নিরব সে পর্ব-০৪

0
1112

৩য় পর্বের পর থেকেঃ-

”নিরব সে”
#সাদিয়া_সৃষ্টি
৪র্থ পর্ব

সকালে বাড়ি ভর্তি আত্মীয়দের খাবারের ব্যবস্থা করেন ওয়াফিফের মা আফিয়া রহমান, আর তার সাথে আথার মতো লেগে ছিল জিনিয়া। কোন কাজ করুক না করুক, আফিয়ার পিছন পিছন ঘুরে বেড়িয়েছে। আবার একটু আধটু কাজে হাত ছুঁইয়ে দিয়েছে। একবার তো আফিয়ার পিছন পিছন যেতে যেতে বাথরুম অবধি ঢুকে পড়ার অবস্থা তৈরি হতে হতে হয় নি। এতে সে আফিয়া সহ বাড়ির বাকি কর্ত্রী বা মহিলাদের প্রিয় হয়ে উঠেছে। যাই হোক, আজ পর্যন্ত বিয়ের পর কোন নতুন বউ নিজের শাশুড়ির সাথে লেগে থেকেছে? তাদের ছেলের বউ তো এমন করে নি। অনেকে এ নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছে তো অনেকে বলছে – ২ দিন পর এসব চলে যাবে। তখন তার ছেলেও তাকে ভুলে গিয়ে বউ এর আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াবে। এসব শুনে আফিয়া রহমান বাইরে যাই প্রকাশ করুক, ভেতরে ভেতরে বেশ খুশি তিনি। নিজের পছন্দের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে পেরেছেন। এখন শুধু ছেলে আর ছেলের বউ ২ জনেই মায়ের পিছন পিছন ঘুরলেই হল।

আফিয়া রহমানের সাথে জিনিয়ার দেখা সাধারনভাবে হয়েছে। জিনিয়া এক বৃদ্ধ মহিলাকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করছিল, সেই সময় রাস্তার অপর পারে আফিয়া রহমান দাঁড়িয়ে খেয়াল করেছিলেন। কাছেই পার্ক ছিল। সেখানেই ঘুরতে গিয়েছিলেন পরিবার সমেত। সেখানে জিনিয়াকে দেখে মনে ধরেছিল। এরপর মাঝে মধ্যে তিনি ওই এলাকার ওই পার্কটাতে দুই মেয়ের সাথে বেড়াতে এসেছেন কয়েকবার। এসব সম্পর্কে জিনিয়া কিছুই জানত না। তিনি জিনিয়াকে খেয়াল করেন। আর জিনিয়ার শান্ত এবং সাহায্য করার স্বভাব বেশ মনে ধরে। আশেপাশের অন্য সব মহিলাদের কাছ থেকে খোঁজ করে জিনিয়ার সম্পর্কে সব জানতে পারেন আর নিজের ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। নিজের পরিবারকেও তিনি রাজি করান। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ওয়াফিফকে রাজি করান। গত ৩ কি সাড়ে ৩ বছর ধরে তিনি ওয়াফিফের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ওয়াফিফকে রাজি করানো যায় নি। ওয়াফিফ নিজের সিদ্ধান্তে অটুট। সে কোনোদিন বিয়ে করবে না। কিন্তু আফিয়া রহমান চান নি ওয়াফিফ পুরনো কথা নিয়ে সারাজীবন পড়ে থাকুক। একা একা থাকুক। তাই তিনি অনেক কষ্টে ওয়াফিফকে বিয়ের জন্য রাজি করান। এতে ওয়াফিফ রাজি হওয়ার পর তিনি স্টার জলসা আর জি বাংলা কে ধন্যবাদ জানান। ছেলেকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে দেওয়ার আইডিয়া তো এরাই দিয়েছিল।

ওয়াফিফ সকালেই এই পণ করে রেখেছিল যে আজ সারাদিন সে ঘর থেকে বের হবে না। এমনকি খাবারের জন্যও না। কিন্তু সেটা আর হল কোথায়? সে যদি বের হয়, তাহলে তাকে সব আত্মীয়রা চেপে ধরত। তাদের নানান কথার বাহার নিয়ে বসত।

”কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে করে ফেললে?”

”খুব তো বলতে বিয়ে করব না।”

”আমরা তো কত মেয়ে দেখলাম, তাদের থেকে একজনকে পছন্দ করলে কি হত?”

”আমাদের দেখা মেয়ে এই মেয়ের থেকেই শত গুন ভালো ছিল। একবার বলেই দেখতে।”

”তবে মেয়ে কেমন? সব খোঁজ খবর নিয়েছ তো?”

