বৃষ্টিস্নাত তুমি পর্ব-০২

0
446

#বৃষ্টিস্নাত_তুমি (২)
হুযাইফা মাইশা

ঢাকায় আসতে আসতে দুপুর হলো। গ্রামটা ওতোটাও দূরে নয়। ঘন্টা কয়েকের দূরত্ব। তাছাড়া আজ ইয়াভকিন স্পীডে গাড়ি চালিয়ে এসেছে। যেন রাগ ঝাড়ছে।
গাড়ি থামলো বড় একটা এপার্টমেন্টের সামনে। লাগেজটা আগেই গাড়িতে রেখে দিয়েছিল পূর্ণতা। ইয়াভকিন নেমে শব্দ করে দরজা লাগাল। পূর্ণতা নেমে একবার এপার্টমেন্টটায় চোখ বুলাল। লাগেজ বের করে ইয়াভকিনকে জিজ্ঞেস করল,
‘ কত তলায় থাকেন?’
‘ ছয়তলায়।’
‘ গাড়ি পার্ক করে আসুন, আমি দাঁড়াচ্ছি।’

ইয়াভকিন গম্ভীর মুখে আবার গাড়িতে উঠল। একপাশে সরে দাঁড়াল পূর্ণতা। কাজকর্ম তার অত্যন্ত স্বাভাবিক। মেয়েটার তো স্বাভাবিক থাকার কথা হয়। ওর সাথে মেয়েটার মতামতের কোনো মিল নেই। বিয়েটাও একপ্রকার জোর করে করা। তাছাড়া মেয়েটা ওকে সহ্য করতে পারেনা। তাহলে কেন বিয়ে করল? ধরা যাক, মেয়েটা বাবার কথায়ই বিয়েটা করল। কিন্তু এখন এরূপ স্বাভাবিক ব্যবহার করছে কি করে!.. প্রশ্ন, প্রশ্ন আর প্রশ্ন! মাথা ঝিম ধরে যাচ্ছে। গাড়িটা পার্ক করে ধুপধাপ পা ফেলে ফিরে আসলো। পূর্ণতার পাশ থেকে নিজের লাগেজটা নিয়ে এগিয়ে গেল। পূর্ণতা চলল পিছু পিছু। লিফটে উঠে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল দুজনে। ঠিক যেমন পুরোটা রাস্তা দুজনে নিশ্চুপ ছিল। পূর্ণতার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল নতুন জীবনের কথা!

ফ্লাটে ঢুকে নিজের রুমটার দিকে এগিয়ে গেল ইয়াভকিন। ভেতরে ঢুকে দরজার পাশটায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল পূর্ণতা আসছে কিনা। তাকে অবাক করে দিয়ে অন্য রুমটায় গেল পূর্ণতা।
ফ্লাটটা ওতো বড় নয়। একা থাকে বিধায় বড় ফ্লাট নেয়নি ইয়াভকিন। বেডরুম দু’টো যদিও।
দরজা লাগানোর শব্দে ইয়াভকিনের ধ্যান ভাঙে। পূর্ণতা রুমটার দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। গজগজ করতে করতে ওয়াশরুমে ঢুকল ও। মেয়েটা একচুয়েলি চাচ্ছে কি!

কলিংবেলের শব্দে বের হয়ে আসলো পূর্ণতা। সবে শাওয়ার নিয়েছে। দরজা খুলবে কিনা সে নিয়ে দ্বিধায় জড়িয়ে। অপেক্ষা করতে লাগল ইয়াভকিনের। পরপর আবার দু’বার বেল বাজতেই চট করে গিয়ে খুলে দিল দরজা। অপরিচিত মহিলাকে দেখে ভড়কে গেল। পিটপিট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘ কাকে চাচ্ছেন?’
‘ আমি এ বাসায় কাম করি। স্যার কই? আপনি কে?’
‘ আব-আমি উনার ওয়াইফ। উনি রুমে। আপনি ভেতরে আসুন।’

মহিলাটি তাজ্জব বনে গেল। ভেতরে ঢুকল। ততক্ষণে ইয়াভকিন বেরিয়েছে রুম থেকে। মহিলাটিকে দেখে বলল,
‘ খালা, এসে গেছেন? এবার একটু জলদি জলদি কিছু বানিয়ে দিন।’

