রঙিন বর্ষা ৫ম পর্ব

0
496

#রঙিন_বর্ষা
লেখা: নীলাদ্রিকা নীলা
৫ম পর্ব
.
শোভা সব গুলো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলছে, রোমান্স চলছিলো নাকি”
মীম শ্রাবণের দিকে ভ্রু কুচকে এখনো তাকিয়ে আছে। লজ্জায় শ্রাবণ ওদের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে না পেরে কিছু না বলেই রুম থেকে বের হয়ে গেল।
,
ঝুমুর এবার কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। শ্রাবণের মা রেগে শ্রাবণকে বলছেন, এক্ষুনি এই মেয়েকে ওর বাড়িতে দিয়ে আয়!
– মা এখন অনেক রাত হয়ে গেছে।
– তাহলে যা। তোর বউকে রুমে নিয়ে গিয়ে তুই সামলা। আমি আর এগুলো দেখতে পারছি না।
,
শ্রাবণ ঝুমুরকে টানতে টানতে আবার ওর রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিলো। ঝুমুর এখনো কান্না করছে। শ্রাবণ ঝুমুরের দিকে তেড়ে এসে চেচিয়ে বলছে, কি হয়েছে এত কান্নার কি আছে!
– আমি বাড়ি যাব। আমি এখানে থাকবো না।
,
শ্রাবণ রেগে গিয়ে এবার ঝুমুরকে থাপ্পড় দিলো।
– এই তোর জন্যই এগুলো হয়েছে। তোর জন্যই এই বিয়েটা করতে হয়েছে। আমি তো এসব করতে চাই নি। আমি তো তোকে ভালো….
কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেল শ্রাবণ।
,
ঝুমুর চোখে পানি নিয়ে শ্রাবণের দিকে চেয়ে আছে। শ্রাবণ আবার বলতে শুরু করলো,
– তুমি কেন ওই কাজটা করলে ঝুমুর!
– তোকে আমি ছাড়বো না শ্রাবণ! আমাকে এখান থেকে যেতে দে! তারপর তোর এই পরিবারকেও আমি….
,
ঝুমুরের কথা শুনে আবারও শ্রাবণ রেগে গেল। ঝুমুরের হাত চেপে ধরে ওর গালে আরও দুটো চড় বসিয়ে দিলো,
– একদম আমার পরিবার নিয়ে কিছু বলবি না। খুব অহংকার না তোর! তোর অহংকার আজ আমি ভাঙবো।
,
শ্রাবণ ঝুমুরের হাত চেপে ধরে ওর গালে এলোপাথাড়ি চড় বসিয়ে দিচ্ছে। খুব জোরে হাত চেপে ধয়ায় হাতের চুড়ি গুলো হাতের ভিতর গেথে গিয়ে হাত কেটে যাচ্ছে। ঝুমুর খুব জোরে জোরে কান্না করা শুরু করে দিলো। শ্রাবণের মাথায় এখন আগুন জ্বলছে। শ্রাবণ আরও জোরে ঝুমুরের হাত চেপে ধরলো। ঝুমুরের চিৎকারে শ্রাবণের মা এসে দরজা ঢাক্কানো শুরু করে।
– শ্রাবণ দরজা খোল!
,
শ্রাবণ দরজা খুলে দিলো। শ্রাবণের মা ভিতরে এসে ঝুমুরের এই অবস্থা দেখে রেগে গিয়ে শ্রাবণের গালে চড় বসিয়ে দিলেন।
– তোকে আমি এই শিক্ষা দিয়েছি! তুই মেয়েদের গায়ে হাত তুলিস! অন্য বাড়ির মেয়েকে ঘরে এনে ওকে এভাবে মারছিস! যা বেড়িয়ে যা এই ঘর থেকে।
,
শ্রাবণ রুম থেকে বের হয়ে গেল। ঝুমুর ওর হাতটা ধরে কান্না করছে। শ্রাবণের মা ঝুমুরকে তার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঝুমুরের হাতের রক্ত মুছে নিয়ে মেডিসিন লাগিয়ে দিলেন।
,
শ্রাবণ ছাদে বসে আছে। আকাশে মেঘ জমেছে। প্রচন্ড জোরে বাতাস বইছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি এসে গেল। বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে শ্রাবণ এবার উঠে দাড়াল। ছাদের রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রাবণের মুখে বৃষ্টির ফোটার সাথে চোখের পানি মিশে এক হয়ে গেছে।
– আমি তোমার সাথে এমন করতে চাই নি ঝুমুর! আমি তো তোমার সাথে এই বৃষ্টিধায় একসাথে ভিজতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তো বোঝো না আমায়!
