নিয়তি (৪)

0
1169

নিয়তি (৪)
সানজিদা ইসলাম সেতু

‘আরে আগের সাজে হবে না নতুন করে সাজাও। অার একমাত্র ছেলের বৌভাত বলে কথা। এমন ভাবে সাজাও যেন আগামী ২০ বছর সবার মনে থাকে।’

শুদ্ধের মা বেশ ব্যস্ত আজ, ছেলের বৌভাত বলে কথা। সারা বাড়িতে লোকজন ভরপুর। নানাজনের নানা রকমের কথা কিন্তু শুদ্ধর মা বেশ কৌশলে তা এড়িয়ে যাচ্ছে।
গত রাতের কাজিনদের আড্ডার পর শুদ্ধকে আর দেখা যায় নি। সন্ধ্যা বেশ এড়িয়ে চলছে।

সাঁঝের মা সাঁঝের সামনে দাড়িয়ে আছে অার সাঁঝের পাশে দাড়িয়ে আছে টিয়া। সবার মুখই থমথমে।
‘টাকা গুলো দে, সন্ধ্যার জন্য কিছু কিনতে হবে।’
‘আমি সত্যি বলছি আমার কাছে কোনো টাকা নেই।’
‘তাহলে কার্ড বা বিকাশ থেকে তুলে দে।’
‘বিকাশের সব টাকা চুরি হয়ে গেছে, আর কার্ড কোথাও খুজে পাচ্ছি না।’
‘মিথ্যা বলার যায়গা এটা না। তুই টাকা দিবি কি না তাই বল?’
‘কতবার বলব যে টাকা নেই।’
‘কাকিমা সাঁঝ তো বলছে ওর কাছে টাকা নেই, তাও এমন করছ কেন?’
‘দেখ টিয়া আমাদের মা মেয়ের মাঝে তুই কোনো কথা বলবি না।’
‘এ কথা বলতে তোমার জিহ্বা একটুও কাপল না কাকিমা? মা মেয়ে! কোনোদিন ওকে মেয়ের ভালোবাসা দিয়েছ? দিবে কি করে, নিজের বুকের দুধই তো দিতে না আর ভালোবাসা তো দূরের কথা। যাও তো এখান থেকে। সন্ধ্যা তো তোমার মেয়ে, তাহলে ওর জন্য এই অপয়া মেয়েটার কাছে টাকা চাইছ কেন? কাকিমা এই মেয়ের কাছ থেকে দূরে থাকো, তোমার মেয়ের নতুন সংসারে যদি এই অপয়া মেয়েটার নজর লাগে তা কিন্তু কারোর জন্য ভালো হবে না।’
টিয়ার এমন টিজ দেয়া কথা সাঁঝের মায়ের সহ্য হয় না, রাহে গজগজ করতে করতে চলে যান।
সাঁঝ ছোট ছোট চোখ করে কোমড়ে হাত দিয়ে টিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সাঁঝের দিকে চোখ পরতেই টিয়া হাসি থামিয়ে দেয়।
সাঁঝ আজ কেন কখনোই টিয়ার কাজের কোনো আগাগোড়া খুঁজে পেত না,কিন্তু দিন শেষ দেখা যেত ও যা করছে তা কারোর ভালোর জন্যই করছে। তবে টিয়ার পেট থেকে কথা বের করা খুবই কঠিন।

দুই বান্ধবীর জুটি এমনই হয় একজন সরল হলে অন্যজন জটিল, একজন মনের দিক দিয়ে নরম হলে অন্যজন শক্ত, তবে দুজনের দুজনকে ছাড়া চলে না।

