লালগোলাপ❤ Part-19-20

0
2264

লালগোলাপ❤
Part-19-20
Writer-Moon Hossain

#19 শীতলের জ্ঞান ফিরলো কয়েকদিন পর। বাঁচার কোন আশা ছিলোনা। ডক্টররা আশা ছেড়ে দিয়েছিলো। রাজ তখনো চুপচাপ ছিলো। কিছু বলেনি। আই সি ও এর পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ছিলো। সবাই শীতলকে নিয়ে ব্যাস্ত যে রাজকে লক্ষ্য করেনি কেউ। ডক্টরের মুখে শীতলের জীবন-মরণের কথা শুনে সে এক দৌড়ে মেডিক্যাল থেকে মসজিদে গিয়েছিলো। দিন রাত আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকতো আর প্রিয়তমা শ্রেয়সীর জন্য দোয়া করতো।
“হে আল্লাহ তায়ালা, আমার শ্রেয়সী কে তুমি ভালো করে দাও। আমি তো পাগল মানুষ, সবাই পাগল বলে, পাগলের দোয়া তুমি নাকি শুনো ও বলেছে। তাহলে আমার দোয়া কবুল করো। ওকে ভালো করে দাও। আমি আর কখনো ওকে ব্যাথা দেব না। কখনো দুষ্টুমি করবনা। মারামারি, ঝগড়াঝাটি, গালাগালি করবনা। বাবলু, হাবলুদের সাথেও মারামারি করবনা।
**রাসূলুল্লাহ (ﷺ ) বলেছেন, “যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তার দুই হাত তুলে দোয়া করেন, তখন তিনি (আল্লাহ) খালি হাত ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।” [তিরমিযি-৩৫৫৬]***। মাথায় প্রচন্ড আঘাতের ফলে তার কাছে চারপাশ এলোমেলো হয়ে আছে। ডক্টর জানালো সাময়িক সময়ের জন্য শীতলের অবচেতন মন কাউকে কিছু বুঝতে পারবেনা। ব্রেইনে চাপ পড়েছে। সময় হলে ঠিক হয়ে যাবেন উনি। শীতলের নরমাল হতে মাসখানেক সময় লাগলো। ডক্টর বলল- ডেন্জার সময়টুকু কেটে গিয়েছে। আর কোন ভয় নেই। তবে সাবধানে থাকতে হবে। শীতলের মাথায় ব্যান্ডেজ করা। ধীরে সুস্থে হাঁটা চলা করতে হবে তাকে। আরও কয়েকমাস কমপ্লিট বেড রেস্ট নিতে হবে।
শীতল মেডিক্যালে যাওয়ার পর থেকে মসজিদে ঢুকেছে আর বের হয়নি। কেউ তাকে বের করতে পারেনি।
সারাদিন নামাজ, কোরআনে তেলওয়াত করে আল্লাহর কাছে দোয়া করতো। বাকিটা সময় মসজিদের এক কোণে শুয়ে থাকতো হাত-পা গুটিয়ে।
মসজিদের ইমাম সহ বাকি মুসুল্লিরা রাজকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠানোর চেষ্টা করতো কিন্তু তাতে কোন লাভ হতোনা।
রাজ বলতো- আমি মসজিদ ছেড়ে গেলে ও মারা যাবে। আমি কখনো মসজিদ ছেড়ে যাব না। অবুঝ রাজের আল্লাহর প্রতি এতো নিষ্ঠা দেখে সবার চোখে পানি এসে গেলো।
.
