লালগোলাপ? Part-36-37

0
1878

লালগোলাপ?
Part-36-37
Writer-Moon Hossain

[খুব জ্বর, জ্বর নিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লিখলাম]
শীতলের সাথে কথা বলা দরকার। সমস্যা যেখানে সমাধানও সেখানে।
শীতল রাজকে দেখলেই চিৎকার শুরু করছে হত্যাকারী, খুনী।
এতোদিন রাজের মধ্যে যে আত্মহননের বিষয়টি ছিলো তা শীতলের মাঝে ঠাঁই পেয়েছে।
এতোটুকু বয়সে মেয়েটা কত কিছু সহ্য করেছে।
রাজের শুধু মা চলে যাওয়াতে রাজ দীর্ঘ কয়েক বছর উন্মাদ পাগল হয়ে পড়েছিলো ঘরের কোণে শেকল বাঁধা অবস্থায়।
সেখানে শীতলের জীবনে সবাই চলে গিয়েছে যারা কখনো ফিরবে না ওর কাছে।
কিভাবে মেয়েটা বেঁচে আছে এটাই রহস্য!
তবুও শীতলের সাথে একবার কথা বলতে হবে।
একবার ওর সব কথার উত্তর দিতে হবে।
মাফ চাইতে হবে।
বিয়ে থেকে আজ পর্যন্ত যা হয়েছে তার জন্য মাফ চাইবে। সমস্ত কষ্ট দেওয়ার জন্য মাফ চাইবে। দরকার পড়লে পায়ে ধরে মাফ চাইবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত শীতল মাফ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পা ছাড়বেনা।
শীতল একজন ধার্মিক মেয়ে। অবশ্যই সে সবকিছু বুঝতে পারবে। এবং রাজকে মাফ করে দেবে।
শীতল দুই দিন ধরে মেডিকেলে আছে।
স্যালাইনে রাখা হয়েছে। কিছুই মুখে না দিতে দিতে একবারে অচেতন হয়ে পড়েছে। শরীর নেতিয়ে পড়েছিলো।
রাজ লুকিয়ে দেখেছে শীতলকে।
বুকে টেনে শান্তনাটুকুও দিতে পারেনি সে।
শীতলের এতো কষ্ট চোখে দেখা যাচ্ছিলো না।
শীতল যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ কাঁদে।
ও পেটে হাত দিয়ে সবাই কে বলে -ওকে আমি কয়েক মাস গর্ভে ধারণ করে আগলে রেখেছিলাম।
এতোটুকুও কষ্টের আচঁ পেতে দিইনি ওকে।
তবে কেন ও চলে গেলো।
আমার বুক খালি করে কিভাবে যেতে পারলো।
একবার কোলেও নিতে পারলাম না।
একটু আদর করতে পারিনি।
ওর মায়া ভরা মুখখানা একবারের জন্য দেখতে পেলাম না। সারা জীবন আফসোস থাকবে। ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
শীতল বুকে হাত দিয়ে বলল-এইখানে খুব ব্যথা হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে।
-মিসেস রাজ। আপনি শান্ত হন। আপনার কন্ডিশন খারাপ ছিলো।
ডেলিভারির আগেই বেবি মারা গিয়েছিলো। আপনাকে খুব কষ্ট করে বাঁচানো হয়েছে।
আপনি বেঁচে আছেন, আপনি চাইলে কনসিভ করতে পারেন।
অনেক গুলো বেবি হবে আপনাদের।
সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখবে ওরা। দুঃখের দিন গুলো সমাপ্তি হবে। সুখে থাকবেন স্বামী সন্তান নিয়ে।
রাজের ইচ্ছে করছে দৌড়ে শীতলের কাছে যেতে।
ওকে শান্তনা দিতে।
ওর কষ্টের ভাগ নিতে।
ওকে বুকে চেপে ধরতে।
শীতলের কান্না আর নিতে পাচ্ছে না সে। সহ্য হচ্ছে না ওকে মেডিকেলের বেডে এভাবে দেখে।
ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় ও।
নিজের হাতে খাওয়াতে চায়। ওর সেবা যত্ন নিতে চায়৷
দুটো লেডি ডক্টর শীতল কে শান্তনা দিচ্ছে। বোঝাচ্ছে।
কোন ভাবেই যখন শান্ত করা যাচ্ছিলো না তখন রাজ ভেতরে ঢুকলো।
শীতল ভয়ার্ত দৃষ্টিতে রাজ কে দেখলো।
রাজ গলার স্বর নরম করে বলল- হাত জোর করছি।
একটু থামো। আমি দুটো কথা বলেই চলে যাব।
তোমার থেকে দূরে থাকব। এখুনি চলে যাব৷
কাঁদতে কাদঁতে কি সিচুয়েশন করেছো নিজের তার খেয়াল নেই। গলায় ব্যথা পাবে। অলরেডি ব্যাথা অনুভব করতে শুরু করেছো।
তোমার চিৎকার গুলো আমার কানের কাছে বাজে। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
একটু শান্ত হও।
মাথা ঠান্ডা করো।
তোমার শরীর কতটা খারাপ তা নিজেও জানো না।
এভাবে চললে তো একটা কিছু হয়ে যাবে।
তোমাকে সুস্থ হতে হবে।
বাড়ি ফিরতে হবে।
প্লিজ আর কেঁদো না।
শীতল শান্ত হলো।
রাজ একটু স্বস্তি পেলো।
শীতলের কাছে গিয়ে বসলো ।
হাত দুটো ধরলো রাজ।