টিয়া হাসি থামিয়ে রুমের দরজা আটকে দেয় আর তারপর সাঁঝের হাতে ওর মোবাইল টা দেয়। আর বলে,
‘তুই কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিস আমি যা বলব তুই কোনো প্রশ্ন ছাড়া সবটা মেনে নিবি।’
‘হ্যাঁ অামার সবটা মনে আছে। তার আগে প্লিজ বলবি দরজা কেন বন্ধ করলি?’
‘বন্ধ করেছি কারন এখন আমি যা বলব আমি চাইনা এসব কথা তুই আর আমি ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তি জানুক।’
‘কি কথা?’
‘গত পরশুদিন তোর ফোনে একটা মেইল আসে আর একটা নাম্বার থেকে কয়েকটা মেসেজ আসে, তোকে না জানিয়ে আমার মেইল আর মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছি। আমি সরি চেয়ে নিচ্ছি কারণ আমি তোর পারমিশন ছাড়া তোর জীবনের একটা বড় কাজ করে ফেলেছি।’
‘আমার আর জীবন! এটা জীবন না রে, এটা খেলার মাঠ। যে যেমন পারছে তেমন খেলা খেলছে এ মাঠে।’
‘তুই মেইল আর মেসেজ গুলো চেক কর।’
ফোন নিয়ে মেইল আর মেসেজ চেক করে বসে পরে সাঁঝ। নিজেকে সামলে উঠে দাড়িয়ে টিয়াকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দেয়।

‘ তোর কাছে আমার ঋণের পরিমান দিনদিন বাড়তেই যাচ্ছে টিয়া। আমি নিজেই চাইছিলাম সব কিছু থেকে থেকে সরে যেতে। কিন্তু তোর হাত ধরে যে এত বড় একটা সুযোগ আমার পায়ের কাছে আসবে আমি তা ভাবতেও পারিনি।’
‘তোর মুভঅন করার সময় হয়ে গেছে সাঁঝ। এতোদিন অন্যের জন্য ভেবেছিস, এবার তুই নিজের জন্য ভাববি অার নিজের জন্য বাঁচবি।’
‘হুম, তাই করব। এ শহরে থেকে আমি কিছুই করতে পারব না। এখানে থাকলে পিছুটান কখনো আমাকে সামনে আগাতে দেবে না।’
‘আজ রাতেই আমার সিলেটের জন্য রওনা হচ্ছি।’
‘আমরা মানে?’
‘আমরা মানে তুই, আমি আর মা। কি মনে করেছিস তুই, তোকে আমরা একা যেতে দেব? আমিও অফিস থেকে ট্রান্সফার নিয়ে নিয়েছি। আমাদের কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ সিলিটেও আছে। আর আমাকে প্রমোশন দিয়ে ট্রান্সফার করা হয়েছে। ওখানে আমাকে একটা ফ্লাট আর গাড়ি দিবে। আজ থেকে আমরা একসাথে থাকব,সিলেছে।’

সেদিন রাতে সাঁঝের কাছে ওর ট্রান্সফারের মেইল আসে। বিয়ের জন্য ছুটি নেয়ায় ওর কাছে ফোন না দিয়ে অফিস থেকে মেসেজ দেয়া হয়। সাঁঝের ট্রান্সফার সিলেটে করা হয়। মেইল দেখে টিয়ার মাথায় বুদ্ধির সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। ও সেই নাম্বারে ফোন দেয়, নাম্বারটা ছিল কোম্পানির এমডির। এমডি আর টিয়া আগে থেকেই একে অপরকে চিনত। টিয়া সাঁঝের কথা খুলে বলে আর বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাঁঝের ট্রান্সফার কার্যকর করার জন্য। তিনি তাতে রাজি হয়ে ২ দিনের মধ্যে সমস্ত ব্যবস্থা করে।
টিয়া চেয়েছে সাঁঝকে এ সব নোংরা মানুষদের থেকে দূরে রাখতে, তাই যখন মেইল পায়, সবটা নিজ দ্বায়িত্বে সামলায়।
বিয়ের ওই ঘটনার পর টিয়া মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল সাঁঝকে ওর সাথে সিলেট নিয়ে যাবে, তাতে সাঁঝ রাজি হোক বা না হোক।
সাঁঝের নিয়তিতে হয়ত এটাই ছিল, তাই টিয়ার সাথে ওর ট্রান্সফারও সিলেটে হয়েছে।

