শুধু তোমায় ঘিরে?পর্ব-১২

0
2186

?শুধু তোমায় ঘিরে?

#মেঘা আফরোজ…..?
#পর্ব-১২…..?

?

বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছি আমার পাশে তিশা। আমাদের পেছনের সিটেই তাসিন আর আয়ান ভাইয়া বসেছে। দুজনের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। গুম হয়ে বসে আছে দুজনে।
বাসে উঠে আমি জানালার পাশটায় বসে তিশাকে আমার পাশেই বসিয়েছি তাসিন তো সেই রকম বিরক্ত ওকে কেনো বসতে না দিয়ে তিশাকে বসালাম। আর আয়ান ভাইয়া তো তার থেকেও বেশি বিরক্ত ইসস কতো আশা করে ছিলো তিশার পাশে বসবে।

তাসিন উঠে দাড়িয়ে আমার কানে কানে বললো
..মেঘা এটা কি করলে বলোতো! তিশাকে আয়ানের পাশে বাসতে দাও আমি তোমার পাশে বসবো।
..চুপচাপ বসে থাকুন কাল রাতে রোহান ভাইয়ার সামনে যা করেছেন এটা তারই শাস্তি।
..শাস্তি তো অনেক ধরনের আছে মেঘাপাখি। ওদেরকে একটু সুযোগ করে দাও।
..ওদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন নাকি নিজের হুমম??
তিশা বলে উঠলো
..ভাইয়া যাই বলেন কাজ হবে না আমি ওই হনুমানটার পাশে বসবো না।
..শালিকা এটা কিন্তু খুব অন্যয় আমার হবু বউকে আমার কাছে বসতে দিচ্ছো না।
আমি তাসিনের এমন সব কথায় মিটমিট করে হেসে চলেছি। আয়ান ভাইয়া হয়তো আমার ওপর খুব রেগে আছে একটা কথাও বলছে না। আচ্ছা আমি তো ভুল করছি আসলেই তো তিশা আয়ান ভাইয়াকে একসাথে বসতে দিলে ভালো হবে। হয়তো তিশাও মনে মনে এটাই চাইছে বলতে পারছে না।

.?

আমি উঠে দাড়িয়ে তিশাকে বললাম
..তিশা একটু পা টা সরাতো আমাকে বের হতে দে।
..বাস ছেড়ে দেবে কোথায় যাবি তুই?
..বের হই তারপর দেখ কোথায় যাই।
তিশা পা সরাতে আমি বের হয়ে তাসিনদের সিটের সামনে দাড়ালাম। তাসিন গাল ফুলিয়ে বসে আছে আয়ান ভাইয়া আমার দিকে একবার তাকিয়ে অন্য দিকে তাকালো। দু ভাইয়ের থেকে কেউ কম নয় দেখছি।
আয়ান ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বললাম
..ভাইয়া ওঠো তো আমি এখানে বসবো।
দুজনেই যেনো ভূত দেখেছে এমন ভাবে তাকালো আমার দিকে। তিশাও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
একটু নিচু হয়ে আয়ান ভাইয়াকে বললাম
..সরি ভাইয়া তাসিনকে শাস্তি দিতে গিয়ে তো তোমাদের শাস্তি দিতে পারিনা তাইনা। যাও তিশার পাশে বসো আমি এখানে বসছি।
আয়ান ভাইয়া হেসে দিয়ে বললো
..এইতো আমার বোনের মতো কাজ করেছিস।
..হয়েছে যাও বসো ওই সিটে।
তিশা বলে উঠলো
..মেঘা এটা কি হলো আমাকে একা রেখে তুই ওখানে বসছিস কেনো?
..একা কোথায় আয়ান ভাইয়া বসছে তোর পাশে। শোন সামনে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাক পিছনে তাকাবি না।
তিশা মুখ ভেংচি দিয়ে ঘুরে বসলো।
..এই যে পিচ্চি সরো আমাকে ওপাশে বসতে দাও।
..বলেছি না পিচ্চি বলবেন না। আপনি অন্য সিটে গিয়ে বসুন এখানে আমি একাই বসবো।
..বাসে আমার জন্য এই একটাই সিট খালি আছে বুঝলে। কথা না বাড়িয়ে বসতে দাও।
তিশা দেখলো সত্যি কোনো সিট ফাকা নেই তাই সরে জানালার পাশ ঘেষে বসে পড়লো।
..আয়ান ভাইয়া একটু হেসে ওর পাশেই বসলো।

. ?

