লালগোলাপ? Last_Part_50?

0
2988

লালগোলাপ?
Last_Part_50?
Writer-Moon Hossain

গোলাপের কাঁটা এখন যতই খোঁচা দিক না কেন রাজ-শীতলের ভালোবাসায় তাতে আচঁড় লাগে না। কারণ গোলাপের কাঁটা গুলোর খোঁচা এখন ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।
গোলাপের কাঁটার খোঁচা মানেই অজস্র ভালোবাসা।
শীতল রাজের প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে রয়েছে। রাজ আর শীতলের গাঁয়ে যত লোম আছে তারচেয়ে বেশি আদর-সোহাগ-যত্নে ভরিয়ে রাখে দু’জন,দুজনকে।
রাজের জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে রেখেছে শীতল।
রাজের জীবনকে স্বয়ং সমপূর্ণ করেছে শীতল।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে পরিপূর্ণ করে বিবাহ দ্বারা।
রাজের যখন মাথায় সমস্যা হয়, যন্ত্রণা হয়, কষ্ট হয়, তখন শীতলকে দেখলেই ভালো হয়ে যায়।শীতলের স্পর্শ পেলেই সব যন্ত্রণা, ব্যাথা, কষ্ট দূর হয়ে যায়। হাওয়ায় মিলিয়ে যায় তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর মায়া ভরা মুখখানা দেখলে। পৃথিবীর সকল সুখ, খুশি, শান্তি যেন আল্লাহ তায়ালা শীতলের মধ্যে দান করেছে শুধু রাজের জন্য!! রাজ এখনো লুকিয়ে লুকিয়ে শীতলকে দেখে এবং সারাদিন তাকিয়ে থেকে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করে।। শীতল ঘোমটা টেনে রাজের দিকে আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে মাথায় ইশারা করে -কি আবার কি মাথার স্ক্রু ডিলে হয়ে গেলো? আমি বলুন তো কে? রাজ কথা শুনে লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসে!
শীতলেরও পৃথিবীর সকল দুঃখ লাগব হয় তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর নিষ্পাপ চেহেরাটা দেখলে।
রাজের দুষ্টুমি আর অবুঝ কথা গুলো শীতলের সবচেয়ে বেশি প্রিয়। মনে হয় ভালোবাসার অজস্র তীর যেন রাজ তার হৃদয়ে বিধস্ত করেছে। রাজের কাছে শীতল থাকা মানেও অজস্র ভালোবাসার তীর তার হৃদয়েও বিধস্ত হয়ে গেঁথে রয়েছে।
সাত বছর হতে চলেছে রাজ-শীতলের বিয়ের। শুরুতে তাদের বৈবাহিক জীবন বাকিদের মতো ছিলো না শত শত ত্যাগ স্বীকার করে তাদের ভালোবাসার পূর্ণতা পেয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর রহমত দান করেছে। অজস্র সুখ-শান্তি আল্লাহ তায়ালা তাদের ভালোবাসার অবুঝ ছোট সংসারে দান করেছেন। তারা এখন সবচেয়ে সুখী দম্পতি। দুজনের মধ্যে এখন আর চুল পরিমাণ ঝগড়া হয়না। তবে খুনসুটি লেগে থাকে। মান-অভিমান হয় খুব। কয়েক মিনিট পরেই আবার দুজন এক হয়ে যায়। একসাথেই দুজন দুজনের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেয়।
দু’জন দুজনকে ছাড়া এক মূহুর্ত থাকতে পারেনা। রাজ যতক্ষণ শীতলের কাছে থাকবে ততক্ষণ শীতলের আঁচল নিজের হাতে বেঁধে রাখাবে রাজ।
শীতল যেখানে রাজও সেখানে। কিছুই বুঝতে পারেনা দু’জন দুজনকে ছাড়া। একে অপরের জীবন। একজন আরেক জনের জীবনের উপর নির্ভর। প্রতিদিন রাজ শীতলকে নিয়ে রাতে বের হয়। খোলা মাঠে হাঁটে। মাঝে মধ্যে দৌড়ের প্রতিযোগিতা হয়।
শীতল একবার জিতে গেলে রাজ পরের বার তাকে ডাবল হারিয়ে দিয়ে চরম প্রতিশোধ নেয়। শীতল সেটা মনে মনে পুষে রাখে। হারিয়ে দেওয়ার প্রতিশোধ সে কড়ায় গন্ডায় রাজকে বুঝিয়ে দেয়।
মধ্য রাতে একসাথে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে দু’জন।
তাদের একসাথে থাকা মানে হলো খুশি। আলাদা খুশির খবরের প্রয়োজন পড়েনা। প্রায় সময় তারা শোকরানার নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানায়৷

শীতলের গায়ে কাঁথা দেওয়া হয়েছে। শীতলের ভোর থেকেই ব্যথা শুরু হয়েছে। এখন নয় মাস চলছে। সে প্রসব যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছে। ব্যাথায় নীল হয়ে চিৎকার করছে। হালকা কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ভেতর থেকে।রাজের কানে শীতলের চিৎকার গুলো ভেসে আসছে।ভোর থেকেই একটু পর পর চিৎকার করছে শীতল। থেমে থেমে কান্নাও করছে। ভয়ংকর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজ নিজেকে ধরে রাখতে পাচ্ছেনা। ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে। হাত ধরে চোখে চোখ রেখে ভরসা দিতে ইচ্ছে করছে – আমি আছি।
ভেতর থেকে আরও জোরে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
রাজ এবার হাটাহাটি শুরু করেছে টেনশনে। খুব অস্হির লাগছে ওর। ভয় লাগছে ওর।
ভয়ার্ত চোখে একটু পর পর ও দরজায় চোখ বুলাচ্ছে।
রাজ আল্লাহ তায়ালাকে বার বার ডাকছে। দোয়া-দরুদ পড়ছে। হঠাৎ সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। কান্নার আওয়াজ আসছেনা ভেতর থেকে। তাহলে কি রাজ ধরে নেবে সবকিছু কি ঠিক হয়ে গেলো?
