শুধু তোমায় ঘিরে পর্ব-০৫

0
2985

?শুধু তোমায় ঘিরে?

#মেঘা আফরোজ…..?
#পর্ব-৫….?

?

আজ শুক্রবার ভার্সিটি অফ নিজেকে রুমের চার দেওয়ালের মাঝেই বন্দি রেখেছি। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বের হই না। আমার পছন্দের মটু পাতলু কার্টুনটাও এখন আর দেখতে ইচ্ছে করে না। আজকাল নিজেকে একা রাখতেই ভালো লাগে। ফ্লোরে বসে আছি খাটের সাথে মাথা ঠেকিয়ে মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে আছে। হঠাৎ দরজার টোকা পড়লো,মা ডাকছে।

..মেঘা দরজা আটকে রেখেছিস কেনো কটা বাজে দেখেছিস ব্রেকফাস্ট করতে হবে না? দরজাটা খোল।
উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে এসে বসে পড়লাম বিছানায়। মা আমার সামনে এসে দাড়ালো।
..কি হয়েছে মেঘা আজ কদিন ধরে দেখছি তুই সেই আগের মতো নেই হাসিস না ঠিক করে কথাও বলিস না কি হয়েছে বলতো?
..আমার কিছু হয়নি মা তুমি অযথাই টেনশন করছো।

মা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো…..কিছু না হলেই ভালো আয় তো ব্রেকফাস্ট করবি তোর বাবা তোর জন্য বসে আছে।
..বাবা এখনো খায়নি কেনো?
..সপ্তাহে এই একটি দিন তোর বাবা বাসায় থাকে তোকে ছাড়া একা খাবে ভেবেছিস।
..ঠিকআছে মা তুমি যাও আসছি আমি।
মা চলে গেলো মনটা খারাপ থাকলেও বুঝতে দেওয়া যাবে না। গিয়ে বাবা মায়ের সাথে হাসি মুখেই ব্রেকফাস্টটা করে নিলাম। খাওয়া শেষে উঠে আসতে নিলে মা বললো……মেঘা আজ তোর খালামনির বাসায় যাবো তৈরি হয়ে থাকিস একটু পরেই বের হবো।
খালামনির বাসায় যাওয়ার কথা শুনে নিমিষেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কিছু না বলেই নিজের রুমে চলে আসলাম। দরজাটা আটকে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলাম।
চোখটা বন্ধ করে ভাবতে লাগলাম ৩ দিন আগের কথা।

. ?

রবিবার ছিলো সেদিন যেদিন ফুচকার দোকানে তাসিন ভাইয়া আর ওই মেয়েটিকে দেখেছিলাম।তাসিন ভাইয়াকে সেদিন রিশার সাথে দেখার পরে মন খারাপ হয়েছিলো তারপরেও মানিয়ে নিয়েছিলাম।
সোমবারে তিশার সাথে কিছু কেনাকাটা করার জন্য শপিংমলে গিয়েছিলাম। শপিংমলে ঢুকতেই একটা দোকানের পাশে দেখতে পেলাম তাসিন আর রিশাকে। দুজনে খুব কাছাকাছি ছিলো ওদের সাথে আরো একটি ছেলেও ছিলো ওরা খুব হাসাহাসিতে মেতে ছিলো। ওদেরকে ওভাবে দেখে খুব খারাপ লেগেছিলো তখন। মনে হয়েছিলো আমার বুকে কেউ ধারালো ছুরি বিধিয়ে দিয়েছে। এক অন্য রকম কষ্টের অনুভব করেছিলাম,,,,
তখন মনে হয়েছিলো তাসিন তো অন্য কাউকে ভালোবাসে,,,,,,তাসিনকে ঘিরে যে সপ্নো বুনেছিলাম আমি সেটা না হয় চাপা পড়েই থাক। ওদের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে ছিলাম তিশা কিছুটা জোরেই বলল উঠলো
..এই মেঘা হলোটা কি তোর হুটহাট দাড়িয়ে পরিস কেনো?
..কিছু না চল। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে।

