এটাও বলেছিল। আমি সেইসময় তোমাকে নিজের সাথে নিয়ে আসতে চাই। তখন অনেকেই অনেক কথা বলে যে আমি কোন পরিচয়ে তোমাকে নিয়ে আসব। তাছাড়া আমার বাড়িতে একটা জোয়ান ছেলেও আছে। সেই সময় আমার কাছে এছাড়া কোন উপায় ছিল না। আমি আরিফকে বলি তোমাকে বিয়ে করার কথা। আরিফ তো প্রথমে রাজিই হচ্ছিল না। আমি তখন ওকে বলি রুহির জন্য তো একটা মায়ের মতো কাউকে দরকার। যতই আমি বা আরিফ ওকে দেখে রাখি না কেন ওকে দেখে রাখার জন্য মায়ের মতো কাউকে তো দরকার। তখন গিয়ে ও রাজি হয়।”

দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মুসকান। এইসব কোন কিছুই তার অজানা নয়। সবই সে জানে। তবুও আরিফের ব্যবহার তাকে মন থেকে শান্তি দিচ্ছিল না। আতিকা চৌধুরী মুসকানকে পুনরায় শোধায়,
“আচ্ছা, তোমার মা কি কিছু বলে নি তোমার সৎ বাবাকে? উনি কিভাবে এইরকম একজন বৃদ্ধের সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করল।”

মুসকান বিদ্রুপাত্মক হেসে বললো,
“মা তো আমার সেদিনই পর হয়ে গেছিল যেদিন তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। আমার সৎ বাবার হ্যাঁ তে হ্যাঁ এবং না তে না মেলানোই তার কাজ। উনি তো আমাকেও এটা বোঝাতো যে আমার সৎ বাবা আমার দায়িত্ব নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে দিয়েছে।”

আতিকা চৌধুরীর ভীষণ কষ্ট লাগলো মেয়েটির কথা ভেবে। সত্যিই মেয়েটি খুবই হতভাগ্য। অথচ এই মেয়ে অনেক প্রতিভাবান। পড়াশোনায় যেমন ভালো, তেমনই ভালো গানের গলা। তাছাড়া এই মেয়েটির প্রতিবাদী ও স্পষ্টবাদী মনোভাব আতিকা চৌধুরীকে মুগ্ধ করে। তাই তো তার মনে মেয়েটির জন্য অন্যরকম স্থান রয়েছে।

মুসকান মনে মনে কিছু চিন্তা করছিল। চিন্তা শেষে আতিকা চৌধুরীকে শুধায়,
“আচ্ছা ম্যাডাম আপনার ছেলে এমন কেন? বিয়ে করার পরও কেন উনি আমায় মানবেন না বলছেন। আমাকে নিয়ে ওনার কি সমস্যা?”

আতিকা চৌধুরী উদাস হয়ে বললেন,
“তোমাকে নিয়ে ওর কোন সমস্যা নেই মুসকান। আসলে ও বিয়ের সম্পর্কে বিশ্বাসই হারিয়ে ফেলেছে।”

“মানে?”

“আমার আর ওর বাবার প্রেমের বিয়ে ছিল। কিন্তু আমাদের সংসার জীবনটা মসৃণ ছিল না৷ ছোটবেলা থেকে আরিফ আমাদের দুজনকে শুধু ঝগড়া করতেই দেখেছে। আর তারপর তো আরিফের বাবা আমাকে তালাক দিতে নতুন করে সংসার পাতলো। আর আমার মেয়ে সুহানি…সেও তো ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। অথচ বিয়ের পর তার সংসারেও কোন শান্তি ছিলনা৷ আরিফকে যেই বিষয়টা সবথেকে বেশি আঘাত দেয় সেটা হলো সুহানির মৃত্যুর মাস পেরুতে না পেরুতেই তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে। এসবের জন্যই আরিফের বিয়ে, ভালোবাসা এসবের উপর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।”

মুসকান এতক্ষণ ধরে মনোযোগী শ্রোতার মতো আতিকা চৌধুরীর সব কথা শুনল। আতিকা চৌধুরী মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“তবে তুমি চিন্তা করো না। দেখবে একসময় তোমাদের দুই জনের মিল মোহাব্বত ঠিকই হবে। তোমাদের দুই হৃদয়ের সন্ধি হবেই।”

মুসকান বেলকনির দিকে তাকিয়ে দেখল আরিফকে। অতঃপর বলে উঠল,
“কিন্তু আমি কখনোই ওনাকে জোর করবো না ম্যাডাম। উনি যদি কখনো আমায় মন থেকে মেনে নেন তো ঠিক আছে। না মেনে নিলেও সমস্যা নেই। আপনি শুধু আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দিয়েন। আমি শুধু আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই। একজন ডাক্তার হতে চাই।”

“অবশ্যই। তুমি যতদূর চাও পড়তে পারো। আমার কোন সমস্যা নেই। আরিফও দ্বিমত করবে না।”

মুসকান স্বস্তি পায়।

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