শীতলকে বাড়িতে আনা হয়েছে। দুটো নার্সের ব্যাবস্থা করেছে তার শশুর।
শীতল সবাই কে দেখে খুশি হলো।
-এই যাত্রায় বেঁচে গেলাম আল্লাহর দয়াতে।
সবাই মাথা নাড়ালো।
বিকেল হয়েছে শীতল একবারও রাজকে দেখতে পেলোনা।
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে শীতল। একটু শব্দ হলেই মনে হয় এই বুঝি রাজ এলো।
কাউকে জিজ্ঞেসও করা যাচ্ছেনা রাজ কোথায়। শীতলকে দেখতে যারা আসছে তারা কেউ শীতলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেরা-ই হড়বড় করে কথা বলে।
শীতল কথা বলতে পারেনা, মাথায় চোট লাগতে পারে। ডক্টর নিষেধ করেছে।
ইনজেকশন দিয়ে শীতলকে ঘুম পাড়ানো হচ্ছে।
শীতল সপ্ন দেখলো রাজ তাকে জড়িয়ে ধরে নাক ঢেকে, গায়ের উপর হাত পা ছড়িয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে।
শীতলের ঘুম ভাঙলো তীব্র ব্যাথায়। শরীরে নয়, মনের ব্যাথায়।
শীতলের ঘুম ভাঙার পরেই সে লক্ষ্য করলো জানালার পাশে বেলকুনিতে কে যেন দাড়িয়ে আছে পর্দার আড়ালে।
পর্দা কাঁপছে।
ঐ তো চুল দেখা যাচ্ছে।
আতরের সুগন্ধিতে পুরো কামরা মৌ মৌ করছে।
দুটি চোখ যেন শীতল কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
মানুষটা একবার একটু মুখ বার করছে পর্দার আড়াল থেকে, আবার পর্দার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখছে।
শীতলের চোখে চোখ পড়তেই মানুষটা লুকিয়ে পড়লো পর্দার আড়ালে।
শীতলের ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে কাছে যেতে মানুষটার।
ডাক দিলেই মানুষটা দৌড়ে চলে আসবে কাছে।
কিছুটা ভয়, সংকোচ, আর লজ্জায় সে প্রকাশিত হচ্ছেনা।
আরেক বার মানুষটা উঁকি দিতেই শীতল হাত দিয়ে ইশারা করে অস্ফুটের স্বরে বলল-ওগো কাছে আসুন।
রাজ পুরো শরীর পর্দার আড়ালে ঢেকে শুধু মুখটা বের করলো।
-ওগো তুমি কেমন আছো?
– এতোক্ষণ ভালে ছিলাম না। আপনাকে দেখে ভালো হয়েছি।
-ইউ আর নাউ ফুল সুস্থ?
-ইয়েস, আই এম নাউ ফুল সুস্থ। ইউ আর মাই মেডিসিন।
বলেই শীতল মুচকি হেঁসে দিলো।
শীতল কাছে আসার জন্য ইশারা দিলো।
রাজ না সূচক মাথা নাড়ালো।
শীতল আবার ইশারা দিলো।
রাজ আবার মাথা না সূচক নাড়ালো। তবে এবার সে এতোবার মাথা নাড়াচ্ছে যে মাথা খুলে পড়ে যাবে এমন অবস্থা।
আহা! মানুষটা এমনিতেই মাথা ব্যথায় অস্থির থাকে আর এখন কিভাবে মাথা নাড়াচ্ছে। মাথার স্ক্রু এমনিতেই ঢিলে আর এখন এতো মাথা নাড়াচ্ছে যে, কখন না জানি মাথা খুলে পড়ে যায়।
শীতল এবার চোখ বড় বড় করে রাগী লুকে রাজকে ইশারা করলো।
রাজ গুটিগুটি পায়ে সামনে আসছে যেন কেউ দেখে না ফেলে।
-আমাকে একটু স্পর্শ করবেন?
-নো।
-কেন?
– তোমাকে টাচ করতে মানা করেছে ওরা।
-ওরা কারা?
-বাবা, রাফিয়া, রাফা।
-আর আপনি ওদের কথা শুনবেন?
-হু।
-আপনার কষ্ট লাগবেনা?
-হু। অনেক।
তোমার কাছেও আসতে মানা করেছে। তোমাকে দেখতেও মানা করেছে।
-এজন্যই কি আপনি লুকিয়ে ছিলেন?দেখা দিচ্ছিলেন না আমাকে?