নিজের বুকের মাঝে দিয়ে বলল- এখানে কত ব্যথা তুমি জানো না।
মনে হচ্ছে আমি বিধস্ত হয়ে যাচ্ছি।
তাকিয়ে দেখো আমি তোমার স্বামী। তোমার আদরের অবুঝ স্বামী।
রাজ শীতলের হাত দুটোয় চুমু খেলো।
হঠাৎ রাজকে অবাক করে দিয়ে শীতল আরও জোরে চেঁচাতে লাগলো।
বাবা! বাবা! করে সে কাঁদতে লাগলো।
রাজের কাছ থেকে সরে গেলো। হাত ছাড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো।
-আমার কোন স্বামী নেই।
হত্যাকারী কখনো স্বামী হতে পারেনা। আবার বাবার হত্যাকারী এই লোকটা।
ইচ্ছে করে আমার বাবা কে মেরেছে এই লোক।
বাবা কোথায় গেলে তুমি? আমাকেও নিয়ে যাও!
আল্লাহ তায়ালা কোথায় তুমি!
আমাকে নিয়ে যাও দয়া করে।
বাবা! বাবা!
রাজ শীতল কে থামানোর চেষ্টা করছে।
-আমি কিছু করিনি।
বিশ্বাস করো।
আমি কিছু করিনি।
আমি ইচ্ছে করে কাউকে হত্যা করিনি।
আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করো।
একটু থামো প্লিজ।
রাজ শীতলের যত কাছে যাচ্ছে শীতল তত সরে যাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে।
শীতলের চোখে রাজের জন্য ভয় দেখতে পাচ্ছে রাজ।
রাজ একটু সরে দাঁড়ালো।
ডক্টর রা রাজকে বেরিয়ে যেতে বলল- মিঃ রাজ আপনি বের হন।
আপনাকে দেখলে মিসেস রাজ আরও বেশি চেঁচাচ্ছে, কাঁদছে।
উনি এখনো সুস্থ হন নি। আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
এরপর আপনার স্ত্রীকে হারাতে হবে আপনাকে।
নাউ ইউ ক্যান গো।
লেডি ডক্টররা শীতল কে শান্ত করছে।
শীতলকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব ক্লান্ত। ভালো ভাবে চেঁচাতেও পাচ্ছে না।
খুব খুব কষ্ট হতে লাগলো রাজের।
রাজ একটু একটু করে পিছিয়ে গেলো কেবিন থেকে।
নিজের স্ত্রীর এই সিচুয়েশনে স্বামী হয়ে পাশে থাকতে পাচ্ছে না রাজ।
এর থেকে কষ্ট কি হতে পারে পৃথিবীতে।
আল্লাহ তায়ালা এর সমাপ্তি কখন ঘটাবে!
শীতলকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।
ধীরে ধীরে সে ঘুমের রাজ্যে যাচ্ছে।
অস্ফুট স্বরে সে বলতে লাগলো বাবা! বাবা!। কোথায় তুমি? আমাকে নিয়ে যাও।
তোমার সাথে থাকব।
ছোট বেলার মতো তুমি ঘোড়া হবে, আমি তোমার পিঠে উঠব। বড় আপাকে খবরদার উঠাবে না।। বড় আপা আমার ভাগের সবকিছু কেড়ে খেয়ে মোটা হয়েছে।
তোমার কষ্ট হবে।
.
.
রাজ কেবিনের বাহিরে জানালার পাশে মরার মতো করে দাড়িয়ে আছে সকাল থেকে। এখন আড়াইটা বাজে।
একটুও নড়ে নি সে।
হাসান এসে রাজের কাঁধে হাত রাখলো।
-নামাজের সময় চলে যাচ্ছে।
ভাইজান মসজিদে যান।
-ওকে দেখবে কে?
ওর যদি কিছু হয়ে যায়?
ভরসা করতে পাচ্ছিনা।
-আমি আছি।
আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
নামাজ পড়ে আসুন।
রাজ পর্দা সরিয়ে এক পলক ঘুমুন্ত শীতলকে দেখলো।
লম্বা চুল গুলো এলোমেলো হয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শীতলের এই সিচুয়েশন চোখে দেখার মতো না।
রাজ প্রচন্ড রকমের অনুশোচনায় ভুগলো।
শীতলের কাছে যাওয়ার জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে।।
রাজ মসজিদে নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাতে জানাতে চোখের পানি ফেলতে লাগলো।
মসজিদের দেয়ালে সে মাথা ঠুকলো।
-আমাকে কেন বাঁচিয়ে রেখেছো আল্লাহ! আমার শ্রেয়সীর কতটা কষ্ট হচ্ছে তা জানো না!
আমার মতো পাগলের সাথে কেন ওর দেখা হলো! কেন ওর বিয়ে হলো! ওর জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছি। ওকেও আমার মতো পাগল বানিয়ে দিয়েছি। কেন! কেন! কেন!
রাজ আল্লাহর নামে গরীব দুঃখীদের মাঝে দান ক্ষয়রাত করে আছরের নামাজ পড়তে পড়তে আরেক দফা ফরিয়াদ জানালো আল্লাহর কাছে।
যেকোনো সমস্যা,,,বিপদ-আপদ এবং দুঃখ-কষ্টে সহজ পাঁচটি আমল করুন,,,,,
.
১. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরুদ পাঠ করা:

“একজন সাহাবি নবীজিকে বলেছিলেন,,তাঁর উপর প্রচুর দরুদ পাঠ করবেন। তখন নবীজি তাঁকে বলেন,,,”যদি তুমি তাই করো,,,তবে তোমার সকল চিন্তা ও উৎকণ্ঠা দূর করা হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।।
_________[তিরমিযি: ৪/৫৪৯, হাকিম: ২/৪৫৭, আত তারগিব: ২/৪৯৮; হাদিসটি সহিহ]
.
২. ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা:

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,,,,,,
“যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে,,, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন,,, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিযিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।”
________ [আবূ দাউদ: ১৫২০, ইবনে মাজাহ: ৩৮১৯, তাবরানি: ৬২৯১]
.
৩. “নফল সালাত আদায় করা (২ রাকাত):

“মহান আল্লাহ্ বলেন,,,”হে ইমানদারগণ,,,তোমরা সবর (ধৈর্য) ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আর নিশ্চয়ই একাজ বিনয়ী ও আল্লাহ ভীরু ছাড়া অন্যদের জন্য খুবই কঠিন।”
_________ [সুরা বাকারা: ৪৫]
.
৪. সাদাকাহ (দান) করা:

“আল্লাহ্ বিভিন্ন কারণে আমাদেরকে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত করেন। কখনো পরীক্ষা করার জন্য,,, কখনো শাস্তিস্বরূপ। এমতাবস্থায় আল্লাহ্কে খুশি করার বিকল্প নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,,, “অবশ্যই সাদাকা আল্লাহ তা‘আলার ক্রোধকে ঠান্ডা করে,,,আর খারাপ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে।
__________ [তিরমিযি: ১৯০৯]
.
৫. দু’আ করা:

“রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,,,,,,
“যমিনের বুকে যেকোন মুসলিম আল্লাহর কাছে কোন দু’আ করলে – যে দু’আর মধ্যে কোন পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কোন দু’আ না থাকে – আল্লাহ্ তার দু’আ কবুল করবেনই। তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দিবেন অথবা তদানুসারে তার কোন বিপদ কাটিয়ে দিবেন।”
____________ [তিরমিযি: ৫/৫৬৬, হাকিম: ১/৬৭০; হাদিসটি সহিহ]
.
“অতএব,,,আমাদের জীবনে যে কোনো দুঃখ,,,কষ্ট,,, বিপদআপদ আসুক,,,আমরা মোটেও ঘাবড়াব না। এই আমলগুলো করব আর আল্লাহর নিকট দু’আ করবো। ইন শা আল্লাহ্ সকল সমস্যার সমাধান হবে।
.
রাজ বেশি বেশি দরুদপাঠ, নফল নামাজ, ইস্তেগফার, সদকা, দোয়া পড়ে আল্লাহর নিকট মনোনিবেশ হলো।
মাগরিবের নামাজ পড়ে মরার মতো করে হেলান দিয়ে মসজিদের ভেতর বসে থাকলো রাজ।
বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়েও পড়লো।
অদ্ভুত এক সপ্ন দেখলো সে।
শীতল সাদা শাড়ি পড়ে কুয়াশার মধ্যে কোথায় যেন যাচ্ছে।
রাজ থামানোর চেষ্টা করলো।
শীতলকে বার বার ডাকলো তবুও শীতল ফিরলো না।
সোজা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেলো।
আশ্চর্য বিষয় হলো রাজ থমকে দাড়িয়ে ছিলো।
সে এক পা এগুতে পারেনি।
সামনে যেতে পাচ্ছেনা।
-আমাকে নিয়ে যাও, তোমার সাথে থাকব।
আমাকে নিয়ে যাও।
ছেড়ে যেওনা তুমি।
ফিরে এসো?
রাজ এমন ভাবে বার বার বলছিলো।
চারদিকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেলো। কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে।
বিশাল ধোঁয়াশা কুয়াশার মাঝখানে একা দাড়িয়ে আছে শুধু।
রাজ প্রচুর ঘামছে। ভয়ে চুপসে গেলো।
শীতল! শীতল! শীতল!
বলে তার অস্ফুটে কন্ঠে আওয়াজ বের হচ্ছে।
রাজ কখনো শীতলের নাম ধরে ডাকেনি। সুস্থ হওয়ার পর অনিচ্ছুক ভাবে শীতল নাম মুখে নিয়ে ছিলো।
শীতল খুব মন খারাপ করেছিলো ওকে নাম ধরে ডাকায়।
-আমাকে নাম ধরে ডাকবেন না!
– মানুষকে তো নাম ধরেই ডাকে।
-ডাকে। সবাই না।
-কেন? তুমি কি সবার থেকে আলাদা?
-সব জেনেও না জানার ভান করা হচ্ছে?
-মোটেও না।
-স্বামীরা সব সময় তাদের স্ত্রীদের নিজেদের দেওয়া নামে ডাকে।
-তাতে কি?.
-আহা! এতে ভালোবাসা প্রকাশিত হয়।
-জানা ছিলো না।
-উফফ, আপনি সব জানেন।
মহা নবী (সাঃ) বিবি আয়েশা (রাঃ) কে হুমায়রা (লাল সুন্দরী) নামে ডাকতেন।। স্ত্রীকে আদুরে গলায় নিজের দেওয়া নামে ডাকা সুন্নত।
আল্লাহ তায়ালা স্বামি স্ত্রীদের ভালোবাসা দেখে খুশি হন।
রাজ চোখ মেলে তাকালো।
সবকিছু কেমন ঘোলাটে হয়ে আছে। ঘোর লাগা চোখে সে ওদিক ওদিক তাকাচ্ছে অস্থির হয়ে। ইমাম সাহেবের স্পর্শে রাজের ঘোর ভাঙলো।
ইমাম সাহেব বলল- নিজের স্ত্রীর কাছে যাও বাবা।
আর কতক্ষণ থাকবে? সপ্ন দেখছিলো। এটা খানিকক্ষণ পর টের পেলো।
রাজ হন্তদন্ত হয়ে মেডিকেলে গেলো।
ঔষধের ট্রলি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। রাজের ধাক্কায় ট্রলি উল্টে গেলো।
ঔষধের শিশি গুলো ভেঙে চুরমার হলো।
মেজেতে মাখামাখি হলো।
-মাফ করবেন।
খেয়াল করিনি।
আমার স্ত্রীর কাছে যেতে হবে। ওকে দেখব।
শীতল ঘুমুচ্ছে।
রাজ বুক ভরে নিশ্বাস নিলো।
-কি সিচুয়েশন?
-তেমন কিছু না। আগের মতোই।
শীতল শুকিয়ে দিনকে দিন কাঠ হয়ে যাচ্ছে।
গায়ে প্রচন্ড তাপ থাকে।
রাজ নামাজের ওয়াক্ত, কোরআন তেলওয়াত এর সময় ছাড়া বাকি সময় টুকু শীতলের কেবিনের পাশে থাকে।
ডক্টর জানালো শীতলের মানসিক-শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।
পুরোনো সৃতি ওকে তাড়া করছে।
নতুন করে কোন আশার আলো পেলে হয়ত এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে শীতল।
যদি আমার কনসিভ করে তাহলে ভালো হয়ে যাবে নতুন প্রানের অস্তিত্ব অনুভব করে।
মৃত সন্তানকে ভুলে যাবে নতুন সন্তানের আগমনে।
রাজের কাঁধে হাত দিয়ে ডক্টর শান্তনা দিলো।
রাজ মাথা নাড়ালো।
দুই হাত কপালে রেখে কিছু ভাবলো।
রাতে শীতলের পাশে কিছুক্ষণ বসলো রাজ।
শীতল জেগে থাকলে আসা সম্ভব না। ঘুমিয়ে থাকলেই কিছুটা ভরসা।
শীতলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে রাজ। শুকনো মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে লাগলো সে। রাজের সাধ্য থাকলে সে শীতলের জায়গা নিয়ে নিতো। শীতলের জায়গায় ও অসুস্থ হতো।
শীতলের গলায় মুখ গুজে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলো রাজ।
শীতল আচমকা রাজকে জরিয়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্টে।
দুটি হৃদয় যেন এক হয়ে গেলো।শীতলের হৃদ স্পন্দন শুনতে পেলো রাজ।শীতলের মুখে আদর মেখে দিলো রাজ। শীতলের ডাগরডোগর চোখ দুটো থেকে ঘুমুন্ত অবস্থায়ও পানি পড়ছে টপটপ করে।
রাজ বলল- কিছু দুঃখের সমুদ্র চোখে!
কিছু কষ্টের হিমালয় বুকে!
কিছু অভিমান রয়েছে মনে!
কিছু ভালোবাসা বলে যায় কানে কানে!
রাজ ঘুমুন্ত স্ত্রীকে খুব আদর করলো অতি যত্নে।
.
.
❤মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নামের দুটি নাম (আরবি,বাংলা)
৬২. ﺍﻟْﺤَﻲُّ আল-হ়াইই চিরঞ্জীব, যার কোন শেষ নাই
৬৩. ﺍﻟْﻘَﻴُّﻮﻡُ আল-ক্বইয়ূম অভিভাবক, জীবিকানির্বাহ প্রদানকারী
৬৪. ﺍﻟْﻮَﺍﺟِﺪُ আল-ওয়াজিদ পর্যবেক্ষক, আবিষ্কর্তা, চিরস্থায়ী❤