শীতলের মা আর বোন কোমল তার কাছে রয়েছে।
রাজ দরজার বাহিরে অপেক্ষা করছে। ভেতর থেকে এটা সেটা আনার জন্য বলা হয়। কাজের মহিলারা যখন নিয়ে আসে তখন রাজ তাদের কাছ থেকে নিজেই নিয়ে ভেতরে এগিয়ে দেয়।দরজা খোলা হলে রাজ এক ফাঁকে শীতলকে দেখে নেয়।
শীতলের মা পর্দার আড়াল থেকে বলল- বাবা আপনি একটু বিশ্রাম নিন। সকাল থেকে আপনার উপর দিয়েও কম ধকল যাচ্ছে না।
-নো। আই এম অলরাইট।
আচ্ছা ওর কি সিচুয়েশন?
ও কেমন আছেন?
-ও কিছুনা। এমন হয় এসময়ে। শীতলের তো আগেও এমন হয়েছে।
-ওআচ্ছা। আচ্ছা এখন কেমন আছে ও?
সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না যে।
-এখন ঘুমুচ্ছে।
আপনি বাবা বিশ্রাম নিন।
রাজ করিডরে গিয়ে বসলো।
কেমন যেন লাগছে ওর। শীতলের জন্য বুকে তীব্র একটা ব্যথা সৃষ্টি হয়েছে।
নিজের প্রতি খুব রাগ লাগছে।
বাবা হওয়ার শখ এখন হারে হারে বুঝতে পাচ্ছে ও।
আচ্ছা মেয়েরা প্রেগন্যান্ট না হয়ে যদি ছেলেরা হতো? তাহলে কেমন হতো?রাজের জন্য ভালো হতো। উফফ,যদি এমনটা হতো তাহলে সবকিছু রাজের উপর দিয়ে যেত। শীতলের এতো যন্ত্রণা পেতো হতো না। সব যন্ত্রণা রাজ ভোগ করতো।
“হে আল্লাহ তায়ালা! তুমি পরম দয়ালু! পরম করুণাময়ী! সর্বশক্তিমান! সকল ক্ষমতার অধিকারী! আমার ভালোবাসা, আমার জীবন! আমার স্ত্রীর সকল কষ্ট দূর করে দাও। ওকে শান্তি দাও।
দয়া করো আমার প্রতি।
রাজ দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে আছে।
হাসান রাজের ঘাড়ে হাত রাখলো।

-কাল রাতেও ভালো ছিলো ও। আজ সকালেই এমন হতে হলো।
-টেনশন করবেন না।
আল্লাহ কে ডাকুন।
ভাবি সুস্থ হয়ে যাবেন।
-আচ্ছা হাসান বলতো ছেলেরা কেন প্রেগন্যান্ট হয়না?
-আল্লাহ তায়ালার নিয়ম এটা। উনি সবচেয়ে ভালো বুঝেন সবকিছু। তাই যাদের জন্য যা বরাদ্দ করা হয়েছে তার মধ্যে ভালো কিছু থাকে।
-ওর জায়গায় আমি থাকলে ভালো হতো। ওর এতো কষ্ট পেতে হতো না।
হাসান হাসলো!!
-তুমি হাসছো?
আমি যে কি পরিমাণ টেনশনে আছি সেটা বুঝতে পাচ্ছোনা।
-একটা কথা বলব?
-বলো?
-ভাবি খুব লাকি!!!
-ওআচ্ছা!
-আপনার মতো একটা স্বামী পেয়েছেন ভাবি।
একচুলি আপনারা দু’জনেই লাকি! আপনাদের ভালোবাসা সার্থক হয়েছে! সফল হয়েছে।
পৃথিবীর খুব কম মানুষের ভালোবাসা সফল হয়।
খুব কম মানুষ তাদের ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকতে পারে!!
ভেতর থেকে আওয়াজ হলো।
রাজ উঠে চলে গেলো দরজার সামনে।
পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পেতো হাসানের চোখের পানি।
হাসান গত সপ্তাহে লন্ডন থেকে দেশে এসেছে।
দেশে আপন বলতে কেউ নেই। দেশে যতবার আসা হয় ততবার রাজাদের এখানে আসতে হয়। গত সাত বছরে হাসানের চেহেরা চেঞ্জ হয়েছে।
চোখে চশমা উঠেছে। বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে।
বয়সের তুলনায় একটু বেশি বয়স্ক মনে হচ্ছে তাকে।
রাজ আর শীতল অনেক বার চেষ্টা করেছে হাসানের বিয়ে দিতে।
হাসান বিয়ের কথা শুনলেই শুধু হাসে!