,
বাহিরে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুমুর শ্রাবণের মায়ের রুম থেকে বের হয়ে এলো। মনটা খুব খারাপ। মেইন দরজা খোলা দেখে ওদিকে এগিয়ে যেতেই সিড়ি দেখতে পায়। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ছাদের দরজার কাছে পৌঁছে গেল। মাঝরাতে এভাবে বৃষ্টি হতে দেখে ঝুমুরের আরও কান্না করতে ইচ্ছে করছে। বৃষ্টি দেখলে এমনিতেই ঝুমুরের মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। তার ওপর আজ মনটা ভীষণ খারাপ। ঝুমুর দরজা থেকে সামনে এগিয়ে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। হঠাৎ ভিতর থেকে প্রচন্ড কান্না আসতেই ঝুমুর কান্না করতে করতে ওখানেই অচেতন হয়ে গেল।
,
কিছুক্ষণ পর শ্রাবণ ছাদের কোনা থেকে দরজার এদিকে এগিয়ে আসতেই ঝুমুরকে ওখানে পরে থাকতে দেখে ওদিকে ছুটে যায়।
,
ঝুমুরের জ্ঞান নেই। কয়েকবার ডাকার পরও ঝুমুর কোনো সাড়া দিলো না। শ্রাবণ ঝুমুরকে কোলে করে রুমে নিয়ে এসে শুয়ে দিল। ওর ভেজা শরীর টাওয়েল দিয়ে মুছে দিতে গিয়ে দেখলো ঝুমুরের শরীর হালকা গরম। বোধহয় জ্বর এসেছে মেয়েটার। শ্রাবণ ঝুমুরের পাশে বসেই ঘুমিয়ে গেল।
,
সকাল হতেই শ্রাবণের বাসার সামনে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। শ্রাবণের বাবা বাহিরে এসে দেখলো, দুই জন সুন্দরমত গরনের যুবকের পিছনে আরও কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ওদের দলবল। প্রিয়া ঝুমুরের বাড়িতে ফোন করে সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে। খবর পেয়ে ঝুমুরের বড় দুই ভাই লিমন আর নিয়ন ঝুমুরকে নিতে এসেছে।
লিমন বললো, কোথায় আমার বোন? আর সেই বেত্তমিস শ্রাবণ কোথায়! বের করে দিন ওদের!
,
শ্রাবণের বাবা কিছু বলতে যাবে তখনই চেচামেচির আওয়াজ শুনে ভিতর থেকে শ্রাবণ বের হয়ে এলো । শ্রাবণ রেগে বলছে, আপনার বোন আমার সাথে অন্যায় করেছে আর সেই শাস্তিসরুপ আমাকে বিয়ে করতে হয়েছে। এখন আমি ওকে এখানেই রাখবো।
,
নিয়ন বললো, কাজটা তুমি ঠিক করছো না। ফেরত দাও আমাদের বোনকে! নইলে এখানে কেউ জ্যান্ত থাকবে না৷
– আপনারা এরকম অভদ্রের মতো অন্যের বাড়িতে এসে হামলা করছেন কেন। এটা ভদ্র মানুষের বাসা। মাস্তানি করতে হলে অন্য কোথাও গিয়ে করুন৷ আমার এখন এসবের ইচ্ছে নেই। আর ঝুমুর এখন আমার বউ। আপনারা যান বিদায় হন।
,
শ্রাবণ ওর বাবাকে ভিতরে নিয়ে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। প্রচন্ড অপমানিত হয়ে চলে যাওয়ার আগে বাহিরে থেকে ঝুমুরের বড় ভাই লিমন চেচিয়ে বললো, আমরা আবার আসবো। তৈরি থেকো শ্রাবণ!
,
শ্রাবণের বাড়ির সবাই আতংকিত হয়ে গেছে। শোভন বললো, এখন কি করবি শ্রাবণ!
– দেখ ভাইয়া। ওরা যাই করুক৷ আমি ঝুমুরকে আমার কাছেই রাখবো।
,
শ্রাবণের মা চেচিয়ে বলছেন, ওই মেয়ের জন্য আমার ছেলের জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল। আর কোনো বিপদ চাই না আমরা।
শ্রাবনের মা শ্রাবণের কাছে এসে বলছেন, শ্রাবণ বাবা আমার কথা শোন, ফেরত দিয়ে দে ওই মেয়েকে।
– না! তোমরা যদি ওকে এখানে না রাখতে চাও তাহলে আমি ওকে নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকবো।
,
শ্রাবণের বাবা ফোন করে রাব্বিকে বাড়িতে আসতে বলেছেন। রাব্বি বাড়িতে আসার সাথেই শ্রাবণের বাবা বলে উঠলেন, এসেছো বাবা! বোঝাও তোমার বন্ধুকে। ও পাগলামো করছে।
,
রাব্বি শ্রাবণকে নিয়ে ছাদে চলে এলো।
– এসব তুই কি করছিস শ্রাবণ। ঝুমুরের বাপ ভাইরা খুব একটা সুবিধার নয়। সেসব জেনেও কেন ঝুমুরকে এখানে আটকে রাখতে চাইছিস!
– ঝুমুর এখন আমার বউ। ওকে এখানে রেখেই উচিত শিক্ষা দিবো সবাইকে। ওরা কি মনে করে নিজেদের!
– দেখ শ্রাবণ এতে তো তোর ক্ষতি হবে৷ এমনিতেই তুই ঝুমুরকে বিয়ে করেছিস। ঝুমুরকে শায়েস্তা করাই তো তোর জীবনের উদ্দেশ্য নয়। তোর একটা ভবিষ্যৎ আছে না?