এদিকে তাসিন এখনো গাল ফুলিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
আমি তাসিনের হাতের ওপর হাত রাখলাম উনি তাকালো না। বা বাহ কতো অভিমান!
..শুনুন না আর অভিমান করতে হবে না আমি আপনার পাশেই তো বসেছি।
..কেনো বসেছো যাও আমাকে তো শাস্তি দেবে তুমি।
..আমি কিন্তু তমা আপুকে ডাকবো এখন এমন করলে।
..না থাক আমাদের মাঝে আপুকে জড়াবে কেনো।
..হুম। আপনি এই সিটে আসুন তো আমি জানালার পাশে বসবো।
তাসিন কোনো কথা না বলে উঠে আমাকে বসতে দিয়ে উনি আমার পাশে বসলো।

বাস ছেড়ে দিয়েছে তাসিন কোনো কথা বলছে না। আমি উনার হাত জড়িয়ে বললাম
..প্লিজজ এমন ভাবে থাকবেন না কথা বলুন।
..কি বলবো?
..যা ইচ্ছে বলুন।
উনি মুচকি হেসে আমার কোমড় জড়িয়ে নিজের কাছে নিয়ে বললো
..আই লাভ ইউ মেঘাপাখি।
উনি যে এ সমনে এ কথা বলবেন সেটা আমার ভাবনার বাহিরে ছিলো। আমি তাসিনের কাধে মাথা রেখে বললাম
..আপনি না সত্যি একটা পাগল।
..হুমম পাগল। তোমার প্রেমে পাগল আমি।

. ?

তিশা জানালার দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসে আছে আয়ান ভাইয়া তিশার হাতের ওপর হাত রাখলো। তিশা কেপে উঠে তাকালো। নিজের হাতটা ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছে আয়ান ভাইয়া আরো শক্ত করে ধরে বললো
..হাতই তো ধরেছি এমন করছো কেনো হুম?
..কেনো ধরবেন আমার হাত ছাড়ুন।
..ভালোবাসি তাই ধরেছি।
তিশা আর কিছু বললো না ওভাবেই বসে থাকলো। আয়ান ভাইয়া তিশার দিকে আরে একটু চেপে বসলো
..ভেবেছো কিছু?
..কি ভাববো!
..ওই যে ওটাই শুন্যর বাইরে আসা যায় নাকি।
..জানিনা। বলেই বাইরে তাকালো।
আয়ান ভাইয়াও আর কিছু বললো না তিশার হাত ধরেই বসে রইলো। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলো তিশা সামনের দিকে বার বার ঝুকে পড়ছে। আয়ান ভাইয়া আমাকে ডাকলো। আমি তাসিনকে ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বললাম
.. কি হলো ভাইয়া ডাকছো কেনো?
..মেঘ তিশার কি গাড়িতে ঘুমানোর অভ্যাস আছে?
..হ্যা ভাইয়া ও দুরে কোথাও জার্নি করলেই ঘুমিয়ে পরে।
..ওও আচ্ছা ঠিকআছে তুই বসে পর।

তিশা ঘুমে পড়ে যেতে নিলে আয়ান ভাইয়া ওকে এক হাতে আগলে নিলো। একটু পর ভাইয়া খেয়াল করলো তিশার মাথাটা উনার কাধে। ভাইয়া মুচকি হেসে ওকে আরো একটু জড়িয়ে নিলো। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো….ইসস আমার পিচ্চিটাকে ঘুমের মধ্য আরো মায়াবি লাগছে,,,,ভালোবাসি তোমাকে ঘুমপরী।

. ?

৬ঘন্টা পর আমরা ঢাকায় এসে পৌছোলাম তিশা তখনো ভাইয়ার কাধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলো। তাসিন ভাইয়াকে বললো
..একটু পরে তো নামতে হবে ওকে ডেকে তোল এবার।
আয়ান ভাইয়া তিশাকে ডেকে তুললো,তিশা ঘুম ভেঙে দেখলো ও আয়ান ভাইয়ার খুব কাছে আর উনার কাধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলো। ও কিছুটা লজ্জা পেয়ে একটু সরে আসলো। আয়ান ভাইয়া হেসে বললো
..পিচ্চি এতো ঘুম কই পাও শুনি? সারাটি পথ ঘুমিয়ে কাটালে আর আমার কাধ টাও ব্যাথা করে দিয়েছো।
..আমি বুঝতে পারিনি ঘুমের ঘোড়ে কখন আপনার কাধে মাথা রেখেছি,সরি।
..এ তো আর নতুন নয়!আমার কি মনে হচ্ছে জানো তুমি ইচ্ছে করেই ঘুমিয়েছো যেনো আবারো আমার কাছে আসতে পারো। বাকা হেসে বললো।
তিশা রাগি চোখে তাকালো ভাইয়ার দিকে ওর এমন রাগি ফেস দেখে ভাইয়া হাসতে লাগলো। আমি ভাইয়াকে বললাম
..ভাইয়া বাড়িতে গিয়ে হেসো বাস থেকে নামতে হবে উঠো এখন।

. ?

