দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-০৬

0
173

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ৬
#লেখিকাঃদিশা_মনি

আরিফ রুহিকে কোলে নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টায় মগ্ন। এমন সময় রুমে প্রবেশ করলো মুসকান। তাকে দেখে ভীষণ অন্যরকম লাগছিল। আরিফ মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আপনি কি কাঁদছিলেন?”

মুসকান কিছু বলে না। কিছুক্ষণ নির্বিকার চেয়ে থেকে চলে যেতে নেয়। মুসকান রুম থেকে বেরিয়ে গেলে আরিফ সেদিন পানে তাকিয়ে ভ্রু কুচকায়। রুহিকে আলতো করে আদর করতে করতে বলে,
“এই মেয়েটার আবার কি হলো। সকাল থেকে তো ভালোই ছিল। ওনার মা আর সৎ বাবার সাথে দেখা করার পর থেকে দেখছি এমন।”

রুহিকে ঘুমিয়ে পড়লে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয় আরিফ। অতঃপর আলতো করে কাঁথা টেনে দেয়। মুসকান রুমের মধ্যে প্রবেশ করলে আরিফ আদেশের সুরে বলে,
“আমি বাইরে যাচ্ছি। আমার রুহির দিকে একটু নজর রাখবেন।”

মুসকান বলে,
“আচ্ছা, আমি নজর রাখবো।”

আরিফ নিশ্চিত হয়ে নিজের কাজে বেরিয়ে যায়। মুসকান রুহির পাশে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকে। এরমধ্যে রুহি আর জেগেও ওঠে না।

মুসকান একটু বাইরে যায়৷ আতিকা চৌধুরীর রুমে গিয়ে দেখে তিন ভীষণ কাশছেন। মুসকান তার কাছে গিয়ে বলে,
“কি হয়েছে ম্যাডাম? আপনি ঠিক আছেন তো?”

“হ্যাঁ, আমি ঠিকই আছি। শুধু একটু শরীরটা…”

পুরো কথা শেষ না করেই কাশতে শুরু করে দিলেন তিনি। কিছুটা থেমে বললেন,
“শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। কিছু রান্না হয়নি আজ। আরিফটা একটু পরই খেতে চাইবে। বাইরের খাবার তো খেতেও পারে না ছেলেটা। কি যে করি এখন। রান্নার লোকও তো আজ ছুটি নিয়েছে।”

মুসকান কিছুটা ভেবে বলে,
“আপনি এক দম চিন্তা করবেন না। আমি দেখি কি করা যায়।”

“কি করবে তুমি? তুমি তো রান্না করতে পারো না।”

“ইউটিউব দেখে চেষ্টা করব। আপনাকে আর এই অসুস্থ শরীরে রান্না করতে হবে না।”

আতিকা চৌধুরী আর কথা বাড়ান না। মুসকানও চলে যায় রান্না করতে। ইউটিউব দেখে টুকটাক রান্না করতে থাকে সে। রান্না করতে পটু না হলেও ইউটিউব দেখে বেশ ভালোই রান্না করে মুসকান। নিজেই নিজের প্রশংসা করে বলে,
“দেখে দেখে বেশ ভালোই শিখতে পারি আমি।”

★★★
আরিফ বাইরে থেকে এসে সবার আগে নিজের রুমে রুহিকে দেখতে যায়। রুহি বিছানার একবারে সাইডে চলে এসেছিল ঘুমের মধ্যে গড়াতে গড়াতে নিচে পড়ে যাচ্ছিল। এমন সময় আরিফ এসে তাকে ধরে ফেলে। অল্প একটুর জন্য সে বেঁচে যায়। নাহলে তো বেচারি মেয়েটা পড়েই যেত। না জানি এটুকু বাচ্চার কি ক্ষতি হয়ে যেত।

আরিফ আশেপাশে মুসকানকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ রেগে যায়। মুসকান-কেই তো রুহিকে দেখে রাখার দায়িত্ব দিয়ে গেছিল আরিফ। আরিফের সব রাগ গিয়ে পড়ে মুসকানের উপর। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“মেয়েটা এত দায়িত্বহীন কিভাবে হলো? ওনাকে তো শুধু রুহিকেই দেখে রাখতে বলেছিলাম। এই কাজটাই ভালো ভাবে করতে পারল না।”

আরিফ রুহিকে কোলে নিয়ে বাইরে আসতে থাকে। রান্নাঘরে গিয়ে মুসকানকে রান্নায় ব্যস্ত দেখে বলে,
“এই কি করছেন এখানে আপনি?”

“রান্না করছিলাম। কেন? কোন অসুবিধা?”

“আপনাকে কি বাড়িতে রান্না করার জন্য আনা হয়েছে?”

“আপনি কিন্তু আপনাকে অপমান করছেন মিস্টার আরিফ চৌধুরী।”

“আপনাকে সেটাই করা উচিৎ। ইচ্ছা করছে আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দেই।”

মুসকান কোমলে আঁচল বেধে এগিয়ে এসে বলে,
“আপনি কি বললেন আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন? আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না আপনি আমার সাথে এমন ব্যবহার কেন করছেন?”