এসব প্রশ্ন তো শেষ হওয়ার নয়। এরপর শুরু হত সমবয়সী ভাই বোন দের প্রশ্ন।

”ভাইয়া, শেষেমেশ বুড়ো বয়সে এসে বিয়েটা করেই ফেললেন? আমি তো ভেবেছিলাম আপনার বিয়ে আর খাওয়া হল না।”

”কত কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু করব কি না সেটাই ভাবছি। ভাই যদি অনুমতি দিতেন?”

এই অনুমতি দেওয়া মানে এক এক টা শয়তান কে অনুমতি দেওয়া কি না কি করবে তার ঠিক নেই।
এর পাশাপাশি আছে কিছু চিপকু টাইপের মেয়ে আর তাদের মা। এরা আরেক পরীক্ষা ওয়াফিফের কাছে।
বিরক্তি চলে আসে এসবের মধ্যে থাকলে। আগে সাধারণত ঘরের কোন অনুষ্ঠান হলে সে সেদিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরত না। কিন্তু এখন বিয়ে উপলক্ষ্যে তার মা তাকে না জানিয়ে ছুটি নিয়ে নিয়েছেন তাও ২ সপ্তাহের। এর ১ দিন আগেও বাড়ির বাইরে পা রাখলে মা এর সেই বিখ্যাত লাঠি আলমারির পিছনে লুকানো আছে। নতুন বউএর সামনে সেই লাঠির বাড়ি খেয়ে নিজের মান সম্মান খোয়াতে হবে তাকে। সেটাও আরেক চিন্তা। তাই রুমের বাইরে বের হওয়া বাদ। একদিন না খেয়ে থাকলে কিছু হবে না।

সকাল টা ভালোই চলছিল। ওয়াফিফ তখনও রুম থেকে বের হয় নি। তবে তার পেটে ইঁদুর বিড়াল দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে। না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে। তবে খুব কম। সে কিছু না কিছু খায় অল্প হলেও। কিন্তু কিছুই খায় নি। ঘরে পানিও ছিল না। বুক সেলফ থেকে নিজের ডাক্তারির একটা বই বের করে তাতে ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু এটাও বৃথা গেল। এর বদলে তার আরও বেশি ক্ষুধা লাগল। বিছানার পাশের টেবিলের ড্রয়ারে হাত দিতে দিতে দিল না। একবার সেখানে হাত নিয়ে যাচ্ছে তো আবার পিছিয়ে নিচ্ছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। এখানে সিগারেট বের করা ঠিক হবে না। সে কিছু না করে এবার চোখ থেকে চশমা নামিয়ে টেবিলে বই রেখে তার উপর রাখল। আর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। যদি কেউ আসে তাহলে তাকে দিয়ে খাবার পাঠাতে বলবে।

কিছুক্ষণ প রটার ভাবনা সত্য করে জিনিয়া ঘরে প্রবেশ করল। অবশ্য সে এখন নিজ ইচ্ছায় এখানে আসে নি। বাইরে সে সারা সকাল কারো না কারো সাথে সময় কাতাচ্ছিল। বেশির ভাগ সময় আফিয়া রহমানের সাথে। আর বাকিটা ওর বোনদের সাথে। ওয়াফিফের বোনেরা বেশ মিশুক। সহজেই জিনিয়ার সাথে মিশে গেল ওরা। জিনিয়া ওদের সাথে থাকলেও বেশি কথা বলে নি। চুপ করেই একজায়গায় বসে ছিল। ওকে এভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে একজন তো বলেই উঠেছিল,

–ভাবি, আপনি এভাবে চুপ করে বসে আছেন কেন? কেউ তো বলতেই পারবে না যে আপনি এখানে আদৌ আছে কি না? কিছু কথা তো বলুন।

এর উত্তরেও জিনিয়া শুধু মুচকি হেসেছিল। এর মধ্যে জিনিয়া শুধু ওয়াফিফের বোন মিলা আর মিনা কে একবার জিজ্ঞেস করেছিল,

–আচ্ছা, এখানে বাড়ির সামনের তালগাছের নিচে কি কেউ পিঠা বিক্রি করে?