-হু।
রাজের চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।
– শ্রেয়সী। আমি তোমার কাছে থাকলে তুমি একদিন মারা যাবে। আমি তোমাকে অলটাইম ব্যথা দিই।
আমি তো পাগল তাই কিছু বুঝতে পারিনা।
– মাথায় যতটুকু আঘাত পেয়েছি তারচেয়ে একশত গুন আঘাত বুকে পেলাম।
-আমার কাছে তেল আছে স্পেশাল। আমি মালিশ করে দিচ্ছি। বুকে আর ব্যথা করবে না।
শীতল হাত বাড়িয়ে রাজের হাত ধরে তাকে টেনে বিছানায় বসালো।
রাজ বারবার চারদিকে চোখ বুলাচ্ছিলো, যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে সর্বনাশ হবে।
– অন্যদিকে না তাকিয়ে আমার দিকে তাকান।
কেউ আপনাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবেনা আল্লাহ তায়ালা ছাড়া।
-আমি তোমার এখানে একটু থাকি? তারপর ঐ পর্দার আড়ালে চলে যাব।
রাজ কথা গুলো বলার সময় পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখ মুছবার চেষ্টা করছিলো বার বার। তাতে লাভ হলো না। চোখ মুছতেই আবার দু-চোখ পানিতে ভরে যাচ্ছে।
শীতল আহত চোখে রাজের চোখে তাকিয়ে আছে।
-কোথাও যাবেন না আপনি। আমার সাথেই থাকবেন আপনি। কথাগুলো মাথায় ঢুকিয়ে নিন।
-না।
-মানে?
-বাবা মানা করেছে। তুমিই তো বলো আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, বাবার কথা মেনে চলতে।
-আল্লাহ তায়ালা এটাও বলেছেন, বউয়ের সাথে থাকতে।
আপনি তাহলে আমার সাথে থাকবেন না কেন?
-বাট বাবা?
-সেটা আমি দেখব।
রাজ খুশি মুখে বলল- তেল মালিশ করব?
-কেন?
-তুমিই তো বললে, তোমার বুকে ব্যাথা করছে।
-জাস্ট সেট-আপ।
রাজ নিজের ঠোঁটে আঙুল দিলো।
রাজের হাত শীতল তার বুকের বাম-পাশে রাখলো।
-আমার বুকের ভেতরে ব্যাথা করছে। ঠিক এই জায়গায়।
আমাকে একটু আদর করুন। সব ব্যাথা চলে যাবে।
-করব বাট বাবা যে মানা করেছে।
-আপনি কি চান, আপনার আদরের মেডিসিনের অভাবে আমি মারা যাই?
রাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শীতলের কপালে একটা ডীপ চুমু খেলো।
মাথায় চুমু খেলো।
-তোমার মাথায় বেশি বেশি করে আদর করে দিচ্ছি।
দেখবে একটু পরেই বলে হয়ে যাবে।
-আপনি পাশে থাকলে আমি একদম সুস্থ হয়ে যাব।
আপনার স্পর্শ পেয়েছি, দেখবেন একটু পরেই ভালো হয়ে যাব।
রাজ বলল- তোমার এখানে আমি ইট দিয়ে আঘাত করেছিলাম তাইনা?
অনেক ব্যথা পেয়েছো তাইনা?
-আরে না না। বরং মজা লেগেছে।
-আর ইউ কিডিং মি?
-ওয়াও, আপনি কিডিং বুঝেন?
-তোমার স্বামী সব বুঝে।
তোমার অনেক ব্যথা লেগেছে তাইনা বলো?
আই এম সরি।
বলেই চোখের পানি মুছবার চেষ্টা করছে রাজ।
-ছেলেমানুষ কাঁদেন কেন? কাঁদে তো মেয়েরা।
আসুন চোখের পানি মুছে দিই।
-দাও।
শীতল রাজকে নিজের দিকে ঝুঁকিয়ে নিলো।
দু-জনের নিশ্বাস প্রসারিত হচ্ছে। দুটি চোখ যেন অন্য দুটি চোখের মধ্যে হারিয়ে যেতে চাচ্ছে।
শীতল রাজের দুচোখে দুটো চুমু দিলো।
চোখের পানি মুছে দিলো।
-আপনাকেও আদর করলাম। আর কাঁদতে পারবেন না।
-আই এম সরি।
কখনো তোমাকে আঘাত করবো না।
-আমি জানি।
আরেকবার সরি বললে খবর আছে।
-কটার খবর?