খালা ছুটলেন রান্নাঘরে। ইয়াভকিন পূর্ণতাকে না দেখার ভান করে চলে গেল। পূর্ণতা পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে।

‘ খালা, দিন আমি একটু সাহায্য করি।’
‘ না না, আমি পারমু। একটা কথা আছিলো।’
‘ বলুন।’ বলতে বলতে কাটা’কাটিতে হাত লাগাল ও।
‘ আপনাদের বিয়া হইছে কবে? না মানে আগে কোনোদিন আসতে দেখলাম না তো..’
‘ কালই বিয়ে হয়েছে। সকালে এসেছি আমরা।’

কাজের খালা হতভম্ব হলেন আবার। বিয়ের পরদিন কেউ এভাবে ছুটে আসে জানা ছিলনা।

দুপুরের খাবারটা খেয়ে সোফায় বসলো পূর্ণতা। খালা একটু আগে চলে গেছেন।
ইয়াভকিন রুম থেকে বের হয়ে সর্বপ্রথম নজর নিল পূর্ণতার দিকে। মেয়েটা আনমনা হয়ে চারপাশ দেখছে। মেয়েটা নিঃসন্দেহে সুদর্শনা। কিন্তু ওর আচরণ বারবার ইয়াভকিনকে বিরক্ত করে। ইয়াভকিনের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে সে এই মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। মেয়েটাকে দেখলে আবার গতকালের কথা স্মরণে আসছে। ইয়াভকিন মনে প্রাণে চাইছে এটা যেন কোনো দুঃস্বপ্ন হয়।
কিন্তু হায়! সেটা তো সম্ভব নয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে এল ও। ধ্যান ছুটে পূর্ণতার। ইয়াভকিনকে দেখে জিজ্ঞেস করে,
‘ কিছু বলবেন?’
‘ তুমি বিয়েটায় রাজি ছিলে?’
‘ না আবার হ্যাঁ।’
‘ সোজাসুজি উত্তর দাও।’
‘ পাত্র দেখার আগে পুরোপুরি রাজি ছিলাম। কিন্তু দেখার পর সেটার মাত্রা একদম কমে গেছে। একেবারে কমে গেছে সেটাও নয়।’

হেয়ালিপনা! ব্যাপারটা কোনোকালেই হজম করতে পারেনা ইয়াভকিন। কটমট চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ মশকরা করছো? তোমার সবাই পেয়েছ টা কি? বিয়ে মানে মজা?’
‘ দেখুন…’
‘ কি দেখবো? বিয়েতে তুমি রাজি না থাকলে এতো স্বাভাবিক থাকছ কি করে?’

থমকে গেল পূর্ণতা। উত্তরের আশায় কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকল ইয়াভকিন। কিন্তু পূর্ণতাকে নিরুত্তর দেখে সুপ্ত রাগ মাথায় চড়ল। যেভাবে এসেছিল সেভাবেই বিদায় নিল। পূর্ণতা তখনও শান্ত চিত্তে বসা। সে অত্যন্ত স্বাভাবিক? হয়তো। তো কি করবে! বাড়ি মাথায় তুলবে চেঁচিয়ে? বিয়েটা তো হয়েই গেছে। এখন এসব করে লাভ আছে? সে নাহয় বাবার বাধ্য মেয়ে। ইয়াভকিন তো তার বাবার জেদি,একরুখা ছেলে। জোর দিয়ে মানা কেন করতে পারলনা, এতই যদি সমস্যা তাকে নিয়ে!
ফারুক সাহেবের ছোট মেয়ে বিধায় ভীষণ আদুরে। বড় ভাই প্রান্ত আর বোন প্রিমা, কম আদর করেনা ওকে। যদিও মায়ের কাছে রাতদিন বকা খেত। ছোটবেলা থেকেই ওর কাছে এক্সপেকটেশন্স অনেক ফারুক সাহেবের। কোনোদিন নিরাশও করেনি। বিয়ের ব্যাপারটায়ও করতে চায়নি। তাই এই অসহ্য ব্যাক্তিকেও বিয়ে করলো। আর এখন কিনা তাকেই কথা শুনতে হচ্ছে।