.
চলবে…..
.
.
#লালগোলাপ?
Writer-Moon Hossain
Part-37
শীতলের গায়ে চাদর জরিয়ে দিলো রাজ।
গুটিশুটি ভাবে শুয়ে আছে সে।
শীতল এই কয়েক দিনে নেতিয়ে পড়েছে।
মুখে সেই গোলাপি আভা টা নেই। একটু কালচে হয়ে পড়েছে।
শীতলের ডাগরডোগর চোখ দুটো পানিতে টুপটুপ করছে।
এতো কষ্ট দিয়েছে রাজ শীতলকে, ঘুমের মধ্যেও শীতল কাঁদছে।
রাজ শীতলের গালে একটু নাক ঘষে দিলো।
আলতো ভাবে সে শীতলের পাশে শুয়ে পড়লো।
শীতল জাগবার আগে উঠে যাবে।
শীতলের সামনে থেকে দূরে চলে যাবে।
রাজ কে দেখলে আবার কান্নাকাটি শুরু হয়ে যাবে।
রাজ শীতলের থেকে দূরে সরে যতটা কষ্ট পাবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাবে শীতলকে কাঁদতে দেখলে।
খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে শীতল।
আগের মতো আবার চুপচাপ হয়ে পড়ে শীতল।
রাজ ডক্টরদের কাছে এর কৈফিয়ত চায়।
ডক্টর রা জানায় এটা মানসিক হাসপাতাল নয়। শীতলের মানসিক প্রবলেম হচ্ছে, এজন্য তার শারীরিক প্রবলেম। সুস্থ হচ্ছে না।
রাজ ডক্টরের মুখে মানসিক হাসপাতালের নাম শুনে এক রেগে যায়।
রাজ কখনো তার শ্রেয়সী কে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাবে না।
প্রাণ থাকতে তো কখনো নয়।
সে শীতলের চিকিৎসা এরচেয়ে বড় কোনো মেডিকেলে করাবে।
দরকার পড়লে আমেরিকা নিয়ে যাবে।

রাজ শীতলকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়ার ডিসিশন নেয়।
বিশেষজ্ঞ কোন সাইকিয়াট্রিস্ট কে দেখানোর জন্য সে মনোনিবেশ করে।
রাজকে মসজিদের ইমাম সাহেব বলেছিলো কালো জিরার ঔষধ সেবন করে দেখতে। মহানবী (সাঃ) বলেছিলেন সকল রোগের ঔষধ কালো জিরা।
রাজ অসুস্থ থাকাকালীন শীতল প্রতিদিন কালো জিরা খাওয়াতো রাজকে।
বাজার থেকে রাজ কালো জিরা কিনে সেগুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখলো।
কালোজিরা থেকে উপকৃত হতে হলে কী করণীয়?