– ভবিষ্যৎ! তো? আমি ঝুমুরকে ভালোবাসি।
– কি বললি তুই? তুই ঝুমুরকে চিনিস না! এসব জেনেও তুই ওকে কিভাবে,
– আমি প্রথম দিনেই ঝুমুরকে দেখে ঝুমুরের ছবি নিজের মনে এঁকে নিয়েছি। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে ঝুমুর নিজেই।
,
জানালার পর্দা বাতাসে উড়তে থাকায় সরাসরি রোদটা এসে ঝুমুরের মুখে লাগতেই ঝুমুরের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে বুঝতে পারলো এটা শ্রাবণের রুম। যেখানে শ্রাবণ ওকে কাল প্রথমবার নিয়ে আসে।
,
বিছানা থেকে উঠে বসতেই ঝুমুরের মনে পরলো কাল রাতে ছাদে বৃষ্টিতে ভেজার কথা। কিন্তু ওখান থেকে কখন রুমে চলে এলো সেটে তো মনে হচ্ছে না। কিভাবে কখন ছাদ থেকে সিড়ি দিয়ে নেমে হেটে এই রুমে আসলো সেটা কিছুতেই মনে পরছে না। এটা ভাবতে ভাবতেই ঝুমুর পেটে ব্যথা অনুভব করলো। শাড়িতে রক্ত লেগে আছে। বিছানাতেও কিছুটা রক্ত দেখতে পায়।
,
ঝুমুরের চোখ মুখ এবার শুকিয়ে গেল। তাহলে কি ঝুমুরের পিরিয়ড হয়ে গেল। এই অবস্থায় ঝুমুর কি করবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ দরজায় নক পরে। শোভা বললো, ভাবি ভিতরে আসবো?
,
ঝুমুর ভয়ে ভয়ে বললো, হ্যাঁ এসো।
,
শোভা ভিতরে এসে ঝুমুরের সামনে বিছানায় বসে বলছে, ভাবি তোমার নাকি জ্বর, ভাইয়া বললো!
,
ঝুমুর কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এদিকে পিড়িয়ড হয়ে যাওয়ায় ঝুমুরের অবস্থা খারাপ। বেট ব্যথায় কুকড়িয়ে যাচ্ছে। ঝুমুর পেটে হাত দিলো।
– কি হলো ভাবি। তোমার শরীর কি খুব বেশি খারাপ।
,
ঝুমুর আর চেপে রাখতে না পেরে সব বলে ফেললো।
,
ঝুমুরের বাড়িতে তান্ডব চলছে। ঝুমুরের বাবা চেচিয়ে বলছেন, আমার মামনিকে তোরা ওখানে একা ফেলে চলে এলি!
,
নিয়ন বললো, বাবা ওই শ্রাবণ আমাদের অভদ্র বলেছে। আমরা নাকি ওখানে গিয়ে পরিবেশ নষ্ট করেছি।
,
লিমনও বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলছে, হ্যাঁ বাবা! শ্রাবণ আমাদের অপমান করেছে। ওখানে প্রতিবেশীদের সামনে আমাদের মুখের ওপর দারজা লাগিয়ে দিয়েছে। ঝুমুরের সাথে দেখা পর্যন্ত করতে দেয় নি।
,
ঝুমুরের বাবা বললেন, ঠিকাছে” আমিও দেখবো আমার মামনিকে কিভাবে আটকে রাখে! এবার আমি পুলিশ নিয়ে যাবো।
,
সকালের খাবার খাওয়ার পর ঝুমুর শ্রাবণের রুমের ভিতর এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করছে আর বার বার দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, কাল রাতের পর শ্রাবণকে তো এই রুমে একবারও আসতে দেখলাম না। ওর মতলব তো আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!
,
চঞ্চল স্বভাব হওয়ায় কারণে ঝুমুর রুমের ভিতরে শ্রাবণের জিনিসপত্র হাতে নিয়ে ঘেটেঘুটে দেখছে। ঝুমুর শ্রাবণের ওয়ারড্রোবে হাত দিলো। ওয়ারড্রোবে শার্ট প্যান্ট,গেঞ্জি এসবের এক সাইডে একটা শাড়ি দেখতে পায়৷ শাড়িটা হাতে নিয়েই দেখলো এটা ওই শাড়িটা।যেটা মার্কেটের ভিতর শ্রাবণ খুলে নিয়েছিলো।
,
রাগে ঝুমুর শাড়ির দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে বলে উঠল, আবার রেখেও দিয়েছে!
,
শাড়িটা বিছানা ওপর রেখে আবারও ওয়ারড্রোবে হাত দিয়ে হাতাতে থাকে। প্রত্যেকটা ড্রয়ার খুলে খুলে দেখছে। এবার একটা ড্রয়ারের কোনায় সাদা গেঞ্জির নিচে একটা নুপুর দেখলো। নুপুরটা বের করে হাতে নিয়ে দেখতেই ঝুমুরের চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গেল। ঝুমুর খুব অবাক হয়ে নুপুরটার দিকে তাকিয়ে আছে।
,
চলবে….