-তেরো টার।
-তুমি কি আমার উপর রাগ করেছো?
আর কথা বলবেনা?
-এখন তবে কে কথা বলছে?
-তুমি। আবার কে?
– আমি কখনো আপনার উপর রাগ করিনা।
কখনো করবোনা।
রাজ বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ে শীতলকে জরিয়ে ধরলো খুব শক্ত করে।
-আপনি এতোদিন আমাকে দেখতে আাসেন নি কেন?
-আমি তো বাড়িতে ছিলাম না।
-মানে? কোথায় ছিলেন?
-মসজিদে।
আল্লাহর তায়ালার কাছে দোয়া করছিলাম।
রাজ সব খুলে বলল সে এতোদিন যেভাবে মসজিদে থেকেছে।
-আপনি এতোদিন মসজিদে ছিলেন?
-হু।
-সারাদিন আমার জন্য দোয়া করেছেন? আল্লাহর এবাদতে মশগুল ছিলেন?
-হু।
-আমি…
-মসজিদ থেকে বের হলেই যদি তুমি মরে যেতে তাই বের হয়নি।
-আমার ভাগ্যে এতো সুখ কেন?
-আমি জানিনা।
-আমি এতো সৌভাগ্যবতী কেন?
-সেটাও আমি জানিনা।
শীতল রাজের দাঁড়ি গুলোতে হাত বুলিয়ে দিলো।
পাল্টা জবাবে রাজ চুল বুলিয়ে দিলো শীতলের।
আবারও দু-জনে নিশ্বাস যেন আঁটকে পড়লো।
খুব খুব কাছে থেকে দুজন দুজনকে অনুভব করছে তারা।
.
.❤মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নামের দুটি নাম (আরবি, বাংলা) ❤
❤২৩. ﺍﻟﺮَّﺍﻓِﻊُ আর-ঢ়¯ফি’ উন্নীতকারী।
২৪. ﺍﻟْﻤُﻌِﺰُّ আল-মু’ইয্ব সম্মানপ্রদানকারী ❤
.
চলবে…..

#লালগোলাপ❤
Writer-Moon Hossain
Part-20
আল্লাহর রহমতে শীতল আগের থেকে বেটার হয়েছে। শরীর স্বাস্থ্য আগের মতো হয়েছে। রাজ শীতলের জন্য দিন-রাত আল্লাহর কাছে এবাদত করেছে।
শীতলের সেবা করেছে।
যাকে বলে কঠিন স্বামী সেবা। ভালোবাসার সেবা।
সেই ভয়ংকর দিনটি এলো শীতলের জীবনে।
শীতলের শশুর তার ছেলেকে পাবনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলো অনেক আগে থেকেই।
রাজকে তিনি শীতলের দূর্বলতা দিয়ে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন।
-তুমি কি চাও তোমার বউ মারা যাক?
-নো, নো।
কখনো না।
-তুমি যে অসুস্থ সেটা জানো?
-হু।
-তোমার মাথা সব সময় ঝামেলা বাঁধাতে চায়, অন্যের ক্ষতি করতে চায়, এমনকি কাউকে খুনও করে ফেলতে পারো তুমি সেটা জানো?
-হু।
-তুমি বলো তোমাকে কি সাধারণ মানুষদের সাথে মানায়?
– নো।
-তোমার সাথে তোমার বউ থাকলে একদিন তাকেও তুমি মেরে ফেলতে পারো ভুল বশত। সেটা জানো?