ছাদে উঠে হাসান দাঁড়ালো রাফিয়ার দাড়ানো জায়গায়। যেখানে রাফিয়া সব সময় দাড়িয়ে থাকতো আর চোখের পানি ফেলতো।
হাসান প্রথম রাফিয়া কে দেখতে পায় তখনও রাফিয়া কাঁদছিলো।
কিছু মেয়েদের কান্নারত মুখ খানা দেখতে বড় ভালো লাগে। মায়া পড়ে যায়। মানুষ সব ছেড়ে থাকতে পারে কিন্তু মায়া ছেড়ে নয়।
সেদিন রাফিয়ার জন্য হাসানের মায়া জন্মে ছিলো। একটা ভালো লাগা কাজ করেছিলো। ভালোলাগা একসময় ভালোবাসায় পরিণত হয়ে যায়। রাফিয়ার ডায়েরি টা ওর কাছে আছে।
হাজার বারের মতো পড়েছে সে। এখন মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। ডায়েরি টা বুকের মধ্যে নিয়ে না ঘুমালে ঘুম আসেনা হাসানের দু-চোখে।
শীতলের মুখ লাল বর্ণ ধারণ করে কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। চোখ দিয়ে অনবরত পানি বের হচ্ছে। পেটে হাত দিয়ে দিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো সে।
রাজ নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। বার বার দরজা নক করছে। খোলা হচ্ছে না বলে সে দরজায় এখন লাথি দিচ্ছে। তার মাথা কাজ করছে না। কাজের লোকেরা কেউ রাজকে আটকাতে পারলো না। শীতলের কান্নার আওয়াজ তার কানে জলতরঙ্গের মতো বাজছে। এক মূহুর্তেরও জন্যও সে শীতলের কান্না সহ্য করেনা আর আজ ভোর থেকেই এমন কান্নার আওয়াজ শুনতে হচ্ছে প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর।
দরজা একটা সময় খুলে গেলো লাথির জন্য।
ভেতরের মেয়েরা ঘোমটা দিয়ে নিলো লম্বা করে।
শীতলের মা বলল- নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে কেন বুঝতে পাচ্ছিনা। এতোক্ষণ তো হয়ে যাওয়ার কথা।।
শীতলের হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো রাজ।
পেটে হাত বুলিয়ে দিলো কিছুক্ষণ।। কপালে চুমু দিয়ে হাতে চুমু খেতে গেলেই দেখলো পেলো লাল টকটকে কিছু একটা তরল পদার্থ।
রাজ আঙুল দিয়ে ঘষে বুঝতে পারলো রক্ত।
রাজ আতংকিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। শীতলের হাত ছেড়ে দিলো আপনাআপনি।
বিছানা টা লাল টকটকে রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। শীতলের শাড়িতে রক্ত লেগে আছে। রাজ ভয়ার্ত ভাবে শীতলের দিকে তাকালো।
রাজের দম বন্ধ হয়ে এলো।
বুকে তীব্র ব্যথা শুরু হয়েছে।
শীতল কান্না করতে করতে রাজের দিকে তাকালো অসহায় চোখে। রাজ শীতলের চোখে চোখ পড়তেই চোখ রাখার সাহস পেলো না সে।
শীতল ততক্ষণে আবারও আত্ম চিৎকার করতে লাগলো।
সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে। সময় হয়েছে। সবাই শীতলের কাছে গিয়ে তাকে ঘিরে ধরলো।
রাজ এক পা দুই পা করে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়লো। রাজ আর এক মূহুর্ত থাকতে পাচ্ছেনা এখানে। বেরিয়ে এসে দেয়ালে কিছুক্ষণ মাথা ঠুকলো। খুব অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। কি দরকার ছিলো শীতলকে কষ্ট দেওয়ার!সব ওর দোষে হয়েছে। রাজদের বিশাল বাড়িটা অন্ধকার হয়ে আছে। যে বাড়িটা সারাক্ষণ রাজ-শীতল আনন্দে মাতিয়ে রাখতো তা আজ স্তব্ধ, নীরব, অন্ধকার। বাড়িতে থাকা সব লোক উপরে শীতলদের কামরার সামনে দাড়িয়ে দোয়া-দরুদ পড়ছে। বাড়িটা যেন খা খা করছে। রাজ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। উদ্দেশ্যেহীন ভাবে ড্রাইভ করছে। মন বড় অশান্ত। যেখানে শান্তি পাবে সেখানে যাওয়ার উপক্রম নেই। শীতলকে রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় শুয়ে প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে থাকা দেখার সাহস তার নেই।
রাজ কখন ঘুমিয়ে পড়লো তার খেয়াল নেই।
নামাজ পড়ে সে মসজিদে বসে কোরআন তেলওয়াত করছিলো। খুশির সংবাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো।
তারপর চোখ লেগে কখন সেটা বোঝা গেলো না।
ইমাম সাহেবের ডাকে রাজ চোখ মেলে তাকালো।
মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখলো হাসান দাড়িয়ে আছে গাড়ি নিয়ে।
-আসসালামু আলাইকুম!
-ওয়ালাইকুম আসসালাম!
কি হয়েছে? তুমি মসজিদে? নামাজ তো শেষ!
-আপনাকে নিতে এলাম।
-খুশির সংবাদ দিতে এসেছো?
আমার কি মেয়ে হয়েছে?
-ভাইজান গাড়িতে উঠে বসুন।
-বলছো না কেন?
ছেলে হয়েছে না মেয়ে হয়েছে?
রাজ একবারও শীতলের কথা বলছেনা ভয়ে।
ক্লিনিকে রাজ বসে আছে।
কেউ কিছু বলছেনা।
রাজও কিছু জিজ্ঞেস করছে না। সে হাতের আঙুল দিয়ে কি যেন গুনছে। হাতে একটা কোরআন শরীফ আছে।
ডক্টর বলেছেন নাড়ির সাথে বাচ্চাটা পেঁচানো সিচুয়েশনে আছে সেজন্য নরমাল ডেলিভারি হবেনা। আর সিজারও সম্ভব না। অপারেশনের ধকল মা বাচ্চা কেউ নিতে পারবে না।
ডক্টররা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ডক্টররা রাজকে সান্তনা দিলো।
-মিঃ রাজ ধৈর্য ধরুন।মিসেস শীতল অল প্রবলেম কাটিয়ে সেরে উঠবেন। শি ইজ ভেরি স্ট্রং গার্ল।
সবাই ভেবেছিলো রাজ শীতলের সিচুয়েশনের কথা শুনে রেগে যাবে। মারধর শুরু করবে। চিৎকার করে গর্জন করবে। তেমন কিছুই হলো না।
রাজ শান্ত ভাবে কোরআন শরীফ নিয়ে হাটাহাটি করতে লাগলো করিডরে।
হাসান রাফিয়ার কবর স্থানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলো।
ডায়েরি টা তার সাথেই ছিলো।
রাফিয়া ছোট বেলা থেকেই ডায়েরি তে সকল ঘটনা লিখে রাখতো। হাসানের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেও সবকিছু সে ডায়েরিতে লিখে রাখতো।
হাসানের সাথে করা বাজে, কঠোর, অবহেলা, অপমান ইত্যাদি সব বিষয় গুলোও লিখা আছে। রাফিয়া স্পষ্ট করে হাসানকে পছন্দ করতো এমন কিছু লিখেনি।
আবার রাফিয়ার ডায়েরিতে একমাত্র ছেলে বলে হাসানের উল্লেখ আছে। হাসানের প্রতিটা বিষয় লিখা আছে। কোনদিন, কখন, কটায় তাদের দেখা হয় এবং হাসান কি রংয়ের পোশাক পড়ে তাও লিখা রয়েছে। হাসানের পছন্দের খাবার সহ যাবতীয় কিছু পছন্দ-অপছন্দের উল্লেখ আছে। পুরো ডায়েরিটা জুড়ে শুধু হাসান, হাসান, হাসান। ভালোবাসি কথাটা সরাসরি বলতে হয়না, মনের মধ্যে রেখে ভালোবাসি কথাটা বলা হয়ে যায়। শুধু যে মিলন হবে এটাই একমাত্র ভালোবাসা নয়।দূর থেকে মনের মিলনও ভালোবাসা।
রাফিয়ার মৃত্যুর আগে হাসান জিজ্ঞেস করেছিলো – আল্লাহর নাম নিয়ে বলো তুমি কিভাবে ঘটলো?
