রাগি বউ ১০ম পর্ব ও শেষ পর্ব

0
1868

#রাগি_বউ
শামিয়া খানম জিনিয়া
১০ম_পর্ব ও শেষ পর্ব
==========================
মেসেজে লেখা ছিল,
” রাগি বউ! রাগ খুব মারাত্মক জিনিস। রাগের কারনে মানুষের সংসার পর্যন্ত ভেঙে যায়। তোমার রাগের কারনেই তুমি তোমার বাবার বাড়ি চলে গেলে। আমি তোমাকে কখনো ফিরে আসতে বলবনা। জোর করে যে আর সংসার পাতা যায়না।
কিন্তু কিছু কথা জেনে রাখা জরুরী।
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ও আবদুল আ’লা ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) ….. আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সে লোক প্রকৃত বীর বিক্রম নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয় বরং প্রকৃত বীর বিক্রম সে-ই যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৪০৫, ইসলামিক সেন্টার ৬৪৫৬)।
দেখো কিভাবে কঠিন হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে হাদিসে রাগের ব্যাপারে।কুস্তিতে জয়ী হওয়ার থেকে রাগ কন্ট্রোল হওয়াকে বেশি গুরুত্বদেওয়া হয়ছে হাদিসে………!!!
রাগ এর কারনে সব কিছুই শেষ হয়ে যেতে পারে। আমি চাইলেই কিন্তু তোমার কাছে ফোন দিতে পারতাম। কিন্তু দিইনি, অভিমান বলে যে একটা শব্দ আছে।
সামান্য একটা নেকলেস এর কারনে তুমি কতগুলা মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছ। অথচ আমাদের প্রিয় নবীর সেই কষ্টের ইতিহাস তুমি কি করে ভুলে গেলে?
কত রক্ত, ঘাম আর অশ্রুমাখা সেই ইতিহাস তো তোমার অজানা ছিলনা। তবে আমি জানি তুমি শয়তানের ধোকায় পড়ে এমন টা করেছো।
তবুও আমি আর জোর করবনা তোমাকে……..
তোমার ইচ্ছা যদি হয় তো আসবে।
হয়ত অনেক বড় লিখে ফেললাম মেসেজ টা। যাই হোক আসল কথায় আসি,
” আমি বিদেশে যাচ্ছি ব্যবসার কাজে। মা অনেক অসুস্থ, তাই মায়ের চিকিৎসার জন্য আমাকে অনেক টাকা জোগাড় করতে হবে। না হলে হয়ত বিদেশেই যেতাম না।
মায়ের অসুস্থতার কথা জানানোর জন্যই তোমাকে মেসেজ দিয়েছি। ”
ভাবি বলল,
“মাহাদি কবে যাচ্ছে বিদেশে?”
“তা তো জানিনা ভাবি। ওসব তো কিছু লিখিনি আমায়।”
“তাহলে??? ”
“ভাবি আমি এক্ষুনি বাড়ি যাবো। ছেলেটার সাথে অনেক অন্যায় করেছি আর অন্যায় করতে চায়না আমি। ওর লেখা গুলো পড়ে বোঝা যাচ্ছে খুব অভিমানী মন নিয়ে মেসেজ গুলা লিখেছে…………!!!”
সত্যিই আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার নবীজী কত অভাবের মধ্যে দিয়ে প্রতিটা দিন পার করেছেন???
জানিনা মাহাদি চলে গেছে কি’না? পথ দিয়ে হাটতে থাকি হতাশ হয়ে………
আসলে আমার যে বাসে চড়ে যেতে হবে। তা তো আমি ভুলেই গেছিলাম। নিজের বিবেক কে বারবার ধিক্কার দিচ্ছিলাম। নিজের কৃতকর্মের কথা ভেবে খুব লজ্জিত হচ্ছিলাম………..!!!
পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি……
কোথা থেকে যেন একটা আওয়াজ কানে ভেসে আসে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কোন এক বৃদ্ধা আমায় ডাক দিচ্ছে আর বলছে,
” কি গো! পাগলি মেয়ে তোর বাড়ি কোথায়। তোর কি বাড়ি নাই??? এভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন???”
বৃদ্ধার কথায় আমার হুশ ফিরে আসে। বুঝতে পারি হাটতে হাটতে অনেক টা পথ চলে এসেছি। তাড়াতাড়ি একটা বাসে উঠে পড়ে শশুর বাড়ির দিকে রওনা দিই।
অপেক্ষার সময় গুলা অনেক কষ্টের হয়। তবু ও আমাদের সে সময় টাতে অনেক ধৈর্যধারন করতে হয়। আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হয়।
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ করে বাড়ি চলে আসলাম। বাড়িতে ঢুকেই সালাম দিলাম।
শিউলি আর আমার শাশুড়ি মা কে কেমন বিষন্ন দেখাচ্ছিল। আমায় দেখে শিউলি জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে……….!!!
আর বলে উঠে,
” আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেন ভাবি তুমি???”
শিউলির কথার উত্তর যে আমার জানা ছিলনা। মায়ের কাছে জিজ্ঞাস করলে মা জবাব দেয়
” তার তো আজ ৪ঃ০০ টার সময় ফ্লাইট। সে তো স্টেশন এ।”
” মায়ের কথা শুনে যেন মনে হলো আমি আকাশ থেকে পড়েছি। ৪ঃ০০ টা বাজতে তখন মাত্র ৪৯ মিনিট বাকি ছিল………..!!!!
হন্তদন্ত হয়ে আবার ও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। স্টেশনে যাবো বলে, ওর সাথে দেখা করব বলে।
খুব কষ্ট হতে থাকে আমার বুকের ভিতর। নিজের স্বামীর সাথে এতগুলা অন্যায় মেনে নিতে পারছিলাম না।
পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে
পড়ি……….
আবার ও দেখি সেই বৃদ্ধা পিছন থেকে ডাক দিয়েছে। বৃদ্ধাকে সব কথা খুলে বলি।
বৃদ্ধা আমায় বললেন,
” ওগো মেয়ে তাড়াতাড়ি যা! নিজের স্বামী কে ফিরিয়ে নিয়ে আয়। একবার হারিয়ে ফেললে আর ফিরে পাবিনা কিন্তু। রাগের বশে তুই খুব মারাত্নক কাজ করেছিস।
আজ যে আমি আমার নিজের দোষেই পথের পথিক। আমার স্বামীর সাথে কোন এক সকালে খুন ঝগড়া করেছিলাম। জানিস! তার কোন দোষ ছিল না। সামান্য একটা শাড়ি নিয়ে ঝগড়া করেছিলাম, ভাল দামি শাড়ি কিনে দেয়নি বলে। সেই যে বেরিয়ে যায় রাগে রাগে আর ফিরেছিলাম যেদিন। সেদিন তাকে আর পায়নি। তিনি চলে যায় না ফেরার দেশে। আজ আমার বাড়ি নেই ঘর নেই। আজ আমি শুন্য, একা একা পথে পথে ঘুরি। সেখান থেকে আর আল্লাহর আদেশের অমান্য ও আর করিনি। ”
বৃদ্ধার কথা শুনে আরো জোরে পথ চলতে থাকি। আর সবশেষে পৌছে যায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।
সামান্য একটু দেরির জন্য আমি হারিয়ে ফেলি ওকে। আমার যাওয়ার সাথে সাথেই ফ্লাইট ছেড়ে দেয়……..!!!!
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি আমি। বৃদ্ধার বলা প্রতিটা কথা অন্তরে তীরের মত আঘাত করে আমার ভিতর টা ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে।
পা যেন আর চলেই না। হাটতে থাকি এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে………!!!
ভেবেছিলাম বাড়ি আর ফিরবনা। বাড়ি ফিরে শিউলিকে ই বা কি জবাব দিব, তাকে তো বলে এসছি তার ভাইয়াকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব……….!!!