-হু।
-আমি ভুল করে তোমার জীবনে মেয়েটাকে এনেছিলাম। কত বার তোমার জন্য মৃত্যুর মুখে পড়েছে সেটার হিসেব নেই। ওর জীবনটা নষ্ট হোক তা চায়না।
তুমি বরং তোমার নিজের জায়গায় ফিরে যাও।
পাবনা মেন্টাল হসপিটাল। সেটাই তোমার আসল জায়গা। এখানে তুমি কখনো সুস্থ হবেনা। পাবনা থেকে কতজন যে সুস্থ হয়েছে, তুমিও হবে। ইনশাল্লাহ।
-ইনশাআল্লাহ।
-তুমি তৈরি থাক।
-আচ্ছা।
-ভালো করে ভেবে নাও, ওখানে একবার গেলে ভালো হওয়া না পর্যন্ত তুমি আসতে পারবেনা।
-ওকেও দেখতে পারবো না ?
-না।
-ওকে ছাড়া আমার যে কিছু ভালো লাগেনা।
-তোমার বউকে দেখলেই তুমি বাসায় আসতে চাইবে চিকিৎসা ছেড়ে।
তারপর আবার উশৃংখল করবে। দেখা যাবে এমন একটা কাজ করেছো যে তোমার বউ আল্লাহ তায়ালার কাছে চলে গেলো তোমাকে ছেড়ে।
-নো, নো। ও আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা।
-ও যেনো তোমাকে ছেড়ে না যায় এজন্য তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে ওকে।
-বাট?
-তুমি কি তোমার বউয়ের ভালোর জন্যেও যাবেনা?
রাজ চুপ করে আছে।
-বৌমা বেঁচে থাকুক সুস্থ ভাবে সেটা চাওনা?
-চাই।
-তাহলে কি যাবেনা?
রাজ চুপ করে আছে।
বাবা আবার বলল- চুপ করে আছো যে? তুমি যাবেনা?
-যাব।
বাড়ির সবাই একমত হয়েছে রাজের পাবনা যাওয়ার বিষয়ে। সেখান থেকে কত মানুষ সুস্থ হয়েছে।
রাজও একদিন সুস্থ হবে আল্লাহর দয়ায়। আল্লাহ ভরসা।
শীতল এখন পর্যন্ত এই বিষয় জানেনা। রাজ কয়েকদিন ধরে কোন দুষ্টুমি করছেনা। একদম চনচলা ভাবটা আর নেই।
শীতলের নজর এড়ালো না।
রাজকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে তার সেই বিখ্যাত শরীর দুলিয়ে মুচকি হাসে।
শীতল এরপর আর কিছু বলতে পারেনা। তবে বাড়িতে তার আড়ালে কিছু একটা চলছে।
ঘুমুনোর সময় শীতল সব সময় দীর্ঘ হাদিস বলতো। হাদিসের কাহিনি বর্ণনা করতো। রাজ শুনতো মনোযোগ দিয়ে। শীতল আর রাজ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে টুকটাক হাদিসের কথা বলে। শীতলের ভালো লাগে বলতে আর রাজের ভালো লাগে শুনতে।
শীতলকে অবাক করে দিয়ে রাজ বলল-তুমি কি জানো যে–

– করাত দিয়ে চিড়ে যাকারিয়া নবীকে দুই খন্ড করে হত্যা করা হয়েছিলো।
– যাকারিয়ার পুত্র আরেক নবী ইয়াহইয়াকেও খুন করা হয়েছিলো।
– ইব্রাহীম নবীকে বিশাল বড় আগুনে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো।
– চরম বালা (পরীক্ষা) দেওয়া হয়েছিলো আইয়ুব নবীকে।
– মসীবতে ফেলা হয়েছিলো ইউনুস নবীকে।
– হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিলো ঈসা নবীকে।
আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি শান্তি ও দয়া বর্ষণ করুন।
.