প্রতি উওরে রাফিয়ার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দেখা গিয়েছিলো। রাফিয়ার বেচারা স্বামী বলেছিলেন তারা ছাদে জোছনা দেখছিলো। আকাশে স্পষ্ট চাঁদ ছিলো। রাফিয়াও বেশ হাসি-খুশি ছিলো।
রাফিয়ার মৃত্যুর রহস্যটা ডায়েরিতে লিখা নেই, রাফিয়ার সাথে সাথে তার মৃত্যুর রহস্যটাও কবরে দাফন হয়ে রয়েছে। একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা অবগত।
আজ দুদিন হলো শীতল ক্লিনিকে আছে। সিচুয়েশন আরও জটিল হচ্ছে।
রাজ শীতলের কাছে এসে বসেছে। শীতল ঘুমিয়ে ছিলো।
রাজ স্পর্শ করতেই চোখ মেলে তাকালো শীতলের দিকে।
– আসসালামু আলাইকুম! কেমন ফিল করছো?
-ওয়ালাইকুম আসসালাম!
আলহামদুলিল্লাহ!
– এতোকিছুর পরেও আলহামদুলিল্লাহ বলছো?
শীতল হাসলো!
রাজও হাসলো!
-আপনি কখন খেয়েছেন। আচ্ছা কটা বাজে?এখন কোন সময়ের খাওয়ার সময়?
-আমি খেয়েছি।অস্হির হওয়ার কোন কারণ নেই। শান্ত হও!
-আজ কত তারিখ?
-২২-০৩-২০২০। এবার খুশি?
শীতল হাসলো।
-এখনও কি ব্যথা করছে?
-নাতো।
-তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে।
আমি বুঝতে পারি।
-মোটও না। এরা স্বাভাবিক।
যদি প্রেগন্যান্ট হতে তবে বুঝতেন।
রাজ হাসলো।
মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে চোখের পানি মুছলো।
শীতল যেন না দেখে সেজন্য। রাজের চোখে পানি দেখলে শীতল টেনশন করবে।
শীতল আল্লাহর কাছে মাফ চাইলো মিথ্যে বলার জন্য।
তার ব্যথা হচ্ছে কিন্তু রাজের মানসিক সিচুয়েশনের কথা চিন্তা করে সত্যিটা বলেনি।
-তোমার কি বাড়ির খাবার খেতে ইচ্ছে করছে?
-আমার পেট ভরা।
-কই কিছুই তো খেতে দেখলাম না।
-আমার হাতে দেখুন কিসের সুচ? আমাকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে তাই আমি সব সময় খাচ্ছি। আমার পেট ভরা।
রাজ হাসলো।
রাজও আল্লাহর কাছে মাফ চাইলো মিথ্যে বলার জন্য কারণ সে কিছুই খাইনি দুদিন ধরে। শীতল কষ্ট পাবে তাই সত্যিটা বলেনি।
রাজ শীতলের গলায় মাথা রেখে শুয়ে আছে।
শীতল মাথায় হাত বুলিয়ে বলল- তিনজন মেয়ের বাবা এভাবে ছেলেমানুষী করে?
-একশত বার করব।
কোথায় লিখা আছে তিনজন মেয়ের বাবা ছেলেমানুষী করতে পারবেনা? আন্স মি?
শীতল বলল- আমাদের মেয়েরা কোথায়?
-আমাদের মেয়েরা কোমল আপার সাথে রয়েছে। আপা দেখাশোনা করছেন।
-ওরা এখন কি করছে না জানি!
-তোমার টেনশন হচ্ছে?
-না। একদম না। আপনি ওদের বাবা। আপনি ওদের এমন ভাবে রাখবেন যেন আমার টেনশন না হয়।
-ওদের মিস করছো?
-অনেক। ওরাও আমাকে মিস করছে। জান্নাত খুব ছোট। ও তো আমাকে ছাড়া কারও হাতে খেতে চায়না। আপনার মতো হয়েছে ঠিক।।
-দেখতে হবে না কার মেয়ে।
টেনশন নিয়ো না। আমি ওদের খাইয়ে দিয়েছি। ওরা ভালো আছে। আশায় আছে কখন তুমি নতুন ভাই অথবা বোন নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
-ওরা আসতে চেয়েছিলো এখানে?
– হু। তবে জান্নাত খুব কান্নাকাটি করেছিলো। আমার সাথে আসতে চাচ্ছিলো।
-ওদের মুখ খানা দেখলে শান্তি পেতাম।
-ওদের দেখতে ইচ্ছে করছে?