ওয়াফিফের বলা কাহিনী তখনও তার মনে আসছিল বারবার। এর উত্তরে মিলা বলল,

–হ্যাঁ ভাবি, শীত কালে বেশি আসে। তাছাড়া অন্য সময় মাঝে মাঝে আসে। অনেক আগের নাকি এক কাকু আসতো। তার পিঠা বেশি মজার ছিল। কিন্তু আমরা খাই নি।

এই কথা বলেই ওরা চলে যায়। মিলার কথা শুনে সে আবার গতরাতের কথা ভাবতে থাকে। কিন্তু তার আগেই ডাক পড়ে।

সেখানে পৌছুতেই বাড়ির বড়রা তাকে চেপে ধরে।

–কি ব্যাপার নতুন বউ? ঘর থেকে যে কেবার বের হয়েছ, আর ঢুকছ না। ঘরে বাঘ আছে না কি ভাল্লুক?

–হ্যাঁ তো, সারাদি শাশুড়ির সাথে থাকলেই হবে না কি? একটু সময় তো বরকেও দেও।

–কাল রাতে কি তোমাদের ঝগড়া হয়েছে না কি যে সেই সকাল থেকে এখনো এখানে আছো?

এমন নানা কথা তাকে লজ্জায় ফেলছিল। তখন আফিয়া রহমান ই বলে উঠলেন,

–জিনিয়া, যাও তো, গিয়ে দেখ ওয়াফিফের কিছু লাগে কি না?

এই কথা শুনে সে মুচকি হেসে সেখান থেকে চলে গেল। কিন্তু তখনও তার কানে ভেসে এলো কিছু কথা।

–কি ব্যাপার ভাবি? আমরা তো বিয়ের পর ছেলের বউকে ঘর থেকে বের করতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে ফেলতাম। আর তুমি তাকে আরও ঘরের মধ্যে ঢোকাচ্ছ? নিজের ছেলের বউকে সামলে রাখো। আঁচলে বেঁধে রাখো এখন থেকেই , এতো আস্কারা দিও না।

এর উত্তরে আফিয়া রহমান কি বলেছিলেন সেটা জিনিয়ার জানা নেই। তার আগেই সে ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দেয়। তার তখন কান লাল হয়ে এসেছে লজ্জায়। কি কি কথা বলছিল ওরা? বাবা রে বাবা!

ওয়াফিফ জিনিয়াকে ঘরে ঢুকতে দেখে যেন আশার আলো দেখতে পেল। তার চোখ জোড়া চকচক করে উঠল। সে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে বলে উঠল,

–কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

–আপনার কথা মতো মায়ের সাথে ছিলাম।

–ওরে আমার পতীব্রতা স্ত্রী, পতীর আদেশ এর দিকে খেয়াল আছে, কিন্তু পতীর পেটের দিকে খেয়াল নেই।

–মানে?

–মানে, আমি বলেছিলাম ফেবিকলের মতো লেগে থাকতে, ঠিক আছে। কিন্তু আমি যখন থাকব না তখন। এখন তো নর্মাল আঠার মতো লেগে থাকতে পারো।

–বুঝলাম না আপনার কথা।

–এখন তো এই সদ্য বিবাহিত নতুন বরের দিকেও একটু খেয়াল রাখো। সকাল থেকে না খেয়ে আছি সেদিকে খেয়াল আছে তোমার? তোমার মনে কি এই প্রাণীর জন্য একটু দয়া মায়া নেই?

–এই কথা। সে তো আপনি বের হলেই খেয়ে নিতে পারতেন।

–বের হওয়া যাবে না।

–কেন?

–বাইরে বিপদ, একেবারে ১০ নং বিপদ সংকেত দেওয়া আছে। আমার মাথায় লাল সাইরেন বেজে চলেছে।

–আপনি সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে পারেন না? একটু বুঝিয়ে বলবেন?

–বাইরে কারা আছে?

–আত্মীয়রা।

–ওরা হল এক বিরাট বড় বিপদ। ওদের সামলাতে পারলেও ওদের হাজারটা প্রশ্ন একেকটা তীরের মতো মাথায় লাগে। তার উত্তর আমি দিতে পারব না। তুমি বরং এক কাজ করো। আমার জন্য খাবার নিয়ে এসো ঘরে।

–শুনুন। আমি বলছিলাম কি…

এই কথা বলতে না বলতেই ঘরের মধ্যে বাচ্চারা খেলতে খেলতে ঢুকে পড়ল। ওয়াফিফের ডান হাত মাথায় চলে গেল। দুই আঙুল দিয়ে কপালে স্লাইড করতে করতে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল সে।

জিনিয়া এবার ওয়াফিফের রাগ দেখে কেটে পড়ার জন্য বলল,

–আমি আপনার খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি ততক্ষণ খেলা করুন।

বলেই দৌড় দিল জিনিয়া। ওয়াফিফ ও আর কোন উপায় না দেখে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

চলবে।

[রিচেক করি নি, ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আর ধরিয়ে দিবেন। ধন্যবাদ]