কালোজিরা থেকে প্রকৃত উপকার পেতে হলে অবশ্যই তার ব্যবহার পদ্ধতি জেনে সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
কখনো কালোজিরার তেল, কখনো পাউডার, কখনো মধু বা অন্যান্য জিনিসের সাথে মিশ্রণ, কখনো ফোটা আকারে ঢেলে, কখনো ব্যান্ডেজ করে এবং ব্যবহারের সঠিক সময় ও নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যবহার করতে হবে। এ বিষয়গুলো গবেষণা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞদের নিকট থেকে জানতে হবে। তাহলে আশা করা যায়, কালোজিরা ব্যবহার করে সকল প্রকার রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। ইচ্ছে মত কালোজিরা ব্যবহার করলেই সকল রোগের ক্ষেত্রে সমান ভাবে সাফল্য নাও পাওয়া যেতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, রোগ থেকে আরোগ্য দান কারী একমাত্র আল্লাহ। ঔষধ-পথ্য কেবল মাধ্যম। সুতরাং আল্লাহ যদি না চান তাহলে কোন ওষুধই কাজ করে না।
কারণ আল্লাহ হয়তো বান্দাকে রোগব্যাধি দিয়ে পরীক্ষা করেন অথবা এর মাধ্যমে তার গুনাহ মোচন করেন, আখিরাতে মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং সেখানে তাকে এর চেয়েও বড় পুরস্কারে ভূষিত করেন যা দুনিয়ার সকল কল্যাণ এর থেকেও অধিক উত্তম। এ মর্মে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

সুতরাং ঝাড়ফুঁক, কালোজিরা, মধু, হোমিও, এলোপ্যাথি, ইউনানি সকল প্রকার ওষুধ ব্যবহার করে 100% রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে- এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কারণ আল্লাহ সুবহানাতায়ালা রোগ থেকে মুক্তি দান কারী। এটা একমাত্র তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
আমাদের কাজ হবে, আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং বিভিন্ন পথ্য ও ঔষধ ব্যবহার করা।
আল্লাহ চাইলে অবশ্যই সুস্থতা অর্জিত হবে। অন্যথায় তিনি অন্যভাবে বান্দাকে এর বিনিময় দান করবেন। এ বিশ্বাস রাখাই মুমিনের কর্তব্য।
যেমন জমিনে সঠিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ ও চাষাবাদ করেও অনেক সময় ফসল পাওয়া যায় না, সঠিকভাবে গাছ পরিচর্যা করার পরেও তাতে ফল ও ফুল ধরে না, দাম্পত্য জীবন সঠিকভাবে অতিবাহিত করার পরেও সন্তান ভাগ্যে জোটে না, এ্যালোপ্যাথিক, হোমিও, ইউনানি ইত্যাদি ঔষধ যথার্থ নিয়মে ব্যবহার করার পরেও অনেক সময় রোগ সারে না। কারো উপকার হয়; কারো হয় না।
সুতরাং এই বিষয়গুলো সর্বদা মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু যথার্থ নিয়মে কালোজিরা ব্যবহার না করার ফলে প্রত্যাশিত ফলাফল লাভ না করলে কোনোভাবেই হাদিসের প্রতি কু ধারণা পোষণ করা বৈধ নয়। যদিও ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকরা এ হাদিসের ব্যাপারে নানা অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে।
আমরা দোয়া করি, আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত করুন। আমীন।

বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞান কালোজিরা গবেষণা করে এর মাধ্যমে অনেক রোগের চিকিৎসায় বিস্ময়কর ফলাফল অর্জন করেছে। আশা করি, সময়ের ব্যবধানে এর আরও ওষধি গুণ মানবজাতির সামনে প্রতিভাত হবে ইনশাআল্লাহ।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদী আরব
প্রশ্ন: মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছেন- কালিজিরা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের ওষুধ। তাহলে নিয়মিত কালজিরা খেলেও রোগ সারে না কেন? কালিজিরা খাওয়ার কি কোনো নিয়ম আছে?

উত্তর:
প্রথমে আমরা কালোজিরা সম্পর্কে হাদিসে কী বলা হয়েছে তা জেনে নিব। এ সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হল:
১) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
عَلَيْكُمْ بِهَذِهِ الْحَبَّةِ السَّوْدَاءِ فَإِنَّ فِيهَا شِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ إِلاَّ السَّامَ ‏”‏ ‏.‏ وَالسَّامُ الْمَوْتُ
“তোমরা এই কালোজিরা ব্যবহার করবে। কেননা, এতে মৃত্যু ছাড়া সব রোগের প্রতিষেধক রয়েছে।” [সূনান তিরমিযী, হাদিস নম্বরঃ [2048]অধ্যায়ঃ ৩১/ চিকিৎসা (كتاب الطب عن رسول اللَّهِ ﷺ), ইসলামিক ফাউন্ডেশন]