তিশা আমাকে যখন ডেকেছিলো তাসিন শুনতে পেয়ে পাশে তাকিয়ে আমাকে দেখেছিলো অনেক বার ডেকেছিলো আমি শুনি নি। কেনো জানি একটা চাপা অভিমান হয়েছিলো তাসিনের উপর। এই তিন দিনে তাসিন অনেকবার ফোন দিয়েছে রাস্তায়ও কথা বলার চেষ্টা ও করেছে কিন্তু আমি কথা বলিনি। কেনোই বা বলবো কথা বললে হয়তো আমার আরো বেশি কষ্ট হবে তার থেকে বরং নিজেকে একা রাখি এটাই ভালো হবে।

. ?

মায়ের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বেড়িয়ে এলাম। দরজার ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে ডাকছে উঠে গিয়ে খুলে।দিলাম।
..কিরে মেঘা তুই এখনো তৈরি হসনি কি করলি এতোক্ষণ বলতো? যা জলদি তৈরি হয়ে নে।
..মা আমি যাবো না তুমি আর বাবা যাও।
..সেকিরে কেনো যাবিনা??
..এমনি ইচ্ছে করছে না যেতে।
..ইচ্ছে করছে না মানে!তুই না গেলে তোর খালামনি রাগ করবে আর কথা না বাড়িয়ে যাতো রেডি হয়ে নে।
মায়ের জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়েই যেতে হচ্ছে,,,,,তবে আমি ঠিক করে নিয়েছি তাসিনের সাথে কোনো কথা বলবো না।

মা আমি খালামনি বসে আছি খালামনির রুমে বাবা আর খালু একটু বেড়িয়েছেন। আমি চুপচাপ বসে আছি খালামনি আমাকে চুপ থাকতে দেখে বললো
..মেঘা তোর কি মন খারাপ?
..কই নাতো আমি ঠিকআছি খালামনি।
..আমার তো মনে হচ্ছে তুই ঠিক নেই কেমন চুপচাপ হয়ে গেছিস চেহারাটাও ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।
মা ও তখন বললো…..আপা তুমি একদম ঠিক বলেছো আমিও ওর মাঝে পরিবর্তন দেখতে পারছি।

তখনি তাসিন ভাইয়া মা মা করে ডাকতে ডাকতে রুমে ঢুকলো আমি কিছুটা চমকে উঠলাম উনার কন্ঠ শুনে।
তাসিন ভাইয়া হয়তো বাড়িতে ছিলো না মাত্রাই আসলো ,,,,রুমে ঢুকেই উনি যেনো চুপ হয়ে গেলো আমার দিকে তাকিয়ে। আর আমি উনাকে দেখে আরো চমকালাম।
..একি অবস্থা হয়েছে তাসিনের? চুলগুলো এলোমেলো চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে উনি কি ঘুমায় না নাকি?চেহারার মধ্য উজ্জ্বলতার ছিটেফোঁটাও নেই। মনে মনে বলছিলাম।
আবারো উনার প্রতি অভিমানটা আমার ওপর যেকে বসলো নামিয়ে নিলাম চোখটা। উনি আমার দিকে কেমন যেনো অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন আমি অন্য দিকে তাকাতেই উনি মায়ের সাথে কথা বলে চলে গেলেন। আমার ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিলো,,,,খুব ইচ্ছে করছে উনার এলোমেলো চুলগুলো একটু ছুয়ে দিতে।

. ?