দ্রুতপায়ে রুমে গেল সে। ব্যাগ গোছগোছ করে লম্বা একটা ঘুমের প্রস্তুতি নিল। ঘুম ভাঙ্গল সন্ধ্যার পর। উঠে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে গেল। বাসায় যেন আর কেউ নেই। ইয়াভকিনের রুমের দরজাটা আটকানো। কি করছে কে জানে!
সন্ধ্যায় এক কাপ চা রোজকার নিয়মের মধ্যেই পড়ে পূর্ণতার। এক কাপ চা বানাতে গিয়ে দুই কাপ বানিয়ে ফেলল দ্বিধা নিয়েই। এরপর নিজের কাপটা টেবিলের পাশটায় রেখে ইয়াভকিনের রুমের সামনে গেল। লোকটার সাথে সে ফ্রি না। কথাবার্তা খুব কম হয়েছে। সেই ঝ’গড়ার পর ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয়েছে খুব কম। কথা হয়েছে কিনা সন্দেহ।

দরজায় নক করল। একবার..দুইবার..তিনবার। চারবারের মাথায় চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলল ইয়াভকিন। গায়ে সাদা রঙের টিশার্ট। লম্বাটে, ফর্সা মুখশ্রীতে ঘুমের লেশ লেগে আছে।
‘ কি দরকার?’
‘ ডিস্টার্ব করলাম নাকি?’
‘ যদি বলি হ্যাঁ?’

থতমত খেল পূর্ণতা। অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায় চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ ধরুন।’

ধরার পরপরই ধুপধাপ পা ফেলে চলে এল পূর্ণতা। টেবিল থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে নিজের রুমে পা বাড়াল।
তীক্ষ্ণ নজরে ওর কার্যকলাপ দেখে নিজেও রুমের ভিতরে চলে এলো ইয়াভকিন।

রাতের বেলা খাবারগুলো গরম করে টেবিলে সাজিয়ে রুমে চলে এল। না খেয়েই শুয়ে পড়ল।
রাত এগারোটার দিকে টেবিলে খাবার পেয়ে চুপচাপ খেয়ে নিল ইয়াভকিন। ভেবেছে, পূর্ণতাও খেয়েছে। কি অদ্ভুত দুজনে! এক ফ্লাটে থেকেও সরাসরি কথা হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকবার!

সকালবেলা, পূর্ণতার চোখ ভেঙেছে দরজা ধা:ক্কানোর শব্দে। ঘুমঘুম চোখে দরজা খুলে দিতেই ফর্মাল ড্রেসআপ এ সজ্জিত ইয়াভকিনকে নজরে এল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘ কি দরকার?’
‘ ফ্লাটের তালার চাবি। একটা আমার কাছে আছে। যাইহোক, আমি অফিসে যাচ্ছি। এমনিতেও এসবের চক্করে আমার অফিসের বারোটা বাজতে চলেছে!’

শেষের কথাগুলো কণ্ঠস্বর নিচু করে বললেও কানে এসেছে পূর্ণতার। চাবিটা হাত বাড়িয়ে নিল। প্রাণহীন কণ্ঠে বলল,
‘ দুপুরে খালাকে আসতে মানা করে দিবেন।’

মুখের উপর দরজা লাগাতেই ইয়াভকিন ভ্যাবাচেকা খেল। পরমুহূর্তেই রাগে ‘ বেয়া’দব ‘ বলে বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে গেল।
_

বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল হলো ইয়াভকিনের। বাবা রাজ’নীতি সামলান আর সে ব্যবসা। মোটেও সহজ নয়। কোনো কোনো দিন হিসেবে গোলমিল হলে ফিরতে ফিরতে ওর রাত হয়। আজ খানিকটা আগেই ফিরেছে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফ্লাটের বাইরে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপল কয়েকবার। কোনো নড়চড় নেই দেখে ভ্রু কুঁচকাল। পরপরই নজর যায় বাইরে ঝুলা’নো তালাটার দিকে। ফ্লাটের তালাটা ওর রুমে ছিল। বাসায় পূর্ণতা ছাড়া কেউ ছিলনা। ও কি কোথাও গেছে? ভাবতে ভাবতে পকেট হাতড়ে চাবি বের করল। দরজা খুলে প্রবেশ করতেই অন্ধকারে তলানো ফ্লাটটা দেখে কপালেও ভাঁজ করল। এক এক করে সব লাইট অন করে পুরো ফ্লাট ঘুরে দেখল। নাহ! মেয়েটা নেই! আশ্চর্য, গেল কোথায়?
টেবিলের উপর বাটি গুলোতে খাবার সাজিয়ে ঢেকে রাখা। ওসবে বিশেষ নজর না দিয়ে ফোন বের করল। মেয়েটার নাম্বারও নেই! কি যে মুসিবত! স্ত্রীর নাম্বার স্বামীর কাছে নেই!