হাটতে হাটতে পৌছাই এক ইয়াতিম খানায়। যেখানে মা হারা বাবা হারা শিশুরা থাকে। ওদের কাছে গিয়ে ওদের কিছু খাবার কিনে দিয়েছিলাম।
মাহাদি তো এই দিনের ই স্বপ্ন দেখতো, দু’জন মিলে একসাথে অসহায় ইয়াতিম দের মুখে খাবার তুলে দিবে এমন আশায় করত ও।
কিন্তু আজ সে কোথায়?
আজ তো আমার সাথে নেই সে।
অশ্রুসিক্ত নয়নে মাহাদির শেখানো ওই হাদিস টা আজ বড্ড মনে পড়ছে,
রাসুল সাঃবলেন, ‘তোমরা কোন ভাল কাজকেই তুচ্ছ মনে কোরোনা। যদি ও তা পানি সংগ্রহকারীর পাত্রে তোমার বালতি থেকে কিছু পানি ঢেলে দিয়ে হোক না কেন। কিংবা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলে হোক না কেন। (সহিহ আদাবুল মুদরাহ হা/৯০১)
খুব কষ্ট হচ্ছিল, আমার। আর তারপর যা শুনেছিলাম। তা শুনে যে কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেছিল তা আমার জানা ছিলনা………..!!!
জ্ঞান ফেরার পরে আবার ও সেই বৃদ্ধাকে দেখতে পেয়েছিলাম। বৃদ্ধাকে দেখে বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে আবার ও কাঁদতে শুরু করি। চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বৃদ্ধা আমায় জিজ্ঞাস করলেন,
” কি রে বর চলে গেছে এত কাঁদছিস কেন?
ফিরে আসবে তো নাকি…………!!!”
” বুড়ি মা! মানুষের মুখ থেকে শুনলাম আজ যে ফ্লাইট টা ছেড়েছে সেটা এক্সিডেন্ট করেছে, ওই ফ্লাইট মধ্যেই যে ও ছিল।”
কথাটা বলে আবার ও কাঁদতে থাকি আমি। এবার আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করি……….
আসলে আমায় সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা বৃদ্ধা হারিয়ে ফেলেছিল……!!!
ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরব, বাড়ি না ফিরলে আমার শশুর, শাশুড়ি কে দেখবেই বা কে……???
আবার ও পথ চলতে থাকি……..
মনে পড়ে যায় তার সাথে কাটানো হাজার ও স্মৃতি। ওই যে ওর ডাক ছিল রাগি বউ! পথ চলতে মনে পড়ে যায় সেসব কথা…..
এটাই ছিল আমার রাগের পরিণতি। বুঝেছিলাম রাগ খুব খারাপ জিনিস………
বাড়িতে গিয়ে সবাইকে বলতে পারিনি যে ফ্লাইট এক্সিডেন্ট করেছে………
আমার শাশুড়ি মায়ের শরীর যে অসুস্থ। ওনি তো কোন রকমের প্রেসার সহ্য করতে পারবেন না।
“হারিয়ে ফেললে আপু তোমার স্বামীকে! তোমার রাগের কারনে????”
আমার জীবনের গল্প এখনো শেষ হয়নি রে……
এভাবেই কয়েকটা দিন কেটে যায়। আমি আবার ও একদিন সেই ইয়াতিম খানায় যায় ইয়াতিম দের কিছু সাহায্য করার জন্য…..
পিছন থেকে সেই চেনা সুর,
“কি গো রাগি বউ আমার স্বপ্ন তুমি একা একা পুরন করছো! তোমার মনে নেই আমি আর তুমি স্বপ্ন দেখতাম দু’জন মিলে অসহায় দের মুখে খাবার তুলে দিব………..”সত্যিই খুব অবাক লাগে ওকে দেখে…….
আল্লাহরর প্রতি শুকরিয়ায় চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসে…….