– এছড়া মসজিদের ভেতরে নামায পড়া অবস্থাতে খঞ্জর মেরে শহীদ করা হয়েছিলো দ্বিতীয় খলিফা উমারকে।
– ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ক্বুরান তেলাওয়াত করা অবস্থাতে খুন করা হয়েছিলো তৃতীয় খলিফা উসমানকে।
– বিষাক্ত ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছিলো চতুর্থ খলিফা আলীকে।
– বর্শা দিয়ে লজ্জাস্থানে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছিলো এই উম্মতের প্রথম শহীদ সুমাইয়াকে।
– শহীদদের সর্দার, নবীর প্রাণপ্রিয় আপন আপন চাচা ও দুধভাই হামযাকে হত্যা করা হয়েছিলো, মৃত্যুর পরে তাঁর কলিজা খেয়েছিলো এক মুশরেক মহিলা, অবশ্য পরে সেই মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।
– একজন ক্বুরানের হাফেজ সাহাবীকে বর্শা দিয়ে এমনভাবে বিদ্ধ করেছিলো যে সেই বর্শা বুকের একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেকপাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলো। তবুও মৃত্যুর পূর্বে সে চিৎকার করে বলেছিলো, কাবার রব্বের কসম! আমিতো সফলকাম হয়ে গেছি।
আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।
.
পূর্ব যুগের লোকেরা কত কষ্ট করেছিলো, ঈমান আনার কারণে কাফের মুশরেকদের কত অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলো।

– মুসা নবীর যুগে ফেরাউন বনী ঈসরাল জাতির লোকদের কন্যা শিশুদেরকে দাসী বানিয়ে রাখতো আর পুত্র সন্তানদেরকে জন্মের পরেই হত্যা করে ফেলতো।
– সুরা বুরুজে বর্ণিত ঈমান আনারা কারণে আসহাবুল উখদুদ নামক এক জাতির লোকদেরকে আগুনের গর্তে ফেলে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো।
আমাদের তুলনায় তাদেরকে কি পরিমান কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিলো সেটা নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস থেকে জানা যায়।
.
সুতরাং, হে বন্ধু!
তুমি তোমার দুঃখ-কষ্টের ব্যপারে ধৈর্য হারিয়ে ফেলোনা। নবী-রাসুল, সাহাবা এবং অলি-আওলিয়া ও নেককার লোকদের মতো তুমিও বিপদে ধৈর্য ধারণ করো। আর তাঁদের মতো এতো বড় বিপদ বা কষ্টে পড়োনি দেখে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করো। আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগ দাও, নামায পড়ো, ক্বুরান পড়ো। আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরগুলো শান্তি পায়। সুতরাং, আল্লাহর যিকির দ্বারা তোমার অন্তরটাকে সুখী রাখার চেষ্টা করো।
.
মূলঃ শায়খ আব্দুল হা’মীদ ফাইযীর লিখিত “সুখের সন্ধানে”, পৃষ্ঠা ৭৬-৭৭। (সম্পাদিত)।
শীতল যেন রাজের কথা গুলো শুনে কোথায় যেন হাড়িয়ে গেলো। নবী-রাসুলের কষ্ট গুলো নিজের মধ্যে চলে এলো। কত কষ্ট সহ্য করেছে ইমান আনার জন্য আল্লাহর প্রতি। আল্লাহর পথে চলার জন্য কাফেররা কত নির্মমভাবে অত্যাচার চালিয়েছে।
-মাশাআল্লাহ!