-খুব।
-এখানে এখুনি নিয়ে আসছি।
-না না। দয়া করে আনবেন না। আমার এই সিচুয়েশন দেখলে কান্নাকাটি করবে।
তারচেয়ে ওদের আরেকটা ভাই বা বোন হবে একারণে মা ক্লিনিকে আছেন এটা ভেবে আনন্দ করুক।
রাজ অনেক ক্ষণ শীতলের গলায় মুখ গুজে থাকলো। শীতল হাত বুলিয়ে দিলো।
রাতে রাজ শীতলের সামনে বসে খাচ্ছে। সামনে অনেক খাবার। শীতল আবদার করেছে রাজ যেন তার সামনে খায়। রাজকে বাধ্য হয়ে খেতে হচ্ছে। যদিও খাবার গলা দিয়ে ফাঁসের মতো লাগছে। শীতলের কথা ফেলতে হবে ভেবে খেতে হচ্ছে। শীতল জানে রাজ কিছু খাইনি। রাজের একটু পর পর খাওয়ার অভ্যাস। তাই বুদ্ধি করে রাজকে সামনে বসে খাওয়ানোর আবদার করেছে সে। রাজের খাওয়া দেখে অনেকটা শান্তি পেলো শীতল।। খাওয়ার মাঝেই শীতল আহ! করে উঠলো।
ব্লিডিং হচ্ছে। বিছানা মেখে যাচ্ছে। প্রায় শীতলের এমন অসহনীয় ব্যাথা শুরু হয়। সাথে ব্লিডিং। শীতল চেষ্টা করেও চিৎকার থামাতে পারলো না। ব্যথায় কুকরে যাচ্ছে। ডক্টর নার্স ছুটে এলো।
রাজ কি করবে ভেবে পেলো না। সে ঢোক গিলছে।
শীতল বলল- দোহায় লাগে। আপনি চলে যান। ক্লিনিকে আর আসবেন না। আপনার সহ্য হবেনা।
চলে যান।রাজ শীতলের ব্যথা কমানোর উপায় খুঁজছে। হঠাৎ রাজ টেবিলে থাকা কোরআন শরীফ শীতলের পেটের উপর রেখে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে ভীতুর মতো।
শীতলের কেবিনের দরজা ভেতর থেকে লক করা হলো। লক থাকলেও শীতলের চিৎকার ভেসে আসছে।যা রাজের কানে মৃত্যু যন্ত্রণার মতো শোনাচ্ছে।
.
রাজ ভোরে ফিরলো মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ পড়ে। এই কয়দিনে একমাত্র একটু শান্তি অনুভব হচ্ছে মসজিদে গিয়ে। এছাড়া প্রতিটা সেকেন্ড কি পরিমাণ কষ্টে কাটছে রাজের তা আল্লাহ তায়ালা জানেন। আল্লাহ মহান, দয়ালু, সর্বশক্তিমান।
শীতল ঘুমুচ্ছো ক্লান্ত হয়ে। শীতল পুরোপুরি রোগা-জীর্ণশীর্ণ হয়ে আছে।
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম শীতলের। রাজ মুছে দিয়ে শীতলের রুক্ষ ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। এক হাত দিয়ে মাথায় আর অন্য হাত দিয়ে পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আলতো ভাবে রাজ।
শীতলের চোখ খুললো এগারোটার দিকে।
রাজের চোখ মুখ ফুলে ফেঁপে একাকার! শীতল বুঝতে পারলো রাজ কেঁদেছে।
এই পরিবেশে দুজন দুজনকে কি বলবে তা খুঁজে পেলো না।
নিরবতা ভেঙে শীতল বলল-
-একটা কথা বলব?
-একশত টা বলতে পারো।
-আচ্ছা আবার যদি মেয়ে হয়?
-সো ওয়াট।
-আপনি কিছু মনে করবেন?
-অবশ্যই মনে করব।
শীতল ভয়ে বলল -কি?
-অনেক খুশি হবো আর কি? আমার মেয়ে হলে এবারও পুরো ময়মনসিংহের লোক কে কবজি ডুবিয়ে খাওয়াব।
-আপনি কি আমাদের উপর রাগ করেছেন?
-আমাদের বলতে?
-মানে আমি আর আমার মেয়েরা।
-তুমি আর মেয়েরা কি আমার নও? আমি কি তোমাদের নই? এখানে তুমি তোমাদের ওয়ার্ড টা ব্যবহার করেছো কেন?
– সিচুয়েশন অনুযায়ী বলেছি।
এখন বলুন আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?
আমাদের মেয়েদের উপর রাগ করেছেন?
-কিসব বলছো? এই সিচুয়েশনে?
তুমি আর আমাদের মেয়েদের উপর খামকা রাগ করবো কেন? তোমরা আমার জীবন৷
বংশে একটা ছেলে থাকা দরকার এটা সবাই চায়? মন থেকে বলুন?