খালামনি আজ আমাদেরকে যেতে দেয়নি যদিও থাকার ইচ্ছে ছিলো না কিন্তু সবার কথার জন্য থাকতে হলো।
রাতে তখন ১১ টা বাজে ভালো লাগছিলো না। ভাবলাম ছাদে গেলে খোলা আকাশের নিচে হয়তো ভালো লাগবে। তাই রুম থেকে বেড়িয়ে ছাদে উঠার শিরিটার কাছে আসতেই কেউ আমার হাতটি জোরে চেপে ধরলো। আমি কিছু বুঝে উঠার আছেই সে আমাকে পাশের রুমটাতে নিয়ে দরজা আটকে দিলো। এতোক্ষণে যেনো বুঝতে পারলাম কি হলো আমার সাথে।
আমি নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছি সামনে থাকা লোকটির মুখ অন্ধকারে দেখতেও পারছি না,,,,ভয়ে আমার গলাটা শুকিয়ে আসছে। রুমটা অন্ধকার জানালা দিয়ে বাইরের কিছুটা আলো এসে সামনের মানুষটির মুখে পড়াতে আমি চরম আকারে অবাক হলাম সাথে রাগ ও হলো তার ওপর।

..ভাইয়া আপনি!!আমাকে এভাবে নিয়ে আসলেন কেনো ছাড়ুন আমাকে।
উনি আমার ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ থাকতে বললেন। তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে যেনো কতোদিনের তৃষ্না মিটাচ্ছেন আমাকে দেখে। বাইরের আলো এসে আমার মুখে পড়ায় উনি ভালো ভাবে দেখতে পারছেন।

আমার মোটেও সহ্য হচ্ছিলো না উনি আমার হাতটা এখনো চেপে ধরে আছেন। আমি নিজেকে ছাড়ানের জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। হঠাৎই তাসিন আমাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলেন উনার একহাত আমার কোমড়ে অন্য হাত দেওয়ালে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন।
..মেঘা তুই কি আমাকে মেরে ফেলতে চাস?
আমি বিষ্মিত চোখে তাকালাম উনার দিকে আবছা আলোতেই বুঝা যাচ্ছে চোখে পানি টলমল করছে। কিন্তু উনি এ কথা কেনো বললো? উনার নিশ্বাস আমার মুখে পড়ছিলো। কেমন যেনো অস্বস্তিকর একটা পরিবেশ।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে তাসিন উনার দুহাতে আমার দুগালে হাত রেখে আমার কপালে নিজের কপাল ছুইয়ে বললো…..
মেঘা তুই তো এতোটাও ছোট নয় একটা বার কি সত্যিটা যাচাই করতে পারতি না? আমার মনে কি আছে সেটা কি একটি বার জানতে চেয়েছিস তুই? কখনো কখনো যে চোখের দেখাটাও ভুল হতে পারে এটাও কি বুঝিস না? তোর এমন অবহেলা অভিমানটা যে আমার ভিতরটা তিলে তিলে ক্ষতোর সৃষ্টি করছে।

তাসিনের বলা কথাগুলো যেনো আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে কি বলে চলেছে উনি এসব? আমি প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম উনার দিকে।
উনি আবারো বলতে লাগলো….

আমি যে ঘুমাতে পারি না মেঘা।জানিস এই খান টায় ঠিক এই খানে(বুকের বা পাশে আমার হাতটি চেপে ধরে) প্রচন্ড আকারে চিনচিন ব্যাথা অনুভব করি। মনে হয় যেনো কেউ আমার হৃদপিন্ডটা আমার থেকে আলাদা করে নিয়েছে।আমার পুরোটা জুরে যে শুধু একটি রমনির বসবাস,,,,সে যে প্রতিটি মুহুর্তে আমাকে মুগ্ধ করে। আমি চাই খুব করে চাই সে আমার বুকে এসে আমার এ অসহ্য যন্ত্রণা টা কমিয়ে দেক।

আমার মনে অনেক গুলো প্রশ্ন জটলা পাকিয়ে চলেছে। তাসিনের বলা সব কথা,গুলো যেনো আমাকে ঘিরেই ছিলো। তাহলে কি উনিও আমাকে ভালোবাসেন? কিন্তু ওই মেয়েটা সে কে ছিলো উনার।
আমার হাত তাসিন নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন……