রাতে রুমে বসে পড়ছিলাম তখন তিশা ফোন দিলো
..হ্যা তিশা বল।
..মেঘা তোকে একটা কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি।
..কি কথা?
..আগে বল হাসবি না।
..আচ্ছা হাসবো না বল।
..আ আমি আয়ানকে খুব মিস করছি রে।
আমার সত্যিই হাসি পাচ্ছিলো কিন্তু এখন হাসা যাবে না হাসিটা চেপে বললাম
..সে তো করবি যাকে ভালোবেসে ফেলেছিস তাকে মিস করাটাই স্বাভাবিক তাইনা।
..ম মমানে মেঘা কি বলছিস ততুই?
..হয়েছে আর ন্যাকামো করতে হবে না। তিশা তুই আমাকে কি ভাবিস বলতো আমি বুঝিনা কিছু? শোন তিশা আয়ান ভাইয়া তোকে ভালোবাসে তা আমি তাসিন জানি আর তুই ও যে ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিস সেটাও আমি বুঝতে পেরেছি। সো এতো রং ঢং না করে ভাইয়াকে মনের কথা বলে দে।
..তুই সব জানিস!!
..হুমম জানি। এখন ফোন রাখ তাসিন কল দিচ্ছে।

তিশা কেটে দিলো আমি তাসিনের ফোন রিসিভ করে তিশার কথা গুলো বললাম। হঠাৎই তাসিনের পাশে জোরে আওয়াজ হলো
..কিসের আওয়াজ হলো আপনার পাশে?
..কিসের আবার তিশার বাদরটা তিশা ওকে মিস করছে শুনে লাফিয়ে উঠেছে। বেড সাইড টেবিলে গ্লাস ছিলো ওটা পরে ভেঙে গিয়েছে।
আমি জোরে হেসে উঠলাম তাসিনও হাসছে।
আয়ান ভাইয়া তাসিনের থেকে ফোনটা নিয়ে আমাকে বললো
..মেঘ তিশার বাড়ির ঠিকানাটা দে না বোন আমি এখনি দেখা করবো ওর সাথে।
..ভাইয়া মাথা ঠিক আছে তোমার! প্রায় ১১ টা বাজে এখন ওদের বাড়িতে কি করে যাবে তুমি? আমি তোমাকে কাল ওর সাথে দেখা করিয়ে দিবো।
..কাল না আমি আজ দেখা করবো ও আমাকে মিস করছে ভাবতে পারছিস মেঘ! দে না ঠিকানাটা।
তাসিন ফোন নিয়ে বললো
..তোমরা পারো মেঘা তুমি তো আমাকে পাগল করেছো এখন তোমার ফ্রেন্ড আমার ভাইটাকে পাগল করলো।
..পাগল হতে কে বলেছে আপনাদের হ্যা।
..কে বলেছে আচ্ছা সেটা পরে বলবো। শোনো তিশাদের বাড়িটা তো আমাদের এখান থেকে কাছেই আমি আয়ানকে দিয়ে আসবো। তিশাকে আগেই কিছু বলো না।
..কিন্তু তিশার বাড়ির কেউ দেখলে কি হবে??
..সেটা নিয়ে ভেবো না রাখছি এখন ওকে পৌছে দিয়ে কল দিবো।
আমার তো টেনশনে ঘাম হচ্ছে না জানি ভাইয়াটা তিশার সাথে কি ভাবে দেখা করবে!

. ?