রাজ শীতলের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো।
তারপর বলল- হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে,

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ঐ স্ত্রী স্বামীর জন্য অধিক বরকতময়, যার দেন-মোহরের পরিমান কম হয় এবং যার প্রথম সন্তান হয় মেয়ে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, “যার গৃহে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহন করল, অতঃপর সে তাকে (কন্যাকে) কষ্টও দেয়নি, তার উপর অসন্তুষ্ট ও হয়নি এবং পুত্র সন্তানকে প্রাধান্য দেয়নি, তাহলে ঐ কন্যার কারনে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।” (মুসনাদে আহমদ, ১:২২৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন,” যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান হবে, এবং সে তাদেরকে এলেম-কালাম, আদব-কায়দা শিক্ষা দিবে, এবং যত্নের সাথে প্রতিপালন করবে ও তাদের উপর অনুগ্রহ করবে, সে ব্যক্তির উপর অবশ্যই জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। উল্লেখিত বর্ণনা দ্বারা প্রমানিত হয় যে, কন্যা সন্তান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নেয়ামত। সুতারাং-

কন্যা সন্তানকে বেশী করে ভালবাসুন। আদর-সোহাগ করুন আর মায়া-মমতা দিয়ে লালন-পালন করুন। সে তো আপনার কলিজার টুকরার টুকরো, দেহের এক বিশেষ অংশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অসীম বানীর প্রতি লক্ষ্য রেখে কন্যা সন্তানকে পুত্রের চাইতে ও বেশী আদর যত্ন করুন। এখানে একটি বিষয় আলোচ্য হলো, কন্যা সন্তান আল্লাহ মহান প্রদত্ত নেয়ামত ঠিক কিন্তু পুত্র সন্তানও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। এই আলাচেনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কন্যা সন্তানের প্রতি বিরুপ মানসিকতা পরিহার করা। একমাত্র ছেলে সন্তানের কামনায় কন্যা সন্তানকে অবহেলার পাত্র না বনানো।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র কোরান ও হাদিসের বর্ণনা মেনে কন্যা সন্তানকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রদত্ত নেয়ামত করার এবং কন্যা সন্তানের সাথে ব্যবহার করার, নায্য প্রাপ্ত প্রদান করার ব্যাপারে কন্যা সন্তানকে উপযুক্ত-

মর্যাদা প্রদান করার তাওফিক দান করুন। আমিন।-জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১২ অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- مَنْ كَانَ لَهُ ثَلاَثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلاَثُ أَخَوَاتٍ أَوْ ابْنَتَانِ أَوْ أُخْتَانِ فَأَحْسَنَ صُحْبَتَهُنّ وَاتّقَى اللّهَ فِيهِنّ فَلَهُ الجَنّةُ. যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান বা তিনজন বোন আছে অথবা দু’জন কন্যা সন্তান বা বোন আছে। সে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করেছে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করেছে। তার জন্য রয়েছে জান্নাত।

জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৬ দেখুন, এ ফযীলতের কথা পুত্র সন্তানের বেলায় বলা হয়নি। বরং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। এজন্য আমাদের উচিত কন্যা সন্তানের লালনপালন সন্তুষ্টচিত্তে করা। কন্যা সন্তান জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় হযরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ ابْتُلِيَ بِشَيْءٍ مِنَ البَنَاتِ فَصَبَرَ عَلَيْهِنّ كُنّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النّارِ. যে ব্যক্তিকে কন্যা সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সে ধৈর্যের সাথে তা সম্পাদন করেছে সেই কন্যা সন্তান তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড় হবে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৩ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হওয়া দেখুন! জান্নাতে প্রবেশ করার মাধ্যমও হল কন্যা সন্তানের লালনপালন করা। আবার জাহান্নাম থেকেও-

মুক্তি মিলবে কন্যা সন্তানের উত্তমরূপে প্রতিপালন করার দ্বারা। এর চেয়ে বড় আরেকটি ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আনাস রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ دَخَلْتُ أَنَا وَهُوَ الجَنّةَ كَهَاتَيْنِ، وَأَشَارَ بِإصْبعَيْهِ. যে ব্যক্তি দুইজন কন্যা সন্তানকে লালনপালন ও দেখাশুনা করল [বিয়ের সময় হলে ভাল পাত্রের কাছে বিবাহ দিল] সে এবং আমি জান্নাতে এরূপ একসাথে প্রবেশ করব যেরূপ এ দুটি আঙুল। তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখালেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৪ কন্যা সন্তান প্রতিপালনের তিনটি ফযীলত সকল ফযীলতের সারমর্ম হল তিনটি জিনিস।

এক. আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। দুই. জান্নাত দান করবেন। যা নিআমত ও আরাম আয়েশের স্থান। তিন. আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য দান করবেন। যা সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ তিনটি ফযীলত বর্ণনা করেছেন কন্যা সন্তান লালনপালনকারীদের জন্য। কন্যা সন্তানের জন্মে অধিক আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের শিক্ষা হল, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে আনন্দ প্রকাশ করা; তাইতো কন্যা জন্মের সংবাদকে ‘সুসংবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর সুসংবাদ শুনে মানুষ আনন্দই প্রকাশ করে।
রাজ শীতলের গালে নাক ঘষে দিলো।
-আমি চাই আমার সব মেয়ে হোক।
-সব মানে? আর কত চান?
-১০টা মেয়ে তো চাই কমপক্ষে।
-কি? ১০টা মেয়ে কমপক্ষে?
-ভয় পেলে চলবে না।
এতোটুকু তে ভয় পেলে হয়? আমাদের আরও ৬টা বেবি হতে হবে।
তাই দয়া করে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে নাও। পরের বেবির জন্য তো প্রিপ্রারেশন নিতে হবে।
শীতল লজ্জা পেলো।
-আহা! দেখ দেখ আমার বউটা কতটা লজ্জা পেয়েছে। ফেসটা লাল হয়ে গেলো।তোমাকে দশজনের মা বানাব। আমরা দশজন মেয়ের বাবা মা হব। সবাই কে বিয়ে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে একেক জনের বাড়ি বেড়াতে যাব। হা! হা!হা!।
শীতল লজ্জায় রাজের বুকে মুখ লুকালো।
তাদের প্রথম মেয়ে হয়েছিলো প্রথম মধুচন্দ্রিমায়। তখন কুয়াকাটা বেড়াতে গিয়েছিলো ওরা। শীতল কুয়াকাটা একটুও ঘুরতে পারেনি রাজ ওকে কামরায় বন্দিনী বানিয়ে রাখলো পরম আদরে! কুয়াকাটা থাকতেই শীতল বুঝতে পারলো তার মধ্যে একটা অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ঘুমুতে যাওয়ার সময় শীতল হঠাৎ রাজের কানে কানে বলল- নতুন অতিথি আসছে!! রাজ আচমকা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো। শীতলের দিকে কেমন করে যেন তাকালো।
শীতল অবাক হয়ে বলল- এভাবে তাকানোর কি হলো? একটা বিবাহিতাা মেয়ে কি প্রেগন্যান্ট হতে পারেনা? রাজ এতো খুশি হয়েছিলো যে বিশ্বাস করতে পাচ্ছিলো না।
রাজ খুশির জোয়ারে সেন্স লেস হয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো।
শীতল হতভম্ব!!