“আপনাকে বলেছিলাম না, রুহির খেয়াল রাখতে। সেটা না করে আপনি রান্নাঘরে কি করছেন? আরেকটু হলে তো আমার রুহি বিছানা থেকে পড়ে যেত।”

“আসলে ম্যাডাম খুব অসুস্থ আর রান্নার লোকও আজ আসে নি। তাই…”

“তাই আপনি রাধুনির দায়িত্বটা নিয়ে নিলেন। ভালোই তো আজ থেকে আমি বাড়ির রান্নার লোককে ছুটি দিয়ে দিচ্ছি। আপনাকে আর আমার বাচ্চার দায়িত্ব নিতে হবে না। আপনি বরং রান্নার কাজই করুন। বিনিময়ে মাসের শেষে টাকা দেব।”

“যথেষ্ট হয়েছে আমাকে আর অপমান করবেন না। আমাকে কি আপনার বাচ্চার গভন্যান্স পেয়েছেন? যে সবসময় ওকে দেখব। আর রুহি পড়ে যেতে ধরেছিল পড়ে তো যায়নি। আর বিছানা থেকে পড়ে গেলেও কি বা এমন ক্ষতি হতো যে এত রিয়্যাক্ট করছেন। মরে তো যেতো না।”

মুসকানের কথা শুনে আরিফ প্রচণ্ড রেগে গিয়ে মুসকানের গালে ঠা’স করে একটা থা’প্পর বসিয়ে দেয়। মুসকান হতবাক হয়ে যায়। পরপর আরো দুটো থা’প্পর বসিয়ে দেয় আরিফ। আরেকবার থা’প্পর মা’রতে হাত বাড়ালেই মুসকান সেই হাত ধরে বলে,
“খবরদার। এই ভুল আর করবেন না। আমার আত্মসম্মানে আঘাত করেছেন আপনি। আমি আর এক মুহুর্ত থাকব না আপনার বাড়িতে।”

কথাটা বলেই মুসকান দৌড়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। আরিফ নিজেও রাগের মাথায় এমন কিছু করে ফেলবে ভাবতে পারেনি। এখন কি করবে বুঝতে পারে না। রুহিও আচানক কাঁদতে শুরু করে দেয়। আরিফ ভাবে,
“উনি আর কোথায় যাবেন। একটু পর ঠিকই ফিরে আসবেন। এখন আমি রুহিকে সামলাই।”

★★★
মুসকান কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বলে,
“আর ফিরবো না আমি ঐ বাড়িতে। আমার আত্মসম্মান এতটা ঠুনকো নয়। প্রয়োজনে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব তাও চড়-থাপ্প’র খেয়ে ঐ বাড়িতে পড়ে থাকার কথা ভাবব না।”

এসব কথা বলে চোখের জল মুছতে মুছতে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে মুসকান। যে দিকে দু চোখ যায় সেদিকেই যাবার পণ নিয়েছে সে।

★★★
কয়েক ঘন্টা হয়ে গেল মুসকান বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বাড়ি ফেরেনি। শুরুর দিকে পাত্তা না দিলেও আরিফের এখন বেশ চিন্তা হচ্ছে মুসকানকে নিয়ে। আরিফ বিড়বিড় করে বলল,
“কোথায় চলে গেলেন উনি? অনেক ক্ষণ তো হলো এখনো ফিরছেন না কেন। আবার কোন বিপদ হলো না তো? উনি তো চট্টগ্রাম শহরে কাউকে চেনেন ও না। তাহলে যাবেন কোথায়?”

আরিফের এমন চিন্তার মধ্যেই আতিকা চৌধুরী তার রুমে এসে বললেন,
“হ্যাঁ রে, মুসকান কোথায়? অনেকক্ষণ থেকে ওকে দেখছি না।”

আরিফ ভাবল আতিকা চৌধুরী এখন সব জানলে রেগে যাবেন অনেক দুঃশ্চিতাও করবেন। আর মুসকান তো বলছিল তার শরীর নাকি ভালো না। তাই চিন্তা করলে শরীরটা আরো বেশি খারাপ হবে। এসব ভেবে সত্যটা লুকিয়ে বলে,
“উনি একটু পাড়া-পড়শীর সাথে গল্প-গুজব করতে বেরিয়েছেন। তুমি চিন্তা করো না একটু পরেই ফিরে আসবেন।”

আরিফের কথাটা বিশ্বাস হলো না আতিকা চৌধুরীর। তিনি বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কিছু বললেন না। এদিকে আরিফও চুপচাপ ভাবতে লাগল মুসকানের কথা। মেয়েটার কি হলো তাহলে?

এরমধ্যে রুহি কেঁদে ওঠায় রুমে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো আরিফ। রুহির কান্না থামাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। তার মাথা থেকে মুসকানের চিন্তাটাও বেরিয়ে গেল। কিন্তু আতিকা চৌধুরী ভাবতে লাগলেন মুসকান হঠাৎ করে কই চলে গেল। মেয়েটার কোন বিপদ হলো নাতো?

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