তিশার রুমটা দোতলায় তাসিন আগে গিয়েছে তাই চিনতে প্রবলেম হয়নি। তাসিন ভাইয়া নিচে থেকে আয়ান ভাইয়াকে উপরের ওঠার ব্যবস্থা করে দিয়ে চলে আসলো। আয়ান ভাইয়া উঠে তিশার রুমের ব্যালকনিতে দাড়ালো দরজাটা লক করা।
..এখন আমি কি করি দরজাটা তো ভেতর থেকে লক করা মনে হচ্ছে! দরজাটা নক করে দেখি একবার।
আয়ান ভাইয়া এগিয়ে দরজায় হাত দিতেই কিছুটা ফাকা হয়ে গেলো
..বাহ দরজাটা তাহলে খোলাই ছিলো উফ আয়ান তোর ভাগ্যটা খুব ভালো। মনে মনে বললো।
আয়ান ভাইয়া ভেতরে ঢুকলো
..একি তিশা কোথায়! তাসিন আমাকে ভুল রুমে পাঠায় নি তো?
তখনি ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে আয়ান ভাইয়া ঘুরে তাকালো।
তিশা বের হয়ে আয়ান ভাইয়াকে নিজের রুমে দেখে চমকে গেলো। অবাক হয়ে বললো
..একি আপনি এতো রাতে আমার রুমে!! জোড়েই বললো কথাটা।
আয়ান ভাইয়া দ্রুত গিয়ে তিশার মুখটা চেপে ধরে বললো
..আরে এতো জোড়ে কথা বলছো কেনো আমি শুনতে পাই তো নাকি। বলেই মুখে থেকে হাত সড়িয়ে নিলো।
..আপনি এখানে কেনো আর কি ভাবে আসলেন??
..কি ভাবে এসেছি সেটা তোমার না জানলেও চলবে। আমি এখানে এসেছি আমার পিচ্চিটাকে দেখতে সে নাকি আমাকে খুব মিস করছে।
তিশা বিড়বিড় করে বললো…হারামি মেঘাটা বলে দিয়েছে আমি উনাকে মিস করছি,,,তোকে পাই সামনে একবার।
..কি হলো বিড়বিড় করে কাকে বকছো?
..কাউকে না। আপনার দেখা হয়েছে এখন যান আপনি।
..দু মিনিট হলো না এসেছি এটুকু দেখাতে মন ভরে নাকি। বলেই তিশার হাত ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসলো।
..আমাকে এভাবে ধরেছেন কেনো ছাড়ুন।
..এমন ভাবে বলছো যেনো আমার কাছে আগে আসোনি!
..ছাড়ুন অস্বস্তি লাগছে।
আয়ান ভাইয়া ওকে ছেড়ে দিয়ে বললো
..হুম ছাড়লাম। আচ্ছা তিশা সত্যি খুব মিস করছিলে আমায়?
..উহু একটুও না। নিচে তাকিয়ে।
..ওওও তাহলে আর কি আমি বরং চলেই যাই কেউ তো আমাকে মিস করে না আর ভালোবাসা তো কতো দুরে।
তিশা তাকালো ভাইয়ার দিকে,,,ভাইয়া তিশাকে বাই বলে ব্যালকনির দিকে যেতে নিলে তিশা দ্রুত পায়ে এগিয়ে ভাইয়াকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।
ভাইয়া ভেবেছিলো তিশা উনাকে ডাকবে কিন্তু এভাবে যে জড়িয়ে ধরবে ভাবতে পারেনি হা করে পাথরের মতো দাড়িয়ে আছে।

তিশা ওভাবেই জড়িয়ে ধরে বললো ভালোবাসি আয়ান খুব ভালোবেসে ফেলেছি আপনাকে।
আয়ান ভাইয়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো উনি ঘুরে দাড়িয়ে তিশার দুগালে হাত দিয়ে বললো
..আমি জানি তো তুমি আমাকে ভালোবাসো তোমার সেদিনের শুন্য বলার পিছনে যে এটাই ছিলো আমি বুঝতে পেরেছিলাম। শুধু অপেক্ষায় ছিলাম তোমার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটি শোনার জন্য। বলেই তিশার কপালে ঠোঁট ছোয়ালো।
..তিশা মুচকি হেসে বললো হনুমান একটা সব জেনেও এমন ঢং করছিলেন এ কয়দিন।
..হ্যা গো পিচ্চি।
তিশাকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে আয়ান ভাইয়া বললো….জানো তিশা আমি না এখনো ভাবতে পারছি না আমি কাউকে ভালোবাসি। তোমাকে দেখার আগে কখনো এমন হয়নি আমার। তোমাকে দেখার পর থেকে বুকে এক অন্য রকম অনুভূতি হয়েছিলো,,,,তখনি মনের কোনে তোমাকে নিয়ে সপ্নো বুনতে শুরু করেছি। এখন আমার সব চাওয়া পাওয়া সপ্নো”””শুধু তোমায় ঘিরে”””।

?

#চলবে. . . ?