▪ ২) আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন:
فِي الْحَبَّةِ السَّوْدَاءِ شِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ، إِلاَّ السَّامَ
“কালোজিরায় মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের আরোগ্য রয়েছে। (বুখারী পর্ব ৭৬ অধ্যায় ৭ হাদিস নং ৫৬৮৮; মুসলিম ৩৯/২৯ হাঃ ২২১৫)
▪ ৩) বুরায়দা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ هَذِهِ الْحَبَّةَ السَّوْدَاءَ فِيهَا شِفَاءٌ ، قَالَ وَفِي لَفْظٍ : قِيلَ وَمَا الْحَبَّةُ السَّوْدَاءُ ؟ قَالَ الشُّونِيزُ قَالَ
وَكَيْفَ أَصْنَعُ بِهَا ؟ قَالَ : تَأْخُذُ إِحْدَى وَعِشْرِينَ حَبَّةً فَتَصُرُّهَا فِي خِرْقَةٍ ، ثُمَّ تَضَعُهَا فِي مَاءٍ لَيْلَةً فَإِذَا أَصْبَحْتَ قَطَرْتَ فِي الْمَنْخِرِ الْأَيْمَنِ وَاحِدَةً وَفِي الْأَيْسَرِ اثْنَتَيْنِ ، فَإِذَا كَانَ مِنَ الْغَدِ قَطَرْتَ فِي الْمَنْخِرِ الْأَيْمَنِ اثْنَتَيْنِ وَفِي الْأَيْسَرِ وَاحِدَةً ، فَإِذَا كَانَ فِي الْيَوْمِ الثَّالِثِ قَطَرْتَ فِي الْأَيْمَنِ وَاحِدَةً وَفِي الْأَيْسَرِ اثْنَتَيْنِ
নিশ্চয় এই কালোজিরায় আরোগ্য রয়েছে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, কালোজিরা কী? তিনি বললে, শুনীয। প্রশ্ন করলেন: কিভাবে তা ব্যবহার করবো?
তিনি বললেন:
“২১টি কালোজিরার ১টি পুটলি তৈরি করে রাতে পানিতে ভিজিয়ে রাখবে এবং সকালে (পুটলির পানির ফোঁটা এ নিয়মে নাসারন্ধ্রে ব্যবহার করবে) “প্রথমবার ডান নাকের ছিদ্রে ২ ফোঁটা এবং বাম নাকের ছিদ্রে ১ ফোঁটা। পরের দিন বাম নাকের ছিদ্রে ২ ফোঁটা এবং ডান নাকের ছিদ্রে ১ ফোঁটা। তৃতীয় দিন ডান নাকের ছিদ্রে ২ ফোঁটা ও বাম নাকের ছিদ্রে ১ ফোঁটা।” (আবু নুআইম-কিতাবুত ত্বিব, মুস্তাগফিরী-কিতাবুত ত্বিব-সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারী থেকে নেয়া)
কালোজিরা সম্পর্কে একাধিক বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই হাদিসগুলো অবশ্যই সত্য। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। কারণ তিনি, যা বলতেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে বলতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ- إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ
এবং তিনি মনগড়া কথা বলেন না। এটি (আল্লাহর পক্ষ থেকে তার নিকট) প্রেরিত ওহী ছাড়া অন্য কিছু নয়।” (সূরা নজম: ৩ ও ৪)।
শীতলকে রাজের আনা কালোজিরা খাওয়ানো হচ্ছে নিয়মিত।
পাশাপাশি কালোজিরার বিভিন্ন ঔষধও খাওয়ানো হচ্ছে দেশের এবং দেশের বাহির থেকে।
শীতলকে সব সময় ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। এজন্য আরও নেতিয়ে পড়েছে সে। এছাড়া কোন উপায় নেই।
চোখ যতক্ষণ খোলা থাকে ততক্ষণ সে কাঁদতে থাকে। জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে আল্লাহ কে স্বরণ করে।
শীতল ঘুম থেকে উঠে বলল- এখন কোন কটা বাজে?
-দুপুর দুটা৷
-আমি নামাজ পড়ব।
-অবশ্যই। তবে সুস্থ হলে।
এখন তো আপনি অসুস্থ।
শীতল ডক্টরের কথা কিছুই শুনলো না।
সে নামাজ পড়ার জন্য তৈরি হতে লাগলো।
নামাজের সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলো।
কিছুতেই তাকে উঠানো গেলো না।
শীতল অনেকটা খাম খেয়ালি হয়ে পড়েছে। যখন যেটা মনে পড়ে সেটাই করতে চায়।
রাজ এতে বাঁধা দেয়না।
শীতলের খেয়াল খুশি মতো সবকিছু হয়।
শীতল একদিন বলল- সে তার ময়মনসিংহের গ্রামে যাবে।
বাবার কবর দেখবে।।
শীতল কে না করাতে সে খুব চেচামেচি শুরু করলো।
স্যালাইনসহ শীতলকে এম্বুলেন্স করে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো।
সেখানে রাজ তার শশুরের কবর জিয়ারত করলো।
রাজ এম্বুলেন্সের পেছনে নিজেই ড্রাইভ করে এসেছে গাড়িতে।
শীতলকে কবর দেখানোর পর হলো আরেক ঝামেলা।
কিছুতেই সে কবর থেকে আসেনা।
সেখানেই নাকি থাকবে।