‘তাড়াতাড়ি সব প্যাকিং শেষ করে নে। এবাড়িত থেকে সবাই যখন সন্ধ্যার বৌভাতে যাবে, আমরা তার কিছুক্ষণ পর রওনা হব। সবাই জানে আমি সিলেট যাব কিন্তু কাউকে এটা জানতে দেয়া যাবে না যে তুই সিলেট যাচ্ছিস। ‘
‘একবার ও বাড়িতে যাব।’
‘তুই..’
‘প্লিজ টিয়া, শেষ বারের মতো।’
‘আচ্ছা তাহলে আমরা রেড়ি হয়ে একেবারে বেরব। ও বাড়ি থেকে বের হয়েই সোজা সিলেট।’
‘আচ্ছা। ‘

নীল বেনারসি, ভারি মেকআপ অার সোনার গয়নায় সাজানো হয়েছে সন্ধ্যাকে। ওর শ্বাশুড়ি এসে কাজলের টিকা দিয়ে গেছে, যাতে কারোর নজর না লাগে। শুদ্ধ তো সন্ধ্যার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না।
সাঁঝকে এ বাড়িতে দেখে অনেকেই চমকে যায়। কারোর ধারণাতেও ছিল না সাঁঝ আসবে। অার ওর মা-বাবাও ওকে আসার জন্য বলেনি।
টিয়া সাঁঝের জন্য জন্য একটা নতুন কালো জামদানী শাড়ি এনেছে, সাঁঝ সেটাই পরেছে, কালো চুড়ি, বড়বড় টানা চোখে চিকন করে কাজল, কোমড়ের নিচ অবধি ছড়ানো কালো চুল। অনুষ্ঠানের সব ছেলের চোখ আটকে গেছে।
কারো দিকে না তাকিয়ে সাঁঝ সোজা সন্ধ্যার কাছে যায়। সাঁঝকে সন্ধ্যার কাছে যেতে দেখে শুদ্ধর মা যেন উড়ে এসে ওদের পাশে দাড়াল। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে হাতের রিং ফিঙ্গার থেকে আংটিবদলের আংটি খুলে শুদ্ধের হাতে দেয়। বলে,
‘নাও এটা সন্ধ্যাকে পরিয়ে দাও।’
শুদ্ধর মা বলে ওঠে,
‘আমার ছেলের বউ সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস পরবে না।’
সাঁঝ হেঁসে বলে,
‘আপনার ছেলের বউ তো সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস পাশে নিয়ে দাড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতে সেটা নিয়ে সংসারও করবে তাহলে এ সামান্য আংটি কি দোষ করল। এটাও আমার বৌমা ব্যবহার করতে পারবে।’
সাঁঝের কথা টিয়া সহ আরো কয়েকজন সিটি বাজায়। অনেকেরই মাথা নিচু হয়ে আছে। সাঁঝ স্টেজ থেকে চোখ বুলিয়ে সবাইকে দেখছে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ওর বাবামায়ের কাছে যায়।
‘আজ থেকে মনে করবে তোমাদের বড় মেয়ে মরে গেছে। ভুলে যেও কোনোদিন অামি তোমাদের জীবনে ছিলাম অার আমিও ভুলে যাব যে তোমরা কোনোদিন আমার জীবনে ছিলে। তোমাদের মাসিক খরচ ঠিক সময় মতো তোমার দরজায় পৌঁছে যাবে।
জানি আমাকে কোনোদিন এটিএম ছাড়া মেয়ে বলে মনে কর নি। যদি কোনো দিন মেয়ে বলে মনে হয় বা না হয় আমাকে খুঁজতে যেও না। আসছি..’

সেদিন বিয়ের আসর থেকে সাঁঝ মাথা নিচু গিয়েছিল আজ এখান থেকে মাথা উঁচু করে বের হচ্ছে। আজ টিয়া ওর পাশে আছে সেদিনও পাশে ছিল।

চোখ মুছে গাড়িতে ওঠে সাঁঝ। শহরের কোলাহল থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিজ গতিতে চলতে থাকে।
গাড়ির জানালা টিয়া খুলে দেয়।
‘আজ থেকে তুই স্বাধীন সাঁঝ। উপভোগ কর নিজের এ নতুন জীবনকে।’

জানালা থেকে মাথা বের করে গভীর শ্বাস নেয় সাঁঝ। নিজেকে আজ মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে।
রাতে বুক চিরে আস্তে আস্তে মুখ বের করছে সূর্য, সাঁঝের জীবনে নতুন সূর্য উঠছে, যে জীবনে নেই কোনো বাঁধা, নেই কোনো পিছুটান।