ইয়াসিন সাহেবের নাম্বারে কল দিল ও। দুইবার রিং হতেই কল রিসিভ করলেন উনি। উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন,
‘ বাবাকে মনে পড়ল তবে!’
‘ পূর্ণতার নাম্বারটা দেও।’
‘ বউয়ের নাম্বার নেই?’
‘ বাবা!’
‘ দিচ্ছি, দাঁড়া।’

ইয়াসিন সাহেব ছেলেকে রাগাতে বেশ মজা পান। সর্বদা ঠাট্টার স্বরে কিছু বলেই ইয়াভকিনকে তেঁতিয়ে দেন। খানিক পরে ম্যাসেজে নাম্বার পাঠিয়ে দিলেন। পরে আবার কল করলেও ধরলনা ইয়াভকিন।

পূর্ণতার নাম্বারে কল করতে করতে নজর গেল টেবিলটায়। সাজানো গোছানো টেবিল। একটা বাটির নিচে ভাঁজ করে রাখা সাদা কাগজটা নজরে এল তখনই। রিং হতে হতে কল কেটে গেছে ততক্ষণে। হাত বাড়িয়ে কাগজটা আনল। কালো কালিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
‘ বিয়েটায় আপনার এতো আপত্তি থাকলে আগেই মানা করে দিতে পারতেন। এখন শুধু শুধু আমাকে কথা শুনিয়ে কি লাভ? আর আমিও ওমন কথা শুনে থাকতে পারবোনা। তাছাড়া এক সপ্তাহ আমার ভার্সিটির ক্লাস মিস গেছে। আর মিস দিতে চাচ্ছিনা। আগে যে বাসায় থাকতাম ওখানেই উঠছি গিয়ে। ভার্সিটিটা আপনার ফ্লাট থেকে অনেক দূরে!
যাইহোক এসব কাউকে বলার দরকার নেই। আপনি আপনার মতো থাকুন, আর আমি আমার!
আর ভাবলাম আজকের খাবারটা আমিই বানাই। ওতোটাও খারাপ বানাইনা।’

ভার্সিটিটা এখান থেকে দূরে একদমই নয়। ডাহা মিথ্যে! যদিও সেটা কেবল পূর্ণতাই জানে। শহরে ফারুক সাহেবের বাসা আছে। তবে এখান থেকে সেটা দূরেই। আবার তাদের বাসা থেকে ভার্সিটি দূরে। সেজন্য অনার্সে ভর্তির সময় সবার বিপক্ষে গিয়ে আলাদা একটা বাসায় উঠেছিল। যোগ দিয়েছিল দুই বান্ধবী।
ইয়াভকিন শান্ত নজরে কাগজটা আবার পড়ল। পরমুহূর্তেই কাগজটা দু’টুকরো করে ফেলে দিল মেঝেতে। মেয়েটা এতো অদ্ভুত!

রিংটোনের শব্দে ধ্যান ভাঙে। কল রিসিভ করে গম্ভীর গলায় বলে,
‘ এই মেয়ে, কি সমস্যা তোমার?’
‘ কে?’ ওপাশে থাকা পূর্ণতার চমকিত কণ্ঠ।
‘ যাওয়ার আগে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেনা? বাবা জিজ্ঞেস করলে কি জবাব দিবো?’
‘ প্রয়োজন বোধ না করলে কাগজটা রেখে আসতাম না। আর বাবাকে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করে নিবেন।’
কল কেটে দিল ইয়াভকিন। মাথা ধরে যাচ্ছে রাগে!

চলবে।