অনেক বুঝিয়ে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে তবেই মেডিকেলে আনা হলো তাকে।
রাজ তখন কবরের পাশে জঙ্গলে শিমুল গাছের আড়ালে দাড়িয়ে ছিলো।
ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিলো শীতলের কাছে। ওকে বুকে রেখে শান্তনা দিতে ইচ্ছে করছিলো।
শীতলকে এম্বুলেন্সে রাখা হলে রাজ শীতলের কাছে যায়।
কপালে একটা চুমু দিয়ে জরিয়ে ধরে।
এলোমেলো চুল গুলো কানের কাছে গুজে দেয়।
ঘেমে যাওয়া মুখটা মুছে দেয় সযত্নে।
অসুস্থ স্ত্রীকে এমন এমন সিচুয়েশনে সে দেখবে এটা ভাবতেই বুক ফেটে যায় তার।
সবার ধারণা ছিলো মেডিকেলে সজাগ হলেই শীতল চেচামেচি করতে থাকবে। কবরের কাছে যেতে চাইবে।
শীতল চোখ মেলে তাকানোর পর তেমন কিছু করলো না।
সবাই ভাবলো শীতল ঠিক আছে।
শীতল শুধু বলল- আমার ছেলে হয়েছিলো না মেয়ে?
-ছেলে।
-দেখতে কেমন ছিলো?
-খুব সুন্দর। আপনার মতো সুন্দর। মা এতো সুন্দরী তো ছেলে এতো সুন্দর হবে না?
-ওকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে?
লেডি ডক্টর চুপ করে রইলো।
রাতে ঘটলো ঘটনা।
শীতল মেডিকেল থেকে পালিয়েছে।
রাতে শীতল স্বাভাবিক নিয়মে ঘুমিয়েছে বলেই ইনজেকশন পুশ করা হয়নি।
রাজ কেবিনের বাহিরে ছিলো।
জানালার ধারে শীতলকে দেখতে দেখতে চোখ লেগে এসেছিলো।
রাত তিনটার সময় রাজের ঘুম ভাঙে।
বেডের উপর চোখ পড়তেই তার বুক ছটফট করতে লাগলো।
শীতল নেই।
লেডি ডক্টর গুলো ঘুমুচ্ছে চেয়ারে বসে বসে।
সিকিউরিটি গার্ডও ঘুমুচ্ছে।
রাজের মাথায় রক্ত উঠে গেলো।
যতটা না মেডিকেলের ডক্টর, নার্স, সিকিউরিটির উপর ততটা নিজের উপর।
কি দরকার ছিলো ঘুমুনোর।
এই কয়দিন তো নির্ঘুমে কাটিয়ে দিচ্ছিলো নির্বিঘ্নে।
আজ তার চোখে ঘুম এলো কোথা থেকে।
রাজ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
কোতোয়ালি থানার ওসি তার পরিচিত ছিলো।
রাজ রাতে থানায় যেতেই একটা রিপোর্ট লিখলো।
শীতলকে খুজতে কিছু পুলিশ নিয়োজিত করা হলো।
রাজ কারও উপর ভরসা না করে নিজেও খুজতে বের হলো।
দুই ঘন্টার মধ্যে সে ময়মনসিংহের অনেক জায়গায় সার্চ করলো।
কিছুই বাদ পড়লো না।
রাজ গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
অসুস্থ মেয়েটা কোথায় গেলো। ক্ষতি হতে পারে।
গায়ে স্যালাইন পুশ করা ছিলো। সেটা খুলে কোথায় চলে গেলো।
ও এতো রাতে কোথায় আছে! ওর মাথা ঠিক নেই যে নিজের খেয়াল রাখতে পারবে।
কতটা বিপদ রাস্তাঘাটে তার বিন্দু মাত্র রেশ নেই শীতলের।
ওসি রাজের কাঁধে হাত লাগলো।
-ডোন্ট ওয়ারি মিঃ রাজ।
মিসেস শীতলকে আশা করি রাতের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।
-আশা করি মানে? ওকে পেতেই হবে।
রাতের মধ্যেই ওকে খুঁজে বের করুন।
রাজকে হিস্টোরিয়াগত অস্বভাবিক রোগির মতো দেখাচ্ছে।
নিজের উপর কন্ট্রোল নেই।
নিশ্বাস নিতে পাচ্ছেনা।
-মিঃ রাজ আপনার স্ত্রী বিশেষ কোন জায়গায় যেতে পারে বলে আপনার ধারণা আছে?
এমন কোন জায়গা আছে যেখানে উনি যেতে পারেন? যেখানে উনার বিশেষ কেউ আছে?
রাজ পাঞ্জাবির ফোল্ড করলো।
চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ালো।
কবর স্থানের চারদিক অন্ধকার।
ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। হালকা হাওয়া বইছে।
স্তব্ধ পরিবেশ।
শীতল নতুন ছোট একটা কবরের পাশে বসে আছে।
এটাই তার সন্তানের কবর।
একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিলো তার সন্তান।
পৃথিবী বড় বিস্বাদ লাগছে।
সন্তানের কবরের মাটি নিয়ে আঁচলে রাখছে শীতল।
মাটি দিয়ে পুরো পুরি লেপ্টে ফেলেছে নিজেকে।
রাজ কবর স্থানের ল্যাম্পপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
শীতলের কাছে যাওয়ার সাহস নেই। রাজকে দেখলে চিৎকার করে কাঁদা শুরু করবে।
একসময় জ্ঞান হারাবে।
রাজ এসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত। শীতলকে তার জন্য আর একবারও কাঁদতে দিতে চায়না। রাজকে দেখলে শীতলের পুরোনো সৃতি মনে পড়বে। কষ্ট পাবে।
এরকম টা হতে দিতে পারবে না রাজ।