” আরে আপনি কিভাবে আসলেন?”
” আমি সেদিন টিকিট ছিড়ে ফেলেছিলাম। ভাবি আমাকে ফোন করে সব খুলে বলেছিলেন, আর তাই আমি দেশেই ভাল একটা কাজ খুঁজে নিই।
আমি জানি তুমি তোমার সব ভুল বুঝতে পেরেছো………..!!!
“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন? মসজিদে ছিলাম………”
” আর আমায় ছেড়ে যাবেন না কোনোদিন। দুনিয়াতেও না আর আখিরাতেও না। আমি থাকতে পারবনা আপনাকে ছাড়া। প্রতিটা দিন আমার কিভাবে কেটেছে জানেন???”
“ইনশাআল্লাহ! আল্লাহ তেমন আমল করার তৌফিক দান করুক যাতে আমরা জান্নাতে গিয়ে ও মিলিত হতে পারি……….!!!”
“আপনাকে আল্লাহর জন্য অনেক ভালবাসি…….!!!”
“কথাটা বলার সাথে সাথে লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলি আমি, জানো বৃষ্টি সেখান থেকে আর কখনো ওর ওপর রাগ করিনি। যদি ও কোন ভুল করতো তাহলে সেটাতে ও কিছু বলতাম না। কারন বুঝেছিলাম রাগ কতটা খারাপ জিনিস……….!!!”
“মাশ আল্লাহ তোমার জীবনের গল্প আমায় আবার নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগালো………!!!!”
“আমি তো আজ ও শাড়ি পরে ছবি উঠিয়ে রেখেছিলাম। ফেসবুকে দেব বলে। কিন্তু আমি চাইনা আমার সামান্য ভুলের কারনে সামান্য কয়টা লাইক কমেন্ট এর জন্যে জাহান্নামের আগুন কে আকড়ে ধরতে……….!!!
” দেখো আপু আজ থেকে ইনশাআল্লাহ শান্তির ধর্ম ইসলাম কে আকড়ে ধরবো। এতেই যে শান্তি তাছাড়া কোথাও শান্তি নেই। কোথাও মুক্তি নাই।
আল্লাহ আমদের সবাইকে রক্ষা করুক……..!!!
আমিন আমিন ছুম্মা আমিন……..!!!
আচ্ছা আপু রাগ থেকে মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে হাদিসে কিছু লেখা আছে???”
“অবশ্যই আছে।
৩০. রাগের মুহুর্তে যে নিজেকে বশ করে তার মর্যাদা এবং কিসের সাহায্যে রাগ দূরীভূত হয়
৬৫৪০-(১০৯/২৬১০) ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ও মুহাম্মাদ ইবনুল আলী (রহঃ) ….. সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে দু’ব্যক্তি কথা কাটাকাটিতে প্রবৃত্ত হলো এবং তাদের একজনের দু’ চোখ (রাগে) লাল হয়ে গেল এবং তার রগরেশ খাড়া হয়ে গেল। রসূলুল্লাহ বললেন, আমি এমন একটি কালিমাহ জানি, যা যে কেউ পাঠ করলে তার রাগ দূর হয়ে যায়। আর তা হচ্ছে ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﺍﻟﺮَّﺟِﻴﻢِ (আমি বিতাড়িত শাইতানের (শয়তানের) থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই)। (এ কথা শুনে) সে ব্যক্তি বলল, আপনি কি আমাকে পাগল মনে করেছেন?
রাসুল সাঃ এর উপদেশ “তোমরা রাগ কোরোনা।”(বুখারী)
বিঃদ্রঃ ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। প্রতিটি গল্পের শেষ পর্বে বড় করে মন্তব্য লিখবেন।
গল্প হতে কি শিখেছেন তা জানাবেন।
আল্লাহ সবাইকে ভাল রাখুক। নেক আমল করার তৌফিক দান করুক।আমিন।
সমাপ্ত