এতো সুন্দর সুন্দর অনুপ্রেরণা মূলক হাদিসের কথা তো আমিও জানিনা।
রাজ একটু লজ্জা পেয়ে বলল- মসজিদের হুজুর বলেছে প্রতিদিন। আমি শুনে শুনে মনে রেখেছি।
-শুধু শুনে মনে রাখলেই হবেনা। আমাদের নিয়মিত আমল করতে হবে।
-ইয়েস। আমি আল্লাহর সব আদেশ শুনব, মহানবী (সাঃ) এর সব নির্দেশ মানব। তোমার সব কথা শুনব।
-আল্লাহ আপনার ইমান অটল রাখুক।
– আমিন। আমার পুরষ্কার দাও তাহলে এগুলো বলার জন্য।
শীতল রাজের গালে ঠোঁটের স্পর্শ দিলো।
-তোমার স্বামী হাদিসও জানে। সে সব জানে।
কারও সাহস নেই শীতলকে রাজের চলে যাওয়ার বিষয়ে বলা।
রাজ মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছে। শীতল এখন হাঁটাচলা করতে পারে।
মাথায় কিছু সেলাই খোলা হয়েছে। ব্যান্ডেজ নেই।
শীতলকে অবাক করে দিয়ে রাজ কোরআন তেলওয়াত শুনালো।
একে বলে আল্লাহর কুদরত। এতো শুদ্ধ আর সুরেলা ভাবে রাজ কোরআন তেলওয়াত করলো যে ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।
শীতল রাজকে তেলওয়াত শিখিয়েছে। রাজ মোটামুটি ভাবে শিখেছিলো। আনুষ্ঠানিক ভাবে তেলওয়াত কখনো করেনি রাজ।
-এতো শুদ্ধ ও সুন্দর করে কিভাবে পারলেন?
-তুমিই তো শিখিয়েছো।
ভুলে গেলে?
-জ্বি আমি। কিন্তু এতো সুন্দর করে কিভাবে তেলওয়াত করলেন?
-মসজিদে আমি সারাক্ষণ তেলওয়াত করতাম নামাজ পড়েই।
-ওআচ্ছা। এবার বুঝেছি। সারাক্ষণ তেলোওয়াত করার ফলে সুর এতো সুরেলা আর শুদ্ধ হয়েছে। একটুও ভুল হয়নি। কি নির্ভুল ভাবে তেলোওয়াত করলে।
-তোমার স্বামী কোরআন তেলওয়াত করতে জানে। সে সব পারে।
রাজ মিষ্টি করে মুচকি মুচকি হাসলো।
.
.
কাজের মেয়ে ভুল করে একদিন শীতলকে সেই ভয়ংকর কথাটা বলে দিলো।
শীতলের মাথায় আসমান ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো।
শীতল জ্ঞান হারালো।
খুব মাথা ব্যথা করছে।
শীতলের জ্ঞান ফিরতেই সবাকে দেখতে পেলো সে।
রাজ মাথার কাছে হাত ধরে বসে আছে।
রাফা, রাফিয়া পায়ের কাছে দাড়িয়ে আছে।
শীতলের শশুর পর্দার আড়ালে দাড়িয়ে ছিলো।
-বাবা এই সিদ্ধান্ত কিভাবে নিলেন?
-তোমাদের ভালোর জন্য নিতে হলো।
-আমি থাকতে আমার স্বামী পাগলা গারদে যেতে পারবেনা। উনার সকল দায়িত্ব আমার।
-সব রেডি বৌমা।
মানা করোনা।
যেতে হবে ওকে।
-বাবা উনি যেদিন এই বাড়ি থেকে বের হবেন, ঐদিন আমার লাশ বের হবে।
-বৌমা তুমি আমার মেয়ের মতো। নিশ্চয়ই চাইবেনা আমি তোমার পায়ে ধরি।
তোমার স্বামিকে পাঠানোর জন্য হলেও আমি কিন্তু এই কাজটা করব।
শীতল স্তব্ধ হয়ে গেলো।
রাতে রাজ শীতলের সাথে ঘুমুতে এলো।
রাজ শীতলের সাথে আগের মতোই ব্যবহার করছে। এতো বড় ঘটনা অথচ রাজের কিছু আসে যায়না।
-আমাকে কেন বললেন না? আপনি চলে যাবেন?
– বাবা নিষেধ করেছেন।
-আমাকে ছাড়া থাকতে পারবেন?
-না।
-তাহলে?
-আমি যাব।
-আমার হাত ছাড়া খেতে পারবেন?
-না।
-আমাকে ছাড়া ঘুম আসবে?
– না।
-ব্যথা পেলে আমার আদর ছাড়া ব্যথা কমাতে পারবেন?
-না।
– আমার সাথে খেলা ছাড়া আপনার দিন কাটবে?
-না।
-আমার জন্য আপনার বুকে ব্যথা করবে না?