তাদের ২য় মেয়ে হওয়ার সময়ও এক কান্ড। সিলেট বেড়াতে গেলো ঠিকই কিন্তু কোথাও ঘুরতে পারলো না শীতল রাজের জন্য। আবারও সে স্বামীর ভালোবাসায় বন্দিনী হয়ে রইলো।
যখন ৩য় মেয়ের সময় ওরা গেলো বান্দরবান। এখানেও সেই এক ঘটনা!!! বেড়াতে এলে এতো আদর- ভালোবাসা কোথা থেকে আসে সেটাই শীতল রাজকে প্রশ্ন করে। রাজ উওরে শুধু মুচকি মুচকি হাসে।
এবার শীতল মা হওয়ার সময় ছিলো সুন্দরবনে।
এবারের টা ভিন্ন হলো। এবার রাজ না শীতল কোথাও ঘুরতে গেলো না। সে নিজেই স্বামীর আদর-সোহাগ-ভালোবাসায় এরেস্ট হলো যাকে বলে আত্মপক্ষ সমর্পণ!!!!
রাজ দারুণ খুশি হয়েছিলো।
-যাকবাবা,নিজ থেকে বউয়ের আদর-সোহাগ তাহলে কপালে জুটলো।
-ভালো হবেনা বলে দিলাম।
-ওরে বাবা, লজ্জায় দেখি আমার বউটার ফেস গোলাপি-বেগুনি হয়ে গেলো। হা!হা!হা!।
শীতল রাজের হাসি শুনে ভীষণ রেগে গেলো। রাজের হাসি থামাতে সে তার ঠোঁট রাজের ঠোঁটে মিশিয়ে দিলো!! এবার হাসুক দেখি!!
শাকিলার স্বামী শীতলের চিকিৎসার তত্ত্বাবধানে আছেন। লেডি ডক্টর রা সার্বক্ষণিক শীতলের সাথে আছেন। ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া হাতে অপশন নেই। সিজারে মা-শিশু দুজনের ক্ষতি হতে পারে। শাকিলা ছেলে-স্বামীর সাথে গত মাসেই জার্মান থেকে দেশে এসেছে।
শীতলের জন্য তার বুকে খুব সূক্ষ্ণ একটা ব্যথা অনুভব হচ্ছে। বেচারি বিয়ের পর থেকে শুধু যন্ত্রণা পেলো। আহারে!!
রাতে শীতল স্বাভাবিক ভাবে রাজের সাথে কথা বললো।
রাজ অনর্গল এটা সেটা বলে শীতলকে টেনশন ফ্রী করেছে। তাকে ভরসা দিয়ে পাশে আছে।
শীতলের কপালে চুমু খেয়ে রাজ বলল- আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। জেগে থেকে আমার জন্য পেটে ব্যথা সহ্য করতে হবেনা।
শীতল রাজের হাতটা খপ করে ধরে বলল-আমার খুব ভয় লাগছে! কাল না জানি কি হয়! আপনি আমার সাথে কেবিনে থাকবেন। আমার হাত ধরে তাহলে আমি আল্লাহর রহমতে আজরাইলের সাথেও লড়াই করতে পারবো।
রাজ শীতলকে উওর স্বরুপ আলতো ভাবে জরিয়ে ধরলো যেন পেটে চাপ না লাগে।
নাকে নাক ঘষে দিলো। একজন নারীর আল্লাহর পর স্বামীর ভরসা পেলে আর কি চায়!
ভোরে শীতল একটা ফুটফুটে ছেলের জন্ম দিলো!!
রাজ তাকে কোলে নিয়ে খুশিতে আত্মহারা হলো।
কত যুদ্ধের পর জয় হলো তাদের। ওদের ফুটফুটে ছেলেটা তার বড় বোনদের সাথে তাদের বিশাল অট্টালিকায় বড় হতে লাগলো হেসে-খেলে-আনন্দে!! বাড়িটা মাতিয়ে রাখে ছোট ছোট ভাই বোনরা মিলে।
বসন্ত কাল চলছে। চারদিকে ফুল ফুটে আছে। বিশেষ করে টকটকে লাল গোলাপ শীতলের পছন্দ।
বাড়িটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। লোকজনের সমাগম হৈ-হুল্লোড়েরেে মেতে উঠেছে।
রাজ ইজিচেয়ারে বসে আছে। সবুজ জামদানী আর গহনা পড়ে শীতলকে খুব মানিয়েছে। রাজ চশমা খুঁজতে হাত বাড়ালো।
জান্নাত বলল- এই তোমার চশমা! দেখি পড়িয়ে দিই।
রাজ চশমা পড়লো।
-আমাকে কেমন লাগছে?
রাজ হা করে তাকিয়ে রইলো।
-উফফ, বাবা তুমি আবারও ভুল করে আমাকে মা ভেবেছো। যদিও আমার চেহেরাটা সেম মায়ের মতো। সবাই আমাকে দেখলে ভূত ভেবে ভয় পায়। হা!হা!হা!।
১৫ বছরের পাঞ্জাবি পড়া একটা ছেলে এসে বলল- বাবা বড় আপা, মেজো আপা দুলাভাইদের নিয়ে চলে এসেছে। শাকিলা ফুপুও ফুপাকে নিয়ে এসে পড়েছে। তোমাকে খুঁজছে।
জান্নাত তার ছোট ভাইকে বলল- সবাই চলে এসেছে?
– জ্বি না। ছোট দুলাভাই আসেনি।
-আমার তো বিয়ে হয়নি। ছোট দুলাভাই কোথা থেকে পেলি?
-একটু পর তো হবেই তাই আপডেট বললাম। তোমার হবু বর এখনো আসেনি।
ওরে দুষ্টু দ্বারা!!!