কেটে গেছে ২৫টি বছর। সিলেট যাবার তিন বছর পর টিয়া আর ওর মায়ের জোরাজুরিতে বিয়ে করে সাঁঝ, মানুষটা বড় ভালো, সাঁঝের সবটা জেনেও বিয়ে করেছে ওকে। এমন মানুষ পৃথিবীতে আছে বলেই আজও পৃথিবীটা এতো সুন্দর। এক ছেলে আছে ওদের, ২০ বছর বয়স। টিয়াও বিয়ে করেছে, ওর মেয়ের বয়স ১৮ বছর।
সন্ধ্যার ২ মেয়ে, বড় মেয়ের নাম ছায়া বয়স ২৩ আর ছোট মেয়ের নাম মায়া বয়স ২০।
এতো গুলো বছরে মাত্র একবার নিজের সেই পুরোনো শহরে গেছিল সাঁঝ, যেদিন ওর বাবামায়ের মৃত্যু হয়। একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে তাদের মৃত্যু হয়। সাঁঝ প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অংকের টাকা পাঠাত। বিয়ে করে একবার ফোন দিয়েছিল তাদের জানাতে। সেদিন ওর বাবা-মা নিজেদের ভুল স্বীকার করে অনেক কেঁদেছিল কিন্তু সাঁঝ কিছু বলে নি।
আজ আবার যাবে নিজের সেই শহরে। সন্ধ্যার বড় মেয়ের বিয়েতে। সাঁঝের স্বামী আর শুদ্ধ বিজনেস ফ্রেন্ড, সেই হিসেবেই দাওয়াত এসেছে, কোনো আত্মীয় হিসেবে না। এমনকি শুদ্ধ নিজেও জানে না এ সাঁঝের স্বামী।
আজ সাঁঝের সাথে টিয়াও এসেছে। সাঁঝকে দেখে সন্ধ্যা আর শুদ্ধ দুজনেই অবাক হয়। কোনোদিন ভাবেনি সাঁঝ ফিরবে। এতবছর পর দুবোনের দেখা। দুজন দুজনকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দেয়।

২৫ বছর আগের সাঁঝের বিয়ের আসরে শুদ্ধ আর সন্ধ্যা যে ঘটনা ঘটিয়েছিল, ২৫ বছর পর সেই একই ঘটনা সন্ধ্যা আর শুদ্ধর বড় মেয়ে ছায়ার বিয়েতে ঘটিয়েছে ওদের ছোট মেয়ে মায়া আর ছায়ার হবু বর রোশান।
আজ ওদের চোখ খুলেছে, ওরা বুঝতে পারছে সেদিন কি ভুল করেছিল।

‘মা বাবা আজ তোমাদের খুব ভালো লাগছে নিশ্চয়ই, খুশি হয়েছ তো? যে কাজে তোমরা খুশি হয়েছিলে সেই একই জিনিস যখন তোমাদের মেয়ের সাথে হচ্ছে তখন নিশ্চয়ই তোমাদের খুশি হওয়ার কথা।
তোমাদের নোংরা কাজের জন্য আজ অামার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে। ‘
ছায়া নিজের রুমের দরজা আটকে হাতের রগ কেটে দেয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এর জন্য ছায়ার মৃত্যু হয়।
সন্ধ্যা সাঁঝের পা ধরে ক্ষমা চায়। টিয়া ওকে নিয়ে আসার জন্য ওর হাত ধরার আগে সাঁঝের স্বামী ওর হাত ধরে নিয়ে আসে। টিয়া হালকা হেসে ওদের সাথে পা বাড়ায়।

প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয় না। তুমি যে কাজ করবে তার ফল তোমাকে এখানেই পেতে হবে।
শুদ্ধ সন্ধ্যা এই ২৫টি বছর খুব সুখে কাটিয়েছে কখনো ভাবেনি এমন কিছু হবে। শেষ বয়সে এসে এতবড় একটা ধাক্কা পেল ওরা। ওদের নিয়তিতে এটাই পাওনা ছিল। এটাই রিভেঞ্জ অব নেচার, এটাই নিয়তি।

#সমাপ্ত

পাশে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।