-হু।
-এতোগুলা না নিয়ে যাবেন?
-হু।
– আমি কিভাবে থাকব? আপনাকে না দেখলে আমি তো এক সেকেন্ডও থাকতে পারিনা।
রাজ একটা ফাইল বের করে ছোট ছোট পাসপোর্ট সাইজের ফটো বের করলো রাজের।
জরুরি প্রয়োজনের জন্য তোলা হয়েছিলো।
ফটো গুলো শীতলের হাতে দিয়ে বলল- এই যে আমি।
আমাকে সব সময় দেখতে পাবে।
শীতল কে কাঁদিয়ে রাজ হাসছে।
তারপর বলল- আমার ক্ষিদে লেগেছে, খুব ঘুম পেয়েছে।
রাজ শীতলকে জরিয়ে ধরে শুয়ে পড়লো।
এতোক্ষণ শীতল যা বলল তাতে রাজের কিছু হলো না।
পাগল বলে কথা!
শীতল বসে আছে সোফায়।
রাজ নিজেই গোছগাছ করছে যেন ট্যুরে যাচ্ছে। হাসি হাসি মুখ করে সে শীতলকে বিধায় জানাচ্ছে।
রাজকে যা বলছে সেটাই সে করে এবং করছে এখন।
নতুন পাজামা -পাঞ্জাবি নিয়ে রাজ বলল- তুমি চোখ বন্ধ করো।
-কেন?
-আমি চেঞ্জ করব। আমার লজ্জা লাগছে।
-আচ্ছা।
উল্টো, পাজামা, পাঞ্জাবি পড়লো রাজ। টুপিও উল্টো।
জুতোর ফিতে অনেক চেষ্টা করে লাগাতে পারলো না সে।
একটা ব্যাগে কিছু পাজামা -পাঞ্জাবি ভরলো সে।
শীতল চুপচাপ শুধু কান্ড দেখছে।
রাজ হাসিহাসি মুখ নিয়ে শীতলের সামনে এলো বিধায় নিতে।
দুটো প্লাস্টিকের ছোট বোতল সে বের করলো।
-বোতল দিয়ে কি হবে?
-একটা কাজ করব।
একটা বোতল খুলে রাজ নিজের গায়ে উপুড় করে ধরে কিছুক্ষণ ঘষলো। তারপর একটু শুকে ছিপি লাগিয়ে দিলো।
অন্য বোতলটা নিয়ে সে একই ভাবে শীতলের গায়ে উপুড় করে ধরলো। কিছুক্ষণ ঘষাঘষি করে একটু শুকে ছিপি লাগালো।
রাজ ওর গায়ে ঘষা বোতলটা শীতলকে দিলো আর শীতলের গায়ে ঘষা বোতলটা নিজের ব্যাগে ভরে ফেললো।
শীতল বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। কিছু বুঝতে পাচ্ছেনা।
-তোমার গায়ের গন্ধ, সুবাস ছাড়া আমি ঘুমুতে পারিনা তো, তাই বোতলে তোমার গায়ের সুবাস ভরে নিলাম। ওখানে একটু পর পর খোলে শুকব।
তুমিও তো আমার গায়ের গন্ধ ছাড়া ঘুমুতে পারোনা, থাকতেও পারোনা। তাই তোমাকে আমার গায়ের গন্ধ, সুবাস দিলাম।
শীতল হৃদয় কেঁপে উঠলো।
রাজ প্রিয়তমা শ্রেয়সী স্ত্রীর কপালে শেষ চুমু দিয়ে বলল-
-শ্রেয়সী!
-জ্বি!
-আমি তাহলে আসি? আসসালামু আলাইকুম!
-ওয়ালাইকুম আসসালাম।
❤মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নামের দুটি নাম (আরবি, বাংলা)
❤২৫. ﺍﻟْﻤُﺬِﻝُّ আল-মুঝ়িল সম্মানহরণকারী
২৬. ﺍﻟﺴَّﻤِﻴﻊُ আস-সামী’ সর্বশ্রোতা❤
.
চলবে……..❤❤❤❤❤