শীতল সেদিন ফুটফুটে রোগা ছেলের জন্ম দিয়ে মারা যায়।
আশ্চর্য হলো রাজের চোখে এক ফোঁটা পানি পড়েনি। শেষ বারের মতো শীতলের মুখ খানি দেখে সোজা বাড়ি চলে এলো। কাজের মহিলারা বলল- ভাবির ছেলে হয়েছে এবার ড্রাইভার বলল । ছেলেরা আসতে বড্ড ঝামেলা করে।তাই ভবির কষ্ট হলো।এখন তো ভাবির সুখ আর সুখ।
রাজ জায়নামাজে বসে কোরআন তেলওয়াত করতে লাগলো। বাড়িতে বিশাল রান্না করা হচ্ছে। চারদিকে খুশির আমেজ। একটু পর ক্লিনিক থেকে আরেক ড্রাইভার এসে খবরটা দিলো।
পুরাতন কাজের মহিলারা বিলাপ করে ফ্লোরে বসে কান্না জুড়ে দিলো। পুরো বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেলো। শীতলের অভাব তারা কিভাবে পূরণ করবে! শীতলকে ছাড়া কিভাবে থাকবে!! সম্ভব না এই দুঃখ সয়ে যাওয়ার।
রাজ স্বাভাবিক ভাবেই শীতলের কবরে মাটি দিলো।
আজ প্রায় পনেরো বছর হয়ে গেলো। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তারা মালয়েশিয়া সেটেল্ড। আজ ছোট মেয়ে জান্নাতের বিয়ে। জান্নাত আর তার হবু স্বামী ক্লাসমেট! ছেলেটা ধার্মিকের সাথে সাথে খুব জেদি। ইসলামিক রীতিনীতি মেনেই তারা পছন্দ করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর এসেছে বলে অনেকে চিৎকার করছে।ছোট ছেলেটাকে দেখার জন্য তার বোনেরা রয়েছে।রাজ এখন আল্লাহর এবাদত করে আর অপেক্ষা করে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে কখন যাবে, শীতল তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ওপারে।রাজ বেলকুনিতে গিয়ে দাঁড়ালো হাতে একটা বাক্স নিয়ে। বাক্সটা খুলতেই শুকনো গোলাপের পাপড়ি গুলো ধমকা হাওয়া ছড়াতে লাগলো। এটা শীতলের গোপন বাক্স। মারা যাওয়ার পর খোলা হয়েছে। রাজ বিয়ের পর থেকে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত যত লালগোলাপ শীতলকে দিয়েছিলো তা সব এই বাক্সে জমিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলো আলমারিতে। গোলাপ
শুকানোর সাথে সাথে কাঁটা গুলোও শুকিয়ে আছে। আশ্চর্য বিষয় হলো লালগোলাপের সুগন্ধি এখনো আছে জীবন্ত! যেমন শীতলের প্রতি রাজের ভালোবাসা এখনো জীবন্ত! কি সুভাস!!!
রাজ বেলকুনি থেকে শীতলের কবর দেখলো। সবসময় সে বেলকুনি থেকে শীতলের কবর দেখে সময় কাটায়। শীতলের কবর তাদের গোলাপ বাগানে দেওয়া হয়েছে। সারা বছর টকটকে গোলাপ ফুটে থাকে! চারদিকে সুভাস ছড়িয়ে পড়ে।
বেলকুনি থেকে রাজ কামরার দিকে তাকালো! বিছানায় অজস্র লালগোলাপের উপর সবুজ জামদানী পড়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে শীতল বসে আছে নতুন বউয়ের মতো।
রাজ মুচকি মুচকি হাসছে! শীতল প্রথম বাসরের মতোই লজ্জায় কুঁকড়ে লাল হয়ে যাচ্ছে!!! রাজ তার সাথে সব সময় শীতলকে অনুভব করে। শীতল নতুন বউয়ের মতোই মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে থাকে রাজের আশেপাশে।
হাওয়ায় লালগোলাপের পাপড়ি গুলো উড়ছে রাজ-শীতলের ভালোবাসার সুভাসে!!!! রাজ পলকহীন ভাবে প্রাণপ্রিয় শ্রেয়সী স্ত্রীকে দেখছে। পৃথিবীর সমস্ত রুপ যেন তার শ্রেয়সীর মধ্যে আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন।রাজ কোটি কোটি বছর ধরে শীতলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবে পলকহীন ভাবে❤

❤মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নামের শেষ নাম গুলো(আরবি,বাংলা)
৯৬. ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺙُ আল-ওয়ারিস় সবকিছুর উত্তরাধিকারী।
৯৭. ﺍﻟﺮَّﺷِﻴﺪُ আর-রশীদ সঠিক পথের নির্দেশক।
৯৮.ﺍﻟﺼَّﺒُﻮﺭُﺍﻟﻨﻮﺭ আস-সবূরআন নূর ধৈর্যশীলজ্যোতি।
৯৯.Allah (الله) The Greatest Name( এটাকে আল্লাহর জাতি নাম বলা হয়।অনেকেই এ নামের কোন অর্থ করেননি। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন যুক্ত অক্ষর-ال+الإله বলে সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী)❤
.
[ হয়ত অজস্র ভুল করেছি না জেনে তাই মাফ করে দেবেন দয়া করে আমাকে। সবকিছু সঠিক ভাবে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। গল্পটা একটি সংসার কে ঘিরে ছিলো, দুটি মানুষকে ঘিরে ছিলো, অজস্র ঝড় তাদের উপর দিয়ে বয়েছে। গল্পটি একটুখানি ইসলামিক ছিলো।যেমনটা আমরা প্রতিদিন আল্লাহর এবাদত করে থাকি যদিও আমরা মহা পাপী হইনা কেন, তাই রাজ-শীতল আমাদের মতোই ভুল-ত্রুটি যুক্ত মানুষ। গল্পে কেউ আল্লাহর এবাদত করে ধার্মিক হয়ে ভুল কাজ করলে সেটা লেখিকার দোষ না, দোষ হলো সেই কেউদের, আর সেই কেউরা আমরা বাস্তবে আমাদের মধ্যেই দেখি সর্বদা, আমরা আল্লাহর এবাদত করেও ভুল কাজ করি, পরিবার, স্বামি,সন্তানদের কষ্ট দিই, তাই দোষ হলো আমাদের সকলের, আমাদের উচিৎ আল্লাহর রহমত নিয়ে নিজেদের শুধরে নেওয়া। রাজের মতো আমারও মাথায় সমস্যা আছে, ভীষণ মাথার যন্ত্রণায় ভুগছি, একটু দোয়া করবেন আমার জন্য। চোখ মেলে তাকানো বা দাঁড়ানো শক্তি নেই আমার তবুও কোনরকম শেষ করলাম অজস্র ভুল-ভ্রান্তি দিয়ে গল্পটা?]
[সমাপ্ত]