দূরে থেকে শীতলকে কিছু কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চায় সে।
রাজ শীতলকে দেখতে থাকলো। শীতল নড়াচড়া করছে না।
এক জায়গায় চুপ কর বসে আছে।
শীতল অস্ফুট স্বরে শুধু বলছে-দেখ বাবা আমি এসেছি। তোমার কি ভয় করছে? এতো ছোট তুমি! অন্ধকারে ভয় তো করবেই৷
আমি এসেছি তোমার কাছে। আর ভয় নেই। তুমি আমার সাথে দেখা না করে কিভাবে চলে গেলে? মায়ের সাথে এটা করতে পারলে?
কাজটা ঠিক হলো না তোমার।
তোমাকে একবার দেখতে না পারার ব্যথা কখনো ভুলব না। আমরা কত মাস একসাথে ছিলাম। কত সপ্ন সাজিয়েছি তোমাকে ঘিরে।
তোমার বড়লোক বাবা তোমার গরীর মা’কে মানুষ মনে করলো না। শুধু তার প্রয়োজন মতো ব্যাবহারিত হলাম।
তোমাকে নিয়ে ছোট সংসার সাজাবো ভেবেছিলাম।
যেখানে তুমি আমি থাকব। তুমি আমাকে আগলে রাখতে, তোমার দুঃখী মায়ের চোখের পানি মুছে দিতে। অনেক ভালোবাসতে আমাকে। আমাদের সংসারে আমাকে একা করে আল্লাহর কাছে চলে গেলে!
আমার মানিক রতন বাবা কেন মা’কে ছেড়ে একা চলে গেলে? আমাকে নিয়ে যাও! তোমার সাথে থাকব! তুমি ছাড়া কেউ নেই আমার!
রাতের স্তব্ধ পরিবেশে শীতলের কথা গুলো রাজের কানে বাজছে!
রাজ হাঁটু গেড়ে বসে জোরে জোরে নিশ্বাস নিলো।
মাথায় হাত দিয়ে আল্লাহ কে উদ্দেশ্য করে বলল- আমার মতো পাগল কে কেন পৃথিবীতে পাঠানো হলো! একি হলো আমার দ্বারা! সবার জীবন নষ্ট করে দিলাম।
নিজের ভালোবাসা কে অপমান করলাম। ইচ্ছে করে এসব করিনি। কিভাবে যেন হয়ে গেলো।
নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। এখন আমি সুস্থ। নিজের জ্ঞান আছে।
আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমাকে বলে দাও মহান আল্লাহ তায়ালা কি করে করব? একটা সুযোগ দাও।
আমার শ্রেয়সী কে যতটা দুঃখ দিয়েছি এরচেয়ে কোটি গুন সুখ দেব। একটাও অভিযোগ রাখব না।
প্রতিটিতে সেকেন্ড ওর কাছে থাকব আর তোমার ইবাদত করবো। ব্যাবসা, বানিজ্য সব বন্ধ।। শুধু তুমি আর আমার শ্রেয়সী।
লেডি ডক্টর এসে রাজের কোলে তার সন্তান তুলে দিলো।
এতো ফুটফুটে ছেলে কখনো দেখেনি এর আগে সে।
মাথার চুল গুলো ঘন কালো।
ঠোঁট দুটো তার মতোই লাল টুকটুকে। সাদা ধবধবে গায়ের রং। একদম তুলোর মতো নরম শরীর। দেখে বোঝার উপায় নেই মায়ের গর্ভে মারা গিয়েছে।
জীবন্ত দেখাচ্ছে।
ছেলেকে কোলে নিয়ে সারা রাত সে বসে ছিলো। কেউ রাজের কাছ থেকে তার ছেলে কে নিতে পারেনি।
পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে লুকিয়ে চোখের পানি মুছেছে সে। পুরুষ মানুষরা কখনো কারও সামনে কাঁদে না। শত বিপদেও তাদের নাকি কাঁদতে নেই।
শীতল কবর স্থানে চুপটি করে বসে আছে।
রাজ ভয়ে ভয়ে শীতলের কাছে গেলো।
শীতল রাজের দিকে তাকাতেই রাজ হাত জোর করে বলল- এখুনি চলে যাব। সামনে আসবো না। দূর থেকে তোমাকে দেখব।
রাতে তুমি একা মেয়ে হয়ে কিভাবে নির্জন কবর স্থানে থাকবে! আমি শুধু বসে থাকব পাশে। একটুও বিরক্ত হবে না তুমি।
তুমি তোমার কাজ করো।
আমি শুধু বসে থাকব। তোমাকে কবর থেকে নিতে আসিনি।
শীতল শান্ত স্বরে বলল- বড় আপা-ছোটআপা কবর কোন গুলো? বাবা! বাবা কোথায়?
রাজ দেখিয়ে দিলো।
শীতল দূর থেকে দেখে নিশ্বাস ফেললো।
শীতল এলোমেলো ভাবে হাঁটছে।
রাজের সাহস হচ্ছে না ধরে নিয়ে যাওয়ার। সে পেছনে হাঁটছে। শীতল পড়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরবে এই আশায়।
সোজা রাজের গাড়িতে গিয়ে বসলো শীতল।
রাজ অবাক হলো।
-বাড়ি চলুন।
আমি বাড়ি যাব।
-যাচ্ছি এখুনি।
কয়েক মিনিট লাগবে।
তুমি চোখ বন্ধ করো।
চোখ মেলে তাকালেই দেখবে আমাদের বাড়ি৷
-আমাদের বাড়ি। হ্যাঁ আমাদের বাড়ি!

.
❤মহান আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি নামের তিনটি নাম (আরবি,বাংলা)
৬৫. ﺍﻟْﻤَﺎﺟِﺪُ আল-মাজিদ সুপ্রসিদ্ধ
৬৬. ﺍﻟْﻮَﺍﺣِﺪُ আল-ওয়াহ়িদ এক, অনন্য, অদ্বিতীয়
৬৭. ﺍﻟﺼَّﻤَﺪُ আস-সমাদ চিরন্তন, অবিনশ্বর, নির্বিকল্প, সুনিপুণ, স্বয়ং সম্পূর্ণ❤
.
চলবে……..