মেঘা আমি জানি তুই কি ভাবছিস। তোর ভাবনার উত্তরটা আমিই দিচ্ছি। রিশা আর আমাকে যেভাবে যেটুকু দেখেছিস পুরোটাই আমাদের প্ল্যান ছিলো। রিশা আমার ফ্রেন্ডের গার্লফ্রেন্ড। আমি শুধু তোর মনের অনুভূতি টুকু জানার জন্য ওর সাথে তোর সামনে মিশেছিলাম। কিন্তু আমি ভাবিনি তুই এ ব্যাপারটা এতোটা সিরিয়াস ভাবে নিবি।
এ তিনটা দিন আমার তিনটা বছরের মতো কেটেছে তোর সাথে একটু কথা বলার জন্য দমটা যেনো বন্ধ হয়ে আসছিলো আমার।
আমি তোকে অনেক ভালোবাসি মেঘা,,,আমার জীবনের থেকেও বেশি।

. ?

আমার চোখ থেকে ফোটা ফোটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো নিজের হাতটা তাসিনের থেকে ছাড়িয়ে কষিয়ে একটা চর বসিয়ে দিলাম তাসিনের গালে। উনি হয়তো ভাবতেই পারেনি আমি এমন একটা কাজ করবো। উনি নিজের গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি কান্নাটা আর চেপে রাখতে পারলাম না ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম।
কান্নারত অবস্থাতেই তাসিনের শার্টের কলার চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে লাগলাম…….

আ আমাকে কি আপনার পুতুল মনে হয়েছিলো হ্যা? এতো কিছু বুঝেন আর এটা বুঝেন না একটা মেয়ে হয়ে কি করে ভালোবাসি কথাটি বলবে? অনুভূতি বুঝতে চেয়েছিলেন আপনি!! তার জন্য,এতো নাটকের কি দরকার ছিলো?
সারাসরি বললেই পারতেন ভালোবাসেন আমাকে তারপর না হয় দেখতেন আমার অনুভূতি কি ছিলো। আপনার কোনো ধারনা আছে কি ভাবে কাটিয়েছি আমি এ কটি দিন!!

মেঘা প্লিজজ আমাকে একটু বুঝার চেষ্টা কর। সত্যিই আমি বুঝতে পারিনি রে। জানিস এখন আমি খুববব খুশি এটা জেনে আমার মেঘা পাখি টাও যে আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে। আমার গালে হাত রেখে বললো।

আমি একঝটকায় উনার হাত আমার গাল থেকে সড়িয়ে দিয়ে বললাম…ছুবেন না আপনি আমাকে। আমাকে এতো এতো কষ্ট দিয়ে কাঁদিয়ে এখন এসেছে ভালোবাসা দেখাতে।

তাসিন আমাকে একটানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন এতোটাই কাছে নিয়েছেন আমি উনার বুকের টিপটিপ শব্দটা টের পাচ্ছি। উনি আমাকে বুকের জড়িয়ে ধরে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বললেন……আর কষ্ট দিবো না তোমাকে এখন থেকে শুধু ভালোবাসবো তোমায়। আমি যে অজস্র সপ্নো বুনে রেখেছি এ বুকে সবটাই”””””শুধু তোমায় ঘিরে””””মেঘকন্যা।

তাসিনের আবেগময় কথাগুলোতে আমার চোখের পানি যেনো বাধ মানছে না একহাতে তাসিনের শার্টে খামচে ধরে উনার বুকে মাথা রেখে অঝরে কান্না করে চলেছি।
আমার সারা শরীর যেনো অবস হয়ে আসছিলো আস্তে আস্তে চোখটা বন্ধ হয়ে গেলো আমার। নিজের সব ভার ছেড়ে দিলাম তাসিনের উপর। তারপর কি হয়েছিলো জানি না।
পরের দিন সকালে…..

?

#চলবে. . . ?